মায়াজাল

           
দিনে দুবার এ্যালার্ম বাজে এই ঘরে। ঘড়িতে নয়। মোবাইলে। ঠিক পৌনে পাঁচটার সময়। ভোরবেলায় বেরিয়ে যান ভদ্রলোক। যারা অন্য অন্য ঘরে থাকে, অথবা বিছানায় গড়ায়, তারা জুতোর মসমস শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে গানের কলি শুনতে পায়।
দুদিনের মধ্যেই বেশ চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছেন তিনি। অবশ্য তার কারণও আছে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক আজকাল আর সচরাচর দেখা যায় না। শুধু যদি ধুতি পাঞ্জাবি হত, তাহলেও কথা ছিল। রীতিমত চুনোট করা ধুতি। সাথে গিলে করা পাঞ্জাবি।
তিনি চলে যান নদীর ধারে। যেখানে সবুজ ঘাসের মাঠ। ছেলেমেয়েরা জিমন্যাস্টিক্স প্র্যাক্টিস করে। অল্পবয়সী খেলোয়াড়েরা দৌড়ায়। বয়স্কদের জগিং ট্র্যাক আছে। মাঠের অগ্নি কোণে আছে একটা বিশাল কাঠবাদাম গাছ। ঘন ছায়ায় ঘেরা সেই কোণটায় তিনি বসেন। সবুজ ফাইবারের চেয়ারে। তিনটে চেয়ার নিয়ে। একটায় তিনি বসেন। বাকী দুটো চেয়ার, তার সামনে পাতা থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে খেলোয়াড়েরা লক্ষ্য করে। জগার দের নজরে পড়ে। হাঁটতে বা বেড়াতে আসে কেউ কেউ। তারাও দেখে। কিন্তু কেউই চেনে না তাকে।
নদীর ধারে এ শহরের বিস্তৃতি কম। টাউনশিপ এখান থেকে অনেকটা দূরে। মুখে মুখে আলোচনা চলে, এনার বাস কোথায় হতে পারে। দুদিন ধরেই তাকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ বসার পর তিনি ওঠেন। চেয়ার তিনটি তুলে নিয়ে যায় একটা বাচ্চা ছেলে। সে বাবুদার চায়ের দোকানে কাজ করে। ছোট শহরের চরিত্রে মুখ বুজে বসে থাকাটা ঠিক যেন মানায় না। দৌড়াতে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি ছেলে একদিন বলে উঠল,
–   দাদু, তোমাকে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
–  তোমাদেরকে দেখতেও যে আমার খুব ভালো লাগে দাদু ভাই। ভদ্রলোক উত্তর দিলেন। কিন্তু কথা আর এগোল না তখন। ছেলেমেয়েরা দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেল। দূর থেকে কোচ নিশ্চয় নজর রেখে চলেছেন ওদের উপর। আবার এল টুকরো কথা। এবার একটি মেয়ে। পাশ দিয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেল।
–  দুটো এক্সট্রা চেয়ার কার জন্য রেখেছ দাদু?
উত্তর দেওয়ার সময় পেলেন না তিনি। হাওয়ায় কথা ভাসাতে তিনি পছন্দ করেন না। অতএব, অপেক্ষায় থাকলেন। আবার দৌড়াতে দৌড়াতে এদিক দিয়েই যাবে। তখন উত্তর দেবেন। কিন্তু, কোন মেয়েটি প্রশ্ন করেছে, তাকে তিনি চিনতে পারবেন কি করে, সেটা ভাবতে হবে। প্রত্যেকে একই জার্সি পরে দৌড়ায়। মাথায় চওড়া ব্যান্ড দিয়ে চুল আটকানো। পায়ে একই ধরণের স্পোর্টস শু। কথা বলার জন্য ছটফট করছিলেন তিনি। ভাবতে ভাবতেই দেখতে পেলেন গ্রুপটাকে। ওরা কাছে এগিয়ে আসতেই হাত তুলে বললেন, বন্ধু বান্ধবীর জন্য চেয়ার রেখেছি দিদিভাই। মেয়েটিও হাত নেড়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল মেয়েটি। সঙ্গে তার গ্রুপ। পিঠে তাদের ব্যাগ রয়েছে। প্রত্যেকে ক্লান্ত। কিন্তু চোখেমুখে উজ্জ্বল হাসি। কথা শুরু করলেন ভদ্রলোক নিজেই।
–  তুমি কি গীতাদির নাতনি?
–  না তো! আমার ঠাম্মুর নাম তো রত্না। তুমি চেনো আমার ঠাম্মুকে?
গ্রুপের সব মেয়ের মুখের ভাবে তখন একই জিজ্ঞাসা।
–  গীতাদি আমার নিজের মাসতুতো দিদি। খুব সুন্দর গানের গলা গীতাদির।
–  ঠিক আছে। আমি আমার ঠাম্মুকে বলব বাড়ি গিয়ে। ঠাম্মু হয়তো চিনবে। কাল আবার আসছ তো দাদু? আমরা তোমার সাথে গল্প করতে আসব।
উৎসাহের সাথে বলে উঠল রত্নার নাতনি। ভদ্রলোক নিজে বুঝতে পেরেছেন, মেয়েটির সাথে কথা বলার সময় বাড়ির বড় কাউকে টেনে আনা তার উচিৎ হয় নি। তিনি ভালোই জানেন, বানানো গল্প কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। মন অস্থির হয়ে উঠল তার। উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে।
চায়ের দোকান থেকে বাবু ডাক দিল
– চা পাঠাব দাদু?
হাত নাড়িয়ে জানিয়ে দিলেন তিনি, লাগবে না। রত্নার নাতনির গ্রুপে যদি সাতটি মেয়ে ছিল, তাহলে আজ এ মাঠে উপস্থিত অন্তত কুড়ি জন গতকালের ঘটনা ইতিমধ্যেই শুনে ফেলেছে। যতই ছোট শহর হোক, এই ধরণের হিসাব সর্বত্র মোটামুটি একই রকমের। কিভাবে কথা উঠবে, কি কথা শুনতে হতে পারে, হিসাব করেছিলেন তিনি। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। তিন বন্ধু চলেছে হাঁটতে হাঁটতে। যুবক বয়স। পঁচিশ ছাব্বিশ হবে হয়ত। ওদের মধ্যে একজন ভদ্রলোকের দিকে মাথাটা একটু ঘুরিয়ে, বেশ জোরের সাথে, মুখ খিঁচিয়ে বলল,
–  শালা। গীতাদির ভাই…। 
ভদ্রলোক সাথে সাথেই যুবকটির দিকে হাত নির্দেশ করে বলে উঠলেন,
– ও জামাইবাবু! এই যে, হলুদ টী শার্ট পরা জামাইবাবু…।
হাঁটতে হাঁটতে কয়েক জন দাঁড়িয়ে পড়েছে। সকাল বেলায় বিনি পয়সায় এমন রগড় তো আর রোজ রোজ দেখা যায় না। হলুদ টী শার্ট খুব উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে এল। সাথে তার দুই বন্ধু। কিন্তু বাকী জনতার হাসির রোলে তার আর এগোনো হল না। জটলা ভাঙতে লাগল। সেই ভাঙা জটলা থেকে বেরিয়ে এল দুজন। এক কিশোরী। এবং সাথে এক প্রৌঢ়া।
–  চেয়ারে বসতে দেবে দাদু? ফাঁকা চেয়ারের উপর হাত রেখে অনুমতি চাইল কিশোরীটি।
–  হ্যাঁ হ্যাঁ। বসো, বসো। বসুন ম্যাডাম। আপনিই রত্না দেবী?
ভদ্রলোক ভালোই বুঝতে পারছিলেন, এটি গতকালের সেই মেয়েটি নয়। এই প্রৌঢ়ার এমন বয়সের নাতনি হওয়ারও কথা নয়। তবু, সংলাপ শুরু করার জন্য কিছু একটা সূত্রের প্রয়োজন হয়। তাই পুরোনো প্রসঙ্গ টেনে আনা। কথা বলতে বলতেই বাঁ হাতের তর্জনী এবং মধ্যমা ছড়িয়ে, বাবুকে চায়ের নির্দেশ ও দিয়ে দিয়েছেন। ভদ্রমহিলা দৃশ্যত অত্যন্ত ক্লান্ত। চেয়ার ধরে ধীরে ধীরে বসলেন। কিশোরী মেয়েটি বসার আগেই জানিয়ে দিল, ইনি রত্না দেবী নন। ইনি তার জ্যাম্মা। সদ্য ডায়াবিটিস ধরা পড়েছে। তাই ডাক্তারের নির্দেশে জ্যাম্মার হাঁটতে বেরোনো। হাঁটা তো অভ্যাস নেই। সেই কারণে পায়ে খুব ব্যথা হচ্ছে। গুছিয়ে সব কথা বলার পর সে জানিয়ে দিল, রত্না দেবী মুনিয়ার ঠাম্মু। দূরে কিছু ছেলেমেয়ে ফ্রী হ্যান্ড এক্সারসাইজ করছিল ।তাদের একজনের দিকে আঙুল দেখিয়ে মেয়েটি বলল, ঐ যে মুনিয়া। চা বিস্কুট এসে গেছে। দুকাপ নয়, তিন কাপ। সকালের নরম আলোয় গরম চায়ের আপ্যায়নে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন জ্যাম্মা। মুখের ক্লান্তি যেন মুছে গেছে। নিজের নাম, পরিচয় জানিয়ে, আলাপও শুরু করে দিয়েছেন।
– আপনি ভোরবেলায় এসে এখানটায় বসেন, শুনেছি। আমি তো সকালে বেরোই না। তাই দেখি নি। কতদিন এসেছেন এখানে? আছেন কোথায়?
এরপর অবধারিত ভাবে এল স্ত্রী এবং পরিবারের কথা। আপনার স্ত্রীও এসেছেন নিশ্চয়।
– এই তো পাঁচদিন হল এসেছি। ঝটপট উত্তর দিলেন ভদ্রলোক। আজ বিকালেই ফিরতে হবে।
–  সে কি! ভদ্রলোকের ফেরার কথা শুনে যেন বেশ অবাক হলেন জ্যাম্মা। আর আপনার মিসেস? দেখাও হল না তার সাথে।
–  নিশ্চয় দেখা হবে। ও তো আমার সাথেই এসেছে। সকালে বেরোনো ওর পছন্দ নয়। বুঝতেই পারছেন, ওরও তো বয়স হয়েছে। আমার গৃহিণী আবার ভোরবেলায় জানালায় বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে খুব ভালোবাসে। ভদ্রলোক উত্তর দিলেন।
–  আমিও তো ভালোবাসি। দৃশ্য দেখতে। মেলামেশা করতে। হয়ই না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপের স্বর আরো গাঢ় হয়ে উঠল জ্যাম্মার।
জ্যাম্মার দীর্ঘশ্বাসকে যেন আমলই দিলেন না ভদ্রলোক। বেশ গল্পের চালে বলে উঠলেন,
–  আশেপাশে খুঁজুন। ভালো করে খুঁজুন । সব পেয়ে যাবেন। আলো, ছায়া, ভালোবাসা, মেলামেশা, স-ব। স-ব। যেটা কম আছে, খুঁজে পেতে নিয়ে নেবেন।
বললেন ভদ্রলোক। বুঝিয়ে বুঝিয়ে। বলতে পারলেন না, তারও তো কেউ নেই। কেউই না। তিনিও তো এভাবেই খুঁজে খুঁজে নিয়ে চলেছেন। ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। ওঠা দেখেই বোঝা যায়, তিনি ফিরবেন এবার। কিশোরীটি শুনছিল এতক্ষণ। প্রশ্ন করল এবার,
– দাদু, তোমরা কোন হোটেলে উঠেছ? দিদিমাকে দেখা হল না। দিদিমাও নিশ্চয় খুব মজার মানুষ।
মুখে হাসির ছোঁয়া। গলায় খুশির আভাস কিশোরীর।
– আমাকে হোটেলের এ্যাড্রেস বলো। আমি সব চিনি। এক্কেবারে টো টো কোম্পানি। সাইকেলে সব জায়গা ঘুরে বেড়াই। একবার গিয়ে দেখেও আসতে পারি।
– হোটেল পঞ্চামৃত। পাঁচমাথার মোড়ের উপরেই। রুম নাম্বার তিনশ সাত। চলে এসো। লিফ্ট আছে। জ্যাম্মাকে নিয়েই এসো। তাড়াতাড়ি করে কথাগুলো বলেই এগিয়ে চললেন ভদ্রলোক। ধরা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। চায়ের দোকানের ছেলেটি এল সাথে সাথেই। চেয়ার তিনটে নিয়ে যেতে।
 তাকেই জিজ্ঞাসা করল কিশোরী।
–  এখানে পাঁচমাথার মোড় কোথায় আছে রে?

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত