manage বা নিয়ন্ত্রণ

manage বা নিয়ন্ত্রণ- এই শব্দের পিতা ইতালির managgiare.এক কথায় নিয়ন্ত্রণ। এই পথরেখা ধরে চললে, সবার আগে, অর্থাৎ সংসার,সমাজ,রাজ্য,দেশ ও বিদেশকে ম্যানেজ করবার আগে নিজেকে ম্যানেজ করতে জানতে হবে। যেমন, প্রতিটি সংসার থেকে রাজ্য, দেশ, এমন কি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থার ভেতরে অবস্থিত ছোটো ছোটো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও একজন করে ‘ আমি ‘ থাকে। এই আমি’র অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বজনীনতার বিপরীত! অর্থাৎ যেমন, কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার সময় দলের সর্বময় কর্তৃত্বকে, দলের অন্য কারোর কাছেই জবাবদিহি বা সম্মিলিত বৈঠক করতে হয়না, ঠিক তেমন একক সিদ্ধান্ত নেবার ফলে, আপন মস্তিষ্কপ্রসূত সিদ্ধান্তের জন্য অনেক সময়ই বড় রকমের ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই  নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়ন্ত্রণ এক অনুপুরক যুগপৎ অমিশ্রিত শব্দ যুগল ।এখনকার সময়ে বড় এবং মস্ত বড় কথা হোলো ম্যানেজ! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আপনি বা যে কেউ নিজেকে ম্যানেজ বা নিয়ন্ত্রণ করবেন কি করে!এই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ভারতীয় যৌথ ব্যাবস্থার একটি চালচিত্র তুলে ধরি।ধরুন, আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর, কিম্বা দেশ স্বাধীন হওয়ারও অনেক আগে, একটি পরিবার মানে অন্তত তিনটে ছেলে দুটি মেয়ে, বৃদ্ধ পিতামাতা সহ অপেক্ষাকৃত দৈন অবস্থায় থাকা কোনও না কোনও স্বজন সহ এক ছাদের নীচে বহু অবস্থান। এমতাবস্থায় কমবেশি রোজগার থাকলেও বাড়ির কর্তাব্যক্তির ম্যানেজ বা নিয়ন্ত্রণই ছিলো সেই সংসারটির রক্ষাকবজ। অসম্ভব দুর্দিনেও বিচক্ষণতার তীক্ষ্ণতায় সংসারের গাড়ির চাকা এক থেকে ত্রিশ তারিখ পর্যন্ত দিব্যিই চলে যেতো। এক্ষেত্রে কর্তা বা বাড়ির প্রধানের এমন একটি বিশেষ গুন ছিলো, যার ফলে তিনি নিয়ন্ত্রণ বা কন্ট্রোল অথবা ম্যানেজ, যে শব্দই হোক না কেন, তিনি তার নিজস্ব এবং অর্জিত বুদ্ধিমত্তার কৌশলে কেবল বৃহৎ একটি  সংসারকেই রক্ষা করতেন না, সবার আগে তিনি নিজেকেই ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন, অথবা এইভাবে বললে, বলা যায়- আজকের সর্ব বিষয়ে ম্যানেজমেন্টের রমরমা ছবি দেখা গেলেও সেইসময়ে সেই বাড়িটির সেই কর্তাব্যক্তিটিই কিন্তু আজকের সময়ের নিরিখে একজন ম্যানেজমেন্টের টপ বস !!আসলে ম্যানেজ বা নিয়ন্ত্রণ – ব্যাক্তির একটি বিশেষ ব্যাক্তিত্ব, যা নিজেকেই গড়তে হয়। আমাদের দেশে একটি প্রবাদ আছে।
