শুভ জন্মদিন হাজার চুরাশির মা

Reading Time: 7 minutes

‘ যে মাটিতে নারীর চোখের জল পরে
সেই মাটি বন্ধ্যা হয়ে যায় ‘

-মহাশ্বেতা দেবী

মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যের একটি দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন বিষয়ের বহুমাত্রিকতা এবং দেশজ আখ্যানের অনুসন্ধান ক’রে। তার সেই খুঁজে ফেরা আখ্যানে তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছেন ব্যতিক্রমী জনপদের সাহিত্য। যে সাহিত্য কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল মাত্র সাহিত্য হয়ে থাকে নি, হয়ে উঠেছে ইতিহাস ।

তিনি ইতিহাস থেকে, রাজনীতি থেকে যে সাহিত্য রচনা শুরু করেন, তা শোষিতের আখ্যান নয় বরং স্বদেশীয় প্রতিবাদী চরিত্রের সন্নিবেশ বলা যায়। প্রতিবাদী জীবন ও সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ঘরানার লেখক তিনি। সামাজিক দায়বোধ থেকেই তিনি তাঁর সেই উপেক্ষিত ইতিহাসের নায়কদের তুলে আনেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের ভূমিকায় বলেছিলেন—

লেখক হিশাবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিশাবে, একজন বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের সমস্ত দায় দায়িত্ব বহনে আমরা সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব অস্বীকারের অপরাধ সমাজ কখনোই ক্ষমা করে না। আমার বিরসা-কেন্দ্রিক উপন্যাস সে অঙ্গীকারেরই ফলশ্রুতি।

মহাশ্বেতা দেবী তাঁর চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর উপন্যাসে ব্রিটিশ আমলের এক মুন্ডা হেডম্যান পহানকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন? সে সময় বিহার রাজ্যের ছোট লাটসাহেব রনাল্ডসনের ভাই মুন্ডাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। ইংরেজ লোকটি মুন্ডা আদিবাসী গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে আদিবাসী নারী-পুরুষের সঙ্গে ফটো তুলছিলেন এবং আদিবাসীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছিলেন, গ্রাম্য মেয়েদের সঙ্গে হাসি-তামাশায় মেতে উঠেছিলেন। এই দেখে অবাক হয়ে ওই মুন্ডা হেডম্যান পহান তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?’

তিনি লিখেছেন, ‘আমি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছি, সাধারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করে।… আমার লেখালেখির কারণ ও অনুপ্রেরণা সেই মানুষগুলি, যারা সতত শোষিত এবং ব্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও হারকে মেনে নেয়নি কখনও। ’ শুধু লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর সমাজবদলের ভাবনা। কাজ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের লোধা ও শবর উপজাতিদের নিয়ে। মেয়েদের হয়ে কথা বলেছেন বারবার, সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর হয়ে বলার জন্যই যেন কলম তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

১৯২৬ সালের ১৪ই জানুয়ারি ঢাকা শহরে মহাশ্বেতা দেবী জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মণীষ ঘটক ছিলেন কল্লোল সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত খ্যাতনামা কবি ও ঔপন্যাসিক ও মা ধরিত্রী দেবী ছিলেন লেখক ও সমাজকর্মী। মহাশ্বেতা দেবীর কাকা ঋত্বিক ঘটক একজন ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্র পরিচালক ও মামা বাড়ির দিকে মামা শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভাস্কর এবং শচীন চৌধুরী ছিলেন দি ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি অফ ইন্ডিয়া পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক।

মহাশ্বেতা দেবী সম্পর্কে ১৯৯৭ সালে শঙ্খ ঘোষ লিখেন – ‘…আমাদের ভব্যসমাজের সেই গণ্ডিটাকে উড়িয়ে দিতে চাওয়াটাই হলো মহাশ্বেতাদির ব্যক্তিজীবনের আর রচনাজীবনের সবচেয়ে বড়ো কাজ।… ‘মহাশ্বেতাদির মতো সত্যভাবে কেউই আমরা বলতে পারি না যে সমস্ত কিছু পিছুটান ভাসিয়ে দিয়ে সেই নিচুতলারই সহপথিক আমার জীবন। সাহিত্যজগতে সে-কথা বলতে পারেন ওই একজন, ভব্যসমাজের রীতি-না-মানা ওই একজন, বলতে পারেন যে তিনি ‘বর্ণ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের নিপীড়িত দুঃখী সংগ্রামী মানুষের আপনজন।… আমাদের সাহিত্য সমাজে এই একজন আছেন, সত্য অর্থে যাঁকে যে কোনো অঞ্চলে অভ্যর্থনা জানানো যায় ।শুধু পণ্ডিতজনের সেমিনার ঘরে নয় – অবোধজনের পথে পথে মাদল বাজিয়ে।’

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘লেখক’ শব্দটির সংজ্ঞা আরও বৃহৎ করে দিয়ে গেলেন মহাশ্বেতা দেবী।

১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট নাট্যকার এবং কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসার জীবন ছিল দারিদ্র্যে পরিবেষ্টিত—এ সময় মহাশ্বেতা দেবী রঙ সাবান, রঙের গুঁড় ফেরি করেন, ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্য়ের জন্ম হয়। তাদের সংসার জীবন পনের বছরের বেশি টেকে নি। তবে মহাশ্বেতা দেবী নিজেই পরবর্তীতে বিজয় ভট্টাচার্য সম্পর্কে বলেন—

Bijan has shaped my talent and given it permanent form. He has made me into what I am today.

সাহিত্যযাত্রার এই মোড়ে একদিনে এসে দাঁড়াননি মহাশ্বেতা। তার পিছনে ছিল দীর্ঘ পরিক্রমা। ’৪৬-এ বিশ্বভারতী থেকে ইংরেজির স্নাতক। এমএ পাশ করে বিজয়গড়ে জ্যোতিষ রায় কলেজে পড়ানো। তার আগে ১৯৩৯ সাল থেকেই ‘রংমশাল’ কাগজে ছোটদের জন্য লেখালেখি শুরু। স্বাধীনতার বছরে ‘নবান্নে’র রূপকার বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিয়ে। সে সময়টা কখনও সংসার চালাচ্ছেন টিউশনি করে, কখনও সাবানগুঁড়ো বিক্রি করে। মাঝে এক বার আমেরিকায় বাঁদর চালান দেওয়ার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন, সফল হয়ে উঠতে পারেননি। ১৯৬২’তে বিবাহবিচ্ছেদ, পরে অসিত গুপ্তের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহ। ১৯৭৬ সালে সেই দাম্পত্যেরও অবসান ঘটে।

ইতিমধ্যে, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি একমাত্র পুত্র নবারুণকে বাবার কাছে রেখে, চেয়েচিন্তে একটা ক্যামেরা জোগাড় করে উঠে পড়েছিলেন আগরার ট্রেনে। তন্নতন্ন করে রানির কেল্লা, মহালক্ষ্মী মন্দিরে ঘুরলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে টাঙাওয়ালা, কাঠকুটোর আগুন ঘিরে বসা কিষাণ মেয়েদের থেকে গল্প শুনলেন, ‘রানি মরেনননি। বুন্দেলখণ্ডের মাটি আর পাহাড় আজও ওঁকে লুকিয়ে রেখেছে।’

তাঁর একটি বিখ্যাত গল্প ‘স্তনদায়িনী ও অন্যান্য গল্প।’ এখানে দেখানো হয়েছে এক মহিলা শিশুদের স্তন্যপান করান। এই স্তন্যপান করানোই ছিল মহিলাটির পেশা। কিন্তু একদিন কৌটোর দুধ এসে বাজার ছেয়ে নেয়। মহিলাটি পেশাহারা হয়ে পড়েন। এবং শেষ জীবনে মহিলাটির ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়। এমনই আরও অনেক মর্মস্পর্শী গল্প লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

২০০৮ সালে সেলিনা হোসেনের সম্পাদনা দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী গল্প শিরোনামে একটি গ্রন্থ বের হয়। এই সংকলনে মহাশ্বেতা দেবীর যে গল্পটি ছিল, তার নাম রুদালী। এই গল্পটি চলচ্চিত্র হয়েছে। গল্পটি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিষয়ের নতুনত্ব আমাকে বিস্মিত করেছিল।

রুদালী বাংলা শব্দ নয়। সে জন্য আমাদের অভিধানে নেই। এই শব্দের ব্যাখ্যা হলো, এরা টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা নারী। এদের মৃত বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করতে হয়। বিনিময়ে টাকা পায়। এই নারীরা মূলত রাজস্থানের নিম্নবর্গের বিভিন্ন গোত্রের। এভাবে কাঁদানোর রীতি রাজস্থানের সংস্কৃতির অংশ। স্বরোচিষের কাছ থেকে রুদালীদের চিনতে পেরে মহাশ্বেতা দেবীর সৃজনের মাত্রা আমাকে আচ্ছন্ন করে।

গল্পের নায়িকার নাম শনিচরী। নিজের কেউ মারা গেলে শনিচরী কান্নার সময় পায় না। মৃতের সত্কারের জন্য নানা কাজ করতে হয়। বর্ণনা এমন : শাশুড়ি মরলে শনিচরী কাঁদেনি। ওর বর আর ভাশুরশাশুড়ির দুই ছেলেকেই হাজতে পুরেছিল৷ মালিক-মহাজন-রামাবতার সিং। বুড়িকে দাহ করার ব্যবস্থা করতে শনিচরী এত ব্যস্ত ছিল যে কাঁদার সময় হয়নি। হয়নি তো হয়নি! বুড়ি যে জ্বালান জ্বালিয়ে গেছে, কাঁদলেও তো শনিচরীর আঁচল ভিজত না। এরপর মারা গেল শনিচরীর ভাশুর আর জা। তখনো কাঁদা হলো না শনিচরীরকাঁদবে, না লাশ জ্বালাবার, সস্তায় শ্রাদ্ধ সারবার কথা ভাববে? শনিচরীর জীবন তো এভাবেই কাটে।

কারণ ওকে কাঁদতে হবে মৃত বাড়িতে গিয়ে। টাকা আয় করতে হবে।

স্বামীর মৃত্যুতেও কাঁদা হলো না শনিচরীর। একমাত্র ছেলে বুধুয়াকে নিয়ে রান্ডি হলো। ঘটনা দাঁড়াল এমন যে মোহনলালকে তুষ্ট করতে, রামাবতারের কাছে পাঁচ বছর ক্ষেত-বেগারি খেটে ৫০ টাকা শোধ করবখতে টিপসই দিয়ে কুড়ি টাকা নিতে, সে টাকায় বুধুয়ার বাপের শ্রাদ্ধ করতে, শ্রাদ্ধ মেটাতে কচি ছেলে নিয়ে হা-ভাত! জো ভাত! করতে করতে এমন ব্যস্ত থাকে শনিচরী যে বুধুয়ার বাপের জন্য আর কাঁদা হয়নি।

এক বছর পর খত দিয়ে টাকা নেওয়ার দায় শোধ করার জন্য দিনমজুরির সময় শনিচরী অন্য মজুরদের বলল, আজ আমি বুধুয়ার বাপের জন্য কাঁদব। বুক ফাটিয়ে কাঁদব।

অন্য মজুররা অবাক হলো। এত দিন পরে কাঁদবে কেন শনিচরী? তাও আবার বুক ফাটিয়ে কান্না? ওদের জিজ্ঞাসার উত্তরে শনিচরী বলল, তোরা মজুরি নিয়ে ঘর যাবি। আমি খত লিখে বসে আছি। আমি যাব চারটি ভুট্টার ছাতু নিয়ে। তাই কাঁদব। আমার কান্না পায় না?

মৃত স্বামীর জন্য নয়, কাঁদতে হয় ভাতের জন্য। এভাবেই নিম্নবর্গের মানুষের জীবন চিত্রিত হয়েছে মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে। এরপর ছেলে বুধুয়া মারা গেছে, এখনো কাঁদতে পারেনি শনিচরী। শুধু দুই চোখ ভরে তাকিয়ে দেখল খিদের জ্বালায় বুধুয়ার বউ ঘর ছেড়ে গেল। যে পুরুষদের ও ভাই ডেকেছিল তারা ওকে রান্ডি ছাড়া আর কিছু ভাবেনি। এসব নিয়ে শনিচরীর ভাবনা ভাঙিয়ে দিয়ে অন্যরা বলল, অত পাপ-পুণ্য দেখাতে চাস না বুধুয়ার মা। পাপ-পুণ্য মালিকদের এখতিয়ারের জিনিস। ওরাই সে হিসাব ভালো বোঝে। তুই-আমি বুঝি খিদের হিসাব। শেষ পর্যন্ত শনিচরী কাঁদতে গেল গম্ভীরা সিংয়ের মৃত্যুর পরে। তার আগে ওকে অনেক রান্ডি জোগাড় করতে হলো। বেশ্যাপাড়ায় গিয়ে হাজির হলো ও। বিধবাদের জড়ো করলে যুবতী বেশ্যারা বলল, আমরা যাব না? শনিচরী পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, সবাই চল। বুড়ো হলে এ কাজ তো করতে হবে, আমি থাকতে থাকতে তোদের হাতেখড়ি করে দিই।

গল্পের শেষে দেখা যাচ্ছে, পেটফোলা লাশ ঘিরে রুদালী রান্ডিরা মাথা কুটে কাঁদতে লাগল। মাথা কুটে কাঁদলে পাওয়া যায় ২০০ টাকা। গল্পের শেষ হলো শনিচরীর কান্না দিয়ে।

এ এক অসাধারণ গল্প। অন্যদিকে নিম্নবর্গের মানুষের ভাতের কান্না প্রিয়জনের মৃত্যু শোকের চেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে। এও এক কঠিন সত্য। জীবনের এই অনুচ্চারিত দিক সাহিত্যে এনেছিলেন তিনি। তাই তাঁকে স্মরণে রাখা মৃত্যুরও অধিক।

হাজার চুরাশির মা, তিতুমীর, অরণ্যের অধিকারের মতো উপন্যাসগুলোর জন্য বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মহাশ্বেতা দেবী। যদিও আমরা তাকে তার সাহিত্যে মনে রাখতে চাই কিন্তু তিনি ছিলেন একজন মানবাধিকার কর্মী এবং বামপন্থী রাজনীতির সাথে সংপৃক্ত। আর তার এই পরিচয় ফুটে উঠে তার লেখায়।

পাঁকাল হচ্ছে একটি মাছের নাম। এই মাছের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটির বসবাস কাদায় কিন্তু তথাপি এর গায়ে কাদা লাগে না কারণ এর পিচ্ছিল দেহ। মহাশ্বেতা দেবীর এই পাঁকাল বইটি দুইটি বড় গল্পের সংকলন। প্রথম গল্পটিতে আমরা দেখতে পাই, গ্রামের মেয়েদের চরণদাসী হবার গল্প। পুরোহিতেরা গরীবগুবো মেয়ের জোর করে দেবতার বউ বানাচ্ছে তাদের দিয়ে দেহের কামনা মিটাচ্ছে এবং একটা সময় বাধ্য হচ্ছে অন্যের দেহের লালসা মেটাতে। শুধু তাই নয় আমরা দেখতে পাই মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা তেজারতির কারবার। আবার এর বিপরীতে দেখতে প্রতিবাদমুখর একটি চরিত্র । যে, ধনীদের বিরুদ্ধে লড়ছে, শ্রমিক মজুরদের হকের জন্য লড়ছে আবার একই সাথে চরণদাসী প্রথারও বিলুপ্তির জন্য কাজ করছে। গল্পের এই চরিত্রটি যেনো মহাশ্বেতা দেবীরই প্রতিরূপ। একজন বামপন্থী নেতা এবং একই সাথে মানবাধিকার কর্মীর সাফল্যের গল্প ।

বইটির দ্বিতীয় গল্পেও লেখিকা মন্দির ব্যবসার মূল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন ফাঁকিগুলো । গল্পের মূল চরিত্র সুদান সংসারের দুঃখ কষ্ট সবকিছু ভুলে থাকতে চায় সে। তার মনে বেজে ওঠে সংসারে বেঁচে থাকতে হলে হতে হবে পাঁকাল মাছ। এতে সংসারের দুঃখ কষ্ট সবকিছুর উর্ধ্বে চলে যায় মানুষ। কিন্তু সুদান পারে না। সে স্বপ্ন দেখে সুন্দর একটা পরিবারের যেখানে তার পরিবার ভরপেট খেতে পাবে। মেয়েদের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে। কিন্তু সেই জোতদারের জন্য কিছুই হয় না সুদানের। জীবন উলটপালট হয়ে যায় তার। তারপর একদিন প্রতিশোধ নেয় সে । এই গল্পেও আমরা অনুরূপ একটি প্রতিবাদী চরিত্র পাই। যে একই সাথে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত এবং সুদানের মতো মানুষের ভালোবাসে।

দুটি গল্পতেই মহাশ্বেতা দেবী নিজেকে চিত্রিত করেছেন অক্ষরে সাজিয়ে । আবার একই সাথে চিত্রিত করেছেন আমাদের ধর্মীয়ানুভূতিতে অন্ধত্বের দিকগুলো । যেভাবে লেখিকা ধর্ম ব্যবসায়ীদের একহাত নিয়েছেন তাতে সত্যিই অবাক হতে হয় ।

ঝাঁসির রানী’ উপন্যাস ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে বেরোল এবং একা একা ঘুরে বেড়িয়ে লেখার উপাদান সংগ্রহ করার বিপ্লবিয়ানায় মহাশ্বেতা তাঁর পূর্বসুরি লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণাদের থেকে বেশ খানিকটা আলাদা হয়ে গেলেন। আলাদা হয়ে গেলেন তাঁর অকুণ্ঠ রাজনৈতিক উচ্চারণেও। ‘অগ্নিগর্ভ’ উপন্যাসের সেই মোক্ষম লাইন: ‘জাতিভেদের সমস্যা ঘুচল না। তৃষ্ণার জল ও ক্ষুধার অন্ন হয়ে রইল রূপকথা। তবু কত দল, কত আদর্শ, সবাই সবাইকে বলে কমরেড।’ কমরেডরা তো কোনও দিনই ‘রুদালি’, ‘মার্ডারারের মা’-এর সমস্যা দেখেননি। ‘চোলি কে পিছে’ গল্পের স্তনহীন নায়িকা যে ভাবে ‘লক আপে গ্যাংরেপ… ঠেকেদার গাহক করে, গানা বাজায়’ বলে চেঁচাতে থাকে, পাঠকেরও কানে তালা লাগে।

মহাশ্বেতা দেবীর মত প্রাণবন্ত মানুষের মৃত্যু নেই। যতদিন জীবন ও সমাজের জন্য একটি মানুষের লড়াই জারি থাকবে, ততদিন মহাশ্বেতা শক্তবাঁধনে থাকবেন সংগ্রামী মানুষের বাজুবন্ধে।সর্বভারতীয় সাহিত্য এবং সমাজ এই দুই ক্ষেত্রে মহাশ্বেতা দেবীর মত সমান গ্রহণযোগ্যতা অন্য কোন বাঙালির আছে বা ছিল বলে আমার জানা নেই।

ভরা বর্ষায় মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল, দাম্পত্য কত কীই না হারিয়ে ফেলে। কিছু কিছু বিদায়ে মানুষের মন চিরকালীন শূন্য হয়ে পড়ে। মাথার ওপর থেকে ছায়া সরে গেলে যেমন হয়। বাংলার মানবতাবাদ, সাহিত্য মহাশ্বেতা দেবীকে বহু অংশে ঘিরে ছিল। তাঁর বিদায়ে মনের অনেক গভীরে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরী করেছে। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

শুভ জন্মদিন হাজার চুরাশির মা

মহাশ্বেতা দেবী। একজন লড়াকু মানুষের নাম। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, নারী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ ও মানবাধিকার কর্মী। যিনি লেখনীর মধ্যদিয়ে জাগিয়ে তুলেছেন হাজারো ছাত্র-তরুণকে। যতদিন মানবসভ্যতা টিকে থাকবে ততদিন তাঁর লেখনী, লড়াইয়ের হাতিয়ার হিশেবে কাজ করে যাবে এই সমাজে।

একটা সময় ছিল হাজার চুরাশির মা, অগ্নিগর্ভ, অরণ্যের অধিকার যেন আমাদের আবেগের প্রতিধ্বনি। এরকম জনশ্রুতি তৈরি হয়েছিল যে, ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাস মহাশ্বেতা দেবীর জীবনের বাস্তব উপাখ্যান। তাঁর নিজের নিহত ছেলেকে নিয়েই এই উপন্যাস। পরে জেনেছিলাম এটা আবেগ তাড়িত কথা। তবে আমার আজও মনে হয়, বিপ্লবের জন্য জীবন দানে ‘ব্রতী’র মতো সাহসীদের সকলেরই মা হয়ে উঠেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>