Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আগস্টের ভূত । গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

Reading Time: 4 minutes
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যাদু-বাস্তবতার পৃথিবী সেরা লেখক। ১৯৬৫-৬৬-এর দিনগুলোতে লিখেছিলেন তাঁর সেরা উপন্যাস ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ’আগস্টের ভূত‘ গল্পটি অনুবাদ করেছেন তুষার তালুকদার।
  ভেনেজুলীয় লেখক মিগেল ওতেরো সিলভার কেনা রেনেসাঁস আমলের দুর্গটি খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে, দুপুরের সামান্য আগে আরেসসোতে পৌঁছলাম আমরা। প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক ধরে দুর্গটি খুঁজছিলাম আমরা। তুসকানের নিভৃত পল্লীতে এ দুর্গটির অবস্থান। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম দিককার। তপ্ত এক রোববার। ঘনজনবহুল ব্যস্ত রাস্তা। তবে পর্যটকে রাস্তা গিজ-গিজ করলেও কেউ কোনো তথ্য দিতে পারে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা শেষে গাড়ি নিয়ে দু’পাশে সাইপ্রেস গাছের সারিওলা রাস্তা ধরে নগর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে হাঁস খাওয়ানোতে ব্যস্ত এক মহিলা দুর্গটির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে আমাদের জানাল। বিদায় শুভেচ্ছা জানানোর আগে ঐ দুর্গে আমরা ঘুমানোর পরিকল্পনা করছি কিনা তা জানতে চাইল সে। উত্তরে বললাম, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ওখানে কেবল মধ্যাহ্ন ভোজ করা। “তাহলে ঠিক আছে, কারণ ওটি ভুতুড়ে বাড়ি।” আমার স্ত্রী ও আমি, ভরদুপুরের ভূতে আদৌ যাদের কোনো বিশ্বাস নেই, মহিলাটির সহজ বিশ্বাস প্রবণতায় হেসে উঠলাম। কিন্তু নয় ও সাত বছর বয়সী আমাদের ছেলে দুটো জলজ্যান্ত ভূতের দেখা পাবে এ ভেবে ভারি আনন্দ পেল। সুলেখক মিগেল ওতেরো সিলভার আতিথেয়তার জুড়ি নেই। তার আমন্ত্রণে আমরা এক অবিস্মরণীয় মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিয়েছিলাম। ভোজন রসিক ওতেরো’র ভোজকে কেন্দ্র করে আয়োজিত প্রত্যেকটি ব্যাপারই ছিল মনোমুগ্ধকর। আমরা যেহেতু দেরিতে পৌঁছেছিলাম, তাই খাবার টেবিলে বসার আগে দুর্গের ভেতরটা দেখার সময় হয়নি। তবে দুর্গের বাইরের চেহারায় ভীতিপ্রদ কিছুই ছিল না। ফুল আবৃত যে আঙ্গিনার ওপর বসে সমস্ত নগরীর দৃশ্য দেখতে দেখতে মধ্যাহ্নভোজ সারছিলাম তাতে আমাদের সব অস্বস্তিই উবে গিয়েছিল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, কোনরকমে গাদাগাদি করে নব্বই হাজার লোকের স্থান সংকুলান হতে পারে এমন একটি পাহাড়ের এ বাড়িটিতে অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এতগুলো লোক জন্মগ্রহণ করেছে। যাহোক, মিগেল ওতেরো সিলভা তার ক্যারিবীয় রসবোধ সহযোগে বলল যে, তাদের কেউই আরেসসোর সবচেয়ে খ্যাতিমান সন্তান ছিলেন না। তবে “তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন লুদোভিকো”, সে জানাল। শিল্প ও যুদ্ধের মহা-পৃষ্ঠপোষক, লুদোভিকো এ যন্ত্রণাময় দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। পুরো মধ্যাহ্ন ভোজ জুড়েই মিগেলের সবকথা ছিল লুদোভিকো প্রসঙ্গে। সে আমাদেরকে লুদোভিকোর অসীম ক্ষমতা, যন্ত্রণাবিদ্ধ ভালোবাসা, ভয়ংকর মৃত্যু সম্পর্কে সব কথা শুনালো। কেমন করে হৃদয়ের ক্ষণিক উন্মত্ততায় যে বিছানায় ভালোবাসার মানুষের সাথে যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছে, সে বিছানাতেই তাকে ছুরিকাবিদ্ধ করেছেন লুদোভিকো, তারপর নিজের যুদ্ধংদেহী ভয়ংকর কুকুরগুলো নিজের উপর লেলিয়ে দিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়েছেন_ এসব কাহিনীই মিগেল শোনাল আমাদের। অনেকটা গম্ভীরস্বরে সে আমাদের আরো জানাল যে, রাত দুপুরের পর তার ভালোবাসার এই পবিত্র স্থানে শান্তির খোঁজে ঘরের মধ্যে অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় লুদোভিকোর ভূত। দুর্গটি ছিল সত্যিই বিশাল। আলোকহীন ও বিষণ্ন। কিন্তু দিনের আলোয় ভরা পেট ও পরিতৃপ্ত হৃদয়ে মিগেলের বলা কাহিনীটিকে মনে হলো একটু চটকদার। ভাবলাম অতিথিদের মনোরঞ্জনের স্বার্থে মিগেল হয়তবা একটু বাড়িয়েই বলে থাকে। দুপুর-নিদ্রা শেষে, বিন্দুমাত্র আশংকা ছাড়াই নানারকম পরিবর্তনের শিকার দুর্গের বিরাশিটি কক্ষ একে একে ঘুরে দেখলাম আমরা। মিগেল পুরো নিচতলাটি ঢেলে সাজিয়েছিল। বানিয়েছিল সনা, ব্যবস্থা করেছে ব্যায়ামের যন্ত্রপাতির এবং যেখানে বসে আমরা লাঞ্চ খেয়েছি সেই আঙ্গিনাটুকু উজ্জ্বল সব ফুলে ফুলে ঢেকে দিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হওয়া দ্বিতীয় তলাটি বিভিন্ন আমলের পুরনো আসবাবপত্রে ঠাসাঠাসি হয়ে পড়ে আছে। বলা যেতে পারে নিস্তব্ধ, নিষপ্রাণ অবস্থায়। তবে সবচেয়ে উপরের তলায় পুরোপুরি অপরিবর্তিত অবস্থায় রক্ষিত একটি কক্ষ দেখলাম আমরা_ লুদোভিকোর শয়নকক্ষ, যেখানে সময়ও বোধ হয় তার পা ফেলতে ভুলে গেছে। ঐ মুহূর্তটি ছিল সত্যিই ঐন্দ্রজালিক। ঐ তো দাঁড়িয়ে সেই বিছানাটি, সোনালি সুতোয় এমব্রয়ডারি করা মশারী, বিছানার চাদর এবং পাশের লম্বা ঝালরগুলো তার উৎসর্গীকৃত প্রেমিকার শুকনো রক্তে এখনো শক্ত হয়ে আছে। শেষ চেলাকাঠটি পাথরে পরিণত করে, বরফের মতো ছাই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফায়ারপ্লেসটি, আগ্নেয়াস্ত্র বোঝাই অস্ত্রাগার এবং সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো, চিন্তামগ্ন নাইটের তেলচিত্র। নিশ্চয় কালোত্তীর্ণ হতে না পারা কোনো ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকরের অাঁকা কাজ এটি। যাহোক, আমাকে সবচেয়ে যে-জিনিসটি বেশি অভিভূত করেছে তা হল সমস্ত শোবার ঘর জুড়ে ভরে থাকা তাজা স্ট্রবেরির আব্যাখ্যেয় সুবাস। তুসকানির গ্রীষ্মের দিনগুলো সুদীর্ঘ ও ধীরগতিসম্পন্ন এবং রাত ন’টা পর্যন্ত দিগন্ত নিজ জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। দুর্গের ভেতরটা যখন আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখা প্রায় শেষ তখন পাঁচটা ছাড়িয়ে গিয়েছে, কিন্তু মিগেল আমাদেরকে সান ফ্রান্সেসকোর গীর্জায় পিয়েরো দেইয়া ফ্রান্সেসকার ফ্রেসকো দেখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করল। তারপর স্কোয়ারের কুঞ্জবনের নিচে বসে চা খেতে খেতে আয়েশ করে অনেকটা সময় কাটালাম এবং খানিকবাদে যখন আমাদের স্যুটকেস নিতে ঘরে এলাম, দেখলাম আমাদের জন্য খাবার অপেক্ষা করে আছে। সুতরাং সান্ধ্যভোজ সেরে নেয়ার জন্য থেকেই গেলাম আমরা। শুধু একটি তারা-জ্বলা উজ্জ্বল বেগুনি রংয়ের আকাশের নিচে বসে যখন আমরা খাচ্ছিলাম, ছেলেরা তখন রান্নাঘর থেকে টর্চলাইট নিয়ে ওপরের তলাগুলো অভিযানে বেরিয়ে গেল। টেবিলে বসে আমরা সিঁড়ির ওপর বন্য ঘোড়ার দুপদাপ, কড়া নেড়ে ওঠা দরজা, বিষণ্ন ঘরে ঘরে লুদোভিকোকে ডাকার হর্ষ চিৎকার শুনতে পেলাম। ঐখানে ঘুমাবার দুষ্টু বুদ্ধি ওদের মাথায়ই চেপেছিল। উৎফুল্ল মিগেল ওতেরো সিলভা ওদেরকে সমর্থন জোগালো এবং ওদেরকে না বলার সামাজিক সাহস আমাদের হয়ে ওঠেনি। আমাদের ভয়কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, খুব ভাল ঘুমিয়েছিলাম আমরা। আমি ও আমার স্ত্রী নিচতলার একখানি শোবার ঘরে এবং সেই সংলগ্ন আরেকটিতে বাচ্চারা। দুটো কক্ষই আধুনিকায়ন করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অনালোকিত বিষণ্নতার কোনা ছাপ ছিল না। ঘুমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে, বসার ঘরের পে-ুলামঅলা ঘড়িতে বারোটি বিনিদ্র ঘণ্টা শুনলাম, এবং হাঁস-পরিচর্যারতা মহিলার ভীতিপ্রদ সাবধানবাণী স্মরণ করলাম। কিন্তু খুব পরিশ্রান্ত ছিলাম বিধায় কখন যে একটানা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম তা টেরই পেলাম না এবং জানালা বেয়ে ওঠা আঙুর লতার ফাঁক গলিয়ে আসা চমৎকার সূর্যালোকিত সকাল সাতটার পরে জেগে উঠলাম। আমার পাশে আমার স্ত্রী অপাপবিদ্ধার নিস্তরঙ্গ সাগরে পাল তুলে দিয়ে বসেছিল। “কি বোকামী!” নিজে নিজে বললাম আমি, “এই সময় ও জগতে এখনো ভূতে বিশ্বাস করা!” কেবল তখনই আমি তাজা স্ট্রবেরির ঘ্রাণে কেঁপে উঠলাম এবং দেখলাম ঠান্ডা ছাই আর পাথর হয়ে যাওয়া শেষ চেলাকাঠসমেত ফায়ারপ্লেসটি, এবং সোনালি ফ্রেমে বাঁধা বিষণ্ন নাইটের পোট্র্রেটটি তিন শতাব্দীর ওপার থেকে আমাদের দিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে বসে আছে। কারণ আগের রাতে নিচতলার যে শোবার ঘরে আমরা ঘুমিয়েছিলাম সেখানে আমরা নেই, আমরা শুয়েছিলাম লুদোভিকোর শোবার ঘরে ধূলিময় মশারী আর শামিয়ানার নিচে এবং তার অভিশপ্ত বিছানার চাদর তখনো রক্তে ভেজা।
কৃতজ্ঞতা : জলভূমি

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>