” শিব ঠাকুরের আপন দেশে
আইনগুলো সর্বনেশে”…
চৌকাঠে দাঁড়িয়ো না।বাবার ঋন হবে। অথচ চৌকাঠে দাঁড়ালে অপর ব্যাক্তির, ঘরে প্রবেশ- প্রস্থানে যে বাঁধা সৃষ্টি হয়, তা, না বলে বলা হোলো – “চৌকাঠে দাঁড়িয়ো না। বাবার ঋন হবে।” এই যে ভীতি প্রদর্শন করিয়ে দিয়ে যুক্তির থেকে অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়া, একে এমনভাবে বললেই বোধহয় সমীচীন হবে যে, সংখ্যাগুরু হিন্দুদের রাষ্ট্রচেতনার শুরুর লগ্ন থেকে ভীতি বা ভয়এর প্রদর্শন, যা কি না, জাতির নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবার থেকে বিরত করে দিয়ে এক ধরনের ক্লীবতার কাছে সমর্পিত করে ফেলেছে। অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না !গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় – সাংখ্য যোগে সঞ্জয়এর দূরদর্শিত চোখে অর্জুনের অসহায় অবস্থার বর্ণনাকালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন-
” এই ঘোর দুঃসময় হেন মোহ ভার।
কেমনে গ্রাসিল দেখি হৃদয় তোমার।।
না হও ব্যাথিত সখা তুমি এ সময়।
ছিঃ ছিঃ হেন অবসাদ সাজে না তোমায়।।
ত্যাগ করি ক্লৈবভাব ওঠো ধনঞ্জয়।
হেন অধীরতা সখা তব যোগ্য নয়।।  ”
গীতার এই বাংলা তর্জমায় স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যদি সংসার তথা পৃথিবীর রক্ষাকর্তা হন, তবে তাঁর মুখাশ্রিত এই অমৃতময় বাণী থেকে অন্তত এটুকু বোঝা গেলো, এমন নানাবিধ যুক্তির জালে শ্রীকৃষ্ণ ধনুর্ধর অর্জুনকে বেঁধে ফেলতে পেরেছিলেন বলেই, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দুষ্ঠের দমন সম্ভব হয়ে একধরনের ক্লীবত্ব থেকে ভারতবর্ষ মুক্তি পেয়েছিলো। এটাই ম্যানেজ।

 ম্যানেজ, একটা দীর্ঘ চর্চাও বটে। এই ক্ষেত্রে যিনি চর্চা করেন, তিনি নিজেই কর্তা। আর যিনি চর্চিত হন, তিনি একাধারে কর্মফল ও অপরদিকে এক অদম্য সমাপিকা ক্রিয়ারই অঙ্গ, যা থেকে ক্লীবত্ব প্রাপ্ত নাগরিক সমাজ একটি সুষ্ঠু যুক্তিবাদী মননশীলতার সাথে নিজেদেরকে জুড়তে পারেন, নিজেদের বৌদ্ধিক আত্মার বিকাশ ঘটাতে পারেন।

আমরা শিখি কতটুকু?  ঠিক ততটুকুই, যতটুকু প্রশ্ন করা হবে, ততটুকুই!  বিষয়ের গাম্ভীর্যের সঙ্গে তাল মেলাতে যাওয়া মানে, সময়এর অপচয়, এমন যুক্তি আজকের সময়ে অহরহ শোনা যায়। ফলে ‘চৌকাঠে দাঁড়িয়ো না। বাবার ঋন হবে, ‘ এমন অযৌক্তিকতার বেড়াজালে আজও আমরা আঁটকে থাকলাম। শুধু তাই-ই নয়, চন্দ্রযান২ কে পাঠিয়ে ল্যান্ডার বিক্রমের সঠিক অবতরণের জন্য ইসরো’র চেয়ারম্যানকে সারা দুনিয়া দেখলো, একটি মন্দির থেকে পুজো দিয়ে বেরোচ্ছেন। এ কোন দেশ, যে দেশে একটি বিশেষ ধর্মের ধর্মীয়গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথনে দৃঢ় চরিত্র নির্মাণের আশ্চর্য একটি গীতিমালিকা তৈরি হয়েছিলো, যা মনের নিয়ামকও বটে!  আবার সেই দেশই যখন বিজ্ঞানের চরম উন্নতির শিখরে  যেসমস্ত বিজ্ঞানীদের গবেষণার দ্বারা পৌঁছোচ্ছে, তারাই আবার ধর্মস্থানগামী হচ্ছে – কেন? না কি, চন্দ্রযান২ প্রেরিত ল্যান্ডার বিক্রমকে যেন দেবতা সঠিকভাবে অবতরণ করিয়ে দেয়। একটা দোদুল্যমানতা, যা আসলে ফেলিওরিটির নামান্তর।
আমাদের দেশের এই দোদুল্যমানতা,  এই দোলাচলটা, এসেছে সমাজ থেকে। যেমন ভয় বা প্যানিক। ধরুন ঠাকুরদেবতার দেশ এই ভারতবর্ষ। নানা জাতির দেশও বটে! বিপদ ঘটলে মন্দিরে অথবা সত্যপীরএর দরগার প্রার্থনার করজোড়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরালও হবে ! অথচ আমার এক বন্ধু, যে উচ্চ চাকুরির জন্য বিদেশে থাকে, সে একবার দেশে ফিরে এসে একটা গল্প করেছিলো। যেভাবে বন্ধু আমাকে কথাগুলো বলেছিলো – ” জানিস, একজন কোরিয়ান মেয়ের সাথে আলাপ হয়েছিলো। বললাম, তুমি গডকে ডাকো? উত্তর দিলো – না। কোনো বিপদে পড়লে? ও নির্বিকারভাবে উত্তর দিলো – না। তুমি টেম্পলে যাও?  মেয়েটি বললো – মাএর সাথে বৌদ্ধবিহারে যাই। এরপরে প্রশ্ন রেখেছিলাম – এমন কোনো দিন হয়েছে, যে, বিপদে পড়েছো আর এমন সময় গডকে ডাকলে !  সপ্রতিভ মেয়েটি উত্তর দিয়েছিলো –  না। এমন হলে মোবাইল অন করে কাছাকাছি বন্ধুদেরকে ডাকবো।
কি শিক্ষা!  এই না হলে পাশ্চাত্য শিক্ষা  !!
আমি ভেবেছি বহুদিন আমার বন্ধুর বলা, তার আলাপচারিতার বিষয় নিয়ে। আমাদের দেশের শিশুদের জন্য এই শিক্ষারই তো প্রয়োজন, যা সৌভাতৃত্ববোধ, সাম্য, অহিংসা, কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিয়ে তাদেরকে ভবিষ্যতের ম্যানেজমেন্টের তুখোর যুক্তিবাদী মননশীলতার চর্চাকারী করে তুলবে।
গৌতম বুদ্ধ বলেছেন —
[ মানুষের জীবনে দুঃখ আছে।
দুঃখের পিছনে কারণ আছে।
দুঃখ নিরসনের উপায়ও আছে।
দুঃখ নিবারনের পথও আছে। ]

কিভাবে ব্যাক্তিত্বের বিকাশ ঘটবে। কি উপায়ে ব্যাক্তি তার চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাদশাহ থেকে সাধারণ্যে – এক হতে পারবে ? গৌতম বুদ্ধের কথায় — “কোন পথে গেলে মানুষের দুঃখ নিরসনের উপায় বের হবে?”

যৌথপরিবারে বেড়ে ওঠায় অনেক ছোটো ছোটো মনিমুক্তসম কথা মনের পর্দায় এসে ভীড় করে। যেমন, ঠাকুমা বলতেন – সন্ধ্যা নামলে খেলার মাঠ থেকে ফিরে হাত- পা ধুয়ে সম্পূর্ণ  একা, তারাফোটা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সারাদিনের কাজের খতিয়ান তারাদের দিকে তাকিয়ে বলবে। তারাগুলো, ‘তারা’ নয় ! পিতৃপুরুষেরা বংশানুক্রমিকভাবে তারা হয়ে গেছে। ( পরে বুঝেছি, আসলে প্রতিটি তারাই কল্পলোকে বাস করা এক একটি বংশানুক্রমিকভাবে নক্ষত্র বা স্টার! যারা অনুজদের কাছে দূর থেকে আলো বা জ্ঞান প্রদান করবার জন্য উদাহরণ হয়ে আছেন !) সত্য যা, তাও ! আবার মিথ্যেটাও বলবে। কেন মিথ্যে, কেন অন্যায়, এ বিষয়ে আত্মসমর্পণ করবে। নিজের কান নিজে ধরে আত্মসমালোচনা করবে। ভবিষ্যতে আর একাজ যেন না হয়, তার জন্য বর্তমানকালেই নিজেকে ম্যানেজ বা নিয়ন্ত্রণ করবে।

ফিরে এলাম আবারও ম্যানেজে। মানুষ নিজের জন্য আইডিয়া বা ধারণা তৈরি করে। প্রতিদিন নতুন নতুন ধারণা, যার জনহিতকরতা পৌঁছে যাবে সমাজের সর্বচ্চ থেকে সর্বনিম্ন স্তরে। আর এটাই অসংলগ্নতাকে সুস্পষ্টতা দেবে এবং সমাজের রসাতলে যাওয়াকে ঠেকাতে একটি নিয়ন্ত্রণরেখা তৈরি করে দেবে। যে রেখার ওপারটা বিভীষিকা, অসুন্দর! আর এপারে পাখি গান গায়, বসন্ত যথাসময়ে গাছে গাছে ফুল ফোটায়!  ফলে স্বার্থপর দৈত্যও ( পাঠক,স্বার্থপর দৈত্যের গল্পটা ভাবুন) একটা সময়ের পরে ভালো হয়ে যায়। এভাবেই মানুষকেই তার তৈরিকৃত আইডিয়াকে enjoy করতে হবে। নিজে খাদ্যবস্তুর অমৃত স্বাদ পেলে তবেই না অপরকে সে স্বাদ বোঝানো সম্ভবপর হবে!
খোলামন বা উদারমনের মানুষ হতে হবে। সমাজের ছোটো, বড় সকলকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভাবতে হবে, আমি পারি। আমিই পারি যেকোনও অপ্রীতিকর অবস্থাকে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার দ্বারা প্রীতিময় করে তুলতে। অর্থাৎ চরম মতদ্বৈধতা সত্বেও উদ্ভুত সমগ্র বিষয়টিকে , যার” শেষ ভালো, তার সব ভালো”-এমন রূপ দিতে। আর এটা পারলে ধনী থেকে আরও ধনবান না হয়ে, একজন সত্যিকারের আদর্শবাদী মানুষ হয়ে উঠে সকলের কাছে উদাহরণ হওয়া সম্ভব হবে। নিজের প্রতি নিজের দায়িত্ব যে সঠিকভাবে নিতে পারে, সেই তো পারে সমাজ- পরিপার্শ্বের দায়িত্ব বদলে অংশগ্রহণ করতে!  ব্যাপারটা সহজ না হলেও, কঠিনও নয়, যদি জীবনবোধ থাকে। এই বোধ জীবনের যেকোনো বয়সেই আসতে পারে! তার জন্য  আত্মনিয়ন্ত্রণটা খুউব জরুরী! এই আত্মনিয়ন্ত্রিত মানুষেরা এক একটি ছোটো ছোটো ইউনিট। সমগ্র হলেই হবে সংগঠন।আর এইসব সংগঠিতেরা এতটাই সংঘবদ্ধ, যার আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া যায় শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী !
শেষ করছি গৌতমবুদ্ধের মৃত্যুশয্যার দৃশ্য দিয়ে। বুদ্ধ’র মৃত্যু আসন্ন। প্রিয় শিষ্য আনন্দ এসে বললেন- আমাদেরকে পরবর্তীতে নেতৃত্ব কে দেবে?
তথাগত বললেন – আমাদের নীতি, আমাদের আদর্শ, আমাদের বিচারধারাই নেতৃত্ব দেবে আগামী প্রজন্মকে। যে নিয়ন্ত্রণ( যা, আসলে ম্যানেজ) আমরা শিখেছি, তাই-ই পরবর্তীদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত