মান্না দে-র কফি হাউস আর কফি হাউসের মান্না দে

Reading Time: 3 minutes

বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। গানের দিন আর বাঙালি মনে মান্না দের সুর আনমনেই গুনগুন করে উঠবে না তা কি হয়। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য তেমনি কয়েকটি গান ও কফিহাউজ ও মান্না দে নিয়ে  অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের একটি অনুসন্ধানী লেখা।


মান্না দে কি কফি হাউসে রেগুলার ছিলেন? এই প্রশ্ন সাম্প্রতিক প্রজন্মের অনেকেই করে থাকেন। এর উত্তর দিতে গিয়ে থমকান ভেটেরান কফি হাউসিরা। হেদুয়া থেকে কফি হাউসের ভৌগোলিক দূরত্ব এমন কিছু নয়। কিন্তু, স্কটিশের ছাত্র মান্না দে কি নিয়েমিত আসতেন কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে? আসলে মান্না দে-র ‘কফি হাউসের আড্ডা’ গানটিকে নিয়েই যত বিপত্তি। বস্তুত বাংলার গ্রাম ও মফস্‌সলে এই গান কলেজ স্ট্রিটের এই কফিখানাকে এমন একটা ভাবমূর্তিতে ঠেলে দেয়, যার দায় কিছুতেই এড়াতে পারেন না কিংবদন্তি গায়ক। ফলে প্রশ্ন ওঠে, মান্না দে কতটা নিয়েমিত ছিলেন কফি হাউসে?

কফি হাউসের আড্ডা নিয়ে লেখা বই-পত্তরে যে সব স্টলওয়ার্টদের প্রসঙ্গ জানা যায়, তার মধ্যে মান্না দে-র নাম নেই। ১৯৫০-এর দশকে সাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদারকে ঘিরে যে সারস্বত আড্ডা বসত, তাতে গানের মানুষ হিসেবে কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়র কথা জানা যায় অনিরুদ্ধ লাহিড়ির লেখা ‘কমলকুমার ও কলকাতার কিসসা’ গ্রন্থটিতে কিন্তু কোথাও মান্না দে-র নাম নেই। সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের স্মৃতি উসকানো কাব্যগ্রন্থ ‘কফি হাউসের সিঁড়ি’-তেও নেই। সমাজবিদ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনবদ্য স্মৃতিকথা ‘নিশির ডাক’-এও নেই ‘কফি হাউস’-গায়ক। তা হলে? কফি হাউসে সদ্য পা রাখা পাবলিক রক্তদান শিবিরের আগের দিন এই প্রশ্নটা অবধারিত ভাবে করবেই (রক্তদানের পোস্টারে মান্না দে-র ছবি প্রতি বছরই জ্বলজ্বল করত)। আর এই প্রশ্ন শুনে ভেটেরানরা থমকে থাকবেন।

১৯১৯-এ জন্মানো মান্না দে যে সময়ে কলেজে পড়তেন, অর্থাৎ যে সময়ে তাঁর আড্ডা মারার মতো অবকাশ ছিল, সেই সময়ে কফি হাউস ছিল কি? ১৮৭৬ সালে তৈরি হওয়া অ্যালবার্ট হল ‘কফি হাউস’-এ পরিণতি পায় ১৯৪২ সালে। হিসেব মতো মান্না দে তখন কলেজের গণ্ডি ডিঙোচ্ছেন। ওদিকে ১৯৪২ সালেই মান্না দে বম্বে পাড়ি দেন কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র আহ্বানে। কিছুদিনের মধ্যেই জুড়ে যান শচীনদেব বর্মনের সঙ্গে সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে। ১৯৪৪-১৯৫০-এর মধ্যে মান্না দে সর্বভারতীয় ফিগার। নেহাত ‘সেলিব্রিটি’ শব্দটা তখন জানা ছিল না, তাই। নইলে তাঁর জনসমক্ষে এলে মবড হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে কফি হাউসের মতো এক খুলে আম দরবারে তাঁর আগমন ও আড্ডা দেওন খুব একটা সম্ভব ঘটনা নয়।

জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত কফি হাউসের সুখ-দুঃখের শরিক কবি উৎপলকুমার বসুও তাঁর জীবদ্দশায় মনে করতে পারেননি মান্না দে-কে কোনও দিন কফি হাউসে দেখেছেন কি না। উৎপলকুমার অবশ্য জীবনের একটা বড় পর্যায় বিদেশে ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে মান্না দে-ও খ্যাতির চরম থেকে চরমতর সোপানে আরোহণ করছেন। হিন্দি পেরিয়ে বাংলা— ‘আমি আজ আকাশের মতো একেলা’ থেকে ‘এ নদী এমন নদী’, ‘ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ’, ‘যদি কাগজে লেখো নাম’। বাঙালির মনোগহীনের না-বলা কথাগুলোকে উগরে দিয়েছেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্য কারোর সহযোগিতায়।

যাটের দশকে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় যা বার বার ফিরে এসেছিল, যাকে ইংরেজিতে হালকা করে বলে ‘প্যাথোজ’, তাকে কবিতার সীমানা ছাড়িয়ে মান্না দে-ই তুলে আনেন তাঁর গানে। সেই ষাটের দশক, যখন বাংলায় অফিসিয়ালি রাগী যুবকের জন্ম হয়নি, সামাজিক অপ্রাপ্তি আর প্রেমহীনতা বাঙালি যুবককে কুরে কুরে খেযেছে। যখন বেকার কবি বা ছবি আঁকিয়ের সযত্নে গড়ে তোলা প্রেমের মণিদীপ এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দয়িতা সম্বন্ধ বিবাহের পিঁড়িতে সাতপাক ঘুরে বোঁ করে পাড়ি দিচ্ছেন পশ্চিম জার্মানি।

নেহরুভিয়ান প্রগতি গোঁত্তা খাচ্ছে, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আস্তে আস্তে পাওয়া যাচ্ছে আসন্ন বারুদের ঘ্রাণ, তখন সেই বিষণ্নতাকে যে মূর্ত করেছিল ‘আমার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে’-জাতীয় গানের লিরিক আর শ্রম ও নিষ্ঠায় তৈরি এমন একটা কণ্ঠ, যা বাংলা গানের চাঁদকপালে রাজপুত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো ‘গেল্ডেন’ নয়। ঘাম আর রক্তের স্বাদ সেই কণ্ঠস্বরে বড় প্রকট।

একদিক থেকে দেখলে মান্না দে ছিলেন আম বাঙালির বেদনার শরিক। সুচরিতা বিয়ে করে জার্মানি চলে যাওয়ার পরে নিরঞ্জন কফি হাউসের কোনায় যে সাতদিন খড়খড়ে দাড়ি নিয়ে বসে বসে ইনফিউশন খেয়েছে, সেই সাতটা দিনের সাঁঝবেলা অবধারিত ভাবে ছিল মান্না দে-র। ১৯৬০-এর দশকের বাঙালির একান্ত বিষাদকে কাঁধে কাঁধ দিয়ে সামলেছেন মান্না দে। বিছানায় খোলা সুনীল গাঙ্গুলির ‘নীরার দুঃখকে ছোঁয়া’, চোখের সামনে রোম্যান্টিকতার সংজ্ঞা বদলে কিছুটা ফেড হয়ে যাচ্ছেন উত্তমকুমার, একটু ঝোড়ো, একটু অবন্যস্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উঠে আসছেন মানসপটে। সেখানে ‘প্রেমহীন হাজার বছর’-এর চাপকে ঘরে যদি সামলে থাকেন মান্না দে, বাইরে সামলেছে কফি হাউস। সেখানে মান্না দে কফি হাউসের নিয়েমিত আড্ডাধারী হন, বা না-ই হন, তাতে কিছু যায় আসেনি। কফি হাউস নামের আর্কিটাইপটার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান মান্না দে।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় আর সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’ কি বাঙালির এক বিশেষ পর্বের সামূহিক স্মৃতির অভিজ্ঞান নয়? আর মান্না দে নামক কিংবদন্তিটি সেই অভিজ্ঞানের অনুঘটক? এমন ব্যালাড পাশ্চিমে তৈরি হলে রাস্তার পাথরে নাম খোদিত হয়। ‘ওয়াক অফ ফেম’ বলে কিছু তো বাঙালির জীবনে হল না! হবেও না বোধ হয়। মান্না দে-ই তো পাথরে নাম লিখতে বারণ করে গিয়েছেন। থাকগে।

কফি হাউসিদের সাইকিতে লেখা হয়ে রয়েছে সেই সব গানের কলি। আজও মফস্‌সল থেকে কলকাতায় পড়তে এসে শ্যামলিমা মাখানো মুখচ্ছবি থমকে দাঁড়ায় বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রিটের মোড়ে। ‘ইন্ডিয়ান কফি হাউস’ বোর্ডটা দেখে মাথার ভিতরে রণন তোলেন মান্না-গৌরীপ্রসন্ন-সুপর্ণকান্তি। ইতস্তত করে সে ঢুকেও পড়ে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় আর তার পরে নাগরিকতা তাকে লুফে নেয়।

তার গ্রাম-মফস্‌সলের বাঁধনগুলো ছিঁড়ে যেতে থাকে। সে তখন নাগরিক। তাকে ঘিরে ধরে শহরের অমৃত-গরল। স্মৃতিকোষে তখন ঢেউয়ের পরে ঢেউ। সুনীল গাঙ্গুলি-শক্তি চাটুজ্যে-ভাস্কর চক্রবর্তীর সঙ্গে পথ হাঁটেন মান্না দে-ও। কলকাতা আদর করে তাকে। অমৃত আর বিষের আদর। নাগরিক ক্যানভাসে যুক্ত হয় আরও একটা নতুন মুখ।

                     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>