মেহগনি পালঙ্ক

ইদানিং এই এক মোহ। নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে স্ট্যাটাস আপডেট করা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে তনয়া। যা মনে আসে গল্পের মত লিখে ফেলে। কিছু অনবদ্য অন্তর্জাল ম্যাগাজিনের খোঁজ পেয়েছে। মন দিয়ে অক্ষর সাজায় সেখানে যারা। সেখানেই পাঠিয়ে দেয়। সত্যি বলতে কি লেখিকা হওয়ার তাগিদ এখান থেকেই খুঁজে পেয়েছে সে। নিজের টাইমলাইনে দিলে এর আগে তেমন সাড়া দিতো না চেনা মানুষগুলো। বরং কিছু বাঁকা উক্তি শুনেছে, কিরে ফেসবুকে না লিখে ম্যাগাজিনে পাঠা না, রবীন্দ্রনাথের সময় ফেসবুক ছিলনা ভাগ্যিস ইত্যাদি।তনয়া বুঝে পায়না যে মানুষ অপরের কোমলতায় খোঁচা দিয়ে কি সুখ পায়। তার কোন দাবী নেই সাহিত্যিক হওয়ার। মনের ভেতর যে ভাব জমে, ফেনিল হয়ে উপচে পড়ার আগে একটি পাত্রে ধারণ করে রাখা শুধু, সেটাই তনয়ার লেখার খাতা। ব্যস, ওইটুকুই।

নেহাত কৌতুহলের বশেই একদিন ইনবক্সে পাঠিয়েছিল লেখা একটি ওয়েবসাইটে। চটজলদি রিপ্লাই এল। সে লেখা মনোনীত হল। পোস্ট হওয়ার পর প্রজাপতির ছটফটানি মনের ভেতর। কি সুন্দর করে এডিটিং হয় এখানে। একটা একটা শব্দ মেপে। কোন নেতিবাচক ভঙ্গি নেই, কোন উটকো জ্ঞান নেই, ইচ্ছে করে নিজেদের মত শব্দ গুঁজে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেই অন্যের লেখায়। যে রকমটা হলে ভাল তেমনটাই প্রকাশ করে এঁরা। প্রথম লেখাটি যেদিন প্রকাশ হলো একটা, দুটো, তিনটে…..করতে করতে দু’হাজার লাইক পড়লো তনয়ার গল্পে। অজস্র কমেন্টস। কিছু চেনা নাম ছিল, তবে অচেনা নামই বেশি। সেইদিনটা যে কি ভীষণ ভাললাগার ছিলো। যাদের সাথে কোনদিন কথা হয়নি, তাদেরকে কি আপন মনে হচ্ছিল হঠাৎ আজকাল এই বাংলা না পড়ার যুগে এমন প্রাপ্তি সৌভাগ্য বলেই মনে হয় তনয়ার। তার লেখা কেউ পড়ছে, মতামত দিচ্ছে এইটুকুই তো পাওয়ার কথা ভাবেনি কয়দিন আগেও । যারা তাকে চেনেনা, জানেনা, তাদের থেকে এইটুকু পাওয়া অনুপ্রাণিত করে। রান্নাঘরে হয়ত রান্না করতে করতে মোবাইলে টাইপ করেছে গল্পটা। কোনদিন হয়ত মেয়েদের স্কুলের হোমওয়ার্ক করানোর ফাঁকে।
নেটে আছে তার কিছু লেখকবন্ধু। তারা বহুদিন ধরেই অন্তর্জালে লিখছে। সবাই ভাল লেখে এমন নয়, কিন্তু কারো কারো বেশ পেশাদার কলম, সাথে শব্দের জম্পেশ মহড়া আর অনুভূতির ডালিভর্তি ফুল। তাদের লেখা রীতিমতো গোগ্রাসে গেলে তনয়া, অপেক্ষায় থাকে নতুন লেখার। প্রায়ই ব্যক্তিগতভাবে আলাপের ইচ্ছে হয়। কিন্তু তখন দ্বন্ধ জাগে। অচেনা মুগ্ধতার এই যে পরশ, বাস্তবের আলাপচারিতায় সে যদি ভেস্তে যায়। সেটা ভেবে আলাপ করা হয়না। তার চেয়ে কলম চিনে নেয় কলমের বাঁক যত আছে, না চেনাটুকু এইভাবে থাকে আড়ালের আনাচে-কানাচে। 

