| 20 মে 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত কবিতা কবিতা সাহিত্য

নোবেলজয়ী লুইস গ্লুকের কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

মাত্র আঠেরো বছর বয়সে কবিতায় হাত খড়ি। ২৫ বছর বয়সে প্রথম কবিতার বই ‘ফার্স্টবর্ন’। লুইস গ্লুক। তাঁর প্রথম সন্তান, প্রথম কাব্যগ্রন্থই সাড়া ফেলে দিয়েছিল সাহিত্যের জগতে। তারপর আস্তে আস্তে বেড়েছে পরিধি। মেলভিন কানে, পুলিৎজার পুরস্কার জুটেছে আগেই। এবার তাঁর মুকুটে জুড়ল নোবেলের পালক। যে কবিতা তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল মৃত্যুর থেকে, সেই কবিতায় এবার তাঁকে পাইয়ে দিল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান। আমেরিকার সেই আশ্চর্য কবির কিছু কবিতার অনুবাদ রইল, কয়েকজন কবির কলমে…


অনুবাদ: অমিতাভ পাল

লাল পপি

 

মন না থাকলেও হয়,
বড় কথা হলো- অনুভূতি থাকা;
আমার সেগুলি আছে এবং
ওরাই আমাকে চালায়।
স্বর্গে আমার প্রভুর নাম সূর্য,
আমি আমার হৃদয়ের আগুন তাকে দেখাই-
এই আগুনই আমার ভিতরে তার উপস্থিতির কথা বলে।
কিন্তু যদি হৃদয় না থাকে তাহলে?
ভাই বোনেরা- মানুষ হবার বহু আগে
আমাকে কি পছন্দ করেছিলে তোমরা?
তোমরা কি নিজেকে খোলার অনুমতি দিয়েছিলে
এবং তারপর আর কখনো খোলোনি?
এটা এজন্যই বলছি,
কারণ এখন তোমাদের মতোই আমি কথা বলি।
আমি কথা বলি কারণ আমি ছিন্নভিন্ন।

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

 

অনুবাদ: নন্দিনী সেনগুপ্ত

ইচ্ছে
(‘দ্য উইশ’ কবিতা অবলম্বনে লেখা)

মনে আছে তোমার,
সেবারে তুমি ঠিক কি কামনা করেছিলে?

আমি গুচ্ছের জিনিসের জন্য মানত করি,
মনে মনে সংকল্প করি।

সেবারে ঐ প্রজাপতির ব্যাপারে
আমি তোমাকে মিছে কথা বলেছিলাম।
আমি সবসময় আশ্চর্য হয়ে ভাবি যে
তুমি ঠিক কী কারণে মানত করো!

আমি কী চেয়েছি তুমি জানো?
কী ভেবেছ?

নাহ, আসলে আমিও ঠিক জানিনা।
ভাবি ফিরে আসবো।
ভাবি শেষমেষ যেভাবেই হোক,
আমাদের মিলন হবে।

অবশ্য আমি সেটাই চেয়েছিলাম,
যেটার জন্য আমি সবসময় মানত করে থাকি।

আমি আরেকটা কবিতা চেয়েছিলাম।

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

 

অনুবাদ : খোরশেদ আলম

কৃতজ্ঞতা
 
আমার প্রতি তোমার এতটুকু করুণার জন্য
মনে করো না যে আমি কৃতজ্ঞ নই।
আমি খর্বাকৃতির করুণা পছন্দই করি,
বরং বৃহৎ আকারের চেয়েও
এইসব করুণা আমার বেশিই প্রিয়,
যা তোমাকে চোখে চোখে রাখে,
নেকড়ের জ্বলজ্বলে দৃষ্টির মতো,
অপেক্ষায় জাগিয়ে রাখে
দিনের পর দিন
নিঃশেষ হবার আগ পর্যন্ত।
 
 
বিদায়
 
চোখ ভরা জল নিয়ে
বাবা দাঁড়িয়ে আছেন প্ল্যাটফর্মে
জানালার দৃষ্টি গলে তাঁর মুখমণ্ডলে
নিবুনিবু আলো— যেন অতীতের
ভুলে যাওয়া অন্য একজন।
তার ছায়া মুখে মেখে নিয়ে
সহসাই তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন
আর মন দিলেন পাঠে।
 
জীবনের অভ্যস্ত রুটিনে অপেক্ষার
ট্রেন সেখানে ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস ছাড়ে।

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

অনুবাদঃ অনিমিখ পাত্র

 

মা ও শিশু 
আমরা সবাই স্বপ্নদ্রষ্টা, আমরা জানি না আমরা কারা
কোনো মেশিন আমাদের তৈরি করেছিল, এই দুনিয়ার মেশিন, বেঁধে রাখা পরিবার।
নরম চাবুকে ঘষামাজা হয়ে, তারপর দুনিয়ায় ফেরৎ যাওয়া।

আমরা স্বপ্ন দেখি; আমরা মনে রাখি না।

পরিবারের মেশিনঃ অন্ধকার লোমশ ফার, মাতৃদেহের অরণ্য
মায়ের মেশিনঃ মায়ের ভেতরে সাদা শহর।

এবং তার আগেঃ মাটি আর জল।
পাথরের মাঝে মস, পাতা আর ঘাসের টুকরো।

আরও আগেঃ বিরাট অন্ধকারের মধ্যে কোষগুচ্ছ
এবং তারও আগেঃ পর্দাঢাকা পৃথিবী।

এই কারণেই তোমার জন্মঃ আমাকে চুপ করিয়ে দেবার জন্য।
আমার মায়ের আর বাবার কোষ, এখন তোমার পালা
মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠার, মাস্টারপিস হয়ে ওঠার।

আমি সহসা উদ্ভূত, আমি কক্ষনও মনে রাখিনি।
এখন তোমার চালিত হওয়ার পালা;
তুমিই সে যার জানবার দাবি আছে

আমি কেন কষ্ট পাই? আমি কেন কিছু জানি না?
বিরাট অন্ধকারে স্থিত কোষগুচ্ছ। কোনো মেশিন আমাদের তৈরি করেছিল।
এবার তোমার ডাক দেবার পালা, জিজ্ঞেস করার পালা
কীসের জন্য আমি? কীসের জন্য আমি?

 শীতের শেষ
স্থির এই পৃথিবীতে, কালো বৃক্ষশাখার মধ্যে
একা জেগে উঠে ডাকে পাখি।

জন্ম নিতে চেয়েছিলে তুমি, আমি তোমাকে জন্ম নিতে দেব।
তোমার খুশির পথে কখনই বা
আমার শোক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলো?

একইসঙ্গে ডুবে গিয়ে অন্ধকার আর আলোয়
সংবেদনের জন্য উন্মুখ

যেন তুমি নতুন একটা জিনিস, নিজেকে
প্রকাশ করতে চাইছ

সব চমৎকারিত্ব, সব প্রাণবন্ততা

কখনও ভাবোনি
যে তোমাকে কিছু মূল্য চোকাতে হতে পারে,
তুমি কখনও কল্পনা করোনি আমার কন্ঠস্বর
তোমার অংশ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে –

অপর জগতে তুমি তাকে শুনতে পাবে না
আর কক্ষনও পরিষ্কারভাবে পাবে না,
কোনো পাখির ডাকে বা মানুষের কান্নায়।

কোনো পরিষ্কার আওয়াজ নয়, কেবল
সমস্ত শব্দের
নাছোড় প্রতিধ্বনি
যার মানে বিদায়, বিদায় –

এক অবিচ্ছিন্ন রেখা
যা আমাদেরকে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রাখে।

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

 

অনুবাদ: সুজিত মান্না 

 

শিকারি 
অন্ধকার রাত – রাস্তাগুলি ঘিরে ধরে আছে কতকগুলি বিড়াল 
বিড়াল এবং তাদের শিকারসামগ্রী –
বিড়ালগুলি তার পাহাড়ি পূর্বপুরুষের মতই দ্রুত দৌড়োতে পারে
ঠিক তাদের মতই ক্ষুধার্ত।
কোথাও কোনো চাঁদ নেই। রাত্রিটা ঠান্ডা হয়ে আছে– 
এই রাতকে উত্তাপ দেওয়ার জন্য কোনো চাঁদ জেগে নেই। গ্রীষ্ম বেরিয়ে গেছে পথে অনেক দূর
অনেক শিকার-ই বাকি পড়ে আছে
ইঁদুরগুলি বসে আছে শান্ত হয়ে, বিনিদ্র ঠিক বিড়ালগুলির মতো।
এই বাতাসের গন্ধ নাও – এই নিশ্চল রাত এক ভালোবাসার রাত 
ক্ষণে ক্ষণে রাস্তার ভেতর চিৎকার উঠে আসছে
যেখানে বিড়ালগুলি তাদের দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে ইঁদুরগুলির পায়ে
যখনই ইঁদুরগুলি চিৎকার তুলছে, তাদের মৃত্যু হচ্ছে। এই চিৎকার যেন একটি নকশা 
এমন একটি নকশা যেটা বিড়ালগুলিকে বলে দিচ্ছে কোথায় বসাতে হবে থাবা। 
তারপর সেই সব চিৎকার জুড়ে উঠে আসছে মৃত্যু 
এমনই এক রাতের ভেতর তুমি ভালোবাসা পাচ্ছো – এ বড়ো সৌভাগ্যের 
তোমার শরীর বিছানায় বিবস্ত্র হয়ে শুয়ে থাকার মতো উত্তাপ নিয়ে বসে আছে 
ঘামছে – এসব কিছু তো পরিশ্রম, ভালোবাসার ফল, ভুলে যাও মানুষ কী কী বলে ফিসফাস করে
মৃত ইঁদুরগুলি পড়ে আছে রাস্তার ওপর – বিড়ালগুলি তাদের দেহ রেখে গেছে এখানেই 
খুশি হও তোমাকে আজ এই রাস্তার ওপর থাকতে হয়নি
এখনই রাস্তাপরিষ্কারকরা এসে তাদের সরিয়ে দেবে। সূর্য উঠলেই কেউ আর এইসব দেখে হতাশ হবে না 
সূর্য উঠলেই পরবর্তী দিন ও রাতের জন্য আবার সুন্দর হয়ে উঠবে রাস্তাগুলি
শুধু খুশি হও তুমি বিছানায় আছো
যেখানে ভালোবাসার চিৎকারগুলো ডুবিয়ে রাখছে সমস্ত মৃত্যুর শব্দগুলিকে 
 সূর্যাস্ত
সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই একজন খামার-শ্রমিক  মৃত পাতাদের পুড়িয়ে ফেলছে 
এটি এমন কোনো বড়ো ঘটনাই নয়, একটুকু আগুনই তো শুধু
স্বৈরাচারী শাসকের হাতে লালিত একটি পরিবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ছোট একটি জিনিস মাত্র, 
তবুও, যখনই এটা জ্বলে উঠছে, শ্রমিকটি উধাও হয়ে যাচ্ছে
রাস্তার ওপর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সে 
সূর্যের তুলনায় এইসব আগুন নেহাতই ক্ষণজন্মের এবং কোনোদিনই তারা পেশাদার হতে পারবে না –
যোগান শেষ হয়ে এলে তাদের মৃত্যু দাঁড়িয়ে দেখি।
তারপর লোকটি আবার ফিরে আসে – ছাইগুলিকে একজোট করে। 
এইসব কিছুর পরেও মৃত্যুই একমাত্ৰ সত্য।
যেন মনে হয় – সূর্য যে জন্য এসেছিল, সব কাজ শেষ করে ফেলেছে 
জমিতে শস্যদের বাড়তে দিয়েছে – তারপর তাদের পুড়ে যেতে
উদ্বুদ্ধ করে গেছে
তাই সূর্যের এখনই চলে যাওয়ার সময় এসেছে।
 
জ্বলে থাকা পাতা
শুকনো পাতারা দ্রুত আগুনে জ্বলে যায়। 
তারা পুড়ে যায় দ্রুত, ক্ষণিকের মধ্যেই 
কোনো একটি অবস্থা থেকে শূন্যতে এসে থামে 
এখন মধ্যদুপুর। নীল আকাশটা ঠান্ডা হয়ে আছে 
আগুনের নীচে ধূসর হয়ে আছে পৃথিবী
যত দ্রুত এগুলো হারিয়ে যাবে, পৃথিবীর ধোঁয়া ততটাই তাড়াতাড়ি পরিস্কার হয়ে আসবে 
পাতার স্তুপ করা জায়গাটিতে
হঠাৎ এই শূন্যতাটিকেই বিশাল আকারের মনে হবে
রাস্তা বরাবর দাঁড়িয়ে একটি ছেলে এইসব দেখছে
দীর্ঘ সময় ধরে সে এই পাতাদের পুড়ে যাওয়া দেখে চলেছে
হয়তো এভাবেই তুমিও পৃথিবীটাকে মরে যেতে দেখবে–
দেখবে এটা এভাবেই জ্বলে যাচ্ছে
অনুবাদ: ফারহানা আনন্দময়ী

সুখ

দুজন শুয়ে আছে রাত্রির কোলে
সাদা বিছানার চাদরে শুয়ে আছে দুজন মানুষ।
ভোর খুব কাছে,
এইবার ওদের ঘুম ভাঙবে
মাথার কাছে লিলি জাগছে ফুলদানিতে
সূর্যের আলো ওদের পানপাত্রে তৈরি—
এখনই চুমুক দেবে।
পুরুষটি পাশ ফিরল, কোমল স্বরে ডাকল সঙ্গীকে
পর্দাটা দুলে উঠল, গেয়ে উঠল পাখিদল
নারীটি এবার পাশ ফিরল, আর তার সর্বাঙ্গ
তপ্ত হলো সঙ্গীর নিশ্বাসে।
চোখ খুললাম আমি…
সূর্যেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়
আমি তোমার মুখের দিকে তাকালাম,
আয়নায় দেখতে পেলাম আমাকেই।
আমরা স্থির; শুধু সূর্যটা আমাদের
যেতে থাকল পেরিয়ে, আলো ছড়াতে ছড়াতে।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
অনুবাদ: অহ নওরোজ
অল হ্যালোজ
 
এমনকি এখন দৃশ্যগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে
অন্ধকার হয়ে আসছে পাহাড়,
ষাঁড়গুলো তাদের নীল জোয়ালে নুয়ে পড়ছে।
মাঠগুলো যেন গুছিয়ে রাখা।
নতুন চাঁদ উঠছে বলে
চারপাশে ফুটেছে হলুদ সিঙ্কফয়েল—
তার ভেতর পথের সীমানায়
গাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভেড়াগুলো।
 
 
ফসলের বিরানকাল আসে এভাবে,
যেনবা মড়ক লেগেছে।
মহিলারা জানালায় ঝুঁকে এসে বাড়াচ্ছে হাত
কিছু পাওয়ার আশায়—
আর শস্য ও মুদ্রাগুলো ডাকছে তাদের
এদিকে এসো, এদিকে এসো
 
গাছ থেকে আত্মা বেরিয়ে আসে শিরশির করে।
ডিসেম্বরের শুরুতে ক্রোটন-অন-হাডসনে*
 
ম্লান রোদে হাডসনের
বরফ জমে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।
হাড়ের ভেতর শুনছি ঠনঠন শব্দ­­—
মাত্রই ঝরে যাওয়া ধূসর বরফগুলো
নদীর পশম হয়ে গেছে­­, স্থির।
গত বছর যেদিন গাড়ির চাকা অচল হয়েছিলো­
আজ ঠিক সেদিনই ছুটছি আমরা
ক্রিসমাসের উপহার বিলাতে।
প্রবল ঝড়ে তারের উপর
ভেঙে পড়েছে পাইনের ডালপালা…
 
আমি তোমাকে চাই।
 
*ক্রোটন-অন-হাডসন একটি স্থানের নাম।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত