মাসুদ খানের কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 3 minutes

আজ ২৯ মে কবি মাসুদ খানের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

দীক্ষা

পথ চলতে আলো লাগে আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু

আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে

কিংবা চীনচীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে

ফুলেফুলে উথলেওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব

নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে

মন পড়ে রইবে দূরদেশে সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,

দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরীর মতো শুদ্ধ সালঙ্কার…  

দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু

দিনে দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,

নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল

এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব

কখনো প্রেমের ফের কখনো রাগের

অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়নিশীথেফোটা গভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়

ওদিকে অদূরে লালেলালহয়েথাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ

সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ঝিল্লিতে

আমি সেই মরিচপোড়ার গল্প বলব যখন

উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে এমনকি বৃদ্ধরাও

যখন প্রেমের গল্প–  আঙুর পাকতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়

আবার যখন গাইব সেগন্ধকাহিনি, সেই ভেজাভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের

ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর

     

বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবীর গান

যেই দেশেতে গৌর পাই

সেই দেশেতে চলিয়া যাই

এই দেশ তো আর ভালো লাগে না’-

গাইতে গাইতে দেশদেশান্তর পার হয়ে

চলেছে সে, স্নাতকিনী, বৈষ্ণবী আমার

সেকোন অজ্ঞাত পূত এক স্নানসত্রের সন্ধানে

বহু দিন বহু তিথি বহু দেশ বহু পথ ভ্রমণের শেষে

স্নাতকিনী এসে আজ দাঁড়িয়েছে এমন এক তারিখরেখায়,

যেইখানে একই দিনে একইসাথে আসে রবিআর শশীবার

একইসঙ্গে জাগে কৃষ্ণ প্রতিপদ আর দ্বিতীয়ার গোরা বাঁকাচাঁদ

গোলার্ধপ্রতিম দূরে, বৈষ্ণবী দাঁড়িয়ে আছে সেই দ্রাঘিমায়

যেইখান থেকে দূর বৈকুণ্ঠগোলোক,

কৈলাস অলিম্পাস, জান্নাতজাহান্নাম

সবকিছু ঝাপসা দেখায়  

 

            

              

ডালিম

যুগের যুগের বহু বিষণ্ণ বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাসের সাথে

নির্গত কার্বনডাইঅক্সাইড

তা থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে

জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে

তবে ওই সারিসারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ

বৃক্ষের যতটা সাধ্য, তারও বাইরে গিয়ে

তবেইনা ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ, মায়াতরুরূপাঙ্কুররূপসনাতন

পাতার আড়ালে ফাঁকেফাঁকে ফলোদয়

থোকাথোকা গুপ্ত রক্তকূপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ

রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে

ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালেডালে লালাভ ডালিম

বসে আছি ম্রিয়মাণবেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়

সামনে খুলে মেলেরাখা একটি ডালিমফল, তাতে

প্রভূত বেদানাদানা, নিবিড় বেদনাকোষআর,

বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি

টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুকচাহনি

ভাবি,

এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত  

আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ণ পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!

ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলেতিলে, অনেক বছর রে

   

ঋতু

শরীরে সূচিত এক অভিনব ঋতুর ধারণা

এই পুষ্পফোটা মাস, ডিমেরকুসুমফেটেছিটকেছিটকেলাগা ঋতু

নতুনজোয়ারেজাগা ঘোলাবাঁকা নবীন জলের উদ্বোধন

আবার শোধনকলে, পুনশ্চক্রপথে, ফের সেই ময়লা জলেরই শোধন

ভাটিতে, বাঁকার ঘাটে, নতুন ঘোলাটে জলে

আনকোরা ঝিল্লির জালে ঝাঁকেঝাঁকে ধরা পড়ছে মীন

মীনের বীজেরা আজ জাল ছিঁড়ে ধেয়ে যাক অবিরাম উজানের দিকে

(রাশিদোষে মাছেদের জন্মগত উজানি স্বভাব)

ঝিল্লির ছাঁকনিতে আটকে থাক ছেঁড়াছ্যাঁকড়া কিছু শ্লেষ্মা আর ক্বাথ

উজানে উপচানোভাব ভরন্ত যুগলকুম্ভ–  তাতে তেজাব, তরল

এক কুম্ভে মধু যদি, অন্য কুম্ভে গম্ভীর গরল

কিছুটা ভাটিতে এক জাগ্রত ভোর্টেক্স, ঘূর্ণ্যমান নাভিকুণ্ড

চক্রাকার, প্রমত্ত প্রবল

.

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>