| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

বিষ নীল আতর

আনুমানিক পঠনকাল: 18 মিনিট

সকালে এমন আচরণ না করলেই পারত। নির্বিকার তো একরকম রূঢ় রুক্ষ। বেচারা মনে আঘাত পেয়ে থাকবে। অথচ কত আগে থেকে কল্পনা করেছিল, দৃঢ় শপথ; অঞ্জলিকে কোনোদিন বকবে না। অভিমান করে বসে এমন কথা মুখে আনবে না। সে যে তার সহধর্মিণী। কিন্তু কোত্থেকে যে কি হয়ে যায়! আজকাল আকস্মিক মাথা গরম হয়ে ওঠে। কোনোকিছু সুন্দর স্বাভাবিক নেই। অকারণ অদ্ভুত অস্থিরতা। এসবের মধ্যে শ্বশুরবাড়ির কারও কথা অসহ্য। কষ্টের কারণ। পেছনের কথা ভাবতে চায় না। তবু মনে পড়ে যায়। অতীতের দিনকালে হেঁটে বেড়ানো মানুষ স্বস্তিতে থাকে না। সেও শান্তিতে নেই। নিজের প্রতি অসম্ভব করুণা। এপ্রিলের তাপদগ্ধ শুকনো দিনে দৃষ্টি ভিজে আসতে চায়। পৃথিবীতে এত সুখী মানুষের বসবাস। সকলে কত কাজে ব্যস্ত। মূল্যবান রিসোর্স। সে জঞ্জাল। সমাজে কোনো দাম নেই। মূল্যহীন। অপাঙ্‌ক্তেয়। অযোগ্য। শহরের এককোণে মানুষের পায়ের তলায় বসে থাকে। দুটো টাকার জন্য। সে কেন নিজেকে তেমনভাবে চালাতে পারে না? এসব ভাবনার মধ্যে কখনো নিজেকে শাসন। এ ছাড়া উপায় কি? অনন্যোপায়। ‘শিহাব তোমাকে পেছনে তাকানো চলবে না। হেরে যাবে। পরাজিত মানুষ…কত আর মার খাবে?’ অবশেষে রাস্তার মানুষজন, ভিড়, গাছগাছালি দেখতে দেখতে সময়ে ফেরার চেষ্টা।

প্রচণ্ড রোদ। গুমট উত্তাপ। সময় স্থির-নিশ্চল-স্থবির। দৃষ্টি টলমল। কখনো কখনো অনেককিছু ভুলে যায়। স্মৃতি সঙ্গে চলে না। একটি-দুটি বিষয় শত ঘুরপাক খেয়ে চলে। লাট্টু চক্কর। অন্যকিছু মনে থাকে না। উত্তরের রাস্তায় ভাবলেশহীন যেতে যেতে সেই কথা ধাক্কা মারে। সে কি ফিরে যাবে? নড়বড়ে সাইকেল ঠিকমতো চলে না। ফ্রি-হুইল মাঝে মধ্যে ড্রপ করে। সামনের চাকায় পর্যাপ্ত হাওয়া নেই। বুক উঁচু টায়ার, ভেতরে গ্যাটিস; ঘূর্ণন মেপে মেপে উথাল-পাতাল ধাক্কা ঢেউ। মেকানিকের কাছে যাওয়া দরকার। কিন্তু টাকা নেই। টাকা নেই তো বুদ্ধি নেই। অতএব এভাবেই চলুক। চলতে হবে। তার ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। তবে অবিমিশ্র কৌতূহল মাথায় বেজে চলে। কখনো ঠেসে ঠেসে অদ্ভুত নির্মোহ তাগাদা। কী করবে সে? যাবে, নাকি যাবে না; প্রশ্নদোলায় রাস্তার বাঁ-ধারে নিমগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ে। একটু জিরিয়ে নেয়। সুসি’র ভেবে নেয়া দরকার। অঞ্জলি কয়েকদিন ধরে বলে। কোনো ব্যাকুলতা নেই। জোর নেই। কোনো চাপ নেই। স্বাভাবিক কণ্ঠ। শিহাব কখনো যেমন অবাক-বিস্মিত হতবিহ্বল…স্থির তাকিয়ে থাকে। কীভাবে এত নিরাসক্ত থাকতে পারে?

‘আজ বাবা আসতে চেয়েছেন। সকাল-সকাল ফিরে এসো।’

‘আমি আগে এসে কী করব?’

‘বা রে তুমি নিজে কথা বলবে না?’

‘আচ্ছা দেখি।’

‘দেখি নয়। তুমি আসবে। তোমাকে কথা বলতে হবে। আমি কী বুঝি? কোনো আলাপ করতে পারব?’

অঞ্জলি কথা বাড়ায় না। সেও। সামনের মুখছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। ভাষাহীন। অনেক কথা সেখানে। অথবা কোনো কথা নেই। সে আগের মতো অদ্ভুত উন্মন হয়ে পড়ে। অনেকদিন পর। এমনভাবে শেষ কবে তাকিয়েছিল? মনে নেই। অঞ্জলি ইদানীং বেশ গম্ভীর। দু-চোখের কোনায় বিষণ্ন মেঘ-বিকেল। প্রাণখোলা হাসি নেই। দুষ্টুমি নেই। তাকে শতবার ক্ষেপিয়ে তোলার কোনো উন্মাতাল নেশা নেই। সেই দৃষ্টি যেখানে নদীর মতো খুশি ঝিলমিল করত, কোনোকিছু নেই; পানসে মরা মাছ। নিরুত্তাপ…নির্বিকার। কেমন করে বদলে গেল? সেও কি বদলে গেছে? সব দুর্বোধ্য। রহস্যময়।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় আট বছর। দীর্ঘ এই সময় তবু মনে হয় গতকাল। কেন এমন হয়? সে নিঃসঙ্গ-একলা মানুষ। মুখচোরা লাজুক। বন্ধু-বান্ধব নেই। এই পৃথিবী আর পরিচিত মানুষজনের আয়তন সীমারেখা অনেক ছোট। আশপাশের অনেককিছু অচেনা। অদেখা। এ তার দোষ। হীনম্মন্যতা। নিজের প্রতি ভরসা নেই। যখন অঞ্জলি জীবনের আঙিনায় এসে দাঁড়ায়, ভেবেছিল এবার সামাজিক হবে। ঘরকুনো জীবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে যাবে। মানব-সভ্যতার ইতিহাসে কেউ তো একলা বেঁচে থাকতে পারে না। সে-সময় নিজেকে অন্তত সুখী-মানুষ ভেবে নেয়। দুঃসাহস আসে। অবশ্য সুখের সংজ্ঞা জানা নেই। বুকের মধ্যে শূন্য-অতৃপ্তি-হাহাকার। তারপর নতুনভাবে একে একে পরিচিতির ডালপালা ছড়াতে শুরু করে। আনমনে অজান্তে মিলিয়ে যেতে থাকে একাকীত্ব। একলা জীবনপাঠের অভ্যেস। সূর্যের আলোয় দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় বাহিরের পৃথিবীতে। এই তো জীবন! এই বেঁচে থাকা।

সেদিন বসন্ত বেলাশেষে আকস্মিক টুপটাপ প্রথম বৃষ্টি। পলেস্তরা খসা ভাঙাচোরা ঘরের আলোছায়ায় দু-জন মুখোমুখি। ধুলোঝড় শেষ। গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকা ম্লান অন্ধকার ধুয়ে গেছে। বৃষ্টিস্নাত সন্ধে বুকে অদ্ভুত আলোর সুখ ঢেউ তুলে যায়। সে আর একলা নয়। তার সঙ্গী আছে। জীবন পথের সহযাত্রী।

‘অঞ্জলি, আমি তো গরিব মানুষ। তোমার কষ্ট হবে। সইতে পারবে?’

‘না।’

’তা হলে কী করি। কীভাবে সুখী করি তোমায়? বড় ভুল হয়ে গেল।’

‘আমারও। আগে জানলে তোমায় বিয়ে করতাম না।’

অঞ্জলির ঠোঁটে লাজুক হাসি। সেখানে কি কোনো কৌতুক দুষ্টুমি খেলা করে? শিহাব বুঝতে পারে না। সে আলগোছে দু-হাতে মুখছবি তুলে নেয়। সত্যি অপূর্ব সুন্দর! এত আলো কোন্‌ যত্নে রাখবে সে? সুখের প্রচ্ছন্ন ঢেউ-দোলা বুকে খেলা করে।

‘তুমি আমার।’

‘উঁ!’

‘বলছি…তোমাকে খুব ভালবাসব। তুমি আমার।’

‘আমিও।’

সেই তো জীবনের শুরু। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আকাশ জুড়ে অন্ধকার। বিদ্যুৎ দপ করে চলে গেল। অঞ্জলি তার বুকে পাখির মতো লুকিয়ে পড়ে। এভাবে জড়িয়ে ধরে তার জীবন। সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার অভিযাত্রা। আকাশে মেঘ-বিদ্যুতের খেলা।

সাধ যত অবারিত সীমাহীন, সাধ্য কোণঠাসা। শীতের কোনো এক সকালে বাবা চলে গেলেন। শিহাবের তখন ইন্টার পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। চোখে অনেক স্বপ্ন। পাঁচ বছর আগে মা চলে যাওয়ার বেদনাবিধুর সন্ধেরাত সময়ের গতিপথে ফিকে হয়ে গেছে। কখনো উদাস দৃষ্টি দিগন্তে মেলে দিয়ে একাকী সান্ত্বনা খোঁজে। কখনো ভেবে নেয়, ভালোই হয়েছে। তীব্র পিত্তশূল, ফুসফুসে পানি আর উচ্চ-রক্তচাপের চেয়ে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের কষ্ট থেকে রেহাই। মাকে বাঁচানো যেত। কিন্তু টাকা কোথায়? বাবা অনেক চেষ্টা করে পারেননি। সে মানুষও ডায়াবেটিসে ক্লান্ত-জীর্ণ। পর্যুদস্ত।। রাইস-মিলে কাজ করেন। ভোরে ঘুম ছেড়ে রাস্তায় নামেন। ফেরেন রাতে। মিলের সবকিছুর হিসাব রাখেন। ভারী ভারী বস্তা টানেন। নিজ জীবনের হিসাবনিকাশ রাখতে পারেননি। সেই জীবনের বোঝাও টানতে পারলেন না।

মা চলে যাওয়ার চার মাস পেরোয়নি, তখন সেভেন-এইটের ছাত্র; বাবা এক সন্ধেয় কোত্থেকে কার বুদ্ধিতে নতুন মা এনে হাজির। পাড়াপড়শি অবাক। কৌতুক দৃষ্টি। দু-চারজন কাছে-দূরের মানুষ, বরাবর কৌতূহলী; আঙিনায় এসে দাঁড়াল।

‘এই বয়সে বিয়া করলেন সাবের সাহেব?’

বাবা হাসেন। বোকার হাসি। বিব্রত চোখ-মুখ। উপায় নেই। বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে। দু-জন মানুষ। কে রেধে দেয়? কখনো না খেয়ে থাকতে হয়। ঘরে স্ত্রী-মানুষ না থাকলে চলে? সবকিছু দেখেশুনে রাখতে হবে না? এমন সেবা-শুশ্রূষারও দরকার…গৃহিণী ছাড়া চলে না। মানুষ হাসে। হাসুক। বাবা নির্বিকার। তার মোক্ষম যুক্তি। সকালে নতুন মা আঙিনার আলোয় দাঁড়ায়। তখন মনে হয় ঠিক মানাচ্ছে না। বাবাকে বুড়ো বুড়ো লাগে। তারপর সব বুঝে নেয়া-বুঝিয়ে দেয়ার পালা। পরিচয় আর দায়িত্ব। শিহাব অনেককিছু ভাবে। ভালোই হয়েছে। এবার এলোমেলো দিনকালে শৃঙ্খলা আসবে। এলো। বছর ঘুরতে না ঘুরতে বাড়িতে নতুন অতিথি। শিহাব খুব আদরে কোলে তুলে নেয়। ছোট ছোট হাত-পা-আঙুল। কখনো অর্ধ-নিমীলিত কখনো পূর্ণ দৃষ্টি। চেনা-অচেনা মানুষ আর পৃথিবী দেখে নেয়ার চিনে নেয়ার হাসি হাসি স্বপ্ন আকর্ষণ। সামিনা। শিহাবের বুকে নতুন আকাশের ফুরফুরে বাতাস। তার বোন।

তিন-সাড়ে তিন বছর পর চলে গেলেন বাবা। শিহাব ডিগ্রি ভালো করতে পারেনি। আবার প্রস্তুতি চলছে। অনেক অস্থির-চঞ্চল সময়। এসবের মধ্যে বিকেল থেকে সন্ধেরাত দুটো টিউশনি। মাস গেলে ষাট যোগ পঞ্চাশ, মোট একশ দশ টাকা। হাত খরচ চলে যায়। চলে না। বাড়িতে ফিরে বোনকে কোলে নেয়। আদর করে। সামলায়। তবু নতুন মায়ের চোখে নীলদৃষ্টি। শিহাব সব বোঝে। আমগাছের ছাল তেতুল গাছে লাগে না। বোঝার ভান করতে হয়। এই তো মানুষের জীবন। কী করবে সে? সাদা মনের সহজ সরল বোকা।

সেদিন আঙিনায় ছোটখাটো ভিড়। আত্মীয়পরিজন-পাড়াপড়শি। বিকেলে বাবাকে মাটি দেয়া হয়েছে। মায়ের কবরের পাশে। একজন মানুষ চলে গেলে পৃথিবীর কোনো যায় আসে না, মানুষেরও; যতটুকু শোক-সন্তাপ শূন্য খাঁ-খাঁ সবটুকু আপনদের বুকে বেজে যায়। নানা দু-চারদিন পর পুনরায় এলেন। নতুন মা চলে যাবে। এখানে থেকে লাভ কি? কে আছে আর? দুটো ঘর-আঙিনা বসতভিটা সে তো শিহাবের মায়ের নামে দলিল-দস্তাবেজ। অতএব সামিনা থাকবে না। নানাবাড়ি থেকে বড় হবে। পড়াশুনা করবে। মানুষ হবে। শিহাব সকল কথা শোনে। প্রস্তুতি দেখে। তখনো প্রিয় মানুষ বিচ্ছেদের ঝাপসা দৃষ্টি শুকোয়নি। এবার সত্যি সত্যি শুকিয়ে যায়। কোনোমতো বলে বসে, –

‘মা আমি কোথাও কাজ নেব। বাবার মিলে যোগাযোগ করি। মালিক অবশ্যই একটা চাকরি দেবে।’

‘না শিহাব। এত বড় ঝুঁকি নিতে চাই না। তুমি কি করবে করো। এদের নিয়ে যাই।’

চৌকিতে আয়েশে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে জবাব দেন নানা। শিহাবের একবার ইচ্ছে হয়, জিজ্ঞেস করে; সে কি করে একা থাকবে? সে কোথায় কার কাছে দাঁড়াবে? কিন্তু তখন সব ইচ্ছে মরে গেছে। পৃথিবীতে সে আসলে একা। এরচেয়ে অন্য কোনো সত্য নেই।

পরদিন সকালে নতুন মা চলে গেল। সবাই যায়। শিহাব কিছু বলতে পারল না। কোনো নির্দেশ-উপদেশ পেল না। বাড়ির মধ্যে সে একা। সে-সময় ওই একাকীত্ব…শূন্যতা বড় ভৌতিক মনে হয়। ভয় লাগে। কোনো অবলম্বন যেমন নেই, জীবন আর অস্তিত্বের সকল রুটিন বির্পযস্ত। একদিন বাসে উঠে বসে। গোপালগঞ্জ। বাবার কাজের ঠিকানা। সানফ্লাওয়ার অটো রাইস মিল। অনেক আঘাত সয়েছে। প্রিয় মানুষেরা কাঁদিয়ে-ভাসিয়ে চলে গেল। এমন ধাক্কা খায়নি। বাবার জমানো সব টাকা নতুন মা আর তার বাবা তুলে নিয়ে গেছে। কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সচিব স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। করার কিছু নেই। কাজের সুযোগ হলে জানানো হবে। শিহাব কী করে? ফিরে এলো শূন্য হাতে। হতাশ মন। ভেবেছিল পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকায় কোনো ব্যবসা করবে। খেয়ে না খেয়ে থাকার অবসান হতে পারে। কিছু হয় না। মাঝখান থেকে যাওয়া-আসা খরচে চলে গেল টিউশনির বেতন থেকে একশ টাকা। জীবন চলে কঠিন বাস্তবতায়।আরও কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। কাজ নেয় এক দোকানে। সেলসম্যান আর হিসাবপত্তর রাখা। এরমধ্যে একদিন শোনে নতুন মা তাদের পাশের গ্রামে আবার বিয়েতে বসেছে। শিহাব ভালো হয়েছে ভেবে নেয়। কখনো সামিনার জন্য মন উন্মন হয়।কেমন আছে বোন তার? কোনোদিন অভিমান জেঁকে বসা মনের কোনে গুনগুন ধ্বনি। নতুন মা তার কথা একবারও ভাবল না? কেমনভাবে বেঁচে আছে সে? কেমন কেটে যায় দিনকাল? তারা সকলে ভালো থাক। এই কামনায় ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সকল আবেগ বন্ধন। পৃথিবী বড় স্বার্থপর। কেউ আপন হয় না।

সেই শুরু। মানুষের প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সন্দেহদোলা। একলা জীবনের একা একা বেঁচে থাকা। টিকে থাকার লড়াই। জগৎ সংসারে যার কোনো দাম নেই, অপাঙ্‌ক্তেয় অনাবশ্যক; তাকে একা বাঁচতে হয়। দোকানের কাজে বিকেলে ছুটি। একটি টিউশনি জুটিয়ে নেয়। সততার মধ্য দিয়ে জীবন সংগ্রাম। প্রফেসর দীপঙ্কর বোধকরি এজন্যে তাকে একটু স্নেহ করেন। কলেজের শিক্ষক। বাংলা পড়ান। একটি ফ্লাড প্রেসের মালিক। শিহাব তখন দু-তিনশ টাকার জন্য এর-ওর কাছে ধরনা দিচ্ছে। বাবা অসুস্থ। বিছানায় শুয়ে কাতরায়। তাকে বিরক্ত করতে চায় না। এদিকে ইন্টার ফরম ফিল-আপের শেষ দিন-তারিখ যায় যায়। অস্থির দুর্ভাবনায় চোখ-মুখ ক্লান্ত। সেই হতাশার অন্ধকার গহ্বর থেকে উদ্ধার করেন প্রফেসর। তাকে ডেকে বলেন, –

‘ফরম ফিল-আপের দিন তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। তোমার নাম দেখছি না। পরীক্ষা দেবে না? না না পরীক্ষা দাও।’

‘দেব স্যার…হয়তো ফাইন ডেটে দিতে হবে; সব টাকা জোগাড় হয়নি।’

‘তুমি কাগজপত্র আমার হাতে দাও। আমি দেখছি।’

‘না স্যার আপনার কাছে এমনি ঋণী। তারপর আবার…।’

‘ওসব বিত্তহীন সেন্টিমেন্ট দেখিও না শিহাব। তুমি মেধাবি ছাত্র…ঋণের কথা বলো না।’

‘জি স্যার।’

শিহাবের বুক থেকে ভার নেমে যায়। এসে দখল করে কৃতজ্ঞতার ঋণ। এই বোঝা নামানো যায় না। তাই একদিন প্রফেসরের অনুরোধে প্রেসে লেগে গেল। নিয়মিত পড়াশোনা বন্ধ। প্রাইভেটের প্রস্তুতি চলে। প্রেসে প্রুফরিডারের কাজ। এখন একটি দৈনিক বেরোয়। তার কাজ দায়িত্ব অনেক।

স্বল্প আয়। মোটামুটি স্বস্তির দিনকাল। তখন অঞ্জলির সঙ্গে পরিচয়। সিনেমেটিক প্রেম ভালবাসা? কে জানে। তবে একাকীত্বের দুর্বোধ্য অন্ধকার থেকে উদ্ধার বা মুক্তির জন্য এরচেয়ে ভালো বন্ধু নেই। আসলে মন কাছে পেতে চাইছিল খুব। তাই দু-জনের ঘরদোর বসে গেল। এক-দেড় বছর উচ্ছলতার নীল সাগরে অবগাহন। তারপর কোত্থেকে ভেসে এলো অস্বস্তির ঢেউ। অভাবের তাড়না। ছোট ছোট সাধ-আহলাদগুলো গলা টিপে মারতে শুরু করে। জীবন অল্প টাকায় চলে না। শিহাব সন্ধেয় কয়েকটি টিউশনি নেয়। দু-দিক সামলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠা মন উলটো খিটখিটে। কখনো সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দূর অজানায় চলে যেতে ইচ্ছে জাগে। পারে না। পারার কথা নয়। মায়াময় পিছুটানের শক্ত গিঁট। অঞ্জলি দু-বছরের গ্যাপ রেখে কোলে তুলে দিয়েছে দুই মেয়ে। যখন মিনি এল, সে পিতা; অদ্ভুত অহংকার আবেশ উদ্বেল মন। কি করে আর না করে। পরেরবার অনেক আশা, একটি ছেলে; পুর্ণ হয়নি। কয়েকদিন মন বিমর্ষ। এ সত্য অস্বীকার করার মতো বেহায়া তো নয়। তারপর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল না পাওয়ার অর্থ-সকল অভিমান। ছোট ছোট দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে অপরিসীম স্বর্গসুখ। মেয়েরা তার দুটো চোখ। চোখ না থাকলে পৃথিবী অন্ধকার।

শিহাব রোদ বাঁচিয়ে নিমগাছের ছায়া থেকে ছায়ায় সরে আসে। বেঁচে থাকা জীবন বড় মায়াময়। মধ্য-দুপুর। প্রতিদিন এ-সময়ে বাড়ি ফেরে। পেরিয়ে গেছে অতিরিক্ত দেড়-দুই ঘণ্টা। আজ আগে ফেরা দরকার। শ্বশুর আসবেন। কোনোকিছুর আয়োজনে কোনো টাকা পয়সা দিয়ে আসেনি। অঞ্জলি কি অপেক্ষায় আছে? শিহাব বুঝতে পারে না। সে কেন এভাবে নিজেকে তাড়িয়ে বেড়ায়? জানে না। প্রতিনিয়ত অস্থিরতার বিছুটি দংশন। নিজের প্রতি অবিশ্বাস। বদ্ধ নীল নিশ্বাস ফুসফুসে জমা হয়। কখনো দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। সে কি তবে জীবন থেকে পলাতক? নিজেকে বুঝতে পারে না। সব কেমন অদ্ভুত দুর্বোধ্য।

রোদ-ক্লান্ত পাখি হাঁপিয়ে ওঠে। বাতাসে মেলে দেয়া দু-ডানা ভারী শ্লথ। ভেসে ভেসে উড়তে পারে না। ইচ্ছে করে ফিরে যায়। যেতে পারে না। সাইকেলের বাঁ-প্যাডেলে ডান-পা তুলে দিয়ে প্রকৃতি নিমগ্ন কোনো চাতক। কোনোকিছুতেই কোনো আগ্রহ বা ধ্যান নেই। নিরাসক্ত উন্নাসিক দৃষ্টি রোদের মতো নিষ্ঠুর। সিগারেটের ধোঁয়ায় ফুসফুস জ্বলতে থাকে। অঞ্জলি এখন কি করছে? তার বাবা এসেছে? আপ্যায়িত করার কিছু তো নেই। কিছু কিনে রাখা উচিত ছিল। বিবিধ ভাবনার মধ্যে আকস্মিক চোখের উপর চোখ পড়ে যায়। তার দু-নয়ন। মেয়েরা নিশ্চয়ই শুচিবাই বুড়োর কোলে বসে নেই। মিনি হয়তো আঙিনার এককোনায় তাপিত দুপুরে অনাদরে খেলছে। গড়াগড়ি করছে ধুলোয়।

অভাবের সংসার মেয়েদের জন্য মাঝে মধ্যে বাহুল্য খরচ। অঞ্জলির রাগ। নানারকম মন্তব্য-প্রশ্ন। শিহাবের খারাপ লাগে। জবাব দেয়…দেয় না। নিশ্চুপ। তার শিশুকাল-ছেলেবেলা অনাদর-অবহেলায় গেছে। কৈশোর নিঃসঙ্গ-একলা। কেউ কোনোদিন একটি খেলনা কিংবা শখের জিনিস দেয়নি। কত মর্মপীড়ন! তাই অজান্তে খরচ হয়ে যায়। নিজেকে সামলাতে পারে না। এ তার লুকোনো আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছায়া। অভাব বাড়তে থাকে। প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনায় কাটছাট। অক্ষমতার ডালপালা ছড়িয়ে যায়। সীমিত হতে থাকে যাবতীয় চাহিদা। অঞ্জলির মুখের দিকে তাকিয়ে বিষাদ সাগর। কত ইচ্ছে অপূরণীয় থেকে থেকে মন মরে গেছে তার। শিহাব অবশেষে একদিন শ্বশুরের কাছে হাত পাতে। কোনোদিন তেমন করে দাঁড়ায়নি। তখন তার আত্মসম্মান নেই। কোনো মর্যাদা নেই। বোধের উপলব্ধি ফ্যাকাশে-ধূসর। সে-সময়ই জানা যায়। অঞ্জলি অনেকদিন ধরে এটা-ওটা চেয়ে নেয়। শিহাব নিজের মধ্যে মিশে যেতে শুরু করে। সে এমনিই দিগ্‌ভ্রান্ত-অস্থির। দৈন্যের জটজালে নিজেকে শুধু নগ্ন দেখে যায়। কিছু বলে না। ফিরে আসে। সন্ধে অদ্ভুত বিষণ্ন-ম্লান। অঞ্জলির মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। অঞ্জলি হাসে। চোখের তারায় তারায় সেই দুষ্টুমি।

‘কি হল তোমার…অমন করে তাকিয়ে আছ?’

‘তুমি বাবার কাছে সাহায্য নাও বলোনি তো!’

‘সাহায্য? ও…ভালবেসে দেয়। নেব না?’

‘অঞ্জলি এতটা তো নয় তুমি হাত পাতবে।’

‘হাত পাতিনি তো। আমি তার মেয়ে না? বাবা দিলে না করব কেন?’

‘আমাকে অসম্মান করলে। আমি গরিব মানুষ। গরিব মানুষ।’

শিহাবের দু-চোখে বিষাদ-ছায়া।সে কী করে? আঙিনায় সন্ধের অন্ধকার নেমে আসে।ঘরের পেছনে বাতাবিলেবু ফুলের মন-মাতাল সুবাস।সেখানের কোনো পাণ্ডুর বাতাস মনের মধ্যে ভেসে বেড়ায়। অঞ্জলি জড়িয়ে ধরে তখন।

‘এতকিছু ভেবে তো জীবন চলে না। চলে? তোমার অনেক খাটুনি। উপার্জন নেই। দিন আসুক…আর কখনো নেব না।’

‘তোমার অনেক কষ্ট অঞ্জলি। শুধু কষ্ট দিই। একটু স্বস্তি…শান্তি দিতে পারি না। আমি বড়ই গরিব। অসহায়।’

‘এ কথা বলছ কেন? আমি তোমার সন্তানের মা।’

যত সহজে গল্পের শেষ…রেশ শেষ হয় না। শিহাব ভেবে নেয় কিছু করতে হবে। আরও কাজ আরও টাকা। এভাবে অভাব তাড়নায় জীবন কতদিন চলে? একদিন মেয়েরা বড় হবে। স্কুলে যাবে। পড়ালেখার খরচ দরকার। তার নিজের যেমন সুখকর অতীত নেই, ভবিষ্যতও নেই, নাই থাকল; সন্তানের জন্য কিছু তো করতে হবে।

শিহাব একদিন সকল আড়ষ্ট-সংকোচ এড়িয়ে প্রফেসরকে বেতন বাড়ানোর কথা বলে।সে তখন মরিয়া-অস্থির।সংসারের ন্যূনতম চাহিদাটুকু ঠিকমতো পূরণ হয় না।সব জিনিসের দাম বেশি। উপার্জন কম। এদিক-ওদিক অনেক কাটছাট। শৌখিন মনের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে। তারপরও ভালো সাবান, মসৃণ ব্লেড ইত্যাদি চোখ টানে। সাইকেলে যেতে আসতে দু-চারটি কসমেটিক্স দোকান পেরিয়ে যায়। সে-সব দোকানে রং-বেরঙের দ্যুতি ছড়ানো বাতি। বর্ণিল আলোয় বিমূর্ত সৌন্দর্য। দৃষ্টি ঝলসে ওঠে। মন-মাতাল সুগন্ধে ম-ম আশপাশের অবারিত সীমানা। কখনো নিষিদ্ধ সাধ জাগে একবার নেমে কোনো বাহারি সুগন্ধি কিনে নেয়। হয় না। বেঁচে থাকার এই জীবনে অনেককিছু ছেড়ে দিতে হয়। অভাব আর দৈন্যের সঙ্গে সহজে পারা যায় না

প্রফেসরের হাতে দামি সিগারেট। নাক-মুখ-আঙুলের ফাঁক গলিয়ে নীলচে ধোঁয়া উঁচুতে উঠে যায়। বাতাসে ভাসতে ভাসতে কোনো মেঘছবি আঁকে। বায়বীয় স্বপ্নরেখা। শিহাব শোনে আশার বাণী। ভুল শোনেনি। আগামী মাস থেকে বেতন বাড়বে। এই কষ্টের বাজারে দুই শত টাকা হাতির গায়ে সুড়সুড়ি নয়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে মনে মনে হিসাব কষে। এক-দেড় মণ জ্বালানি-খড়ি কেনা যায়। অঞ্জলির খুব কষ্ট। শুকনো পাতা আর তুষের আগুনে ফুঁ দিতে দিতে প্রায় হাঁপানি। টাকা স্বস্তি আনে। তবে এ খবর এমন নয় যে বলতে পারে। পরিহাস। নিজেকে কতবার অপমানিত করবে সে? আশা ছিল হাজার-বারো শ বাড়বে। একটি টিউশনি ছেড়ে দেবে। শরীর-মন চলে না। গবেট মার্কা ছাত্রের পেছনে মাথা খাটিয়ে মস্তিষ্ক শূন্য ফাঁকা। সে ভাবনা হিসাবনিকাশে থেকে গেল। উলটো আরও দু-একটির সন্ধান করতে হবে। পরিচিত দু-চারজনকে বলে রাখার তাগিদ।

এরমধ্যে একদিন শ্বশুর হাজির। শিহাব চোখের দিকে তাকাতে পারে না। কোত্থেকে সহস্র দৈন্য গ্রাস করে নেয়। আঠারো-কুড়ি তারিখের পর হাতে অনেক টান। সে দ্রুত মোড়ের দোকানে গিয়ে স্লিপ লেখে। মিষ্টি-শিঙাড়া-সন্দেশ। শ্বশুর লাল-চা পছন্দ করেন না। কী করে এবার? পরিচিত মুদির দোকান বন্ধ। অঞ্জলি পাশের বাড়ি থেকে দুধ নিয়ে আসে। এসব ছুটোছুটি চিহ্ন-নিদর্শন চোখে পড়ার কথা নয়। গোপনে সমাধা হয়। একফাঁকে তিনি ডেকে বলেন, –

‘বাবাজি ওই পত্রিকার কাজ ছেড়ে দাও। অল্প বেতন। সেও শুনি নিয়মিত পাওয়া যায় না। তুমি তো প্রাইভেট পড়াও। ছাত্রছাত্রি গুণের কথা জানে। একটা কোচিং সেন্টার বা টিউটোরিয়াল হোম খোলো। মাসে আট-দশ হাজার হয়ে যাবে।’

‘ভালো কথা।…তুমি করতে পারো তো। যে তোমার চাকরি…বেতন ঠিকমতো নেই।’

অঞ্জলির মুখছবি উজ্জ্বল। অনেক কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। শিহাব কি বলে? তেমন করতে পারলে ভালো। তবে চালু হতে হতে অনেক সময়। বিনিয়োগের পুজি নেই। চেয়ার-বেঞ্চ-বোর্ড কত কি দরকার। সে-সব আসবে কোত্থেকে? ভোর-সকালে টিউশনি করে ফিরেছে। একই অঙ্ক চার-পাঁচবার। ছাত্র বোঝে না। শিহাবের মাথা গরম। কারণ আছে অথবা কারণ নেই। অকারণ। সে নিশ্চুপ। উত্তর দেয় না।

‘জামাই আমার কথা কি ভালো লাগল না? তোমাদের দুটো মেয়ে। খাওয়া খরচ বেড়েছে। ওদের জন্য সামনে আরও খরচ। আয়-রোজগার তো তেমন নাই। এখনই কিছু করতে হবে। বসে থাকলে চলবে?’

‘বসে তো থাকি না।’

‘না বাবা বসার সময় কোথায়? সারাদিন ছুটে চলে। এই দেখ কত ভোর-সকালে পড়িয়ে এল। তারপর অফিস। আবার ফিরে বিকেল-সন্ধ্যা চলছে।’

‘এখন কষ্ট করলে পরে সুখ। টাকা কিছু জমাতে পারছ? মেয়ের বিয়ে দিতে হবে না?’

‘কি যে বলেন বাবা!’

‘জামাই চেষ্টা করো বাবা। টাকা হল শক্তি। মেয়েদের পড়ালেখা বিয়েশাদি অনেক টাকা দরকার। তাই বলছি। তিন-চার ব্যাচে পঞ্চাশ-ষাটজন ধরতে পারলে তোমার টাকা খায় কে!’

‘বাবা ঠিক বলছে মিনির আব্বা।’

অঞ্জলির চোখ-মুখ উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়। আপন মানুষ তার ঘরে। অথবা যে স্বপ্নদোলা মনকে দোলায়। ভালো লাগে। শিহাব সেদিকে তাকিয়ে বিমূর্ত ভাবনায় ভাসে। স্বপ্ন তো।

‘হ্যাঁ ঠিক কথা…দেখি কী করতে পারি।’

‘দেখি নয়, করতে হবে।’

অঞ্জলি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। শিহাব সত্যি সত্যি বিরক্ত। এত পরামর্শ-উপদেশ ভালো লাগে না। সারাদিন পরিশ্রম। মাথার মধ্যে হাজার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কী করবে? কোথায় যাবে? ভবিষ্যৎ কি? সব অন্ধকার। কোচিং সেন্টার খুলবে। টাকা কোথা থেকে আসবে? অনেককিছু মুখে বলা সহজ, বাস্তব দুনিয়ায় সম্ভব নয়; বড় কঠিন। সে অদ্ভুত উন্নাসিক দৃষ্টি আচ্ছন্ন। আলোচনা বৈঠক থেকে আলগোছে বের হয়ে যায়। শজনেতলার এককোনায় সাইকেল পড়ে থাকে। সেটি ধরে রাস্তায়।

তার ভালো লাগে না। মন অস্থির-চঞ্চল। প্যাডেল মেরে মেরে এদিক-ওদিক বিস্রস্ত ঘোরে। অর্থহীন দিগ্‌ভ্রান্ত। বড়মাঠে বসে থাকে। পুনর্ভবার ঝিলমিল পানির দিকে নিষ্প্রাণ তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস। বিকেল থেকে সন্ধে। বেশ রাতে ঘরে ফেরে। তখন অঞ্জলি বারান্দায় নিশ্চুপ প্রতীক্ষায়। সামনে কুপি দপদপ জ্বলে। লাল-হলুদ শিখা ধীর বাতাসে কেঁপে কেঁপে যায়। আশপাশে ঝিঁ-ঝিঁ ডাক-কলরোল। বাতাসের ঢেউয়ে মৌন বেদনার সুর-তরঙ্গ। মনের আদ্যোপান্ত সবখানে কত ভাবনা কত চিন্তা-দুশ্চিন্তা। শিহাবের বুকে ধক করে ধাক্কা লাগে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সে কিছু বলে না।

সাইকেল বারান্দায় তুলে চেইন-তালা মারে। টিউবওয়েলে হাত-মুখ ধোয়। সাবান খুব করে ঘষে। সেখান থেকে অপাঙ্গ-অন্ধকার দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়। অঞ্জলি মেঝেয় ভাত বাড়ে। শিহাব খেতে বসে। একটি শব্দ করে না। অঞ্জলিও।

রাতে খাওয়ার পর কখনো আঙিনায় চেয়ার টেনে বসা হয়। কোনো কোনো রাত আকাশে নক্ষত্র আলো ছড়িয়ে দেয়। একেকটি তারা নিজেদের মধ্যে হাতে হাত ধরে রাখে। সে রাত আশ্চর্য বিমূর্ত। পুব-দক্ষিণ কোনে একলা একটি চাঁদ নির্নিমেষ তাকায়। তার উপায়হীন দৈন্য, পরিশ্রম-ক্লান্ত মন আর হাজার নিশ্চুপ কথায় উজ্জ্বল হতে থাকে। শিহাবের দু-চোখ ম্লান। অঞ্জলি টিউবওয়েল পাড়ে এঁটো থালাবাসন পরিষ্কার করে। কাজ শেষে বার-দুয়েক সামনে দিয়ে আলতো হেঁটে যায়। তারপর পেছনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। শিহাব নিস্পৃহ। আনমনে জীবনের খেরোখাতা খুলে বসে। আদি ইতিহাসের জাবরকাটা। কেউ নেই তার। সে একদম একা। অতীতের বালুকাবেলায় হেঁটে বেড়ানো মানুষ আর কী পেতে পারে? তার মন অকারণ হু-হু ভেসে যায়। অঞ্জলি তার চুলে বিলি কাটে।

সে রাতে নিয়মের মতো অঞ্জলির গায়ে হাত রেখে শোয় না। পেছন ফিরে কাত্‌ হয়ে নিশ্চুপ নিঃসাড়। ওপাশে কেউ দু-চোখ আলো-অন্ধকার দেয়ালে ফেলে রেখে কিছু হাতড়াতে থাকে। তার সরু দীর্ঘশ্বাস ভারী মনে হয়। শিহাব কী করে? সে মুখ ঘুরে ফেরে না। মুখোমুখি হয় না। জেগে থাকে। মনের দেয়ালে ছবির পর ছবি এসে হারাতে থাকে কোনো প্রত্যাশার জলছবি। পরদিন সকালে মাথায় কিছু নেই। কোনো দুশ্চিন্তা উদ্বেগ। অঞ্জলি নাশতা এগিয়ে দিয়ে বলে, –

‘তুমি রাগ করেছ?’

‘কী জন্য?’

‘ওই যে বাবা কী করতে বলে গেল।’

‘না রাগ করিনি। তিনি তো ভালো কথা বলেছেন। এরজন্য চাকরি ছাড়তে হবে কেন? একটু গুছিয়ে নিই।’

‘বাবা টাকা দেবে। নেবে?’

‘কত টাকা?’

‘দশ-পনেরো।’

‘তোমাদের অনেক টাকা অঞ্জলি।’

অঞ্জলি নিশ্চুপ। শিহাব রাগ করে আছে। এই মানুষের বুকের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। বুকে জড়িয়ে শোয়। এখন কত অচেনা। দুর্বোধ্য। সে কিছু বলে না।

গাছের ডালে ডালে হাজার কাক। বিল্ডিং’এর কার্নিশে। ইলেকট্রিক তারে। আকাশে কালো ছায়া। বাতাসে ডানার ঝটপট শব্দ। অস্বস্তি। শিহাব নিমগাছের ছায়া থেকে সরে আসে। রাস্তার ওপারে রেস্তোরাঁ। বিরিয়ানি পাওয়া যায়। আলমের দোকান। প্রবেশমুখে বড় ডেকচি। পেতল বা তামার। লাল শালুতে মুখ ঢাকা। ভেতরে ছোট ছোট টেবিল। তিন-চারটি টুল। নীল-লাল-হলুদ-সবুজ প্লাস্টিক। শো’কেসে সাজানো কেক-পেটিস-ক্রিমরোল। বিবিধ বিস্কুট। সে কি খাবে? পকেটে জোর নেই। মুখ শুকিয়ে কাঠ। আকণ্ঠ তৃষ্ণা। এক গ্লাস পানি খেতে পারে। আলম মিয়া পাউরুটি-টোস্ট ছিঁড়ে ছিঁড়ে আকাশে ছুড়ে দেয়। কাকেরা খেলা করে। ক্রিকেট বল ক্যাচ্‌। আউট। মানুষ মধ্যদুপুরে তামাশা দেখে। মাথা বাঁচিয়ে হেঁটে যায়। আলম পূর্ব-জনমে কাক ছিল। অথবা তার পূর্বপুরুষ। শিহাব তবে কী? কুকুর। সারাদিন সাইকেলে এপ্রিলের দগ্ধ-দুপুর হেঁটে হেঁটে দৌড়ে ছোটে। জীবন তাড়নার তাগিদ।

সে আস্তে করে সব পেরিয়ে যায়। মাথার উপর গনগনে সূর্য। কয়েক ডজন কাক তারস্বরে চিৎকার করে। করুক। সব তার হতাশা। আর্তি। ডানাভাঙা স্বপ্নসাধ। রোদের উজ্জ্বল ঝলকানি দৃষ্টি ধাঁধা। আজও মাথাব্যথা নিশ্চিত। অন্ধকার বেঁচে থাকায় সবকিছু এত তীব্র লাগে কেন? কোচিং সেন্টার খুলে বসলে মন্দ হয় না। স্বাধীন কাজ। নিজের ইচ্ছেমতো চালানো যায়। অফিসের ডিউটি বাঁধা নিয়মে চলে। সকাল এগারো থেকে দুপুর দুই-আড়াই। দ্বিতীয় শিফ্‌ট রাত দশটায় শুরু। কখন শেষ জানা নেই। সবকিছু ম্যাটারের উপর নির্ভর করে। সংবাদপত্রের কাজ। লেটেস্ট খবর ধরা চাই। কম্পোজ হলেই তো প্রুফ। তারপর তার কাজ।

মেশিন ঘরের পাশে ছোট আরেকটি ঘর। মূলত গ্যারেজ। তার এককোনায় টেবিল-চেয়ার। আধভাঙা-ভাঙাচোরা। কাজ চলে যায়। ওই ঘরের মধ্য দিয়ে মানুষজন উত্তরে যাওয়া-আসা করে। শেষ-সীমানায় দেয়াল ঘেঁষে ল্যাট্রিন-প্রস্রাবখানা। একটি কামরাঙা গাছ। সেটির কালচে শরীর। সবুজ পাতার ডালে ডালে লাল-বেগুনি ফুল আসে। নিচে টিউবওয়েল। শিহাব কখনো কখনো দরজা দিয়ে সামনে দৃষ্টি ছুড়ে দেয়। চকচক করে হাসতে থাকে কনডেন্সড্‌ মিল্‌কের কৌটোর আলো। সেগুলো কেটে পানি ব্যবহারের উপযোগি করা হয়েছে। মানুষের কত বুদ্ধি! কেউ তৈরি করে ফুলের ঝুড়ি…কেউ পানি ঢেলে পরিষ্কারের পাত্র। সে দেখে। ভাবে। দেখতে দেখতে ভাবতে ভাবতে দমকা বাতাস। উৎকট গন্ধ। বিবমিষা। এই জীবন। বেঁচে থাকা।

হলরুমের মতো বড় ঘরে তিন-চারজন কম্পোজ করে। সিসার পর সিসা বসিয়ে অক্ষর সাজায়। কথা তৈরি হতে থাকে। সাইফুল হ্যান্ড-মেশিনে প্রুফ প্রিন্ট ছাপে। একগাদা কাগজ সমেত দিয়ে যায়। শিহাব কালি-ধুলোমাখা মূল কাগজ নিয়ে বানান আর ভাষার শুদ্ধতা খোঁজে। প্রুফরিডার। তার জীবনে সরলতার শুদ্ধতা বেঁচে থাকা দিনকাল বলে যায়, সি কপি…সি কপি। করার কিছু নেই? তার মূল-কপি হারিয়ে গেছে। যার মূল নেই…মূল্যও নেই।

গত বছর শ্বশুর হজ্ব করে এলেন। অঞ্জলি বাসে উঠে বারবার বলে যায়। মন্ত্রপাঠের স্তবকগুচ্ছ।

‘শোনো তুমি কিন্তু কালকেই চলে আসবে। দুপুরের আগেই। সন্ধে বা পরের দিন চলে আসব আমরা। একটি বড় বোতল এনো। জমজমের পানি নিতে হবে। নিয়ত করে খাবে। তোমার মাথাব্যথা থাকবে না। তুমি তো বিশ্বাস করো না। কি করি!’

‘আচ্ছা আচ্ছা যাব।’

বাস ছেড়ে দেয়। শিহাব দাঁড়িয়ে থাকে। শূন্য একলা। একা থাকতে খাঁ-খাঁ লাগে। সে তারপর যায়নি। এর আগে শ্বশুরের বড়ভাই, জ্যাঠা-শ্বশুর হজ্ব করে এলেন। অঞ্জলির সঙ্গে শিহাব বাসে ওঠে। যথাসময় পৌঁছে একে-ওকে সালাম দিতে বারো-অবস্থা। সেই মানুষকেও সালাম। কুণ্ঠিত চোখ-মুখ। জ্যাঠা-শ্বশুর দেখেও দেখেন না। চিনতে পেরেছেন কি না কে জানে। তিনি দু-জন মওলানার সঙ্গে অতিব্যস্ত। মক্কা-মদিনার রাস্তাঘাট পাহাড়-পর্বত কেমন? কে কত উঁচুতে উঠেছেন? শয়তানকে কতগুলো পাথর মেরেছেন? এসব গল্প। আজব দুনিয়া। কেউ ধর্মের নামে টাকা ওড়ায়…কেউ টাকার জন্য ধরে রাখতে পারে না।

শিহাব শূন্য বুক আকুলতা নিয়ে ঘরে ফেরে। খর বাতাসে চোখ-মুখ শুকনো। দু-দিন আগে ফেটে যাওয়া ঠোঁটে রক্তের লোনা স্বাদ। পেটে ক্ষুধা। গলির মাথায় আসতে আসতে চেহারা আরও গম্ভীর। দরজার কাছে পড়ে থাকা শজনের ফুল পায়ে দলে যায়। চারপাশে আর্শ্চয মন উতল সৌরভ। সে কখনো ফুল দলে দেয় না। ছেঁড়ে না। ফুলেরা বৃন্তে থাক। এই ভালো লাগে। আজ তার কি হয়েছে? চিনচিন মাথাব্যথা। নিজেকে এভাবে কষ্ট দেয়া কেন? আধভাঙা বুড়ো সাইকেল রান্নাঘরের পেছন দেয়ালে ছায়ায় রাখে। আশপাশে একপলক তীব্র দৃষ্টি। তারপর চোখ মাটিতে নেমে যায়। মাটির মতো কারও ধৈর্য নেই। সে তেমনকিছু হতে পারেনি। দুর্ভাগ্য। কোনোকিছু হতে পারল না। নিশ্চুপ হেঁটে একচিলতে বারান্দায়। অঞ্জলির দৃষ্টি সবদিকে।

‘এত দেরি করলে যে আজ!’

‘কাজ ছিল।’

‘হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আর বসো না এখন। ভাত খাবে।’

‘তোমার বাবা এসেছিল?’

‘হুঁ!’

শিহাব উঠে পড়ে। আশ্চর্য নিস্পৃহ-উন্নাসিক। কোনোকিছু ভালো লাগে না। কী কী কথা হল ইত্যাদি জানার ইচ্ছে নেই। কোথায় হারালো সেই মন? সে টিউবওয়েলে যেতে যেতে অজান্তে কিছু ভাবে। ভাবনা আসে। শ্বশুর হয়তো অঞ্জলির হাতে কিছু টাকা দিয়ে গেছে। এভাবে কত আর নেবে? শিহাব নিষেধও করতে পারে না। এখন তার নিজের উপর ঘৃণা। সে এক ঘেয়ো কুকুর। গলির মাথায় দাঁড়িয়ে অসহায়-নির্বোধ পশু। একটুকরো উচ্ছিষ্টের আশায় সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। গলির পর গলি হাতড়ায়। তার করুণ দৃষ্টি ধরে রাখে সভ্যতার কত কথা কত কাহিনি। হায় জীবন! তারপর দুটো দিন একটু স্বস্তি। খাবারের থালায় একটুকরো মাছ বা মাংসের ঝোল। আশ্চর্য বেঁচে থাকা! সে এবার ওই টাকা স্পর্শ করবে না। অঞ্জলি নিজের কাছেই রাখুক।

টিনের চাল বারান্দা। উপর থেকে গনগনে তাপ ঝরে। তিষ্ঠানো দায়। অঞ্জলি যে কীভাবে বসে আছে! রাস্তার ড্রেনে বড় মেয়ে বসেছে। তার অপেক্ষা। অসুখী বিষকাঁটা আবার বুকের জ্বালা জাগায়। খোঁচাতে থাকে। মেয়ের পেছনে এত টাকা খরচ! সারছে না কিছুতেই। ডাক্তারের কথা, সেরে যাচ্ছে; খাবারের দিকে নজর রাখবেন। এই ওষুধ দেবেন। অ্যালার্জিক খাওয়া নিষেধ। কত কি! প্রাণান্ত চেষ্টা। শিহাব ফেরার পথে মেয়ের জন্য এটা-ওটা কিনে নেয়। আজ আনতে পারেনি। টাকা নেই।

এ-সময় ঘরের ভেতর ছোট মেয়ে ‘প্যাঁ-া-া’ করে কেঁদে ওঠে। ওকে হয়তো আধো-ঘুমেই শোয়াতে গেছে অঞ্জলি। তারপরও সে ঘর থেকে বেরোয়। শিহাবের খাবার সাজাবে। শিহাবের কপালে দপদপ ঢেউ। দৃষ্টি এলোমেলো। শ্রুতিতে ভোঁ ভোঁ। অসম্ভব বিরক্তি। সে কথা বলে না। চুপচাপ। প্রাণ ব্যাকুল মিহি কান্নার গমক হেঁচকির মতো একটানা বাজতে বাজতে আঙিনায় থমকে দাঁড়ায়। শিহাবের সহ্য করতে পারে না। একছুটে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। আশ্চর্য সব শান্ত। নিরিবিলি প্রলেপ। তার ভালো লাগে। অঞ্জলি নির্বিকার। শিহাবের সকল তিক্ত দিনরাত, বিষণ্ন সময়কাল; অস্বস্তি কাঁটা নেই। তখন মুখে আবেগ থরথর বোল। সে মেয়েকে আদর করতে করতে শুধোয়।

‘মিনি ক-বার পায়খানা করল?’

‘কি জানি ক-বার, অত-শত মনে থাকে?’

‘মনে রাখতে হবে না!’

‘মেয়েকে বড় ডাক্তার দেখাও। এই পেটের অসুখ পরে আরও ভোগাবে।’

‘দেখাতে কে না চায় বলো? টাকা পাচ্ছি না। দেখি সামনের মাসে বেতন পেলে না হয়…।’

‘কি যে চাকরি করো…বেতন ঠিকমতো নেই। এর চেয়ে রিকশা টানাও ভালো দেখি।’

‘তুমি এ কথা বলতে পারলে অঞ্জলি?’

‘আর কী বলব বলো! তোমার কষ্ট দেখা যায় না। বাচ্চাদের কষ্ট। আমি কোথায় যাই বলতে পারো? কী করি আমি?’

অঞ্জলির দু-চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শিহাব সেদিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। অঞ্জলি সহজে কাবু হয় না। আজ বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিশ্চয় কান্নাকাটি করেছে। তখন শিহাবের চিন্তনে রিকশা টানার ছবি। ঠিক…এই চরম নিষ্ঠুর কথাই সত্য। তার থেকে রিকশাঅলারা অনেক ভালো আছে। মহাজনকে দিনের কমিশন মিটিয়েও নগদ উপার্জন অনেক টাকা। তার বেতন দিন হিসাবে মাস শেষে সেই নাগাল ধরতে পারে না। সে অবিশ্বাস্য ঝাঁকুনি খায়। সামান্য প্রুফরিডার। এরচেয়ে উপরের কি ভাবতে পারে? অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। বিএ পাশ করেছিল। চাকরির আবেদন করার সময়কাল পেয়েছে ছয় মাস। কম সময় নয়। কিন্তু এই ভদ্র ন্যায় সমাজে তার যোগ্যতা থার্ড ডিভিশন। এ দিয়ে দাঁড়ানো যায় না।

অঞ্জলি কখনো নির্দ্বিধায় চরম সত্য বলে ফেলে। মনে হয় কোনো মমত্ববোধ নেই। ‘মানুষের ভুল শোধরাও…তোমার ভুল ঠিক করবে কে?’ শিহাব শোনে। কিছু বলে না। প্রফেসর প্রেস উঠিয়ে দেবেন। কাগজের ডিক্লারেশন বিক্রির কথাবার্তা চলছে। প্রেস উঠে গেলে চাকরি কোথায়? সম্বল টিউশনি। সেও আজকাল কেউ পড়তে চায় না। ছেলেমেয়েরা স্কুল-স্যারের কোচিং’এ পড়ে। তারা সাজেশন পায়। প্রশ্নপত্রও নাকি দেয়া হয়। কে জানে। সে কয়েকজন প্রাইমারি আর কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রছাত্রি পড়ায়। প্রাণান্ত অবস্থা। মাথা ঘোরের মধ্যে পড়ে অনুভূতিহীন। কি করবে সে? দু-চোখ অন্ধকার। অসহায় দৃষ্টি। অঞ্জলি একপলক তাকিয়ে মুখছবি অন্যরকম করে নেয়। আবেগ জমে ওঠে। তার কাঁধে হাত রেখে বলে, –

‘যাও তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো। রিনিকে আমি সামলাচ্ছি।’

‘নাও। যাও আম্মা-মা-মণি মায়ের কোলে যাও।’

শিহাব আদুরে গলায় বলতে বলতে মেয়েকে অঞ্জলির কোলে তুলে দেয়। সে-সময় মিনি একগাল হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে। হেসে হেসে আবদারি বোল।

‘আব্বা আমার বিট্টুট এনেছ?’

‘ওই খাও…সাত বেলা হাগা আর বিস্কুট খাওয়া!’

অঞ্জলি কি ক্রমশ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে? শিহাব হোঁচট খায়। তার ব্যর্থ-অক্ষম-কষ্ট-অস্তিত্ব ক্যাকটাস হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তীক্ষ্ণ কাঁটার খোঁচা। পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছে না। কোনো উপায় খুঁজে পায় না। রোরুদ্যমান কোনো দীর্ঘশ্বাস আলগোছে বুকেই পিষে মারে সে।

‘আব্বা বিট্টুট খাব।’

‘আচ্ছা মা খেয়ো। একটু পরে এনে দিই।…অঞ্জলি ওকে কাপড় পরিয়ে দাও আগে। ওদিকে রিনি কাঁদছে।’

‘করছি, সবই করব; এ ছাড়া করার কি আছে আমার? তুমি হাত-মুখ ধুয়ে এসো।’

শিহাব উঠে পড়ে। টিউবওয়েলে গিয়ে গামছায় চেপে চেপে মুখ ঘষে। এভাবে যদি ঘষে ঘষে নিয়তি বদলানো যেত! সে কি ক্রমশ অদৃষ্টবাদী হয়ে যাচ্ছে?

খেতে বসে চমক। বাটিতে মাংস। কিছু বলে না। নিশ্চুপ। মিনি পাশে খেতে বসে। শিহাবের বুকে জমাট হাহাকার। ডাক্তার কোন্‌ ওষুধ যে দিল, মেয়ের স্বাস্থ্য ভেঙে কাঠ। অপুষ্টির এই চেহারা কি করে ফেরাবে? অঞ্জলি আবার ব্যস্ত। চৌকির উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে মাথা উঁচু আধশোয়া। রিনির দু-ঠোঁটের মধ্যে স্তনবৃন্ত। মৃদু শব্দ। অঞ্জলির উশকোখুশকো চেহারার রাজ্যের বিষাদ। রহস্যময়। দুর্বোধ্য।

‘বাবা তোমার জন্য একটা জিনিস দিয়ে গেছে।’

‘কী?’

শিহাবের আগ্রহ নেই, তবু সাড়া দেয়; অঞ্জলি খুশি থাক। কোথায় হারিয়ে গেল হাসিখুশি আলোকিত মুখছবি। ফিরে আসুক।

‘খেয়ে নিয়ে দেখ। মক্কা থেকে এনেছে।’

‘দেখা করিনি বলে রাগ করেছেন তো!’

‘মেয়ের বাবা কোনোদিন জামাইয়ের উপর রাগ করতে পারে?’

‘মনে মনে করেছেন।’

‘সে কথা বলতে পারব না মিনির আব্বা। আমার খারাপ লেগেছে। বাবা মক্কা থেকে হজ্ব করে এলো। কত মানুষ দেখা করল। তুমি বড় জামাই। অন্তত একটা সালাম দিয়ে আসতে। উচিত ছিল।’

শিহাব কিছু বলতে পারল না। সব তার দোষ। ঘরের এককোনায় বাঁশবাতার র‌্যাক। উপরের তাকে চকোলেট-কালো রঙের প্যাকেট জ্বলজ্বল করছে। ইংরেজি আর আরবি লেখা। সোনালি রঙের প্রিন্ট ‘বাব-আল-ক্বাবা’। বেশ দামি আতর। একটু স্পর্শ বা ঘ্রাণ নিয়ে দেখবে? আজ কেন বিষের শিশি মনে হয়? কোত্থেকে বিষাদ বাতাস ঢেউ তোলে? তার হারানো কৈশোর। সে-সময় সুগন্ধির প্রতি মন হারালো আগ্রহ। কতদিন কত চেষ্টায় পয়সা জমিয়ে কেনা হয়। এখন হাজার অক্ষমতার ভিড়ে সব হারিয়ে গেছে। বাহুল্য বিলাসিতা। অঞ্জলি তখন খুশি। স্বস্তির উজ্জ্বল দৃষ্টি।

‘মিনির আব্বা, তুমি ব্যবহার করবে তো? রাগ করে ফেলে দিয়ো না যেন।’

‘আচ্ছা।’

এই উত্তরের মধ্যে যদি সামান্যতম সুখ লুকিয়ে থাকে, তাই হোক। শিহাব নিজেকে উদার আর কৌশলী ভেবে নেয়। মহৎ? কে জানে। আঙিনায় বিকেল নেমে পড়ে। ঘড়িতে চার-সাড়ে চার। খেয়ে উঠে একটু বিশ্রাম নিতে সাধ হয়। সেটি অলীক স্বপ্ন। টিউশনি আছে। তাকে দৌড়তে হবে।

অনেক রাতে শিহাব যখন দিনের সব কয়টি টিউশনি শেষ করে বাড়ি ফেরে, রাস্তায় ঘুটঘুটে অন্ধকার; লোডশেডিং। অবশ্য যে গলিতে বসবাস সেখানে ইলেকট্রিক পোল থাকলেও কখনো বাল্‌ব জ্বলে কখনো অন্ধকার। একটি চওড়া ড্রেন পেরিয়ে গলিতে পা রাখতে হয়। তখন কোনো রাতে কেউ একজন বুকের গহিনে বিড়বিড় করে যায়। অসিত রাত্রির গলি। প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগে। অবসন্ন। সাইকেল থেকে নেমে ধীর-শ্লথ পায়ে ড্রেন পেরোয়। নিকষ-কালো-অন্ধকারের কোনায় শুয়ে পড়বে? সে পারছে না। পারছে না সে। এই বেঁচে থাকা জীবন…অস্তিত্বহীন অস্তিত্বে বীতশ্রদ্ধ। সে কেন উন্নাসিক হয়ে ওঠে? বুঝতে পারে না। জবাব খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ। কি চেয়েছিল? ছোট ছোট প্রত্যাশা-স্বপ্নসাধ-স্বস্তির জীবন। কোথায় গেল? কী পেয়েছে? মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের পেছনে দৌড়য়। দৌড়তে থাকে। কেউ ছুটতে ছুটতে আছাড় খেয়ে পড়ে। স্বপ্ন ভেঙে যায়। সজীব মন চোখ-মুখ-দৃষ্টি ঘোলা। শুকনো ঝাপসা। এই হল বেঁচে থাকার বাস্তবতা। তখন পালাতে চায়। অস্তিত্বের পলায়ন। পলাতক মানুষ কি বাঁচতে পারে? সে কি বেঁচে আছে?

অঞ্জলি মধ্যরাতে কয়েকবার ডাকে। শিহাব নিথর নিশ্চুপ। অসম্ভব ক্লান্তি ঘুম কেড়ে নেয়। সে ঘুমোতে পারে না। পৃথিবীর যত অস্বস্তি-দুর্ভাবনা-দুশ্চিন্তা-হতাশা-বিষাদ ভাবনায় জ্বলতে থাকে। পোড়াতে থাকে। সীমাহীন অন্ধকার কোনো নক্ষত্রলোকে ভেসে যায়। আসলে কোথায় চলেছে জানে না। কোনো আলো নেই। কোনো দিশা নেই। অন্ধকার আর অন্ধকার। কোথাও কোনো জানালা নেই। আকাশের বুকে একলা একটি চাঁদ জাগে। সেও কেমন কৃপণ। একটু মুখচোরা হেসে উঁকি দেয় না। এই সংসার-জীবন-জটিলতার পাঁকে ভঙ্গুর। শিহাবের শীত লাগে। কেঁপে ওঠে শরীর। লন্ঠনের নিবু নিবু মৃদু আলো-আঁধারির ছোট ঘর। রহস্যময় পরিসীমা। কোথাও কোথাও পলেস্তরা খসে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র। কোনো দুঃস্বপ্নের সরল আর বক্র রেখা-জলছাপ। শিহাব সহসা কখন মুক্তি পাগল চোখ খোলে। অঞ্জলি কতদূর শুয়ে আছে! মিনি জন্ম নেয়ার পর প্রায়ই একসঙ্গে কাছাকাছি শোয় না। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে থাকে না। সন্তানদের মধ্যখানে আগলিয়ে দূর-তেপান্তর। যেভাবে আগে বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অঞ্জলি ঘুমিয়ে যেত, ভালবেসে জড়িয়ে; নির্ভরতায়। এভাবে প্রতিদিন সোনালি ভোর। জেগে ওঠে। সব হারিয়ে গেছে।

‘মিনির আব্বা, তোমার কি খারাপ লাগছে?’

‘নাহ্‌‌।’

‘এত কী ভাবছ?’

‘কে বলেছে আমি ভাবছি…ঘুম আসছে না তাই!’

‘মাথায় হাত বুলিয়ে দেব?’

‘না।’

‘মিনির আব্বা, বাবার উপর রাগ করো না। বুড়ো মানুষ কি বলতে কী বলেছে! তুমি কোচিং সেন্টার নাই খুললে, একটা ভালো চাকরি খোঁজো। নিশ্চয়ই পাবে। নিয়মিত বেতন হলে কষ্ট থাকবে না।’

‘আচ্ছা।’

‘তুমি রেগে আছ এখনো।’

‘রাগ করিনি আমি।’

‘আতরটা ব্যবহার করবে না? প্যাকেট খুলে তো দেখলে না।’

‘করব। অঞ্জলি এবার একটু চুপ করো…ভালো লাগছে না আমার।’

‘মাথা ধরেছে। রোদে রোদে ঘুরেছ তো!’

‘কে বলল তোমায়?’

‘তোমার চোখ দেখে দুপুরেই বুঝেছি। মাথা টিপে দিই।’

‘না।’

‘আমি ঘুমোলাম।’

শিহাব ভোর-ভোর সকালে জেগে ওঠে, নাকি শেষরাত? লন্ঠন নিভে গেছে। ঘরের দেয়ালে অপার্থিব আলোছায়া। প্রতিফলিত হতে থাকে নতুন দিনের সকাল। নিজেকে সেভাবে আবিষ্কার করে। অনেকদিন পর। অঞ্জলি বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আছে। শরীরে অদ্ভুত মন-বিভোর সৌরভ। আতর? হয়তো। অথবা…কে জানে। শিহাবের চোখ-মুখ উজ্জ্বল। মাথায় যন্ত্রণা নেই। ঠোঁটে হাসিরেখা। গভীর রহস্যময়। সবটুকু বোঝা যায়। বোঝার চেষ্টা। কেউ বুকের গহিনে গুনগুন সুর তোলে। এই-ই জীবন। কষ্টের মধ্যে চেনা-অচেনা সুখ। অব্যক্ত সুন্দর। অঞ্জলির ভালবাসা। শিহাব ভাগ্যবান। সে কি কেঁপে উঠল? অঞ্জলি আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। ঠোঁটের উপর ঠোঁট রেখে ফিসফিস উচ্চারণ।

‘তুমি এবার একটু ঘুমোও।’   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত