মহুলগঞ্জের গুপ্তধন

ভবানীপ্রসাদ অনেকবার নিজের কুষ্টি যাচাই করে দেখেছেন।প্রতিবারই গোড়া থেকে নতুন করে হিসেব নিকেশ করে দেখেছেন।কিন্তু না, প্রতিবারই একই ফলাফল।বিত্তবান হওয়া তাঁর ভাগ্যে নেই।সবই ভাগ্য।নইলে ভবানীপ্রসাদের মত জ্যোতিষী এ শহরে কজন আছে,যারা তার মত এতো নির্ভুল ভাগ্যবিচার করতে পারে?কিন্তু ভবানীপ্রসাদ নিজের গুনের কদর পেলেন কই?বেনারসের বিখ্যাত জ্যোতিষাচার্য জ্যোতিষার্নব কিম্ভুতানন্দ স্বামী মহারাজের কাছে জ্যোতিষবিদ্যা শিখেছেন তিনি অনেক বছর।তারপরেও পসার না হওয়ার আর কি কারন থাকতে পারে,দুর্ভাগ্য ছাড়া?অমানিশা, ভাগ্যে তাঁর ঘোর অমানিশা।

যদুনাথ ঘোষাল মহুলগঞ্জ হাই স্কুলের অংকের মাষ্টার।অংকপাগল মানুষ।তিনি নাকি স্বপ্নের মধ্যেও কঠিন কঠিন ইয়া লম্বা সব অংক কষে ফেলে।রাস্তাঘাটে চলতে চলতে অংক কষেন বিড়বিড় করে।কতবার যে গাড়িঘোড়ার নিচে পড়ার থেকে বেঁচেছেন।সমস্যাটা হল,তাকে বাঁচাতে গিয়ে রাস্তায় আজ পর্যন্ত প্রায় সতেরোটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।চারজনের পা ভেঙেছে,দুজনের মাথা ফেঁটেছে।একজন তো পাক্কা চোদ্দদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে বাড়ি ফিরেছে ভাগ্যের জোরে।তাকে রাস্তায় দেখলেই আজকাল গাড়ি ঘোড়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পরে,তিনি রাস্তা পেড়িয়ে চলে না যাওয়া অব্ধি।কিন্তু যদুনাথ বাবুর কোনদিকে হুঁশ নেই।তিনি নিজের জগতেই থাকেন।

এ হেন যদুনাথ দু’ চোখে দেখতে পারেন না ভবানীপ্রসাদকে।ব্যাটা বুজরুক।জ্যোতিষ না ছাতার মাথা।যত্ত সব বুজরুকি। প্রথম প্রথম কিছুদিন মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন যদুনাথ মাষ্টার। কিন্তু কোন হিসেবের আগামাথা নেই।কোন অংক নেই।খুব বিরক্ত হয়ে জ্যোতিষের সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করেন।ভবানীপ্রসাদকে একদম পছন্দ করেন না।কিন্তু হলে কি হবে?যতই অপদার্থ হোক,লোকটা দাবা বড্ড ভালো খেলে।যদুনাথের আবার রোজ সন্ধ্যেবেলায় অন্ততো দুই দান দাবা না খেললে মাথাটা ঠিক খোলে না।রাতে স্বপ্নের মধ্যে অংকগুলো মিলতে চায় না।স্বপ্নের অংক না মিললে পরদিন মেজাজটা খিচড়ে থাকে।স্কুলে গিয়েও ছেলেদের অংকের বদলে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে নিজের স্বপ্নের অংক কষতে থাকেন।বারবার কষেন আর মোছেন।কখন ক্লাস শেষের ঘন্টা বাজে,আর কখন ছেলেরা ক্লাস ছেড়ে বেড়িয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দেয়,তিনি টেরও পান না।পিওন হারাধন দরজায় তালা লাগাতে এসে যদুনাথকে বাড়ি পাঠায়।

সেই কারণে ভবানীপ্রসাদকে যতই অপছন্দ হোক,রোজ সন্ধ্যেবেলায় তার সাথেই দাবা সাজিয়ে বসতে হয় যদুনাথ মাস্টারকে।কিন্তু আজ যেন ভবানীপ্রসাদ কিছুটা অন্যমনস্ক। বারবার সহজ দানে ভুল করছেন।এইরকম বালখিল্য চালে হারার মত খেলোয়াড় ভবানীপ্রসাদ নয়।বার দুয়েক জঘন্য দান খেলার পর অত্যন্ত বিরক্ত যদুনাথ মাষ্টার জিজ্ঞাসা করলেন,”বলি হলটা কি তোমার?এসব কি খেলা হচ্ছে?”
ভবানীপ্রসাদ একটু অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলেন,”তুমি ভূতে বিশ্বাস কর যদুনাথ?”
“ভূত?” যদুনাথ একটু চিন্তা করলেন।”তা যদি বল,ইনফিনিটিকে যদি জিরো থেকে ইনফাইনাইট এর লিমিটে…”
“ধুত্তোর নিকুচি করেছে তোমার ইনফিনিটি।তোমাকে কিছু বলাই ঝকমারি। “
“আহা চটছো কেন?কি হয়েছে সেটাই বলনা।”
ভবানীপ্রসাদ একটু চুপ করে রইলেন কিছুক্ষন।যেন মনে ভাবছেন বলা উচিৎ হবে কি না।তারপর সাত পাঁচ ভেবে বললেন,
“তোমাকে তো বলেছিলাম,আমার রেডিওটা কিছুদিন বেগরবাই করছিলো।তা,তোমার স্কুলের ফিজিক্সের মাষ্টার শচীনবাবুকে রাস্তায় দেখা হতে বললাম।বললো,আমি ঠিক করে দেবো মশাই। কোন চিন্তা নেই।আমিও ছাই বিশ্বাস করে নিজে যেঁচে দিয়ে এলাম ওনার বাড়িতে।পরদিন আমায় ফেরত দিয়ে বললো,ও আর ঠিক হবে না।এক্কেবারে গেছে।উনি কলকব্জা খুলে কী যে নাড়াচাড়া করেছেন কে জানে,আগে যেটুকু বা শোনা যেত,তাও আর যাচ্ছে না।”
যদুনাথ এবার বললেন,”তা এর মধ্যে ভূত কোত্থেকে এলো?”
ভভবানীপ্রসাদ খুব বিরক্ত হয়ে বললেন,”আহ্,তোমার সবটাতেই তাড়াহুড়ো।পুরো ঘটনাটা তো বলতে দেবে,নাকি?হ্যাঁ,তারপর শোনো।সেদিন সন্ধ্যায় হারু গোয়ালা এলো।এসেই বললো,ওর কেলে গাইটার খোঁজ মিলছে না।সকালে চড়তে বেরিয়েছিল।রোজ নিজেই বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে।আজ ফেরেনি।অনেক খোঁজাখুঁজি করে আমার কাছে এসেছে।বলল,গুনে বলে দিন কোথায় আছে।কি আর বলি।বললাম,একটু সময় লাগবে গুনতে।তা সে বলল,আপনি গুনুন।আমি বাড়ি থেকে ঘুরে আসি চট করে।সে তো গেল।আমি খাতা কলম নিয়ে বসলাম।যতই আঁক কষি, বজ্জাত গরু বারবার ফাঁকি দিয়ে পালায়।একবার দক্ষিনের মাঠে তো আরেকবার উত্তরের মানকেদের আমবাগানে দেখা পাই তার।কি করি ভাবছি।ঘরের তাকে রেডিওটা চালু ছিল।এতক্ষন শুধু ঝিঁঝিঁর ডাকের মত শব্দ হচ্ছিল।হঠাৎ মনে হল স্টেশন বদলের মত নানারকম শব্দ আসছে নিজে থেকেই।তারপর হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।রেডিওর ভেতর থেকে মোটা গলায় কেউ বললো,’হতভাগা হারুটাকে বল,ওর ছেলে জুয়ায় হেরে রেমো গোয়ালার ছেলেকে দিয়ে এসেছে গরু।গিয়ে ছাড়িয়ে আনতে।’আমার তো ভয়ে হাত পা থরথরিয়ে কাঁপছে।হারু আসতে বললাম ওকে।তখনো জানিনা সত্যি কি মিথ্যা।পরদিন সকালে হারু এসে দক্ষিনা দিয়ে প্রণাম করে গেল।গরু ফিরে পেয়েছে।রামুর বাড়িতেই ছিলো।”

এই অবধি বলে ভবানীপ্রসাদ চুপ করে গেলেন।যদুনাথ অট্টঠাস্য করে উঠলেন।”তাহলে তো তোমার ভাগ্য খুলে গেলো হে।রেডিও ভূত তোমার সাথে আছে,আর ভাবনা কি?”
ভবানীপ্রসাদ খিঁচিয়ে উঠলেন,”থামো তো বাপু।আমার প্রাণ যাচ্ছে,আর উনি ইয়ারকি কচ্ছেন।”
“কেন,কি হল আবার?”
“হল আর কি?হবে।আমার মরন।ঐ রেডিওভূতের হাতেই মরন আছে আমার।” বলে ভবানীপ্রসাদ ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে দুবার নাক টেনে ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছে বলতে থাকেনল,
“বেশ চলছিলো সপ্তাহখানেক।তোমায় বলবো বলবো করেও বলিনি।তুমি যা মানুষ।বিশ্বাস করবে না।ভূতটুত নিয়ে ইয়ারকি ফাজলামো ভালো জিনিস নয়।বললে বিশ্বাস করবে না,এক সপ্তাহের মধ্যে আমার ব্যবসার পসারও বেশ চড়চড়িয়ে বারছিলো।ভূতের সব ভবিষ্যতবাণী টকটক করে ফলে যাচ্ছিলো বেশ।কিন্তু ঐ যে,আমার কপাল,জানি তো সুখ সইবে না বেশীদিন।কাল তোমার এখান থেকে যাবার পর রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে রেডিওটা চালিয়ে বসলাম।দু একটা বিধান জেনে নেওয়ার ছিলো।কিছুক্ষন ঐ ঝিঁঝিঁ ডাকের পর তেনার সাড়া পাওয়া গেলো।”
“তারপর?”
“রেডিওভূত বললো,’তোর কাজ তো অনেক হল।এবার তোকে আমার কাজ করতে হবে রে হতভাগা।’ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,কি কাজ?”
” কি কাজ?” যদুনাথ আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করলেন।
“শোন তবে।” ভবানীপ্রসাদ ঢোক গিলে বললেন,”গুপ্তধন উদ্ধার করতে হবে।মুখুজ্জেদের গুপ্তধন।ইনি নাকি হরিহর মুখুজ্জের প্রপিতামহ।বৃদ্ধ বয়সে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচতে পাঁচ ঘড়া মোহর লুকিয়ে রেখেছিলেন।সেগুলো খুঁজে তুলে দিতে হবে হরিহর মুখুজ্জের বিধবা মেয়ে আর নাতিটার হাতে।”

মুখুজ্জেরা একসময় এই মহুলগঞ্জ,নবগ্রাম আর শিমুলতলা মিলে তিনগ্রামের জমিদার ছিলেন।বিরাট ধনী।তিনগ্রাম মিলিয়ে একটাই দূর্গাপুজো হত,সেটা জমিদার বাড়িতে।সে কি ধুমধাম,কত আলো,বাজি।কলকাতা থেকে যাত্রাদল আসতো।এখন সেই রামও নেই,সেই অযোধ্যাও নেই।হরিহর মুখুজ্যের একমাত্র ছেলেটা মারা গেল মাত্র দুদিনের জ্বরে।বংশে বাতি দেবার আর কেউ রইল না।মুখুজ্জেরা দান ধ্যান,আমোদ প্রমোদে দু হাতে টাকা উড়িয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব।শুধু বাড়িটা আছে থাকার মধ্যে।বুড়ো হরিহর মুখুজ্জে শয্যাশায়ী। যমরাজ মাথার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায় অনেকদিন।শুধু বিধবা মেয়ে আর নাতিটার কথা ভেবে শেষ নিঃশ্বাসটা পড়বো পড়বো করেও পড়ছে না।নাতিটা নাকি লেখাপড়ায় খুব মাথা।বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরার সুযোগ এসেছিলো।টাকার অভাবে যেতে পারেনি।এই মুখুজ্জেদের দয়ায় একসময় গ্রামের কত ছেলে লেখাপড়া করেছে, শহরে গিয়েছে,আজ তাদের নিজেদেরই এই দশা।

যদুনাথ বললেন,”তা অসুবিধা কি,খুঁজে দাও ওদের গুপ্তধন। “
খেঁকিয়ে উঠলো ভবানীপ্রসাদ, “আহা রে,খুঁজে দাও ওদের গুপ্তধন। গুপ্তধন ছেলের হাতের মোয়া তো?খুঁজে দাও বললেই হল।বুড়ো ভূত,নিজেই ভুলে বসে আছে কোথায় লুকিয়েছিলো।উফ্।আমি কি বিপদে পড়লাম।”

যদুনাথ মাথায় হাত দিয়ে বলল,”যাহ,তাহলে?”
“তাহলে আর কি।আমার মাথা আর মুন্ডু।বুড়ো বলছে একটা উপায় আছে।মুখুজ্জে বাড়ির দক্ষিনের ঘরের কুলুঙ্গিতে একটা খেরোর খাতা আছে।ওতে নাকি আছে গুপ্তধনের সংকেত।সেটা পেতে হলে ওই বাড়িতে ঢুকে খাতা বার করে আনতে হবে,যদি সেই খাতা এখনো অক্ষত থাকে।তারপর সেখান থেকে সংকেত উদ্ধার করতে হবে।ও মা গো।আমার কি হবে?উফ্ কেন যে মরতে শচীন মাষ্টারকে রেডিওটা দিয়েছিলাম?”
“আহ্,বন্ধ কর তো তোমার নাঁকি কান্না।আমায় একটু ভাবতে দাও।”

পরদিন বিকেলবেলায় পুটিরামের দোকান থেকে এক সের ক্ষীরদই আর বাজার থেকে এক ঝুরি ফল কিনে ভবানীপ্রসাদ আর যদুনাথ গিয়ে হাজির হল জমিদার বাড়িতে।এককালে প্রাসাদই ছিল বটে,এখন অন্ধকার ভূতের বাড়ি ঝোপঝাড় জঙ্গলের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।পূবের দিকটা ভেঙে চুড়ে কবেই ধ্বসে পড়েছে।হরিহর মুখুজ্জের মেয়ে বিমলি দিদির থেকে ছোটবেলায় অনেক নাড়ুটা,মোয়াটা খেয়েছে তারা।কতদিন হল এদিকে আর আসাই হয়নি।আজ এতদিন পর এই বাড়িতে পা দিয়ে কত স্মৃতি মনে পরে গেল।মনটা হুহু করে উঠলো দুজনেরই।বিজয়ার পর বা লক্ষ্মী পূজায় এবাড়ির নাড়ু,লাড্ডুর লোভে তারা সব দল বেঁধে ভীর করতো।রানিমা আর বিমলি দিদি কত আদর করে খাওয়াতেন তাদের।আজ সেই মুখুজ্জেবাড়ির এই দশা।অথচ গ্রামে থেকেও তারা কতদিন এ মুখো হয়নি,খবরটাও নেয়নি।

বিমলিদিদি কিন্তু একবারেই চিনতে পারলেন তাদের।”কে রে,যদু আর ভবা না?আয় আয়।”যদুনাথ গলা খাকাড়ি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,”কেমন আছ বিমলি দি?”
বিমলি দি আগের মতই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন।”ওমা,শোন কথা।কেমন আবার থাকবো।এই তো দিব্যি আছি।তোরা বাবার কাছে ব’স।আমি চা আনি।দুধ নেই কিন্তু। আমরা কেউ দুধ চা খাইনা তো।অম্বল হয়।তাই আনা হয়না।তোরা ব’স।আমি আসছি।”

হরিহর মুখুজ্জে বিছানায় চোখ বুঁজে শুয়ে।ঘুমিয়ে আছে,না জেগে বোঝার উপায় নেই।ওরা বিমলি দির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করে।তারপর যদুনাথ চুপিসারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দক্ষিনের দিকে এগিয়ে এগিয়ে যান।এ বাড়ি তার মোটামুটি চেনা।দক্ষিনের ঘর খুঁজে পেতে অসুবিধে হবার কথা নয়।কিন্তু খাতাটা এতদিন পরে কি আর পাওয়া যাবে?দেখা যাক।

সন্ধ্যে লেগে গেছে।অন্ধকার নেমেছে।ঘরের এক কোনে টিমটিম করে একটা হেরিক্যান জ্বলছে।ঘরে বসে ভবানীপ্রসাদের বুকের ভেতর যেন দুরমুশ পিটছে।এখনো এলোনা যদুনাথ।বিমলি দি যেকোন সময় ঘরে আসবেন চা নিয়ে।যদি ধরা পরে যায়।যদি খাতা খুঁজে না পায়।ভবানীপ্রসাদ বারবার ডান হাত কপালে ঠেকান।এমন সময় বিমলি দি চা নিয়ে ঘরে ঢোকেন।
“ওমা,তুই একা কেন? যদুটা গেলো কোথায়?”
“ও?ও মানে,এই তো,এখানেই,মানে…”
“কি মানে মানে করছ হে?এই যে দিদি,একটু এদিকটা ঘুরে দেখছিলাম।অনেকদিন পর এলাম তো।” বলতে বলতে যদুনাথ ঘরে ঢোকে।ভবানীপ্রসাদের দিকে চোখ টিপে ইশারা করে।

মুখুজ্জে বাড়ি থেকে বেড়িয়েই ভবানীপ্রসাদ জিজ্ঞাসা করে,”খাতাটা পেলে?”
যদুনাথ গলা নামিয়ে ফিশফিশ করে বলে,” কোন কথা নয় এখানে।আগে বাড়ি চল।”

বাড়ি ফিরে যদুনাথ ধুতির কোঁচা থেকে একটা প্রায় ঝুরঝুরে খেরোর খাতা বার করে আনলো।দুজনের চোখে মুখেই তখন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ।ঘরে আলো জ্বালিয়ে খাতা খুলে বসলো দুজন মিলে।কিন্তু একি।পাতাগুলো জায়গায় জায়গায় ইঁদুরে খাওয়া।পুরোন হলুদ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলো ওল্টাতে গেলেই ভেঙে যাচ্ছে।খাতা ভর্তি ঠাসা অংক।প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা অব্ধি।গুপ্তধনের হদিশ কোথায়?ভবানীপ্রসাদ হতাশ হয়ে বসে পরে বিছানার উপরে।সেই সময় যদুনাথের মুখের দিকে চাইলে দেখতে পেতো,সেখানে হাজার ওয়াটের আলো জ্বলছে।

ভবানীপ্রসাদ হতাশ হয়ে বিদায় নেয়।বাড়ি গিয়ে রেডিও চালিয়ে বসবে।ভূত যদি কিছু কূলকিনারা দেখাতে পারে।যদুনাথ আজ আর রান্না খাওয়ার ঝামেলায় যাবেনা।বিমলি দি চা মিষ্টি খাইয়েছে।আজ রাত কেটে যাবে।গুপ্তধনের সংকেত কি না যদুনাথ জানে না,কিন্তু এই খাতা নিজে কোন গুপ্তধনের চেয়ে কম নয়।ছেঁড়া পোকায় খাওয়া পৃষ্ঠাগুলো একেকটা শূন্যস্থান। সেগুলো পূরণ করতে পারাটার মধ্যে যে কি আনন্দ,সেটা তার মত অংকপাগল লোক ছাড়া আর কে বুঝবে?সারারাত যদুনাথ দুচোখের পাতা এক করতে পারেনা।খাতার পাতা ধরে যত এগোন,বিস্ময়ে নিশ্বাস ফেলতে ভুলে যান।এইসব জটিল অংক মহুলগঞ্জে বসে একটা মানুষ প্রায় একশো বছর আগে করে গেছেন।কি অসাধারণ প্রতিভা।ভাবা যায় না।যদুনাথের তাক লেগে যায়।যদুনাথ ঘরের তাক থেকে নামিয়ে আনেক জটিল সব গণিতের বই,বিদেশী গণিত জার্নাল।নাওয়া খাওয়া ভুলে ডুবে যান অংকের সমুদ্রে।প্রতিটা পাতা যেন সোনার খনি।

পাক্কা তিন রাত তিন দিন পর যদুনাথ মাষ্টার দরজা খুলে ঘর থেকে বার হন।সূর্যের মুখ দেখেন।একটু পোস্ট আপিসে যেতে হবে।তার আগে একবার মুখুজ্জেবাড়িতে ঢুঁ মেরে যাবেন।কাজ সেরে বাড়ি ফিরে দেখেন ভবানীপ্রসাদ বসে আছেন বারান্দায়।তিন দিনে চোখমুখ বসে গেছে যেন।বললেন,সেদিন এখান থেকে যাবার পর থেকে সেই রাত থেকে আমাশা।বাম হাতের জল শুকোচ্ছিলো না।কাল রাত থেকে ভাল আছেন এখন।আর রেডিওটা পুরোপুরি দেহ রেখেছে।রেডিওভূত বিদায় নিয়েছেন।
“গুপ্তধন পেলে,যদুনাথ? “
“গুপ্তধন?”যদুনাথ হাসে।” গুপ্তধন ভাবলে গুপ্তধন। না ভাবলে কানাকড়ি। “
“কি হেঁয়ালি করছো?খুলে বলো।”
“কোন মোহর নেই হে ভবানী। “ভবানীপ্রসাদ হতাশ মুখে বারান্দায় বসে পড়ে।
যদুনাথ তাড়া দেয়।”আরে বসলে কেনো আবার এখানে?চল চল।ঘরে চল।

দুমাস কেটে গেছে। আজ সকালে যদুনাথমাষ্টার সদর দরজায় তালা লাগিয়ে স্কুলে বেরোতে যাবেন,ক্রিং ক্রিং সাইকেলের বেল বাজিয়ে ডাকপিওন তার দরজায় এসে থামলো।চিঠি আছে।হাত বারিয়ে চিঠিটা নিয়ে যদুনাথের হাত কাঁপতে লাগলো।বড় খয়েরী লেফাফার উপর বিদেশী স্ট্যাম্প মারা।বেশ ভারি।খামটা খুলে একঝলক দেখেই ছুটলেন ভবানীপ্রসাদের বাড়ি।ভবানী বাড়িতেই ছিলেন ভাগ্যিস।
“শিগ্যিরি চল।মুখুজ্জেবাড়ি যেতে হবে।”
ভবানীপ্রসাদ অবাক হন।
“এখন?কেন?আরে কি হয়েছে বলবে তো?”
“এখন অ্যাতো কথা বলার,বোঝানোর মত সময় নেই।তাড়াতাড়ি চল।” যদুনাথ দৌড় লাগান প্রায়।
মুখুজ্জে বাড়ির গেটেই বিমানের সাথে দেখা।বিমান বিমলিদির ছেলে।যদুনাথ তখন রীতিমতো হাফাচ্ছেন।
“আরে স্যার,আপনি? কি ব্যাপার?শরীর ঠিক আছে তো?চলুন, ঘরে চলুন।”

যদুনাথ তার মাথায় হাত রাখেন।খামটা বাড়িয়ে দেন তার দিকে।
“এই নাও বাবা।তোমার প্রপিতামহের রেখে যাওয়া গুপ্তধন। “
“গুপ্তচর? “
ভবানীপ্রসাদ ও বিমান একসাথে বলে ওঠে।যদুনাথ হেসে বলেন,”গুপ্তধনই বটে।যদিও কোন আর্থিক মূল্যই এই ধনের যথেষ্ট মূল্য নয়,তবু এটুকু স্বান্ত্বনা,আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে তোমার পূর্বপুরুষের সম্পত্তি সঠিক হাতে গিয়েছে,যারা এর প্রকৃত মূল্য বুঝবে।”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।” ভবানীপ্রসাদ অবাক গলায় বলেন।
“আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।বিমান আশা করি তুমি বুঝেছো।চল ঘরে বসি।”
ঘরে গুছিয়ে বসে যদুনাথ বলতে শুরু করেন,” খাতাটা প্রথম কয়েক পৃষ্টা দেখেই বুঝেছিলাম,খাতাটা যে সে খাতা নয়।সোনার খনি।সে খাতা তোমায় দেখিয়েছি বিমান।তুমিও বিজ্ঞানের ছাত্র।নিশ্চয়ই মূল্য বুঝেছো ঐ খাতার।তিনদিন তিনরাত ধরে ওই খাতার নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশগুলি উদ্ধার করি আমি।তারপর বিমানের সম্মতিক্রমে এটা পাঠিয়েছিলাম বিদেশের এক বিখ্যাত নিলামঘরে।জানতাম সেই মূহুর্তে টাকাটা ওদের খুব দরকার।মন থেকে শান্তি পাচ্ছিলাম না তবু।এত মূল্যবান একটা জিনিস কোন ধনী ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের কাছে পরে থাকবে, মন থেকে মানতে পারছিলাম না।আজ খবর এসেছে,একটি পৃথিবীবিখ্যাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গণিত সংগ্রহশালার জন্য বহুমূল্যে কিনে নিয়েছে সেই খাতা।বহু উজ্জ্বল ছাত্রের কাজে আসবে ভবিষ্যতে।”

যদুনাথের দু’চোখে জলের ধারা গড়িয়ে পরে,যেন নিজের সন্তানকে সহস্তে অন্য কারো হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি।বিমান ও ভবানীপ্রসাদ তাকে জড়িয়ে ধরে।

এক সপ্তাহ পরে এক ছুটির সকালে বিমান যদুনাথ মাষ্টারের বাড়িতে আসে।ভবানীপ্রসাদও সেখানেই উপস্থিত ছিল।বাইরে রিকশায় একটা বড় সুটকেস।সেটা হাতে করে নামিয়ে আনে বিমান।যদুনাথের পায়ের কাছে রেখে বলে,এর ভেতর কিছু বই আছে।আমাদের বংশের পূর্বপুরুষদের সংগ্রহ। বেশিরভাগই আমার প্রপিতামহের।এগুলোর মূল্য আপনিই বুঝবেন।এগুলো মা আপনার জন্য পাঠালেন।আর একটা ব্যাগ ভবানীপ্রসাদের দিকে এগিয়ে বললো,এতে একটা নতুন রেডিও আছে,আপনার জন্য।বিমান দুজনকে প্রণাম করে।জানায় সে পড়তে যাচ্ছে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদুনাথ ও ভবানীপ্রসাদ তাকে সর্বান্তকরণে আশীর্বাদ করেন।সকালটা সুন্দর হয়ে যায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত