মাহবুব কবিরের কবিতাগুচ্ছ

 


আজ ২ জুন কবি ও সাংবাদিক মাহবুব কবিরের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবি কে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

কাজিন

তখন সবাই ছোট ছোট। আমরা কাজিনরা সংসার-সংসার খেলতাম।
আমি হতাম গৃহকর্তা, অর্থাৎ পরিবারের বড় সন্তান শেফালির বাপ।
ও হতো চার সন্তানের জননী।

বাইরে থেকে ঘরে ফিরে স্বভাবে-অভাবে নানা ছুতোয়
ওকে পিটিয়েছি কত—
সে মিছেমিছি ব্যথায় কাতরাতো, নিখুঁত কাঁদত মিছেমিছি।

একুশ বছর পর ওকে দেখি হাসপাতালে, বার্ন ইউনিটে।
পোড়া শরীর দেখিয়ে বলে,
শেফালির বাপে শরীরে কেরোসিন ঢেলে
আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
সত্যিকারের আগুন।

 

 

 

সাদা কাগজ

সাদা কাগজ বিধবার সাদা শাড়ি।
সাদা কাগজ লিখে ভরে ফেলতে হবে।
বিধবার সাদা শাড়ির শোক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই।
কালো কালো বালবাচ্চায় ভরে ফেলতে হবে সাদা কাগজ-
ফলে কোলাহলমুখর প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে পৃথিবী।

প্রেম, সাদা পাতা নয়।

 

 

 


মাটির আয়না

সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াই,
প্রতিদিন।
ভালো লাগে, বাঁচতে ইচ্ছে করে।

রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত
নিজের প্রতিবিম্বই উজ্জীবিত রাখে আমাকে।
বেডরুম, ওয়াশরুম, ড্রয়িংরুম, বারান্দা, লিফট, গাড়ি,
অফিস, শপিং মলে… এমনকি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
পাশের দোকানপাট, বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবনের গাসে গাসে-
ইস্পাতে ইস্পাতে,
নিজের প্রতিবিম্ব দেখি, ভালো লাগে, বাঁচতে ইচ্ছে করে।

কাচের, জলের এ আজব জগৎ বানিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার।
যেদিকে তাকাই সেদিকেই আমি।

যখন আশপাশে আয়না নেই, জল নেই-
তখন আমি আমার ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি,
মাটির আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকি।
 

 

 

 

যে গাছে ফাঁসে ঝুলেছিল মেয়েটি

যে গাছে ফাঁসে ঝুলে মেয়েটি আত্মহত্যা করে-
গ্রামবাসী দেখল, তিন দিনের মাথায় সেই গাছের সব পাতা
ঝরে গেছে।
সবাই ভাবল, পানি দরকার।
-ছেলেবুড়ো সবাই বালতি বালতি পানি ঢালল গাছের গোড়ায়।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।
ধীরে ধীরে গাছের ছাল উঠে গেল,
শুকনো ডালপালা ভেঙে পড়ল।
তখন সবাই বুঝল গাছটি মরে গেছে।

একদিন গ্রামের সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ লোকটি সবাইকে ডেকে বলল-
গাছটি আত্মহত্যা করেছে,
যেদিন তার শাখায় মেয়েটি ফাঁসে ঝুলেছিল, সেদিনই।
 

 

 

 

পঁচিশ বছর পর

পঁচিশ বছর পর দেখা।
পঁচিশটি বছর পৃথিবীতে ঠিকই বয়ে গেছে-
কিন্তু আমরা কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করিনি।

পঁচিশ বছরে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে-
বনের ভেতরে সভ্যতা এগিয়েছে অনেক…
জলের ভেতরে… মহাশূন্যে…
কিন্তু একটি জায়গা থেকে আমরা একটুও এগোইনি-
পঁচিশ বছর পরও আমরা খুনিই রয়ে গেলাম।

পঁচিশ বছর পরে এসেও আমাদের নিহত ভ্রুণ
চায়ের টেবিলে জলের গাস ফেলে দেয়,
ভিজিয়ে দেয় দুজনকেই।
 

 

 

 

সন্তানের পাশে

বাইরে পরিতৃপ্ত নারী ঘরে ফিরে স্বামীর সঙ্গে
সঙ্গম করতে চাচ্ছে না।

স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্ভোগ ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে কি না,
প্রকৃতিবিরুদ্ধ কি না-
তা ভাবতে ভাবতে লোকটি
সন্তানের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে।

বাইরে পরিতৃপ্ত পুরুষ ঘরে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে
সঙ্গম করতে চাচ্ছে না।

 

 

 

 

 

তারা হতে ইচ্ছে হলো তার

ছাদে উঠতে চায় না, একেবারেই ওঠে না
এ রকম অনেককে চিনি আমি।

ছাদে উঠলে তারাদের মতো শূন্যে ঝুলে পড়ার ইচ্ছে জাগে,
ইকারুসের মতো আকাশে উড়ে বেড়ানোর ইচ্ছে হয়,
নিচের দিকে তাকালে মাথা চক্কর মারে,
রুপালি মাছ অবচেতনে ঘাই মারে বলে-
অনেকেই ছাদে উঠতে চায় না- একেবারেই ওঠে না।

আমিও ছাদে না-ওঠা দলের মানুষ।
পাশের বাড়ির ছেলেটিও ছিল আমার দলের।
পূর্ণিমার ইশারায়-
নববধূর মনোবাঞ্ছায় ছাদে উঠেছিল সে।
পাশে প্রিয়তমা বধূ-
তারপরও তারা হতে ইচ্ছে হলো তার;
এবং সে শূন্যে উড়ে গেল!

 

 

 

 

 

এঁটো কবিতা

তোমাকে কিছুই দিইনি- এই দেহ ছাড়া।
হৃদয় তার জন্য, এই গান তার জন্য, এই কবিতা…।
তোমাকে দিইনি কিছুই- এই দেহ ছাড়া, ছেলেমেয়ে ছাড়া।


আমি কোথায় পাব মামু-
আমার মায়ের ভাই নাই
ভবতরি কেমনে পার হমু?

 

 

 

বন্দুক

বন্দুক, পুরানা আমলের।
বাবার মৃত্যুর পর চাচার কাছে বেচে দিয়েছি।
চাচা গ্রামে থাকেন, আমি মফস্বল শহরে।

সেই প্রত্যন্ত গ্রাম। ডিঙাপোঁতা, শনির হাওর। ধনু নদী।
চাচা বন্দুক কাঁধে নিয়ে হাওরে যান, বিলে যান,
পাখি শিকার করেন।

এলাকায় চাচার মর্যাদা বেড়েছে_
হিস্যা বেড়েছে, ফাও বেড়েছে।
সবাই তাকে সমীহ করে চলে।

লাইসেন্স নবায়নে বন্দুক হাতে চাচা শহরে আসেন।
চাচাকে তখন ঘসেটি বেগমের বীরপুত্র
শওকত জং মনে হয়।

 

 

.

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত