কার্তিকী সন্ধ্যার গল্প

বাউড়ি পাড়া ছাড়িয়ে মাঠের মাঝখান দিয়ে সিঁথির মত ছাগলচরা পথ। দুপাশে ছোট ছোট জোত। কার্তিকেই কিছু জমির ধান বেশ পেকে গেছে। ধানের মাঠ ফেলে খানিক গিয়েই জঙ্গলে ঘেরা ভাতপুকুর শ্মশান। এপথেই চলেছি। সামনে গড়গড়ি ঘাসের উঁচু উঁচু ঝোপ, ঘেঁটু, ভ্যারেণ্ডার ঘন অন্ধকার ফুঁড়ে বিরাট এক শিমুল গাছ নিশানের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে দিনমানেই কেউ আসেনা বড় একটা, আর এখন তো প্রায় সন্ধ্যালগ্ন বেলা! জঙ্গলের ভিতরে খসখস শব্দে শিয়াল সরে গেল। সতর্ক হলাম। শিয়ালের কামড় বড় বিপজ্জনক!
শ্মশানে এলেই মনে পড়ে, বহুদিন আগে এখানে একজন তান্ত্রিক সাধক থাকত। তখন আমি একদমই কিশোর। তার কপালে সিঁদুরের বিরাট রক্ত তিলক, চুল দাড়িতে ভরাট কালো গম্ভীর মুখ। তাকে দেখে ভয় পেত গাঁয়ের লোক । সে গভীর রাত্রে গ্রামের ভেতর দিয়ে রামপ্রসাদী গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়াত, আর মাঝে মাঝে বিকট শব্দে, মা মাগো, বলে চিৎকার করে উঠত। ছোটবেলায় শ্মশানে দু একবার বন্ধু বিলাসের সঙ্গে গিয়ে দেখেছি আধপোড়া হাড়গোড়ের স্তুপে সেই সাধক কী সব খুঁজে বের করে আনছে, আর সামনের মাটির মন্দিরে দন্ডায়মান ভয়ঙ্করী কালীপ্রতিমার কাছে গিয়ে মাতৃসম্মোধনে ডেকে উঠছে। সে মারা গেছে অনেকদিন হল। এখন নতুন সাধক ষষ্ঠী, তার খোঁজেই এসেছি। কার্তিকী অমাবশ্যায় তার সাথে খানিক গল্পগুজব করতেই এখানে আসি প্রত্যেক বছর। এবারও এলাম। শ্মশান নিষ্প্রদীপ দেখে আশ্চর্য লাগল। এমন তো হবার কথা নয়। আজ ঘোর অমাবস্যাতিথি,শক্তিময়ীর মহাপুজো। এই দিনে কেবল মন্দিরের ভেতরেই আলো জ্বলছে! 
মন্দিরে ঢুকে দেখলাম ষষ্ঠী কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে মৃদু হেসে বলল, এস ভাগনা এস আমার কী সৌভাগ্যি, জানতাম তুমি আসবে! সে উঠে বসার চেষ্টা করল, আমি বাধা দিয়ে গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, প্রচন্ড জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। কী দেখলে ভাগনা খই হয়ে যাবে নয়, এ শালার বেটি আজই কৃপা করল দেখ ব্যপার ! তা বেশ করেচিস মা, ভাল করেচিস। তোকে আজ আর আলো দেবনা যা… হে হে হে! কথাগুলো একনাগাড়ে বলে ষষ্ঠী হাঁপাতে লাগল। তারপর ফের আমার দিকে ফিরে বলল, তা ভাগনা সব খবর ভাল তো? আমি বললাম, হ্যাঁ ভাল আছি, কিন্তু তুমি ডাক্তার দেখাওনি নিশ্চই মহারাজ,সত্যি বল! গত বছরও তোমার অসুখ দেখে গেলাম, এখনও দেখছি তাই। তোমার কি বাঁচার ইচ্ছা নেই !
বাঁচা মরা কি আমার হাতে ভাগনা, অইযে পাগলী রয়েছে, সেই তো মালিক গো! এবার নলডাকার দিনে সন্ধিলগ্নে একটা  শিয়াল ডেকে মরল, আর আমি জ্বরে পড়লাম। আমি অবাক হয়ে বললাম, নলডাকা, সেটা আবার কী, শুনিনি তো আগে ! সে বলল, কার্তিক সংক্রান্তির সন্ধি সময় গো, এসময় ফসলের বাড়বৃদ্ধি হয়। তখন যে শিয়াল ডাকবে সে মরবে! বুঝলাম এটা এক ধরণের লোকাচার। সারা বাঙলায় যে কত লোকাচার আছে তার ঠিক নেই। কিন্তু ষষ্টির জ্বরে পড়ার সঙ্গে শিয়াল মরার নলডাকার সম্পর্ক কী তা বোধগম্য হলনা।
এবার কোনোরকমে সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে উঠে বসে কালীমূর্তিকে প্রণাম করল। আমি বললাম, বেশ তো শুয়ে ছিলে আবার উঠতে গেলে কেন? না ভাগনা তিনসন্ধে বেলা শুয়ে থাকা ঠিক নয়। তারপর আজ আবার বিশেষ তিথি। আমি আগেই উঠতাম, কিন্তু বউটা গেছে শ্বশুর বাড়িতে, কিছু চাল আনতে। দিনমণি যে চলে গেইছেন বুঝতে পারিনি গো! যাইহোক বুঝলে ভাগনা, আজ দশ দিন ঠায় বসে খেলাম। বর্ধমানে একবাড়িতে রঙের কাজ করে কিছু টাকা হয়েছিল। সে টাকা সব শেষ। তা তুমি তো চোত মাসে শ্মশানকালীর পুজোয় এলেনা ভাগনে। কি ধুম কি ধুম যদি দেখতে। কত কষ্ট করে আয়োজন করি…
সে আবার নিঃশ্বাস নিল তারপর আবার বলল,এক কবিরাজের সন্ধান পেয়েচি জানলে, সে বলেচে আমার জ্বর আর থাকবেনা। দেখা যাক মায়ের ইচ্ছায় কী হয়! আমি জানতে চাইলাম, কোথাকার কবিরাজ। সে বলল তারাপীঠের কোথায় যেন থাকে, পয়সা নেয়না। 
কী আর বলব অতি দরিদ্র এই ভক্ত সাধক, দিন তার এভাবেই কেটে যায়। অসুখের চিকিৎসা করাবার পয়সা তার নেই। একবছরের বেশী সময় সে ভুগছে। হাতুড়ে ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে কখনো হয়তো ভাল থেকেছে। ব্যাস লেগে গেছে কাজে। একটু পয়সা জমলেই চলে গেছে তীর্থে, সেখানে মদ গাঁজা খেয়ে উড়িয়ে দিয়ে ফিরে এসেছে গাঁয়ে।
বুঝলাম আজ আর গল্প হবেনা। বাইরে ঘন অন্ধকার।এই অন্ধকারে একাই ফিরে যেতে হবে, ষষ্টি আজ এগিয়ে দিতে পারবেনা। উঠতে যাব এমন সময় বাইরে পায়ের শব্দ শুনলাম । গলা খাঁকারি দিয়ে কে যেন ডাকল। ষষ্টি হাঁক পেড়ে বলল আজ আর হবে না রে! দেখি কাল যদি মা ইচ্ছা করে। আমাকে অবাক হতে দেখে সে বলল,ওই বাউড়ি পাড়ার নিত্য এসেছে মায়ের প্রসাদ খেতে, তা ভাগনা কি চলে যাবে নাকি, তা যাও কাল এসো আবার গল্প হবে। আজ শরীরে তেমন জুত নেই! ষষ্টি আমাকে বিদায় করে দিতে চাইছে। আজ হবেনা বলেও সে তার মদ গাঁজার বান্ধব কে বিদায় দেয়নি। এর আগে যতবার এসেছি ততবার সে আমাকে নেশাদ্রব্য এগিয়ে দিয়েছে ওতে আমার আশক্তি নেই জেনেও। আজ আর সে সেসব বলল না। আমি বাইরে এসে দাঁড়াতেই সেই প্রসাদভিখারি দ্রুত ঢুকে পড়ল মন্দিরে। পিছন ঘুরে একবার শুধু বললাম, মহারাজ এই অসুখ শরীরে নেশাভাঙ করোনা। সে বেশ জোরের সঙ্গে বলল, না না ভাগনা তাই কি খেতে পারি!মিথ্যা আশ্বাস শুনে হাসলাম মনে মনে।
খানিক এগিয়ে যেতেই দেখলাম অন্ধকারে ঝোপগুলো জ্বলছে ঠিক আকাশের মত। জোনাকি আর তারা এমনভাবে মিলেমিশে  এক হয়ে যেতে পারে ভেবে মুগ্ধ হলাম। পরক্ষণেই আচমকা শিবাকুলের উল্লাসধ্বনি আমার পা দুটোকে থামিয়ে দিল। শিমূলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়লাম। 
এই সেই শিমূল গাছ। যেখানে ষষ্টির গুরু তারাপদ বাউরি,আমার ছোটবেলায় দেখা সেই তান্ত্রিক সাধক পঞ্চমুন্ডির আসন পেতেছিল। এখানেই একদিন ষষ্টিকে বসিয়ে রেখে সারারাত সে আসেনি। সে পরীক্ষা নিয়েছিল। পরীক্ষায় নাকি পাশও করেছিল ষষ্টি। সারারাত তার চারপাশে ভয়ঙ্কর পিশাচ নাচ করেছিল। মানুষের চেয়ে বড়, বিরাট বিরাট মাকড়সা তার দিকে নাকি ছুটে এসেছিল। কিন্তু পঞ্চমুন্ডির আসনে সে বসে থাকায় কেউ তাকে ছুঁতে পারেনি। ষষ্টি বলেছিল তার গুরু তারাপদ শ্মশানের চিতার উপর বসে সাধনা করত। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম মহারাজ তুমি পিশাচ দেখেছ? সে বলেছিল, না সে দেখেনি তবে গন্ধে সে টের পায়। গন্ধ বলে দেয় সে পিশাচ কেমন। তার গুরু তারাপদ পিশাচসিদ্ধ ছিল। সে সিদ্ধিলাভ করতে পারেনি, বড় কঠিন সাধনা নাকি!
ষষ্টি সেবার শবসাধনার গল্প বলেছিল। একবার সে নাকি তার গুরুকে সাহায্য করেছিল সেই সাধনায়। একটা বাচ্চা ছেলের মড়া এনে তার বাড়ির লোকেরা পুঁতে দিয়েছিল শ্মশানের অই পিছনের জঙ্গলে। বাচ্চা মরে গেলে ওখানেই পুঁতে দেয় সবাই। তারা দুজনে মিলে মাটিখুঁড়ে গভীররাত্রে সেই দেহ তুলে এনে থেকে পাহারা দিয়ে রেখেছিল দেহটা ,যাতে শিয়ালে মুখ না দেয়। দেহে কোনো খুঁত হলে সাধনায় নাকি ফল মেলেনা। ষষ্টির গুরু মন্ত্র পড়ে সেই মড়াটার গাত্রবন্ধন করেছিল। কারণ অনেকসময় খারাপ পিশাচ মৃতদেহে ঢুকে পড়ে। তারপর তেল ঘি মাখিয়ে চান করিয়ে কপালে চন্দন দিয়ে সেই দেহ প্রস্তুত করেছিল সাধনার জন্য।
গল্পটার কথা মনে পড়তেই আরো অবশ হয়ে গেল পা দুটো। পিশাচ থাকুক না থাকুক এই শ্মশানের আবহ নিদারুণ ভীতিজনক সন্দেহ নেই। দূরে একটা আলো দেখা দিতেই শক্তি ফিরে পেলাম। দুপা এগিয়ে যেতেই দেখি ষষ্টির কুঁড়ের সামনে অন্ধকারে কে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি চমকে উঠতেই সেই ছায়ামূর্তি বলে উঠল,আমি গো ভাগনা, কখন এলে ? আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, কে তুমি? আমি গো ষষ্টি সাধুর বউ, চেঁচাও কেনে ভয় পেলে নাকি? আমি অপ্রস্তুতের মত স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলাম, না না ভয় পাব কেন, মহারাজের কাছে এসেছিলাম, খুব জ্বর দেখলাম তাই চলে যাচ্ছি। সাধুর বউ চাপা ক্রোধ প্রকাশ করে বলল, হুঁহ জ্বর! এখন তো আবার মদ গিলছে দ্যাখোগা! পেটে ভাত নেই অসুখে ওষুধ নেই নেশাটি ঠিক আছে। 
তুমি নাকি চাল আনতে গেছ বাপেরবাড়ি? আমি বললাম। সে বলল, হ্যাঁ গো ভাগনা গেইছিলাম তো এই ফিরলাম। তাদের ঘরেও চাল বাড়ন্ত ভাগনা, তাদেরও তো ছানাপোনা আছে, কী করে চাই বল? খালি হাতে ফিরে এলাম। নামেই ভাতপুকুর গাঁ, চাষির ঘরে চাল নাই গো, আমরা দিনমজুররা তো  আরো মরেছি। এবছর বানবন্যা গেল। মড়ার উপর মায়ের খাঁড়া….আমার ভাইদের মোটে দুবিঘে জমি, তাদেরই চলেনা….তার চাপা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম। খানিক চুপ থাকার পর সে বলল,বাইরে ডাঁরিয়েই থাকবে নাকি ভাগনা ঘরে এস! আমি আপত্তি করতে সে, আরে এস না, বলে হঠাৎই আমার হাত ধরে টান দিল। আমি চমকে উঠে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, না আমি পরে আসব। সে আবার ঘন চাপা স্বরে ডাকল, ও ভাগনা ভয়ের কী আছে এসই না! আমি না, বলে দ্রুত রাস্তায় নেমে এলাম। সে পিছন থেকে বলল, তবে কিছু টাকা দিয়ে যাও, আজ মায়ের পুজোর দিনে শ্মশানে বাতিও দিতে পারিনি কো।আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম , খেয়াল হল ষষ্টির কাছে গল্প শোনার পর কিছু টাকা দিয়ে যাই প্রতিবার, এবারে দেওয়া হয়নি। পকেটে হাত দিয়ে যা পেলাম ফিরে এসে পুরোটাই তার হাতে দিয়ে বললাম এর বেশী কিছু দেবার ক্ষমতা আমার নেই, প্রদীপ না জ্বালিয়ে অন্তত উনুনটুকু জ্বেল আজ।
ঘোর অন্ধকারে তার মুখ দেখতে পেলাম না। কিন্তু যেতে যেতে অনুভব করলাম আমার ঠিক পিছনেই  তার চোখদুটো দপ দপ করে জ্বলছে।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত