Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Maxim Gorky

ম্যাক্সিম গোর্কি’র অনুবাদ গল্প: শরতের একটি রাত

Reading Time: 11 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Maxim Gorkyআলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ (রুশ: Алексей Максимович Пешков) বা মাক্সিম গোর্কি (মার্চ ২৮, ১৮৬৮ – জুন ১৮, ১৯৩৬) ছিলেন একজন রুশ, সোভিয়েত লেখক, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। তিনি নিজেই তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম হিসেবে ‘গোর্কি’ অর্থাৎ ‘তেতো’ নামকে বেছে নেন। তার অনেক বিখ্যাত রচনার মধ্যে ‘মা’ একটি কালজয়ী উপন্যাস। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য পাঁচবারের মনোনীত হয়েছিলেন।


একবার এক শরতে আমি খুব কঠিন আর অসুবিধাজনক অবস্থায় পড়েছিলাম। আমি যে শহরে তখন সবেমাত্র নেমেছি, সেখানে একটি প্রাণীকেও আমি চিনতাম না। পকেটে হাত দিয়ে টের পেলাম ভরপুর শূন্যতা। আর সেই সাথে নেই রাত কাটাবার কোনো যায়গা।

যে কাপড়গুলো বিক্রি করে দিয়ে আমি চলতে পারব সেগুলোর প্রত্যেকটি গত কয়েকদিনে বিক্রি করে দিয়ে, আমি শহর থেকে ‘ইশতে’ নামক কোয়ার্টারে এলাম যেখানে আগে জাহাজঘাট ছিল, ছিল জলমৌসুমের দিনগুলোর হইহল্লা, আর সংগ্রামমুখর জীবন। কিন্তু অক্টোবরের শেষ দিনগুলো বলেই সেখানে তখন কেবলি অসহনীয় নিস্তব্ধতা।

ভেজা বালিতে পা টানতে টানতে, এবং কোনো একটা খাবার খুঁজে পাওয়ার আশায় পা দিয়ে বালি খুঁচিয়ে আমি এখানকার জনমানবহীন বাড়ি, গুদামঘর এবং এর মাঝ দিয়ে একাকী চলছিলাম, আর ভাবছিলাম ভরপেট খেতে পেলে কতই না ভালো লাগত!

আমাদের এখনকার সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় মনের ক্ষুধা শরীরের ক্ষুধার চেয়ে দ্রুত পূরণ হয়। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকলে আপনি দেখবেন বাইরে থেকে দেখতে মন্দ নয় এমন  দালানের সমাহার। এবং আপনি বেশ নিশ্চিতভাবেই ভেবে নিতে পারবেন যে এগুলোর ভেতরের অবস্থাও ততটা মন্দ নয়। আর এইসব দৃশ্য আপনার ভেতরে স্থাপত্য, সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতাবোধ এবং আরো অনেক জ্ঞানগর্ভ ও উচ্চমার্গীয় চিন্তাকে উস্কে দেবে। হয়ত সেখানে বসবাসরত ফিটফাট গরম কাপড় পরিহিত লোকগুলোর সাক্ষাতও মিলবে ; তারা সবাই খুব নম্র এবং খুব কৌশলে – আপনার উপস্থিতির দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতাকে আক্রমণাত্বক দৃষ্টিতে না দেখে – আপনাকে এড়িয়ে যাবে।

তবে হ্যাঁ, খাদ্যহীন লোকের পক্ষে উপসংহার টানতে গেলে একথাই বলতে হয় যে, একজন ভরপেট লোকের চেয়ে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মন সবসময়েই বেশি গভীর এবং সুস্থ। আর সেখানে তখন পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে আপনাকে ক্ষুধার্ত থাকার বাস্তবতার পক্ষে কোনো চতুর উপসংহার টানতেই হবে।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল এবং সেই সাথে ঝমঝম বৃষ্টি  আর উত্তর দিক থেকে তীব্রভাবে বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করল। সে বাতাস শূন্য দোকান আর বুথগুলোতে অবিরাম বাঁশি বাজিয়ে চলল, সরাইখানার জানালার কপাটে বাড়ি খেল, আর নদীর জলতরঙ্গে আঘাত হানল। সেই জলতরঙ্গ তীরের উপর বিকট শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের শুভ্র মাথা সমুচ্চ রেখেই, একের পর এক দুর্বার গতিতে হামলে পড়ল একে অন্যের কাঁধে; খুব কাছেই। দেখে মন হচ্ছিল, নদীটা শীতের তীব্রতা প্রতিবিন্দুতে অনুভব করছে, আর তাই এলোপাথাড়ি ছুটছে প্রবল শীতের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে; যা হয়তো আজ রাতেই তার উপর জেঁকে বসবে। আকাশটা ঘন কালো মেঘে ভারী হয়ে আছে, আর এর নিচেই অবিরাম বৃষ্টির ভয়ংকর নৃত্য। অদূরে একজোড়া ভেঙেপড়া বিকৃত উইলো-ট্রি আর তাদের গুড়িতে উল্টে পড়ে থাকা ছোট একটা ডিঙিনৌকা যেন আমার চারপাশে প্রকৃতির এই শোকগাথাকে আরো তীব্র করে তুলছে।

উল্টেপড়া নৌকার জীর্ণ শরীর  আর এই নিরীহ গাছগুলোকে শীতের বাতাস ক্রমাগত বিদীর্ণ করতে লাগল। চারপাশের সবকিছুই খুব বেশি নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রভ, আর মৃত। সেই সাথে আকাশটা অবিশ্রান্ত কেঁদে চলেছে। সবকিছুই পরিত্যক্ত, অন্ধকারাচ্ছন্ন আর বিষাদে পরিপূর্ণ। মনে হচ্ছিল আমাকে এই মৃত্যুর মধ্যে একাকী বাঁচিয়ে রেখে বাকী সবকিছু ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে; আর আমিও একটা শীতল মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছি।

আমার তখন আঠারো বছর বয়স … দারুণ একটা সময় !

আমি ভেজা ঠাণ্ডা বালির উপর দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। হাঁটছি, আর প্রচণ্ড ক্ষুধা ও শীতে আমার দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একটা খালি বাক্সের ভেতর খাবার মত কিছু খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমার পেছনে কিছু একটা নড়ছে। বৃষ্টিতে ভেজা মেয়েদের কাপড়ের মত একটা আকৃতি, মাটির দিকে নিচু হয়ে আছে। এপাশে দাঁড়িয়ে আমি তার কাজ দেখতে লাগলাম। আমার মনে হল, সে বালিতে ডুবে থাকা একটা বাক্সের চারদিক থেকে বালি সরানোর চেষ্টা করছে।

আমি আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এটা কী করছ? মেয়েটি একটা মৃদু চীৎকার দিয়ে, আবার সাথে সাথেই নিজেকে সামলে নিল। তারপর দাঁড়িয়ে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তার খোলা ধূসর চোখে আতঙ্ক বোঝাই। আমি বুঝতে পারলাম যে এই সুন্দর মুখের মেয়েটি বয়সে আমার মতই হবে। তবে দুর্ভাগ্যবশত তার মুখের উপর তিনটি নীল কালশিটে দাগ। এটাই তার চেহারার সৌন্দর্য একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে, যদিও এই নীল দাগগুলো প্রায় প্রত্যেকটা একই রকমের। চোখের নিচে দুটো; আর একটা কপালে ঠিক নাকের উপরে। আঘাতের এমন ভারসাম্য – নিঃসন্দেহে মানুষের সৌন্দর্য ধ্বংস করতে সিদ্ধহস্ত – দক্ষ কোনো শিল্পীর কাজ।

মেয়েটি আমার দিকে তাকাল এবং তার চোখের আতঙ্ক ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলে সে তার হাত থেকে বালি ঝেড়ে ফেলল। তারপর মাথার কাপড় ঠিক করে নামিয়ে নিয়ে বলল,  ‘মনে হচ্ছে তুমিও খাবার খুঁজছ? তাহলে এখানটা খুড়ে দেখো। আমার হাত আর পারছে না। এইতো এইখানে’। সে তার মাথা নেড়ে আমাকে বুথের দিকটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ এখানে নিশ্চয় পাউরুটি আর জেলি আছে।’

আমি খুড়তে শুরু করলাম।  সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবং আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার পাশেই বসে পড়ল, আর আমাকে সাহায্য করতে শুরু করল।

আমরা চুপচাপ কাজ করছিলাম। আমি এখন বলতে পারব না যে ঠিক সেই মুহুর্তে আমি অপরাধ-আইন, নৈতিকতা, মালিকানা, এবং অন্যকিছু নিয়ে ভাবছিলাম কিনা, যেগুলো – অভিজ্ঞ মানুষের মতানুযায়ী – মানুষের প্রতিমুহুর্তের ভাবনা। প্রকৃত সত্যের খুব কাছাকাছি গিয়ে স্বীকার করতে হয়, আমি তখন সম্ভবত বাক্সের পাশের ভেজা বালি খোঁড়ার কাজে খুব গভীরভাবে মগ্ন ছিলাম এবং বাকী সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু একটি কথাই ভাবছিলাম যে এই বাক্সের ভেতরে কী থাকতে পারে?

সন্ধ্যা নেমে এল। ধূসর, ক্লান্তিকর, ঠাণ্ডা কুয়াশা আস্তে আস্তে আরো ঘন হতে শুরু করল আমাদের চারপাশে। নদীর উত্তাল ঢেউ আগের চেয়ে আরো ভয়াবহ গর্জন শুরু করল, আর সেই সাথে বৃষ্টির ফোটা আরো তীব্রবেগে প্রবল শব্দে বাক্সের উপর পড়তে লাগল। তখন কোথাও না কোথাও রাতের প্রহরী তার ঘণ্টাধ্বনি বাজাতে শুরু করেছে।

‘এর কি কোনো শেষ নেই না কি ?’ আমার সহকর্মী নরম স্বরে জানতে চাইল। আমি তার কথা বুঝতে না পেরে চুপ করেই থাকলাম।

‘আমি জিজ্ঞেস করছি, এই বাক্সের কি কোনো তল নেই? যদি থাকেও – তবুও সেটা খোঁজা একটা ব্যর্থ চেষ্টা হবে বলে মনে হচ্ছে। এখানে আমরা খুড়তে খুড়তে একটা খাল বানিয়ে ফেললাম, তবুও শুধু কিছু শক্ত বোর্ড ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। কিভাবে এটা খুলব আমরা? তারচেয়ে বরং এর মরচে পড়া তালাটা ভেঙ্গে ফেলা যাক।’

ভালো কাজের চিন্তা মেয়ে মানুষের মাথায় খুব কমই আসে। কিন্তু সত্যিটা এই যে খুব কম হলেও কখনো কখনো তা আসে। আর আমি ভালো চিন্তার প্রশংসা সবসময়েই করি এবং যতটা সম্ভব তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।

তালাটা খুঁজে পেতেই আমি সবলে একটা মোচড় দিয়ে টান দিলাম এবং এটা সবসুদ্ধ খুলে এল। আমার সংগী সময় নষ্ট না করে ফাঁকা জায়গাটায় ঢুকে পড়ল এবং ঠিক যেন সাপের মত আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে শুরু করল। আর সেসময় সে বিড়বিড় করে বলল, ‘তুমি সত্যিই শক্তিশালী লোক।’

বর্তমান সময়ে কোনো পুরুষের স্তূপাকার স্তুতিবাক্যের চেয়ে মেয়েদের একটুকরো প্রশংসা আমার কাছে অধিকতর মূল্যবান মনে হয়, যদি সে পুরুষ অতীত এবং বর্তমানের সব মহৎ ব্যক্তির চেয়েও মহৎ হয় তবুও। কিন্তু তখন আমি এখনকার মত এতটা স্বচ্ছন্দ-সচেতন ছিলাম না। আর তাই আমার সঙ্গীর প্রশংসায় আমি কোনো ভ্রুক্ষেপই না করে, বরং খুব উদ্বিগ্নভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছু পাওয়া গেল?’

খুঁজে পাওয়া জিনিসগুলো দেখতে দেখতে খুব হতাশ ভঙ্গিতে সে বলল, ‘এক ঝুড়ি বোতল, মোটা পশম, একটা ছাতা, একটা লোহার বালতি।’

এর সবগুলোই অখাদ্য। আমি টের পেলাম যেন আমার সব আশা নিমেষে উধাও হয়ে গেছে…  কিন্তু হঠাৎ আমার সংগী উৎফুল্লভাবে বলল, আহা, এতক্ষণে পেয়েছি । কী? ব্রেড… একটা পাউরুটি… একটুখানি ভেজা… এই নাও।

আমার পায়ের কাছে পাউরুটিটা ছুড়ে দিয়ে, সে উঠে এল। আমি ততক্ষণে পাউরুটির এক টুকরো মুখে পুরে দিয়ে চাবাতে থাকলাম। ‘আরে, আমাকেও কিছুটা দাও ! আমাদের আর এখানে থাকা চলবে না… কিন্তু এর মধ্যে কোথায় যাওয়া যায়?’ সে চারদিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। চারপাশে অন্ধকার আর দুর্যোগের মহাযজ্ঞ। ‘দেখ! ঐতো, একটা ছোট নৌকা উলটে পড়ে আছে… ওখানে চল।’

‘আচ্ছা, তাড়াতাড়ি চল।’

আমাদের এতক্ষণের অর্জনের সেরা অংশ – পাউরুটি – মুখে গুঁজে বাকি সবকিছু ফেলে আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। বৃষ্টি আরো তীব্র আকার ধারণ করল। নদীটা গর্জে উঠল; কোথা থেকে যেন দীর্ঘ বিদ্রূপের সুর শোনা গেল, যেন বিশাল কোনো শক্তি – কোনোকিছুরই তোয়াক্কা না করে – পৃথিবীর সকল নিয়মকানুন, শরতের এই ভয়াবহ বাতাস আর আমাদেরকে-সহ সবকিছু তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ সুর আমার হৃদপিণ্ডে কাঁপন ধরিয়ে দিল। তা সত্ত্বেও আমি লোভীর মত খেয়েই চললাম এবং আমার বাম পাশের মেয়েটিও সমান তালে আমার সাথে হাঁটতে থাকল।

যেহেতু আমি তার নাম জানতাম না, তাই জিজ্ঞেস করলাম – তোমাকে সবাই কী বলে ডাকে?

শব্দ করে পাউরুটি চাবাতে চাবাতে খুব সংক্ষেপে সে জবাব দিল, নাতাশা।

আমি তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। আমার মনের ভেতরটা ব্যথা করে উঠল; তারপর সামনের কুয়াশার দিকে তাকিয়ে মনে হল, আমার ভাগ্যের বিভ্রান্তিকর অদ্ভুত চেহারা আমার দিকে তাকিয়ে শীতলভাবে হাসছে।

বৃষ্টির ফোটা উল্টানো নৌকার পিঠে অবিশ্রান্তভাবে আছড়ে পড়তে লাগল এবং এর নরম শব্দ আরো বেশি বিষণ্ণতা ডেকে আনছিল। কাঠের ফাটলের ভেতর শীতল বাতাস ঢুকে তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে হতাশার একঘেয়ে সুর বাজিয়ে চলল। সেই সাথে নদীর অশান্ত ঢেউগুলো কুলে আছড়ে পড়তে লাগল ভীষণ হতাশায়, যেন তারা অসহনীয় বেদনায় গম্ভীর আর্তনাদ করছে, যা তাদেরকে ভীষণ বিপর্যস্ত করে তুলছে এবং এ থেকে তারা পালিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু নিরুপায় হয়ে তাদেরকে শেষ পর্যন্ত হতাশার কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দ নদীর ঢেউয়ের ঝাপটার শব্দের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আর নৌকার ভাঙা কাঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছিল একটা অনন্ত দীর্ঘশ্বাস – উষ্ণ আর উজ্জ্বল গ্রীষ্ম থেকে স্যাঁতস্যাঁতে শীতল আর কুয়াশাচ্ছন্ন শরতের যে চিরন্তন পরিবর্তন – তার দ্বারা নির্ধারিত পৃথিবীর গভীরতম দীর্ঘশ্বাস। বাতাস ক্রমাগতভাবে বয়ে যেতে লাগল জনমানবহীন উপকূল আর নদীর ঢেউয়ের উপর দিয়ে; বিষণ্ণতার গান গেয়ে…

উল্টানো নৌকাটার আশ্রয় আমাদের জন্য মোটেও আরামদায়ক ছিল না। নৌকাটা ছিল খুবই সরু আর স্যাঁতস্যাঁতে, সেই সাথে বৃষ্টির ঠাণ্ডা পানি আসছিল ভাঙা অংশ দিয়ে। বরফশীতল বাতাসের ঝাপটা ঠিক হাড়ে গিয়ে লাগছিল। আমরা চুপচাপ জড়সড় হয়ে বসে ছিলাম আর ঠাণ্ডায় কাঁপছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, আমার খুব শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিল। নাতাশা নৌকার খোলে ঠেস দিয়ে বসে শরীরটাকে একদম ছোট একটা বলের মত গুটিয়ে নিয়েছে। আর হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরে মুখটা তার উপর রেখে নদীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার ফ্যাকাসে মুখের নীল দাগগুলোর কারণে চোখ দুটোকে খুবই গভীর মনে হচ্ছে। সে একদম নড়াচড়া করছে না। আর তার এই নিশ্চুপ নীরবতায় আমার মনের মধ্যে তার সম্বন্ধে কিছুটা ভয় তৈরি হচ্ছে। আমি তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কিভাবে শুরু করব।

নাতাশা নিজেই কথা বলা শুরু করল।

‘জীবনটা কী এক অভিশপ্ত জিনিস!’ – খুব সহজ আর নির্মোহভাবে, গভীর প্রত্যয়ের সুরে সে বলল।

কিন্তু সেখানে কোনো অভিযোগ ছিল না। তার শব্দগুলোতে অভিযোগের বদলে অদ্ভুত এক উদসীনতা ছিল। তার নিজের বুদ্ধিমত্তা অনুসারে সে এই চিন্তা করেছে – চিন্তা করেছে এবং একটা সুনিশ্চিত উপসংহারে এসেছে যা সে এইমাত্র উচ্চারণ করল এবং যা আমি নিজের জীবনের বিপরীতে গিয়ে অস্বীকার করতে পারিনি। আমি তাই চুপ থাকলাম। আর সে যেন আমাকে লক্ষ্য না করেই সেখানে অনড় বসে থাকল।

‘যদি আমরা চীৎকার করি, তাতেই বা কী …’ নাতাশা আবার বলতে শুরু করল, শান্তভাবে এবং এবারও তার কথায় কোনো অভিযোগের সুর নেই। একদম সহজ স্বাভাবিকভাবে সে কথা বলতে লাগল যেন সে তার নিজের জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থির সিদ্ধান্তে এসেছে। এবং তার ভাষ্যমতে শুধুমাত্র  ‘চীৎকার’ করা ছাড়া – জীবনের সকল বিদ্রূপ থেকে বেঁচে থাকার জন্যে – সে  আর কোনো কিছু করার পর্যায়ে নেই।

তার চিন্তার এই স্বচ্ছতা আমার কাছে অবর্ণনীয় দুঃখের এবং যন্ত্রণার মনে হল। মনে হল, আমি যদি আর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই আমার চোখ থেকে অবিরাম জল গড়াতে থাকবে এবং তা হবে একজন মেয়ে মানুষের সামনে সত্যিই লজ্জার বিষয়; যেখানে সে নিজেই কাঁদছে না। আমি তাই নাতাশার সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম।

‘তোমার এমন পরিণতির জন্যে কে দায়ী?’ – সেই মুহুর্তে বলার মত উপযুক্ত কিছু খুঁজে না পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘পাশকা সবকিছুর জন্যে দায়ী’ – করুণ এবং ঠাণ্ডা সুরে সে উত্তর দিল। সে কে? আমার প্রেমিক… বেকারির কর্মচারী। সে কি তোমাকে প্রায়ই মারধোর করত? যখন সে প্রচুর মদ খেয়ে আসত তখন … প্রায়ই!

এরপর হঠাৎ আমার দিকে ফিরে নাতাশা ওর নিজের সম্পর্কে, পাশকা আর ওদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। সে ছিল রুটির কারখানার লাল মোচওয়ালা এক শ্রমিক। এবং সে খুব ভালো ‘বানজো’ খেলত। তাকে দেখে নাতাশা সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিল, কারণ পাশকা সবসময় খুব উৎফুল্ল থাকত আর নতুন নতুন পোশাক পরত। তার একটা জামা ছিল যেটার দাম পনের রুবল। এছাড়া তার সুন্দর বুট জুতো আর মানানসই পোশাক ছিল। আর তাই নাতাশা তার প্রেমে পড়ল। তখন পাশকা হয়ে উঠল তার ‘ক্রেডিটর’। এরপর থেকে পাশকা নানাভাবে নাতাশার কাছ থেকে টাকা বাগিয়ে নিতে থাকল, যে টাকাগুলো নাতাশার বন্ধুরা ‘বুনবুন উৎসবে’র জন্যে তার কাছে রেখেছিল। পাশকা সেই টাকা দিয়ে প্রচুর মদ খেত, এবং তাকে ধরে ধরে পেটাত। কিন্তু তবুও এগুলো কিছুই ছিল না, যদি না সে তারই চোখের সামনে অন্য মেয়েতে আসক্ত হত !

‘এটা কি অপমানজনক নয়? আমি অন্য মেয়ের থেকে কোন দিক দিয়ে কম? ব্ল্যাকগার্ডরাও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত। গতকালের আগেরদিন আমি আমার মালিকের কাছ থেকে কিছুক্ষণের ছুটি নিলাম এবং গিয়ে দেখলাম ডিমকা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পাশকার সাথে বসে আছে। আর পাশকাও গলা পর্যন্ত মদে ডুবে আছে। আমি বললাম, ‘হারামজাদা’।  সাথে সাথেই ও আমার কাছ থেকে সব লুকাতে চেষ্টা করল। আমার চুল ধরে টেনে আমাকে লাথি মারতে লাগল। কিন্তু তারপর যা করল তা আরো ভয়ংকর। আমার সব জিনিসগুলো ও ভেঙ্গে ছিঁড়ে একাকার করে ফেলল। আমার পোশাক, জ্যাকেট – যেটা ছিল একদম নতুন – অনেক দাম দিয়ে আমি কিনেছিলাম ওটা। আমার মাথা থেকে রুমালটাও সে ছিঁড়ে ফেলল। হায় ঈশ্বর ! আমার এখন কী হবে ?’

নাতাশা হঠাৎ ভীষণ শোকে ঢুকরে দুলে উঠল।

ওদিকে চারপাশে বাতাসের আর্তনাদ আরো বেড়ে গেল এবং ঠাণ্ডা আরো ভয়াবহ আর অসহনীয় হয়ে উঠল। আর আমার দাঁতে দাঁত লেগে কাঁপুনি দিতে লাগল সমস্ত শরীর।  শীত থেকে বাঁচতে সেও আরো জড়সড় হয়ে আমার দিকে সরে বসল। গায়ে গায়ে ঘেঁষে। এতটাই কাছাকাছি যে সেই অন্ধকারের ভেতরও আমি তার চোখের দীপ্তি টের পাচ্ছিলাম।

‘তোমরা পুরুষেরা কী জঘন্য ! তোমাদের সবাইকে যদি জ্বালিয়ে দিতে পারতাম, যদি সবগুলোকে কেটে টুকরো টুকরো করে দিতে পারতাম। যদি তোমাদের কেউ আমার চোখের সামনে মরে যেত, তাহলে আমি তার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিতাম। আর তার প্রতি একটুও করুণা করতাম না। ঘৃণ্য জানোয়ারগুলো ! তোমরা মিষ্টি কথা বলে বলে, কুকুরের মত মাথা নুইয়ে আমাদেরকে ভোলাও। আর আমরা বোকা মেয়েরা নিজেদের সবকিছু তোমাদের কাছে সপে দেই। আর তারপরই সব শেষ ! সাথে সাথে তোমরা আমদের পায়ের তলায় ফেলে দাও…মিজারেবল লোফারস!’

সে নানাভাবে আমাদের পুরুষদের উপর অভিশাপ দিতে থাকল। কিন্তু  তার স্বরে কোনো তেজ ছিল না, বিদ্বেষ ছিল না, এমনকি ‘মিজারেবল লোফারস’ উচ্চারণের সময়ও তার কণ্ঠস্বরে কোনো ঘৃণা ছিল না। তার গলার স্বর কোনোভাবেই বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বরং এটা ছিল যথেষ্ট শান্ত, আর তার ঘৃণার বহিঃপ্রকাশও ছিল নিতান্তই দুর্বল।

কিন্তু তারপরও তার কথাগুলো আমার উপর খুব শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে, বইতে পড়া বা শোনা অন্য সব মহৎ বক্তৃতা বা বিশ্বাসযোগ্য আলোচনার চেয়েও। এবং এটা এজন্যে যে একজন মূমুর্ষূ ব্যক্তির যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখা – সবচেয়ে নিখুঁত মৃত্যু-বর্ণনা পড়ার চেয়েও – বেশি শক্তিশালী, বেশি বাস্তব।

আমি সত্যিই ভীষণ অসহায় বোধ করছিলাম। তবে সেটা যতটা না আমার সঙ্গীর বাক্যের জন্যে, তার চেয়ে বেশি অসহনীয় ঠাণ্ডার জন্যে। আমি ধীরে ধীরে হাঁপাচ্ছিলাম এবং দাঁত কাঁপিয়ে নুইয়ে পড়ছিলাম।

আর ঠিক সে মুহুর্তেই আমি আমার শরীরে দুটি ছোট হাতের ছোঁয়া অনুভব করলাম। একটা হাত আমার ঘাড়ের দিকে, আরেকটা আমার মুখের ওপর। আর সাথে সাথে একটা উদ্বিগ্ন, সুমধুর, বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করল –

তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

যদি কেউ আমাকে বলত, এটা অন্য করো কণ্ঠস্বর নাতাশার নয়, তবুও আমি তা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এটা নাতাশাই ছিল,  যে কিনা একটু আগেই সমস্ত পুরুষজাতিকে ‘স্কাউন্ড্রেল’ বলে ঘোষণা দিয়ে তাদের ধ্বংস কামনা করেছে। এটা সেই নাতাশাই ছিল। এবং সে খুব দ্রুত বলতে থাকল –

তোমার কী হয়েছে? খুব ঠাণ্ডা লাগছে? খুব বেশি? আহা, তুমি কেমন লোক, এতক্ষণ একটা ছোট্ট পেঁচার মত পাশে বসে আছো, অথচ একবারও বললে না। কেন ! অনেক আগেই তোমার বলা উচিত ছিল যে তোমার ঠাণ্ডা লাগছে। এসো…এখানে মাটিতে শুয়ে পড়… হাত-পা ছড়িয়ে দাও আমি তোমার উপর লেপ্টে জড়িয়ে থাকব… এখানে ! এখন কেমন লাগছে? এবার হাত দুটো দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরো?… আরো শক্ত করে ! এখন কেমন লাগছে? কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার শরীর গরম হয়ে যাবে… আর তারপর আমরা এভাবেই শুয়ে থাকবে… রাত খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, দেখে নিয়ো। আচ্ছা,… তুমি কি খুব বেশি মদ খেয়েছিলে? … তুমি কি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ ? আহা… একদম চিন্তা করো না, কিচ্ছুটি ভেবো না। ”

এমনিভাবে সে আমাকে আরামে রাখল…  ক্রমাগত উৎসাহ দিতে থাকল।

আমাকে কি আরো অভিশাপ দেয়া হবে ! এই একটি ঘটনা আমার কাছে এক পৃথিবী পরিহাস নিয়ে এল। শুধু একবার ভাবুন ! এই যে আমি এখন – মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে, সামাজিক প্রক্রিয়া নিয়ে, রাজনৈতিক বিপ্লব নিয়ে কত ভয়াবহ-জ্ঞানগর্ভ বই পড়ছি যার অপরিমাপযোগ্য গভীরতা সেই সব বইয়ের লেখকদের দ্বারাই স্বীকৃত – আসলে, আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছি ‘একটা গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় সামাজিক শক্তি’ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে। আমার কাছে মনে হয়েছে যে আমি আমার এ কাজে কিছুটা হলেও সফল হয়েছি। কিন্তু যাহোক, সেদিনের সে রাতে  আমার নিজের সম্পর্কে এই ধারণা থেকে আমি অনেক দূরে ছিলাম যে  আমার বেঁচে থাকবার একটা স্বতন্ত্র অধিকার আছে এবং একই সাথে আমার ভেতর বেঁচে থাকবার মত প্রয়োজনীয় মহত্ব আছে, আর  আমি যেকোনো ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনেরও পুরোপুরি উপযুক্ত। আর আমাকে যে মেয়েটি তার শরীর দিয়ে উষ্ণতা দিচ্ছে – যে একটা হতভাগ্য, অবহেলিত, নগণ্য প্রাণি – তার জীবনের কোনো মূল্য নেই। এবং সে নিজে থেকে আমাকে সাহায্য না করলে আমি তাকে সাহায্য করার কথা কখনো চিন্তাও করি না, এবং যদি তেমন ভাবনা আমার মাথায় আসে, তখনও আমি সত্যিই জানি না কীভাবে তাকে সাহায্য করা যায়।


আরো পড়ুন: মারিও বেনেদেত্তি’র অনুবাদ গল্প: স্বপ্নের মধ্যে কারাগারে


আহ ! এটা বিশ্বাস করতেও আমি প্রস্তুত ছিলাম যেন সবকিছুই একটা স্বপ্নের মধ্যে ঘটছিল – একটা অবিশ্বাসযোগ্য, কষ্টকর স্বপ্ন।

কিন্তু হায় ! তখন এটা চিন্তা করাও আমার জন্যে অসম্ভব ছিল। বৃষ্টির ঠাণ্ডা ফোটা আমার ওপর পড়তে লাগলো এবং মেয়েটি আমাকে তার আরো কাছে টেনে নিল, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার মুখের উপর পড়ছে  এবং কিছুটা ভদকার গন্ধ থাকা সত্ত্বেও তা আমাকে শান্তি দিল।

আবারো গর্জন করে বাতাস ফুসে উঠছে, নৌকার গায়ে বৃষ্টির ফোটা মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে, নদীর ঢেউ প্রবলবেগে আঘাত হানছে উপকূলে আর এরই মধ্যে আমরা দুজনে, একে অন্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠাণ্ডায়-শীতে কাঁপছি। এ সবই ছিল অত্যন্ত বাস্তব এবং আমি নিশ্চিত যে কেউ কখনো, কোনোদিনও এমন কষ্টদায়ক আর ভয়াবহ বাস্তবতার কথা স্বপ্নেও প্রত্যক্ষ করতে চাইবে না।

কিন্তু পুরোটা সময় জুড়ে নাতাশা কিছু না কিছু বলছিল – খুব নম্রভাবে, মমতার সুরে – যেভাবে শুধু মেয়েরাই কথা বলতে পারে। তার কণ্ঠের মাধুর্য আর মমতামাখানো কথার মাঝে আমার মনের মধ্যে একটা ছোট্ট দীপশিখা জ্বলে উঠল এবং আমার হৃদপিণ্ডের ভেতরের সবকিছু যেন গলে যেতে থাকল।

তারপর আমার দুচোখ থেকে বিপুলবেগে অশ্রু নামতে লাগল অঝোরে।  হৃদয়ের সব পঙ্কিলতা, কষ্ট, দুঃখ, ধুলো-ময়লা ধুয়ে যেতে থাকল, যা ঐ রাতের পূর্ব পর্যন্ত আমাকে ঘিরে ছিল।

‘ আহা, শান্ত হও, শান্ত হও। কিচ্ছুটি ভেবো না। ঈশ্বর তোমাকে আরেকটা সুযোগ দেবেনই… সব ঠিক হয়ে যাবে আর তুমিও আবার তোমার ঠিক যায়গায় পৌঁছে যাবে… সব ঠিক হয়ে যাবে.. কিচ্ছুটি ভেবো না….’

তারপর সে আমাকে চুমু দিতে লাগল… অনেকগুলো চুমু দিল সে আমাকে… তীব্র চুমু… কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়াই …

ওগুলোই ছিল আমার কোনো নারীর কাছ থেকে পাওয়া প্রথম চুম্বন এবং সবচেয়ে গভীর চুম্বন, যা জীবনের পরবর্তী সব চুম্বনের চেয়ে আমাকে বেশি শিহরিত করেছে।

‘ এইত, কিচ্ছু ভেবো না ! কালই আমি তোমার থাকবার জায়গা খুঁজে দেব’ নাতাশার শান্ত মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলা কথাগুলো যেন মনে হচ্ছিল কোনো স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে আমার কানে ভেসে আসছে…

সেখানে আমরা ভোর পর্যন্ত শুয়েছিলাম…

তারপর যখন ভোর হল, আমরা হামাগুড়ি দিয়ে সেখান থেকে বের হলাম এবং শহরের দিকে গেলাম… অতঃপর বন্ধুত্বপূর্ণভাবেই একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম এবং আমাদের আর কখনো দেখা হয়নি। যদিও তারপর দেড় বছর ধরে আমি সেই মমতাময়ী নাতাশাকে প্রত্যেকটি অলিতে-গলিতে খুঁজেছি।

যদি সে এর মধ্যে মরে গিয়ে থাকে – যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে, তাহলে – তার আত্মা শান্তি লাভ করুক ! আর যদি সে এখনো জীবিত থাকে – তবুও আমি বলব, ‘তার মনে শান্তি নেমে আসুক ! ’ এবং  নিজের দুর্ভাগ্যের কথা যেন কখনোই তার মনে না আসে… কেননা সেটা হবে জীবনে বেঁচে থাকার পথে একটা নিতান্তই নিষ্ফল দুর্ভোগ…

  ———– শরতের একটি রাত (One Autumn Night) মূল – ম্যাক্সিম গোর্কি অনুবাদ – এস এম মামুনুর রহমান        

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>