জাতক

আজ ০৪ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক মানস সরকারের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


বিছানায় শুলেই ঘুম আসে না দীপনের। এটা হঠাত্‍ করে গজিয়ে ওঠা অভ্যেস নয়। সেই ছোট্টবেলা থেকেই। শেষ দু’মাস খাটের পাশে রাখা রিডিং লাইটটাও জ্বালায় না সুচেতার ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে। তাই কোনও ল-জার্নাল পড়ারও সুযোগ নেই। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর দীপন বুঝতে পারল, ঘুম থেকে আজ ও অনেক দূরে। পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে সুচেতা। ডাক্তার এভাবেই ঘুমোতে পরামর্শ দিয়েছে। পাঁচ মাসে পা রেখেছে সুচেতার গর্ভাবস্থা। চার মাস আগের এক শনিবার। অফিস থেকে ফিরে ঘরেই বিশ্রাম নিচ্ছিল দীপন। চা নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল সুচেতা। চা’টা হাতে তুলে দিয়ে বসে পড়েছিল খাটে। – ডেট পেরিয়েছে প্রায় মাস খানেক। অথচ এখনও ……
খুশি হয়েছিল দীপন। ইচ্ছেটা ছিল দু’তরফে। তবে কি ……. – কাল ফার্স্ট মর্নিং ইউরিনটা একটু কালেক্ট কোরো। ফ্রেশ বটলে কিন্তু, একটু থেমে যোগ করেছিল, কাল তো রবিবার। বাজার করে ফেরার পথে একটা টেষ্ট কিট কিনে নেবে। পরদিন বাজার থেকে ফিরে আসতেই নিজের ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনার পারদ পেয়েছিল দীপন। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কিটের ফয়েলটা ছিঁড়ে ফেলেছিল। নির্দেশমতো হলুদ তরল দু’ফোটা স্লাইডে ফেলতেই নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ।
মিনিটখানেকের মধ্যেই তৈরি হওয়া পার্পল কালারের দু’দুটো ব্যান্ড ছিল তৃতীয় কারোর আসার সঙ্কেত।

(২)
খুশির খবরটা সুচেতাকে মুখে নয়, স্লাইডটা তুলে দেখিয়েছিল। ওর নীরবতার মধ্যেই ছিল খুশির উত্তাপ। সেকেন্ড সিটে ডাঃ সদানন্দ চ্যাটার্জির চেম্বারে প্রথম গর্ভাবস্থার টেনশন।
– একটা স্পেশাল সোনোগ্রাফি লিখলাম। বাচ্ছার নড়াচড়াটা একটু অনিয়মিত, কঠিন ছিল ডাঃ চ্যাটার্জির মুখ। ভ্রু তখন কুঁচকে দীপনের, মানে, আপনি কি কিছু সাসপেক্ট …… – এখুনি কমেন্টটা করি কী করে! – ঠিকই, চুপ করে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা চোখে পড়েনি। দিন দশকের মধ্যেই রিপোর্ট নিয়ে স্বামী-স্ত্রী আবার ডাঃ চ্যাটার্জির চেম্বারে। যতক্ষণ সে রিপোর্টে ডাক্তারের চোখ আটকে ছিল, দীপনের বুকে চাপা উত্তেজনা। সেখানে লেখা কথাগুলো থেকে নিজে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে অর্থ বোঝার। খুব একটা সুবিধে হয়নি। বার বার রিপোর্টের একটা বাক্যে চোখ চলে গিয়েছিল, ‘প্ল্যাসেন্টা ইস অন দ্য পসটেরিয়র ওয়াল ইন দ্য আপার ইউটেরাইন সেগমেন্ট অফ গ্রেড ওয়ান ম্যাচুরিটি উইথ লোয়ার মার্জিন এটলিস্ট টুয়েন্টি নাইন এম এম অ্যাভোভ ইনট্যারনাল ও এস।’ গ্রেড ওয়ান মানেটা কী! গ্রেড ওয়ান ম্যাচুরিটি কি যথেষ্ট নয়! ছবি আর রিপোর্ট দেখার পর হাসি ফুটে উঠেছিল প্রসূতি বিশেষজ্ঞের মুখে, নাহ, সবই তো ঠিক দেখছি। বুকে চেপে রাখা শ্বাস বেড়িয়ে এসেছিল। কড়কড়ে চারটে একশো টাকার নোট রিসেপশনে দিয়ে বেড়িয়ে আসার সময় নিজেকে ভারহীন লেগেছিল দীপনের।
নড়ছে সুচেতা। ও ওঠার চেষ্টা করতেই উঠে বসে দীপন, কী হল! – কী আবার, ওয়াক তুলল সুচেতা।
এখনও জন্মায়নি। এরই মধ্যে বেশ কয়েক রাত মা’কে ঘুমোতে দেয়নি। মা হওয়া সহজ! সুচেতার পিঠে হাত রাখে ও, একটু জল খাও। চুপ ভাবী মা। সম্মতির লক্ষণ। নেমে, খাটের পাশে রাখা জলের বোতলটা তুলে এগিয়ে দেয়। বেশ কয়েক ঢোঁক খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে সুচেতা। পেটে সেভাবে কিছুই নেই। সারাদিনটাই চলেছে বমনপর্ব। গভীর নিঃশ্বাসের আওয়াজ পেতে অনেকটা নিশ্চিত লাগে নিজেকে দীপনের। শিশুর হাসি, অনেক ফুল, নিজের

(৩)
ছেলেবেলা – অনেককিছুর ভিড় হতে থাকে নিজের কাছে। আরও গভীরে যেতে একসময় ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করে ……

দুই
স্টেশনে নেমেই ভেবে নিল দীপন, চা খেয়ে সোফায় আধাশোয়া হয়ে একটু বিশ্রাম নেমে আর টিভি দেখবে। সারাটাদিন আজ অফিসে টেবিল থেকে মুখ তুলতে পারেনি। এমনিতেই ল-ফার্মে কাজের চাপ বেশি। দীপনের মাত্রাতিরিক্ত। তার উপর সকালে উঠে বাজার, ট্রেনে গাদাগাদি, বাসে গুঁতোগুঁতি – বিধস্ত ভাবটা নিঃশ্বাসটাকে যেন চেপে ধরতে চায়। দু’দুবার কলিংবেল দেওয়াটা বহুদিনের অভ্যেস। ‘কে’ প্রশ্নটা ওর দিকে এইজন্যই ধেয়ে আসে না। মা আর সুচেতা নিশ্চয়ই যে-যার ঘরে। কলিংবেলটায় দু’দুবার আঙুল ছোঁয়াতেই পাখির ডাক। ইদানিং সুচেতা আর নামে না খোলার জন্য। আলগোছে হাতের ঘড়িটা দেখল দীপন। বাবা মারা যাওয়ার পর গ্রাউন্ড ফ্লোরেই থাকে মা। আজ একটু বেশি সময় নিচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়ল! শরীর জুড়ে ক্লান্তি নেমে আসছে। আরও দু’বার প্রেস করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলল মা।
– সব ঠিক আছে? প্রশ্নটা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রোজই করছে এখন। – থাকবে না কেন, মা’র হাসি মুখ।
– ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
– না, না, টয়লেটে গিয়েছিলাম।
কথা না বাড়িয়ে জুতো-মোজা খুলে ফ্যালে দীপন। কলিংবেলের শব্দ বেডরুম অবধি পৌছায়নি নিশ্চই। সাধারণত বেডরুমের সামনের প্যাসেজটা থেকে একবার উঁকি মারে সুচেতা। বেডরুমের দরজা ঠেলে ঢুকতেই আবিস্কার করল গভীর ঘুমে অচেতন সুচেতাকে। মাতৃত্বের ভারে ক্লান্তি আর তৃপ্তি মুখে মাখামাখি হয়ে আছে। ভাবী সন্তানের স্বপ্ন দেখছে বোধহয়। থাক, ডাকার দরকার নেই। যতক্ষণ ঘুমোতে চায় ঘুমোক। বিশ্রামটা না হয় নিচে নেমে ড্রয়িং -এর সোফাতেই নিয়ে দেবে। শব্দ না করে ধীরে ধীরে নিজের পোশাক বদলাতে শুরু করল দীপন।
সোফায় বসে টিভি চালাতে না চালাতেই সিঁড়ির সামনে থেকে উঁকি মারল সুচেতা, আমি কিন্তু একটু নামব।
– আবার কেন, অস্বস্তি ফুটে ওঠে দীপনের গলায়!

(৪)
– কেন আবার, সারাদিনই তো ঘরে। ভাল লাগে কারো।
– ঠিক আছে। নামো তাহলে।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে মা, উঠে, একটু ধর ওকে।
হ্যাঁ, যাচ্ছি। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে ও।
তুমি কী গো মা! বেশ লজ্জিত সুচেতা।
– না, না, ওঠা নামা করার সময় একটু সাবধান থাকা ভাল, মা হাসল, তোমার বর হওয়ার সময়ও আমি খুব সাবধানে সিঁড়িতে ওঠা-নামা করতাম। ওর বাবা এসে আমার কনুইটা ধরতেন। পুরনো বাড়ির সিঁড়িগুলো তো দেখেইছো। কী উঁচু। রেলিং ধরে আস্তে আস্তে নেমে এল সুচেতা। পাশে দীপন। চা’এর কাপ, বিস্কুট সাজিয়ে মা টেবিলে রেডি। চা ঢালতে ঢালতেই হাঁক দিল, চলে আয় দীপ।
চা খেতে খেতেই টিভির খবর শোনা যেত। রিমোট থেকে সুইচ অফ করে ডাইনিং -এ গিয়ে বসতে হয়।
বিস্কুটে একটা দু’টো কামড় দিয়েই মুখটা বিকৃত করে ফেলে সুচেতা, ভাল্লাগছে না। ওয়াক আসছে। তুমি খেয়ে নাও।
ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট দু’টো চালান হয়ে যায় দীপনের হাতে।
ভ্রু কুঁচকে যায় মা’র, ভাল লাগছে না, না?
দু’দিকে ঘাড় নাড়ে সুচেতা।
স্নেহ মিশিয়ে মা বলে ওঠে, একটু ধনে পাতার চাটনি করে দিচ্ছি, খাও। মুখটা অন্যরকম লাগবে। কিন্তু ….
– কী হল, প্রব্লেমটা কী? মা’র ‘কিন্তু’ বলে থেমে যাওয়া মানেই কিছু একটা ব্যাপার আছে।
ওর দিকে মুখ ঘোরায় মা, বেড়িয়ে একটু ধনেপাতা এনে দে তো।
বাধা দেয় সুচেতা, ছেড়ে দাও মা, কাল খাব।
– রাজি হয়ে যাও। আমারও খেতে ইচ্ছে করছিল, বাকি চা’টা এক চুমুকে শেষ করে উঠে দাঁড়ায় দীপন, তাছাড়া আমাকে বেড়োতে হতই।

 

(৫)

তিন
বি-নেগেটিভ একটা সমস্যা, স্টেথোটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে যোগ করলেন ডাঃ চ্যাটার্জি, তবে আমার করা অপারেশনে রক্ত লেগেছে, এটা অফ্‌ দ্য রেকর্ড।
– তবু স্যর, একটু অ্যারেঞ্জ করে রাখলে মানসিকভাবে বোধহয় আর একটু স্ট্রং থাকব, হাসার চেষ্টা করে দীপন।
– নিশ্চই। কিন্তু বেবি কমপ্লিটলি ম্যাচিওরড্‌। উইকডেসেই করে ফ্যালো। তাতে প্রয়োজন পড়লে যেকোনও সরকারি জায়গা খোলা পাবে।
– স্যর, নরমাল বোধহয় কোনওভাবেই …..
– প্রশ্নই ওঠে না। সিজারটাই এখন নরমাল বলতে পারো। নরমালে রিস্ক ফ্যাকটর অনেক বেশি। তাছাড়া সিজার কমপ্লিটলি পেনলেস্‌। লোকাল অ্যানাস্‌থেসিয়াতেই কাজটা সেরে নেওয়া যায়। শুধু মাস দু’য়েকের একটা রেস্ট।
শেষ পাঁচমিনিট দীপন আর ডাঃ সদানন্দ চ্যাটার্জির কথোপকথনটা ছিল এরকম। মুখ নিচু করে দীপনের পাশের চেয়ারটায় বসে ছিল সুচেতা।

চেম্বার থেকে বেড়িয়ে আসতেই বৃষ্টি। প্রথমে দু’চার ফোঁটা। তারপর অগুনতি। আশেপাশে কোনও রিক্সা নেই। সুচেতার বাঁ-হাতটা বেশ শক্ত করে ধরে কার্তিকদার রেঁস্তোরাটায় ঢুকে পড়তে হয়।
বেশ কিছু লোক খেতে ব্যস্ত। এ রকম ফুড সেন্টারে ঢুকে বিশ্বাস হয় না, এখন খাদ্যসংকট চলছে। জিনিষ-পত্রের দাম আগুন। বরঞ্চ পরিপুষ্ট পরিবেশ। দু’একটা টেবিলে ফেলে ছড়িয়ে সুখী, মোটাসোটা পরিবাররা খাওয়া সারছে। বাঁদিকের কোণের টেবিলটা ফাঁকা দেখে দু’জন বসে পড়ল। একজনের খাওয়া শেষ। দাঁত খড়কে দিয়ে দাঁত খোঁচানোয় মগ্ন। অন্যজনের সামনে প্রায় শেষ হয়ে আসা চিকেন বিরিয়ানির প্লেট। মাংস চিবোতে চিবোতে চোখ প্রায় বুজে এসেছে। টেবিলে পড়ে থাকা মেনুকার্ডটা তুলে নিয়ে চোখ বোলাতেই মার্টনের আইটেমে চোখ আটকে যায় দীপনের। সুচেতাকে ডাঃ চ্যাটার্জি একটু করে রেডমিট খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রেডমিট ওরও অবশ্য পছন্দের তালিকায় পড়ে।
মেনুকার্ডটা এগিয়ে দেয় সুচেতার দিকে দীপন, কী খাবে?

(৬)
– যা হোক একটা কিছু।
– তবু বলো কিছু ….
– বিরিয়ানি। মার্টন্‌।
অর্ডার টুকে নেয় কার্তিকদার আপ্তসহায়ক। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দু’একজন সুচেতার শরীরের নিচের দিকটায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। প্রশান্তদাকে ফোন করার
জন্য প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল দীপন। প্রশান্তদা এখন সহকারী হাসপাতালের রক্তবিভাগে খুব গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে।
তিনবার রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ও প্রান্তে প্রশান্তদা।
– বল।
– একটা ব্যাপারে একটু দরকার ছিল। ব্যস্ত?
– বল না -।
নিচু হয় দীপনের স্বর, বলছি, বৌমা তো এক্সপেক্টিং। সামনের সোমবারই ডাক্তার ভর্তি করতে বলছে।
– কোথায়?
– মাদার’স হাউস নার্সিংহোমে।
– কে দেখছে?
– ডাঃ সদানন্দ চ্যাটার্জি। কিন্তু একটা প্রব্লেম আছে।
– কী!
– একটা বি-নেগেটিভ ব্যাগ একটু অ্যারেঞ্জ করে দিতে হবে।
– সোমবারই?
– হ্যাঁ।
চিন্তা করছে প্রশান্তদা কিছু। ফোন থেকে গাড়ির ঘন ঘন হর্ণ শোনা যাচ্ছে। রাস্তায় আছে, বোঝাই যাচ্ছে।
– শোন, তুই বৌ’কে ভর্তি কর রোববার। সেদিন অনেক ব্লাড ক্যাম্প আছে। দু’একটা বি নেগেটিভ ব্যাগ নিশ্চয় জমা পড়বে। সোমবার সকালে ডাঃ চ্যাটার্জি অপারেট করবে। তুই প্রথম স্লটটা নেবার চেষ্টা করবি। ব্লাড ব্যাঙ্ক খুলবে সকাল সাড়ে দশটা। যদি সাড়ে দশটার মধ্যেও রিকুইজিশনটা ওভার ফোন আমায় দিতে পারিস, আমি একটা ব্যাগ ঠিক অ্যারেঞ্জ করে রাখব। কিন্তু তারপর বললে হওয়া

(৭)
শক্ত। বুঝলি?
– হ্যাঁ, কিন্তু বি-নেগেটিভ জমা পড়ছে কি না, জানব কী করে!
– রোববার রাতে একটা ফোন কর।
– তাই করব। সব ঠিক হয়ে যাবে তো?
– হ্যাঁ রে বাবা।
– ছাড়ছি তাহলে?
– ছাড়।
– থ্যাঙ্কু।
ফোনটা ছেড়ে, নিশ্চিত লাগার বদলে কেমন যেন অনিশ্চিত লাগল। যদি না হয়! হীরকদাকে একটা ফোন লাগালে হয়। পার্টির অতবড় নেতা। ডাইরেক্ট ডোনারের অ্যাড্রেস কি আর কাছে থাকবে না।
টেবিলে দিয়ে যাওয়া গরম বিরিয়ানি থেকে জিভে জল আনা গন্ধ বেরচ্ছে। সুচেতাকে খেতে ইশারা করে দীপন। এই মুহূর্তে ফোন করলে গরম উত্তেজক খাবারটা ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। যাক। ফোনটা খাওয়ার থেকে অনেক বেশি ইমপর্‌টন্যান্ট ……
চার

নার্সিংহোমের ওয়েটিং রুমে ঝোলান দেওয়াল ঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে নিল দীপন। দশটা দশ। যে-কোনও ঘড়ির বিজ্ঞাপনে এই সময়টাই দেখান থাকে। কোথায় যেন শুনেছিল, ঘড়ি আবিস্কারের সঙ্গে সময়টার সম্পর্কের কথা। আশেপাশের মুখগুলো বেশ উদ্বেগে ভরা। শ্বশুরমশাই বেশ শক্তপোক্ত। ভেতরে কী চলছে, বোঝা যাচ্ছে না। শাশুড়ির আবেগের বহিঃপ্রকাশ দু’টো লাল চোখ। সুচেতার দাদা উঠে চলে গেল ওয়েটিং রুমের বাইরে। একটু ঘন ঘনই সিগারেট খাচ্ছে। সত্যিই কি টেনশন কমায়। দীপনের মনে হল, একটা সিগারেট টানলে মন্দ হত না। ওরা ছাড়াও আরও তিনজন এ ঘরে। অন্য পেশেন্ট পার্টি। একজন দেওয়ালে
পিঠ ঠেকিয়ে, চোখ বুজে কী যেন বিড় বিড় করছেন। প্রার্থনা! হতেও পারে। ভদ্রলোকের স্ত্রী’র অনেকটা ব্লিডিং হয়েছে পরশু রাতে। ভদ্রলোকের সঙ্গে কালকে কথা বলেই মনে হচ্ছিল কেসটা ক্রিটিক্যাল। সপ্তম মাসে ব্লিডিং মেডিক্যাল সাইন্স

(৮)
বোধহয় খুব একটা ভাল চোখে দ্যাখে না। দীপন অবশ্য এ ঝক্কির মুখোমুখি হয়নি। বমি বাদ দিলে সুচেতার মাতৃত্ব এগিয়ে গেছে বাধাহীনভাবেই। শুধু রক্তটাই যা প্রবলেম।
আবার ঘড়ি দেখল দীপন। একটু বেশিই সময় লাগছে। দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় লাগা উচিত বলে মন্তব্য করেছিল ফ্লোর মেট্রন। সব ঠিকঠাক চলছে তো! বন্ড সই করার সময় হাত কেঁপে গিয়েছিল। যেন কিছু হারানোর ভয়। নীল একটা ড্রেসে আগাগোড়া সুচেতাকে মুড়ে ওটিতে নিয়ে চলে গিয়েছিল স্বাস্থ্যবতী কয়েকজন নার্স। ‘ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসুন। যথাসময়ে ডেকে নেওয়া হবে’, মেট্রন সামনে খুলে রাখা ঢাউস খাতাটা থেকে চোখ না তুলেই নির্দেশ শুনিয়েছিলেন। তখন থেকে এক একটা মিনিট এক একটা বছর মনে হচ্ছে।
দশটা কুড়ি। শেষ চব্বিশ ঘন্টায় অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে দীপন। প্রত্যেকেই একমত। ডাঃ চ্যাটার্জির ব্লাড লেগেছে বলে তারা কখনও শোনেনি। শুনে সাহস পাচ্ছিল। তবুও এখন বুকের ভেতর হাতুড়ির শব্দ। প্রশান্তদা ফোন করতে বলেছিল সাড়ে দশটার মধ্যে। হীরকদার ডোনার রেডি। শুধু একটা ফোন ….। সুচেতার কি অনেকটা রক্ত বয়ে যাচ্ছে! কতটা রক্ত বয়ে গেলে একজন মাতৃত্বের স্বাদ পায়।
– ই-ফোর’এর বাড়ির লোক? একজন যুবতী নার্সের উদয় হয়েছে।
– ই-ফোর! ই-ফোর! চেঁচিয়ে উঠে শাশুড়ি নার্সের সঙ্গে। পেছনে শ্বশুড়। তার পেছনে দীপন। সুচেতার দাদা সিগারেট খেতে বাইরে বেড়িয়েছিল। এখনও ফেরেনি।
ও.টি.’র সামনের ফ্লোরে দাঁড়াতেই ডেটল আর ঔষধের তীব্র গন্ধ নাকে আঘাত করে। ইনজেকশন্‌, স্যালাইন-বটল, কাঁচি, লিউকোপ্লাস্ট্‌, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দিকে চোখ পড়তেই ভেতরটা যেন ঘুলিয়ে ওঠে। বুকের বিচিত্র ধুকপুকুনি নিয়ে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা। ককিয়ে ওঠা শিশুর কান্না। ও’টির দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন এক সিনিয়র নার্স।
নার্সের বাঁ-হাতে সাদা কাপড়ের ওপর এক শিশু। সাদা, ফ্যাকাশে ধরনের। জরায়ুর তরলে দীর্ঘদিন থাকার জন্য বোধহয়। নির্বিকারভাবে নার্স সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ছেলে হয়েছে। ভাল করে দেখে নিন। ভাল করে দেখল দীপন।

(৯)
ভেতরে মিশ্র অনুভূতি। শরীরের কয়েক ফোঁটা তরল থেকে একটা শিশুর সৃষ্টি। এবার ও যাকে দেখতে চায় বের করে আনা হচ্ছে স্ট্রেচারে। স্যালাইনের চ্যানেল, বিভিন্ন জায়গায় লেগে থাকা রক্ত – মাথা আর বুকের ভেতর মোচড় অনুভব করল। পুরো অজ্ঞান না করলেও কথা বলার ক্ষমতা সদ্য মা হওয়া সুচেতার নেই। কথা বলার পারমিশনও নেই। কাল সকাল থেকে ভিজিটের পারমিশন মিলতে পারে। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করা যাবে না এখন। পরের সিজারের প্রস্তুতি চরমে। সামনে বসে থাকা মেট্রনকে জিজ্ঞাসা করল দীপন, এক্সকিউজ মি ম্যাম, ই-ফোর’এর কি রক্ত লাগতে পারে? মানে একটা প্রস্তুতি -।
চশমার ওপর দিয়ে চোখ তুললেন মেট্রন, লাগলে ঠিকই জানিয়ে দেওয়া হত।
– ও, আচ্ছা। থ্যাঙ্কু।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে আসে দীপন। রক্ত এই মুহূর্তে লাগছে না। প্রশান্তদা, হীরকদাকে একবার জানিয়ে দেওয়া উচিত। বাড়িতে মা মুখিয়ে আছে। কী হল জানতে চেয়ে মামা সকাল থেকে দু’বার ফোন করে ফেলেছে। মোবাইল বের করে পটাপট সুইচ টিপতে লাগল ও।

পাঁচ

ওয়েটিং রুমের কাঠের বেঞ্চে হেলান দিয়ে নিজেকে একটু সহজ করে নিচ্ছিল দীপন। শ্বশুর, শাশুড়ি আর সুচেতার দাদাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে দুপুরেই। নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ অবশ্য আগেই জানিয়ে দিয়েছে, পেশেন্ট স্টেবেল। বিকেল অবধি একজন কেউ থেকে গেলেই হবে।
সুচেতার ব্যাপারে উদ্বেগের মধ্যিখানেই ছুঁয়ে যাচ্ছিল ক্ষিদের হালকা যন্ত্রণা। নার্সিংহোম থেকে কয়েক গজ দূরে শ্রী চন্ডী হোটেল। সবাইকে রিক্সায় তুলে দেওয়ার পর ঢুকেছিল হোটেলটায় দীপন। ভাত শেষ। বিকেল চারটের সময় না থাকাই স্বাভাবিক। হোটেলের মালিক উত্‍সাহী হয়ে প্রস্তাব ছুঁড়েছিল, গরম তরকা-রুটি খেয়ে যান। রুটি খেতে ভাল লাগছিল না। অল্প চা পানের পর আবার এই ওয়েটিং রুমেই।
সুচেতাকে রিলিজ করতে এখনও সাতদিন। বাড়ি ফিরলেও সেভাবে সক্রিয় থাকতে পারবে না। অন্ততপক্ষে দু’মাস রেস্টে থাকতেই হবে। একজন আয়ার

(১০)
বন্দোবস্ত করতে হবে। পার ডে দুশো টাকা। মাসে ছ’হাজার। এর থেকে কমে যাদের পাবে তারা কেউ ট্রেনড্‌ নয়। সুচেতার বাড়ি থেকে পুরো ব্যাপারটার খরচ বহন করার প্রস্তাব এসেছিল। দীপনই না করে দিয়েছে।
– ই-ফোর’এর কেউ আছেন নাকি? ওয়েটিংরুমে হঠাত্‍ই আবির্ভাব হয়েছে এক রোগা মতো আয়ার।
মেরুদন্ড টান দীপনের। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আছি, ওনার হাজব্যান্ড্‌। – একটু উপরে আসুন তাহলে। স্যর ডাকছেন।
বুকে কাঁপন লাগল। আবার কী হল! এই তো বলল, স্টেবল্‌। মেয়েটিকে অনুসরণ করে উপরে উঠে এল দীপন।
অপারেশন আর রাউন্ড দেওয়া – দু’টোই বোধহয় শেষ। মেট্রনের চেয়ারে এখন ডাঃ চ্যাটার্জি। চারপাশে বেশ কয়েকজন নার্স। কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতেই একটা ফাইল টেনে নিয়ে মৃদু হাসেন, টেনসড্‌ হবার কিছু নেই। আসলে বাচ্ছার ব্লাড টেস্ট হয়েছে।
চুপ দীপন। মনে হচ্ছে, আরও কিছু ওনি বলবেন। বললেনও।
– আসলে, বাচ্ছার ব্লাড গ্রুপ পজিটিভ বেড়িয়েছে। এক্ষেত্রে বি-নেগেটিভ মায়েদের আমরা ‘অ্যান্টি ডি’ ইঞ্জেক্‌শন্‌ দিতে বলি। পরবর্তী ইস্যু এলে যাতে তা নষ্ট না হয়। ইঞ্জেক্‌শন্‌টা একটু কষ্টলি কিন্তু ভাইটাল। এ জন্য এটা বাইরে থেকে কিনতে বলি। আর দেওয়ার সময় বাড়ির কাউকে প্রেসেন্ট থাকতে হবে।
– কীরকম দাম হওয়া উচিত, ঢোঁক গেলে দীপন।
– হাজার পাঁচেকের মতো।
– আশেপাশের দোকানে পাবো?
– হ্যাঁ, হ্যাঁ।
– আর্জেন্ট কি?
হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়ে এবার পাশে দাঁড়ানো নার্সরা। তলায় নেমে আসে দীপন। দশ হাজারের মতো সঙ্গে রেখে বাকি টাকাটা বাড়িতে আলমারিবন্দি করে এসেছে। এর মধ্যে ইন্‌জেক্‌শন্‌টা হয়ে যাবে। নার্সিংহোমের প্যাকেজ মূল্যটাও মিটে যাবে। কিন্তু আর কত সূচ ফোটাবে এরা সুচেতাকে। মা হওয়া সত্যিই সহজ নয়।
উপরের ফ্লোর থেকে বাচ্ছার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। দীপন বুঝতে

(১১)
পারে না, কান্নাটা ওর ছেলের কি না। দু’পায়ে আর শরীরে ক্লান্তির মেঘ।
নিজেকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় বের করে এক সদ্যজাত পিতা ….

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত