Meeting Amar Mitra

অমর মিত্র সংখ্যা: মুখোমুখি নদীর মানুষ অমর মিত্র

Reading Time: 13 minutes

সাহিত্যের সঙ্গে ৫০ বছর, সাহিত্যই তাঁর প্রথম পছন্দ। ১৯৭১ এ যাত্রা করে এখনো তিনি অক্লান্ত। জীবন গেছে মানুষ এবং প্রকৃতি সংসর্গে। গল্প ও উপন্যাসে সেই মানুষ এবং প্রকৃতি। দেশ দেশান্তরে ঘুরেছেন, ভারতবর্ষের সঙ্গে দেখা হয়েছে বারে বারে। বলেন দেশকে না লিখতে পারলে লিখবেন কী? দেশ মানে নগর ও গ্রাম, পাহাড় থেকে সাগর, ময়মনসিংহ গারো পাহাড়ের কোল থেকে বছরে ছমাস ভেসে থাকা ধনপতির চর, ছিটমহলের রাষ্ট্রহীনতায়। অমর মিত্র সাহিত্যকে সাধনা বলে জানেন, কলমের জাদুতে বিশ্বাস করেন। সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম পুরস্কার, শরত পুরস্কার, কথা পুরস্কার ইত্যাদি সম্মানে ভূষিত এই লেখক। ইরাবতী লেখকের জন্মবার্ষিকী ও সাহিত্য জীবনের ৫০ বর্ষ কে উদযাপন করছে। বিশেষ এই দিনকে সামনে রেখে লেখক অমর মিত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন অরিন্দম বসু। তাদের সেই কথপোকথন ইরাবতীর পাঠকদের জন্য এখানে অবিকল তুলে দেয়া হলো।


১) আপনার লেখালেখির শুরু সেই ’৭১ সাল থেকে। ’৭৪ সালে যখন ‘মেলার দিকে ঘর’ গল্পটি লিখছেন তখন থেকেই আপনার লেখায় প্রান্তিক মানুষের কথা উঠে এল। প্রথম উপন্যাস ‘নদীর মানুষ’-এও তাই। নীচের দিকে পড়ে থাকা মানুষদের জীবন কি আপনাকে টানে?

অমর মিত্র: টানে। দেখেছি সেই জীবন। যৌবনকাল গেছে এইসব মানুষের কাছাকাছি থেকে। সেই জীবন বর্ণনাতীত। এখন অলীক মনে হয়। সেই কারণেই চাপাপড়া মানুষ, নীচের তলার মানুষ টানে। ১৯৭১-৭৩ সালে যে কয়টি গল্প লিখেছিলাম সেই গল্পও অসফল মানুষের গল্প। অসফল, ব্যর্থ   মানুষ, নিরূপায় মানুষ টানে, তাই লেখা। যত বড় বড় লেখকের লেখা পড়েছি, সবই তো ব্যর্থ   মানুষ নিয়ে, ক্রমাগত লড়াই করে হেরে যাওয়া সেই বৃদ্ধ আর অতিকায় এক মাছ, মাছের কঙ্কাল নিয়ে ফেরা– ভেবে দ্যাখো। একমাত্র তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি উচ্চবর্গের কথা বলেছেন তাদের  অনাচার আর নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করতে। ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’, ‘রেজারেকশন’, ‘গ্যাম্বলার’ কিংবা   ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’… এসব আমার প্রিয় গল্প-উপন্যাস।

২) ‘মাঠ ভাঙে কালপুরুষ’, ‘পার্বতীর বোশেখ মাস’, ‘গাঁওবুড়ো’, ‘দানপত্র’, ‘হাসেম আলির সাত কাঠা’ এবং এমন আরও গল্পে, ‘আগুনের গাড়ি’ উপন্যাসে গ্রামীণ ভারতবর্ষকে দেখতে পাই যা আমাদের দেশ ও মানুষকে চেনাতে চায়। এই কি আপনার লেখালেখির মূল সূত্র?

অমর মিত্র: হয়ত। একসময় ছিল তা। কিন্তু অনেকটা পথ ফেলে এসেছি। ওই জীবন থেকে সরেও এসেছি। তবে দর্শন তো বদলায় না, বরং আরো সূচিভেদ্য হয় দেখা। আমি আমার দেশকে যদি না লিখতে পারি, তাহলে কী লিখব? দেশ মানে দেশের মানুষ, দেশের ভূপ্রকৃতি, মানুষের বেঁচে  থাকার যুদ্ধ। তুমি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসে দেখবে, কী অপূর্ব পূর্ববঙ্গ। অত সুন্দর পূর্ববঙ্গ আমি আর কোথাও পড়িনি। পশুপাখি, সাপ, ব্যাঙ সব আছে। সব।

৩) ভূমি রাজস্ব বিভাগে চাকরি করেছেন বহুদিন। চাকরিকে পায়ের বেড়ি না ভেবে সেখান থেকে জীবনকে ছেঁকে নিলেন কীভাবে?

অমর মিত্র: চাকরিটা এই নগর থেকে নির্বাসন ছিল। আমি কলকাতায় বড় হয়েছি। ২৩ বছর বয়সে  গেলাম এমন গ্রামে চাকরি করতে, যেখানে পৌঁছতেই লাগত দেড় ঘণ্টা, দু’ঘণ্টা পায়ে হাঁটা।  তার আগে ট্রেন-বাস তো হয়েছেই। গোপীবল্লভপুর থানার যেখানে ছিলাম, ছ’ঘণ্টা বাসে গিয়ে  জামশোলা ব্রিজে নেমে এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পায়ে হাঁটতে হত। রাস্তা ছিল না, বনপথ,  চাষের জমির আল, চড়াই-উৎরাই ভেঙে বংশীধরপুর। এই জীবন যেন নির্বাসন ছিল একপ্রকার।  ঠিকই করে নিয়েছিলাম ওই চাকরি আমাকে জমি চেনাবে, মানুষ চেনাবে, আমি লিখব। সুতরাং হেরিকেন কিংবা কেরোসিন লম্ফ আর কাগজ-কলম সম্বল হল। বিস্ময়ের শেষ ছিল না। জীবনের  বিস্ময়ই আমার কর্মজীবনকে বেড়িতে বাঁধতে পারেনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এমন সুযোগ  আমি পেয়েছি, এ আমার পরম সৌভাগ্য।

৪) ‘অশ্বচরিত’ উপন্যাসে একটি ঘোড়ার বারবার হারিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসা যেন স্থান ও কালকে অতিক্রম করে যেতে চায়। আগের লেখার রূপক বা রূপকল্পের ধরন থেকে জাদুবাস্তবতায় চলে গেলেন। কেন?

অমর মিত্র: জাদুবাস্তবতা বলছ, আমি তার খোঁজ পাইনি এখনো। এর খসড়া লিখেছিলাম ১৯৮১ সালে।  ‘বিভ্রম’ নামে শিলাদিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২-র ফেব্রুয়ারিতে। সম্পাদক ছিলেন   সুধীর চক্রবর্তী। তারপর ১৯৯৭ সাল অবধি অপেক্ষা করে নতুন উপন্যাস লিখি ‘বিভ্রম’ সামনে  রেখে। তখন নাম হয় ‘অশ্বচরিত’। ‘বিভ্রম’ লেখার পর মনে হয়েছিল, কী যেন লেখার কথা ছিল,  লেখা হয়নি। তা খুঁজে পেতে সতেরো বছর। জাদুবাস্তবতা নয়, এই পদ্ধতি আমার লেখার ধরন।  আমি এইভাবে লিখতে স্বচ্ছন্দ। আমার প্রিয় সাহিত্য রুশ সাহিত্য, রুশ উপন্যাস পড়ে আমি  উপন্যাস লিখতে শিখেছি, যদি তা হয়ে থাকে। আমি দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর দেখেছি, সমুদ্র এবং   নদীর ধারে থেকেছি। চোখটা তাই অনেক দূর দেখতে শিখেছে। ব্যপ্ত জীবনের উপন্যাস লিখতে    তাই ভালোবাসি। ‘অশ্বচরিত’ ঐভাবে এসেছে। এই আসার জন্য আমাকে সতেরো বছর অপেক্ষা  করতে হয়েছিল সত্য।

৫) ‘অশ্বচরিত’ থেকেই কি আপনার লেখার ন্যারেশনের ধরন বদলে যেতে শুরু করে? যেমন এক পরিচ্ছেদের কিছু কথা পরে আবার বলছেন। তারপর আবার। ‘ধ্রুবপুত্র’-এ আছে। তার পরের লেখাতেও আছে। এটা কি ফর্ম হিসেবে ব্যবহার করলেন? পাঠক যদি বিরক্ত হন?

অমর মিত্র: কিছু বাক্যের পুনরাবৃত্তি হয়। আমার কথাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।  কেন হয়েছে বলতে পারব না, কিন্তু অবধারিতভাবেই হয়েছে। বড় পরিসরে লেখা হলে এইটা  হয়। আমি তো কাহিনি আবার শোনাচ্ছি না, এমন কিছু বাক্য, যা পরে এসে গেছে দুর্গম যাত্রায় সঙ্গী হতে। কবিতায় এমন  দেখেছি। একই অনুষঙ্গ ঘুরে ফিরে আসে। এ যেন জলের কাছে ঘুরে  ঘুরে জলের কথা বলে যাওয়া।

৬) ‘ধ্রুবপুত্র’ উপন্যাসে প্রাচীন ভারত, রাজতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, দুষ্কৃতীদের হাতে ক্ষমতা, প্রবল খরা, নির্বাসিত কবি— এসবই আপনি লেখাটির কায়া নির্মাণে ব্যবহার করলেন। তার সুদীর্ঘ ছায়াটি তো সময়ান্তরে সত্য হয়ে ওঠে।

অমর মিত্র: যে সময়ে বাস করি, সেই সময়কে এড়িয়ে কোনো লেখা সম্ভব নয়। আমি লেখার সময়  মনে মনে প্রাচীন উজ্জয়িনীতে গিয়েছিলাম সত্য, কিন্তু আসলে তো আমি এই সময়ের প্রতিনিধি  হয়েই গিয়েছিলাম। আমার গায়ে এই সময়ের ঘাম, রক্ত, ঘা-পাঁচড়া। তাকে আমি এড়াব কী করে?  ফলে তার ছায়া পড়েছে প্রাচীন নগরের কাহিনিতে। সময় থেকে সময়ান্তরে যাত্রাই তো  ঔপন্যাসিকের যাত্রা। ‘ধ্রুবপুত্র’ এই মহামারীর সময়ের কাহিনিও হয়ে উঠেছে। মিলিয়ে দেখে  নিও। এই ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছে, মিলিয়ে নিও।

৭) একটি লেখা যে বিশেষ সময়ে লেখা, আপনি সেই সময়কে স্বীকার করেও তা গুলিয়ে দিতে চান। এক সময়ের ভেতরে আরও অনেক সময় ঘনিয়ে ওঠে। গল্পে হয়তো কম, উপন্যাসে বেশি। সেখানে ফ্যান্টাসি ও মাইথোলজি একটি প্রধান মাধ্যম। এ কি আপনার প্রিয় অভিলাষ?

অমর মিত্র: ফ্যান্টাসি ও মাইথোলজি আমার লেখায় সেই শুরু থেকেই আছে। ‘মেলার দিকে ঘর’ গল্পে  লক্ষ্মীর পদচিহ্ন পড়ছে ধুলোর উপরে। লক্ষ্মী গ্রাম ছেড়ে  চলে যাচ্ছে যে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওই  রূপকল্পে। কিন্তু সকলে জানে সে তো যাচ্ছে মেলা দেখতে। মাইথোলজি, কিংবদন্তী আমাকে   টানে, টানে লোকউৎসব, লোকশ্রুতি। সুতরাং তা চলে আসে। সময়কে গুলিয়ে দিয়ে সময়ে  প্রত্যাবর্তন আমার লেখার আনন্দ। মাইথোলজির প্রথম উপন্যাস ‘নদীর মানুষ’, দ্বিতীয় উপন্যাস  ‘পাহাড়ের মতো মানুষ’-এও  আছে। ফ্যান্টাসিও। এইভাবে লিখতে ভালোবাসি। প্রিয় অভিলাষই।

৮) ‘মোমেনশাহী উপাখ্যান’ বিষয়ের দিক থেকে অভূতপূর্ব। ফর্মের দিক থেকেও। কমলা সায়রের মিথ আপনি মিশিয়ে দিচ্ছেন কলকাতার এক কলোনির দিঘির সঙ্গে। গারো পাহাড়, হাতিখেদা আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একাকার। ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্রকুমারকে আধুনিক ‘খবরিয়া’ করে এনেছেন। ইতিহাসের কালক্রমকে ভেঙে আবার গড়েছেন। এও কি সেই প্রাকৃতজীবনের আবিষ্কার?

অমর মিত্র: যদি মনে করো, তবে তাই। আমি আমার মতো লিখেছি। জমি, মাটি, মানুষ চিনেছি   সারাজীবন ধরে, তাই লিখতে পেরেছি জমির কথা, ফসলের ভাগ আর জমির ভাগের কথা, টঙ্ক  চুক্তির কথা। আর এইভাবে আমি জীবনকে দেখি। মনে হয়…

‘মানুষের মৃত্যু হলেও তবুও মানব

থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে

প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।’

এ তো শুধু জীবনানন্দের কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়। আরো কিছু। সুতরাং ১০০ বছর আগের চন্দ্রকুমার  হয়ে যেতে পারেন খবরিয়া ইমতিয়াজ আলী চন্দ্রকুমার। সে নাকি আবার লেখকের সৃষ্ট চরিত্র,  খবরিয়া বাণেশ্বরের বংশধর। সবই সম্ভব। একে প্রাকৃতজনের আবিষ্কার যদি বলো তবে তাই।

৯) ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ উপন্যাস আপনি লিখেছেন ছিটমহল নিয়ে। ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ড। রাষ্ট্রহীন। আবার এক দাদামশাই ও তার নাতির অলীক সম্মেলনও রয়েছে। প্রখর বাস্তবতার ভেতরে পড়ে থাকা ছিন্ন মানুষদের জীবনের কথাই কি ছিল অনুসন্ধান?

অমর মিত্র: একটি উপন্যাস লিখেছিলাম বাস্তবতার পোড়া দাগ দেখতে পেয়ে। রাষ্ট্রহীন মানুষ আমাকে   তাড়িত করেছিল। অবাক হয়েছিলাম এত বছর ধরে এমন হয়ে আছে সব, কেউ অনুসন্ধান করে  দেখেননি। আবার সেই কথা, জমি, মাটি জানি বলে বিপন্নতাকে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম।  তাদের বসবাসই আমার অলীক মনে হয়েছিল। এক দেশের ভিতরে আর এক দেশ। দাদামশায়ের সঙ্গে দেখা হওয়াও সেই অলীক জীবনের একটা অংশ। ৪৫ বছরের দাদামশায়ের সঙ্গে ৬২  বছরের দৌহিত্রর দেখা হওয়া ঐ রাষ্ট্রহীন বাস্তবতার অনুসারী।

১০) ‘দশমী দিবস’ উপন্যাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রয়েছেন। কিন্তু এ তাঁর জীবনী উপন্যাস নয়। বীরাঙ্গনা দাসী মধুকবি ও কপোতাক্ষকে সঙ্গে নিয়ে ওপার থেকে এপারে এসে কবির কথা বলে চলেন। এখানেও মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ এসে গিয়েছে। কেন এভাবে ভাবলেন লেখাটি?

অমর মিত্র: বিদায়ঘাট দেখেছিলাম সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষ তীরে। ২০০০ সাল। আমার প্রথম বাংলাদেশ   যাওয়া। মনে হয়েছিল অখণ্ড বাংলায় কত বিদায়ঘাট না হয়েছিল ১৯৪৭-এ। যারা দেশান্তরে  গিয়েছিল, তাদের ভিটের উঠোনটিই হয়েছিল বিদায়ঘাট। বীরাঙ্গনা দাসীকে আমি চিনি। তাঁকে  নিয়ে লিখতে গিয়ে মাইকেল এবং পার্টিশন একসঙ্গে এসে গেছে। বিদায়ঘাট একটি মিথ। পরে  খুঁজে দেখেছি মাইকেল বিলেত বা মাদ্রাজ যাওয়ার আগে সাগরদাঁড়ি যাননি। তাহলে? মানুষ   ভালোবেসে এই কাহিনি রচনা করেছিল, মাইকেল বিলেত যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা  করতে এসেছিলেন নাকি। সাগরদাঁড়িতে তাঁবু ফেলে অপেক্ষা করছিলেন। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে   পরিত্যাগ করেছিলেন। বাড়িতে ঢুকতে দেননি। সবই মানুষের কল্পনা। মানুষ এমন পারে। আবার  এসে গেল কিংবদন্তী, মিথের প্রসঙ্গ। মানুষই তো বানিয়েছে সব। আমিও বানাই। অন্য উপন্যাসে  বানিয়েছি। হ্যাঁ, বীরাঙ্গনা দাসী যিনি, মাইকেল যাঁর ঠাকুরদা, দূরের সম্পর্কে হলেও, তিনি ছিলেন  আমাদের আত্মীয়া। পার্টিশনে দরিদ্র হয়ে যাওয়া তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে মধুসূদন এসে গেছেন। এইটি পার্টিশন নভেল। জীবনী উপন্যাস নয়।

১১) দেশভাগ, উদ্বাস্তু মানুষের জীবন, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক— এসবই আপনার গল্প-উপন্যাসে বারবার এসেছে। ‘নদীর ওপার’ গল্প, ‘মাতৃভূমি’, ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’, ‘দশমী দিবসে’ উপন্যাসে স্বাধীনতা ও তার পরবর্তী সময় এসেছে। কী দেখতে চেয়েছেন এইসব লেখার মধ্যে দিয়ে? মনে হয়নি রিপিটেশন হচ্ছে?

অমর মিত্র: একটি লেখাও আগেরটির কোনো চিহ্ন ধারণ করে নেই। আলাদা লেখা। আমি সন্তুষ্ট হইনি  বলেই আবার লিখেছি। পার্টিশন শুধু আবেগের ব্যাপার নয়, ইতিহাস, জাতির প্রতি  বিশ্বাসঘাতকতা সবই পার্টিশন। পৃথিবীতে কোনও জাতি এমনভাবে পীড়িত হয়নি, এর সঙ্গে  তুলনীয়  নাৎসি জার্মানির  হলোকাস্ট। পশ্চিমে এবং  পুবে তা  হয়েছিল। রাজনীতিকরা এবং  ব্রিটিশ সরকার দায়ী। কিন্তু ব্রিটেনকে দোষ দেব কেন, এই পাপ আমাদের পাপ। পেনসিলে  দাগিয়ে দেশভাগ!  জমি বন্টন। উত্তর ভারতের কিছু  হয়নি, আমাদের হয়েছে। এখনো তার  ফল  ভুগছে মানুষ। ডিটেনশন ক্যাম্প কেন? অনুপ্রবেশ করেছে? প্রতিবেশী দেশে পীড়িত হয়েই পার  হয়ে এসেছে। যাবে কোথায় মানুষ? রাজনীতিকরা এই নিয়ে রাজনীতি করেছিলেন। ক্ষমতার রাজনীতি। মানুষের জন্য ভাবেননি। পূর্ব সীমান্তের উদ্বাস্তু নিয়ে উত্তর ভারতের রাজনীতিকদের মাথাব্যথা ছিল না বলেই আমরা ক্রমাগত মরেছি। পশ্চিমে সুষ্ঠু সমাধান হয়েছিল। পুবে কিছুই  না। এসব বলতে হবে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর এই বছর। রিপিটেশন নয়, যা বলতে পারিনি তা  আবার বলব। লিখছি সেই লেখা।

১২) ‘ধনপতির চর’ উপন্যাস এক আশ্চর্য লেখা। বঙ্গোপসাগরের মোহনার চর, কচ্ছপের মিথ, তিন নারীর রহস্যময়তা ও প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের প্রভুত্ব, ধনপতিদের মুখ ও মুখোশ। সঙ্গে বাস্তব আর জাদুবাস্তব হাত ধরাধরি করে চলেছে। কী করে পেলেন এমন লেখা?

অমর মিত্র: পাইনি তো এই লেখা। আমি সবটাই বানিয়েছি। শতকরা ১০০ ভাগ সত্য। তবে লেখার  বহুদিন আগে সুন্দরবনের গোসাবায় সাত দিন ছিলাম অফিসের কাজে। তখন এসব নিয়ে  ভাবিইনি। বরং ভেবেছিলাম স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টনের সমবায় নিয়ে উপন্যাস লিখব। কিন্তু  হয়নি। আমার সারাজীবন যাদের সঙ্গে কাটানো, যাদের দেখা, তারাই এসেছে এই উপন্যাসে। সূত্র  ছিল ২০০২-০৩ নাগাদ জম্বুদ্বীপে মাছ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবীদের উচ্ছেদ। সরকার এই  উচ্ছেদ   করেছিল। একটি টেলিভিশন রিপোর্ট দেখেছিলাম আমি। প্রতিবাদীরা ফিরছে গাঙ পেরিয়ে।  তারপর কীভাবে লেখা আসে, চরিত্ররা আসে, এখন আর মনে নেই। এই উপন্যাস একবার  লিখলাম ৭৫ পাতা। এক বন্ধুকে পড়ে শোনালাম। সে খুব প্রশংসা করল। কিন্তু নিজে টের  পেয়েছিলাম কোথাও কিছু  ভুল হচ্ছে। লেখা হয়নি ঠিকঠাক। পরের দিন সেই উপন্যাসের প্রথম  পরিচ্ছেদ থেকেই প্রথম পর্ব  লেখা আরম্ভ করলাম। উপন্যাসটি হয়ত মা কমলার সোনার গাগরি   থেকে আকাশ মাটি চর সমুদ্রর মতো বেরিয়ে এসেছিল। মা কমলা এবং মা মেরি জানেন হয়ত   কীভাবে কী হয়েছিল। ধনপতির চর মা কমলার সোনার গাগরি থেকে বেরিয়ে এল, এই মিথ   আমিই ভেবেছিলাম আমাদের পুরাণ, মঙ্গলকাব্য স্মরণ করে। মিথ পড়েছি লেখালেখির শুরু   থেকে। ভেরিয়ার এলুইন থেকে সাঁওতাল গ্রামে সাঁওতাল বুড়োর কাছে শুনেছি সৃষ্টিতত্ব। সবই   সাহায্য করেছে, নতুন মিথ, শ্লোক রচনা করতে।

১৩) সময়নিষ্ঠ থেকে একেবারে যাকে বলে পুরোপুরি ঐতিহাসিক উপন্যাস— তা লেখার কথা মনে হয়নি কখনও? আপনাদের অগ্রজ লেখকদের অনেকেরই কিন্তু এমন সফল লেখা রয়েছে। আপনি লিখতে পারেননি না কি চাননি? যদি না চান তাহলে কেন?

অমর মিত্র: না লিখতে ইচ্ছে হয়নি। এমনকি হতে পারে কাহিনির রেখাকে অনুসরণ করে যেতে হবে,  তাই। কিন্তু সামনে তো ছিল মহৎ উপন্যাসের উদাহরণ। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শাহজাদা দারাশুকো’। তবুও লিখিনি কেননা লিখতে উদ্বুদ্ধ হইনি। তবে এতদিন বাদে পার্টিশন নিয়ে   একটি নভেল লিখছি, সেখানে ইতিহাস চিহ্নিত হয়েছে অনেক জায়গায়।

১৪) ব্যক্তিমানুষের জীবনে রাজনীতি উপস্থিতিকে বিষয় করে আপনি ‘নিরুদিষ্টের উপাখ্যান’ লিখেছেন। অনেক পরে আবার লিখেছেন ‘পুনরুত্থান’ উপন্যাস। এই প্রচণ্ড বাস্তবতাকে কীভাবে দেখেছেন লেখায়?

অমর মিত্র: এইসব ঘটনা ঘটেছিল আমাদের সামনে। আমি তো অনেকের মতো সাক্ষী ছিলাম। তাই  লিখেছি। দুটি ঘটনাই সত্য। আমি স্থান বদলেছি। নিজের মতো  করে নভেলাইজ করেছি। এই  ঘটনাদুটি এতই আমাকে মানসিকভাবে বিব্রত  করেছিল যে না লিখে পারিনি। যা আমাকে বিব্রত করে, আহত করে, তাও এক বিস্ময়। এমন হল কেন, তাই  লেখা। এই দুই লেখার বাস্তবতা   অনেকটাই নির্মাণ। এইভাবেই এসেছিল তা।

১৫) ‘বহ্নিলতা’ উপন্যাসে আপনি একটি মেয়েকে এমনভাবে এনেছেন যেখানে অতীত, বর্তমান মিলেমিশে গেছে, এমনকি ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও রয়েছে। মেয়েটি কত যুদ্ধ, বিপ্লব, মিছিলের সাক্ষী যা বাস্তবে একজনের পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত সে যেন বাঘিনী হয়ে ওঠে। লেখার ভাবনাটি বলবেন?

অমর মিত্র: আমি তো বহ্নিলতাকে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছি। বাস্তবতায় কতটা সম্ভব তা আমি  জানি না। মনে হয়, যায় না। আর বাস্তবতা আমার দেখার কথা নয়। আমি সংবাদপত্রের   রিপোর্টিং করতে বসিনি। আমি এমন এক নারীকে নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম, যার আছে দীর্ঘ,   অতিদীর্ঘ এক অতীত, ইতিহাসের পুত্রী সে। ইতিহাসকে ধারণ করে থাকে। হবে না কেন,  আমার ভিতরে কি আমার পূর্বপুরুষের স্মৃতি সঞ্চিত নেই, আমি কী করে আমার জন্মের আগের কথা  লিখি। লিখি মানে দেখি। সে-ও দ্যাখে  সেইভাবে। আর বাঘিনী না হয়ে সে শোধ নেবে কীভাবে ?  গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলাই কি তার ভবিতব্য? মনে করি না তা।

১৬) এই প্রসঙ্গেই আপনার গল্প-উপন্যাসের নারীচরিত্র নিয়ে জানার ইচ্ছে করে। ‘অশ্বচরিত’-এর কোকিলা, ‘ধনপতির চর’-এর কুন্তী, বাতাসি, যমুনা, ‘বহ্নিলতা’-র বহ্নিলতা, ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’-এর জবা, ‘অর্ধেক রাত্রি’-র শোভা— এরা যেন ঠিক রক্তমাংসের নয়। নারীদের প্রায়ই অজানা ছায়ায় মুড়ে রেখেছেন কেন?

অমর মিত্র: বাস্তবতার চর্চা আমি করতে চাই না। বাস্তবতা আমাকে আমার প্রার্থিত জায়গায় পৌঁছে   দিতে পারবে বলে মনে করি না। আমি কল্পনায় ভরসা রাখি। যে নারীদের আমি দেখেছি বা  দেখিনি তেমনভাবে, তারা আমার নির্মাণে অন্য রূপ নেয়। লেখকের স্বাধীনতা তা। আসলে এই  সমাজে দুঃখী মেয়েদেরই দেখেছি বেশি। তারা চাপের ভিতর থাকে। সেই মেয়েরাই যখন চরিত্র  হয়ে আসে, তারাই নিজের মতো করে বদলে যেতে থাকে। বদলে যে যায়, তা সোশ্যাল মিডিয়া  দেখে এখন বুঝতে পারি। আমার গল্প-উপন্যাসের মেয়েরা অনেকদিন আগে থেকেই বদলে গেছে নিজে নিজে। অজানা ছায়া বলে যা মনে হয়, তা আসলে তাদের প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠার চিহ্ন। তুমি  আমাকে মারলে আমি বাঘিনী হয়ে তোমাকে দেখে নেব। আসলে সব মিলিয়ে এক নারীর কথাই  যেন নানা বয়ানে লিখে গেছি।

১৭) জীবনের প্রধান এক চালিকাশক্তি যৌনতা। লেখাতেও তার উপস্থিতি এক শক্তি হতে পারে। আপনার লেখায় সেই অর্থে যৌনতা নেই। কেন?

অমর মিত্র: জানি না এই প্রশ্নের উত্তর দেব কী করে। যেভাবে লিখেছি, তাইই সত্য, যা লিখিনি, তা   পারিনি। যৌনতাই প্রাণবায়ু। প্রাণবায়ু আমার একটি গল্প। আছে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

১৮) ‘শূন্যের ঘর শূন্যের বাড়ি’ উপন্যাস আদতে এক উদ্বাস্তু মানুষের গৃহ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। সাধারণ মানুষ একটি ছাদ চায় যেখানে শুয়ে সে স্বপ্ন দেখবে। আসলে কি মানুষ চিরকালই ভূমিহীন? নাগরিকত্ব বলে কিছু হয় না এই জগৎপুরে?

অমর মিত্র: বাড়ি নির্মাণ এক স্বপ্ন নির্মাণ। বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে, আর কিছু করার থাকে না প্রধান  চরিত্রের। আবার এক স্বপ্ন দেখা যায় কি? সেই স্বপ্ন, স্বপ্নই নয়। একটু জমি, বাড়ি, মাথার  উপরে ছাদ– মানুষের এই চিরকালীন আকাঙ্ক্ষার একটি চেহারা আছে এই উপন্যাসে। আচ্ছা দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে মহাত্মাজি, কংগ্রেস বা বাংলার আবুল হাসিম-এর মুসলিম লিগের আর কি কোনো কাজ ছিল? হিন্দু মহাসভা বা জামাত ইসলাম বা মুসলিম লিগের এক অংশের না হয় এজেন্ডা শেষ হয়নি, বিভ্রান্ত রাজনীতির জন্য মাথার উপরের ছাদ বেহাত হয়ে গেছে তো। তা এখনো বজায় আছে তো। জগৎপুরের নাগরিক সকলে, আমি যদি উল্টো বলি। আসলে  জন্মমুহূর্ত থেকে এই পৃথিবীর এক কণা আমার,  এইটা  কে বুঝতে  চায় ?

১৯) আপনার পরের দিকের লেখায় দেখা যাচ্ছে একেবারে আধুনিক সময় বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, টেকনোলজির চূড়ান্ত আধিপত্যের সঙ্গে মানুষের একাকীত্ব আবার বিশ্বনাগরিকত্বের কথাও। যেমন ‘ভুবনডাঙা’ উপন্যাসটি। এ কি শুধুই বিষয়ের প্রক্ষেপ?

অমর মিত্র: ‘ভুবনডাঙা’ একটি প্রয়াস মাত্র। টেকনোলজির এই বিস্ফোরণ আমাকে ক্রমাগত বিস্ময়ে  ডুবিয়েছে, যেমন ডুবেছিলাম ২২-২৩ বছর বয়সে গ্রাম ভারতবর্ষে পৌঁছে। যা কিছু বিস্ময়ের সূত্র  তা আমাকে লিখতে প্ররোচিত করে। এখন এই টেকনোলজি, এই বিস্ফোরণ মানুষকে দলিত  করছে। আট ঘণ্টার কাজ ষোল ঘণ্টায় শেষ  হচ্ছে, এসবও দেখার। টেকনোলজি মানুষের  স্বাধীনতা হরণ করেছে। মানুষ কি একদিন এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে? পৃথিবীর যা কিছু ভালো  তার অংশ আমাদেরও চাই।

২০) শেষের কবিতা-য় আছে লেখক যখন ফুরিয়ে যেতে থাকেন তখন তিনি নিজের লেখা থেকেই চুরি করেন। যাকে বলা হয়েছে ‘রিসিভার্স অফ দি স্টোলেন প্রপার্টি’। আপনার লেখায় বিচিত্র বিষয় ও প্রেক্ষাপটের খোঁজ কি এই কারণে?

অমর মিত্র: লেখক যখন নিজেকে অনুকরণ করেন তখন বুঝতে হবে তিনি ফুরিয়ে গেছেন। আমি  চিরকালই চেষ্টা করেছি নিজেকে নতুন পথে নিয়ে যেতে।  একবার  লিখেছি ‘ধ্রুবপুত্র’, অনুরোধ   সত্ত্বেও আর যাইনি ওই পথে। তেমন সর্বক্ষেত্রে হয়েছে। টের পাই, আমার ভিতরে নতুনের প্রতি   আগ্রহ আগের মতোই আছে।

২১) আপনার লেখায় যাকে ‘স্টোরি টেলিং’ বলা হয় তা অনুপস্থিত। অথচ আপনি ঘটনা লেখেন না এমন নয়, আবার তার বিনির্মাণও করেন। কিন্তু সেখানে চরিত্ররা যত ঘটনায় সম্পৃক্ত ততটা মনস্তাত্বিকভাবে নয়। বরং তারা লেখকের মন্তব্য ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। মানবেন?

অমর মিত্র: এইটা আমার লেখার পদ্ধতি। পাঠক পড়ছেন। আমাকে আবার পড়ছেন। আবার। সুতরাং  কাহিনিবলয় ব্যতীত কাহিনি লিখে তা আবার ভেঙে দেওয়া– এই যে লিখন প্রক্রিয়া, এ আমার  স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর  সঙ্গে আমার পাঠকের কোনো বিরোধ নেই মনে  হয়। কোনো লেখকই   জনতার লেখক হন না। চরিত্ররা ঘটনায় সম্পৃক্ত অর্থে সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত। সমাজ, পৃথিবীকে   কি এইভাবে দেখা যায় না ?

২২) লেখার ফর্ম নিয়ে আপনি অনেক নাড়াচাড়া করেছেন। আঙ্গিক ও বিষয়কে কীভাবে একত্রিত করেছেন লেখায়? এ জন্য তো পরিকল্পনা লাগে। সবই কি পূর্বপরিকল্পিত?

অমর মিত্র: না। জীবনযাপনই আঙ্গিক চিনিয়ে দিয়েছে। আমার গল্পের চরিত্ররা একসময়  এক জায়গা  থেকে দূরবর্তী অন্য জায়গায় পায়ে হেঁটে যেত। ‘গাঁওবুড়ো’, ‘মেলার দিকে ঘর’, ‘পার্বতীর  বোশেখ মাস’, ‘রাজকাহিনি’, ‘মাঠ  ভাঙে কালপুরুষ’, ‘হস্তান্তর’… আমাকে হাঁটতে হত ক্যাম্প অফিসে  যেতে, দেড়-দু’ঘণ্টা। এইসব যাত্রাপথ ছিল আমার যাত্রাপথ। এইভাবে গল্পের আঙ্গিক তৈরি হয়ে  গিয়েছিল। আবার জমি হস্তান্তরের দলিল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ‘দানপত্র’। ‘দানপত্র’-র আগে এই ফর্মে  কেউ লিখেছেন বলে মনে হয় না। পরে লিখলাম, ‘যুদ্ধে যা ঘটেছিল’– একই ফর্ম, শুধু  জেলাশাসকের কাছে ছিটমহলবাসীরএক নিবেদনপত্র। তার ভিতরেই ছিটমহল জন্মের  মিথোলজি।  কিছুই পূর্বপরিকল্পিত নয়  আবার  অপরিকল্পিতও নয়।

২৩) রুশ সাহিত্যের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট, সাধারণ মানুষের জীবনের অনুপুঙ্খ, লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের কুহক, স্বপ্নবাস্তবের প্রভাব কি রয়েছে আপনার লেখায়?

অমর মিত্র: রুশ সাহিত্য পড়েই উপন্যাস লেখা শেখা। লাতিন আমেরিকার উপন্যাস অনেক পরে পড়েছি,  বছর পনের-কুড়ি হবে হয়ত। ২০০০ সালের পরে। কুহক, স্বপ্নবাস্তবতা জীবন থেকে শেখা।   ‘অশ্বচরিত’ উপন্যাসের খসড়া ১৯৮১ সালে লেখা। ‘বিভ্রম’। সেখানে ঘোড়াটি এক দিনেই তিন  ঋতুকে প্রত্যক্ষ করে। এই দেখা আমার দেখা। আমিই তখন ঘোড়াটির ভিতরে প্রবেশ করেছি। এমনি অনেক ঘটনাক্রম  আছে,  ‘ধ্রুবপুত্র’, ‘ধনপতির চর’, ‘নিরুদ্দিষ্টের  উপাখ্যান’ উপন্যাসে, তা  আমার জীবন থেকে আহরণ। জমি অধিগ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলে লিখতে পেরেছি   ‘ধনপতির চর’। চর নিয়ে যে পালিয়ে গেল মৎস্যজীবী দ্বীপবাসী, তা প্রত্যক্ষ অনুভব ছিল।  বজবজে ইন্ডিয়ান অয়েলের লিকুইড পেট্রোলিয়াম ফিলিং প্ল্যান্টের জন্য অধিগৃহীত জমির দখল  নিচ্ছিল সরকার। জেলাশাসক। আমি উপস্থিত ছিলাম সেই দখল নেওয়ার দিন। প্রচুর পুলিশ  ছিল। রাইফেলধারী ছিল। হতদরিদ্র এক বিধবা বুড়ি বগলে কাঁথামাদুর নিয়ে ভিটে ত্যাগ করে  পালিয়ে যাচ্ছিলেন পুলিশি হুঙ্কারে। আমাকে দেখে কী মনে হল তাঁর, পায়ে  পড়ে গেলেন। বাবা,  তুমি পারবে। তুমি আদেশ দাও, আমার ভিটেটা বেঁচে যাবে। আমার এমন অভিজ্ঞতা আগে  হয়নি। তখন মনে হয়েছিল বুড়ি শুধু কাঁথামাদুর কেন, নিজের ভিটেবাড়ি আর গ্রামটি নিয়ে   পালাতে পারত যদি, অধিগ্রহণের হাত থেকে রক্ষা পেত গ্রামের মানুষ। এই অনুভব ‘ধনপতির চর’  উপন্যাসের শেষে আসে। চরবাসীর ডাকে কাছিমের ঘুম ভেঙেছিল। দ্বীপটিকে বাঁচাতে কাছিম  দ্বীপটিকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে  যায় চরবাসীর প্রার্থনায়। বুড়ির কথা মনে করো। জীবনই   কুহকের জন্মদাতা। আসলে যে যেভাবে জীবনকে প্রত্যক্ষ  করেছে। জাদুবাস্তবতা কোনো বিশেষ  আঙ্গিক নয়। জীবনেই জাদু আছে। আর আমাদের কিংবদন্তী, পুরাণ, কথা সরিৎসাগর জাদুকাহিনিতে  ভরা।

২৪) আসলে আপনার লেখা প্রাকৃতজনদের জীবন, লোককথা, কিংবদন্তী, পুরাণ, কাব্য, ইতিহাসের অন্য নিমার্ণ নিয়ে ভারতীয় আখ্যানেরই অনুসারী যা নিজের শিকড় থেকে ওঠে এবং তাবৎ জগতে ছড়িয়ে পড়তে চায়। বলা যায় কি এমন?

অমর মিত্র: বলা যায় কিনা পাঠক বলবেন। তুমি বলবে। তবে এই কথা অনেকে বলেছেন। অচেনা  মানুষ, অচেনা পাঠক বলেছেন। এই কারণে দূর কাজাখস্তানে এশীয় লেখক সম্মেলনের উদ্বোধনী  অনুষ্ঠানে আমাকে আমার লেখায় যে মিথোলজি আছে তা নিয়েই বলতে বলা হয়েছিল। তার অর্থ,   তাঁরা জানতেন আমি কী লিখি। তাঁরা বলেছিলেন, দু’বছর হোমওয়ার্ক করে নির্বাচন করেছেন   আমাকে। হোমওয়ার্ক যথার্থ ছিল মনে হয়।

২৫) বাংলা ভাষার লেখার অন্তত ইংরেজি অনুবাদ নিতান্তই কম। সে না হয় একটা দিক। কিন্তু কোনও লেখা আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে ভাষার বাধা আছে বলে মনে হয়?

অমর মিত্র: খুবই বিমর্ষ করে এইসব ঘটনা। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটিমাত্র গল্প ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। আর নয়। তাঁর কোনো গল্পের বই নেই ইংরেজি বা হিন্দিতে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ে ‘নীলকন্ঠ  পাখির  খোঁজে’ ইংরেজিতে অনুবাদ হলে বিশ্বসাহিত্যের পাঠক   তাঁকে চিনতে পারত। এমনি অনেক উদাহরণ আছে। মহৎ লেখাগুলি অনুবাদ হয়নি, সেই কারণেই   বাংলা সাহিত্য  আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠেনি।

২৬) সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন, বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছেন, শরৎ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। আরও অনেক পুরস্কারই পেয়েছেন। ছোট কিংবা বড়— যেকোনও পুরস্কার একজন লেখকের কীভাবে নেওয়া উচিত?

অমর মিত্র: অকাদেমি পেয়েছি ২০০৬ সালে। বঙ্কিম পুরস্কার ২০০১ সালে। এইসব পুরস্কারের পর   ‘ধনপতির চর’, ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’, ‘মোমেনশাহী  উপাখ্যান’ লিখেছি, লিখেছি ‘পুনরুত্থান’।  পুরস্কার দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আমি সদ্য লিখেছি ‘ও আমার পছন্দপুর’। ফর্ম এবং বিষয়ে তা এই  ভারতবর্ষ।  লিখছি পার্টিশন  নভেল, লেখক হিসেবে দায় আছে লেখার।

২৭) ‘ও আমার পছন্দপুর’ লেখায় একটা বানিয়ে তোলা শহর কলকাতা আর একটা অরণ্য, পাহাড়, নদীর পছন্দপুর। সেই পছন্দপুরও মানুষই যেন ধ্বংস করতে উদ্যত। এমন আয়োজন তো বিশ্বজুড়েও। আপনার অনেক আগের লেখা ‘সোনাই ছিল নদীর নাম’-এও হারিয়ে যাওয়া নদীর কথা আছে। পছন্দপুর নিয়ে আপনি ব্যবহার করলেন কথোপকথনের নানা স্তর যেখানে ন্যারেশন ও সংলাপ মিশে গিয়ে ঘোর তৈরি করে। আগেও অনেক লেখাতে এমন আছে। এটা মনে হয় একান্তভাবে আপনারই সিগনেচার টিউন।

অমর মিত্র: কথোপকথন উপন্যাস বা গল্পে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেখানে লেখকেরসৃষ্ট চরিত্রদেরই প্রধান  ভূমিকা। তবে লেখকেরও তো নিজস্ব কিছু কথা থাকে যা তিনি সেই মুহূর্তে বলতে চান। সেই  কথাই ন্যারেশন হয়ে যুক্ত হয় কথোপকথনের সঙ্গে। এইভাবে লিখি। কোথাও তা কম কোথাও তা  বেশি, যেমন প্রয়োজন  হয়েছে তেমনি। লেখক কি লেখার আগে কতটা কী লিখবেন তা জানেন?  এই ধরনটি  তোমার পছন্দ হয়েছে জেনে খুশি। সিগনেচার টিউন কিনা তা পাঠক বলবেন, আমি  বলার কে ?

২৯) আপনি এবং আপনাদের সমসাময়িকদের মধ্যে অনেকেই সেই অর্থে বড় কাগজের পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। তবে সময়ের দিকে ফিরে তাকালে আপনাদেরই সেই সময়ের প্রধান লেখক বলা যায় এখন। কী মনে হয়?

অমর মিত্র: যা হয়েছে তাই-ই হত। এই-ই লিখতাম, কিন্তু তা সেখানে ছাপা যেত না। ছাপতেন না  তাঁরা। লেখার বিষয় এবং দর্শন এই ভবিতব্য গড়ে দিয়েছে।

৩০) আপনি তরুণ লেখকদের বন্ধু। তাদের পিঠ চাপড়ে দেন, বকাবকিও করেন। তারাও কি আপনাকে উৎসাহিত করে না?

অমর মিত্র: নিশ্চয়ই করেন। তাঁরা কত ভালো লেখা লেখেন। তা পড়ে এক একসময় মনে  হয় তাঁরা  আমাকে অতিক্রম করে গেলেন অমুক গল্পে। লেখায় মনোনিবেশ করতে হয় সেই সময়। তরুণ  লেখকদের দীপ্তির ছোঁয়া নিই, যেমন হোম যজ্ঞের পর প্রদীপ শিখার তাপ নেওয়া হয়, তেমনই অনেকটা।

৩১) এখন কী লিখছেন?

অমর মিত্র: পার্টিশন, এই ভারত, অখণ্ড ভারত, এই  বঙ্গ, অখণ্ড বঙ্গ নিয়ে একটি নভেল। মনে হয়  কথা আমার শেষ হয়নি।

৩২) ১৯৭১ থেকে ২০২১, আপনার লেখক জীবনের পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জীবনের কোন দর্শন ও বোধ আপনাকে এতটা পথ নিয়ে এসেছে?

অমর মিত্র: কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হয়, জীবনের শুরুতে তা বুঝে গিয়েছিলাম। কষ্ট করেছি খুব।  পরিবারও খুব কষ্ট করেছে। লিখে তো টাকা হয়নি তেমন। আমি এমন একগুঁয়ে তাই লিখতে  পেরেছি। শুরুতে বুঝে গিয়েছিলাম যা লিখতে চাই, সেই লেখার পথ বন্ধুর। যশ, অর্থ এসব  বহুদূর। দেড় লক্ষ শব্দের উপন্যাস ‘ধ্রুবপুত্র’ লেখার সময় জানতাম না কে ছাপবেন। পত্রিকা তো  ছাপেনি। ধারাবাহিক হয়নি। নিজের জেদ আমাকে এত পথ পার করেছে। যাঁরা আমাকে জীবন  চিনিয়েছেন, আমি তাঁদের কথা লিখি। এইটাই দর্শন। বোধ। সব।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>