ফ্রানৎস কাফকা: জীবন ও সাহিত্য

আজ ০৯ অক্টোবর কবি, কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংকার মাসরুর আরেফিনের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


প্রস্তাবনা

kafka.gif

ফ্রানৎস কাফকার লেখায় সব বিচিত্র ও উদ্ভট ঘটনা ঘটে এমনভাবে, যেন ওগুলোতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। যেমন: গ্রেগর সামসা নামের এক সেলস্ম্যান এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, সে একটা তেলাপোকায় পরিণত হয়ে গিয়েছে; কিন্তু বেচারা তখনো ভাবছে অফিসে যাওয়ার ট্রেনটা যেন আবার মিস না হয়ে যায় (গল্প ‘রূপান্তর’); জোসেফ কে. নামের এক নিরপরাধ ব্যাংকারকে একদিন সকালে অজানা এক অপরাধের দায়ে দুজন সরকারি এজেন্ট আকস্মিক গ্রেপ্তার করে বসে। কে.র প্রতিবেশী মহিলার ঘরে তার একটা ছোটখাটো বিচার হয়ে যায়। তাকে কেউ গ্রেপ্তার করে কোথাও নিয়ে যায় না, শুধু ‘মুক্ত’ভাবে ঘোরাফেরা করার অনুমতি আর পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করার আদেশ দেওয়া হয় তাকে (উপন্যাস বিচার); কে. নামের এক ভূমিজরিপকারী ভদ্রলোক সারা জীবন ধরে ব্যর্থ চেষ্টা করে যায় গ্রামের শাসকদের দুর্গ বলে পরিচিত রহস্যময় এক দুর্গের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করার আর তার এই গ্রামে অবস্থানের আইনগত স্বীকৃতি ও অনুমতি পাওয়ার (উপন্যাস দুর্গ); এক অদ্ভুতদর্শন মেশিন আক্ষরিক অর্থেই দণ্ডিত আসামিদের গায়ে শত শত সুই দিয়ে নকশা করে লিখে দেয় তাদের অপরাধের কথা, ওভাবেই নির্মম মৃত্যু হয় আসামিদের (গল্প ‘দণ্ড উপনিবেশে’); এক লোক সারা জীবন আইনের দরজার বাইরে অপেক্ষা করে থাকে ভেতরে ঢোকার জন্য, তারপর যখন সে মারা যাচ্ছে, তাকে বলা হয়, এই দরজাটা শুধু তার জন্যই বানানো হয়েছিল (গল্প, ‘আইনের দরজায়’); এক ব্যবসায়ী ছেলে বিয়ে করে স্বাধীনভাবে সংসার করতে চায় আর এতে খেপে গিয়ে তার বৃদ্ধ বাবা, জীর্ণ নোংরা আন্ডারওয়ার পরা এক ক্ষমতা-উন্মাদ বুড়ো, ছেলেকে পানিতে ডুবে মরার মৃত্যুদ- দিয়ে বসেন (গল্প ‘রায়’); এক বৃদ্ধ গ্রাম্য ডাক্তার গভীর রাতে আজব এক ঘোড়াগাড়িতে চড়ে, তার নিজের বাসার কাজের মেয়েটাকে ধর্ষণোদ্যত এক লোকের হাতে ফেলে রেখে রোগী দেখতে যান দূরের গাঁয়ে, রোগীর শরীরে জ্বলজ্বল করছে ফুলের মতো একটা ক্ষত, আর সেখানে কিলবিল করছে পোকা, আর গ্রামবাসীরা ডাক্তারের রোগ সারানোর ব্যর্থতার শাস্তি হিসেবে এই অসহায় ডাক্তারকে শুইয়ে দেয় বিছানায়, রোগীর পাশে (গল্প ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’); সম্রাটের বার্তা নিয়ে এক বাহক কোনো দিনই পৌঁছাতে পারে না তার গন্তব্যে, পথে শুধু বাধা আর বাধা, আক্ষরিক অর্থে গোলকধাঁধার মতো (গল্প ‘সম্রাটের কাছ থেকে একটি বার্তা’); এক লোকের পেশাই হচ্ছে না খেয়ে থাকা, ক্ষুধা-শিল্পী সে, একদিন ওভাবে উপোস করেই সে মারা যায়, আর মরার আগে বলে যায়, তার খাওয়ার মতো কোনো খাবার এই পৃথিবীতে নেই বলেই অনশনই ছিল তার শিল্প (গল্প, ‘এক অনশন-শিল্পী’); এক কিশোর ছেলে, কার্ল রসমান, বাসার কাজের মেয়ের গর্ভে অবৈধ সন্তানের জন্ম দিলে তার বাবা-মা তাকে অভিবাসীদের জাহাজে তুলে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেন, এবার এই ভিনদেশে শুরু হয় তার বারবার নানা বিচারের মুখোমুখি হওয়া (উপন্যাস আমেরিকা, প্রথম অধ্যায় এ বইয়ের ‘দি স্টোকার’); এক মেয়ে ইঁদুর, নাম জোসেফিন, মঞ্চে গান গায়, তার জাতির একমাত্র আশা-ভরসা সে, এমনটাই তার দাবি, আর আমরা তার জীবনের গল্পটি শুনি এক কথকের মুখে যে জোসেফিনের দাবিগুলোর প্রতি সন্দিহান কিন্তু একই সঙ্গে বিস্ময়বিমুগ্ধ যে মঞ্চের বাইরের এই অতি সাধারণ মেয়ে ইঁদুরটি মঞ্চে কেন এত পূজনীয় (কাফকার শেষতম গল্প ‘গায়িকা জোসেফিন অথবা ইঁদুর-জাতি’)।

বলে শেষ করা যাবে না কীসব বিচিত্র, আপাত-অর্থহীন, মানসিক ও শারীরিক নৃশংসতার ঘটনা অবলীলায় ঘটে যেতে থাকে কাফকার গল্পের পরে গল্পে, ডায়েরির পাতায় পাতায়; বারবার মনে হয়, সবটা দুঃস্বপ্নে ঘটছে, সবটাতে গল্পের চরিত্রেরা যেন অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তাদের জীবনের মানে, কিংবা খুঁজে ফিরছে খোদার সাহায্যের হাত, মালিকের অনুগ্রহ বা শাসকের কৃপাদৃষ্টি। নাকি পুরোটাই ঠাট্টা, নাকি পুরোটাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরের ইউরোপিয়ান অনিশ্চিতির এক গদ্যকবিতা, তখনকার সামাজিক-বাস্তবতার এক কমিক উপস্থাপন (এখানে মনে পড়ে যায় ১৯০৮-এর দিকে চার্লি চ্যাপলিন-হ্যাট-পরা কাফকার বিখ্যাত ছবিটার কথা; চ্যাপলিন বাস্তবেই প্রিয় ছিল কাফকার)?

কতভাবেই-না কাফকা পড়া যায় – ডাক্তারি শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কাফকা পড়ার চল আছে (অর্থাৎ কাফকার ‘ক্লিনিক্যাল ব্যাখ্যা’), তেমনি শ্রেণীবৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও কাফকাকে নিয়ে লেখা হয়েছে কয়েক শ বই (কাফকার ‘ম্যার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যা’), আর তেমনই ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদী চোখ দিয়ে কাফকার প্রতিটা লাইন, এমনকি প্রতিটা শব্দের, আর কমা, সেমিকোলন ব্যবহারেরও ব্যাখ্যা হয়েছে কতবার (কাফকার ‘ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা’)। আরো কত কত ব্যাখ্যা হয়েছে এই লেখকের লেখার থিম, তাঁর ব্যবহৃত ইমেজ ও লেখার আবহ নিয়ে- তার ইয়ত্তা নেই। তবে সবকিছু বলা হয়ে যাওয়ার পরেও, বারবারই, কাফকার পোস্টকার্ড ইমেজটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘যন্ত্রণা’ ও ‘জ্বালা-পীড়া-দুঃখ-কষ্টে’র। রোনাল্ড হেয়ম্যানের ১৯৮১-তে প্রকাশিত যথেষ্ট বিখ্যাত কাফকা-জীবনীর একেবারে শেষে নির্ঘণ্ট অংশ ‘ফ্রানৎস কাফকা’ নামের পাশের ভুক্তিগুলোর দিকে তাকালে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়:
কাফকা, ফ্রানৎস: ‘আত্মহত্যার বোধ’; ‘আত্মঘৃণা’; ‘আনন্দময় অভিজ্ঞতাগুলো মনে রাখতে পারার অক্ষমতা’; ‘শব্দের জ্বালাতনে পীড়িত’; ‘নিজেকে অপছন্দ করার বাধ্যতামূলক আচরণ’; এমনকি এক রহস্যময় ভুক্তি ‘জীবন যে খাদ্য দেয় তার প্রত্যাখ্যান’।
এটাই আমাদের সেই চিরচেনা কাফকা: খ্যাপাটে, যন্ত্রণাপীড়িত, আত্মবিশ্বাসহীন, নিজের প্রতি ঘৃণায় ভরা এক শিক্ষিত চেক যুবক, যার অদ্বিতীয় মেধার পূর্ণ স্বীকৃতি তাঁর নিজের সামান্য একচল্লিশ বছরের জীবদ্দশায় মেলেনি।
আরেকটু পণ্ডিতি ঢঙে বললে, আমাদের চিরচেনা কাফকার ছবিটা এমন: এক রহস্যময় প্রতিভা, নিঃসঙ্গ এক ইউরোপিয়ান নস্ত্রাদামুস্ (ভবিষ্যদ্বক্তা), যার সৃজনী-ক্ষমতাকে তাঁর সমকালীন লেখকেরা উপেক্ষা করেছিলেন আর যিনি ইহুদিদের প্রতি এক বৈরী পরিবেশে বাবার তাচ্ছিল্য ও অফিসের পীড়ন সয়ে নেমে গিয়েছিলেন তাঁর কুহকী সাধু-সন্তসুলভ চিন্তার গভীরতম প্রদেশে আর ওখান থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন একদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে, সোভিয়েত গুলাগ আসবে, আমলাতন্ত্র পৃথিবী জুড়ে আরো পোক্ত হবে এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিল থেকে আরো জটিলতর হয়ে উঠবে।

কাফকাকে দেখার এই প্রতিষ্ঠিত ঢং, কাফকা-ব্যাখ্যার সময় শব্দচয়নের এই যে চিরচেনা ভঙ্গি, রোনাল্ড হেয়ম্যানের বইয়ের ‘কাফকা’ নামের পাশে নির্ঘণ্টের এই যে ক্লিশে ভুক্তিগুলো, এর নামই ‘কাফকা-মিথ’। আমরা যত যা-ই বলি না কেন, আমাদের ঐ কাফকা-মিথই ভালো লাগে, মিথের ঐ কাফকাকেই আমরা ভালোবাসি, পূজা করি, পছন্দ করি। তবে কথা হচ্ছে, এসব মিথের গোঁড়ায় আছে বিরাট গলদ এই কাফকা-মিথের অনেকটুকু সত্যিই মিথ বা অসত্য অনুমান।

সত্য তাহলে কী, তা জানার জন্য আমাদের নির্মোহ চোখে তাকাতে হবে কাফকার জীবনের দিকে। কাফকার লেখাগুলো অসংখ্য আত্মজীবনীর উপাদানে ভরপুর (কিন্তু তার মানে এমন না যে কাফকার সাহিত্যকর্ম তাঁর কোনো লুকানো-সাজানো আত্মজীবনী)। কাফকা আসলে বলেওছিলেন যে, তাঁর কোনো কোনো লেখা ‘সত্যিই একদম ব্যক্তিগত স্বভাবের কিছু হিজিবিজি কাটা বা খসড়া নোট টোকার বেশি কিছু না’; কিন্তু জীবনকে সাহিত্যে পরিণত করার তাঁর যে মূল লক্ষ্য ছিল, সেখানে তিনি ঠিকই ঐ ব্যক্তিগত পর্যায়কে অতিক্রম করে, সমগ্র মানব-অস্তিত্বের মৌলিক চেহারাটিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন ‘পৃথিবীকে তার শুদ্ধ, সত্য ও অপরিবর্তনীয় রূপে তুলে ধরতে’ (ডায়েরি, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭)।
কাফকাকে নিয়ে তৈরি হওয়া মিথগুলো খণ্ডানোর জায়গা এটা নয়, আর তা সাধারণ বাঙালি পাঠকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছুও নয়। মিথ বলি, আর সত্যই বলি, এই ‘ভূমিকা’র উদ্দেশ্য পরিষ্কার: ১. কাফকার জীবনের মূল দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা (তাতে যদি কোনো-না-কোনো মিথ এমনিতেই খণ্ডানো হয়ে যায়, তো ভালো), যাতে করে তাঁর সময়কার সমাজ, রাজনীতি ও তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনা থেকে পাঠকের কাফকা বুঝতে কিছুটা সুবিধা হয়; ২. কাফকা-সাহিত্যের নানা ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব কিছুটা ছুঁয়ে যাওয়া যাতে করে পাঠক আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফ্রানৎস কাফকার জীবন ও সাহিত্যকর্ম বোঝার ব্যাপারে এবং এর সূত্র ধরে একসময় প্রবেশ করেন শুধু কাফকার নয় বরং সমগ্র আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভুবনে; এবং ৩. পাঠককে এ কথাটুকু বলা যে, যেমনটা আলব্যের কাম্যু বলেছিলেন, কাফকার মূল স্বাদ অনুভব করার জন্য তাঁর নিজের লেখা বারবার পড়তে হবে; আর তাঁকে নিয়ে লেখা যত কম পড়া যায় ততই ভালো। মিথের কাফকার বিষয়ে শুধু এটুকুই জানা ভালো যে তাঁকে নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে এই এই মিথ বিদ্যমান আছে, কিন্তু মিথের কাফকা মাথায় রেখে কাফকা-পাঠ তাঁর সরল-সুন্দর গল্পগুলো পাঠের আনন্দ শুধু বাধাগ্রস্তই করবে।

কাফকার জীবনে প্রবেশের আগে আসুন আমরা শুধু একবার দেখে নিই প্রধান দশটি কাফকা-মিথ। আবারও বলছি, এখানে ‘মিথ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে হয় অর্ধসত্য বা পুরো অসত্য কিছুকে। প্রতিটা মিথের পাশে ব্র্যাকেটে তা সত্য না অসত্য নাকি অর্ধসত্য সেটা বলে দেওয়া হলো:

১. কাফকা তাঁর জীবদ্দশায় লেখক হিসেবে বলতে গেলে অপরিচিত ছিলেন; লেখা প্রকাশে তাঁর ছিল বিরাট অনীহা (অর্ধসত্য)
২. কাফকা তাঁর সমস্ত লেখা ম্যাক্স ব্রডকে তাঁর মৃত্যুর পরে পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন (সত্য)
৩. ভয়ংকর এক আমলাতান্ত্রিক চাকরি তাঁকে নিষ্পেষিত ও শেষ করে দিয়েছিল (অর্ধসত্য)
৪. কাফকার বাবা ছিলেন একজন নিষ্ঠুর একনায়ক; ভালো কিছুই ছিল না তাঁর বাবার মধ্যে (বিতর্কিত)
৫. কাফকা জীবনের বহু বছর যক্ষ্মা রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন (সত্য)
৬. কাফকা তাঁর জীবনে আসা নারীদের সঙ্গে অসম্ভব রকমের সৎ ছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ ও অসহায় (অসত্য)
৭. প্রাগে জার্মানভাষী ইহুদি হিসেবে কাফকা ছিলেন দ্বিগুণ টানাপোড়েনে তিনি ছিলেন সংখ্যালঘুদের মধ্যেও সংখ্যালঘু; সংখ্যাগুরু চেকভাষীদের মধ্যে এক সংখ্যালঘু জার্মানভাষী লেখক এবং চারদিকের অসংখ্য খ্রিষ্টানের মধ্যে সংখ্যালঘু এক ইহুদি (অর্ধসত্য)
৮. কাফকার সাহিত্যকর্ম তাঁর এই জোড়া সংখ্যালঘুত্বের ইহুদি অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। তাঁর লেখা বুঝতে হলে তাঁর ইহুদিত্বকে আগে বুঝতে হবে (বিতর্কিত সত্য)
৯. কাফকার সাহিত্যকর্ম, যতই অবিশ্বাস্য মনে হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বন্দিশিবিরের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিল যুদ্ধের প্রায় কুড়ি বছর আগেই (সত্য, তবে ব্যাপারটি এমন নয়)
১০. নাৎসিরা কাফকার লেখা নিষিদ্ধ করেছিল এবং পুড়িয়ে ফেলেছিল (অর্ধসত্য; মূলত অসত্য)

২.

পরিবার

১৮৮৩ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে ফ্রানৎস কাফকার জন্ম তখনকার অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগে, এই প্রাচীন শহরটির ওল্ড টাউন স্কোয়ারের একদম কাছে। প্রাগ তখন বোহেমিয়া রাজ্যের রাজধানী। কাফকারা ছিলেন মধ্যবিত্ত, আশ্কেনাজি সম্প্রদায়ের ইহুদি। তাঁর বাবা হারমান কাফকা (১৮৫২-১৯৩১) ছিলেন ইয়াকব কাফকার চতুর্থ সন্তান; ইয়াকব পেশায় ছিলেন ধর্মীয় অনুশাসন-মানা কসাই। ইয়াকবই পরিবারটিকে দক্ষিণ বোহেমিয়ার ইহুদি অধ্যুষিত পল্লি ওসেক্ থেকে প্রাগে নিয়ে আসেন। কিছুদিন সেনাবাহিনীতে, কিছুদিন ভ্রাম্যমাণ সেলস্ম্যান হিসেবে কাটিয়ে হারমান কাফকা তাঁর স্যুভেনির, ফ্যান্সি জিনিসপত্র আর কাপড়চোপড়ের দোকান চালু করেন প্রাগে, ওল্ড টাউন স্কোয়ারে। তাঁর অফিসে কাজ করতেন ১৫ জন কর্মচারী (এতে বোঝা যায়, একদম ছোট ছিল না তাঁর ব্যবসা) আর তাঁর ব্যবসার লোগো ছিল দাঁড়কাক (চেক ভাষায় kavka)। কাফকার মা ছিলেন ইয়ুলি কাফকা (১৮৫৬-১৯৩৪), ইয়াকব লোউভি নামের এক প্রতিষ্ঠিত রিটেল ব্যবসায়ীর মেয়ে; শিক্ষার দিক থেকে তাঁর স্বামীর ওপরে। কাফকার বাবা-মা বাসায় কথা বলতেন ইদ্দিশ (হিব্রু বর্ণমালায় লেখা আশ্কেনাজি ইহুদি মূল থেকে তৈরি হওয়া, গোঁড়া ইহুদিদের ব্যবহৃত হিব্রু ও সেমেটিক সংমিশ্র্রণের এক জার্মান ভাষার রূপ) ঘেঁষা এক জার্মান ভাষায়, কিন্তু ‘শিক্ষিত জার্মান’ ভাষা তখন যেহেতু ছিল সমাজে ও চাকরিতে উপরে ওঠার জন্য জরুরি, তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের ‘শিক্ষিত জার্মান’ ভাষা শিখতেই অনুপ্রাণিত করতেন। কাফকারা ছিলেন মোট ছয় ভাই বোন, এঁদের মধ্যে ফ্রানৎস কাফকা সবার বড়। ফ্রানৎসের বয়স ছয় হওয়ার আগেই তাঁর অন্য দুই ভাই গেয়র্গ ও হেইনরিখ একদম শিশু বয়সেই মারা যান। এরপর জন্ম নেন ফ্রানৎসের তিন বোন: গ্যাব্রিয়েল, ডাকনাম এলি (১৮৮৯-১৯৪১); ভ্যালেরি, ডাকনাম ভাল্লি (১৮৯০-১৯৪২); ওটলি, ডাকনাম ওট্লা, আমৃত্যু বড় ভাই ফ্রানৎস কাফকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এই ওট্লা (১৮৯২-১৯৪৩)। তিন বোনের মৃত্যুসন দেখে নিশ্চয়ই আর বলতে হয় না যে এঁরা তিনজনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসি বন্দিশিবিরে প্রাণ হারান।
কাফকারা শুরুর দিকে থাকতেন একটা ছোট, ঠাসাঠাসি অ্যাপার্টমেন্টে। তাঁদের বাসায় এক কাজের মেয়ে থাকত (কাফকার বেশ কিছু গল্প ও তিনটি উপন্যাসে বাসার ঝি বা কাজের মেয়ের কথা বারবার ঘুরেফিরে আসে)। কাফকার ঘর প্রায়ই থাকত অনেক ঠান্ডা; প্রাগে বিদ্যুৎ তখনো আসেনি, হিটিং সিস্টেমের তো প্রশ্নই আসে না; প্রচণ্ড শীতে কয়লাই ছিল একমাত্র ভরসা। ১৯১৩-র নভেম্বরে কাফকা পরিবার বেশ বড় একটা অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠে (প্রায় সাত-আটবার বাসা বদল করেন হারমান কাফকা; সবগুলোই প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারের আশপাশে), যদিও তত দিনে এলি ও ভাল্লির বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাঁরা কাফকার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে তাঁদের স্বামীদের সঙ্গে বাস করছেন। ১৯১৪-র আগস্টে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেভাগে, এ দুই বোন বাবা-মায়ের বড় অ্যাপার্টমেন্টে ফেরত আসেন, যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে তাঁদের স্বামীরা কোথায় তা তাঁরা জানতেন না। দুজনেরই তখন বাচ্চা কোলে। ফ্রানৎস কাফকা, তাঁর বয়স তখন ৩১, ভাল্লির ফেলে আসা নীরব নিশ্চুপ অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠেন; জীবনে এই প্রথম তাঁর একা থাকা। কাজের দিনগুলোতে বাবা-মা দুজনেই কাজে যেতেন, ইয়ুলি কাফকা মাঝেমধ্যে টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করতেন স্বামীর দোকানে, ব্যবসা দেখাশোনায়। কাফকার শৈশব তাই ছিল মূলত তিন বোনের সঙ্গে, কিছুটা একা কাজের মেয়ে আর ঠিকা-ঝিদের হাতেই আসলে বেড়ে উঠেছিলেন এই চার ভাইবোন।

শিক্ষা

১৮৮৯ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত কাফকা প্রাগের তখনকার মাসনা স্ট্রিটে ‘জার্মান বয়েজ এলিমেন্টারি স্কুলে’ পড়াশোনা করেন। তাঁর বয়স ১৩ হলে ‘বার মিৎজভাহ্’ (ইহুদি ছেলেদের বালেগ হওয়ার ধর্মীয় অনুষ্ঠান) অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কাফকার ছোটবেলার ধর্মীয় পড়াশোনার শেষ হয়। কাফকা কখনোই ইহুদি উপাসনালয় সিনাগগে যেতে পছন্দ করতেন না; বছরে মাত্র চারবার বাবার সঙ্গে ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানাদির জন্য সিনাগগে যেতেন।
১৮৯৩-এ এলিমেন্টারি স্কুল ছেড়ে কাফকা প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারের ওপর অবস্থিত কিন্স্কি প্যালেসে (এটারই নিচতলায় ছিল তাঁর বাবার দোকান) কড়া শাসনের ও ক্ল্যাসিক্যাল শিক্ষাদান রীতিতে চালানো জার্মান মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন। এখানে পড়ার মাধ্যমে ছিল জার্মান, কিন্তু কাফকা চেক বলতে ও লিখতে পারতেন। তাঁর চেক ভাষায় দখলের জন্য তিনি প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন, কিন্তু নিজেকে তিনি চেক ভাষায় সাবলীল মনে করতেন না। ১৯০১-এ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে কাফকা প্রাগের জার্মান কার্ল-ফার্দিনান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুরু করেন রসায়নে, কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে আইনের ছাত্র হয়ে যান। আইন নিয়ে পড়াশোনা তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ ছিল না, কিন্তু তাঁর বাবা খুশি হয়েছিলেন, কারণ আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। এখানে কাফকার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক ফেলিক্স ভেলট্শ্, লেখক অস্কার বাউম, ফ্রানৎস ভেরফেল্ প্রমুখ। প্রথম বছরের পড়া শেষ হতেই কাফকার সঙ্গে পরিচয় হয় ম্যাক্স ব্রডের। ম্যাক্সও ছিলেন আইনের ছাত্র। শুরু হয় কিংবদন্তিতে রূপ নেওয়া এক আজীবন বন্ধুত্বের। ম্যাক্স ব্রডই প্রথম খেয়াল করেন খুব কম কথা বলা, লাজুক ধরনের এই ছেলেটির মেধা ও প্রজ্ঞা গভীর ও অগাধ। জীবনভর কাফকা খুব উৎসুক পাঠক ছিলেন। ম্যাক্স ও তিনি একসঙ্গে, ম্যাক্সের পরামর্শে, মূল গ্রিক ভাষায় প্লেটোর Protagoras পড়েন এবং কাফকার পরামর্শে তাঁরা দুজনে আবার একসঙ্গে মূল ফরাসিতে ফ্লবেয়ারের Sentimental Education ও The Temptation of Saint Anthony পড়েন। কাফকা চারজন লেখককে তাঁর ‘সত্যিকারের রক্তের ভাই’ বলে ভাবতেন: দস্তয়ইয়েফ্স্কি, ফ্লবেয়ার, ফ্রানৎস গ্রিলপারসার ও হাইনরিখ ফন ক্লাইস্ট । এর পাশাপাশি চেক সাহিত্য ভালোবাসতেন কাফকা আর গ্যেয়টেকে খুব পছন্দ করতেন। ১৯০৬ সালের ১৮ জুলাই তিনি আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি পান এবং এর পরে এক বছর আদালতে বাধ্যতামূলক বেতনহীন ক্লার্কের চাকরি করেন। পড়াশোনার ক্ষেত্রে কাফকার প্রিয় বিষয়, অনুমান করি, ছিল দর্শন ও ধর্ম। কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি কোনো বিশেষ টান তিনি দেখাননি। ১৯১৭ সালের পরে তিনি পাস্কাল, শোপেনহাউয়ার, সাধু অগাস্তিনের Confessions, শেষ দিককার টলস্টয়ের খ্রিষ্টীয় ডায়েরিগুলো– এসব পড়েন। এঁদের মধ্যে অস্তিত্ববাদী দার্শনিক সোরেন কির্য়েকেগার্ড কাফকার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেন বলে ধারণা করা হয়। অনেক কাফকা গবেষকে বিশ্বাস করেন, ডেনিশ এই দার্শনিকের মধ্যেই আছে কাফকাকে বোঝার অন্যতম কার্যকর চাবিকাঠি। কাফকার উপন্যাস দুর্গ-এর প্রথম প্রকাশের এপিলোগে ম্যাক্স ব্রডও সে কথা উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে কাফকা কির্য়েকেগার্ডকে যেভাবে বুঝেছিলেন, তাতে মনে হয় না, কির্য়েকেগার্ডের পক্ষে কাফকার লেখায় বিরাট কোনো ছাপ ফেলা সম্ভব ছিল। কাফকা ও কির্য়েকেগার্ড– এ প্রসঙ্গে আমরা শেষ দিকে আরেকটু আলোচনা করব।

কর্মজীবন

কাফকা মোট দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং একটি বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগে মাথা ঘামান। প্রথম চাকরিটি ছিল এক ইতালিয়ান বিমা কোম্পানি Assicurazioni Generali-তে। ১৯০৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯০৮-এর ১৫ জুলাই পর্যন্ত ইতালিয়ান এই কোম্পানির প্রাগের অফিসে খুব অসুখী এক সময় কাটে তাঁর। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তাঁকে বিষর্ম করে তোলে; বেতনও কম আর সেই সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকা লেখালেখির জন্য সময় দেওয়া যাচ্ছে না, এ দুটো সত্যই পীড়া দিতে থাকে তাঁকে। তাঁর অনেক চিঠিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৫ জুলাই ১৯০৮-এ চাকরি থেকে পদত্যাগ করার দুই সপ্তাহ পরে তিনি সরকারি বিমা প্রতিষ্ঠান Workers’ Accident Insurance Institute for the Kingdom of Bohemia-তে যোগ দেন। অফিসে তাঁর দায়িত্ব ছিল মিল-কারখানার শ্রমিকেরা কাজ করতে গিয়ে আহত হলে, সেসব দুর্ঘটনার তদন্ত করা ও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করা; তখনকার দিনে মেশিনে কাটা পড়ে হাতের আঙুল হারানো কিংবা অন্য কোনো অঙ্গের ক্ষতি হওয়া ছিল বেশ নৈমিত্তিক ঘটনা। আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম ম্যানেজমেন্ট গুরু পিটার ড্রাকারের দাবি যে ফ্রানৎস কাফকাই আজকালকার মিল-কারখানায় ব্যবহৃত মাথার শক্ত হেলমেটের মতো জিনিসটার উদ্ভাবক, যদিও এ তথ্যের সমর্থনে কাফকার অফিসের কাগজপত্র থেকে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি (অনুসন্ধিৎসু পাঠক সাম্প্রতিক প্রকাশিত, বিখ্যাত কাফকা স্কলার স্ট্যানলি কর্নগোল্ড ও অন্যদের সম্পাদিত Franz Kafka – The Office Writings বইটি ঘেঁটে দেখতে পারেন)। কাফকার বাবা তাঁর ছেলের এই চাকরিকে Brotberuf বা ‘রুটির চাকরি’ বলে খোঁটা দিতেন; অসংখ্য লেখায় কাফকা নিজেও অফিস-জীবনের অনেক কিছু নিয়ে তাঁর মনঃকষ্টের কথা বলে গেছেন — এর মধ্যে অন্যতম বেশ কিছু ডায়েরি এন্ট্রিতে অফিসের তোষামোদি সংস্কৃতি, বস্-তোষণ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর কিছু কমিক্যাল লেখা। কিন্তু এই একই মানুষ অফিসে কাজের বেলায় ছিলেন খুঁতখুঁতে, যত্নশীল, সৃজনশীল এবং নিবেদিতপ্রাণ। এরই ফলস্বরূপ দ্রুত অনেকগুলো পদোন্নতি হয় তাঁর; এবং নভেম্বর ১৯১৫ নাগাদ তাঁর বেতন গিয়ে দাঁড়ায় বছরে ৫ হাজার ৭৯৬ ক্রাউন, যার মূল্য, তখনকার দিনে, এখনকার হিসাবে মোটামুটি মাসে প্রায় সোয়া ৬ লাখ বাংলাদেশি টাকার মতো। কাফকার সময়ে তাঁরই পরিদর্শন করা অফিসগুলোয় শ্রমিকদের গড় বেতন ছিল বছরে ৯০০ থেকে ১০০০ ক্রাউন। দৈনিক মাত্র ছয় ঘণ্টা অফিসে চাকরি করে মাসে ৬ লাখ টাকার উপরে আয় করা কাফকার চাকরিকে কোনোভাবেই বাজে, নিম্নপদের কোনো চাকরি বলা যাবে না। ১৯১৮-র জানুয়ারিতে কাফকার বাবা ৫ লাখ ক্রাউন দিয়ে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন, যার মূল্য তখনকার দিনে আজকের প্রায় ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সঙ্গে তুলনীয়। জেমস্ হয়েস্-এর Excavating Kafka (২০০৮) এবং পিটার-আন্দ্রে অল্ট এর সাড়া-জাগানো জার্মান কাফকা-জীবনী Der ewige sohn (The Eternal Son; ইংরেজি অনুবাদ এখনো বের হয়নি)-এর এই তথ্য কাফকার নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তাঁর চাকরির ভয়ংকরত্ব বিষয়ে গড়ে ওঠা মিথের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে। পদোন্নতি পেয়ে একসময় কাফকার কাজ হয় ক্ষতিপূরণ দাবির যথার্থতা নির্ণয় করা, রিপোর্ট লেখা, ব্যবসায়ীদের আবেদন নিষ্পত্তি করা ইত্যাদি। এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন (Annual Report:) তৈরি করার মতো বড় কাজটিও কাফকা করেছেন অনেক বছর। তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির ও সম্পাদনার কাজে তাঁর দক্ষতার বিশেষ প্রশংসা করতেন। দুপুর দুটোয় শেষ হয়ে যেত কাফকার অফিসের কাজ, অতএব সাহিত্যের জন্য দেওয়ার মতো সময় তাঁর মিলত যথেষ্ট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যখন প্রাগের যুবকদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগ দিতে হচ্ছে, তখন অফিসের ঊর্ধ্বতনেরা কাফকাকে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘জরুরি প্রয়োজন’ ঘোষণা করার কারণেই তাঁর আর যুদ্ধে যাওয়া লাগেনি। শুধু সেবারই নয়, পরে তিনি অসুস্থ হলে যেভাবে বারবার তাঁর অফিস তাঁর জন্য দীর্ঘ সব ছুটি মঞ্জুর করেছে এবং শেষে অতি অল্প বয়সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পূর্ণ পেনশন নিয়েই কাফকাকে যেভাবে চাকরিতে ইস্তফা দিতে দেওয়া হয়েছে — এর সবই দানবীয় এক অফিসে আমলাতান্ত্রিক অন্ধকারে হাতড়াতে থাকা ফ্রানৎস কাফকা মিথের বিপরীতে আমাদের নতুন করে তাঁকে নিয়ে ভাবতে উৎসাহ জোগায়।

১৯১১ সালে কাফকার বোন এলির স্বামী কার্ল হারমান ও ফ্রানৎস কাফকা মিলে প্রাগের প্রথম অ্যাজবেস্টস্ কারখানা খোলায় মনস্থির করেন। মেয়ের বিয়েতে কাফকার বাবার দেওয়া যৌতুকের টাকাই ছিল এ ব্যবসার মূল পুঁজি। প্রথমদিকে এই ব্যবসার প্রতি কাফকা খুবই আগ্রহ দেখান, পরে তাঁর লেখালেখিতে ব্যাঘাত ঘটছে বলে তিনি এর ওপর বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।

জীবনের এরকম এক সময়েই তাঁর পরিচয় ঘটে এক ইদ্দিশ নাট্যদলের সঙ্গে। প্রাগে নাটক মঞ্চায়ন করতে আসা ইদ্দিশ অভিনেতাদের দলটির নেতা ইজাক লাউভির (দুই রকম বানানে Isaak Lowy এবং Jitskhok Levi) সঙ্গে কাফকার গাঢ় বন্ধুত্ব হয়। ১৯১১-এর অক্টোবরে এদের একটি নাটক দেখে কাফকা পরের টানা ছয় মাস ইদ্দিশ ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে ডুবে যান। এই আগ্রহ থেকেই পরে ডানা মেলে কাফকার ইহুদিধর্মের (Judaism) প্রতি আগ্রহের। এর কাছাকাছি সময়েই কাফকা মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে বাকি জীবনের জন্য শাকাহারী (Vegetarian) হয়ে যান। ১৯১৫ সালে তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার ডাক আসে, কিন্তু আগেই যেমন বলা হয়েছে, সরকারি কাজে তাঁর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে অফিস তাঁকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। পরে অবশ্য, ১৯১৭ সালে, তিনি নিজেই কিছুটা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতি রোমান্টিসিজম ও কিছুটা রহস্যময় এক কারণে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখান, কিন্তু তত দিনে যক্ষ্মার কারণে ডাক্তারি দৃষ্টিকোণ থেকেই সেনাবাহিনী তাঁকে নিতে অপারগতা জানিয়ে বসে। ১৯১৮ সালে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, তাঁর অফিস শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পেনশন মঞ্জুর করে। এর পরের ছয়টি বছর মোটামুটি নানা স্যানাটোরিয়ামে (হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যনিবাস) ঘুরে ঘুরেই জীবন কাটে তাঁর।

বোনের স্বামীর সঙ্গে অ্যাজবেস্টস্ ফ্যাক্টরি চালু করার আকুতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে (তারিখ: ৫ নভেম্বর, ১৯১৫) হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের সম্রাট ফ্রানৎস জোসেফের চালু করা অস্ট্রিয়ান যুদ্ধ-বন্ডে বিনিয়োগ করে ১৫ বছর ট্যাক্স-ফ্রি বার্ষিক ৫.৫% সুদ হারে লাভ পাওয়ার জন্য বড় অঙ্কের টাকা খাটানো এবং নিবেদিতপ্রাণ হয়ে অফিসে কাজ করে তাঁর বারবার পদোন্নতি পাওয়ার ও মোটা বেতনের কর্মকর্তা হওয়ার ঘটনাগুলো আমাদের তাঁর অপার্থিব, সাধু-সন্ত রূপের উল্টোদিকে তাঁকে এক প্রখর বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, বৈষয়িক ও পার্থিব মানুষ হিসেবে দেখতে প্রণোদনা জোগায়।

কাফকার বাবা– হারমান কাফকা

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে খুব কম লেখকের বাবাই ফ্রানৎস কাফকার বাবা হারমান কাফকার মতো বিনা অপরাধে এভাবে নিন্দিত ও গবেষকদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। যেকোনো কাফকা-গবেষণায়ই হারমান কাফকা এক অন্যতম বড় চরিত্র এবং তাঁর চেহারাটি সেখানে সব সময়ই নিষ্ঠুর, অনুভূতিশূন্য এক পিতার, যিনি তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তানকে আজীবন আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিলেন, বাস্তবিক অর্থেই তাকে পোকার চেয়ে বেশি সম্মান দেখাননি, যার ফলে সন্তানটি বেড়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাসহীন এক ব্যর্থ মানুষ হিসেবে।

কাফকা-গবেষক স্ট্যানলি কর্নগোল্ডের ভাষায় হারমান কাফকা ছিলেন ‘বিশালদেহী, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী এক ব্যবসায়ী’; আর ছেলে ফ্রানৎস কাফকার মতে, তিনি ছিলেন, ‘শক্তি, স্বাস্থ্য, ক্ষুধা, উঁচু গলা, বাকপটুতা, নিজের প্রতি মুগ্ধতা, পার্থিব কর্তৃত্ব, সহ্যক্ষমতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং মানুষের স্বভাব সম্বন্ধে জ্ঞানের দিক থেকে একজন সত্যিকারের কাফকা’ (‘যেমনটা আমি কখনোই হতে পারিনি,’ কাফকা লিখেছেন)।

বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি কাফকা তাঁর আত্মবিশ্লেষণের সবচেয়ে দামি ও বড় দলিল তাঁর বিখ্যাত বাবাকে লেখা চিঠিতে ((Letter to His Father) লিখে রেখে গেছেন। ১৯১৯ সালের নভেম্বরে লেখা প্রায় ১০০ পাতার এই চিঠি ফ্রানৎস কাফকার আত্মজীবনীমূলক প্রধান রচনা, যার উল্লেখ যেকোনো প্রামাণ্য কাফকা-গবেষণা বইয়ে থাকবেই। তিনি চেয়েছিলেন, বাবাকে এই চিঠি পাঠিয়ে বাবার সঙ্গে সম্পর্কের একটি দফারফা করবেন। কিন্তু তাঁর প্রিয় ছোট বোন ওট্লা এবং তাঁর মা তাঁকে চিঠিটি পাঠাতে নিষেধ করেন। কাফকা এটিকে ব্যক্তিগত এক দলিল হিসেবেই রেখে দেন, পরে ১৯২০ সালে তাঁর প্রেয়সী মিলেনা য়েসেন্স্কাকে তিনি চিঠিটি পড়তে দেন মিলেনার দিক থেকে তাঁকে বোঝার সুবিধা করে দিতে।

এ চিঠিতেই আমরা দেখতে পাই বাবা হারমান কীভাবে ছেলেকে ‘টেবিলের চারপাশে তাড়িয়ে বেড়াতেন’, কীভাবে তাঁকে হুমকি দিতেন (‘আমি তোমাকে মাছের মতো ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলব’), কীভাবে খুব ছোটবেলায় এক রাতে ছেলে কাঁদতে থাকলে বাবা তাঁকে বিছানা থেকে তুলে বাড়ির বাইরে পেছনের বারান্দায় ফেলে রেখেছিলেন, যার ফলে ছেলের মনে হয়েছিল বাবার তুলনায় সে অতি তুচ্ছ কিছু। কাফকার ভাষ্যমতে, তাঁর বাবা দোকানের কর্মচারীদের ওপর জুলুম করতেন, খুব খোঁটা দিয়ে কথা বলতেন তাঁর সন্তানদের সঙ্গে এবং একবার এসব জুলুমে ত্যক্ত হয়ে দোকানের সবাই চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার মনস্থির করলে ছেলেকেই সবাইকে এক-এক করে বুঝিয়ে ঠান্ডা করতে হয়েছিল। বাবাকে কাফকার ‘দৈত্য’ বলে মনে হতো। বাবার সঙ্গে সাঁতারের পুলে গেলে, বাবার বিশাল বপুর সামনে তাঁর নিজেকে মনে হতো, ‘একটা ছোট কঙ্কাল, অনিশ্চিত, ডাইভিং বোর্ডের ওপরে খালি পায়ে ঘোরাঘুরি করছি, পানি ভয় পাচ্ছি; সাঁতারের সময় তুমি যেভাবে হাত-পা চালাও তা আমার পক্ষে করা সম্ভব না।’ খাবার টেবিলে বাবা হারমান গপগপ করে গরম ধোঁয়া ওঠা খাবার গিলতেন বড় বড় গাল ভরে, মাংসের হাড় চিবাতেন কড়মড় করে, কিন্তু তাঁর সন্তানদের বলতেন যে ওভাবে খাওয়া নিষেধ। (চিঠির এ অংশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কাফকার গল্পের মাংসভোজী অনেক চরিত্রের কথা, যেমন আমেরিকা উপন্যাসের ভোজনপ্রিয় গ্রিন কিংবা ‘এক অনশন-শিল্পী’ গল্পের খসড়ার সেই নরমাংসভোজী চরিত্রকে)। কাফকার ভাষায় তাঁর বাবা তাঁর পুরো জীবন দখল করে ছিলেন, ‘পৃথিবীর পুরো মানচিত্রের উপর শুয়ে ছিলেন’ তিনি, ফ্রানৎসের জন্য ‘কোনো জায়গাই রাখেননি’। বাবাকে অনুকরণ করতে ব্যর্থ হয়ে কাফকা তাঁর অক্ষমতার জন্য নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করলেন; তাঁর নিজের সারাংশ: ‘তোমার জন্য, বাবা, আমি আমার আত্মবিশ্বাস হারিয়েছি, বিনিময়ে পেয়েছি এক সীমাহীন অপরাধবোধ।’

ফ্রানৎস কাফকা জীবনের শেষ দিকে যখন কপর্দকশূন্য মেয়ে ইউলি ওরিৎসেককে বিয়ে করতে চাইলেন, তাঁর বাবা তখন খেপে গেলেন। কাফকার ভাষায়, তাঁর বাবা তাঁকে বললেন: ‘মেয়েটা খুব সম্ভব তার ব্লাউজ একটুখানি উঠিয়েছে, প্রাগের ইহুদি মেয়েগুলো যেভাবে ওঠায় আর কি, আর তুমি? তুমি মজে গেলে, ঠিক করলে ঐ মুহূর্তেই তাকে বিয়ে করবে। তোমাকে আমি একবারেই বুঝি না। তুমি বড় হয়েছ, শহরে থাকছ, কিন্তু তোমার চলার পথে দেখা হওয়া প্রথম মেয়েটাকে বিয়ে করা ছাড়া অন্য কিছুর কথা ভাবতে পারছ না। অন্য কোনো “রাস্তা” কি তোমার নেই? ওইসব জায়গায় যেতে যদি তোমার ভয় লাগে, আমি তোমাকে সাথে নিয়ে যাব।’ বাবার কাছ থেকে পাওয়া গণিকালয়ে যাওয়ার এই ইঙ্গিত কাফকার কাছে মনে হয়েছিল পৃথিবীর ‘সবচেয়ে নোংরা জিনিস’। বাবার কর্তৃত্ব থেকে মুক্তির জন্য কাফকা পথ হিসেবে দেখতেন নিজের ক্যারিয়ারকে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে তাঁর বাবা-মা ছেলে কোন বিষয়ে পড়বে তা নিয়ে তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, কিন্তু এই স্বাধীনতা, কাফকার মতে, ছিল অর্থহীন। যে অপরাধবোধ তাঁর বাবা তাঁর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, এর ফলে পড়াশোনাতে কাফকা কোনো আনন্দই পেতেন না, প্রতিবছর পরীক্ষার আগে তিনি ভাবতেন যে ফেল করবেন। যদিও প্রতিবছরই তিনি পাস করে গেছেন, তবু তাঁর ভাষায়, পড়াশোনার প্রতি তাঁর ততটুকুই আগ্রহ ছিল যেরকম আগ্রহ কোনো টাকা চুরি করা ব্যাংক কমকর্তার, যেকোনো সময়ে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ের মধ্যে, থাকে তার দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের কাজে।

পরে তিনি দেখলেন, বাবার হাত থেকে পালানোর আরেকটি রাস্তা হচ্ছে ‘সাহিত্য’। কাফকা এ চিঠিতে স্বীকার করেছেন, সাহিত্যের মধ্যে সত্যিই কিছুটা হলেও তাঁর সান্ত¡না মিলেছিল। কিন্তু তাতে স্বাধীনতা বা মুক্তি আসেনি, কারণ: ‘আমার সব লেখাই যে ছিল তোমাকে নিয়ে; লেখালেখির মধ্যে আমি শুধু ওসব জিনিসেরই বিলাপ করে গেছি যেগুলো তোমার বুকে মাথা রেখে করতে পারিনি।’ কর্তৃত্বপরায়ণ বাবার মূর্তি আমরা কাফকার অন্যতম বিখ্যাত দুটো গল্পের মধ্যে পাই ‘রায়’ ও ‘রূপান্তর’। প্রথমটিতে ছেলে বিয়ে করে স্বাধীন হতে চাইলে তাঁর বুড়ো বাবা তাঁকে তাঁর বিয়ের পাত্রী নিয়ে ওভাবেই খোঁটা দেন, যেভাবে হারমান তাঁর ছেলেকে দিয়েছিলেন, যেমনটা উপরে বলা হয়েছে, সে ইউলি ওরিৎসেককে বিয়ে করতে চাইলে। গল্পের মধ্যে, পরে এই বাবা ছেলেকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। আর দ্বিতীয় গল্পটিতে ছেলে পোকা হয়ে গেলে বাবাই একসময় তার গায়ে একটা আপেল ছুড়ে মেরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

গত ১০০ বছর ধরে ব্যক্তি কাফকাকে বোঝার যতভাবে চেষ্টা হয়েছে তার সবচেয়ে বড় চেষ্টাটাই হয়েছে তাঁর বাবাকে লেখা এই চিঠির মাধ্যমে। এই চিঠি নিয়েই লেখা হয়েছে ১ হাজার ২০০-র উপরে গবেষণা গ্রন্থ।

শেষ বিচারে এটাই মনে হয় যে, এই চিঠি ছিল কাফকার নিজের উদ্ভাবিত, নিজেকে শান্ত করার, সুস্থ করার থেরাপি। কাফকা এখানে, বাবার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে স্বাধীন হওয়ার জন্য, তাঁর সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ককে নিজের দিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। এই বোঝার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ঢুকেছে কাফকার অতিশয়োক্তি, আত্মপক্ষ সমর্থনের স্বার্থে বাবাকে ছোট করে দেখানো এবং তাঁর লেখকসুলভ সহজাত অনেক কল্পনা প্রবণতা। তবু এটাও বলা যাবে না এই চিঠির সব দাবি মিথ্যা। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বোহেমিয়ার ওসেক্ নামের এক গ্রামে ফেরিওয়ালার গাড়ি ঠেলে বেড়ানো হারমান কাফকার প্রাগে এসে মোটামুটি বড় এক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার সংগ্রামের গল্প থেকেই বোঝা যায়, কতটা শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল এই লোকের। তাঁর হিসাবেই তিনি মাপতে চাইতেন বাকি সবাইকে, সবাইকে মনে করতেন তারা যেহেতু জীবনসংগ্রাম কী তা দেখেনি, তাই বড় আরামে আছে। কাফকার চিঠিতে বাবার প্রতি তাঁর অনুভূতিগুলো বিধৃত থাকলেও এটা তো নেই যে বাবারও কী পরিমাণ হতাশা ছিল তাঁর খামখেয়ালি, অদ্ভুত স্বভাবের একমাত্র পুত্রসন্তানটিকে নিয়ে (মনে রাখতে হবে এই বাবা-মায়ের অন্য দুই ছেলে মারা গিয়েছিল তাদের ১৫ মাস ও ৭ মাস বয়সে)। কাফকার বাবা-মা কাফকার আপন চাচাতো ভাই ব্রুনো কাফকার (ব্রুনো ছিলেন প্রাগের নামকরা আইনের অধ্যাপক এবং পরে খ্যাতিমান এক রাজনীতিবিদ) সাফল্যের মাপে তাঁদের ছেলের পার্থিব ব্যর্থতাগুলো, বিশেষ করে তাঁর বিয়েশাদি করে সংসার করতে না-পারা ও মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে অ্যাজবেস্টসের ব্যবসা শুরু করেও হাল ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিকে মাপতেন।

বাবা-ছেলের এই সম্পর্কের ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদী ব্যাখ্যা হয়েছে বিস্তর। কাফকা চিঠিতে ফ্রয়েডের বলা ইডিপাল সম্পর্কের কথাই যেন লিখেছেন (যার মূল কথা, ছেলেকে বড় হতে হলে, তাকে তার বাবার মতোই হতে হয়, যৌন দিক থেকে ওরকম পাকা হতে হয়; কিন্তু ছেলেকে একই সঙ্গে বাড়ির একমাত্র যৌন বিষয়ে অভিজ্ঞ পুরুষের জায়গাটি থেকে বাবাকে সরিয়েও দিতে হয়, বাবার অনুকরণ করার স্বার্থে বাবার বিরুদ্ধেই তাকে দাঁড়াতে হয়)। কাফকা লিখছেন: ‘তোমার সঙ্গে আমার যে অসুখী সম্পর্ক তার থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাকে এমন কোনো কাজ করতে হবে, যার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক সবচেয়ে দূরতম; বিয়ে করা সবচেয়ে বড় কাজ, ও থেকেই সবচেয়ে প্রশংসাযোগ্য স্বাধীনতা আসতে পারে, কিন্তু আমি দেখছি যে বিয়ের সঙ্গেই তোমার সম্পর্কটা সবচেয়ে কাছের।’ কাফকা এখানে তাঁর বাবাকে দোষ দিচ্ছেন, কেন ছেলে বিয়ে করছে না তা নিয়ে হইচই করার জন্য, কিন্তু কাফকার মতে, তাঁর বাবাই তাঁকে এমন আত্মগ্লানি ও পাপবোধে ভোগা, খোঁড়া এক মানুষ বানিয়ে রেখেছেন যে তাঁর পক্ষে বিয়ে করা অসম্ভব। সন্দেহ নেই, এ চিঠির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাবার প্রভাবের বলয় থেকে তাঁর নিজের মন ও মানসকে বের করে আনা, মুক্ত হওয়া; কিন্তু এ চিঠিতে কাফকা নিজেকে তাঁর বাবার এতখানিই সৃষ্ট এক চরিত্র করে দেখিয়েছেন যে সেই বাবার থেকে তাঁর একটামাত্র চিঠি লিখে মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অসম্ভব ঠেকে। তাহলে কাফকা কি সেই সময়ের এক্সপ্রেশনস্টিক সাহিত্যের রীতি মোতাবেক পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নিয়ে রোমান্টিকতায় ভুগতেন? তখনকার দিনে শিল্পসাহিত্যের অন্যতম বিষয়ই ছিল সাহসী, শিল্পীমনের পুত্রের সঙ্গে কর্তৃত্বপরায়ণ বুর্জোয়া পিতার দুর্বোধ্য সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা। পিতারা ওখানে হতেন মিথ্যা বিশ্বাস ও মিথ্যা নৈতিকতার ধারক ও বাহক, আর তাঁদের সন্তানেরা আধুনিক, মুক্তমনা, প্রথাবিরোধী চরিত্র। এই দুজনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে কম সাহিত্য হয়নি গত শতাব্দীর শুরুর দিকে।

হয়তো তা-ই হবে, হয়তো না। হয়তো ‘বাবার কর্তৃত্বের সামনে নির্যাতিত, অসহায় কাফকা’ একটি মিথ, কিংবা হয়তো তা কিছুটা সত্য, কিছুটা মিথ্যা। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে কাফকার বাবাকে লেখা চিঠি একটি দারুণ গল্প; কাফকার নিজের জীবন নিয়ে নিজেকে বলা একটি চমৎকার কাহিনি। তাতে আমাদের কোনো আপত্তিও থাকার কথা না: সেরা মনঃসমীক্ষণের কাজও তো তাই ; আমরা কী করে আমরা হয়েছি তার একটা সন্তোষজনক গল্প খাড়া করতে পারা।
আমাদের জন্য জরুরি এটুকুই যে, এই ‘চিঠি’ আমাদেরকে কাফকার অপরাধবোধ ও পাপবোধে আকীর্ণ সাহিত্যকর্মগুলোর খুব কাছে নিয়ে আসে এ কথা, বিশেষ করে তাঁর আমেরিকা উপন্যাস থেকে শুরু করে পরের সব লেখার জন্য সত্য (অর্থাৎ ১৯২২ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত)। এই চিঠিতে কাফকার টাকা চুরি করা এক ব্যাংকারের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার মধ্যে আমরা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম বিচার উপন্যাসের (যেখানে ব্যাংকার জোসেফ কে. বিনা অপরাধে একদিন গ্রেপ্তার হয়ে যায়, কিন্তু তাকে কখনো আটক করা হয় না, সে জীবনভর ঘুরে বেড়ায় ; শেষ দৃশ্যে নিষ্ঠুরভাবে খুন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তার অপরাধ কী তা জানার জন্য) বীজ খুঁজে পাই।

কাফকার মা — ইয়ুলি কাফকা

এই বিশাল বাবাকে লেখা চিঠিতে কাফকার মা ইয়ুলি কাফকা কত ছোট যে একটা চরিত্র তা ভাবতে অবাক লাগে। বাবার সঙ্গে তুলনায় তাঁর মা খুব শান্ত ও লাজুক এক মহিলা ছিলেন। এ চিঠিতে তাঁর ভূমিকা স্বামীর সহকারী একজন হিসেবে, যিনি তাঁর সন্তানদের বাবার সঙ্গে এতই ঘনিষ্ঠ যে বাবার অত্যাচারের হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে আমরা দেখি একজন অসহায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে, অসহায় কারণ তিনি পিষ্ট দুদিকেরই চাপে একদিকে তাঁর স্বামী, অন্যদিকে তাঁর সাহায্যের জন্য তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা চার সন্তান। কাফকা বাবাকে লিখেছেন: ‘আমরা তাঁকে (মাকে) সমানে হাতুড়ির বাড়ি মেরে যাচ্ছি, তোমার দিক থেকে তুমি, আমাদের দিক থেকে আমরা।’ ঐ দুটি গল্পেও ‘রায়’ ও ‘রূপান্তর’ যেখানে কাফকা-পরিবারের সবচেয়ে কাছাকাছি এক ছবি পাওয়া যায়, মা চরিত্রটি লক্ষণীয়: ‘রায়’ গল্পে মা মৃত; আর ‘রূপান্তর’ গল্পে তিনি তাঁর ‘দুর্ভাগা ছেলের’ প্রতি মমতায় ভরা, কিন্তু ছেলের বিপদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা ছাড়া তাঁর আর কোনো ভূমিকা নেই। মনঃসমীক্ষণবাদী চোখ দিয়ে দেখলে মনে হয়, কাফকার অরক্ষিত মানসিক অবস্থার কারণ শুধু তাঁর বাবার কর্তৃত্বপরায়ণতাই নয়, তাঁর প্রতি খুব কম বয়সেই তাঁর মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারটাও এর একটা কারণ বটে। কাফকার ডায়েরিতে ইয়ুলি কাফকাকে আমরা দেখি ছেলের অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপারগুলো নিয়ে ‘ঘ্যানঘ্যান’ করছেন, ছেলের বিরক্তি শুধুই বাড়াচ্ছেন আর তাঁকে বুঝতে পুরো ব্যর্থ হচ্ছেন। কাফকা ডায়েরিতে নালিশ জানাচ্ছেন যে তাঁর মা তাঁকে সাধারণ আর দশটা যুবকের মতোই ভাবেন, তাই ‘ঘ্যানঘ্যান’ করেন তাঁর ছেলে কেন ওসব ‘সাহিত্য’ ছেড়ে অন্য সবার মতো বিয়ে-থা করে সংসারী হচ্ছে না। কাফকার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ফেলিস বাউয়ারকে লেখা একটি চিঠির পুনশ্চঃ অংশে আমরা মা ও ছেলের এই পর হয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে পারস্পরিক স্নেহ-ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা পাই:

আমি কাপড়চোপড় ছাড়ব এমন সময় মা কী যেন সামান্য একটা কাজে আমার ঘরে ঢুকলেন, তারপর তিনি চলে যাচ্ছেন এমন সময় আমাকে শুভ রাত্রি জানিয়ে একটা চুমু খেলেন, এরকম ঘটেনি অনেক বছর। ‘ঠিক আছে’, আমি বললাম। ‘আমার কখনো সাহস হয়নি’ আমার মা বললেন, ‘আমি ভাবতাম তুমি এসব পছন্দ করো না। কিন্তু তুমি যদি পছন্দ করে থাকো, তো আমিও করি।’

ব্যক্তিগত জীবন ও কাফকা সাহিত্যে যৌন অনুষঙ্গ

কাফকার যৌন জীবন ছিল বেশ সক্রিয়। ম্যাক্স ব্রডের ভাষায়, কাফকা যৌন কামনার হাতে ‘উৎপীড়িত’ হতেন। কাফকার অন্যতম প্রধান জীবনীকার রাইনার স্টাখের মতে, কাফকা জীবনভর ‘অবিরাম মেয়েদের পেছনে ছুটেছেন’, আর তাঁর মধ্যে সব সময় কাজ করত ‘বিছানায় ব্যর্থ হওয়ার ভয়।’ কাফকা অনেকবার পতিতা সংসর্গ করেছেন; আর পর্নোগ্রাফিতেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর জীবনে প্রেম এসেছে মোট ছয় বার; একেকবার একেক রূপে।
কাফকার ডায়েরি ও চিঠিগুলো পড়লে এরকম মনে হয় যে, বিয়ে করাকে তিনি জীবনের মুখ্যতম ব্যাপার বলে ভাবতেন।
বিয়ে করা, পরিবার গড়ে তোলা, যতগুলো সন্তান ঘরে আসে তাদের গ্রহণ করা, এই অনিশ্চিত পৃথিবীতে তাদের পাশে দাঁড়ানো, এমনকি অল্পস্বল্প পথ দেখানো, আমার হিসেবে এই-ই হচ্ছে মানুষের পক্ষে অর্জনযোগ্য সবচেয়ে বড় সফলতা।

বাবাকে লেখা চিঠিতে কাফকার এই ঘোষণা তিনি নিজের জীবনে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি কোনো দিন। তাঁর সঙ্গিনী নির্বাচনে সব সময়ই সমস্যা ছিল, সেই সঙ্গে ছিল বিয়ে করে সংসার শুরু করলে, ঘরে সন্তান এলে, সাহিত্যচর্চায় ব্যাঘাত ঘটবে– এই ভয়।
কাফকার প্রথম প্রেমিকা ফেলিস বাউয়ারের কথা বলা যাক। বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের বাসায় ১৯১৩ সালের ১৩ আগস্ট কাফকার সঙ্গে ফেলিসের দেখা হয়। ফেলিস বয়সে ছিলেন তাঁর চেয়ে চার বছরের ছোট এক বুদ্ধিদীপ্ত, অল্পবিস্তর পড়ালেখা করা, অনাকর্ষণীয় চেহারার, ভালো চাকরি করা বার্লিনের মেয়ে। কাফকা তাঁকে ভক্তি করতেন, কিন্তু তাঁর প্রতি কামনা-বাসনা বোধ করতেন না। ১৯১৫ সালে ফেলিসের সঙ্গে সময় কাটানোর পরে কাফকা ডায়েরিতে লেখেন: ‘চিঠির ভুবনে ছাড়া বাস্তবে আমি কখনো ফেলিসের সঙ্গে সম্পর্কের সেই মধুরতাটুকু অনুভব করিনি, যেটা মানুষ প্রেমিকার সঙ্গে করে; তাঁর প্রতি আমার শুধু অসীম ভক্তি।’ এই স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী ফেলিসের সঙ্গে কাফকার যখন বিয়ের কথা শুরু হয়, তিনি বোধ হয় নিজের অসম্পূর্ণতাগুলো নিয়ে ভয় পেয়ে যান, সঙ্গে তো সাহিত্য ও বিয়ের মধ্যেকার বৈসাদৃশ্য ঘিরে দুশ্চিন্তা এবং নিজের জীবনে বাবার সংসারেরই পুনরাবৃত্তি ঘটানোর ভয় ছিলই। ফেলিস তাঁকে নিয়ে বাসার আসবাব কিনতে গেলে, কাফকার কাছে সেগুলো মনে হয় ‘কবরফলক’; আর ফেলিস যখন বলেন যে তাঁদের দুজনের বাসায় থাকবে তাঁর (ফেলিসের) পছন্দের ছোঁয়া, কাফকার কাছে খুব অসহ্য লাগে কথাটা। ফেলিসের সঙ্গে বাগ্দানের অনুষ্ঠানে কাফকার নিজেকে মনে হয় ‘কোনো আসামির মতো হাত-পা বাঁধা’। ফেলিসকে লেখা ৫০০ চিঠির মধ্যে (Letters to Felice নামে কাফকার বেস্টসেলার বইটি বাজারে সহজলভ্য) আমরা পাই কাফকার মানসিক ও আবেগগত চাহিদার এক রক্তাক্ত ছবি; ফেলিসের জীবনযাপনের প্রতিটি খুঁটিনাটি জানতে চাওয়ার মধ্যে আমরা দেখি হবু বধূর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কলাকৌশল আঁটা এক চতুর কাফকাকে, আর সবচেয়ে বেশি দেখি দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতার এক প্রগাঢ় অভাব। ফেলিসের চিঠিগুলো যদিও পাওয়া যায়নি, তবু এটুকু নিঃসন্দেহে অনুমান করা যায়, তিনি কাফকা নামের ৬ ফুট লম্বা, সুদর্শন ও আকর্ষণীয় যুবকের খামখেয়ালি, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও তাঁর প্রতি অবিশ্বস্ততার কারণে মানসিকভাবে যথেষ্ট বিরক্ত ছিলেন। ১৯১৪-র ১২ জুলাই ফেলিস নিজেই তাঁদের প্রথম বাগ্দান ভেঙে দেন; পরে অবশ্য তাঁরা আবার যোগাযোগ শুরু করেন; দ্বিতীয়বারের মতো বাগ্দান হয় ১৯১৭-র জুলাইতে, পরে সে-বছরেরই ডিসেম্বরে এটিও ভেঙে যায়।

ফেলিসের সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালীন কাফকা গোপনে ফেলিসের প্রিয়তম বান্ধবী গ্রেটে ব্লখের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। গ্রেটে বার্লিনেরই এক ইহুদি পরিবারের মেয়ে। ম্যাক্স ব্রড দাবি করেন যে গ্রেটের গর্ভে কাফকার একটি পুত্রসন্তান হয়, যার কথা কাফকা কখনো জানতেন না। যদিও সবচেয়ে বিখ্যাত দুই কাফকা-জীবনীকার পিটার-আন্দ্রে অল্ট ও রাইনার স্টাখের মতে এ দাবি সত্য নয়; গ্রেটের সঙ্গে কাফকার ওরকম ঘনিষ্ঠতা কখনোই হয়ে ওঠেনি। গ্রেটে ও কাফকার মধ্যেকার গোপন সম্পর্কের কথা গ্রেটেই বান্ধবী ফেলিসকে জানিয়ে দেন। ফেলিস গ্রেটেকে লেখা কাফকার চিঠিগুলো পড়ে চরম প্রতারিত বোধ করেন।

১৯২০ সালে, অসুস্থ অবস্থায়ই, কাফকা প্রেমে পড়েন চেক সাংবাদিক ও লেখক, সুন্দরী মিলেনা য়েসেন্স্কার। মিলেনাকে লেখা তাঁর চিঠিগুলো Letters to Milena নামের আরেক বেস্টসেলিং বই। এই চিঠিগুলো ফেলিসকে লেখা চিঠিগুলো থেকে অনেক বেশি আন্তরিকতা ও উষ্ণতায় ভরা। এঁদের মূল বৈশিষ্ট্য নিরাপত্তাহীনতার বোধ, তাঁর ভীতি ও নিজের প্রতি ঘৃণার অনুভূতি। তিনি নিজেকে তুলনা করেন ‘নোংরা বিছানায় শোয়া, মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এক লোক, যাঁকে দেখতে এসেছে মৃত্যুর ফেরেশতা’ হিসেবে। এই দফায় আমরা কাফকার প্রতি তাঁর প্রেমিকার অনুভূতির কথাগুলোও জানতে পারি। ম্যাক্স ব্রডকে লেখা মিলেনার অসংখ্য চিঠির মধ্যে দিয়ে জানা যায়, কাফকার ছোটখাটো বিষয়গুলো সামলানোর (যেমন পোস্ট অফিসে যাওয়া) অপারগতা দেখে মিলেনা বিস্মিত; আর অন্যান্য লোকদের স্মার্টনেস দেখে (যেমন ফেলিসের, সেই সঙ্গে মিলেনার মেয়েবাজ স্বামী আরনস্ট্ পোলাকের) কাফকা কীভাবে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন তা বুঝতে পেরে তিনি কাফকার প্রতি সহানুভূতিতে আর্দ্র। মিলেনা লেখেন:

সে (কাফকা) ভাবে যে সে অপরাধী ও দুর্বল, তার পরও এই পৃথিবীতে তাঁর মতো বিশাল শক্তির আর কেউ নেই; আর কারো নেই উৎকর্ষের পূর্ণমাত্রা অর্জনের, শুদ্ধতা ও সত্য অর্জনের এরকম পরম ও তর্কাতীত প্রয়োজন।

মিলেনাকে কাফকা লেখেন: ‘আমি নোংরা, মিলেনা, আমার ভেতরকার নোংরার কোনো শেষ নেই, সে কারণেই আমি শুদ্ধতা নিয়ে এত জোরে চিৎকার করি।’ (২০ আগস্ট, ১৯২০)
১৯২০-এর আগস্টে মিলেনা ব্রডকে আরো একটি চিঠি লেখেন, যেটি কাফকার অপাপবিদ্ধ, সাধু-সন্তের ইমেজ (বা মিথ) আরো গাঢ় করে তোলে।

তাঁর [কাফকার] কাছে জীবন অন্যদের কাছে যেমন সেরকম মোটেই নয়…সে একদম সাধারণ জিনিসগুলোও বুঝতে পারে না…এই পুরো পৃথিবীই তাঁর কাছে একটা ধাঁধা…আমি যখন তাকে আমার স্বামীর কথা বললাম, আমার স্বামী যার আমার প্রতি অবিশ্বস্ততার ঘটনা বছরে শতবার ঘটছে, তাঁর মুখটা [আমার সেই স্বামীর প্রতি] সেরকম শ্রদ্ধায়ই উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেমনটা হয়েছিল সে আমাকে তার অফিসের বস্ নিয়ে বলার সময়… তাঁর বস্ দ্রুত টাইপ করতে পারেন, আর সেকারণেই [কাফকার হিসেবে] কী চমৎকার একজন মানুষ তিনি… সে [কাফকা] মিথ্যা বলতে সম্পূর্ণ অসমর্থ।

মিলেনার সঙ্গে সম্পর্ক চলার সময়েই কাফকা প্রাগের এক গরিব অশিক্ষিত হোটেল পরিচারিকা ইউলি ওরিৎসেকের প্রেমে পড়েন। ১৯১৯ সালের এক ছুটিতে তাঁদের পরিচয়। ইউলির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বেশি কিছু জানা যায়নি। এ দুজনের মধ্যে বিয়ের জন্য বাগ্দান হয়, দুজনে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন, বিয়ের তারিখও ঠিক করেন। ইউলির সামাজিক অবস্থান ও জায়োনিস্ট আন্দোলনের (ইহুদিদের স্বাধীন আবাসভূমি ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন) প্রতি সমর্থনের কারণে কাফকার বাবা খেপে যান। এ ঘটনা থেকেই জন্ম হয় কাফকার বিখ্যাত বাবাকে লেখা চিঠির। একসময় ইউলিকে ছেড়ে মিলেনার দিকেই কাফকা বেশি ঝুঁকে পড়েন, ইউলির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেন; ইউলি বলেন: ‘তুমি কি সত্যিই আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ?’
ইউলির চেয়ে অনেক বেশি গাঢ় ও সম্ভাবনাময় ছিল কাফকার শেষ প্রেম। প্রেমিকার নাম ডোরা ডিয়ামান্ট। কাফকার অন্য দুই মূল প্রেমিকা ফেলিস ও মিলেনার পাশাপাশি ডোরাও এখন অনেক বিখ্যাত এক নাম। ১৯২৩-এর আগস্টে মৃত্যুর মাস দশেক আগে ডোরার সঙ্গে কাফকার পরিচয় হয় এক অবকাশযাপন কেন্দ্রে। ডোরার বয়স তখন ২৫, কাফকার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট; বার্লিনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একা বাস করা এক মেয়ে সে। ডোরা কাফকার কাছে জায়োনিজম ও ইহুদি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অগাধ আগ্রহ প্রকাশ করেন; পরে দুজনেই পরিকল্পনা করেন যে তাঁরা প্যালেস্টাইনে গিয়ে সংসার পাতবেন, সেখানে তাঁরা একটা রেস্টুরেন্ট খুলবেন, ডোরা হবেন সেটার পাচক, কাফকা ওয়েটার। তা আর হয়ে ওঠেনি; কাফকা মারা যান এর ক’মাস পরেই, কিন্তু ডোরা কাফকাকে জীবনের শেষ ক’মাস — প্রাগ ও পরিবারের শৃঙ্খলমুক্ত অবস্থায় — বার্লিনে সম্ভবত কাফকার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু উপহার দেন। ডোরা এর পরে বেশ নামকরা এক অভিনেত্রী হন, কম্যুনিজমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন (মিলেনার মতোই), প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। লন্ডনে ১৯৫২ সালে ডোরার মৃত্যু হয়। ১৯২৪ সালে কাফকার মৃত্যুর সময় ডোরা তাঁর পাশে ছিলেন।

কাফকার লেখার কোনো কোনো অংশ এমন ধারণারও জন্ম দিয়েছে যে তিনি সম্ভবত সমকামী ছিলেন। তবে গবেষকরা এখন একমত যে, তা অসম্ভব ও অস্বাভাবিক এক অনুমান। কাফকার সময়টা ছিল ইউরোপে পুরুষবাদী সংস্কৃতির তুমুল জোয়ারের সময়; সব ছেলে একসঙ্গে মিলে ব্যায়াম, সাইক্লিং, সাঁতার, দীর্ঘ পথ হাঁটা, পুরো জার্মানি জুড়ে হাইকিং করতে বেরোনো — এসব নতুন ফ্যাশন তখন তুঙ্গে। কাফকার তিন-চারটে লেখায় তথাকথিত সমকামী যৌনতার ইঙ্গিত খুব বেশি হলে এসবেরই উদ্যাপন — এমনটাই এখন এ বিষয় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত উপসংহার।

এর বিপরীতে, নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক কাফকার হাতে সব সময়ই অদ্ভুত ও কিম্ভূতকিমাকার চেহারা নিয়েছে। কাফকার লেখায় এই সম্পর্কগুলো সব সময় আতঙ্ক-জাগানো ও নোংরা। আমেরিকা উপন্যাসে ক্লারা যখন কার্লের দিকে যৌনমিলনের জন্য এগিয়ে আসে, সে কার্লকে পেড়ে ফেলে কুংফু স্টাইলে। বিচার উপন্যাসের লেনি তো মনে হয় কোনো জন্তু, তার আঙুলগুলো বাদুড়ের মতো, জোসেফ কে.-কে ভুলিয়েভালিয়ে সে মেঝেতে টেনে আনে, বলে: ‘তুমি এখন আমার।’ আরো খারাপ দুর্গ উপন্যাসের সেই দৃশ্য যখন কে. ও ফ্রিডা সরাইখানার মেঝেতে জমে থাকা নোংরা ময়লা কাদাপানির মধ্যে মিলিত হয় (যদিও এ সময়ে কাফকার বর্ণনা কিছুটা লিরিক্যাল, অর্থাৎ তিনি সম্ভবত বলতে চাইছিলেন যে, সেক্স একটা নোংরা বিষয় হলেও এর মধ্য দিয়ে ভালোবাসা ও আত্মহারা হওয়ারও প্রকাশ ঘটে)। কাফকা মিলেনাকে লিখেছিলেন, সেক্সের জন্য তাঁর তাড়নার কারণে তাঁর নিজেকে পৃথিবীর পথে ঘুরে বেড়ানো ইহুদি (Wandering Jew) বলে মনে হয়: ‘অর্থহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি অর্থহীন, নোংরা এক পৃথিবীর পথে।’ কিন্তু একই সঙ্গে সেক্সের মধ্যে আছে ‘স্বর্গ থেকে পতনের আগে স্বর্গের যে হাওয়ায় আমরা শ্বাস নিতাম সে রকম হাওয়ার কিছু একটা।’

আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, যৌনতার বেলায় কাফকার ওপর সব সময় ভর করে সমাজের একেবারে নিচু স্তরের, গরিব, কাজের মেয়েরা। আমেরিকা উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় ‘দি স্টোকার’-এ আমরা দেখি কাজের মেয়ের গর্ভে বাচ্চা জন্ম দিয়ে আমেরিকায় নির্বাসিত হয়েছে কিশোর কার্ল রসমান; বিচার উপন্যাসে জোসেফ কে.-র নারীরা হয় সামান্য টাইপিস্ট, ধোপানি, না হয় উকিলের কাজের মেয়ে; দুর্গ উপন্যাসের ফ্রিডা পানশালায় কাজ করা নগণ্য এক মেয়ে, আর পেপি (প্রথম দিকে) আরো নিচু শ্রেণীর এক কাজের মেয়ে; ‘রূপান্তর’ গল্পে কমবয়সী চুলে বেণি করা কাজের মেয়েটা পোকা-গ্রেগরকে কত ভয় পায় (কিন্তু বয়স্কা ঝি-টা এই পোকাকে একটুও ভয় পায় না); ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’ গল্পে ঘোড়ার আস্তাবল থেকে উদয় হওয়া দানবীয় সহিস যৌনবাসনা পূরণের জন্য ডাক্তারের কাজের মেয়ে রোজের ওপর এমনভাবে চড়াও হয়, যেন মনে হয়, সে নরমাংসভোজী, রোজকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে; আর ‘অ্যাকাডেমির জন্য একটি প্রতিবেদন’ গল্পের নায়ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি রট্পিটারের জন্য সঙ্গী হিসেবে মেলে এক আধা-বশমানা মেয়ে শিম্পাঞ্জি, ‘শিম্পাঞ্জিদের মতো করেই তাঁর সঙ্গসুখ ভোগ করে রট্পিটার’।

কাফকা-সাহিত্যের যৌন বিষয়গুলো যাঁরা ‘অপার্থিব’ বলেন (এবং কাফকা মিথে নতুন পালক যোগ করেন), তারা কোন যুক্তিতে তা বলেন জানি না; আমার বরং Excavating Kafka বইয়ের জেমস হয়েসের মতো করেই মনে হয় যে, কাফকা সাহিত্যে (এবং কাফকার ব্যক্তিজীবনেও) যৌনতা খুব উদ্ভট, প্রথাবিরুদ্ধ ও নোংরা-কাদায় ভরা পার্থিব এক সত্য। ‘রূপান্তর’ গল্পের মানুষ-পোকা গ্রেগর যেভাবে তার বোনের গলায় চুমু খেতে চায়, কিংবা ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’ গল্পে রোগীর ঊরুতে যে রকম গোলাপ-রঙের ক্ষত আমরা দেখি, তার নানা রূপক অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু তা সাধু-সন্ন্যাসীর চোখে দেখা কোনো ‘অপার্থিব’, বৈরাগ্যময় যৌনতা নয়।

ব্যক্তিত্ব

কাফকা ভয়ে থাকতেন যে অন্য মানুষের কাছে তিনি বোধ হয় বিরক্তিকর এক চরিত্র– শারীরিক ও মানসিক, দুই দিক দিয়েই। তবে তাঁর সঙ্গে যারা মিশেছেন তাঁদের সবার কাছেই তিনি ছিলেন চুপচাপ ও ঠান্ডা মাথার, যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত ও শুষ্ক রসবোধসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব; কিশোরসুলভ হ্যান্ডসাম, কিন্তু পোশাকে-আশাকে অনাড়ম্বর এক মানুষ। ব্রডের হিসাবে কাফকা তাঁর দেখা অন্যতম মজার এক মানুষ, যিনি বন্ধুদের সঙ্গে সব সময় হাসি-তামাশা করতেন, তাঁদের কঠিন সময়ে তাঁদের ভালো উপদেশ দিতেন। ব্রড আরো বলছেন, কাফকা ছিলেন খুব আবেগে পূর্ণ একজন আবৃত্তিকার, বক্তৃতার সময়ে তিনি কথা সাজাতেন গানের মতো গুছিয়ে। ব্রডের হিসাবে, কাফকার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দুটো দিক ছিল: তাঁর ‘পরম সত্যবাদিতা’ (Absolute Wahrhaftigkeit) এবং ‘সূক্ষ্ম বিবেকবোধ’ (präzise Gewissenhaftigkeit)| । তিনি বিষয়ের এমন খুঁটিনাটি গভীরে চলে যেতেন, এতখানি ভালোবাসা নিয়ে ও নিখুঁতভাবে তা যেতেন যে, আগে চোখে না পড়া অনেক বিষয়ও তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসত, ‘সেগুলো হয়তো অদ্ভুত শোনাত, কিন্তু সেগুলো সত্য ছাড়া আর কিছুই হতো না (nichts als wahr)|।’

কাফকা নিয়মিত ব্যায়াম ও খেলাধুলা ভালোবাসতেন, ভালো সাইকেল চালাতেন, সাঁতার পছন্দ করতেন, নৌকার দাঁড় টানায় দক্ষ ছিলেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাফকাই পরিকল্পনা করতেন বন্ধুরা মিলে কোথায় দীর্ঘ পদযাত্রাতে যাবেন। তাঁর অন্যান্য আগ্রহের মধ্যে ছিল বিকল্প বা প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতি, অ্যারোপ্লেন ও সিনেমা। লেখালেখি তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তিনি বলতেন যে লেখালেখি ‘প্রার্থনার মতো’ একটা কাজ। কোলাহল তিনি খুব অপছন্দ করতেন, এর পরিচয় পাওয়া যায় এ বইতে অন্তর্ভুক্ত তাঁর প্রথম দিককার ছোট রচনা ‘বিরাট শোরগোল’-এ। কাফকা সিগারেট খেতেন না; মদ, কফি, চা, চকলেটও না। তিনি জীবনের দীর্ঘ অনেকগুলো বছর শুধু শাকাহারীই ছিলেন না, কীভাবে খেতে হবে তার নিয়মও ছিল তাঁর জন্য ধরাবাঁধা। খাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ‘fletcherize’ করতেন আমেরিকার হোরেস ফ্লেচার উদ্ভাবিত খাবার চিবানোর তখনকার দিনের এক ফ্যাশন, যেখানে খাবার মুখে নিয়ে এত বেশি সময় ধরেই চিবানো হতো যে তা তরল স্যুপের মতো হয়ে গলা দিয়ে নেমে যেত। কাফকা বিশ্বাস করতেন, এতে হজমের ওপর সবচেয়ে কম চাপ পড়ে আর খাবার থেকে সবচেয়ে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়।

পেরেজ আলভারেজের দাবি, কাফকার ছিল একধরনের split personality -ভগ্নমনস্ক (schizophrenic) বিভাজিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর ‘রূপান্তর’ গল্পসহ অন্য আরো কিছু লেখার বিস্ময়কর অদ্ভুত ব্যাপারগুলো তাঁর ওই বিভাজিত ব্যক্তিতার কারণেই লেখা সম্ভব হয়েছে — এমন দাবি এই ‘ক্লিনিক্যাল’ ব্যাখ্যাদাতাদের। ১৯১৩-এর ২১ জুনের ডায়েরিতে কাফকা লিখছেন:

আমার মাথার মধ্যে কী ভয়ংকর এক পৃথিবী। মাথা ছিঁড়ে-ফেঁড়ে না ফেলে আমি কী করে নিজেকে মুক্ত করব, ওই পৃথিবীকে [মাথা থেকে] মুক্ত করে আনব! আর মাথার ভেতরে ওগুলোকে ধরে রাখার বা কবর দেওয়ার চেয়ে হাজার গুণে ভালো মাথা ছিঁড়ে-কেটে টুকরো করে ফেলা। আমি যে সে কাজের জন্যই এখানে [এ পৃথিবীতে] আছি, তা আমার কাছে একদম পরিষ্কার।



যৌন বিষয়ে কাফকার ঘৃণা, অপরাধবোধ এবং একই সঙ্গে তার অনেকবার পতিতালয়ে যাওয়া, পর্নোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ– এসব নিয়েও কম গবেষণা হয়নি। পাশাপাশি অনেকে এমন দাবিও করেছেন যে কাফকার খাওয়া-সংক্রান্ত অসুখ ছিল। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মানফ্রেড ফিখ্টার তো ‘প্রমাণ হাজির করেছেন যে…কাফকা anorexia nervosa-র (খাদ্যভীতির মানসিক অসুখ, যার পরিণতিতে বিপজ্জনকভাবে মানুষ শুকিয়ে যায়) ব্যতিক্রমী এক লক্ষণে’ ভুগতেন। তাঁর আরো দাবি, কাফকা শুধু ‘নিঃসঙ্গতা ও বিষন্নতার রোগেই ভুগতেন না’, মাঝেমধ্যে ‘আত্মহত্যাপ্রবণও’ ছিলেন। অনেক গবেষকেরই দাবি, কাফকা ছিলেন ‘হাইপোকন্ড্রিয়াক’ (কোনো আপাত-কারণ ছাড়াই যে মানুষ তার অসুখ আছে বলে কল্পনা করে ও অহেতুক উৎকণ্ঠায় ভোগে)। অন্তত একবার যে কাফকা আত্মহত্যা করার সংকল্প করেছিলেন, ১৯১২ সালে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কাফকার এই বিষন্ন, মলিন চেহারাটি প্রতিনিধিত্ব করছে বিশ শতকের (এবং একুশ শতকেরও) আধুনিক পৃথিবীর আধুনিক মানুষের, যেমনটি উনিশ শতকের জন্য করেছিলেন ম্যানিক ডিপ্রেশন ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ভোগা ব্রিটিশ কবি, অসুখী লর্ড বায়রন। ‘কাফকায়েস্ক’ বিশেষণটি ‘বায়রনিক’ বিশেষণের মতোই অকাট্য ও জোরালো। তবে বায়রনের অভিজাত, অনিষ্টকর ইমেজের (যা সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারগুলোকে তাচ্ছিল্য করছে) চেয়ে কাফকার ইমেজটি অনেক বেশি সর্বজনীন। কাফকার অতি মামুলি জীবনীর দিকে তাকালেই মনে হয় যে তিনি আমাদেরই একজন: অতি সাধারণ এক জীবনের বৃত্তে বন্দী থেকে তিনি অনুভব করে গেছেন সাধারণ সব ভয়, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা ও হতাশা; আমরা তাঁকে সহজেই বুঝতে পারি, কারণ তাঁর অনুভবগুলো আমাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যদি খাপে খাপে না-ও মেলে, তবু আমাদের ভয়-শঙ্কা ও দুঃস্বপ্নগুলোর সঙ্গে মেলে তো বটেই।

কাফকা নিয়ে যা কিছু মিথ (বায়রনকে নিয়ে মিথের মতই), তা কাফকার নিজেরই গড়ে তোলা। ওই মিথগুলোর পেছনে কাফকার বাস্তব অভিজ্ঞতার ভূমিকা না থাকলেও, তিনি তাঁর চিন্তার মধ্যে তাঁর রোজকার অভিজ্ঞতার যেভাবে রূপ দিয়েছিলেন, তারপর লেখনীতে সেগুলো যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন (প্রথমত তাঁর নিজের জন্য, আর পরে সবার পড়ার জন্য), তাতেই দাঁড়িয়ে গেছে মিথগুলো। সে কারণেই কাফকার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো থেকে তাদের লেখককে আমরা আলাদা করতে পারি না। তাঁর উপন্যাসের নায়কদের নামগুলোও (লেখার তারিখের ক্রম মেনেই) ধাপে ধাপে ছোট হয়ে আসে: আমেরিকা উপন্যাসের কার্ল রসমান থেকে বিচার উপন্যাসের জোসেফ কে. থেকে দুর্গ উপন্যাসের কে.। বাস্তবেও তা-ই হয়েছিল একবার: ১৯২২-এর জানুয়ারিতে কাফকা একটা হোটেলে চেক-ইন করছেন, দেখলেন যে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁর বুকিং ভুলভাবে পড়ে, তাঁর নামের জায়গায় লিখে রেখেছে ‘জোসেফ কে.’ (Joseph K[afka])| । কাফকা ডায়েরিতে লিখলেন: ‘আমার কি ওদেরকে ঠিক করে দেয়া উচিত, নাকি ওরাই আমাকে ঠিক করুক’। এখানে বাক্যের দ্বিতীয় অংশে কাফকা তাঁর সহজাত কূটাভাস (paradox) করছেন: অর্থাৎ আমিই হয়তো ভুল, আমার নাম আসলেই হয়তো জোসেফ কে., অতএব হোটেল কর্তৃপক্ষই আমাকে, আমার নামটাকে, ঠিক করুক, অর্থাৎ জোসেফ কে.ই রেখে দিক।

যেহেতু সাংস্কৃতিক আইকন ‘ফ্রানৎস কাফকা’ শেষ বিচারে তাঁর নিজেরই সৃষ্টি, সেহেতু এর বাইরে গিয়ে সত্যিকারের কাফকার ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ অনেক কঠিন এক কাজ। গল্প-উপন্যাসের আর ফেলিস ও মিলেনাকে লেখা অসংখ্য চিঠির সেই যন্ত্রণাকাতর কাফকা তাঁর বাস্তব জীবনের দক্ষ অফিস কর্মকর্তা, স্পোর্টসম্যান ও প্রাগের মোটামুটি খ্যাতিমান লেখকে পরিণত হওয়া কাফকার মতোই সত্য। বিষয়টি আসলে কাফকার প্রতিমাসুলভ ইমেজকে ঠিক করা বা না করার নয় (অর্থাৎ তাঁর বাস্তব ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণের নয়), বরং আসল অর্থপূর্ণ কাজ হচ্ছে তাঁর লেখার মধ্যে ফেরত গিয়ে, ওগুলোর মধ্যেই দেখা যে, কীভাবে তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতাগুলো ভেঙে ওই ইমেজ দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। তবে সচেতন পাঠককে সব সময় মাথায় রাখতে হবে, এভাবে কাফকার জীবনের ঘটনা ও অভিজ্ঞতাগুলোর সমান্তরালে তাঁর সাহিত্যকর্ম পড়ে যাওয়ার বিপদও আছে। মনে রাখতে হবে, তাঁর সাহিত্য তাঁর নিজের জীবন, সময় ও সমাজকে অনেক-অনেক বেশি গুণে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিল বলেই কাফকা এখনো পৃথিবীতে বেস্টসেলার, এখনো এই ১০০ বছর পরেও, মানুষ তাঁর লেখা পড়ে আর এখনো প্রতি ১০ দিনে তাঁর ওপর একটি করে নতুন বই বের হয় ।

কাফকা ও রাজনীতি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন শুরু হয়েছে। ১৯১৪ সালের ২ আগস্টে কাফকার সেই কিংবদন্তিতুল্য ডায়েরি এন্ট্রি: ‘জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিকেলে সাঁতার।’ এত বড় বৈশ্বিক ঘটনায়, যেখানে তাঁর নিজের দেশও যুদ্ধের অংশ, কাফকার কী নিরাসক্ত, উদাসীন, নিস্পৃহ উক্তি। একদিকে বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে সাঁতার — কিসের সঙ্গে কী? পড়তে গিয়ে মনে হয় হোরহে লুইস বোরহেসের সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম গল্প ‘ট্লন, উকবার, অরবিস, টারটিয়াস’-এর শেষ অংশটুকুর কথা: ট্লন গ্রহের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এবং পৃথিবীর মাটিতে ট্লনের বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী উড়ে এসে পড়তে থাকার কারণে পৃথিবীর সর্বব্যাপী ধ্বংস নেমে আসছে; এমনকি পৃথিবীর স্কুলগুলোতে মানুষের ইতিহাসের জায়গায় ট্লনের ইতিহাস পড়ানো শুরু হয়েছে; ওষুধশাস্ত্র ও প্রত্নতত্ত্ব পড়ানোর বিষয়বস্তু বদলে গেছে, সামনে বদলে যাবে জীববিজ্ঞান ও অঙ্কশাস্ত্র। এমন এক চরম ও চূড়ান্ত বিপৎসংকুল মুহূর্তে বোরহেস গল্পটি শেষ করছেন এভাবে:

এরপর পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষা। পৃথিবী হয়ে যাবে ট্লন। তবে আমার এসবে কোনো মনোযোগ নেই; আমি আদ্রোগের হোটেলে বসে, শান্ত-স্থির দিনগুলোয়, ব্রাউনের Urn Burial বইটির…অনুবাদের (যা আমার প্রকাশ করার ইচ্ছা নেই) কাজ সংশোধন করে যেতে লাগলাম।
কাফকার মতোই আরেক মহান লেখক বোরহেসেরও রাজনীতি বিষয়ে কী নিরাসক্ত ভঙ্গি! পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর উনি কোথাকার সতেরো শতকের এক লাশের আচার-সংস্কারের ওপরে লেখা বই অনুবাদ করে যাচ্ছেন, তাও কিনা যে অনুবাদ তাঁর প্রকাশ করার ইচ্ছা নেই। চারপাশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে, আর কাফকা বিকেলে সাঁতার নিয়ে ব্যস্ত।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে কাফকা ক্লাব ম্লাদিচ্ নামের চেক এক নৈরাজ্যবাদী, সামরিকতন্ত্র-বিরোধী সংগঠনের বেশ কিছু মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। হুগো বার্গম্যান, যিনি কাফকার সঙ্গে একই স্কুলে গেছেন, ১৯০১ সালে কাফকার থেকে আলাদা হয়ে যান। তিনি লিখেছেন: ‘কাফকার সমাজতন্ত্র আর আমার জায়োনিজম — দুটোই খুব কড়া ধাঁচের।…জায়োনিজম ও সোশ্যালিজমের মিশেল করে কোনোকিছু এখনো উদ্ভাবিত হয়নি।’ চেক নৈরাজ্যবাদীদের (anarchist) বিষয়ে কাফকা পরে ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘এরা সবাই মানুষের সুখ আদায় করার সংগ্রাম করছে, এজন্য এরা কোনো ধন্যবাদও পাবে না। আমি এদের বুঝি। কিন্তু…এদের পাশে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে আর মিছিল করে যাওয়া সম্ভব নয়।’

চেকোস্লোভাকিয়ায় কম্যুনিস্ট শাসনের সময় (১৯৪৮ থেকে ১৯৮৯) কাফকার সাহিত্যকর্ম পুরো ইস্টার্ন ব্লক বা মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের কম্যুনিস্ট ব্লকের দেশগুলোতে নিষিদ্ধ করা হবে কি হবে না, তা নিয়ে বিরাট বিতর্ক ছিল। যখন শাসকেরা ভেবেছেন যে কাফকা তাঁর সাহিত্যে পতনশীল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন, তখন কাফকা পড়া গেছে। যখন তারা এর উল্টোটা ভেবেছেন, কাফকা তখন নিষিদ্ধ হয়েছে। আরনস্ট্ পয়েলের বিখ্যাত কাফকা জীবনীগ্রন্থ A Nightmare of Reason (১৯৮৪) বইটির একেবারে শেষে পয়েল লিখছেন: ‘মৃত্যুতেও কাফকা তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে পালাতে পারেননি। তাঁরা তার সঙ্গে আছেন একই কবরে, কবরফলকও একটিই। এই বিড়ম্বনা অবশ্য অবাক করে না, কারণ আমরা দেখি যে তাঁর নিজের শহরেই কাফকার কবরকে কীভাবে সম্মান করা হয়েছে, ওদিকে তাঁর লেখা কীভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে।’
কম্যুনিস্ট চেকোস্লোভাকিয়ার জন্য কাফকা-সাহিত্যের আরেক বড় উপাদান ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ (alienation) তাদের বড় ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিল। কম্যুনিস্টরা ভাবত, কাফকা তাঁর লেখায় যে অ্যালিয়েনেশনকে চিত্রিত করে গেছেন তা কম্যুনিস্ট সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে; কারণ কম্যুনিস্ট সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাবোধ বা নিরাসক্তির কোনো জায়গাই নেই, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে। কাফকার আশিতম জন্মদিনে, ১৯৬৩ সালে, তাঁরা মনস্থির করলেন, অতএব, কাফকার লেখার আমলাতান্ত্রিক চিত্রণ নিয়ে কথা বলতে হবে। কাফকার মূল লেখাগুলোর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিস্তর হয়েছে, কিন্তু তিনি আদতে কোনো রাজনৈতিক লেখক কি না তা নিঃসন্দেহে একটি বিতর্কিত বিষয়।

ইহুদিত্ব ও জায়োনিজম

ইহুদি ধর্মের সঙ্গে কাফকার সম্পর্ক তা ইদ্দিশ নাটক দেখে তাঁর মোহগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে দিয়েই প্রকাশ হোক কিংবা মার্টিন বুবারের ‘সাংস্কৃতিক জায়োনিজম’ আন্দোলনে বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই হোক কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ম্যাক্স ব্রড ও হুগো বার্গম্যানের সরাসরি জায়োনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই হোক ইদানীংকালের কাফকা-গবেষণার অন্যতম বড় একটি বিষয়। কাফকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই চালাতেন প্রাগের জায়োনিস্ট সংবাদপত্র Selbstwehr (Self-Defence বা আত্মরক্ষা)। এঁদের সঙ্গে কাফকা জায়োনিস্ট মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন অনেকবার; ১৯১৩ সালে ভিয়েনায় এগারোতম জায়োনিস্ট কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন, হিব্রু পড়েছেন, এমনকি ডোরাকে নিয়ে প্যালেস্টাইনে গিয়ে বাস করার স্বপ্নও দেখেছেন। কাফকার অনেক লেখায়, যেমন গল্পসমগ্র-এর এই প্রথম খ-ে প্রকাশিত ‘শিয়াল ও আরব’, ‘অ্যাকাডেমির জন্য একটি প্রতিবেদন’ ও ‘গায়িকা জোসেফিন অথবা ইঁদুর-জাতি’ গল্পে এবং দ্বিতীয় খ-ের ‘একটি কুকুরের তদন্তমালা’ ও ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ গল্পে তখনকার জায়োনিস্ট মহলে চলমান বিতর্কগুলো আমরা দেখতে পাই, আর ওগুলো মূলত (প্রাথমিক অর্থে) জায়োনিস্ট পাঠকদের জন্যই লেখা হয়েছিল মার্টিন বুবারের সাময়িকী Der Jude (The Jew বা ইহুদি)-এর কাফকা একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন এবং ১৯১৭ ও ১৯১৮ সালে এই পত্রিকায় তিনি বেশ কটি গল্প প্রকাশ করেন।

কাফকার ‘যন্ত্রণা’, তাঁর লেখায় নিজেকে পীড়িত করার, কষ্ট দেওয়ার শ্লেষাত্মক বর্ণনা, তাঁর ‘বিভাজিত’ ব্যক্তিত্ব, এই সবকিছু তখনকার দিনের মধ্য ইউরোপের ইহুদিদের ‘আত্মসমালোচনা’ ও ‘আত্ম-ঘৃণার’ যে সংস্কৃতি চালু ছিল, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ১৯১০ সালের Selbstwehr পত্রিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, কাফকার অঞ্চলের (বোহেমিয়া রাজ্যের প্রাগ ছিল এর রাজধানী) ইহুদিদের প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে: ‘আপনি যদি শোনেন যে তারা তাদের সঙ্গী ইহুদিদের নিয়ে কী বলছে, আপনার মনে হবে আপনি পৃথিবীর এক নম্বর ইহুদিবিদ্বেষী (anti-semitic) কারো সঙ্গে আছেন।’ কাফকার মধ্যেও যে একই প্রবণতা ছিল, তা তাঁর লেখা ও ডায়েরির পাতায় স্পষ্ট। তখনকার পশ্চিম ইউরোপীয় ইহুদিরা সবাই ‘দলগত সংশয়’-এ ভুগতেন চেক জাতীয়তাবাদী সংখ্যাগুরুরা ইহুদিদের মনে করত তারা ধর্মাচার মেনে গোপনে মানুষ খুন করে; এই সংখ্যাগুরুরা মাঝেমধ্যে ইহুদিদের মেরেও বসত (কাফকার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু তার ছোটবেলায় ইহুদিবিদ্বেষী এক আক্রমণে চোখের দৃষ্টি হারান); ইহুদিদের ব্যঙ্গ করে বলা হতো ‘ছারপোকা’, ‘কুকুর’, ‘শিম্পাঞ্জি’, ও ‘ইঁদুর’ (লক্ষণীয় যে এই চারটি প্রাণী নিয়েই কাফকা তাঁর বিখ্যাত চারটি গল্প লিখেছেন, যদি আমরা ‘রূপান্তর’ গল্পের অনিশ্চিত প্রজাতির পোকাটিকে ছারপোকা হিসেবে ধরি)। সংখ্যাগুরুদের হাতে এসব লাঞ্ছনার জবাব দেওয়ার জন্য ইহুদিদের কোনো শক্ত ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম ছিল না। প্রাগের ইহুদিদের তখন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ কিংবা আত্মহত্যা করা ছিল অনেক নৈমিত্তিক ঘটনা। কাফকা ডায়েরিতে লিখেছেন ‘আমার ক্লাসে সম্ভবত মাত্র দুজন সাহসী ইহুদি ছেলে ছিল, এরা দুজনই স্কুলে থাকতেই কিংবা স্কুল ছাড়ার কিছুদিন পরে গুলিতে আত্মহত্যা করে।’

ইহুদিত্ব ও জায়োনিস্ট আন্দোলন নিয়ে কাফকার মুগ্ধতার পাশাপাশি, আমরা তাঁর ডায়েরিতে অন্য রকম কথাও দেখতে পাই: ‘আমার সঙ্গে ইহুদিদের কোনো মিল আছে কি? আমার নিজের সঙ্গেই আমার কিছুর মিল নেই; আমি যে শ্বাস নিতে পারছি এটুকু ভেবেই তো আমার উচিত খুব চুপচাপ এক কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।’

Excavating Kafka বইতে হয়েস বলছেন, কাফকা তাঁর নিজের ইহুদিত্ব বিষয়ে খুব সচেতন থাকলেও, তাঁর লেখার ইহুদি ব্যাখ্যা করা ভুল হবে, কারণ, হয়েসের মতে, তাঁর লেখায় ইহুদি চরিত্র, দৃশ্য বা থিম অনুপস্থিত। প্রখ্যাত সাহিত্যবোদ্ধা হ্যারল্ড ব্লুম এ কথার বিপরীতে বলেন যে, যদিও কাফকা তাঁর ইহুদি উত্তরাধিকার নিয়ে বিব্রত ছিলেন, তবু তিনি ‘মূলত একজন ইহুদি লেখক’। পাভেল আইজ্নার, কাফকার প্রথম দিককার অনুবাদকদের একজন, তাঁর বিচার উপন্যাসকে বলছেন যে এটি ‘প্রাগে ইহুদিদের ত্রিধারা অস্তিত্বের এক মূর্ত প্রকাশ…নায়ক জোসেফ কে. এখানে (রূপকার্থে) গ্রেপ্তার হলেন একজন জার্মানের (রাবেনস্টাইনার), একজন চেকের (কুলিচ) এবং একজন ইহুদির (কামিনার) হাতে। আধুনিক পৃথিবীর ইহুদিদের “অপরাধহীন অপরাধবোধের” (guiltless guilt) প্রতিমূর্তি জোসেফ কে., যদিও উপন্যাসটির কোথাও এমন কোনো প্রমাণ নেই যে জোসেফ কে. একজন ইহুদি।’

মৃত্যু

১৯১৭ সালের আগস্টে কাফকার স্বরযন্ত্রের ক্ষয়রোগ (যক্ষ্মা) ধরা পড়ে। ১৯১৮-এর অক্টোবরে তিনি স্প্যানিশ ফ্লুুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর একদম কাছাকাছি চলে যান। উল্লেখ্য, স্প্যানিশ ফ্লুতে সে সময় শুধু জার্মানিরই আড়াই লাখ লোক মারা গিয়েছিল। টানা কয়েক সপ্তাহ ১০৬ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় কাটে তাঁর। আমরা তাঁর যক্ষ্মার প্রসঙ্গেই ফিরে যাই। ১৯১৭-র আগস্টের পর কাফকা তাঁর বাবা-মায়ের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসেন, এরপর বোন ওট্লার কাছে, গ্রামে, গিয়ে থাকেন আট মাস। আবার ফিরে আসেন বাবা-মায়ের কাছে, এরপর প্রাগ ও আধা-স্বাস্থ্যনিবাস ধরনের নানা হোটেলের (যক্ষ্মা উৎপীড়িত পুরোনো ইউরোপে ওরকম হোটেলের কমতি ছিল না) মধ্যে বারবার আসা-যাওয়া; তারপর সত্যিকারের ডাক্তারি স্বাস্থ্যনিবাস হয়ে বার্লিনে ডোরা ডিয়ামান্টের সঙ্গে কয়েক মাস।

১৯২৪-এর মার্চে তিনি খুব অসুস্থ অবস্থায় বার্লিন থেকে প্রাগে ফিরে আসেন। এখানে পরিবারের সবাই, বিশেষ করে তাঁর প্রিয়তম ছোট বোন ওট্লা, তাঁর দেখভাল করেন। ১০ এপ্রিল কাফকাকে নেওয়া হয় ভিয়েনার কাছে কির্য়েলিংয়ে ডক্টর হফমানের স্যানাটোরিয়ামে। কাফকার সঙ্গে ছিলেন প্রেমিকা ডোরা ও রবার্ট ক্লপ্স্টক (১৯২১-এ চেকোস্লোভাকিয়ার মাতলিয়ারি স্যানাটোরিয়ামে কাফকার চেয়ে ১৬ বছরের ছোট মেডিক্যাল ছাত্র রবার্টের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। রবার্ট ওখানে নিজের যক্ষ্মা সারাতে এসেছিলেন। ম্যাক্স ব্রডকে লেখা কাফকার চিঠিতে জানা যায়, কাফকা এই ছেলেটির মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাহিত্যিক ফ্রানৎস ভেরফেলকে খুঁজে পেয়েছিলেন। কাফকা, ডোরা ডিয়ামান্ট ও রবার্ট ক্লপ্স্টক– এই তিন মিলে আমাদের ‘ছোট পরিবার’; তিনি জীবনের শেষ বছরে এ রকমই বলতেন। রবার্ট ক্লপ্স্টক ১৯৭২ সালে আমেরিকায় মারা যান)। এই স্যানাটোরিয়ামেই ১৯২৪-এর ৩ জুন কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। না খেতে পারাই ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ: গলার অবস্থা ক্ষয়রোগে এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি দীর্ঘদিন কোনোকিছু গলা দিয়ে নামাতে পারেননি, আর অন্য কোনোভাবে শরীরে খাবার ঢোকানোর পদ্ধতিও তখনো আবিষ্কার হয়নি। তাঁর মৃত্যুর বিস্তারিত বিবরণটি এরকম:

সোমবার ২রা জুন, কাফকার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি ‘এক অনশন-শিল্পী’ বইটির প্রুফ দেখে কাটান।…কিন্তু পরদিন ভোর চারটার দিকে ডোরা লক্ষ করেন, কাফকা ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছেন না। ডোরা তখন ক্লপ্স্টক ও ডাক্তারকে খবর দেন; ডাক্তার কাফকাকে কর্পূরের ইনজেকশন দেন।
কাফকা খুবই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, তিনি ক্লপ্স্টককে বকতে থাকেন, জানতে চান তাঁকে কেন সেই প্রতিশ্রুত মরফিন দেওয়া হচ্ছে না: ‘তুমি আমাকে সব সময় কথা দিয়েছ। গত চার বছর ধরে তুমি আমাকে কথা দিয়ে আসছ। আমাকে তুমি জ্বালাচ্ছ, সব সময় তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ে আসছ। তোমার সঙ্গে আমি আর কথা বলব না। তাহলে তা-ই হোক, ওটা [মরফিন] ছাড়াই আমি মারা যাব।’ তাঁকে তখন মরফিনের দুটো শট দেওয়া হয়, কিন্তু তখনো তিনি বলছেন: ‘আমাকে বোকা বানাবার চেষ্টা কোরো না। তুমি আমাকে রোগ সারানোর ওষুধ [অ্যান্টিডোট] দিচ্ছ।’ এরপর শেষ একটা স্বচ্ছতার খিঁচুনি, তিনি রবার্ট ক্লপ্স্টকের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন: ‘আমাকে হয় মেরে ফেলো, না হলে তুমি খুনি’ (Kill me, or else you are a murderer)|।
শরীরে মরফিনের কাজ শুরু হলে কাফকা ক্লপ্স্টককে তাঁর বোন এলি বলে ভাবা শুরু করেন, ভয় পান যে এলির মধ্যেও এই অসুখ ছড়িয়ে যাবে: ‘বেশি কাছে এসো না এলি, বেশি কাছে না… হ্যাঁ, ওখানে থাকো, ওটাই ঠিক আছে।’
২ তারিখেই, অমানুষিক কষ্ট করে কাফকা তাঁর বাবা-মায়ের কাছে একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন, চিঠিতে তাঁর শারীরিক অবস্থার নিখুঁত বিবরণ দেন, তাঁরা তাঁকে দেখতে আসবেন কি না, এলে লাভ কী আর ক্ষতি কী, এ দুয়ের যুক্তি-তর্ক তুলে ধরে শেষে তাদের না আসতে বলেন। চিঠিটি তাঁর হয়ে লেখা শেষ করেন ডোরা, যোগ করেন: ‘আমি ওর হাত থেকে কলম নিয়ে নিলাম…’।
৩ জুন, রবার্ট ক্লপ্স্টকের দিকে তাঁর চিরাচরিত ঢঙে ঐ প্যারাডক্সিকাল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পরে, ক্লপস্টক যখন ইনজেকশনের সিরিঞ্জ সাফ করতে যাচ্ছেন, কাফকা মিনতি জানান: ‘আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।’ ক্লপস্টক বলেন: ‘আমি যাচ্ছি না।’ কাফকা উত্তরে বলেন: ‘কিন্তু আমি যাচ্ছি’; তারপর তাঁর চোখ বন্ধ করেন।
৩ জুন, মঙ্গলবার, দুপুরের দিকে, তাঁর একচল্লিশতম জন্মদিনের এক মাস আগে, কাফকা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ডোরা তখন প্রচ- ভগ্নহৃদয়, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থা, কাফকার মৃত শরীর ছেড়ে যাবেন না; ক্লপ্স্টক একসময় ডোরাকে বিশ্রাম নিতে যাওয়ার জন্য জোর করতে থাকেন। ‘শুধু ডোরাকে যারা চেনে, তারাই জানবে ভালোবাসার অর্থ কী,’ এর কয়েক ঘণ্টা পরে ম্যাক্স ব্রডকে লেখেন ক্লপ্স্টক।
এই দফায় মাত্র এক সপ্তাহ লাগল কাফকাকে প্রাগে ফিরিয়ে আনতে। ১১ জুন তাঁকে সমাধিস্থ করা হলো প্রাগের জেলিভ্স্কেহো রেলস্টেশনের পাশে নতুন ইহুদি কবরস্থানে। প্রায় ১০০ লোক জড়ো হয়েছিল তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। ম্যাক্স ব্রড সেখানে মৃত্যুর গাথা পাঠ করেছিলেন, আর যখন শবাধারটি কবরে নামানো হচ্ছিল, ডোরা নিজেকে কবরের মধ্যে বারবার ছুড়ে ফেলতে চাইছিলেন।

প্রাগের যে ছোট পৃথিবীতে কাফকা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন, সেখানে তাঁর মৃত্যু নিয়ে শোক করা হলো। সবচেয়ে বড় দৈনিক Prager Presse-এ ৪ জুন ম্যাক্স ব্রডের লেখা শোকগাথা ছাপা হলো। জার্মান ভাষার পত্রিকাগুলোতে দীর্ঘ শোকসংবাদ বেরোল। ১৯ জুন প্রাগের জার্মান চেম্বার থিয়েটারে ৫০০-এর মতো লোক জড়ো হলো কাফকার স্মৃতিসভায়। ৫ জুন কাফকার প্রাক্তন প্রেমিকা, চেক ভাষায় তাঁর অনুবাদক, মিলেনা য়েসেন্স্কা প্রাগের চেক রক্ষণশীল দৈনিক Narodny Listy-তে কাফকার উদ্দেশে বিদায়বার্তা লিখলেন:

ডক্টর ফ্রানৎস কাফকা, প্রাগে বাস করা জার্মান লেখক, গত পরশু মারা গেছেন ভিয়েনার কাছে ক্লস্টারনুবার্গের কির্য়েলিং স্যানাটোরিয়ামে। অল্প মানুষই তাঁকে চিনতেন, কারণ তিনি চলতেন একা, সন্ন্যাসীর মতো পৃথিবীর রীতিনীতি বিষয়ে সচেতন কিন্তু ওগুলোতে ভীত। কয়েক বছর ধরেই তিনি ভুগছিলেন ফুসফুসের অসুখে, অসুখটি তিনি সযত্নে লালন করতেন…এই অসুখ তাঁকে অনুভূতির এমন এক সূক্ষ্মতা দিয়েছিল, যাকে অলৌকিকের কাছাকাছি কিছু বলতে হবে, আর দিয়েছিল এমন এক আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা যার আপসহীনতার ব্যাপারটি ভয়-জাগানোর মতো কিছু হয়ে পড়েছিল…। আধুনিক জার্মান সাহিত্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লেখাগুলো তিনি লিখেছেন; এদের নগ্ন সত্যের কারণে, এমনকি যখন রূপক অর্থেও বলা হচ্ছে, তখনো মনে হয় সবকিছু কত স্বাভাবিক। এদের মধ্যে আছে এমন একজন মানুষের বক্রাঘাত (irony) ও ভবিষ্যদ্বক্তার অন্তর্দৃষ্টি (prophetic vision) যিনি দণ্ডিত ছিলেন পৃথিবীকে এতখানি এক চোখ-ধাঁধানো স্পষ্টতা নিয়ে দেখার কাজে যে, তিনি আর তা সইতে পারেননি, তাই মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন।

কাফকাকে কবর দেওয়া হলো সেই প্রাগেই, যেমনটা তিনি জানতেন ও ভয় পেতেন যে একদিন হবে। ‘ছোট মায়ের থাবা’ (কাফকা এভাবেই বলতেন প্রাগ সম্বন্ধে) একদম তিক্ত এক শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখল। এখন প্রাগের নতুন ইহুদি কবরস্থানে পাঁচ ভাষায় কাফকা-তীর্থযাত্রীদের তাঁর কবরে পৌঁছানোর রাস্তা দেখানো হচ্ছে। তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকেও ছাড়া পেলেন না, এমনকি মৃত্যুতেও না; তাঁরা আছেন তাঁর সঙ্গে একই কবরে, একই কবরফলকের নিচে।

৩.

ফরাসিরা কেন কাফকা পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল?

১৯৪৬ সালে ফরাসি কম্যুনিস্টরা এক জরিপ চালিয়েছিল: ‘কাফকা কি অবশ্যই পুড়িয়ে ফেলা উচিত?’ — এই শিরোনামে। তাদের যুক্তি ছিল, কাফকা ‘অন্ধকারের সাহিত্যের’ বিপজ্জনক প্রতিনিধিত্ব করছেন, সমাজে কাফকার খুব বাজে প্রভাব পড়তে পারে। খ্রিষ্টানরাও একই রকম কথা বললেন, এমনকি এরিখ হেলারের মতো পণ্ডিত মানুষও। গুন্টার অ্যান্ডার্স তাঁর আলোচনার উপসংহার টানলেন এই কথা বলে: ‘পৃথিবীর যে ছবি কাফকা এঁকেছেন, সে রকম পৃথিবী বাস্তবে হওয়া উচিত নয়; তাতে মানুষের যে রকম আচরণ, সে রকম আচরণ হওয়া ঠিক নয়…ইতিবাচক কিছু হিসেবে তাঁর সাহিত্য কখনোই তাঁর নিজের বা অন্যদের কাজে আসবে না; তবে “সতর্কবাণী” হিসেবে আমাদের জন্য তা কাজে লাগতে পারে।’

ইতির বিপরীতে কাফকার এই নেতিবাচকতার কথা বলতে গেলে সেই ক্লিশে ‘কাফকায়েস্ক’ প্রসঙ্গই বারবার চলে আসে। আমরা যদি ১০০ রকমের ও ধরনের কাফকা-ব্যাখ্যা পাশে সরিয়ে রাখি, এ কথা তো অগ্রাহ্য করা যাবে না যে কাফকার লেখার একেবারে মূলে আছে আধুনিক পৃথিবীতে ব্যক্তির একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং অনাত্মীয় পরিবেশে ‘এই পৃথিবীতে, এই শহরে, আমার পরিবারে পা রাখার ব্যাপারে পুরোপুরি অনিশ্চিত’ মানুষদের কথা ও কাহিনি। কাফকা তাঁর পাঠকের মধ্যেও এই বিচ্ছিন্নতার বোধ জারিত করেন কী সুন্দরভাবে তাঁর লেখায় কোনো দেশ, সময় বা স্থানের নাম থাকে না; এমনকি প্রকৃতির আইনও কাজ করে না (মানুষ পোকা হয়ে যায়), সামাজিক রীতিও মানা হয় না (‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’ গল্পের বুড়ো ডাক্তার শীতের নগ্ন পৃথিবীতে ‘এই সবচেয়ে অসুখী সময়ের তুষারের সামনে অনাবৃত হয়ে’ অনন্তকাল ঘুরে বেড়ান); পারিবারিক নিয়মও শ্রদ্ধা করা হয় না (ছেলে বিয়ে করবে তাই বুড়ো বাবা ‘রায়’ গল্পে ছেলেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন)। আরো বেশি স্তম্ভিত হতে হয় তাঁর নিজের লেখা থেকে তাঁর দূরত্বের ব্যাপারটি দেখলে। তাঁর উদ্ভট, নিষ্ঠুর, অবিচারের ঘটনাগুলোয় আমরা দেখি লেখক কত নিস্পৃহভাবে অনুপস্থিত, কখনোই তিনি কোনো পক্ষ নিচ্ছেন না, কখনোই কোনো কিছুতে একটুও অবাক হচ্ছেন না; এর বদলে, সব সময় পক্ষপাতশূন্য, নৈর্ব্যক্তিক এক ভঙ্গিতে গল্প বলে যাচ্ছেন। তাঁর লেখা কেন প্রাসঙ্গিক, কেন আমরা তা পড়ব, এর উত্তরে কাফকার বিখ্যাত ডায়েরি এন্ট্রির কথাটাই মাথায় আসে। আমরা তা পড়ব, কারণ এতে ধরা আছে ‘Das Negative meiner Zeit’ ‘তাঁর সময়ের নেতিবাচকতা।’ কাফকা ডায়েরিতে লিখছেন:

আমি প্রচ-ভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছি আমার সময়ের নেতিবাচক বিষয়গুলো। এমন এক সময়ে আমি বাস করছি যা, অবশ্যই আমার অনেক কাছের, যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আমার কোনো অধিকার নেই, তবে যেন বা এই সময়টার প্রতিনিধিত্ব করার আমার অধিকার আছে।

কাফকার পৃথিবী এ রকম অ্যান্টি-পৃথিবী বলেই, তা ইতিহাসের নেতিবাচক দর্পণ বলেই ফরাসি কম্যুনিস্টরা কাফকা নিয়ে ওরকম ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।

‘আমি সাহিত্যে গড়া’

আমরা ফ্রানৎস কাফকার গল্পসমগ্র পড়ব আর সাহিত্যচর্চা তাঁর কাছে কত বড় পূজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ এক এবাদত ছিল তা জানব না, তা হয় না।
কাফকার ডায়েরিতে ও চিঠিতে আমরা দেখি, যতবারই কাফকা বিয়ের চিন্তা করেছেন, ততবারই তাঁর সাহিত্যচর্চাই তাঁর কাছে প্রধান বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। কোনো ভাষাই নেই এটুকু সত্য বোঝানোর জন্য যে, সাহিত্য তাঁর কাছে তার বেঁচে থাকার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রেমিকা ফেলিস বাউয়ার একবার যখন বার্লিনে কাফকার চিঠিগুলো এক হাতের-লেখা-বিশারদকে দেখতে দিলেন, সেই লোক বলেছিলেন, এই হাতের লেখা যার, তার ‘সাহিত্যে আগ্রহ’ আছে। ফেলিসকে কাফকা উত্তরে বলেছিলেন: ‘আমার সাহিত্যে আগ্রহ নেই, আমি সাহিত্য দিয়েই গড়া; আমি আর অন্য কিছু না, অন্য কিছু হতেও পারব না।’ তিনি মনে করতেন, বিয়ে করলে তাঁর জীবন থেকে সাহিত্যের জন্য প্রয়োজনীয় নির্জনতাটুকু তিনি হারাবেন। কিন্তু সেই নির্জনতা তিনি যখন খুঁজে পেতেন, তখনো সাহিত্য তাঁর কাছে কঠিন ও হতাশাজনক কিছুই হয়ে থাকত। কাফকার ডায়েরি তাঁর লেখার অক্ষমতা নিয়ে নিজেকে ভর্ৎসনায় ভরপুর। শুধু একবারই তিনি কোনো সচেতন চেষ্টা ছাড়া, স্বাচ্ছন্দে লিখতে পেরেছিলেন। সেই রাতটা ছিল ১৯১২ সালের ২২-২৩ সেপ্টেম্বর রাত; ২২ তারিখের রাত ১০টা থেকে ২৩ তারিখ সকাল ৬টা পর্যন্ত একটানা আট ঘণ্টায় তিনি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘রায়’ এবং এটি লেখার মধ্য দিয়েই নিজের লেখনীশক্তি তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন — কাফকা কাফকা হয়ে উঠেছিলেন। পরদিন তিনি ডায়েরিতে লিখলেন: ‘একমাত্র এভাবেই সম্ভব লেখালেখি, একমাত্র এরকম প্রাঞ্জলভাবেই, শরীর ও আত্মা এরকম সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার মাধ্যমেই।’ তাঁর এই প্রথম সাহিত্যিক সাফল্য আসে ফেলিসের সঙ্গে পরিচয়ের মাত্র এক মাসের মধ্যে। তিনি ম্যাক্স ব্রডকে বলেন, গল্পের শেষ লাইনটি লেখার সময় — অর্থাৎ ‘সে সময় সেতুটার উপর দিয়ে পার হচ্ছে রীতিমতো অফুরন্ত স্রোতে যানবাহন’ — এই বাক্যের শেষ শব্দটি ‘Verkher’ (অর্থাৎ traffic বা যানবাহন) লেখার সময় তিনি ভেবেছিলেন ‘শক্তিশালী এক বীর্যপাতের’ কথা। ‘Verkher’ শব্দের জার্মান অর্থ একই সঙ্গে ‘যানবাহন’ ও ‘বীর্যপাত’ বা ‘যৌনমিলন’। এখানে শব্দটি ‘যানবাহন’ অর্থে ব্যবহৃত হলেও, কাফকা যেহেতু ব্রডকে এরকম কথা লিখেছেন, তাঁর মানে কি এই যে তাঁর যৌনকামনা, ফেলিস তা জাগ্রত করার পর, তাঁর লেখালেখির মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছিল?

সফল সার্থক লেখার অনুভূতি কাফকার জন্য শুধু ওরকম চূড়ান্ত আনন্দের কিছু ছিল, কেবল তা-ই নয়; সার্থক কোনোকিছু লেখার মধ্যে দিয়ে তিনি তার জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকেও দূরে সরতে চাইতেন। প্রায়ই দেখা যেত কষ্টের কোনো ঘটনার পরেই কাফকার সৃজনীশক্তি জেগে উঠত। ফেলিসের সঙ্গে বাগ্দান ভেঙে যাওয়ার পরে, ফেলিসের বান্ধবী গ্রেটে ব্লখের সঙ্গে গোপনে প্রেম করবার শাস্তিস্বরূপ বন্ধুদের সঙ্গে হোটেলে ‘বিচারপর্বে’ (tribunal) বসার পরেই, তিনি লিখলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস বিচার ও মারাত্মক গল্প ‘দণ্ড উপনিবেশে’ দুটি কাহিনিই ন্যায়বিচারের মেটাফর (রূপক)। দুর্গ উপন্যাসটিও তেমন, এটি তিনি শুরু করেন মিলেনার সঙ্গে বিচ্ছেদ হবে হবে এমন সময়ে। লেখার মাধ্যমে জীবনের উচ্চতর দৃষ্টিকোণ অর্জন করে কাফকা তাঁর অর্থহীন আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মগ্লানি থেকে কিছুটা হলেও বাঁচবার পথ খুঁজে পেতেন। ১৯২২ সালে তিনি লিখলেন, লেখালেখির সান্ত¡না এটাই যে এর মাধ্যমে ‘খুনিদের লাইন’ থেকে তিনি বেরিয়ে যেতে পারেন, আর সৃষ্টি করতে পারেন ‘আরো উচ্চতর ধরনের এক দেখার চোখ, উচ্চতর, ধারালোতর নয়; আর সেটা যত বেশি উঁচু হয়, খুনিদের লাইন থেকে (আমার অস্তিত্ব) তত দূরে সরে যায়; সেটা যত তার নিজের গতির আইন মেনে চলে, ততই তার পথ হয়ে ওঠে আরো অগণনীয়, আনন্দময় ও ঊর্ধ্বগামী।’

একই সঙ্গে কাফকা ভাবতেন যে, লেখালেখি তাঁর কাছে নিজের ‘মনশ্চিকিৎসা’র চেয়ে অনেক বেশি কিছু। লেখালেখির মধ্য দিয়ে ‘নবযুগের’ সূচনা হয় বলে ভাবতেন তিনি। ১৯১৬ সালে কাফকা তাঁর প্রকাশকের কাছে স্বীকার করলেন, ‘দণ্ড উপনিবেশে’ গল্পটি আসলেই বেদনাদায়ক একটি গল্প; ব্যাপারটা তিনি ব্যাখ্যা করলেন এভাবে: ‘আমাদের ইতিহাসের এই যুগ, বিশেষ করে আমার এই সময়টি, সত্যিই অনেক বেদনাদায়ক।’ পরের দিকে এসে তিনি তাঁর লেখালেখিকে বললেন ‘ধাঁধায় ভরা এক মিশন’।

এক গ্রাম্য ডাক্তার-এর মতো লেখা লিখে আমি এখনো খুব বেশি হলে ক্ষণস্থায়ী একধরনের তৃপ্তি পেতে পারি, এ ক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছি যে ওরকম আরো লেখা আমার পক্ষে সম্ভব (যদিও খুবই অসম্ভব ঠেকছে ব্যাপারটা); কিন্তু সুখ পেতে পারি কেবল তখনই যখন আমার পক্ষে সম্ভব হবে পৃথিবীকে তার শুদ্ধ, সত্য ও পরিবর্তনের-অতীত রূপে তুলে ধরা।

এ কথার কী অর্থ (…’raise the world into the pure, the true, the unchangeable’) তা বোঝা দুরূহ; তবে এটুকু পরিষ্কার যে লেখালেখি তাঁর কাছে ব্যক্তিগত কোনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। তিনি পৃথিবীর মূল সত্য, আদি ও অপরিবর্তনীয় মূল রূপটিকে তা শুভ হোক আর অশুভ হোক, কিছু যায়-আসে না; অন্তত তাঁর কাছে সত্য রূপ বলে মনে হলেই হলো তাঁর লেখালেখির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে চাইছিলেন। তিনি যখন একই প্রসঙ্গে বলেন, লেখালেখি তাঁর কাছে ‘প্রার্থনা’র মতো, তখন হঠাৎই বিভ্রম বোধ হয় যে (যেমনটা কাফকার লেখার ধর্মীয় ব্যাখ্যাদাতারা বলেন), সত্যিই কি কাফকা নিজেকে ‘পয়গম্বর’ বলে মনে করতেন?

কাফকা-ব্যাখ্যা– ধর্মীয় ব্যাখ্যা

আগেই বলেছি, কাফকার সাহিত্যকর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে অগুনতি রকমের। কোনো কাফকা-ব্যাখ্যারই গভীরে যাওয়ার জায়গা এটি নয়; অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য ওই ছোঁয়াটুকুই যথেষ্ট। তার পরও যতগুলো কাফকা-ব্যাখ্যা হয়েছে (বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাফকা ব্যাখ্যার মোট ১৯ রকমের মূলধারা আছে), যেমন অস্তিত্ববাদী ব্যাখ্যা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদী ব্যাখ্যা (তিনি ডায়েরিতে লেখেন যে, ‘রায়’ গল্পটি লেখার সময়ে তাঁর মাথায় ‘ফ্রয়েডের চিন্তা, স্বাভাবিকভাবেই’ এসেছিল), মার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যা, মেটাফিজিক্যাল ব্যাখ্যা, সামন্ততান্ত্রিক ব্যাখ্যা, অ্যাবসার্ড সাহিত্যিক ব্যাখ্যা, এক্সপ্রেশনিস্ট ব্যাখ্যা, সামাজিক ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, দার্শনিক ব্যাখ্যা, নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, আত্মজৈবনিক ব্যাখ্যা, আইনি ব্যাখ্যা, ইত্যাদি ইত্যাদি, এর মধ্যে আজও অন্যতম জোরালো ব্যাখ্যা হিসেবে, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সূত্রের নিরিখে কাফকা-ব্যাখ্যা এবং অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোকে কাফকা ব্যাখ্যার পাশাপাশি টিকে আছে কাফকা-সাহিত্যের ধর্মীয় ব্যাখ্যা। মৃত্যুর পরে যেহেতু ম্যাক্স ব্রডের হাত ধরেই কাফকার বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশ এবং ব্রড যেহেতু বিশ্বাস করতেন কাফকার লেখাকে দেখতে হবে ‘ঈশ্বরহীন পৃথিবীতে ব্যক্তিমানুষের ঈশ্বরকে খোঁজার আধ্যাত্মিক এক নিরন্তর সংগ্রাম হিসেবে’, আর সেই সঙ্গে কাফকার প্রথম ইংরেজি অনুবাদক উইলা ও এডুইন ম্ইুরও যেহেতু সেই বিশ্বাস মাথায় রেখেই কাফকা-অনুবাদ করেন, কাফকার ধর্মীয় ব্যাখ্যাটি তাই রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে ‘কাল্ট’-এর আকার ধারণ করে। আমরা এখানে কাফকার সৃষ্টিকর্মের আজও এই সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যাটি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করব।
ধেয়ান নামের গল্পসংকলনে আছে কাফকার অন্যতম বিখ্যাত স্কেচ ‘গাছ’। পুরো লেখাটি এ রকম:

যেহেতু আমরা হচ্ছি তুষারে গাছের গুঁড়িগুলোর মতো। আপাত-চোখে ওগুলো কী সুন্দর, তুষারের উপরে, পড়ে আছে মাটিতে; আর হালকা একটা ধাক্কাতেই আমরা ওদের সরাতে পারব মনে হয়। না, আপনি তা পারবেন না, কারণ ওরা শক্ত করে মাটিতে গাঁথা। কিন্তু দেখুন, সেটাও স্রেফ আপাত-অর্থেই।

এই লেখার কী মানে হয়? নিট্শের মতোই কাফকা এখানে বলছেন, ‘পৃথিবীর আর কোনো নিরাপদ ভিত্তি নেই, ভিত্তি সরে গেছে।’ তুষারের মধ্যে বড় হওয়া গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছে ওরা দাঁড়িয়ে আছে শক্তপোক্তভাবে, কিন্তু ওদের ধাক্কা দিয়ে সরানো সম্ভব। তবে আমরা সরাতে চাইলেই গাছগুলো থেকে বাধা আসছে, মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে ওদের শিকড় আরো গভীরে পোক্ত। কিন্তু ওদের এই মাটির গভীরের শিকড় একটা ‘ইল্যুশন’ বা অলীক কল্পনা মাত্র। দেখতে যাকে সবচেয়ে পোক্ত ভিত্তির মনে হয়, তার ভিত্তি আসলে অত পোক্ত আদৌ নয়। নিট্শের ক্ষেত্রে এই হালকা ভিত্তির কারণ: ইউরোপে ‘ঈশ্বর মারা গেছেন।’ সেটা এ কারণে শুধু নয় যে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস ধসে গেছে; বরং এ কারণেও যে মানুষ চাইছে, বিদ্রোহীর মতো, তাদের নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ঈশ্বরের হাত থেকে কেড়ে নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে। ইউরোপে ঈশ্বর-অস্বীকারের মধ্যে দিয়ে পৃথিবী তার আগের সেই স্পষ্ট দিগন্তরেখা, স্পষ্ট অর্থ এবং দৃঢ় ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছে। যুদ্ধ, নির্যাতন, ক্ষুধা, নিগ্রহ ও নির্বিচার অবিচারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে গেছে যে, আর কোনো সূত্র নেই, শরণ নেই, কিসের বরাতে জীবনকে দেখব তার আর কোনো বিধিমালা নেই, মানুষ আর পারছে না পৃথিবীকে অন্ধকার পথের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে; কোনো অভিভাবক নেই, কর্তা নেই, যিনি কিনা আমাদের জন্য তা ঠেকাবেন।

কাফকা বারবার ওরকম এক পরিস্থিতির ছবি এঁকেছেন যেখানে আমাদের অভিভাবক, আমাদের কর্তা, আরো আরো দূরে সরে গেছেন, অনতিক্রম্য দূরে, যেন নির্বাসনে। সে জন্যই কাফকার শ্রেষ্ঠতম একটি লেখা ‘সম্রাটের কাছ থেকে একটি বার্তা’য় (এ বইয়ের এক গ্রাম্য ডাক্তার গল্পসংকলনে আছে) আমরা দেখি সম্রাট তাঁর বার্তাবাহককে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন তাঁর মৃত্যুশয্যা থেকে, কিন্তু সেই ‘অপরাজেয়’, ‘শক্তিশালী’ বাহক নানা গোলকধাঁধার চক্করে পড়ে আমাদের কাছে মৃত সম্রাটের বার্তাটি আর পৌঁছাতেই পারল না। ‘কিন্তু’, গল্পটি এভাবে শেষ হচ্ছে, ‘তুমি বসে থাকো তোমার জানালায়, আর যখন সন্ধ্যা নামে, তুমি স্বপ্নে কল্পনা করে নাও ঐ বার্তার’। ঈশ্বর যদি সত্যিই মারা গিয়েও থাকেন আমরা তবু ঐ ঐশ্বরিক বার্তার আশায় বসে থাকি; কিন্তু যখন কোনো বার্তা, কোনো সাহায্যই আসে না, যখন ধুম করে চাকরি হারিয়ে একটা পরিবার রাস্তায় ভিক্ষার জন্য বসে যায়, বা যখন বিনা বিচারে পুলিশ আমাদের কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়, তখন আমরা মনে মনে কল্পনা করে নেই সে বার্তার, খোদার থেকে পাব এমন কোনো সান্তনার।

কাফকার উপন্যাসগুলোতে আমাদের যিনি বাঁচাবেন তাঁর এই অনুপস্থিতি অধিকাংশ সময়েই ধর্মীয় রূপকল্পে তুলে ধরা হয়েছে। আমেরিকা উপন্যাসে নিউ ইয়র্ক শহরের গির্জা দেখা যাচ্ছে কুয়াশার মধ্যে ডুবে আছে, কিন্তু পোলান্ডারের গ্রামের বাড়িতে কোনো গির্জাই নেই, বিল্ডিংটার আধুনিকায়নের কাজে ওটা পরিত্যক্ত করে রাখা হয়েছে। বিচার উপন্যাসের ক্যাথেড্রালটি বিশাল, অন্ধকারাচ্ছন্ন, প্রায় ফাঁকা; জোসেফ কে.র কাছে ওটা মূলত একটা ‘ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশন’। কবরে রাখা যিশুর একটা ছবি, জোসেফ কে. টর্চলাইটের আলোয় ছবিটা টুকরো-টুকরোভাবে দেখতে পাচ্ছে, একবারে পুরোটা কখনো নয়, তারপর একসময় সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল, কারণ ওটা ইদানীংকালের আঁকা একটা ছবি মাত্র। ক্যাথেড্রালের এই অন্ধকার দেখে আমাদের মনে পড়ে নিট্শের পাগলের সেই সর্বনাশা কথা: ‘চার্চগুলো এখন আর খোদার কবর ও মনুমেন্ট ছাড়া আর কী?’ কাফকার শেষ উপন্যাস দুর্গতে আমরা দেখি কীভাবে তিনি কে.র নিজের শহরের চার্চের সঙ্গে এই দুর্গের তুলনা দিচ্ছেন। দুর্গটি দেখতে দুর্গের মতো লাগছে না। তাহলে দুর্গের চেহারা নিয়ে কে.-র যে প্রত্যাশা, তা মিটবে কীভাবে? দুর্গে তো অভিভাবকেরা থাকেন, তাঁদের থাকার জায়গার চেহারাই যদি অমন হয়, তাহলে তাদের নিজেদের চেহারা কেমন হতে পারে? তাহলে এই হচ্ছে গ্রামের মানুষের কর্তার ছবি? আর দুর্গটা যদিও গ্রামের পেছনে অনেক উঁচুতে, কিন্তু ওটা দেখতে তো গ্রামের থেকে আলাদা কোনো কিছু লাগছে না। কাফকা কি এখানে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে আজকাল মানুষ যে কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে (অর্থাৎ খোদা), তা আসলে তাদের নিজেদের কল্পনা দিয়েই গড়া কোনোকিছু?

বারবার কাফকার লেখার এই ‘চার্চ’ তাঁর সময়ের প্রাগের চিত্রকেই তুলে ধরে, তাঁর ইহুদি পরিবারকে নয়। কাফকার জন্মস্থানের কয়েক গজের মধ্যেই চারটি বিশাল বিশাল চার্চ, পুরো প্রাগ ভরে আছে বিশালায়তন সব চার্চে। খ্রিষ্টধর্ম তাঁর কাছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা হিসেবে একদম তাঁর চোখের সামনেই ছিল সব সময়। তবে তাঁর লেখায় যে চার্চগুলো আছে, তাদের কী ব্যাখ্যা, তা বলা দুরূহ। ‘রায়’ গল্পে গেয়র্গের বন্ধু থাকে রাশিয়ার পিটার্সবার্গে, অর্থাৎ পিটারের শহরে, আমাদের মনে আসে সেন্ট পিটার ও রোমের কথা। তারপর গল্পের সেই বিধ্বংসী দৃশ্য: কিয়েভ শহরের এক যাজক মানুষের অনেক বড় এক ভিড়ের সামনে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তার হাতের তালু কেটে একটা ক্রুশচিহ্ন আঁকলেন। কেন? আর গেয়র্গের বাবা যখন গেয়র্গকে মৃত্যুদ- দিলেন, গেয়র্গ যখন সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামছে, তখন ঠিকে-ঝি চিৎকার করে উঠল: ‘যিশু’; ব্রিজটা থেকে ঝুলন্ত গেয়র্গকে নিশ্চয় ঝুলন্ত ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতোই দেখতে লাগছিল। ‘রূপান্তর’ গল্পে পোকা হয়ে যাওয়া গ্রেগরের দিকে তাঁর অভিভাবক পিতা আপেল ছুড়ে মারলেন, সে তখন ‘ঐ জায়গাতেই যেন পেরেকে গেঁথে গেল’ আবার সেই ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছবি মনে আসে আমাদের। ‘দণ্ড উপনিবেশে’ গল্পে শাস্তিপ্রাপ্ত আসামির আলোকপ্রাপ্তি ঘটে ‘ষষ্ঠতম ঘণ্টায়।’ ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’ গল্পের অসুস্থ ছেলেটিকে জানালা থেকে তাকিয়ে দেখে দুটি ঘোড়া; আস্তাবলে যিশুর জন্মের উল্টো ছবি যেন। ‘এক অনশন-শিল্পী’ গল্পে অনশন-শিল্পী খায় না ‘৪০ দিন’। ঠিক ৪০ দিনই কেন? যিশুর জনহীন-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো, উপোস করা সেই ৪০ দিনের কথাই কি মনে আসে না এটি পড়লে?

বাইবেলের এসব পরোক্ষ-উল্লেখ বিভ্রান্তিকরই ঠেকে, মনে হয় কাফকা খ্রিষ্টধর্মের মূল্যবোধগুলো নিয়ে ক্রিটিক করছেন। নিট্শের পাঠক হিসেবে কাফকা নিঃসন্দেহে ধর্ম নিয়ে নিট্শের সমালোচনাগুলো (বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে করা যেগুলো) জানতেন। নিট্্শে অস্বীকার করেছিলেন যে খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক বিষয় ও ধর্মতত্ত্বের মধ্যে আসমানি কোনো ব্যাপার আছে। নিট্শের হিসেবে নৈতিকতা বিষয়টি ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, কোনো অবিনশ্বর-একক নৈতিকতা বলে কিছু নেই, আর ধর্মীয় নৈতিকতার এত জয়গান এজন্য না যে ওগুলোর মধ্যে আহামরি কোনো উৎকর্ষতা আছে, বরং এজন্য যে, যারা ওগুলো মেনে চলে তারা পৃথিবীতে বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত মানুষ হয়। নিট্শে আরো বলেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের যাজক জাতীয় লোকেরা মূলত অসুস্থ, প্রাণহীন, খোঁড়া মানুষ আর তারা তাদের ততোধিক দুর্বল শিষ্যদের ওপর খবরদারি চালায় তাদের কৌশলে, মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়ে। এই আলোকে দেখলে কাফকার ‘রায়’ গল্পের নিজেকে আহত করা সেই যাজক হয়ে ওঠে নিট্শের The Genealogy of Morals-এর অসুস্থ যাজকেরই একটি ছবি, যে যাজকের ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে তার শিষ্যদের অসুস্থতার বোঝা বহনের গল্প। আমরা দেখি, ‘রূপান্তর’ গল্পের স্বার্থপর পরিবারটি যখন গ্রেগরের মৃত্যুর খবর পায়, তারা তাদের বুকে, স্বস্তিতে, ক্রুশচিহ্ন আঁকে। আমেরিকা উপন্যাসে কাজের মেয়ে ইয়োহান্না ব্রামার কার্লকে যৌনভাবে ব্যবহার করার পরে একটা কাঠের ক্রুশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করে। ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’ গল্পের ডাক্তার এটা ভেবে ব্যথিত যে তার রোগীরা তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস তাদের অপদার্থ যাজককে বাদ দিয়ে এখন এই বুড়ো ডাক্তারের ওপর অর্পণ করেছে:

তাদের আগের সেই ধর্মবিশ্বাস তারা হারিয়ে ফেলেছে; যাজক বসে আছে বাড়িতে আর তার বেদিতে পরার পোশাক এক এক করে ছিঁড়ে ফেলছে; কিন্তু ডাক্তারের কাছ থেকে তাদের আশা যে তিনি তার শল্যচিকিৎসকের নাজুক হাত দিয়ে সব অসম্ভবকে সম্ভব করে দেবেন।

কাফকার লেখায় উপরের এসব খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে যোগাযোগের উদাহরণের পাশাপাশি ইহুদিধর্ম ও জায়োনিজমের যোগাযোগের বিষয়টা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। দুই ধর্মের তাত্ত্বিকেরাই যার যার মতো করে অসংখ্য উদাহরণ তুলে ধরেছেন কাফকার গল্প, উপন্যাস, ডায়েরি, চিঠি ঘেঁটে। জায়োনিস্ট আন্দোলনের মতো একটি বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি কাবালার (Kabbalah; ইহুদিদের গূঢ় রহস্যময় ধর্মীয় গুপ্তবিদ্যা) দৃষ্টিকোণ থেকেও কাফকাকে দেখা হয়েছে। বিচার উপন্যাসের দৃশ্যকল্পগুলো , যেমন এর বিচারকেরা, দ্বার রক্ষকেরা, এর ঘোঁরানো-প্যাঁচানো সিঁড়িগুলো, বলা হয়েছে কাবালার অনেক সূত্র ও মন্ত্রের সঙ্গে মিলে যায়; যদিও কাফকা বিচার উপন্যাস লেখার সময়ে কাবালা বিষয়ে কতটুকু জানতেন তা নিয়ে বিরাট সন্দেহ আছে। কাফকার ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এখানে খ্যাতিমান দার্শনিক ওয়াল্টার বেন্জামিন ও ধর্মতাত্ত্বিক গেরশোম শোলেম (বর্তমানে যাকে কাবালা-বিদ্যা ও আধুনিক জার্মান-ইহুদি চিন্তার অন্যতম বড় স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে)-এর মধ্যকার বিতর্কের কথা উল্লেখ না করে পারছি না। বেন্জামিন খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন ম্যাক্স ব্রড ও অন্যদের খাড়া করা ‘অনায়াসলব্ধ’ ধর্মীয় ব্যাখ্যা পড়ে (তিনি ব্রডের লেখা কাফকা জীবনীগ্রন্থটি অন্যদের পড়তেই মানা করেছিলেন; তাঁর হিসেবে এতই ফালতু ওই বই); তাঁর ভাষ্যমতে, কাফকার কল্পনাগুলো পৃথিবীতে ধর্মের উদ্ভব ঘটারও আগের সময়কার বিষয়, কাফকার চিন্তার সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের চিন্তার যোগাযোগ আছে, কাফকার এই ‘প্রাচীনতা’ (যদিও তিনি ‘আধুনিকতাবাদী’ বা মডার্নিস্ট লেখকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ) ধর্ম ঘটবার আগের ঘটনা। আর শোলেম উত্তরে বলেছিলেন, যা-ই বলা হোক না কেন, কাফকা ঐশ্বরিক বার্তার আলোকেই তাঁর পৃথিবীর ছবিটি এঁকেছিলেন, কিন্তু সেই বার্তার তিনি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে যেতে পারেননি, কারণ তিনি বার্তাটির ঠিকভাবে পাঠোদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। শোলেমের মতে, কাফকা ‘নেগেটিভ’ বা ‘নেতিবাচক’ ধর্মতত্ত্বের বার্তাবাহক, ইতিবাচক ধর্মীয় বিশ্বাসের নয়।

যা-ই হোক, আপনি যতই কাফকা পড়বেন, বিশেষ করে তাঁর ডায়েরি, ততই আপনার কাছে পরিষ্কার হবে যে, কাফকার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মানুরাগী কারো খুশি হওয়ার কিছু নেই। আপনি ধাঁধায় পড়ে যাবেন এটা ভেবে যে, কাফকা কি ঈশ্বরের প্রশংসা করছেন, নাকি ঈশ্বরের সমালোচনা করছেন, নাকি ঈশ্বরের বাণী যে মানুষেরা বহন করে তাদের ব্যাপারে সন্দেহ-অবিশ্বাস-সংশয় প্রকাশ করছেন? আর সেই সঙ্গে কাফকার ঈশ্বর কি খ্রিষ্টান ঈশ্বর, নাকি ইহুদি ঈশ্বর, নাকি অন্য কোনো ধর্মের ঈশ্বর? কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতিই তিনি মিত্রতা দেখাননি– এটুকু পরিষ্কার। যতজন ধর্মবেত্তা ও দার্শনিক কাফকার মন কেড়েছিলেন, তাঁর মধ্যে একমাত্র সোরেন কির্য়েকেগার্ডের (১৮১৩-১৮৫৫) সঙ্গেই ছিল তাঁর কিছুটা বিশেষ এক সম্পর্ক।

১৯১৩ সালে কাফকা প্রথম কির্য়েকেগার্ড পড়েন। তিনি দেখতে পান যে ফেলিস বাউয়ারের সঙ্গে তাঁর বাগ্দান ভেঙে যাওয়ার ঘটনার (যার মূল উৎস ছিল বিয়ে করলে সাহিত্যচর্চায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে এমন একটা ভীতি) সঙ্গে ধর্মের টানে কির্য়েকেগার্ডের রেজিনা ওলসেন-এর সঙ্গে বাগ্দান ভেঙে যাওয়ার ঘটনার মিল আছে। ১৯১৭-১৮ সালে তিনি নতুন করে কির্য়েকেগার্ড পড়া শুরু করেন, ব্রডকে লেখা চিঠিতে বিস্তারিত লিখতে থাকেন কির্য়েকেগার্ড প্রসঙ্গে। কাফকা বিশেষভাবে মুগ্ধ হন কির্য়েকেগার্ডের Fear & Trembling বইয়ের পিতা-পুত্রের কাহিনি — হজরত ইবরাহিম ও তাঁর ছেলে ইসমাইলের কুরবানির কাহিনি– পড়ে। ছেলেকে কুরবানি দিতে রাজি হওয়ার মধ্যে দিয়ে ইবরাহিম সামাজিক নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে (অর্থাৎ পুত্রহত্যা করতে রাজি হয়ে) তাঁর পিতৃসুলভ নৈতিকতাবোধ ছাড়িয়ে গিয়ে, খোদার সেবায় সবকিছু উৎসর্গ করতে সম্মত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রত্যয় খুব ভালোভাবেই সামাজিক নৈতিকতার বিপক্ষেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে– এমনটাই বলেছিলেন কির্য়েকেগার্ড। কাফকা বললেন অন্য কথা। ইবরাহিম-ইসমাইলের ঘটনায় তাঁর মনে হলো ধর্মবিশ্বাস আসলে ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়, যার নির্ণয় শুধু খোদাই করতে পারেন; এখানে সামাজিক নৈতিকতার আগে – ঐ কুরবানির ঘটনায়– বিবেচনা করতে হবে ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে। কাফকার আরো মনে হলো, যে মানুষ তার চরিত্র দৃঢ় রাখতে পারে, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অটুট রাখতে পারে (যদিও বাবা-মা ও শিক্ষকেরা সব সময়ে চেষ্টা করেন এটা খর্ব করতে), সেই মানুষের প্রতি শয়তান ও ফেরেশতা, দুই-ই আকৃষ্ট হয়, এর ফলে তার পক্ষে পরম ভালো কাজ ও চরম খারাপ কাজ– দুটোই করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে।

কির্য়েকেগার্ড এভাবেই কাফকাকে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো মানবসমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখার চশমাটা ধার দিলেন, ধর্মীয় কাঠামোর আয়তনে জীবনকে দেখার স্পৃহা জাগালেন। কাফকা বুঝতে পারলেন, লেখালেখি শুধু নিজের জন্য নয়, শুধু নিজের সৃজনীক্ষুধা মেটাবার জন্য নয়, বরং এর মাধ্যমে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব, অর্থাৎ লেখালেখির কোনো উচ্চতর লক্ষ্যও থাকতে পারে। এভাবেই উচ্চতর লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাড়না থেকেই Ñ কাফকার লেখালেখি তাঁর অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল, কাফকা তাঁর অস্তিত্বের একটা ন্যায্যতা খুঁজে পেলেন এর মধ্যে দিয়ে। তাঁর লেখার প্রয়োজনটা হয়ে উঠল অস্তিত্ববিষয়ক বা অস্তিত্ববাদী, বা ধার্মিক প্রয়োজন। বিচার উপন্যাস লেখার সময় তিনি ডায়েরিতে লিখলেন:

দু বছর আগে যেমনটা ছিলাম [অর্থাৎ ‘রায়’ গল্প লেখার সময়ে] আজ আর আমি আমার লেখার মধ্যে সেরকম সুরক্ষিত অবস্থায় নেই…তার পরও আমি জীবনের একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি; আমার রোজকার শূন্য, পাগলাটে, ব্যাচেলরের মতো জীবনের একটা ন্যায্যতা খুঁজে পেয়েছি।

শেষ দিকের কাফকা শুধু তাঁর নিজের জীবনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি ও একটি কারণ বা ন্যায্যতা খুঁজে ফেরেননি, তিনি সেটি, পয়গম্বরদের মতোই, আমাদের সবারটার জন্যও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। তিনি তখন নিজেকে দেখেছেন তাঁর সময়ের আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে। ১৯১৮-র ২৫ ফেব্রুয়ারির নোটবুকে আমরা তাকে এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক মিশনের সঙ্গে লড়াইরত দেখি:

আমি যদ্দুর জানি, জীবনের জন্য দরকারি এমন কিছুই আমি সঙ্গে আনিনি, শুধু এনেছি মানুষের চিরকালীন ও সর্বজনীন দুর্বলতাগুলো। এভাবেই…খুব শক্তিশালীভাবেই আামি আত্মস্থ করে নিয়েছি আমার সময়ের নেতিবাচক দিকগুলো…। কির্য়েকেগার্ডকে যেভাবে খ্রিষ্টধর্ম– মানতেই হবে ওই ধর্ম এখন আলগা হয়ে পড়েছে, ব্যর্থ হচ্ছে– জীবনে হাতে ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে, আমাকে তা নেয়নি; কিংবা জায়োনিস্টরা যেভাবে ইহুদিদের প্রার্থনার শালের প্রান্ত– ওটাও এখন আমাদের থেকে পালিয়ে যাচ্ছে– ধরতে পেরেছে, আমি তা পারিনি। আমিই শেষ কিংবা আমিই শুরু।

‘আমিই শেষ কিংবা আমিই শুরু’ — শেষ কথা

কাফকা যখন বলেন, তিনি হয় শেষ, না হয় তিনি শুরু, অর্থাৎ তাঁর মধ্যেই আছে একটা সমাপ্তি বা একটা আরম্ভ, তিনি পুরোপুরি ভুল বলেন না। তিনি অর্ধেক ঠিক কথা বলেন। একভাবে দেখলে তিনি সমাপ্তি তো বটেই: তাঁর পথ ধরে আর বেশি দূর যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়; যে ভয়ংকর পৃথিবী তিনি তাঁর মাথার মধ্যে বয়ে চলেছিলেন, তার সামান্য অংশ মাথায় আনলেও সাধারণ মানুষ স্ট্রোকে বা দুর্ঘটনায় মারা যাবে (এ প্রসঙ্গে কাফকার মৃত্যুতে মিলেনা য়েসেন্স্কার শোকবার্তাটি আবার পড়ুন)। কিন্তু থিমের দিক দিয়ে দেখলে, তিনি শুরু। তাঁর বিশাল ও মহান থিম–এর পূর্বপুরুষ নিট্শে ও কির্য়েকেগার্ডে লুকানো থাকলেও, কথাসাহিত্যে কাফকার আগে কেউ তা ভাষা দেয়নি– হচ্ছে এ পৃথিবীতে বাস করার শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক টেনশন। আমাদের সময়ের আধুনিকতা, উদারনৈতিক চিন্তাচেতনা এবং তথাকথিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ফাঁকিটা ও ফাঁকটা কাফকা ধরতে পেরেছিলেন। সেজন্যই হয়তো কাফকার লেখা ভর্তি পুরোনো প্রথা ও পুরোনো বিশ্বাসে: পিতা, পিতার শাসন, আদালত, বিচার, দুর্গ, সম্রাট, অবিনশ্বর আইন ইত্যাদি। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ -এ যূথবদ্ধ, একত্রিত এক জাতির কথা বলার সময়, সেই জাতির একজন হতে পারার ‘মহান’ ব্যাপারটির কথা জানানোর সময়, কীভাবে কাফকা কাব্যিক হয়ে ওঠেন! আর ‘আইনের দরজায়’ গল্পে ভেতরে প্রবেশের জন্য দাঁড়িয়ে থেকে থেকে লোকটা যখন ব্যর্থ এক জীবন কাটিয়ে মারা যাচ্ছে, তখন এই বোকা কিনা দেখে যে ‘আইনের দরজাপথ থেকে ভেসে আসছে অনির্বাণ একটা দীপ্তি।’

কাফকার মতো চালাক সম্ভবত আর কেউ ছিলেন না; তাঁর মতো স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থার ফাঁকগুলোও আর কেউ বোধ হয় ধরতে পারেননি। কাফকার রসবোধ (সেন্স অব হিউমার) নিয়ে চিন্তা করলেই মনে হয়, কীরকম গুরুতর সব পরিস্থিতিকে কীরকম কমিক বানিয়ে ছেড়েছেন তিনি। প্রাগের ‘ক্যাফে স্যাভয়’ তে তিনি যখন বন্ধুদের সামনে বিচার উপন্যাসের শুরুটা পড়ে শোনাচ্ছেন, তখন তিনি ও তাঁর বন্ধুরা হেসে কুটিকুটি। কেন? ওরকম ভয়ংকর এক ঘটনা দিয়ে যার শুরু এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে তার বিছানায় এক সকালে আগন্তুকেরা এসে গ্রেপ্তার করে বসল, বিনা কারণে তা পড়তে গিয়ে কাফকা ওরকম হাসছিলেন কেন? ‘গায়িকা জোসেফিন বা ইঁদুর-জাতি’ গল্পে (এ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত) সংগীতশিল্পী জোসেফিনকে নিয়ে কাফকা ওরকম মারাত্মক ব্যঙ্গ করেন কেন যে, জোসেফিন আসলে গান গায় না, সে অন্য ইঁদুরদের মতোই একটু কিচিরমিচির করে? জোসেফিন ভাবে সে তাঁর জাতির ত্রাণকর্তা, আর গল্পের কথক কিনা বলে, ‘হায় খোদা, জোসেফিন যেন কোনো দিন জানতে না পারে, আমরা যে তাকে শুনি সেটাই প্রমাণ করে যে সে সত্যিকারের কোনো গায়িকা নয়।’ এ কেমন কথা? গল্পে গল্পে কাফকার এই বক্রোক্তি, ঠাট্টা, শীতল রসিকতা কখনো কখনো আমাদের উঁচু লয়ের হাসিতে ফেটে পড়তেও বাধ্য করে ( ‘রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’, ‘এক ছোটখাটো মহিলা’, ‘দি স্টোকার’, ‘প্রথম দুঃখ’, ‘এক অনশন-শিল্পী’, ‘গায়িকা জোসেফিন’)। কাফকার এই যে জার্মান ভঙ্গিতে রস বা হিউমার, যা কমেডিও নয়, বা চাতুর্যপূর্ণ রসিকতাও (রিঃ) নয়, আসলে জীবনের খুঁতগুলো খুব ভালোভাবে বুঝে গিয়ে সেগুলো নিরাসক্তভাবে মেনে নেওয়ার তাঁর যে ভঙ্গি– যেন তিনি বোঝেন যে কেবল তিনিই ওগুলো বোঝেন, কিন্তু আমরা বোকারা বুঝি না–তারই প্রকাশ। আজ বিশটি বছর ধরে কাফকা পড়ার পরে আমার এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, কাফকার রসবোধ যে বুঝবে, গল্পে গল্পে তাঁর বাঁকা উক্তি ও খোঁটা ও ব্যঙ্গগুলো যে ধরতে পারবে, সে-ই দাবি করতে পারবে, সে কাফকা বুঝেছে।

কাফকার সব প্রধান নায়কেরা দেখবেন একটা মতিবিভ্রমের মধ্যে আছে; পোকা গ্রেগর ভাবছে সে পোকা হয়ে গেছে তো কী হয়েছে, তাকে অফিসে যেতে হবে; জোসেফ কে. তাঁর বিচার হবে বলে সারা জীবন অপেক্ষা করছে; কে. দুর্গের লোকদের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য জীবনটা বরবাদ করে দিচ্ছে; সম্রাটের বার্তাবাহক দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছেই; গ্রাম্য ডাক্তার যতক্ষণে খেলাটা বুঝতে পেরেছেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; আইনের দরজায় ঐ বুদ্ধু দাঁড়িয়েই আছে এই অপেক্ষায় যে দরজাটা কবে খুলবে; দণ্ড উপনিবেশে মৃত্যুদণ্ডের পুরোনো প্রথায় বিশ্বাসী লোকটি ভাবছে এই পর্যটক তার ভয়ংকর বিচারব্যবস্থার পক্ষে রায় দিয়ে সব আবার ঠিক করে দেবেন। এদের কারো বিভ্রম, কারো ঘোরই, যেন কাটছে না। এ বইয়ের মোট ৪৬-৪৭টি গল্প-ছোট গল্প-স্কেচের ২৪টিতেই আমরা ওরকম মতিবিভ্রমের (delusion) মধ্যে থাকা চরিত্রের খোঁজ পাই। আমরা অবাক হই, হাসি, ওদের জন্য আমাদের মায়া হয়।

মজার কথা হচ্ছে, কাফকার এ রকম কোনো মতিবিভ্রম বা অলীক বিশ্বাস ছিল না। তিনি পৃথিবীকে অতি, অতি স্পষ্ট করে দেখে ফেলেছিলেন, যেভাবে দেখলে নিজের আর কোনো বিভ্রম থাকে না, কেবল তখন অন্যের বিভ্রম নিয়ে ঠাট্টা করা যায়। কাফকা জেনে গিয়েছিলেন যে ক্ষমতাশালীরা টিকে থাকে বিভ্রম ছড়িয়ে, মিথ্যা বলে আর ভয় দেখিয়ে; আর ক্ষমতাহীনেরা বেঁচে থাকে ঐ ক্ষমতাশালীদের যে ক্ষমতা আছে তা কল্পনা করে নিয়ে। এরা দুই পক্ষই বড় বড় কথা বলে, ফাঁকা আওয়াজ ছাড়ে, কিন্তু ওদিকে এদের আন্ডারওয়্যারগুলো নোংরা, এদের প্রার্থনার পোশাকগুলো ধার করা, এদের বিচারালয়ে পর্নোগ্রাফি পড়ে থাকে সবার চোখের সামনে, এদের ন্যায়বিচারের মধ্যে মানুষ মেরে ফেলাও ন্যায়বিচারের লক্ষণ হিসেবে পড়ে। পার্থিব ক্ষমতাই শেষ কথা, বাকি সব দার্শনিকতা, ধর্ম, আন্দোলন — সব ফাঁকা বুলি; কাফকা খুব ভালোভাবে সেটা বুঝেছিলেন। তাঁর ভাষায় এটাকেই তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর সময়ের ‘নেতিবাচকতা’কে বুঝেছেন ও সেটির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

যারা একবার কাফকা পড়েছেন তারা যে মুহূর্তে ধরে ফেলেন যে, কাফকা ‘বুঝেছিলেন’, কাফকা সত্যি জীবন, পৃথিবী, সমাজের সব খেলা ‘বুঝেছিলেন’, তখন তাঁর প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তারা আর কখনো কাফকা ছাড়তে পারেন না। একসময় এই পাঠকেরা বুঝে যান যে, ‘কাফকায়েস্ক’ কথাটাও অর্থহীন, এ দুনিয়ার এত অনেক কিছুই ‘কাফকায়েস্ক’ যে, সেটার আর কোনো মানে থাকে না। বেকার যুবক যখন চাকরি পাওয়ার জন্য অফিসগুলোর বারান্দায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায় সেটাও ‘কাফকায়েস্ক’; অসুস্থ রোগী যখন বড় হাসপাতালের বিরাট আয়োজনের মধ্যে কোনো ডাক্তার খুঁজে পায় না, যিনি তার সমস্যাটা বুঝবেন, সেটাও ‘কাফকায়েস্ক’; টিভির পর্দায় ধুম করে যখন আমরা দেখি যে ক্ষমতাশালীরা কী সূক্ষ্ম কৌশলে সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, সেটাও ‘কাফকায়েস্ক’, আর আদালতের দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে আমরা যখন দেখি যে আমাদের ফাইলটা অসহায়ের মতো পড়ে আছে নিচের দিকে, সেটাও কাফকায়েস্ক; আর গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে মোবাইল ফোন বেজে উঠলে যে ভয় নিয়ে আমরা সেটা ধরি, আর শুনি ওপাশে, পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে কে যেন বলে উঠছে ‘হ্যালো’, সেটাও ‘কাফকায়েস্ক’।

আমরা পছন্দ করি কি না-করি, কাফকা আমাদের এই আধুনিক সংস্কৃতির এক অমোচনীয় অংশ হয়ে গেছেন। নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কের যে বোধ কাফকা আমাদের মধ্যে জারিত করে গেছেন, আত্ম-উন্নয়নের লাখো বইয়ের কোনোটি পড়েই সেই বোধ আমাদের আর কাটে না। তাঁর ‘সেন্স অব হিউমার’ হাসির ছলে আমাদের দেখিয়ে দেয় যে আমরা কত ভুল, কত বোকা। আমাদের পাপবোধ, হতাশা, ন্যায়বোধ, আশা, পাপমোচন ও ভালোবাসা — সবকিছুর মধ্যেই কত বড় আধ্যাত্মিকতার অভাব ও ফাঁকি। তাই কাফকার আধ্যাত্মিকতা আমাদের জন্য সান্ত¡না হয়ে আসে। তাঁর কল্পনাশক্তির অদ্ভুত লজিক একই সঙ্গে আমাদের বুদ্ধি ও আবেগকে মথিত করে। আমরা বুঝি যে তাঁর নিজের জীবনের সংকট ও সমস্যাগুলো আমাদেরটার থেকে আলাদা কিছু নয়। আমরা বুঝি যে আমাদের মানবসমাজের হৃদয়টি আছে কাফকার ঐ ছোট কয়টি বইয়ের মধ্যেই। তাই আমরা মুগ্ধ হই, আলব্যের কাম্যুর কথার সঙ্গে একমত হই যে, কাফকা বারবার পড়ার জিনিস। ‘আমরা কী?’ এত বড় প্রশ্নের উত্তর যেহেতু সহজ হওয়ার কথা নয়, তাই আমরা কাফকা বারবার পড়ি– যুগে যুগে, দেশে দেশে।

 

 

( ৭ ফেব্রুয়ারী,২০১৩ বাংলাদেশ পাঠকসমাবেশ থেকে লেখকের ফ্রানৎস কাফকা: গল্পসমগ্র নামক প্রকাশিতব্য বইয়ের ভূমিকার অংশবিশেষ এখানে প্রকাশিত হলো। )

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত