ধারাবাহিক: নানা রঙে বাংলার লোকগান(পর্ব -১) । তপশ্রী পাল

Reading Time: 4 minutes

লোকগান কথাটির উৎস সন্ধান করলে জানা যায়, প্রাকৃতজনেরও যে দর্শন আছে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে তার স্বীকৃতি মেলে। প্রাক আধুনিক ভারতে যাকে লোকায়ত দর্শন আখ্যা দেওয়া হয়েছিলো তা আসলে প্রাকৃতজনের অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরই দর্শন। এই দর্শন বস্তুবাদী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন ‘লোকেষু আয়ত= লোকায়ত অর্থাৎ লোকের মধ্যে যা সহজেই ছড়িয়ে পড়েছে বা পরিব্যাপ্ত হয়েছে তাই লোকায়ত’। সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত বলেছেন, নামটির বুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘জনসাধারণের মধ্যে যার পরিচয় পাওয়া যায়’। এই লোকায়ত দর্শন থেকেই উঠে এসেছে লোকগান।

মানুষের মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো সঙ্গীত। আনন্দে, উৎসাহে শোকে-দুঃখে হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে সঙ্গীতের ঝরণাধারা। আবহমান কাল ধরে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সঙ্গীতের যে ধারাটি প্রবাহিত হয়ে আসছে তার নাম লোকসঙ্গীত। লোকসঙ্গীত যে কোন স্থানের নিজস্ব। তেমনই বাংলার লোকগান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিতে পরিপুষ্ট।

জনসাধারণের দর্শন তাদের শ্রম প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সুবিখ্যাত ভারত তত্ত্ববিদ মনিয়ার উইলিয়ামস তাঁর সংস্কৃত ইংরাজী অভিধানে দেখিয়েছেন যে সংস্কৃত ভাষার ‘লোক’ শব্দটি লাতিন ‘Lucas’ শব্দের সঙ্গে তুলনীয়। লাতিন ‘Lucas’ বলতে সরাসরি চাষের জমিকেই বোঝায়। বাংলার প্রাকৃতজন তো মূলতঃ কৃষকই। তাদের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকেই উৎসারিত হয়েছে তাদের ভাবাদর্শ, দর্শন ও সঙ্গীত। সুতরাং লোকায়ত দর্শন এবং সঙ্গীত যে মেহনতী মানুষের সঙ্গে যুক্ত তাতে সন্দেহ নেই।

লোকগান হল মাটির গান । কৃষিপ্রধাণ ও নদীমাতৃক বাংলার লোকগান চাষীর গান, মাঝির গান, মজুরের গান, পথে পথে আউল বাউলের গান। এ গানে মিশে আছে বাংলার বারো মাসে তেরো পার্বণ । এই সহজিয়া গান আমাদের হাসায়, কাঁদায়, নাচায় । লোকগান দেশের সীমা মানে না । বাংলার লোকগান মানে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে যে অবিভক্ত বাংলা তারই প্রাণের গান। কখনো বা তার সাথে মিশে গেছে পার্শ্ববর্তী বিহার, ঝাড়খন্ড লেচঅথবা আসামের লোকগানের ধারা।

বাংলা লোকসঙ্গীতের নানা ধারা, নানা রূপ। আঞ্চলিক ভৌগোলিক বিশেষত্ব, সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পেশা, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব এবং নিত্যদিনের সুখদুঃখ, সবই গাঁথা আছে এই গানে। লোকগানের নানা ধারার মধ্যে আছে ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর, কীর্তন, বাউল ইত্যাদি। যে অঞ্চলের গান সেই অঞ্চলের বাংলা ভাষার dialect এ গাওয়া হয় গানগুলি। কিছু গান আবার অনেকে একসাথে মিলে করেন যেমন সারিগান, জারিগান, গাজনের গান, লেটো, কবিগান, আলকাপ ও গম্ভীরা। কিছু লোকগান ছেলেরাই করেন, যেমন গাজনের গান, কয়েক ধরণের গান শুধু মেয়েরা গান যেমন বিয়ের গান, অন্যান্য গান ছেলে মেয়ে উভয়েই গাইতে পারেন। লোকগানের ভান্ডার অসীম। সমুদ্র থেকে কয়েক বিন্দু জল তুলে নেওয়ার মতোই তাই বেছে নিলাম বাংলার কয়েক ধরণের লোকসঙ্গীত সম্বন্ধে কিছু কথা।

প্রথমেই বলি ভাটিয়ালি গানের কথা। লোকগানের বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটি বিখ্যাত ধারা হল “ভাটিয়ালি”। গঙ্গা, পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত অববাহিকায় যে ভাটি অঞ্চল পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের বরাক উপত্যকা জুড়ে, এ হল সেই অঞ্চলের গান । এই অঞ্চল নদীমাতৃক। এ গানের পরতে পরতে তাই মিশে আছে অথৈ জলের টান – গহীন গাঙ্গে নাও ভাসিয়ে মাঝি খোলা গলায় গেয়ে ওঠে এই গান । নদীর স্রোত, নৌকার গতির সঙ্গে দুলে দুলে তাল রেখে চলে এই গান! এই গানের তালে তালে এরা নৌকা বাওয়ার পরিশ্রম ভুলে যায়! জোয়ারের সময় স্রোতে নৌকা বাইতে আরো পরিশ্রম আর জলের আওয়াজে কিছু শোনা যায় না। তাই ভাঁটার সময়েই গান গাওয়া হয়। ভাটিয়ালী গানের মূল বৈশিষ্টা হলো এ গানগুলো রচিত হয় মূলত মাঝি, নৌকা, দাঁড়, গুন ইত্যাদি বিষয়ে। সাথে থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নরনারীর প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, বিরহ, আকুলতা, প্রতিদিনের সুখ দুঃখ ইত্যাদির সম্মিলন। যেমন –

১। আষাড় মাসে ভাসা পানি পূবালি বাতাসে, বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি, আমার নি কেউ আসে।

২। গুরু কাঙ্গাল জানিয়া পার করো

গুরু জগত উদ্ধারো

গুরু কাঙ্গাল জানিয়া পার করো

৩। দিলদরিয়ার মাঝে রে ভাই আছে আজব কারখানা

দিলদরিয়ার মাঝে রে ভাই –

দেহের মধ্যে নদী আছে, সেই নদীতে ঢেউ লেগেছে গো

দশজনেতে দাঁড় টেনেছে, হাল টেনেছে একজনা

এই গানের সাথে বাজে দোতারা। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের মানুষগুলোর জীবনে নৌকাই সব। এরা বলে নৌকোর প্রাণ আছে। নৌকো এদের মেয়ে। যিনি নৌকোটি গড়ছেন তিনি বাপের মতো স্নেহে নৌকোটি গড়েন। একটা নৌকোর হাত পা দেহ মাথা সব আছে। গলুইতে যেখানে সিঁদুর দেওয়া হয় সেটা মাথা, দাঁড়গুলো তার হাত যা দিয়ে নৌকো এগিয়ে যায়, পিছনে যেখানে হাল ধরে সেটা হলো পা, যা দিকনির্দেশ করে। নৌকো হলো ঘরের লক্ষ্মী যাকে এরা ফুল ফল ধূপ দিয়ে পুজো করে। তারপর বানানো হয়ে গেলে নৌকো সম্প্রদান হয়। যিনি কেনেন তাঁর ঘর হলো নৌকোর শ্বশুরঘর।

বাংলার ভাটিয়ালি গানের ধারাটিকে বিখ্যাত করেছেন শ্রদ্ধেয় নির্মলেন্দু চৌধুরী এবং অমর পাল। তাঁদের গাওয়া অসংখ্য ভাটিয়ালি গানের মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ করছি।

  • আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে – অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে
  • মাঝি বাইয়া যাও রে – অকূল দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙ্গা নাও মাঝি বাইয়া যাও রে
  • মনমাঝি সামাল সামাল ডুবলো তরী ভবনদীর তুফান ভারী

কেমন হয় এই গানের চলন তা বোঝানোর জন্য নীচে দিলাম স্বকন্ঠে একটি গানের টুকরো।



এই ভাটিয়ালি গানেরই একটি শাখা হলো সারিগান। সারিগান দলবদ্ধ সঙ্গীত। নৌকা বাইচ বা একাধিক নৌকার মধ্যে লড়াই, এই অঞ্চলে অত্যন্ত প্রচলিত। এক একটি নৌকায় কমপক্ষে পঁচিশ ত্রিশজন মাঝি বসে একসাথে নৌকা বাওয়ার তালে তালে বাইবার পরিশ্রম ভুলতে একসাথে গেয়ে ওঠে সারিগান। সারিগানের তালে নৌকা যেন উড়ে চলে

১। “নাও দৌড়ায় রে, কুরুলিয়ার খালে

সেলিমপুরের গিরি মাঝি উড়া করো পালে রে”

২। সোনার বান্দাইলে নাও পিতলের গুড়া রে

ও রঙ্গের ঘোড়া, দৌড়াইয়া যাও

আরে বৈঠা না পড়িতে নাওয়ের শূন্যে পড়ে উড়ান

আরে হৈ হৈ হৈ হৈয়া –

ভাটি অঞ্চলে সারিগান প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে প্রচলিত। বিজয় গুপ্তের পদ্মপুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। নৌকাটিকে তেল সিঁদুর দিয়ে সাজিয়ে মাঝিরা যাত্রাশুরুর সারিগান গায় –

“যাত্রা করাইয়া মোরে দ্যাগো নন্দরানী

মা গো কালীদহে যাবো আমি কালীদহে যাবো –“

নৌকা জলে নামলে গায় –

“জল ভরিয়া ঘাটে যাইয়ো না

ও সই কালার নয়ন পানে চাইয়ো না”

দুটি নৌকার মধ্যে গানের লড়াই শুরু হলে, মূল গায়েনরা কোমর দুলিয়ে সারিগান গেয়ে ওঠে। সারিগান এদের জীবন থেকে উঠে আসে! নৌবাইচ প্রতিযোগিতায় কেউ জেতে কেউ হারে। রেষারেষি মনে থেকে যায়। এমন গান গায় যেন শাশুড়ি বৌ ঝগড়া হচ্ছে। একজন বলছে যে কাল নাহয় জিতেছিস, আজ কী করবি?”

“কালকা খাইছিলি মাছের মাথা আজকা খাইবি কী

তর ঘরে রঙ্গিলা বিলাই রে –“

তাই শুনে অপর পক্ষ বলছে –

“খিড়কী ঘুচাইয়া মোরে নাও গো নবনাগরী

বৌ নারী বৌ নারী মুসুর কেন করি

রাও কইরো না ছাও কইরো না শাশুড়ি

একটা বিলাই ইন্দুর মারে”

মানে ঝগড়া না করে ভাব করে নাও।“

সারিগান যে শুধু মাঝিরা গায় তাই নয়। মূলতঃ শ্রমের কষ্ট ভুলতে এই গান। পরবর্তীতে শ্রমজীবীদের মধ্যে যেমন, কৃষকদের ফসল কাটা, ফসল তোলা, ক্ষেত নিড়ানো, হাল চাষ বা হাল বাওয়া ও ফসল ঘরে তোলার পরিশ্রম লাঘবের জন্য এ লোকগানের প্রচলন দেখা যায়। তাছাড়া পরিশ্রম নির্ভর কাজ যেমন, গাছ কাটা, ইমারত ভাঙ্গা, ছাদ পেটানো ইত্যাদি কাজে এর প্রচলন লক্ষ করা যায়।

সারি গান মূলত সমবেত কণ্ঠে পুরুষরা গেয়ে থাকে। তবে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ থাকলে তারাও গানে যোগ দেয়। সারি গানের গায়েনদের মধ্যে একজন বয়াতি মূল গানটি গায়। আর বাকিরা দুয়া বা দিনা ধরে তালে তালে সমবেত কণ্ঠে গেয়ে চলে। পালাক্রমে বয়াতি ও দোহারদের মধ্যে এভাবে সারি গান এগিয়ে চলে।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>