কদিন ধরে শব্দ খুঁজে মরছে তনয়া। বিলি কেটে কেটে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে বিমূর্ত শব্দগুলো সব। হাত ফসকে যাচ্ছে বারবার।
তেমনি একদিন চিন্তা ভেঙ্গে বেজে ওঠে মোবাইলের বিপ, এষার মেসেজ। এই মেয়েটি তনয়ার জীবনে কেমন যেন এক ধোঁয়াটে অধ্যায়। 
স্কুল থেকেই দুজন একসাথে। তনয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে এষা চিরকাল, সবদিকেই। কিন্তু তাও কিসের যে রেষারেষি ওর সাথে বোঝেনা তনয়া। এমন কিছু বলার থাকেনা, তাও সপ্তাহভর মেসেজ না করলেই এষা মেসেজ করে বলবে কিরে, পুরনো বন্ধুকে মনে রাখিস না?
মনে রাখা মানে জানে তনয়া। কোথায় ঘুরেছে উইকএন্ডে, কোন ব্র্যান্ডের লাক্সারী ওয়াচ কিনেছে, অফিসে আর কটা প্রমোশন হল এইসব বলবে এষা।তারপর আসবে অন্য কথায়।
“তুই তো দিব্যি দুই মেয়েকে নিয়ে সুখে ঘর করছিস।বর ডাক্তার, নিজে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে লিখে বেড়াচ্ছিস। বাংলাটা আমিও মন্দ লিখতুমনা এককালে। সময়ই পাইনা আজকাল। মাল্টিন্যাশনালের মোটা টাকা পকেটে ঢোকাতে গিয়ে শখ আহল্লাদ জলে দিতে হয়েছে সব।
তনয়া মনে মনে উত্তর লিখতে থাকে।
কেউ তো এষাকে মাথার দিব্যি দেয়নি বলেনি লিখিস না। অনেকেই তো চাকরি সামলে নামী লেখিকা হয়েছে। এষা উচ্চ মাধ্যমিকে বাংলায় হায়েস্ট পেয়েছিল, স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিল বাংলা ম্যামের প্রিয় ছাত্রী বলে। তনয়া ওর থেকে অনেক সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে ঠিকই, সাধারণ তনয়া ধীরে চলার লোক আজীবন। তনয়া কখনো তার লেখা পড়তে বলেনি এষাকে, এষা নিজেই কিভাবে যেন খুঁজে বের করেছে সেসব অনলাইন ও তনয়ার লেখা। সেই নিয়েই খোঁচা দেয়। তনয়ার বর শুভদীপ ব্যস্ত ডাক্তার, তার সময় বড় কম তাই তনয়াকেই এটা সেটা খেয়াল করতে হয়। রিন্টু-মিন্টুর পড়াশোনা, বড় হওয়া সবকিছু লক্ষ্য রাখতে হয়। নিজের জন্য চাহিদা তনয়ার চিরকাল কম।এতেও এষার কিসের আপত্তি কে জানে?
কিচ্ছু লিখতে পারেনা এইসব মোবাইলে। এষার উত্তরে।
তনয়া লেখে ,
এখনো সময় আছে, লেখা শুরু করে দেখ না, হয়ে যাবে। এষা অট্টহাসির স্মাইলি পাঠায়।
বাড়ি বসে লাইক পাচ্ছিস তো হাজার হাজার, তাই বুঝতে পারিস না শুরু করাটা সবার জন্য তোর মত সহজ নয়।

এই যে কথায় কথায় গরম শলাকা বিঁধিয়ে দেয় এষা সেই স্কুল জীবন থেকে, তারপরেও কিসের যে মোহ মেয়েটার ওপর, কে জানে? মা বলেছে, শুভদীপ বলেছে, এর সাথে তুমি বলেই এখনো কথা বলো।তুমি হচ্ছো ওর সাকসেসের ডিসপ্লে বোর্ড। কিছু বলার মত হলেই তোমায় শোনাতে আসে।
কথাটা মিথ্যে নয়। নিজের কথা হলে আধ ঘন্টা টাইপ করবে এষা, বিদেশ থেকে ফোন করবে। আর তনয়া কিছু বলতে গেলে, এক লাইন উত্তর। এষা সেনের ডিসপ্লে বোর্ড হয়েই তনয়ার কেমন যে আনন্দ কাউকে বোঝানো যায়না তনয়া নিজেও বোঝেনা। এষা তাকে নিজের সব কথা না বলে শান্তি পায়না এটাও কি কম? তার জীবনে তনয়ার এটুকু গুরুত্বই যে কত গর্বের।

শৈশব থেকে তো এষাই তনয়ার চোখে নায়িকা। স্কুলের গুচ্ছ মেয়েরা যখন ঘিরে থাকত তনয়াকে, তাও এষা পাশ দিয়ে গেলে তনয়া হাত নাড়ত, ইশারায় বলত ‘কথা আছে, ফোন করব’, মনের মধ্যে আসমানী ঘুড়ি এঁকেবেঁকে দিক ভুল করে ফেলত এক মুহূর্তে। তখনও এষা ফোন করে নিজের কথাই বলত। কিন্তু যে এষাকে ফোন করে সবাই, এই দরকার, ওই দরকার জানান দেয়, সে তনয়াকে নিজে থেকে ফোন করে, এটা ভাবলেই মনটা কেমন হয়ে আসে সুখে। এষা সত্যি সেভাবে জানতে চায়নি তনয়ার কথা কোনদিন। হয়ত তনয়া মিনমিন করে বলে ফেলেছে একটুকু, দায়সারা উত্তর করে এষা আবার ফিরে গেছে নিজের কথায়। অবশ্য তনয়ার জীবনে তেমন ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার খবর খুব বেশি থাকেওনা। কিম্বা তনয়া জানেনা কিভাবে ঢাকঢোল পেটাতে হয়।
সেই নতুন স্কুলে চলে গেল এষা। সেখানে নতুন বন্ধুরা ওকে কিভাবে বুলি করছে, কারা দলে নিচ্ছে কারা নিচ্ছেনা সবকিছু নখদর্পণে রাখতে হবে তনয়াকে। কতদিন এমন হয়েছে যে স্কুল থেকে ফিরে ভাতের থালা হাতেই ফোনে বসে গেছে তনয়া। এষার সব কথা শুনে উঠতে উঠতে হাতের এঁটো হাতেই শুকিয়ে কাঠ। তনয়ার মা রাগারাগি করতেন। স্কুল থেকে ফিরে মেয়েটা খেতে পারেনা দুটো শান্তিতে, একটু বিশ্রাম হয় না। মা বলত, এই তো আবার ছুটবি কোচিং। এষাকে বলে দিবি ছুটির দিনে ফোন করতে।

তনয়ার বলা হয়ে ওঠেনা। কোচিংয়ে গিয়ে ঢুলতে থাকে ।তাও এষার ফোন চালিয়ে যায় তনয়া।
এষা প্রেমে পড়ল রাতুলের। রাতুল ভালবাসে কেয়াকে। কি করে রাতুল তাকে ভালবাসবে সেই ছিনিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে সর্বক্ষণ এষার। তার মত সুন্দরী মেধাবী কেউ থাকতে কেয়ার মত গেঁয়ো মেয়েকে কিভাবে ভালবাসল রাতুল? তনয়ার কিছু বলার নেই এই পুরো গল্পে। তারপরেও এষা ফোন করে চারঘন্টা ধরে সেসব শোনাবেই ।
যদি তনয়া একবার বলে ফেলেছে ভুল করে ,
রাতুলের থেকে হাজার ভাল ছেলে তো তুই পেয়ে যাবি | কি হবে ওদের দুজনের মাঝে ঢুকে?
অমনি এষার মুখ ঝামটা।
সেই রাতুলকে বিয়ে করেই ছাড়ল শেষ অবদি।কিভাবে যে দিনের পর দিন বিষ ঢুকিয়ে গেছে কেয়ার বিরুদ্ধে, কিছুটা তনয়া জানে। বাকিটা এষা নিজেই করেছে। তনয়ার কিছু বলার ক্ষমতা নেই। ওর কাজ শুধু শ্রোতার। সেই ছেলেকে ডিভোর্সও করল এষা। আসলে রাতুল চিরদিন শান্ত গোছের একটি ছেলে। ইংরিজিতে পিএচডি করছে যাদবপুরে, হঠাৎ  এষার বাতিক উঠল বিদেশ যাবে। যেনতেন করে কোম্পানি থেকে অফার জুটিয়েও নিল। রাতুল বলেছিল, তুমি যাও, আমি এখানেই শেষ করব বাকি কাজটা।
এষার দাবি তাকেও সব ছেড়ে সঙ্গে যেতে হবে।
অনেক অন্যায় মেনেছে রাতুল। এইটা আর পারলনা ধৈর্যের একটা নিজস্ব সীমা থাকে আসলে।
এবারেও তনয়ার সাথে দীর্ঘ আলাপ চলল এষার তনয়া পিনপিনে গলায় বলতে চেষ্টা করছিল যে রাতুলকে ওর মত ছেড়ে দে। তোর যেমন কাজ, ওর কাজও গুরুত্বপূর্ণ। নিজে জীবনে কাজই করলিনা, তোর থেকে এই ব্যাপারে কিছু শুনতে চাইনা।
তাহলে আমায় বলছিস কেন? এটাই সহজ উত্তর হওয়া উচিত তনয়ার কিন্তু সহজ কথা বলাটা যে তেমন সহজ কাজ নয় , বিশেষত এষাকে। 


কদিনের এই শব্দ সন্ধানে জয়ী হতেই হবে তনয়ার। একটি ম্যাগাজিনে গল্প প্রতিযোগীতা আছে। সামনেই।
অনলাইন আর নিজের ডায়রি ছাড়া আর কোথাও লেখার কথা কোনদিন ভাবেনি তনয়া। মা এক দু’বার সেগুলো পড়ে বলেছিল ম্যাগাজিনে পাঠা। সাহস হয়নি তনয়ার। এই সাহস ব্যাপারটাই বড্ড কম তার।
নিউট্রিশানে মাস্টার্স করেছিল। নম্বর ভালই ছিল।কলেজের কল্যাণী ম্যাডাম তাকে বড় ভালবাসতেন ।বলতেন, উপচে পড়তে সবাই জানে। নিজেকে গভীরে বিস্তার করতে কজন পারে বল? সবটুকু না দেখিয়ে ফেলতেও জানতে হয়।
তিনিই বলেছিলেন তনয়াকে পার্ট টাইম কাজ শুরু করতে। কলেজে কিম্বা হাসপাতালে। তার নাকি সেন্সটা ভাল।
সেসব করার সুযোগ হয়নি তনয়ার। বিয়েতে বসে গেল তড়িঘড়ি করে। মা বলল এমন পাত্র পাবিনা পরে। দাদার বিয়েতে দেখে ভাল লেগেছে ওদের। দাবী সেরকম নেই। বিয়েটা হলে মা বাবা দাদা সবার ভাল হচ্ছিল। নিজের কতটা উপকার হচ্ছিল না জেনেই এগিয়ে পড়েছিল তনয়া।
কেটেও গেল এত বছর। কত্তা আর দুই মেয়ের নিউট্রিশানিস্ট হয়ে দিব্যি আরামে আছে। আক্ষেপ তেমন কই? মাসে মাসে হাতখরচ পায় বরের থেকে , বাবা মারা যাওয়ার পর তার নামে রেখে যাওয়া টাকা থেকে পায় কিছু সুদ। সবটুকু ব্যাঙ্কে জমা করে। মেয়েদুটো বড় হচ্ছে। যদি ওদের কোনদিন লাগে? হয়ত লাগবে না। বড়লোক বাড়ির নাতনি ওরা। বাবা নামী ডাক্তার। তাও এইটুকু জমিয়ে রাখে তনয়া। আর এমনিতেও সেভাবে আলাদা করে বাজার গিয়ে কিছু খরচ করতে হবে নিজের জন্য মনেই হয়না কখনো ওর।
এই গল্প প্রতিযোগীতায় প্রথম যে বিজয়ী সে পাবে পাঁচ হাজার টাকা। হঠাৎ এই টাকাটার জন্য আশ্চর্য একটা লোভ হয়েছে তনয়ার। অন্তত নিদেনপক্ষে সান্ত্বনা পুরষ্কারের পাঁচশ টাকাটাও যদি পেত !
অনলাইনে এতদিন যা লিখেছে সেগুলো সবই ছোট লেখা। প্রথম এই দীর্ঘাঙ্গী একটা ছোটগল্প লিখতে বেশ ভয় ভয় লাগে। সবচেয়ে মুশকিল হয়েছে চিরকাল সে যা কিছু করেছে তাতে সবসময় কেউ না কেউ তাকে পরামর্শ দিয়েছে। নিজে থেকে কোন সিদ্ধান্ত আজ অবদি তনয়া নেয়নি। ঠিক ভুলের গন্ডিকে বড্ড ভয় করে তার। অন্য একজন পিঠ চাপড়ে যদি বলে এইটা ঠিক হচ্ছে , তবেই এগোতে সাহস করেছে তনয়া। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বড্ড কম। সেজন্যেই হয়ত ছোট থেকে বাড়িতে মা বাবা দাদা আগলে রাখত তাকে। এমনকি কলেজ জীবনেও রেখেছে অনেকটাই। সেভাবে বন্ধুমহলও গড়ে ওঠেনি তাই। কলেজ কেটে সিনেমা আড্ডা কোনটাই না। প্রেম তো অনেক দূরের কথা। এক বন্ধুর দাদা একবার শুধু ফোন নম্বর চেয়েছিল বন্ধুর জন্মদিনে। এমন ঘাবড়ে গেল তনয়া। ছেলেটি লজ্জায় লাল। যেন শ্লীলতাহানি করে ফেলেছে তনয়ার। বন্ধুর মা বাবা এসে ক্ষমা চাওয়ার জোগাড় প্রায়। সেই থেকে আর তেমন পার্টিতেও যেতনা বন্ধুদের বাড়িতে।
বিয়ের পর শুভদীপ সামলায় এখন। মানে তনয়া করছে সবকিছু , তাও একবার করে জানিয়ে নেয় বরকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে। শুভ এমনিতে বুঝদার। শত কাজের মধ্যেও বিরক্তি দেখায় না। তার এই নির্ভরশীল বউটাকে ভালোবাসে ঘন মুহূর্তে গাল টিপে বলে, আমার তো আসলে তিনটে মেয়ে।ওটুকুই আদর। সুখের শীর্ষবিন্দু। তনয়াদের মত মেয়েরা অর্গ্যাজম নিয়ে লড়াই করতে শেখেনি। 
কিন্তু সেই শুভকেও এই প্রতিযোগীতার কথা বলতে পারেনি তনয়া। এমনিতে ওর অনলাইন লেখার কথা জানে শুভ। গাড়িতে আসা যাওয়ার মাঝে পড়ে নেয় টুকটাক। ভাল লাগলে বলে। কিন্তু ওর বেশি কিছু তো নয়। আসলে ওইটাই তো অনেক। প্রভাত ম্যাগাজিনটা মাসে দুবার আসে। 

মন্টি যখন রান্না করতে আসে তখন তনয়া এক কাপ চা নিয়ে মন দিয়ে পড়ে খবরের কাগজ কিম্বা ওই ম্যাগাজিন। ওই কাজের লোকের ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে সব বুঝিয়ে দেওয়া ওর ধাতে নেই। মন্টি অবশ্য বেশ নিজের হয়ে গেছে। বউদিদি একদিন যা বুঝিয়ে দিয়েছিল আজ পাঁচ বছর ধরে সেই মেনেই রান্না করে। অন্য বাড়িতে গিয়েও তনয়ার প্রশংসা করে। এই বাড়িতে তার অধিকার বেশ ভালই। হয়ত কোনদিন তনয়া বলল “আজ পাবদার ঝাল কর। মন্টি বলে, কালকেই তো রসা খেলে বোয়ালের। আজ পাতলা কালোজিরে লঙ্কা ভেঙ্গে ঝোল করে দিচ্ছি।
মন্টি জেনে গেছে তার লেখার কথা। এমনিতে মাধ্যমিক পাশ সে। বাপ মাতালের সাথে বিয়ে দিয়েছিল। মরে হেজে গেছে বরটা। সেই থেকে রান্না করেই দিন কাটায় মন্টি। বুড়ি মা তার সাথে থাকে ভাইরা সব আলাদা। তনয়া মাঝেমাঝে টাইপ করে মোবাইলে। তখন মন্টি জিজ্ঞেস করে – কি কর গো ওতে? চ্যাট? তনয়া হেসে বলে, তুই চ্যাটও জানিস? জিভে তা দেয় মন্টি। তনয়া বলে, না রে। এই বয়েসে আর কে আমার সাথে চ্যাট করবে এত? আমি একটু লিখি। উৎসাহ ভরে জানতে চায় কি লেখ? বলে দেখতে আসে মন্টি। সেই শুরু। আজকাল তো মাঝেমাঝে পড়ে শোনাতেও হয় ওকে। মন্টিই একদিন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির।

সে নাকি ট্রেনে আসতে গিয়ে শুনেছে প্রভাত ম্যাগাজিনে কিসব প্রতিযোগীতা হচ্ছে লেখার। তার সাধ বউদিদিও ওতে লিখবে। হেসেই গড়ায় তনয়া। তারপর দেখে খবরটা সত্যি। আসলে ট্রেনে মোটামুটি একবার আপডাউন করলেই দিনভরের হাইলাইট জানা হয়ে যায়। সেই থেকে মন্টি পেছনে লেগে আছে। তুমি যদি জেত বউদি, সেইদিন আমি বাজার করে খাওয়াব রুইয়ের কালিয়া।
তনয়ারও একটা ইচ্ছে যে হয়নি তা নয়। অবশ্য সেই মন্টিকেও কিচ্ছুটি বলেনি। ভাবছি, দেখছি বলে কাটিয়ে যাচ্ছে। ওর এত উৎসাহ, কিন্তু তনয়া তো সেরকম লিখিয়ে নয়। কিছুই পাবে না প্রাইজ ।বেচারার আশাটা মাটি হবে। তার চেয়ে অংশ না নিলে তবুও এক রকম।

জমা করার সময় এগিয়ে আসছে। পোস্ট করলেও পৌঁছতে বেশ কদিন। ইমেল করা যায়। কিন্তু তনয়া ভেবেছিল প্রথম ম্যাগাজিনে লিখলে হাতেই লিখে দেবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে থিম ভেবে চলে। অক্ষর সাজায়। ভাঙ্গে, ছড়ায় মনমত হয় না কিছুতেই।লেখা আসলে স্রোতস্বিনী। নিজের মত বইতে না দিয়ে তাকে নিষেধের জালে আটকে ফেললে মুশকিল।
একবার ভেবেছিল এষাকে জানাবে সবটা। কি আর হবে, এষা তো শোনেনা তেমন করে ওর কথা। নয়তো ধমক দেয়। তাও অন্তত একজনকে জানানো হত। অনেক কাটাকুটি খেলা সাঙ্গ করে কাগজ আর মনের সাথে। একদিন অবশেষে কুরিয়ারে জমা করিয়ে আসে তনয়া। মন্টিকেও বলেনি চাওয়া পাওয়ার ঢেউ মরে এসেছে এখন তনয়ার। অনেকটাই লেখার তৃপ্তি থেকেই লেখা।প্রতিযোগীতার বিষয় ছিল প্রাপ্তি। তনয়ার মত একজন স্বল্প প্রাপ্তির ঝুলির মালকিনের জন্য সত্যি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এটা। তারপর সেই তাবিজের মত হাত থেকে খসে পড়া দিনগুলো পেরিয়েছে এক এক করে।

একদিন প্রতিযোগীতার ফলাফল। ছুঁড়ে দিয়ে গেছে ম্যাগাজিনটা বারান্দায় , কাগজের ছেলেটা যেমন দেয়। মন্টি ছিল রান্নাঘরে। একদৌড়ে গিয়ে তুলে এনেছে। তুমি তো নাম দিলেনা, দেখো কত্ত লোক প্রাইজ পেল। তুমিও পেতে। মৃদু হেসে তনয়াও খুলে দেখে একবার পুরষ্কারের পাতাটা। এষা সান্যাল। তৃতীয় পুরস্কার। বুকটা ধক করে ওঠে তনয়ার। একটা স্থির কম্পন। হেসে মন্টিকে বলে, আমার স্কুলের বন্ধু থার্ড হয়েছে দেখ। মন্টি গদগদ হয়ে আসে। তুমি দিলে ফার্স্ট হতে। বউদিদি তার বড্ড প্রিয়। দিন দুই কেটে গেছে ঘটনার। হঠাৎ মাঝরাতে একদিন এষার ফোন। ধড়ফড় করে জেগে বসে তনয়া। শুভর ঘুম না ভাঙিয়ে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় ফোন হাতে। প্রভাত দেখেছিস এইবারের? রক্ত চলকে যায় তনয়ার।

এষা পড়ে নাকি এইসব? তনয়া ভাবতে থাকে। ওটা সত্যি তুই? অভিনন্দন তোকে অনেক। মাই ফোট ব্যঙ্গ করছিস আমায়? তুই জানিস না ওটা আমি কিনা? আমি কি করে জানব বল? তুই তো অনেকদিন বাংলা লেখা থেকে দূরে। বিদেশে থাকিস। সমনামী কেউ হতেই পারত। জানতে চাসনি তো সেটা আমি কিনা। কারণ উত্তর তোর জানা। আমার আঠেরোর জন্মদিনে গল্পটা আমায় কে লিখে দিয়েছিল আমি কিন্তু ভুলিনি। আমার কাছে ওটা এখনো রাখা আছে যত্ন করে।

ঝুলপড়া মশলার কৌটোর মত থমকে আছে তনয়া। সে ভাবতেই পারেনি আজ এতদিন পর ওই গল্পের কথা মনে থাকবে এষার। সেটাকেই তো ঘসেমেজে এষার নামে জমা করেছিল তনয়া। লেখাও হল, আবার নিজের নামে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বোঝাও রইলনা। তোর ওইসব বোগাস ম্যাগাজিন আমি পড়িনা বুঝলি? নেহাত মা আমার নামটা দেখে আমায় মেসেজ করল একটু আগে। আমায় এভাবে অপমান করার অধিকার কে দিয়েছে তোকে?
আমি সেভাবে ভাবিনি এষা। বিশ্বাস কর। ভেবেছিলাম তোকে দিয়েছি যেটা একদিন, তাতে তোরই অধিকার। মনোনীত না হলে তো হারিয়েই গেল। আর যদি বাই চান্স জিত হয় তবে সে জয় তোর। প্রাপ্তির গল্প যে তোকেই মানায়। আমি তো নিস্ফলের, হতাশের দলের লোক।
গলা ধরে আসে তনয়ার। তোর মত বোকার সাথে এইজন্যেই তো বন্ধুত্ব করেছিলাম। ইকনমিক্সের ছাত্রী আমি, লাভ লোকসান মেপে চলি বুঝেছিস! এষা বলে। গল্পটা এখনো রেখে দিয়েছিস কেন? তোর মনে নেই ভেবেই আমি…। তনয়া খেই হারায়।

আমার ভীষণ স্বাধীন মডার্ণ জীবনে তুই একটা পুরনো মেহগনি পালঙ্ক রে, তনয়া স্থির, অচল, নির্বাক সব অবহেলা, অযত্ন সয়ে নিস। কিন্তু ছুটে ক্লান্ত হয়ে গেলে ওতেই আমি ঘুমোতে পারি নিশ্চিন্তে চিরটাকাল।
বন্ধুতা দোল খায় দুটি নারীমন জুড়ে। তনয়ার বুকে উজ্জ্বল হয়ে এক জোনাকরাত্রি নেমে আসে। ফোনের ওপাশে এষার ভিনদেশি দিন জুড়ে ঝিকিমিকি সুখ।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত