লোথার ম্যাথিউস

৮ই জুলাই,১৯৯০।রোমে চলছে বিশ্বকাপ ১৯৯০এর ফাইনাল ম্যাচ আর্জেন্টিনা আর জার্মানির মধ্যে।চলছে শিরোপার লড়াই,শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াই,সমান থাকা শিরোপা সংখ্যা আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়ার লড়াই।দুই দলই সমানে সমান।ফলাফল ৮৫মিনিট পর্যন্ত ম্যাচ গোলশুন্য।বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম জঘন্য ম্যাচটিও নাকি এটা ছিল।৮৫ মিনিটে পেনাল্টি পায় জার্মানরা।অত:পর গোল,জার্মানির শিরোপা হল ৩টি।শেষ বাশি বেজে ওঠার সাথে সাথে ১০নম্বর জার্সি পরিহিত এক খেলোয়াড়ের অদ্ভুত এক উদযাপন।ঠিক যেন “আমি ইহাকে পাইলাম”ধরনের আনন্দ।আর জার্মানদের এই শিরোপা এনে দেওয়ার যে প্রধান কারিগর ছিলেন,সেই ৫ফুট ৮ইঞ্চি বিশিষ্ট ১০নম্বর জার্সি পরিহিত খেলোয়াড়ের নাম লোথার ম্যাথিউস।

কেনো তিনি কারিগর?আচ্ছা তাহলে তার বিশেষত্ব কি?আর কে এই লোথার ম্যাথিউস?আর কেনোইবা তাকে নিয়ে আমি লেখছি?আমি যদি বলি উনি জার্মান লিজেন্ড তাহলে আপনি আমাকে বেকেনবাউওয়ারের কথা বলবেন,বলবেন জার্ড মুলারের কথা।আমিও যুক্তি দিতে প্রস্তুত,জার্ড মুলার অমানবিক ভাবে গোল করে যদি লিজেন্ড হয় তাহলে জার্মান দলের এই বিকাশককে কেনো আমি সেই তকমা দিতে পারি না?তার হার না মানা মনভাব,টিম স্পিরিট দেওয়া,ট্যালেন্ট এবং সর্বোপরি জয়ের জন্যে তার যে সব কিছু করার মনভাব তাকে করেছে লিজেন্ড আর জার্মানিকে করেছে আধুনিক আর অপ্রতিরোধ্য। যিনি জার্মানিকে তুলেছেন টানা ৩বার বিশ্বকাপ ফাইনালে,জিতেছেন ১টি ইউরো আর ১বার দিয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মর্যাদা। হ্যাঁ,এই হার না মানা মনোভাবের অপর নাম “লোথার হার্বার্ট ম্যাথিউস”।’৯০-এর বিশ্বকাপের এই নায়কের যথাযোগ্য বর্ণনা করেছেন ম্যারাডোনা।তার আত্মজীবনী ‘আই এম দ্য দিয়াগো’ বইতে তাকে দিয়েছেন অনন্য সম্মান। তিনি বলেছেন ‘সে ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। আমার মনে হয় শুধু এতটুকুই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।’পেলে তো তাকে রেখেই দিয়েছেন ফিফার সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের তালিকায়।

আজকের ফুটবল লিজেন্ড পরিচিতি পর্বে আমি তার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিব।

ছবি: সংগৃহীত

২১মার্চ,১৯৬১। হেইঞ্জ ম্যাথিউস আর ক্যাথেরিনা ম্যাথিউসের ঘর আলো করে জন্ম নেয় লোথার হার্বার্ট ম্যাথিউস বা লোথার ম্যাথিউস।কে জানত,বাভারিয়ার এর্লাঞ্জেনে জন্ম নেয়া এই বালক হেইঞ্জ আর ক্যাথেরিনার পরিবারের সাথে সাথে জার্মান ফুটবলে জ্বালবেন আলোর মশাল,তার হাত ধরে আসবে জার্মান ফুটবলের আরেক স্বর্ণযুগ ?যারা ইউরোপ ফুটবলের ভক্ত তারা নিশ্চয়ই জানেন যে ১০বছরের কম বয়স থেকে বাচ্চাদের ফুটবল ক্যাম্পেইন করে ফুটবল শেখানো হয়।ঠিক আমাদের দেশে জিলা স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি জন্যে কোচিং করানোর মত।

৯বছর বয়সী লোথার এফ সি হার্জোগেনারচ ক্লাবে খেলা শুরু করেন।সেখানে ৯ বছর দীক্ষা নেওয়ার পর তিনি যোগ দেন বরুশিয়া মনশেগ্লাডবার্খে।তখন মনশেগ্লাডবার্খের কোচ ছিলেন ইয়ূপ হেইন্কস।তিনি ১৮বছর বয়সী লোথারের দ্রুত বড় ভক্ত হয়ে যান আর তাকে মূলদলে নিয়ে নেন।এরপর আর তাকে থেমে থাকতে হয় নি।১৯বছর বয়সেই ডাক পান জার্মানির জাতীয় দলে।১৯৮০সালের ১৪জুনের ৭৩মিনিট অভিষেক হয় জাতীয় দলে।৭৩মিনিটের সেই সাবস্টিটিউশনই হয়ত জার্মানির সর্বকালের অন্যতম সেরা সাবস্টিটিউশন ছিল।১৯৭৯ সালে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করার পর অংশ নিয়েছিলেন ’৮২ বিশ্বকাপে।চমৎকার এই ফুটবলার প্রথমদিকে মধ্য মাঠের একজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ের সঙ্গে সঙ্গে পালন করতেন রক্ষণাত্মক মধ্য মাঠের খেলোয়াড়ের ভূমিকাও।তার স্পেশাল ট্যালেন্ট গুলোর মধ্যে ছিলো প্রধানত প্লে-মেকিং,পাসিং,মিডল শুটিং,পেনাল্টি,ওয়ান টাচ পাস আর স্লাইডিং এ। কিন্তু পরবর্তীতে খেলোয়াড়ী ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এনে দায়িত্ব নেন সুইপারের।

৮০ এর ইউরো অবশ্য ততদিনে জয় করা হয়ে গেছে তার।৮২ বিশ্বকাপে তরুণ এই খেলোয়াড় মাত্র দুটি খেলায় অংশ নিতে পেরেছিলেন। ফাইনালে ইতালির কাছে ৩-১ গোলে হেরে আশাহত হয়ে ফিরতে হয়েছিল লুথারকে,ফিরতে হল তার দল জার্মানিকে।এর পর ’৮৬ বিশ্বকাপে ম্যাথিউস রীতিমতো তারকা ফুটবলার।মিডফিল্ডে তার চমৎকার নৈপুণ্যের জন্য কোচ তাকে তৎকালীন ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফুটবলার ম্যারাডোনাকে মার্কে রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যথেষ্ট সফল ছিলেন।লোথার ম্যারাডোনাকে সেসময় এমনভাবে মার্কিং করেছিলেন যেন তার সব মুভ লোথার জানেন।

ছবি: সংগৃহীত

যা পরবর্তীতে ম্যারাডোনাই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু আবার দুর্ভাগ্য লাগাতার দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ৩-২ গোলে হেরে দেশে ফিরতে হয়েছিল লুথারকে।ভাগ্য যেন রীতিমত তাকে নিয়ে ছেলেখেলা শুরু করল।

’৮২ এবং ’৮৬ পর দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে যখন জার্মানির শিরোপা স্বপ্ন ধূসর হতে শুরু করেছিল ঠিক তার পরের আসরে অর্থাৎ ৯০এর ইতালি বিশ্বকাপে তারা আবারও ফাইনালে।অনেকেই তাই গত দুই বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে জার্মানিকে রানারআপের তকমা তুলে দিয়েছিল,হয়ত মানসিকভাবেও জার্মান দলও ভেবে নিয়েছিল সে ফলাফল। কিন্তু পটপরিবর্তনে এবার অধিনায়ক স্বয়ং লুথার ম্যাথিউস। শেষ মুহূর্তের খেলা পরিবর্তন করে দেয়াই ছিল তার বিশেষত্ব।তার জয়ের আকাঙ্ক্ষা,আগ্রাসী মনভাব আর সেই উক্তি-“দরকার হলে ডিফেন্স করেই বিশ্বকাপ জিতব” এসব দেখে ভাগ্য দেবতাও হয়ত আর প্রসন্ন না হয়ে পারেন নি।লোথারের দু’হাত ভরে দিলেন সেই সোনার হরিণ,বিশ্বকাপ।তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের হাত ধরে জার্মানি জিতল ৩বারের মত বিশ্বসেরার মুকুট।রবার্ট ব্রুশের সেই ৭বারের চেষ্টায় রাজ্য জয়ের গল্প জার্মানবাসী জানেন কিনা জানি না।হয়ত,দরকারও পড়ে নি।কারণ,লোথারের কাছে ব্রুশের ঐতিহাসিক সেই জয়ের রঙ হয়ত ফিকে হয়ে গেছে জার্মানদের কাছে।ইতালি ৯০ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ায় ম্যাথিউসের জন্য খেলা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। কারণ মাত্রই ইতালিয়ান টিম ইন্টার মিলানকে গত বছর এনে দিয়েছিলেন ইতালিয়ান লিগ টাইটেল। আরো আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো মিলানের হোম গ্রাউন্ড স্তাদিও সান সিরোতেই বেশিরভাগ ম্যাচে অংশ নেয় জার্মানি। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপরীতে জার্মানির দর্শক সমর্থনের অন্য আরেকটি কারণও ছিল।কারণ, আর্জেন্টিনার কাছেই যে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল আয়োজক দেশ ইতালিকে।

সব কিছু মিলে আর্জেন্টিনা এবং লিজেন্ড ম্যারাডোনাও কম পরে গিয়েছিল ম্যাথিউসকে রোখার জন্য।বলে রাখা ভালো যে,এই বিশ্বকাপ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানি নামেই মাঠে নামত, পরে পূর্ব জার্মানি যুক্ত হওয়ায় আবার জার্মানি নাম ফিরে আসে। এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ম্যাথিউস গোল করেছিলেন চারটি। এর মধ্যে দুটি গোল ছিল জুগোস্লাভিয়ার বিপরীতে। যেখানে তার দল ৩-১ গোলের ব্যবধানে জয় পায়। ’৯০-এর বিশ্বকাপে এ দলটি ছিল চমৎকার ফর্মে। এমনকি তারা আর্জেন্টিনার সঙ্গেও জয় পেয়েছিল। পশ্চিম জার্মানির সামনে আর্জেন্টিনা থাকায় গতবারের ভুলগুলো সুধরে নিয়ে প্রতিশোধের সুযোগ ছিল। এই ম্যাচেও সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক লোথার। দলকে যোগ্য দিকনির্দেশনা দিয়ে শিরোপা তুলে ধরেছিলেন বিশ্ব শিরোপা। ১-০ ব্যবধানের এই জয় পর পর তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে অংশ নেয়া জার্মানির জন্য কতটা প্রয়োজন ছিল তাই ফুটে উঠেছিল পুরো জার্মান দলের শারীরিক ভাষায়। বীরের বেশেই দেশে ফিরেছিলেন লুথার হারবার্ট ম্যাথিউস।

ছবি: সংগৃহীত

দেরিতে হলেও পরে অবশ্য বলেছিলেন-“মিলানে খেলা ঠিক যেন নিজের হোম গ্রাউন্ডে খেলা।”মিলানে থাকার সময় হাটুর ইঞ্জুরিতে পড়েন সেসময়ের সেরা এই খেলোয়াড়।যার ফলাফল দাড়াল ৯২এর ইউরো মিস।সেবার জার্মানি ফাইনালে গেলেও ফাইনালে ডেনমার্কের কাছে হেরে বসে।ফাইনালে তার অভাব ভালো ভাবেই টের পেয়েছিল জার্মানি।এর পর ’৯৪ বিশ্বকাপে রাজকীয়ভাবেই অধিনায়কত্ব নিয়ে মাঠে নামলেন ম্যাথিউস। তখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নের তকমাটা যে তাদের ওপরই ছিল। কিন্তু এবার অধিনায়ক থাকলেও পরিবর্তন আনলেন নিজের পজিশনে। সুইপারের নতুন পজিশনে খুব একটা সাবলীল ছিলেন না। সে বছর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল দল কিন্তু সে ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন ম্যাথিউস।

৯৪ বিশ্বকাপের পর তার ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার কথা উঠে।কিন্তু তিনি তখনও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিদায় বলেন নি। ৯৬ ইউরোতে তখন জার্মান দলের কোচ বেরটি ভগ্টস।তিনি লোথারের কথা ভূলে অধিনায়কত্ব তুলে দিলেন ক্লিন্সমানের হাতে।ফলে,লোথার ডাক পেলেন না দলে।তার অবর্তমানে যদিও জার্মানী ৯৬এর ইউরোতে জয় লাভ করে।এরপর থেকে তিনি জাতীয় দলে অনিয়মিত হয়ে পড়েন।কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার ভাগ্য ফেরে ৯৮ বিশ্বকাপে।কারণ,বিশ্বকাপের আগেই জার্মান দলের সুইপার ম্যাথিয়াস সামার পড়েন ইঞ্জুরিতে।এতদিনের প্রত্যাবর্তনের পর নিজের জাত চেনাতে ভূল করেন নি লোথার।জুগোস্লাভিয়ার বিপরীতে দ্বিতীয় ম্যাচে নেমেই দলকে ২-২ গোলে ড্র করতে বড় ভূমিকা রাখেন।এর পর থেকে দল বিদায়ের আগ পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচেই অংশ নিয়েছিলেন ’৯৮-এর বিশ্বকাপে। পাঁচ বিশ্বকাপে ২৫টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ম্যাথিউস বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ খেলার রেকর্ডটি নিয়ে গিয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।৯৯ উইয়েফা ছিল শুধুই ম্যাথিউসের। সাইড বেঞ্চে বসেছিলেন ’৮৬ মিনিট পর্যন্ত। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দাপটে ১-০ তে পিছিয়ে বায়ার্ন।কিন্তু কথায় আছে-“ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে” হারতে নারাজ ম্যাথিউস এই অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিবর্তন করে ফেললেন দল ও নিজের ভাগ্য। দুটি গোল করে জয় আর জয়ধ্বনি নিয়েই মাঠ ছেড়েছেন এই নাছোড়বান্দা।ম্যাথিউসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছিল রেকর্ডসংখ্যক ম্যাচের মধ্য দিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে তিনি অংশ নিয়েছেন ১৫০ ম্যাচে।

ছবি: সংগৃহীত

তার ক্যারিয়ারের ১৫০তম ম্যাচটি ছিল পর্তুগালের বিপক্ষে।যদিও সেবার তার দল প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছিলো। পাঁচটি বিশ্বকাপের পাশাপাশি তার ক্যারিয়ারে তিনি অংশ নিয়েছেন চারটি ইউরোতে।দেশের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও তিনি ছিলেন সফলতার অনবদ্য উদাহরণ।ক্লাব ক্যারিয়ারে ৫৯৫ম্যাচ খেলে করেছেন ১৬১গোল।বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে দুইবার বুন্দেসসলিগা এবং একবার ডিএফবি পোকাল জয় করেন।মিউনিখ কাপানোর পর তিনি ১৯৮৮ সালে ইন্টার মিলানে যোগ ৫মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে।ফর্মের তুঙ্গে থাকা লোথার ক্লাবে যোগ দেয়ার পর ক্লাবের হাতে স্কুডেত্তো এবং ইতালিয়ান সুপার কাপ তুলে দেন। উইয়েফা কাপ তুলে দিয়ে ইন্টার মিলানকে ’৯১ সালে পৌঁছে দেন সফলতার শীর্ষে।’৯২ সালে তিনি পড়েন হাটুর ইঞ্জুরিতে।ফলে আবার ফিরে আসেন বায়ার্ন মিউনিখে।ঘরের ছেলে ঘরে এসে যেন প্রাণ ফিরে পায় ক্লাব বায়ার্ন।তার সাথে পায় পায় চারবার বুন্দেসলিগা শিরোপা। দুইবার ডিএফবি পোকাল, আরেকটি উইয়েফা কাপ। এ সময় ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে পৌঁছালেও জয় পাওয়া হয়নি লোথারের।

তারপর ২০০০সালে মিউনিখ ছেড়ে পাড়ি জমান এম এল এস লিগের মেট্রোস্টারস ক্লাবে।তখন তার বয়স ৩৯ বছর।বেকেনবাউয়ার সেরা না লোথার না মুলার?নাকি আবার বালাক?এই নিয়ে চিরকাল সন্দেহ থাকবে হয়ত জার্মানদের মনে।কিন্তু জার্মান ফুটবলকে যে তিনি দু’হাত ভরে দিয়েছেন,তাকে বসিয়েছেন ইউরোপের অন্যতম সেরার সিংহাসনে তা খোদ জার্মান ফুটবল ইতিহাসবেত্তারাও জানেন,এতে কোনোই সন্দেহ নাই।

লোথারের পুরো ক্যারিয়ারের অর্জন ও যেসব ক্লাবের এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন সে দিকে আমরা একবার নজর দিই।

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় দল=জার্মানি U21 দল(৭৯-৮৩)= ১৫ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ২টি।

জার্মানি বি দল(৭৯-৮১)= ৪ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১টি

জার্মানি জাতীয় দল(৮০-২০০০)= জার্মানির রেকর্ড সংখ্যক ১৫০ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ২৩টি

জাতীয় দলের হয়ে অর্জন

বিশ্বকাপ-১টি(৯০),রানার্স আপ-১৯৮২,১৯৮৬
ইউরো কাপ-১টি(১৯৮০)
ইউ এর কাপ-১টি(১৯৯৩)

ক্লাবের হয়ে অর্জন

বরুশিয়া মনশেগ্লাডবার্খ(৭৯-৮৪)
ম্যাচ খেলেছেন ১৬২টি এবং গোল করেছেন ৩৬টি।

অর্জনসমূহ

ইউয়েফা কাপ-রানার্স আপ(৭৯-৮০)
ডিএফবি পোকাল-রানার্স আপ(৮৩-৮৪)

বায়ার্ন মিউনিখ(৮৪-৮৮,৯২-২০০০)

ম্যাচ খেলেছেন মোট৩০২টি এবং গোল করেছেন ৮৫টি।

অর্জনসমূহ

=বুন্দেসলিগা ৭টি(১৯৮৪–৮৫, ১৯৮৫–৮৬, ১৯৮৬–৮৭, ১৯৯৩–৯৪, ১৯৯৬–৯৭, ১৯৯৮–৯৯, ১৯৯৯–২০০০)
=ডিএফবি পোকাল-৩বার(১৯৮৫–৮৬, ১৯৯৭–৯৮, ১৯৯৯–২০০০)
=ডিএফবি সুপারকাপ-১বার-১৯৮৭
=ফুজি কাপ-৪বার(১৯৮৭,১৯৮৮,১৯৯৪,১৯৯৫)
=উইয়েফা কাপ-১বার(১৯৯৫-১৯৯৬)
=ডিএফবি লিগাপোকাল-৩বার (১৯৯৭, ১৯৯৮,১৯৯৯)
=উইয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ-রানার্স আপ-২বার(১৯৮৬–৮৭, ১৯৯৮-৯৯)

ইন্টার মিলান(৮৮-৯২)
ম্যাচ খেলেছেন ১১৫টি এবং গোল করেছেন ৪০টি।

অর্জনসমূহ

=সিরি আ-১টি(১৯৮৮–৮৯)
=ইতালিয়ান সুপারকোপা-১টি(১৯৮৯)
=উইয়েফা কাপ-১টি(১৯৯০–৯১)

মেট্রোস্টারস(২০০০)

ম্যাচ খেলেছেন ১৬টি এবং গোল করেছেন ০ টি।

অর্জন-এম এল এস ইস্টার্ণ ডিভিশন চ্যাম্পিয়নশিপ-১টি(২০০০)

ছবি: সংগৃহীত

ম্যাথিউসের ব্যাক্তিগত অর্জনসমূহ

ক্লাব ও দেশের অর্জনের পাশাপাশি ব্যাক্তিগত অনেক পুরস্কার নিজের ঝুলিতে ভরেছেন এই জার্মান লিজেন্ড।’৯১সালে হয়েছেন ফিফা ফুটবলার অব দা ইয়ার যা জার্মানির কোনো ফুটবলার সেই সম্মাননা অর্জন করতে পারে নি ।৫বার অংশ নিয়েছেন বিশ্বকাপে যা ছেলেদের ফুটবলে কোনো একক খেলোয়াড়ের জন্যে রেকর্ড।জার্মানদের হয়ে খেলেছেন রেকর্ড ১৫০ ম্যাচ।আর বিশ্বকাপে খেলা মোট ২৫ম্যাচের রেকর্ড তো আছেই এবং আশা করা যায় তা অক্ষতই থাকবে।

আসুন দেখে নিই তার ব্যাক্তিগত অর্জনসমূহ

উইয়েফা ইউরো টিম অফ দ্য টুর্নামেন্ট-১৮৮৮
=ফিফা ওয়াল্ড কাপ সিলভার বল-১৯৯০
=ফিফা ওয়াল্ড কাপ অল স্টার টিম-১৯৯০
=ওনজে ডি অর-১৯৯০
=জার্মানি ফুটবলার অফ দি ইয়ার-১৯৯০,১৯৯৯
=গোল অব দি ইয়ার জার্মানি-১৯৯০,১৯৯২
=ওয়াল্ড সকার এওয়ার্ড ফুটবলার অব দি ইয়ার-১৯৯০
=আই এফ এফ এইচ এস ওয়াল্ডস বেস্ট প্লেয়ার-১৯৯০
=ব্রাভো ওট্টো-ব্রোঞ্জ এওয়ার্ড -১৯৯০
=ব্যালন ডি অর-১৯৯০
=ফিফা ওয়াল্ড প্লেয়ার অব দি ইয়ার-১৯৯১
=গোল্ডেন পাইরেট-১৯৯১
=ফিফা বিশ্ব একাদশ-১৯৯৬,১৯৯৭,২০০১
=ফিফা ১০০
=গোল্ডেন ফুট-২০১২

এছাড়াও তিনি জার্মানির মিউনিখ হতে ২০০১ সালে বাভারিয়ান অর্ডার অব মেরিট এওয়ার্ড পান।

লোথারের কোচিং ক্যারিয়ার

কথায় আছে-“একূলে খাইলাম,ওকূলে নাই এখন করি হায় হায়”

সম্ভবত এই কথাটাই সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়েছে লোথারের ক্ষেত্রে।ক্লাব ও দেশের হয়ে মাঠ কাপানো এই লিজেন্ডের কোচিং ক্যারিয়ার মোটেও সুখকর ছিল না।তার খেলোয়াড়ী মনভাবের প্রভাব কোচিং এ বিশাল প্রভাব ফেলেছিল।কোচিং এ তার ফুটবল দর্শন ছিল ভিন।যে কোনো পন্থায় দিনশেষ এ জয়ই ছিল তার চাহিদা।এ ব্যাপারে তিনি বলেন-“ফুটবলে জয়টাই মূখ্য।আপনাকে জয়ের জন্যে সবকিছু করতে হবে।মাঝে মাঝে খারাপ ও কুৎসিত খেলাও খেলতে হবে।আপনি শৈল্পিক ফুটবলে খেলে দিনশেষ এ আপনি শূন্যহাতে বাড়ি ফিরবেন,এমন ফুটবলের পক্ষপাতী আমি নই”।

অবসর নেওয়ার ১বছর পর তিনি পুরোদস্তর কোচার হিসেবে নিজেকে মননিবেশ করেন।তার কোচিং ক্যারিয়ারে মোট ৭টি টিমে তিনি কোচিং করিয়েছেন।।

আসুন দেখে নিই তার কোচিং ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান

রেপিড ওয়েন

তার কোচিং ক্যারিয়ারের এটি ১ম ক্লাব ছিল অস্ট্রিয়ান বুন্দেসলিগার এই ক্লাবে।ক্লাবের হেড কোচের হয়ে দ্বায়িত্ব নেন ৬সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে।তার অধীনে দল মোট ৩২ম্যাচ খেলে জয় পায় ৯টি,ড্র ৯টি আর ১৪টি হার যা জয়ের শতকরা ২৮.১৩%।২০০২সালে ১০ই মে তিনি এ ক্লাব ত্যাগ করেন।

এফকে পার্টিজান

র‍্যাপিড ওয়েন ত্যাগের পর ২২ডিসেম্বর ২০০২সালে ১৮মাসের চুক্তিতে সিজনের মাঝামাঝিতে তিনি দ্বায়িত্ব নেন সার্বিয়ান ক্লাব পার্টিজানের।এই ক্লাবে তার অধীনে দল মোট 43 ম্যাচ খেলে জয় পায় ২৮টি টি,ড্র ৬ টি আর টি হার ৯টি যা জয়ের শতকরা ৬৫.১২%।১৩ডিসেম্বর ২০০৩সালে তিনি এ ক্লাব ত্যাগ করেন।

হাংগেরি জাতীয় দল

পার্টিজান ছাড়ার পর ১৪ডিসেম্বর ২০০৩এ তিনি যোগ দেন হাংগেরি জাতীয় দলের কোচ হিসেবে।
তার অধীনে দল মোট ২৮ম্যাচ খেলে জয় পায় ১১টি,ড্র ৩টি আর ১৪টি হার যা জয়ের শতকরা ৩৯.২৯%।২০০৫ এর ৩১শে ডিসেম্বর তিনি দ্বায়িত্ব ছেড়ে দেন।

এথলেটিকো প্যারানায়েন্স

হাংগেরি জাতীয় দলের পর ১বছরের চুক্তিতে ১১জানুয়ারি ২০০৬ এ ব্রাজিলের ক্লাব প্যারানায়েন্সের হেড কোচ নিযুক্ত হন তিনি।তার অধীনে দল মোট ৭টিম্যাচ খেলে জয় পায় ৫টি,ড্র ২টি আর হার নাই যা জয়ের শতকরা ৭১.৪৩%।মাত্র ২মাসের ১৭মার্চ ২০০৬ সালে তিনি এই ক্লাব ত্যাগ করেন।

রেডবুল সালবার্গ

ক্লাব প্যারানায়েন্সের পর তিনি যোগ দেন অস্ট্রিয়ার আরেক ক্লাব সালবার্গে।কিন্তু ক্লাবকে ট্রফি জিতাতে না পারায় ১২জিন ২০০৭ এ তাকে বরখাস্ত করা হয়।

মাক্কাবি নিতানিয়া

সালবার্গের তিক্ত ঘটনার পর ১৩এপ্রিল ২০০৮ এ তিনি যোগ দেন ইস্রায়েলের এই ক্লাব নিতানিয়ায়।তখন ক্লাব ছিল লিগের ৪র্থ তম স্থানে।তাকে বলা হয়েছিল যদি তিনি ক্লাবের অবস্থান ২য় তে না আনতে পারেন তাহলে তাকে বহিষ্কার করা হবে।কারণ,এতে ফিনানশিয়াল কিছু বিষয় জড়িত আছে।দূরভাগ্যবশত,ক্লাব ৪র্থ হয়ে লিগ শেষ করে।ফলাফল ২৯ এপ্রিল ২০০৯ সালে বিদায় নেন।তার অধীনে দল মোট ৪৫ ম্যাচ খেলে জয় পায় ১৯ টি,ড্র ১৪ টি আর ১২ টি হার যা জয়ের শতকরা৪২.২২%।

বুলগেরিয়া জাতীয় দল

সরাইলীয় ক্লাব নিতানিয়া থেকে চলে আসার পর ২০১০ সালের২৩শে সেপ্টেম্বর তিনি বুলগেরিয়া জাতীয় দলের দ্বায়িত্ব পান।সেখানেও তিনি সফলতার স্বাদ পান নি।তার অধীনে মাত্র ১১ম্যাচ খেলে জয় পান ৩টি তে,ড্র করেন ৩ ম্যাচ আর হার ৫টি যা জয়ের শতকরা ২৭.২৭%।১৯ সেপ্টেম্বন ২০১১ সালে তিনি বুলগেরিয়া জাতীয় দল থেকে তার দ্বায়িত্বের অব্যহতি নেন।

ছবি: সংগৃহীত

লোথারের নিজস্ব জীবন এবং বর্তমান পেশা

বর্তমানে ৫৫বছর বয়সী লোথার ম্যাথিউস ৪সন্তানের বাবা এবং তিনি তার জীবনে মোট ৫বার বিবাহ করেন।
লোথার বর্তমানে বিভিন্ন স্পোর্টস ম্যাগাজিন,স্পোর্টস লাইভ ডিসকাশন সহ ফুটবল সম্পর্কিত আলোচনায় অংশ নেন।
২০০১থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কোচিং এর পাশাপাশি তিনি জার্মানির স্পোর্টস ম্যাগাজিন “স্পোর্টস বিল্ড”এ কলাম লিখতেন।২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে জার্মানির টিভি চ্যানেল “প্রিমিয়ার”এর হয়ে TV Pundit এর কাজ করতেন।এছাড়াও তিনি ২০০৪ এর ইউরোতে,২০১০ এর আল জাজিরার হয়ে ২০১৪ তে ইরানি চ্যানেলে হয়ে এই কাজ তিনি করেছেন।বর্তমানে ২০১৬ উপলক্ষে তিনি ব্রিটিশ টি ভি নেটওয়ার্ক ITVএর সাথে কাজ করছেন।

তাছাড়াও তাকে ইয়াহু স্পোর্টস এর সাথে কাজ করতে দেখা যায়।পরিশেষে,জার্মানির সর্বকালের সেরা ক্যাপ্টেন বেকেনবাউয়ার হলেও তার সেই সুনামে যে লোথার যথেষ্ট ভাগ বসিয়েছে তা আর বলার অন্ত রাখে না।আমার কাছে তিনিই আধুনিক জার্মান ফুটবলের কারিগর,হার না মানা একজন সত্যিকারের লিজেন্ড।আর সেই লিজেন্ডের বিশাল কর্মকান্ড প্রকাশের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা ছিল এটি।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত