মনিপুরী নৃত্য

কনিকা চক্রবর্তী 

মণিপুরী সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম দিক হলো মণিপুরী নৃত্য যা ভারতবর্ষের অন্যান্য শাস্ত্রিয় নৃত্যধারা যেমন কত্থক, ভরতনট্যম, কথাকলি ইত্যাদির সমপর্যায়ের।মণিপুরী নৃত্যকলা তার কোমলতা, আঙ্গিক, রুচিশীল ভঙ্গিমা ও সৌন্দর্য দিয়ে জয় করেছে ভারতর্ষের অসংখ্য দর্শকের মন। স্বতন্ত্রতা নিয়ে মণিপুরী নৃত্য বিশ্ব দরবারে পেয়েছে গৌরবময় স্থান।

ভাষাগত এবং ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের মণিপুরীরা তিনটি শাখায় বিভক্ত এবং স্থানীয়ভাবে তারা (১) বিষ্ণুপ্রিয়া, (২) মৈতৈ ও (৩) পাঙন নামে পরিচিত। ১৯১৯ সনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী গ্রাম মাছিমপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের পরিবেশিত রাসনৃত্য দেখে বিমোহিত হন এবং শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য প্রবর্তন করেন। বিশ্বময় মণিপুরী নৃত্যের এই প্রচার, প্রসার ও সুখ্যাতি পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সিলেট জেলার নিভৃত পল্লী মাছিমপুরের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী রমণীদের অসামান্য ও অনবদ্য ভূমিকা। ১৯২০ সনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন সিলেট জেলার কমলগঞ্জ থানার বালিগাঁও প্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জী, ত্রিপুরা থেকে গুরু বুদ্ধিমন্ত সিংহ এবং আসামের গুরু সেনারিক সিংহ রাজকুমারকে শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য প্রশিক্ষক হিসাবে নিয়ে যান।

গৌরবমন্ডিত এই মনিপুরী নৃত্যের রয়েছে এক পৌরাণিক উপকথা। জনশ্রুতি রয়েছে মহাদেব (হিন্দু পৌরাণিক দেবতা) শ্রীকৃষ্ণ -রাঁধার রাসলীলা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে, কৃষ্ণ তাকে রাসলীলাস্থলের দ্বার রক্ষক হয়ে এই লীলা উপভোগের অনুমতি দেন। মোহিত মহাদেবকে ফাঁকি দিয়ে, পার্বতী এই লীলা উপভোগ করেন এবং পরবর্তীতে নিজেদের জন্য একটি রাসলীলার আয়োজন করার জন্য মহাদেবের কাছে আবদার করেন। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছিলো না উপযুক্ত স্থান। অবশেষে মনিপুর রাজ্য নির্বাচিত হলো। বিভিন্ন দেবতার সাহায্য নিয়ে স্থানটিকে রাসলীলার উপযুক্ত বানানো হলো। এই স্থানে সাতদিন সাতরাত শিব-পার্বতীর রাসলীলা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গীত সহযোগী ছিলেন গন্ধর্ব এবং অন্যান্য দেবতারা। রাত্রিবেলার অনুষ্ঠানের জন্য নাগরাজ অনন্তদেব তার মাথার মণি দান করেন। নাগদেবের মণির নামানুসারে এই স্থানের নাম হয় মণিপুর। কথিত আছে, রাসলীলা শেষে দেবতারা মণিপুরকে একটি জনপদের মর্যাদা দেন এবং এই অঞ্চলের প্রথম রাজা হন অনন্তদেব। এই থেকে মণিপুরে নৃত্যগীতের সূচনা হয়।

(লোককথা অনুসারে কৃষ্ণের রাসলীলা থেকে আসে মনিপুরী রাস নৃত্য)

এই কাহিনী অনুসারে মনে হয়, রাসলীলা বা রাস নৃত্য মণিপুরের আদি নৃত্য কিন্তু রাসনৃত্যের পূর্ণ রূপ পাওয়ার আগেই আরও কিছু নৃত্যগীতের সন্ধান পাওয়া যায়। এসকল নৃত্যের সাথেও মণিপুরের লোকগাঁথা জড়িয়ে আছে। কালক্রমে এই সব লোক উপাখ্যানগুলোও মণিপুরী নাচের মতই চিরায়ত কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এরূপ একটি উপখ্যান থেকে সৃষ্টি হয়েছে লাইহারাউবা নৃত্য। রাজা পামহৈবার আমলে অনেক গ্রন্থাদি ও নিদর্শন ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে মণিপুরের ইতিহাসও ধ্বংস হয়ে যায়। যার ফলে সঠিক ইতিহাস জানা কিছুটা কঠিন।

১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজা চিঙ্‌থাঙ খম্বা বা ভাগ্যচন্দ্র সিংহের শাসনামলে মণিপুরের নৃত্যগীতের চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছায়। তারই চেষ্টায় মণিপুরে রাসনৃত্যের প্রবর্তন হয়। রাসনৃত্য বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গোবিন্দ সঙ্গীত লীলাবিলাস’-কে রাসনৃত্যের আদি পুস্তক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গ্রন্থানুসারে রাসনৃত্যকে ৫টি পর্যায়ে ভাগ করেন। এই ভাগগুলো হলো− মহারাসক, মঞ্জুরাসক, নিত্যরাসক, নির্বেশরাসক ও গোপরাসক। বর্তমানে এই রাসকগুলো মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপরাস বা গোষ্ঠরাস এবং উলুখল রাস নামে পরিচিত। রাজ ভাগ্যচন্দ্রের পৌত্র চন্দ্রকীর্তি সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর সময়ে রাসনৃত্য আরও সমৃদ্ধতর হয়ে উঠে। তিনি প্রথম নর্তনরাসের প্রবর্তন করেন।

মণিপুরী নৃত্যে তালযন্ত্র একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এর ভিতরে আনদ্ধ যন্ত্র হলো- পুঙ, ইয়াবুঙ, হারাপুঙ, তানইবুঙ, নাগনা, খোল, ঢোলক, দফত, খঞ্জরী, পাখোয়াজ ও ঢোল। ঘনবাদ্যের ভিতরে আছে সেমবুঙ, ঝালারি, মঙগঙ, জাল, করতাল, রমতাল ইত্যাদি। তত যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে পেনা, এস্রাজ, তানপুরা। সুষি-যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে বাঁশি, ময়বুঙ, পেরে ও খঙ।

(বাদ্যযন্ত্রের বিভিন্নতা মনিপুরী নৃত্যকে দেয় ভিন্নমাত্রা)

মণিপুরী নৃত্যে নানাবিধ তাল এবং তার লয়ের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য তালগুলো হলো তাণ্চেপ, মেনকুপ, রূপক, দশকোশ, তিনতাল দশকোশ, তিনতাল মাচা, তেবড়া, রাজমেল, দুতাল, অছুবা, যাত্রা রূপক, তিনতাল অছৌবা, তিনতাল মেল, ভঙ্গদাস, গাজন, মদন, মৈতৈ, সুরফাঁক, ঝাঁপ, রাস, চারতাল। চার মাত্রা থেকে আটষট্টি মাত্রা পর্যন্ত বিভিন্ন ভাগে অলঙ্কার পুংলোন বা প্রস্তর ছন্দিত হয়। অনেক সময় দুই বা ততোধিক তালের সমন্বয়ে এবং নৃত্যালঙ্কার প্রয়োগে তাল প্রবন্ধ ও নৃত্য প্রবন্ধ গঠিত হয়।

কথিত আছে, রাজ ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে রাসনৃত্যের পোশাকের নির্দেশ পেয়েছিলেন। এই পোশাকের অন্যতম হলো জড়ি জড়ানো মাথার চূড়া। মুখের উপর পাতলা জালের মতো সাদা কাপড়ের আবরণ। একে বলা হয় মাইখুম। ঘন সবুজ ভেলভেটের ব্লাউজ বা রেশমী ফিরুৎ। চুমকি খচিত সবুজ শার্টিনের পেটিকোট। পোশাকের নিম্নভাগে পিতলের তবকমোড়া বিভিন্ন গোলাকার আয়না সমান্তরালভাবে বাসন থাকে। নিম্নভাগে কাপড়ের ভিতর বেত দিয়ে শক্ত করা থাকে। এই পোশাককে কুমিন বলা হয়। উপরের দিকে থাকে রুপোলি কাজ করা আয়না বসানো সাদা স্বচ্ছ ঘাঘরা। এই ঘাঘরাকে বলা হয় পেশোয়ান। কাঁধের উপর থাকে পাশে ঝোলানো কাপড়। একে বলা হয় খাওন। এর নিম্নভাগে থাকে সোনালী ও রূপালী কাজ করা। অর্ধচন্দ্রাকর, গোল চৌকা কাঁচ বসানো মখমলের বেল্ট ব্যবহৃত হয়। একে বলা হয় খানপ।

(মনিপুরী নাচের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট পোষাক)

এই নাচের সময় তাল, তানথাক, তাংখা, রতনচূড়, অনন্ত, সেনাখুজি, খুড়পা, কুণ্ডলীন, পারেঙ, ঝাপা ইত্যাদি অলঙ্কার থাকে। লাইহারবা নৃত্যে ফনেক নামক পোশাক ব্যবহার করা হয়। ফনেক-এর পাড়ে পদ্মফুল, ও মৌমাছির নকশা থাকে। ফনেকের মাঝখানে লাল ও কালো রঙের সারি থাকে। এর ভিতরে কাল রাত্রির এবং লাল প্রভাতের প্রতীক।

মনিপুরী নৃত্যের স্বকীয়তা এর নিজস্ব ভঙ্গিমা। যুগ যুগ ধরে সগৌরবে বিশ্ব সংস্কৃতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মনিপুরী নৃত্য ।

সূত্রঃ ভারতের নৃত্যকলা (গায়ত্রী বসু), বাংলা পিডিয়া, উইকিপিডিয়া।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত