লেখাপড়া আমার কখনো ভালো লাগেনিঃ মঈনুল আহসান সাবের

আজ ২৬ মে কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইল মঈনুল আহসান সাবেরের একটি সাক্ষাৎকার।


মাসউদ আহমাদ : আপনার বাবা আহসান হাবীব ছিলেন দেশের বড় কবি ও সম্পাদক এবং আপনাদের বাসায় প্রচুর বই ছিল। এই ব্যাপারটি নিশ্চয়ই আপনার লেখক হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে, তাই না? এখান থেকেই আমরা আলাপ শুরু করতে পারি!

মঈনুল আহসান সাবের : এ ব্যাপারটি আমার লেখক হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। কবি ব্যাপারটি কী রকম বা কী, এটা একসময় জানতাম। এর মাধুর্য বা মায়া, এর গুরুত্ব বা মূল্য, কিছুই জানা ছিল না। যে বয়সে এসব জানা ছিল না, সে বয়সে বই কী- এটা জানার উপায় ছিল। একটু ভেঙে বলা দরকার। সে বয়সে বই কী- এই, এটাও বুঝতাম না। শুধু এটুকু বুঝতাম না। শুধু এতটুকু বুঝতাম- বই, পড়ার। সুতরাং পড়তাম। আব্বার ভেতর একটা চমৎকার ব্যাপার ছিল। আপনি যেমন বলছেন, বাসায় প্রচুর বই ছিল; আমি এর সঙ্গে যোগ করি- বাসায় ছোটদের বইও ছিল প্রচুর। আমার বড় দুবোন। আব্বা হয়তো তাদের জন্য কিনেছিলেন। কিংবা তারও আগে কিনেছিলেন, অনাগত সন্তানদের জন্য। আমরা তাই বড় হয়ে উঠলাম বইয়ের মধ্যে। একটু একটু করে বড় হওয়া, একটু একটু করে পড়া, ফলে আরো একটু বড় হওয়া শরীরে ও মনে, আর পাশাপাশি একজন কবিকে দেখা। সাহিত্য ব্যাপারটা ক্রমশ তাই বড় ও বড় প্রিয় হয়ে উঠল। আমার ধারণা, আমার পরিবেশ অবশ্যই একটি বড় ও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

বাবা যেহেতু কবি ছিলেন, সরলভাবে ধরতে গেলে আপনিও কবি হবেন- কিন্তু হলেন না। এই যে সাহিত্যের রুচির অন্যমুখি প্রকাশ, সেটা কীভাবে সম্ভব হলো?

মঈনুল আহসান সাবের : দেখুন, কেন আমি কবি হলাম না, এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বরং উল্টো একটা প্রশ্ন করি- তা, আমি গদ্যকারও না-ই হতে পারতাম। লেখক পিতা বলে সব সন্তানই লেখক হয় না। এই উদাহরণ খুবই কম। আমরা ৪ ভাই বোন। আমি তৃতীয়। আমি ছাড়া আর কেউ লেখালেখির দিকে আসেনি। আমি নিজে যতদূর বুঝি, আব্বার প্রথম ও চতুর্থ সন্তানের লেখার ক্ষমতা ছিল। একজনের গদ্য, একজনের পদ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ দিকটা তাদের টানেনি। জীবনে অন্যকিছু তাদের কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় ছিল বা হয়ে উঠেছিল। সুতরাং তারা তাদের জীবনটাই বেছে নিয়েছে। আর আমি লেখালেখি পছন্দ করেছি। কবি কেন হলাম না- এর পেছনে মোটা দাগে দুটো কারণ। আমি পড়তে যখন শুরু করলাম, হাতের কাছে নানারকম বই- আমি গদ্য পড়া শুরু করলাম। ছড়া বা আরেকটু বড় হওয়ার পর কিশোর কবিতা, আমাকে টানল না। আরেকটু বড় হওয়ার পর, কবিতাও আমাকেও টানল না। আমি গল্প পড়ি, উপন্যাস পড়ি, অন্য কোনো আমুদে গদ্য, তাও পড়ি, কিন্তু পদ্য থেকে দূরে থাকি। পক্ষপাতটা সেই ছোটবেলা থেকে। এই গেল প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণটিও সহজ- আমার কবিতা লেখার ক্ষমতা ছিল না। ছিল না মানে, নেই। ছন্দের কান বলে না, কিংবা কবিতার কান, কিংবা শুধুই কান- আমার নেই। আব্বা একবার আমাকে আর আমার ৪ বছরের ছোটভাইকে একটি কবিতা দেখে দেখে লিখতে দিলেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, মনে আছে, মনে নেই- কোনটি, তা, দেখে দেখেই লিখলাম বা কপি করলাম দুজন। দেখা গেল, দেখে লিখেও আমার তিনটা না হলে দুটো ভুল, ছোটভাইয়ের একটাও না। আব্বা মুচকি হেসে আম্মীকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের ছন্দের কান নেই।’ হায়!

প্রথমদিকে আপনার লেখালেখির ব্যাপারে বাবার প্রতিক্রিয়া বা বিবেচনা কেমন ছিল?

মঈনুল আহসান সাবের : প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক ছিল। আমার খেয়াল আছে, উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর পর তাকে যখন আমার লেখা পড়তে দেই, তাঁর চোখেমুখে বিস্ময় না, আনন্দ দেখেছিলাম। বিস্ময় না থাকার দুটি কারণ, সোজা হিসেবে। যে তিনটি গল্প আমি তাকে পড়তে দিয়ে তার মতামত জানতে চেয়েছিলাম, সেগুলো ছিল বড়দের জন্য লেখা। এর আগে ছোটদের জন্য বেশ কিছু লিখেছি, বেশকিছু ছাপাও হয়েছে। কিন্তু এ তো প্রায় ঘরে ঘরেই হয়। ছোটবেলায় প্রায় সবাই লেখে। আব্বার হয়তো দেখার আগ্রহ ছিল, আমি ব্যাপারটা চালিয়ে যাই কিনা। আমি যখন বড়দের জন্য লিখলাম, ছোটদের জন্য লেখার পাশাপাশি, আব্বার এই ধারণা হলো, লেখালেখির ইচ্ছা বা ভাবনা আমার ভেতর আছে। এটা তাকে আনন্দ দিল। একজন কবি, চাইতেই পারেন তার ছেলেমেয়েরা, বা তাদের কেউ না কেউ লেখালেখির মধ্যে থাকুক। আমি পরবর্তী সময়ে খেয়াল করি, এই যে, আমি লিখছি, এটা তাকে শুধু আনন্দ দিচ্ছে না। এটা তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। সন্তানের কবিতা লেখার ইচ্ছাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন আমার দাদাও। সেটা তার জন্য আনন্দের ব্যাপার কিছুটা হতে পারেও, তবে বেশি ছিল, অবশ্যই, সামাজিক একটি অহঙ্কারের জায়গা- আমার ছেলে কিন্তু কবিতা লেখে, আমার ছেলেকে কিন্তু অমুক অমুক চেনে, তারা ডেকে নিয়ে কথা বলে, প্রথম দিকে; কিংবা আমার ছেলে কিন্তু আহসান হাবীব, পরের দিকে!

যে কোনো মৌলিক লেখকের কাছে লেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ, সে-জন্য পরিপার্শ্বেরও একধরনের সমর্থন দরকার হয়, হয়তো, তাইনা?

মঈনুল আহসান সাবের : আমার বাবার এই পরিচিতির প্রয়োজন ছিল না। তার কাছে লেখালেখি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা তার বাবা উপলব্ধি করেননি। গর্ব যেমন করেছেন আবার এন্ট্রাস পাসের পর চাকরি-বাকরিতে জড়িয়ে পড়ার জন্য ছেলেকে এমন চাপ দিয়েছেন, ছেলেকে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ফলে আমাকে আমার মতো এগোনোর ক্ষেত্রে তিনি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেননি। আমার অনেক আচরণ, মূলত বৈষয়িক আচরণ, আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে না গেলেও মেনে নিয়েছেন। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বের হওয়ার পর প্রায় দুটো বছর কিছুই করিনি, বাবা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কিন্তু আমাকে কিছু বলছেন না। সত্যি কথা বলতে কী, এই না-বলার সঙ্গে তাঁর কিছু অভিমানও মিশে থাকত কিনা, তখন বোঝার চেষ্টা করিনি। এখনো করি না, কারণ করলে মন খারাপ হয়। তবে আমার লেখালেখিতে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন। এখানে এই এটাই কথা।

আপনার মা ছিলেন খুব ভালো পাঠক ও সাহিত্যবোদ্ধা। ভালো লিখতেন। কিছু অনুবাদও করেছেন। তাঁর মনোভাব কীরূপ ছিল?

মঈনুল আহসান সাবের : আমার মা সাহিত্যেবোদ্ধা ছিলেন। আমরা বলতাম আম্মী। সাহিত্য ব্যাপারটা তার বোধের মধ্যে ছিল। এটা আমার বড় খালার মধ্যেও ছিল। আমার জন্মের বেশ আগে তার ছোটবোনের বিয়ের আগে তিনি সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে বগুড়ায় মারা যান। আমার নানা বাড়ি বগুড়ায়। তারা বগুড়ার এক সময়ের প্রতাপ ও সম্পদশালী পরিবার। বড় খালার বিয়ে হয়েছিল নওগাঁয়, কাজী পরিবারে। এই পরিবারটিও বিত্তশালী কিন্তু সাহিত্য ব্যাপারটির প্রতি তাদের কোনোই আগ্রহ নেই। বড় খালা, যতদূর বুঝেছি, এই বিয়েতে তেমন একটা রাজি বা সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু গত শতকের চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে একটি মেয়ে পরিবারের ইচ্ছার বাইরে কীইবা করতে পারে! আমার বড় খালাকে অবশ্য বেশিদিন সংসার করতে হয়নি। প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলেন। এর কিছু পরে, তার ট্রাঙ্ক খুলে আরো নানা জিনিসের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল কয়েকটি খাতা। খাতায় আরো কিছুর সঙ্গে কবি আহসান হাবীবের প্রকাশিত অনেক কবিতা, পত্রিকা থেকে কেটে নিয়ে আঠা দিয়ে লাগানো ছিল। না, আহসান হাবীবকে তিনি চিনতেন না। তিনি বগুড়ায়, আহসান হাবীব কোলকাতায়। কোলকাতায় বসে আহসান হাবীব যা লিখছেন, বগুড়ায় বসে রানী (বড় খালা) তা পড়ছেন এবং যেটা যেটা বেশি ভালো লাগছে, কেটে খাতায় লাগিয়ে রাখছেন। আহসান হাবীব তার এই ভক্তের কথা জানতেন না।

তিনি তাঁর এই ভক্তের কথা জানতেন না, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভক্তের সূত্র ধরেই জীবনের একটা মাইলস্টোন অধ্যায় তৈরি হয়?

মঈনুল আহসান সাবের : হ্যাঁ। আহসান হাবীব জানলেন তার ছোটবোনকে, যার ডাক নাম পলো। দু বোনের মাঝখানে আরেকজন ছিলেন, পেরু। এই পেরুর, রানীর মৃত্যুর পর, রানীর স্বামী অর্থাৎ তার দুলাভাইয়ের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল। বগুড়া-নওগাঁ পাশাপাশি। বগুড়া-কোলকাতা দূর দূর। তবু, কোলকাতায় থাকা আমার এক নানার উদ্যোগে, আহসান হাবীব আর পলোর বিয়ে হয়। সম্ভবত আমার নানা কোলকাতায় থাকা তার সম্পর্কের ভাইকে মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজে দিতে বলেছিলেন। বড় খালার যে সাহিত্যপ্রীতি, তা আমার মা পলোর মধ্যেও ছিল। আমি খেয়াল করি আমার মা-র মধ্যে অদ্ভুত এক উদাসীনতাও ছিল। না থাকলে, লেখালেখি করে বেশ কিছুটা নামই তিনি করতে পারতেন। আমি তাঁর গল্প পড়েছি, পরিমিতিবোধ দেখে বিস্মিত হয়েছি। আমি তাঁর অনুবাদ পড়েছি। মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর সাহিত্যবোধের ওপর আমার পিতারও যথেষ্ট আস্থা ছিল। তা, এই মহিলা তাঁর সন্তানের লেখালেখিতে আনন্দিত হবেন, এটা আগ বাড়িয়ে বলবার প্রয়োজন পড়ে না।

আপনার মায়ের পড়াশোনা বা লেখার প্রয়াস কেমন ছিল?

মঈনুল আহসান সাবের : আমার মা টেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। বিয়ের পর আর পড়া হয়নি। প্রথম দিকে আমার অনেক প্রথম গল্পের প্রথম পাঠক তিনি। এমনও হয়েছে, আমি পড়তে দেইনি, কিন্তু লেখা শেষ করে বা কিছুটা লিখে ভার্সিটি বা বাইরে গেছি। তিনি ঐ লেখাটি পড়ে ফেলতেন। ভালো মন্দ বলতেন, সমালোচনা বলতে যা বোঝায়, তাই। আর বানান ভুল ধরতেন। বানান ভুল থাকলে খুব বিরক্ত হতেন। তবে এতসব কিছু ছাপিয়ে, লেখালেখি বিষয়টা যেহেতু তার পছন্দেরই ছিল, নিজেও কিছু কিছু লিখতেন, সমালোচক হিসেবে সবসময় না থেকে, সন্তানের লেখা তিনি পছন্দ করতেন। এটা তাঁর কাছে ছিল উপভোগ্য।

একটা ব্যাপার খুব দেখা যায়, আমাদের বেশিরভাগ লেখক, তিনি যে পরিবেশ বা সমাজ থেকেই আসুন না কেন, মধ্যবিত্ত কিংবা বলা যায়, নিম্নবিত্তদের জীবন নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। এই যে প্রবণতা, এটা আপনাকে কখনো ভাবিয়েছে?

মঈনুল আহসান সাবের : কথাটা পুরো ঠিক না। মধ্যবিত্ত নয়, আমাদের লেখকরা নি¤œবিত্তের মানুষদের নিয়ে লিখতে ভালোবাসে। আসলে তারা গ্রামের পটভূমিতে লিখতে চায়। এখন এই ধারণা যদিও অনেকটাই বদলে গেছে। তারা মনে করে গ্রামের পটভূমিতে লিখলে লেখাটা লেখা হবে, নি¤œবিত্তের মানুষকে নিয়ে লিখলে সেটা মহৎ সাহিত্য হয়েও যেতে পারে। তা, মহৎ সাহিত্য কে-না রচনা করতে চায়, বলুন? লেখকদের দোষ নেই। আমাদের সমালোচক গোষ্ঠী একসময় এভাবে দেখতে শুরু করে, মানুষের কথা লিখতে হবে, জীবনের কথা লিখতে হবে- এরকম একটি সামাজিক ধারণা অতি রক্ষণশীলভাবে প্রচলিত ছিল। এই সামাজিক ধারণার বাইরে আমাদের লেখকরা আসতে চাননি। হয়তো তাদের সে সাহস ছিল না, কিংবা ক্ষমতা। কিংবা সামাজিক ধারণাটি এতই পোক্ত ছিল, লেখক, এর বাইরেও তাকানো যায়, এরকম ভাবার অবকাশই পাননি।

শহুরে নিন্ম বিত্ত জীবন নিয়েও বেশ কিছু ভালো লেখা লিখিত হয়েছে…

মঈনুল আহসান সাবের : এর বাইরে কোনো লেখকই তাকাননি, এমন বলছি না। গ্রামের পটভূমিতে কিংবা শহুরে নিন্ম বিত্ত নিয়ে পঞ্চাশ দশকেও কিছু লেখা হয়েছে, ষাটের দশকে তো বটেই। একটা সীমাবদ্ধতা সেখানে ছিল- শহুরে মধ্যবিত্ত যে একটা চরিত্র, আলাদাভাবে, এভাবে দেখার চেষ্টা হয়নি।

কিন্তু আপনার নিজের বিবেচনা নিয়ে কিছু বলুন?

মঈনুল আহসান সাবের : আমার কিন্তু গ্রামের পটভূমি বা নিন্ম বিত্ত নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই, পাঠক হিসাবে। আমি চাই, ভালো লেখা। আমার পক্ষপাত লেখকের মুন্সিয়ানার প্রতি। সে যা লিখছে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে লিখছে, কতটা আমাকে দেখতে পারছে- আমি এর অপেক্ষায় থাকি। সমস্যা হলো, কিছু গ্রাম্যতা আমাদের থেকেই গেছে, আমাদের চিন্তায়, আমাদের লেখকদের ভেতর, আমাদের সমালোচকদের ভেতর, আর পাঠকদের ভেতর যে থাকবেই- এই তো স্বাভাবিক। একটু একটু করে এটা নিশ্চয় কাটছে। লেখকরা সব জীবনকেই দেখতে চাচ্ছেন, সমালোচকরাও নিচ্ছেন, পাঠকও। যারা গল্পটল্প পড়ে ভাবুক বা চিন্তক হতে চান, তারাও একটু একটু করে বুঝতে পারছেন, খুব ধনী একটি শ্রেণিকে নিয়েও কেউ যদি লেখে, সেটাও এই সময় ও সমাজকে বোঝার জন্য সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু একটা কথা, লেখার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কোনো পরিবর্তন কিংবা উপকার করা যায়?

মঈনুল আহসান সাবের : কোনো সরাসরি উপকার নেই। কখনো ছিল না। কখনো থাকবেও না। দেখুন, একজন লেখক কী বলছেন? একটা কাহিনি থাকছে। যদি মনে করেন কাহিনীই শেষ কথা না, তা হলে বলি, একটা বোধ থাকছে, একটা অনুভূতি থাকছে। রাজনীতি থাকছে, অর্থনীতি থাকছে, সমাজনীতি থাকছে। পাঠক অনেক অনেক ছবি পেয়ে যাচ্ছে। এইসব টুকরো টুকরো ছবি আপনাকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করছে। ব্যাখ্যা কি জরুরি বা উপকার না? আর, যদি আরও সরাসরি বলতে হয়- অশুভ হেরে যাচ্ছে শুভর কাছে, এই দৃশ্য যদি উপকারী হয়, শুভ হেরে যাচ্ছে অশুভের কাছে- এই দৃশ্যও জরুরি। এটাও আপনাকে জানাচ্ছে। আপনার এই প্রশ্নটি অবশ্য অপ্রয়োজনীয়। খুবই ক্লিশে। মনে হচ্ছে এই এখনই আমাকে সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে লিখতে বসে যেতে হবে।

ছোটবেলায় মানুষ নানাকিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং একটা সময়ে এসে সেই ঘোর বা প্রবণতা বদলে যায়। আপনার স্বপ্নটি কেমন ছিল? লেখকই হবেন এমনটি কি ভেবেছিলেন? এবং লেখক না হলে আপনি কী হতেন?

মঈনুল আহসান সাবের : আমি ভুলে গেছি। আমার মনে নেই। কিংবা আমি কিছুই হতে চাইনি। আমার যতদূর মনে পড়ে, আমি কিছুই হতে চাইনি। এরকম মনে পড়লে, আমি অবাক হই। এই এখন যেমন হচ্ছি। শৈশবে আমার কোনো স্বপ্ন ছিল না কোনো কিছু হওয়ার! মানুষ ওসময়ই না কত কী হতে চায়! হাতি, ঘোড়া, উট কিংবা বাঘ। আমি থেকে গেলাম গাধা, জীবনের ভারবহনকারী। মন্দ না মন্দ না! আচ্ছা, মন্দ না- বুঝলাম। কিন্তু শৈশব আমার ভেতর কিছু হওয়ার, হয়ে ওঠার, স্বপ্ন তৈরি করল না কেন!

এমন হয়, হতে পারে- শৈশব আপনার ভেতর কিছুটুকুন হওয়ার, হয়ে ওঠার, স্বপ্ন তৈরি করেনি?

মঈনুল আহসান সাবের : আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আমার শৈশবকাল পার করতে চাইনি। হ্যাঁ, হয়তো এটাই আমি হতে চেয়েছিলাম। আমি হয়তো শৈশব সংলগ্নই হতে চেয়েছিলাম। একসময় প্রিয় ছিল- খেলা। সেই ছোটবেলায় দৌড়াদৌড়ি, মার্বেল, ঘুড়ি ওড়ানো, রেসকিউ, টিলো এক্সপ্রেস- একজন অনেকজনের যে কোনো একজনকে ছুঁয়ে ফেলার জন্য ছুটবে, যাকে ছুঁয়ে ফেলবে, পরে সে আবার বাকিদের পেছনে ছুটবে। ছোটো, ছোটো, ছুঁয়ে দাও, নিজেকে মুক্ত করো এবং পরবর্তী সময়ে খেয়াল রাখো কেউ যেন তোমাকে ছুঁতে না পারে। আহা! …প্রিয় ছিল ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস। ক্রিকেট কিংবা টেবিল টেনিসে হয়তো থেকে যেতে পারতাম। থাকা হয়নি, দুঃখ নেই কোনো। আমার কিছু না হওয়া নিয়েই কোনো খেদ নেই, দুঃখ দূরের কথা। তবে কোনো না কোনো খেলায় মানুষ থেকেই যায়, দর্শক হিসাবেও। …আছি তো।

আপনি তো সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সমাজবিজ্ঞান থেকে সাহিত্যে কীভাবে এলেন এবং পুরনো কথা যদিও, আপনি বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপনাকে যত না টেনেছে, তারচেয়ে বেশি টেনেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বর। এটার নেপথ্য গল্পটা কী?

মঈনুল আহসান সাবের : লেখাপড়া আমার কখনো ভালো লাগেনি। কখনোই না। ভালো ছাত্র বলতে যা বোঝায়, তার আশপাশেও ছিলাম না আমি। প্রতি বছর টেনেটুনে পাশ। তবু অম্লান বদন। যেন, এই বা কে পারে! এই করে স্কুল পার। স্কুল ফাইনালের রেজাল্ট বেশ ভালো হয়ে গেল। কী করে, জানি না। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি পড়ালেখা করিনি। আমি জানতামও না কিছু। এই রেজাল্ট যা করল, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিল। অথচ আমার কত বন্ধু, কত পরিচিতজন, একইসঙ্গে বাইরের আর ভেতরের পড়া- দুটোতেই চমকে দেওয়ার মতো ভালো। আমার চমকে দেয়ার ক্ষমতা ছিল না, নেই। যা বলছিলাম- স্কুল পার, কলেজও। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পুরোটা স্বাধীন। ক্লাশরুম টানে না, বাইরের রুম টানে। বাইরে রুম বড়, এ জন্য এই টান, তা কিন্তু নয়, টানে- কারণ বাইরের রুমে আমি নিজেকে অলস পার করতে পারি। কোনো বিশেষ কারণে আমি সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হইনি। বড়বোন সমাজবিজ্ঞানে পড়ত, তার কিছু বই পাতা উল্টে দেখার সুযোগ হয়েছিল- এটা ক্ষীণ একটা কারণ হতে পারে। আমার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের বন্ধুরা, যাদের অধিকাংশের সঙ্গে আমি ঢাকা কলেজেও ছিলাম, আমি সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হবো শুনেই খুবই মর্মাহত হলো। তারা ভর্তি হচ্ছে অর্থনীতিতে, তারা ভর্তি হচ্ছে প্রশাসনে, তারা এখান থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে যাবে- সব গোছানো। তো, আমি সমাজবিজ্ঞানে পড়ে কোন চুলোয় যাব! বন্ধুদের দোষ দেই না। তখন এমন একটা কথা প্রচলিত, দেশের সবচেয়ে গাধা ছাত্রগুলো সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়। ভর্তি হয়ে অবশ্য টের পাই, কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। সর্ব অর্থেই। সব অর্থেই গাধা, এমন ছাত্র নিশ্চয় অন্যান্য বিভাগেও ছিল। আমি নিশ্চিত। কিন্তু তাদের কাছ থেকে দেখা সুযোগ আমার হয়নি। সমাজবিজ্ঞানের এই কলঙ্কমোচনে সময় লেগেছিল। এ পরের কথা। বন্ধুদের নানা মন্তব্যের পরও আমি সমাজবিজ্ঞানের ভর্তি হলাম। ১৯৭৬। বন্ধুদের কেউ কেউ বলল, আমি ফার্স্ট ক্লাস নিশ্চিত করার জন্য এই অতি সহজ বিষয় এবং অমেধাবী সহপাঠীদের বেছে নিয়েছি। হায়, একসঙ্গে ঘুরি, গল্প করি, কিন্তু তারা জানে না, আমি কবেই ‘ক্লাস’ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হলো। তারা অন্য বিভাগে, রুটিনে বনে না। সমাজবিজ্ঞানেও আমার বন্ধু নেই, যদিও কলেজে একসঙ্গে ছিলাম, সখ্য হয়নি কবি কামাল চৌধুরীর সঙ্গে। সমাজবিজ্ঞানে সেও ভর্তি যদিও। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাসশিক্ষক আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি যত বই পড়েছি, তত বই তোমরা চোখেও দেখোনি। ঘাড়ে করে ওসব বই নিয়ে যেতে তোমাদের সাতদিন সাতরাত লাগবে। শুনে আমার মনে হলো, ঘাড় খুব ব্যথা হয়ে যাবে এতে। আমার ঘাড় ব্যথা করতে ইচ্ছা করল না। কিন্তু কোথায় যাই? আমি একটু একটু করে চলে গেলাম লাইব্রেরির বারান্দায়। আমি একটু একটু করে চলে গেলাম লাইব্রেরির পাশের মাঠে। অনার্সে কিছু ক্লাস করলাম। এমএসএস করার সময় একটিও না। কিছু শিখলাম না, শিখলাম না- তবু পাস করলাম। বারান্দায় বা মাঠে বসে কি কিছু শিখলাম! আমার বারবার মনে হয়েছে, এখনো বারবার মনে হয়- আমার শেখার ক্ষমতা কম। …না, আফসোস নেই।

আমাদের হুমায়ূন আহমেদকে একপাশে সরিয়ে রাখলে, আপনাকে আমরা মধ্যবিত্ত স্পেশালিস্ট হিসেবে ধরে নিতে পারি। এই মধ্যবিত্তশ্রেণিটি কিন্তু নিন্ম বিত্ত থেকে খুব দূরের জগতের নয়; যদিও আকাঙ্ক্ষায় তারা প্রায় উচ্চবিত্তের কাছাকাছিই বটে, তাই না?

মঈনুল আহসান সাবের : দেখুন, আমি মধ্যবিত্ত স্পেশালিস্ট বা অন্যকিছু বা আরও অন্যকিছু, এসব আমি কারও তুলনায় বিবেচনা করতে চাই না। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, মধ্যবিত্ত নিজেকে নিয়ে যে স্বপ্নটি দেখতে ভালোবাসে, একটু হাহাকার একটু অতৃপ্তি যেভাবে তার জীবনে মাখিয়ে রাখতে চায়, আমি মধ্যবিত্তের সেই কাক্সিক্ষত স্বপ্নময় জীবনের গল্প লিখিনি। আমি মধ্যবিত্তের কাল্পনিক বা ভালোবাসার মধ্যবিত্তকে ধরতে চাইনি। আমি মধ্যবিত্তকে তার জায়গায়ই দেখতে চেয়েছি। আমার মধ্যবিত্ত সুগার কোটেড নয়। আমি এসব কথা মধ্যবিত্ত নিয়ে অন্য লেখকদের লেখার তুলনায় বলছি না, আমি নিছক আমার কথাই বলছি। এই শ্রেণিটি চির অতৃপ্ত, ভীরু, বিশ্বাসঘাতক ও ব্যর্থ। কিন্তু সফল হতে চায়। আমি বলি না এরা এ কারণে খারাপ বা ভালো, তারা এরকম- কথা এটাই। এরা প্রতিনিয়ত ব্যস্ত। নিজেকে একধাপ সামনে নেয়ার জন্য সচেষ্ট, ব্যস্ত- নিজেকে রুচিশীল, মার্জিত, শোভন এবং প্রয়োজনীয় হিসেবে প্রমাণ করতে।

আপনার ‘বৃত্ত’ শিরোনামের গল্প ধরে একটা অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ি। গল্প লেখার সময় অনেকেই, গল্পে হয়তো সংলাপ ডিমান্ড করছে, গল্পকার সেখানে বর্ণনা দিয়ে পার হয়ে গেলেন। আপনার নিজের বেলায় এমন ঘটে? কিংবা এই ব্যাপারটা আপনাকে কখনো ভাবিয়েছে?

মঈনুল আহসান সাবের : যেখানে সংলাপ প্রয়োজন, সেখানে বর্ণনা, নাকি, যেখানে বর্ণনা প্রয়োজন সেখানে সংলাপ দিয়ে সহজে সেরে ফেলা? আমার নিজের বেলায় কখনো এই দ্বিতীয়টি ঘটেছে। আমি খুব অলস প্রকৃতির মানুষ কিনা। …এমনিতে, আমার মনে হয় না, কোনো লেখক এরকম করেন। আপনার হয়তো এরকম মনে হতে পারে কোনো গল্প পাঠে। আবার কারও হয়তো সেই একই গল্প পাঠে এমন মনে হলো না।

শহরে ভাড়াবড়িতে থাকা, দিনযাপনের গøানি- অভাব ও ক্লান্তির নিচে পিষ্ট আলম টের পায়, জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এবং একসময় সে সবকিছু ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে কোথাও চলে যেতে চায়, যদিও প্রয়োজনীয় সাহস ও শক্তির অভাবে পারে না। একটা পরিবর্তন বা অনিয়ম দরকার- এই যে বিধিলিপি, লেখক কি কেবল গল্পই বলে গেলেন? জীবনের রেখাচিত্র এঁকে গেলেন? কিন্তু আলম ও ফিরোজা- তারা আসলে কোথায় যাবে?

মঈনুল আহসান সাবের : তারা আসলে কোথায় যাবে- এ ভাবনা যদি আপনার ভেতর তৈরি হয়ে থাকে, সেটি এক অর্থে গল্পের সার্থকতা, আবার দুর্বলতাও হয়তো- যে, এরকম একটি অদ্ভুত প্রশ্ন আপনার মনে তৈরি হয়েছে। তাদের গন্তব্য আমি নির্দিষ্ট করে দিতে পারি না। আমি তাদের কোথাও পৌঁছে দিতে পারি না।

গল্পে, একটা শাড়িকে কেন্দ্র করে গতানুগতিকতার মোড় পাল্টে যায়। ফিরোজার শাড়ি কেনাকে কেন্দ্র করে ঝগড়ার সূত্র তৈরি হয়; এই ঝগড়ার কারণে ফিরোজার প্রতি মনোযোগ এবং দীর্ঘদিন পর তাকে নিয়ে ঘুরতে রের হওয়া। কিন্তু স্ত্রী ফিরোজাকে মোটরসাইকেলে বসিয়ে আলম যত দূরেই পাড়ি দেয়, শেষ পর্যন্ত এসে হাজির হয় সেই প্রতিদিনের পরিচিত স্থানেই। প্রতিদিনের চেনা গণ্ডির সীমানা আলম কোনোভাবেই অতিক্রম করতে পারে না। বাস্তবে কি এমন হয়, হতে পারে?

মঈনুল আহসান সাবের : বাস্তবে যা হয়, শুধু তা-ই কি আমরা লিখি? কিংবা আমি যা লিখেছি, তাই-ই কি বাস্তব নয়? আসলে সেটাই কি ঘটে না?

আপনার আরও একটি চমৎকার গল্প ‘খননকারী’। পাঠক হিসেবে জীবনের অন্যরকম মানে এখানে খুঁজে পাই- একজন যান্ত্রিক মনোবৃত্তির মানুষের ভেতর লুকায়িত মানবিক বোধের প্রকাশ। রহমত শেখের মতো একজন নির্মোহ গোরখোদক, যে টাকার বিনিময়ে কবর খোঁড়ে, নিরাসক্ত অনুভূতিহীন এই লোক কবরখোঁড়ার কাজ না থাকলে ঘুরে বেড়ায়। আর কোনোকিছুতে তার আগ্রহ নেই- এটা কি বাস্তব গল্প?

মঈনুল আহসান সাবের : আচ্ছা, আপনি কি বলতে চাচ্ছেন- গল্পটি বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রসূত কিনা? বা রহমত বাস্তবে আছে কিনা? আচ্ছা, যদি না থাকে, আমি সমস্যা দেখছি না কোনো। আবার, বাস্তবের ওপর না দাঁড়িয়ে কোনো অভিজ্ঞতা কি আছে আমাদের? সুতরাং সব গল্পই বাস্তব গল্প।

আপনার গল্পে একটা ব্যাপার দেখে অভিভূত হই, কৌতুকও জেগে ওঠে- গল্পের বর্ণনা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, লেখক যেন স্বয়ং আখ্যানের পটভূমিতে উপস্থিত আছেন? ‘খননকারী’ গল্পে মৃতদেহ নিয়ে যে নিপুণ কর্মযজ্ঞের চিত্রণ- মৃতদেহ কবরে রাখা-বাঁশ বিছানো-মাটি ফেলা এবং রহিমের মন, মনের রঙ, তার কাজের সূত্র বিবরণ কী অনুপুঙ্খভাবে আপনি দিয়ে গেলেন! এটা কীভাবে সম্ভব?

মঈনুল আহসান সাবের : দেখুন, এরচেয়ে নিখুঁত বর্ণনা আরো বহু বহু গল্পে আছে। আমার বা বিভিন্ন জনের গল্পে। আপনি যদি ছবিটি অনুমান করতে না পারেন, লিখতে পারবেন না।

আপনার সুন্দর একটি উপন্যাস ‘এখন পরিমল’; এখানে একটি ব্যাপার এই যে, ঔপন্যাসিক কাকে কেন্দ্র করে এই আখ্যান সাজালেন, তা পরিষ্কার নয়- এতে কাউকে প্রধান চরিত্র বলে স্থির করা যায় না। লেখার সময় এই ভাবনাটি কি নির্ধারিত ছিল?

মঈনুল আহসান সাবের : এই লেখার মূল চরিত্র হচ্ছে আমাদের এই এখনকার সময়। কিন্তু কোনো চরিত্র ঘিরে ঘুরছে না, ঘুরছে মানুষের কর্ম, আচরণ ও অবস্থার ওপর। লেখার যখন শুরু, তখন সব ভাবনাই স্থির ছকে আঁকা থাকে না। তবে একটা ধারণা বা ভাষণ নিশ্চয় থাকে। সেই ধারণা নিয়ে যখন লিখতে বসা, তারপর তা কিছু এদিক ওদিক যায় বৈকি, তবে উপন্যাসের ক্ষেত্রে, তা মূল ভাবনা থেকে ছিটকে পড়ে, এমনও না। আমার ভাবনাটাই ছিল সময়কে মূল চরিত্র বানিয়ে মানুষকে দেখা।

আপনি একসময় ‘পার্কে বসে বাদাম খেতে খেতে’ নামক কলাম লিখতেন, জনকণ্ঠে। রঙ্গব্যঙ্গ রচনা হলেও তাতে গল্পের গন্ধও ছিল। বাঁচা মিয়া নামে একটা চরিত্রও দাঁড়িয়ে যায়, সেই লেখার সুবাদে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

মঈনুল আহসান সাবের : এই রম্য কলামটির লেখাগুলো খুব সাদামাটা ও সরল ছিল। একক কাহিনী, নির্দিষ্ট গন্তব্য। লেখার শেষে একটি মোচড়, একটি অসঙ্গতিকে তুলে ধরা। এখানে বিদ্রƒপ ছিল, উইট বলতে যা বোঝায় তা ছিল না। এই ধরনটি লেখার দোষ হতে পারে, গুণও। আয়োজন করে কিছু বলা হচ্ছে না, কিন্তু বলা হচ্ছে। এই সরল উপস্থাপনা আমি খুব একটা ভেবেচিন্তে নেইনি। পরে খেয়াল করে দেখেছি, ওটা হয়ে গেছে। অর্থাৎ বিষয় ও ধরন নিজেই তার হাজির হওয়ার কৌশল বেছে নিয়েছে। লেখাগুলো আমার পছন্দের।

আপনার কিছু উপন্যাস যেমন- পাথর সময়, ঠাট্টা, অপরাজিতা, ফেরা হয় না, হারানো স্বপ্ন, দূরের আকাশ, জ্যোতির্ময়ী তোমাকে বলি, নীল খাম, সে তোমাকে পাবে না ইত্যাদি রচনা একটানা পড়ে ফেলা যায়। সরল সুখপাঠ্য আখ্যান। কিন্তু আপনার নির্বাচিত রচনার দিকে তাকালে এই লেখাগুলোকে হালকা বা ওয়ানটাইম লেখার মতো ঠেকে। আপনি কী বলবেন?

মঈনুল আহসান সাবের : আমি একমত না। বিশেষ করে ঠাট্টা ও জ্যোর্তিময়ী, তোমাকে বলি- এ দুটো লেখাকে আমি ওয়ানটাইম মনে করি না। পাথর সময়কেও ওয়ান টাইম বলা যাবে না। তবে বাকি লেখাগুলোর প্রায় সবকটিই অতি নি¤œমানের রচনা। লেখালেখির মাঝখানের দু’তিনটে বছর আমার জনপ্রিয় হওয়ার সাধ জেগেছিল। প্রকাশকরাও তাগিদ দিচ্ছেন। এসব লেখা ঐ সময়ের। জনপ্রিয়তাকে আমি হালকাভাবে দেখছি না। ভালো লেখাও জনপ্রিয় হয়। হয়ও না। অধিকসংখ্যক বই প্রকাশের পরিস্থিতিতে পড়ে লেখা আমার ঐ বইগুলোর প্রায় সবকটিই অর্থহীন ও নিন্ম মানের। এর মাশুল আমাকে এখনো মোটা দামে দিতে হয়।

আপনার বেশিরভাগ আখ্যানে প্রধান অনুষঙ্গ নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষ এবং তাদের দিনযাপন-প্রত্যাশা-দুঃস্বপ্ন ও বিপন্নতা। ঘটনা বা পটভূমি যা-ই থাকুক, একধরনের প্রতীকী আবহ ও ইঙ্গিতময়তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। এতে আপনার ব্যক্তিজীবনের ছায়া বা অভিজ্ঞতা কতটা প্রতিবিম্বিত হয়?

মঈনুল আহসান সাবের : নিজ ব্যক্তিজীবন ছাড়া মানুষ কি আসলে কিছু লেখে? আমি সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল নিয়ে লিখলেও সে লেখার মধ্যে আমি থাকব, আমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। আমার সম্পর্কে একটি কথা চালু হয়ে গেছে, মধ্যবিত্ত জীবনের রূপকার। আমি এতে অসুবিধার কিছু দেখি না। এই অংশটিতে আমার বসবাস, এই অংশটিকে আমি কাছ থেকে চিনি এবং আমি দেখি, এই অংশটি নিয়ে খুব কম লেখা হয়েছে। তবে কোনো পরিকল্পনা করে আমি মধ্যবিত্তকে ধরতে যাইনি। আর হ্যাঁ, নাগরিক মানুষের বাইরে আমি মানুষ ও প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও এর পরবর্তী অবস্থা নিয়েও অনেক লেখা লিখেছি।

অনেকদিন আগে আপনি একবার বলেছিলেন, টেলিভিশন আমাদের বেশিরভাগ লেখককে খেয়ে ফেলেছে। এই প্রসঙ্গটি আরেকবার আলোকপাত করবেন?

মঈনুল আহসান সাবের : এটা আমার ভাবনা। টেলিভিশন সম্ভবত লেখককে ক্রমশ ছোট সীমিত করে আনে। টেলিভিশনে কাজ করবেন, অথচ নিজের ওপর টেলিভিশনকে তার প্রভাব ফেলতে দেবেন না, এটা সম্ভব না।

গল্প বা উপন্যাসে ভাষার প্রয়োগ নিয়ে আপনার কি আলাদা করে কোনো ভাবনা বা মনোযোগ থাকে? নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে-ভাষাটি কলমের ডগায় এসে যায়, সেটিকেই উপযুক্ত বলে বিবেচনা করেন?

মঈনুল আহসান সাবের : লিখতে লিখতে একজনের একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েই যায়। কেউ কেউ খুব বেশি সতর্ক থাকেন। আমি খুব বেশি সতর্ক থাকি না। আমার ভাষাটি আমার, অনেকের কাছে তো বটেই, সাদামাটা। সাদামাটা ভাষায় লেখার ও খেলার মজাই আলাদা, আমার কাছে। শিথিল হওয়ার একটা আশঙ্কা অবশ্য এতে থেকেই যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে আপনার উল্লেখনীয় একটি উপন্যাস ‘কবেজ লেঠেল’। এর শুরুটাই এমন- মেলেটারি আসিচ্চে…

মঈনুল আহসান সাবের : একাত্তর সালে দুটো বড় ব্যাপার ছিল। এক, মিলিটারি আসছে। দুই, এই মিলিটারির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই। আমি শুরু করেছি মিলিটারি আমার খবরের মধ্য দিয়ে। কাগজ লেবেলের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে মানুষের উত্থানের ভেতর দিয়ে। এই মানুষও পরে আবারো পরাজিত হয়, তবে অপরাজনীতি অতিক্রম করে সে নিশ্চয় আবার উঠে দাঁড়াবে, এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত আশার কথা।

এই নামেই আপনার একটি গল্প আছে, যেটি ‘নির্বাচিত গল্প’-তে ঢুকে পড়েছে; ১৯৮৮-তে লেখা? আচ্ছা উপন্যাসটি মাথায় রেখে কি গল্পটি লেখা হয়েছিল? কারণ উপন্যাসটি বেরিয়েছে ১৯৯২-তে?

মঈনুল আহসান সাবের : হ্যাঁ, কবেজ লেঠেল নামে আমার একটি গল্পও আছে। উপন্যাসের প্রথম পর্ব পর্যন্ত এরও গল্পের কাহিনী এক। তবে উপন্যাসে সঙ্গত কারণেই বিস্তৃত। গল্পের স্বাদ এখানে পাওয়ার কথা না।

এই উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষাটি কি বগুড়া অঞ্চলের?

মঈনুল আহসান সাবের : হ্যাঁ, এর ভাষা বগুড়া অঞ্চলের। ঢাকার নাগরিক ভাষার বাইরে একমাত্র এই ভাষাটিই আমি কিছুটা জানি।

প্রতিবছর ঈদ সংখ্যার মৌসুম আসে, যায়। এতে প্রচুর উপন্যাস লেখা হয়, আপনিও তো কিছু কিছু লিখে ওঠেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের যেসব উপাদান দরকার, যে গঠনশৈলী ও কাঠামো প্রয়োজন- এসব উপন্যাসে তার কতটুকু থাকে, আদৌ থাকে কিনা?

মঈনুল আহসান সাবের : আমাদের সাহিত্যের বিশাল এক ক্ষতি করেছে ঈদ সংখ্যাগুলো। আমি এখানে সহযোগী। আমি সাহিত্যের ক্ষতি করছি। প্ররোচিত ও প্রলোভিত হয়ে নিজের লেখার ক্ষতি করছি। কিন্তু আমাদের দেশে কটি পত্রিকা নিয়মিত সাহিত্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে? আরও শংকার কথা- সাহিত্য হয়ে গেছে দৈনিকের ‘সাময়িকী’ নির্ভর। আপনাকে টিপে টিপে ঠেলে ঠেলে গুজে গুজে দিচ্ছে ঐ সাময়িকীতে। পুঁজি আপনাকে আকৃষ্ট করছে পপ-লিটারেচারে। ঐ ফরম্যাটের বাইরে আপনি লিখবেন, কোথায় লিখবেন? আমি ঈদ সংখ্যার ক্ষতির দিকটি বললাম। এতে আমার অংশগ্রহণের কথাও স্বীকার করলাম। কিন্তু বের যে হয়ে আসব, তা নয়। ঐ সময় নিয়ম অনুযায়ী তাও কিছু লেখা হয়। ভবিষ্যতে যা পরিমার্জনার পর কিছু একটা হতে পারে। আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির ধরন অনুযায়ী আমাদের সাহিত্য-পরিবেশ ও কারবার বলে দিচ্ছে- বড় না, কিছুু একটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকো।

সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ!

মঈনুল আহসান সাবের : ধন্যবাদ।

কৃতজ্ঞতাঃ ভোরের কাগজ

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত