ক্যাপসোল

কাদাখোঁচা পাখির মতো তার এক রত্তি শরীর থেকে নাকি ভক্ ভক্ করে পল্টির মুরগির গন্ধ বেরয়। সেই দূর্গগন্ধে ছোট ভাই-বোনের ঘুম আসে না। এই অভিযোগ সত্য মেনে মা তার বিছানাটা সত্যি সত্যিই আলাদা করে দিলো। তার ছোট ভাই-বোন সারাদিন আগারে-পাগারে প্লাস্টিক কুড়ায়। ওদের শরীরেও বমির মতো টক টক একটা গন্ধ আছে। বিছানায় গেলেই সেই বাজে গন্ধে তার উটকানি উটকানি লাগে। তবু কোনোদিন সে এই বিষয়ে টু শব্দটা করেনি। পল্টির দোকানের মালিক যদি তাকে বেতন বাবদ আর দুই হাজার টাকা বেশি দিত তাইলে সে তার ভাই-বোনকে প্লস্টি কুড়াতে না দিয়ে ইস্কুলে পাঠাত ; এই কথা ভাবতে ভাবতে কত রাত সে দেরিতে ঘুমিয়েছে। 

সেই সকাল থেকে রাত আটটা-নটা নাগাদ সে বিশেষ একটা কৌশলে ছুরি চালিয়ে একা একা শখানেক মুরগি জব করে। তাবাদে চিরিঙ্গি দিয়ে ছুটে আসা রক্ত সমেত মরণদাফাদাফি করা জীবটাকে সে ছুড়ে ফেলে প্লাসিটকের ড্রামে। কেউ কেউ ছিলানো বাবদ পাঁচ-দশ টাকা মালিকে বেশি দিলে, তাকে মুরগীর খাল-চামড়া ফড় ফড় করে টেনে তুলতে হয়, চাকুর একটানে বুক ফেড়ে গিলি-কলিজা এবং আঁত-নাড়িও ফেলে দিয়ে পলিথিনে ভরে খরিদ্দারের হাতে তুলে দিতে হয় গরম গরম গোস্তের দলাটাকে। ছুরির এক খোঁচায় শহীদ হয়ে যাওয়া জীবটা যখন ডাকনা চাপা ড্রামের ভিতর দাফাদাফি করে তখন সে রাস্তাটার দিকে অবশ চোখে তাকিয়ে থাকে। ইচ্ছা করে এক দৌড়ে বাইরের খোলা দুনিয়াটার দিকে ছুটে যায়। মাঝে মাঝে মন চায় ফাহিমের কাছে চলে যেতে। ফাহিম সব সময় পাইসে থাকে। পেন্টের এক পকেটে ডার্বি সিগারেট-ম্যাচ, অন্্য পকেটে টাচ্ মোবাইল। সেটা সে গাজীপুর থেকে চুরি করে নিয়ে এসেছে। এখানে তার বাবা একটা মিশুক চালায়। মা সকাল-বিকাল বাজারের গলিতে পিঠা বেচে। ফাহিমের কাজ হলো মা-বাপের টাকা চুরি করা আর মাঝে মাঝে বাপের হাতের কুত্তাপিটনি খাওয়া। তাবাদে যখন দুপুর হয়। ঠিক দুপুর। খাঁ খাঁ রোদে কাস্টমারহীন নিস্তেজ বাজারটার মতো তখন তারও ঝিমানি আসে। সে-ও ছোট্ট টুলটায় এক ঠ্যাঁং বাঁকা করে বসে খাঁচার মুরগিগুলার মতো অলস ঝিমায় আর বার বার মনে পড়ে, তার বাপ নাই। তার ছোট মাথাটার ওপর সংসার নামক চল্লিশ মন ওজনের একটা বোঝা। আর এই ভাবেই সে মাঝে মাঝে একজন প্রবীণ মানুষের মতো কিছু কিছু কথা ভাবে ; সহ্যগুনটাও দিনে দিনে বড় হয়। হয়ত এই ভাবেই সে ভাই-বোনদের থেকে আলাদা বিছানায় একা শুয়ে শুয়ে নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতাকে মনে-পরানে যাপন করে।

কখনো তিরুটি-বিরুটি হলে মালিক খেঁকিয়ে ওঠে। বাপ তুলে গালি দেয়। সবাই জানে তার বাপ ল্যাংড়া আইনউদ্দির বউকে নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে গেছে। সেখানে নাকি রিক্সা চালায়। এখন মাঝে-মধ্যে তারও পালাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পালানোর সাহস নাই। হয়ত তাই ফাহিমকে তার ভালোলাগে। কিছুদিন পরে পরে ফাহিম পালিয়ে যায়। কৈ যায় এই কথা সে কাওকে বলে না। পালিয়ে যাওয়ার পর কেউ তার তালাশে কোথাও ছুটা-ছুটি করে না। কান্দে না। তারপর দুই-তিন মাস বাদে আবার নিজে নিজেই ফিরে আসে। এইবার ফিরে আসার সময় দামি একটা টাচ্ মোবাইল নিয়ে এসেছে। তার মনে হয় জিনিসটার ভিতরে আস্তা এই দুনিয়াটাই ভরে দিয়েছে।

মুগরিবের আযান হলে মাথার উপরের জাম গাছটায় কয়েকটা পাখি এসে বসে। কিছুক্ষণ ট্যা-টু করে নিজেদের গুপ্তি ভাষায় খুব আলাপ করে। কয়েক মাস আগেও হাইঞ্জারাতে তারা তিন ভাই-বোন যেমন করে এক বিছানায় বসে আলাপ করতো। হাসতো। তারপর হঠাৎ উঠে তিনজনই দৌড় দিতো, আজ মা কি রান্না করছে দেখতে। ঠিক তেমনি কবকব করতে থাকা পাখিগুলাও প্রতিদিন এক সময় কুটুত করে নিরুদ্দেশে উড়াল দেয়।

তার সবচে বড় কষ্ট হলো, তার মা-ও তাকে নিয়ে ভয়ে আছে ; সেও যদি তার বাপের মতো পালায় ! 

একটা হোন্ডার শব্দে তার ঝিমুনি কেটে যায়। লোকটা হোন্ডার সীটে বসেই তিন কেজি মুরগি দিতে বলে। লোকটা ইয়াবা কারবারি। আগে সন্ধ্যার পর ছয়শ টাকা ঘন্টা হিসাবে অন্যের হোন্ডা ভাড়া করে ইয়াবাখোরদের আড্ডায় আড্ডায় চালান পৌঁছে দিত । এখন নিজেই হোন্ডা কিনেছে। পেটটাও সামনের দিকে অনেকটা এগিয়ে গেছে মোটা আয়-রুজগারের বরকতে। লোকটার নাম হাদি। মানুষে ডাকে হাইদ্দ্যাচুরা। ছেলেটা খাঁচায় হাত ঢুকিয়ে মুরগিটা ধরতে ধরতে লোকটাকে আরেকবার দেখে। সে মাঝে মাঝে মালিকের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে দেখেছে ক্রসফায়ারে নিহত মাদক কারবারিদের লাশ। এইডারে কেলিগ্গ্যা ক্রসফায়ারে দেয় না ?

এক হাতে বিশেষ কৌশলে ধরা মুরগি আরেক হাতের ছুরির দিকে তাকিয়ে সে ওপরের কথাগুলা ভাবতে ভাবতে শিহরিত হয়। তাবাদে সে নিজেই যেন হাকিমের আসনে বসে, রায়টা লিখে ফেলে বিরবির করে নিজেকে শুনায়, হাইদ্দ্যা তরে আমি করসফায়ারে দিলাম। বলেই সে ছুরিটা দিয়ে মুরগির গলায় আড়াই পোজ দেয়।

মা বড় বিছানাটার পাশে তার জন্য রোজ রাতে আলাদা একটা বিছানা করে রাখে। সিথানে পাতা থাকে খুব কুচি কুচি করে কাটা খড় দিয়ে বানানো ছোট্ট একটা বালিশ। রাত নটা-দশটার দিকে বাজার থেকে এসে ঘরে ঢুকতেই সবার আগে তার নজর চলে যায় নিঃসঙ্গ বিছানাটার দিকে। তখন ছেলেটা আরেকবার বুঝতে, এই সংসারে সে খুব একা।

মা অবশ্য তাকে খুব কদর করে। সেই আদর-যত্নে মায়ের মমতারচে এখন তোয়াজটাই বেশি থাকে। এই জটিল অনুভবে তার মন আরো বেশি ভার হয়ে এলে, মাকে যেন কিছুটা তটস্থ দেখায়। সে নীরবে হাত-মুখ ধোয়, ভাত খায়। তারপর একটি কথাও না বলে তালি দেওয়া, নোংরা মশারিটার ভেতর সেঁধিয়ে পড়ে। তখন সে মায়ের গলা শুনতে পায়। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা ভয় পাওয়া একজন মানুষের গলা ; মালিকে তোমারে কিছু কৈছে বাজান ? মারছে…?

না।

তার ইচ্ছা করে হ বলতে। হ বললে পল্টির দোকানের মালিককে মা কি করবে ? মাসে তিন হাজার টাকা বেতন পায় বলে যে মা তার ছেলেকে গোপনে গোপনে ভয় পায়, খোশামুদ করে খুশি রাখার জন্য, এই জগতে সে আর কাকে কি করতে পাড়ে ?

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত