অনন্যা আফরিন

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comবিকালের দিকে যখন নির্বাহী সম্পাদকের ঘরে ডাক পড়ল, কমল নিতান্তই বিরক্ত হলো। গত সকালে একবার কথা হয়েছে, কথা মানে ধমক, নির্বাহী সম্পাদক ধমকাতে ভালোবাসেন। কাল কমলকে অনেকক্ষণ ধমকিয়েছেন। লোকটার চেহারা ট্রাক চাপা পড়া, পাটকাঠির মতো শরীর, অথচ গলার আওয়াজে মাইকের যমজ ভাই। ঘরে বসে যদি ধমকান, রাস্তা পর্যন্ত সেটা শোনা যায়। এক বিকালে ধমক খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে মোটর পার্টসের দোকান পড়ায় কমল জানতে চেয়েছিল, ভাই, সাইলেন্সারের দাম কেমন? লোকটার মধ্যে গা-ঘিনঘিনে নোংরামিও আছে বেশ। কথা বলতে বলতে নাক থেকে ময়লা বের করে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন গভীর মনোযোগে। তারপর আকর্ষণ কমে গেলে সেটা আঙুলের টোকায় ছুড়ে দেন কোনো দিকে, হয়তো দেয়ালের দিকে! দেয়ালে গিয়ে সেটা আটকে থাকে। এই লোকের হাতে থেকে কাগজপত্র নিতেও অস্বস্তি হয়। মনে হয় এই বুঝি হাতে ভেজা ভেজা কিছু লাগবে। অথচ কপাল, এই লোকটা তাকেই ডাকতে পছন্দ করেন বেশি, অধিকাংশ সময় ধমকাতে, কখনও কিছু সুখ-দুঃখের গল্প করতেও- “বুঝলা কমল, জীবন নিরামিষ।” লোকটার কাছে কমলের এখন যেতে ইচ্ছা করছে না। একটু আগে লিপি একটা মেসেজ পাঠিয়েছে মোবাইল ফোনে “তুমি আমাকে ভুলে গেলে?” এই মেসেজ কোনো সমস্যা নেই, যদিও এমন একটা মেসেজ হঠাৎ পাঠানোর কোনো যুক্তিও নেই, কারণ গতকালই লিপির সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তবে প্রেম যখন, যুক্তির কথা না-ই উঠল। কমলের মেজাজ খারাপ হলো অন্য কারণে। রোমান হরফে লিপি লিখেছে, ঞটগঊ অগঅকঊ ইটখঅ এঊখঅ। মেসেজ পড়ে মেজাজ খিঁচেছে কমলের, সে মনে মনে বলেছে, ওই, এই অদ্ভুত বানান আর উচ্চারণের মেসেজ তোকে কে পাঠাতে বলেছে। ঞটগঊ দিয়ে ‘তুমি’ হয়, ইটখঅ দিয়ে হয় ‘ভুলে’! মাঝে মাঝে চিঠি লিখলেও এই একই কাণ্ড ঘটায়। মাঝেমাঝে চিঠি লিখবে তারা, ইচ্ছাটা কমলের। লিপির আপত্তি ছিল আবার চিঠি! মোবাইল আছে না! থাকুক। চিঠির একটা আলাদা টেস্ট আছে। মোবাইল ফোন কখনও খুবই নীরস। লিপি লেখে হঠাৎ হঠাৎ, অধিকাংশ সময় কমলের মনে হয়, এই অনুরোধ সে না করলেও পারত। বানান কিছু কিছু ভুল করে সে, এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না কমল, কিন্তু লিপি যখন একটা বাক্য একভাবে আরম্ভ করে অন্যভাবে শেষ করে, তখন কমল মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। সে ফোন করে লিপিকে। এটা, এটা কী লিখেছ? কী বলো? তোমার চিঠি পেলাম। পাবে তো। তুমিই লিখতে বলেছ। কিন্তু এত ভুল বাক্য… কী লেখো! কী লিখি তুমি বুঝো না? বুঝি। তা হলে? একটু গুছিয়ে লিখতে পারো না? আমি এই রকমই লিখি।… চিঠি লেখা বন্ধ করে দিব? বন্ধ করার কথা কমল বলে না। লিপির চিঠি পেতে ভালো লাগে তার। ভুলে ভরা চিঠি, তবু। তবে, এ ভাবনাটা তার সব সময়ই থাকে- চিঠি লেখা একটা আর্ট, লিপি তাকে গুছিয়ে চিঠি লিখুক। নির্বাহী সম্পাদক চেয়ারের হাতলের ওপর এক পা তুলে দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। কমল বলল, আজম ভাই, আসব? আসবা না ক্যান! আসো, তোমার খোমা দেখলেও শান্তি। ও! জানতাম না। দেখেন… ডেকেছেন কেন? পত্রিকাটা তোমাগো কারণে কতটা ডুবতেছে, সেইটার একটা বিবরণ দিতে ডাকছি…। ওই মিয়া, তুমি পাঠকের পাতায় এই সব কী ছাপো? নির্বাহী সম্পাদক বিরক্তির সঙ্গে তাকিয়েছে। তার কথা ধরতে পারল না কমল কী ছাপি মানে? এই সব চিঠি! চিঠি না? আল্লারে! এরে কেমনে বুঝাই! বোঝান। বাছাই করা চিঠি ছাপি। কোনো ভুল নেই। খুব মন দিয়ে এডিট করি। আরে মিয়া, আমি তো এইটা বলি না। এই সব কী চিঠি? স্যুয়ারেজ সমস্যা, বাজারে আগুন, রেলওয়ের বগির টয়লেটে পানি নাই…। ওই মিয়া, পানি নাই তো পাঠকের কী! তোমার কী? কী কথা বলেন? আজম ভাই! চিঠি তো পাঠকই লেখে, তারাই পড়বে। পাঠকের বইসা আর কাম নাই! আমারে এই লাইনে বিদ্যা দিতে আইসো না। শুনো, মাইয়ারা চিঠি লেখে না? কোনো মাইয়ার চিঠি তো দ্যাখলাম না কুনোদিন। ৩ ৪ ২ ছাপি তো। দোকানিদের অশালীন আচরণ, মহিলাদের জন্য আলাদা বাস, ভিড়ের মধ্যে বখাটেদের অশালীন আচরণ…। এই, এইটা পছন্দ হইল, ভিড়ের মধ্যে…। কমল, শুনো পাবলিক আছে সমস্যার মধ্যে, তুমি যদি শুধু সমস্যার কথা ছাপ, পাবলিক পড়ব না। ওইসব চিঠি কমায়া দাও। তো কী ছাপব? ৩-৪টা চিঠি তো রোজ ছাপতে হয়। আরে মিয়া, নরম চিঠি ছাপো। ধরো, একটা মেয়ে তার জীবন নিয়া লিখছে, নতুন চিন্তা, তার জীবন যন্ত্রণা নিয়ে লিখছে…। এটাও তো সমস্যার কথাই হলো। হউক। কুনো মেয়ে এই রকম লিখলে পাবলিক সেইটা পড়ব। অন্যকিছু দাও, বুঝছ। এই যে রোজকার সমস্যা, এইসব থেইকা পাবলিকরে বাইর কইরা আনো। তারে অন্য জগতে নিয়া যাও। তারে মজা দাও, নতুন চিন্তা দাও। টয়লেটে পানি নাই এইটা দিও না। বুঝছ? বুঝেছি, কিন্তু এ রকম চিঠি তো আসে না। আসে না! নির্বাহী সম্পাদককে হতাশ দেখাল। পরমুহূর্তে ধমকে উঠলেন। আমারে বুঝাও? আসো! একটা কথা শুনো, মিস্টার কমল, তোমার পাঠকের পাতা বিভাগের প্যাটার্ন বদলাও। পাবলিকরে বাঁচতে দাও। বুঝছ? বুঝতে বুঝতে কয়েকদিন সময় লেগে গেল কমলের। চারদিন পর সে ওরকম একটা চিঠি ছাপতে পারল। চিঠির শিরোনাম ‘ভিড়’। চিঠিটা এ রকম ভিড়ের মাঝখানে আমি।

 

“চারপাশের এই ভিড় থেকে এখন আর নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না। নিজেকে এই ভিড়ের অংশবিশেষ মনে হয়। ফলে এখন নিজের আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে মাঝে মাঝে সন্দিহান হয়ে পড়ি। আমি কি আছি? এই আমিটা আমি তো! কিংবা আমি কি আমার মতো? কিছুই বুঝতে পারি না। কেউ কি পারে? আপনারা কেউ পারেন, একটা সময় ছিল, ভাবতাম, খুব আলাদা হয়ে বড় হতে পারব। ভিড়ের মধ্যে সহজেই সবাই আমাকে খুঁজে নিতে পারবে। আর, আমি নিজে তো পারবই নিজেকে খুঁজে নিতে। এখন আমি ভিড়ের মানুষ। তবু কখনও এই ইচ্ছাটা বড় হয়ে ওঠে, এ রকম ভাবতে ইচ্ছা করে হঠাৎ একদিন এ রকম কাউকে পেয়ে যাব যে মৃদু গলায় প্রবল বিস্ময়ে বলবে, তুমি কি জানো, তুমি আর সবার চেয়ে কত আলাদা!

 

-অনন্যা আফরিন।”

ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক। নির্বাহী সম্পাদক বললেন, এরে পাইছ কই? এই অনন্যারে? এতদিন কই ছিল! ছিল। আপনি কী চাচ্ছেন, সেটা বুঝতে পারিনি। পারলে এর চিঠি আগেই ছাপাতাম। ওয়াল্ডারফুল চিঠি। একটু হাই থট হইছে…। একদম মনমতো কি হয়? না না, অসুবিধা নাই। যাও কমল। কমল ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দাঁড়াল। এই মেয়ে কী তোমার পরিচিতি? কমল দুপাশে মাথা নাড়ল। ওই যে, তোমার এক প্রেমিকা আছে না, একদিন হঠাৎ কয়া ফালাইছিলা। আরে না আজম ভাই, ওই মেয়ে না। আচ্ছা, ওই মেয়ে না। শুনো, এই মেয়ের চিঠি নিয়মিত ছাপো। রিডার রিঅ্যাকশন থাকলে সেইটাও ছাপো। পত্রিকা লাইনে আমার বয়স অনেক হইল, তোমারে একটা টিপস দেই, পত্রিকা তো শুধু পত্রিকা না, বাণিজ্যও। পাবলিকরে মাঝে-মাঝে ধন্ধে ফেলবা, ব্যস্ত হওনের উপাদান দিবা। বুঝলা? কমল অনন্যা আফরিনের চিঠি নিয়মিত ছাপতে লাগল। সপ্তাহে তিনটা। সপ্তাহ দেড়েক পরই দেখা গেল অন্য পাঠক প্রতিক্রিয়া জানাতে আরম্ভ করেছে। অনন্যা আফরিনের চিঠির পক্ষে বা বিপক্ষে পাঠক লিখতে আরম্ভ করল। নির্বাহী সম্পাদক বললেন, কী মিয়া, তোমারে বলি নাই। পাতাটারে ম্যাড়ম্যাড়ে বানাইয়া রাখছিলা, এহন দেখো তোমার পাতা কেমন জ্যান্ত হইয়া উঠছে। সার্কুলেশন কি বেড়েছে? সার্কুলেশন কি এত সহজে বাড়ে! কিন্তু ধরো, অনন্যা না থাকলে হয়তো কমত। অন্য পাঠকরা দেখছি খুব পার্টিসিপেট করছে। ওনার, মানে অনন্যার একেকটা চিঠির পক্ষে লিখছে, বিপক্ষে লিখছে। এইটাই দরকার। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে চিঠিগুলো পাচ্ছি, অধিকাংশই দুর্বল, অগোছালো, নিজেও ঠিক ক্লিয়ার না আসলে কী বলতে চায়। এইটাই স্বাভাবিক, তাই না? নির্বাহী সম্পাদক মুচকি হাসলেন। শুনো, এইটা নিয়ে ভাববা না, চিঠি পাইবা, চিঠি ছাপবা। হৈচৈ চলুক। হৈচৈ লিপি পর্যন্ত পৌঁছাল। এক বিকালে ফোন করে সে বলল, কতদিন বাড়ি আসো না, মনে আছে? এই না গত মাসে… কী যে কাজের চাপ…! ফোনও করো না! পরশুই না কথা হলো! ৫ ৬ ৩ এই অনন্যা আফরিনটা কে? কে? আমিও জানতে চাচ্ছি, কে? কার কথা জানতে চাচ্ছ? কমল, ঢঙ কোরো না। ঢং তোমাকে মানায় না। আহা লিপি… দাঁড়ায় দাঁড়াও, তুমি অনন্যার কথা জানলে কী করে! খবরের কাগজ আমি পড়ি না। ভালো লাগে না। কিন্তু তুমি যে পাঠকের পাতা দেখো, সেটা আমি নিয়মিত দেখি। এই অনন্যা মেয়েটা কি তোমাদের অফিসে চাকরি করে? তোমার কলিগ? তুমি এর জন্য আমাকে ফোন করার সময় পাও না? কী যে সব বলো! মেয়েটা আমাদের এখানে চিঠি লেখে, এই- এই টুকুই। ও আচ্ছা। তা, রোজ ওই মেয়েটার চিঠি ছাপতে হবে? সবার ওপরে? ঝেড়ে কাশো, কমল। লিপি, কাশাকাশির কিছু নেই। আমাদের নির্বাহী সম্পাদক আজম ভাই চান পাঠকের পাতা বিভাগটা যেন প্রাণবন্ত হয়। আগে শুধু সমস্যার চিঠি ছাপতাম। এখন এ ধরনের চিঠিও ছাপি। মেয়েটা চিঠি খুব ভালো লেখে, তাই না? শোনো কমল, তোমার ওই নির্বাহী সম্পাদককে বলবে, সমস্যার চিঠিই ভালো ছিল। আরে না…। আরেকটা কথা। একদম সত্যি বলবে। ওই মেয়ে কি তোমার অফিসে এসে চিঠি দিয়ে যায়? সেই সন্ধ্যায়ই নির্বাহী সম্পাদককে লিপির কথা জানাল কমল। তার যদিও খুব হাসি পাচ্ছিল, সে মুখ গম্ভীর করে রাখল। হাসি দেখা গেল নির্বাহী সম্পাদকের মুখে। আগে তোমার বান্ধবী পাঠকের পাতা বিভাগ নিয়ে একটা কথাও বলছে? নাহ্। তুমিই তাইলে বুইঝা দেখো তোমার চিঠিপত্রের বিভাগ কত লাইভলি। ও অবশ্য একটু ছেলেমানুষ আছে। না না, এইটা ছেলেমানুষি না। তুমি এইটা নিবা পাঠকের রি-অ্যাকশন হিসাবে…। কিন্তু ধরেন, অনন্যা আফরিন যদি প্রতিদিন ফিচার লিখত, লিপি মাথা ঘামাত না। সেইটা ঠিক। কিন্তু এইটাও ঠিক, তোমার বান্ধবী আগে কিছু বলে নাই, এখন বলে, কত লোক কত চিঠি লেখে, এই যে পাঠক উপাদান পাইছে! এইটা হইল সাকসেস। সাকসেস? এটা নিয়ে ভাবতে গেলে হাসি পায় কমলের। পত্রিকা অফিসে সাকসেস কত বিচিত্র! পাঠককে ধন্ধে ফেলা, ব্যস্ত রাখা এসব হচ্ছে সাকসেস অর্জনের পূর্বশর্ত। তবে এসবের পাশাপাশি এ রকম তার মনেই হয়, অনন্যা আফরিনের চিঠি ছেপে সে মজা পাচ্ছে। গোছানো চিঠি, ইমোশনাল চিঠি, কিছু কিছু প্রশ্ন তীব্র করে তোলে এ রকম চিঠি। এ রকম চিঠি ছাপতে ভালো লাগে। একজনের ভেতরে একই সঙ্গে আকুতি ও সংহত অবস্থা না থাকলে এভাবে লেখা যায় না। এই কাজই করছে সে বেশ কিছুদিন। সে দেখেছে, আবেগ বা আকুতির চিঠি লিখতে গিয়ে অধিকাংশ লোক সেটা গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না, এলোমেলো করে ফেলে। এই মেয়েটি তার আশ্চর্য ব্যতিক্রম। আচ্ছা, মেয়েটির বয়স কত? কমল ভেবে দেখল, মেয়েটির বয়স আন্দাজ করা কঠিন। একবার মনে হচ্ছে মেয়েটির বয়স ২৩, আবার মনে হচ্ছে মেয়েটির বয়স ২৭। আবার এই ধারণাটাও থাকছে না, মনে হচ্ছে মেয়েটি ৩৫। কোনটা ঠিক? কমলের এক সময় মনে হলো, মেয়েটির বয়স ৩০, এটিই বেশি মানানসই। আর সম্ভবত অধিকাংশ সময় মেয়েটি সুতি শাড়ি পরে, আর প্রসাধন সামগ্রী কখনো ব্যবহার করে না। মেয়েটির চেহারায় এমন কিছু নিশ্চয় আছে, তার কোনো প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারের প্রয়োজনই পড়ে না। তবে একটা টিপ, একটা টিপ কি মাঝেমাঝে মেয়েটা ব্যবহার করতে পারে? এই ব্যাপারটা অমীমাংসিত থেকে গেল। এই ব্যাপারে কমল কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল না। নির্বাহী সম্পাদকের অবশ্য কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত। কী কারণে সেদিন তার মন ভালো। সন্ধ্যায় ডেকে পাঠিয়েছেন কমলকে। টেবিলে মুড়ি, পেঁয়াজ আর আলুপুরি। দুই হাতে মুড়ি খেতে খেতে তিনি বললেন, কমল, এই সব বেশি খাইবা না। শরীর নষ্ট করা ছাড়া এই সবে আর কোনো গুণ নাই। আমারে দেখো, বয়স ৪৯, দেখলে মনে হয় ৬৫। কুনো মানে হয়! তবু তো এই সব খান রোজ। আর কী করব! কিন্তু তুমি বেশি খাইও না। তোমার চেহারা সুন্দর। আপনিও সুন্দর। নির্বাহী সম্পাদক হাসলেন। আমারে দেখলে শকুন মনে হয়, এইটা আমি জানি। এইটা কী বললেন, আজম ভাই। ৭ ৮ ৪ আর চেহারা শকুন শকুন বইলাই বুঝছ, ফিটফাট থাকতে মন চায় না, এইটা একটা মারাত্মক সাইকোলজি, বুঝছ? আমার চেহারা খারাপ, আমি থাকবও খারাপ…। আপনি ফিটফাট থাকলে আপনাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগবে। আমার নোংরা থাকতে ভালো লাগে। ফিটফাট থাকবা তোমরা রাজপুত্ররা।… বাদ দাও, তোমার কথা কও। কমল তার কথা বলতে লাগল, বলতে বলতে এক সময় পাঠকের পাতা বিভাগের কথা চলে এলো। সুতরাং অনন্যা আফরিনের কথাও। নির্বাহী সম্পাদক ভুরু কুচকে কতক্ষণ ভাবলেন, কমলের দিকে তাকালেন- তোমার ধারণা অনন্যার বয়স ৩০। হ্যাঁ…। আমার ধারণা ৩৫-এর বেশিই হবে। গড়ন হবে ছিপছিপে…। আপনি দেখেছেন? তুমি দেখছ? তুমি যে বললা বয়স ৩০। আহা, ধারণা বলে একটা ব্যাপার আছে না! ধারণা আমারও আছে। ছিপছিপে গড়ন, মাথায় ফুল থাকবে…। ধ্যাৎ। মানে! মাথায় ফুল একটা ব্যাকডেটেড ব্যাপার। আমার ভালো লাগে না। তোমার ভালো লাগা না লাগায় কিছু এসে যায় না। উনি আমার পাতায় চিঠি লেখেন আজম ভাই…। তো! ওনার চিঠি ছাপাতে তোমারে কে বলছে, কে? দুদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল কমল, একটা ঝামেলা বাধল। দোষটা তার, এখন রং সাইড দিয়ে যানবাহন আসা যে চালকরা বৈধ করে নিয়েছে, এটা তার ঠিক মনে ছিল না, সে রিকশার সঙ্গে ভালো রকম ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল এবং রিকশাচালক ও যাত্রী দুজনেই তার কাছে জানতে চাইল, সে কি চোখ দুটো বাসায় রেখে এসেছে? ডাক্তার জানান, পায়ের পাতায় ধাক্কাটা ভালোই লেগেছে, অন্তত ৫ দিন বিছানা থেকে নামা তার উচিত হবে না। এ কথা শুনে লিপি উচ্ছ্বসিত হলো, সে বলল, কমল, আমি বহুদিন এ রকম আনন্দের খবর পাই নাই।

এটা আনন্দের খবর? আর বোলো না, আরও ৫ দিন তুমি ঢাকায় ফিরতে পারছ না। আমি ফকিরকে পয়সা দেব। একটা কাজ করলে হয় না, ধরো ৫ দিন তো থাকতেই হচ্ছে, বিয়েটা করে ফেললে হয় না? সত্যি? খালাকে বলব? প্লিজ, বলো। দাঁড়াও দাঁড়াও। এখন বিয়ে হবে না। আমি বিছানায় পড়ে থাকা ল্যাংড়াকে বিয়ে করব না। আমার বর আসবে ঘোড়ায় চড়ে। আমি তো দুম্বার কথা ভেবেছিলাম। দুম্বা! বিয়ের পর সব পুরুষই দুম্বা হয়। তাই আগে থেকে…। অসুবিধা নেই। তুমি আমার প্রিয় দুম্বা। চোখ বন্ধ করো। প্রিয় দুম্বাকে আমি একটা পাপ্পি দেব। লিপির এই খুশি খুশি ভাবটা দুদিন পর হঠাৎই থাকল না। তৃতীয় দিনে সে যখন দেখা করতে এলো, তাকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাল। সেটা কিছুক্ষণ পর খেয়াল করল কমল। তোমার কি কিছু হয়েছে? হুঁ। কী? আমি কথা চেপে রাখতে পারি না, তাই বলব। না হয় বলতাম না। বুঝেছি। বলো। ওই মেয়েটা, অনন্যা আফরিন, ও কি জানে তুমি দুদিনের ছুটি নিয়েছিলে? নাহ্। উনি কীভাবে জানবেন! তারপর তোমার অ্যাক্সিডেন্টের খবর। নিশ্চয় জানিয়েছ। তোমার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ, না? লিপি, তোমাকে আমি এক দিন বলেছি। তুমি ছুটিতে আসার পর ওনার আর একটা চিঠিও ছাপা হয়নি। তো? আগে নিয়মিত ছাপা হতো। এখন এত দিনে একটাও নেই। তুমি না থাকলে ও লিখবে না, তাই না? কমল হাসতে আরম্ভ করল। হাসছ কেন! খবরদার হাসবে না। আমি হাসার মতো কিছু বলিনি। এখন না, একদিন আমি তোমাকে এই মেয়েটা সম্পর্কে বলব। এখন বলবে না কেন? এখন বললে মজা নষ্ট হয়ে যাবে। এই যে তুমি অভিমান করছো, আমার ওপর রাগ হচ্ছে তোমার, বলে দিলে এই মজাটা নষ্ট হয়ে যাবে।

কত মিথ্যা যে তুমি বলো! হুঁ… মিথ্যা। শোনো, এখন আমাকে একটা পাপ্পি দাও। ৯ ১০ ৫ পাগল! তোমাকে আর আমি পাপ্পি দেব! জীবনেও না। কমল হাসতে আরম্ভ করল। হাসবে না। আমি বলেছি হাসবে না। আমি কি কিছুই বুঝি না? তুমি আমাকে আর চিঠি লিখতেও বলো না। এখন তোমাকে অনন্যা আফরিন চিঠি লেখে, তাই না? অফিসে ফেরার পর নির্বাহী সম্পাদক কমলকে কিছুটা সময় পর্যবেক্ষণ করলেন। বুঝতেছি না। না বোঝার কিছু নেই। এখনও পায়ের পাতায় কিছু ব্যথা আছে। ধরো, করি সাংবাদিকতা, তোমার অ্যাক্সিডেন্ট হইছে এইটা ঠিক, কিন্তু ধরো আমরা যেমন প্রয়োজন পড়লে নিউজে কিছু মিথ্যা ঢুকায়া দেই, অল্প মিথ্যা, অন পাবলিক ডিমান্ড মোস্ট অব দ্য টাইম, সেই রকম তুমি একটা ঢুকায়া দিলা কিনা, ডাক্তার ৫ দিনের রেস্টের কথা বলছে। কমল হাসল। না, এটা পুরো সত্য। অ্যাক্সিডেন্ট, ৫ দিনের রেস্ট দুটোই সত্যি। বিবাহ করতেছ কবে? আমি তো ভাবলাম, এইবার বুঝি বিবাহ সারলা। লিপি বলল, আমি যেন অনন্যা আফরিনকে বিয়ে করি। নির্বাহী সম্পাদক বুঝতে সামান্য সময় নিলেন। তার মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল অনন্যা আফরিন, না?… শুনো, তার চিঠি তুমি কম্পোজে দিয়া যাবা না! এই কয়দিনে তার একটা চিঠিও আমরা ছাপতে পারলাম না! আজম ভাই, চিঠি না থাকলে আমি কোত্থেকে দেব! চিঠি ছাপা হয়নি বলে অসুবিধাও কিন্তু হয়নি, আপনি ওই চিঠিটা দেখেননি, একজন, পাঠক লিখেছে- ‘অনন্যা আফরিন আপনি কোথায় হারালেন?’ এইটা ঠিক। নির্বাহী সম্পাদককে সন্তুষ্ট দেখাল। …আচ্ছা, দাঁড়াও। নির্বাহী সম্পাদককে সামান্য চিন্তিত দেখাল। বিকালে হালকা টাইমে একবার আইসো তো, গল্প করব। পাঠকের পাতা ছাড়াও কমলকে আরও কিছু বিভাগের কিছু কিছু কাজ করতে হয়।

এ কদিন না থাকায় বেশকিছু কাজ জমেছে। যত না জমেছে, তার চেয়ে বেশি এলোমেলো হয়ে আছে। ফলে সে সময় বের করতে পারল না। নির্বাহী সম্পাদকের সঙ্গে তার দেখা হলো পরদিন। আজম ভাই, সময় করতে পারিনি। বহো। তোমারে একটা চিঠির ব্যাপারে বলব ভাবছিলাম। সেইটা আজ ছাপছ দেখলাম। কোনটা! ওই যে, একজন লিখছে না! ‘অনন্যা আফরিন, আপনি কি চিরদিন ঠিকানাবিহীন?’ ওইটা। রকিব দায়িত্বে ছিল, বলল, আজম ভাই, এই চিঠি কি ছাপব? আমি বললাম, থাউক, কমল আইসা ডিসিশন নিব। ছাপলাম। পাঠকের মনে এই প্রশ্ন তো আসতেই পারে। আরে মিয়া, এই প্রশ্ন আমার মনেও। কুনো চিঠিতে ঠিকানা নাই। সব চিঠির নিচে লেখা ‘ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক’। এই অনন্যা আফরিন থাকে কই? সেটা আমি কী করে বলব আজম ভাই? আরে, ধারণা নাই তুমার? হয়তো ঢাকায়ই থাকে। আরে ধ্যাৎ। কেন? বুঝো না, রোমান্টিক চিঠি লিখতেছে। ঢাকার মেয়েরা হইতেছে মেশিন। এরা কেমনে লিখব! তা হলে মফস্বলের। এখনকার মফস্বলের না। বুঝছ, এখনকার মফস্বলের না। সেই মফস্বল কি আর আছে! তা নেই, আমাদের শহরটাই…। কী যে সুন্দর ছিল, বুঝছ কমল, কত নরম, কত ঠাণ্ডা, মিঠা রোদ উঠত, আবার ছায়া পড়ত, আমরা বাড়ির রোয়াকে বসে আড্ডা দিতাম…। কমল, ওই মেয়েটা এই রকম কোনো শহরে থাকে, কুনো নির্জন টিপটপ শহরে… রাইট? সেদিন খুলনা শহরের ওপর একটা নিউজ পড়ছিলাম। ওখানে একটা জায়গা আছে বয়রা। বয়রা? আমার ধারণা ওটা বহেড়া, বয়রা না। কোনোকালে ওটা বহেড়া বন ছিল। লোকজনের মুখে ওটা বয়রা হয়ে গেছে। কিন্তু বহেড়া নামটা কত সুন্দর, না আজম ভাই? আমার ধারণা মেয়েটা বহেড়ায় থাকে। তোমার এই রকম মনে হইল? হ্যাঁ, মেয়েটা কোথায় থাকতে পারে, এটা আমিও ভাবি। সেদিন বহেড়া শব্দটা দেখলাম, হঠাৎ মনে হলো, আর কোথায় মেয়েটা কি বহেড়ায়ই থাকে? ছোট একটা জায়গা। কোলাহল নেই, যেন স্থির একটা ছবি, কাঠের একটা বাড়ি, ফুলের বাগান, সরু রাস্তা অনেক দূর চলে গেছে, এই ছবিটার ব্যাকগ্রাউন্ড কমলা রঙের… আজম ভাই, এটা স্থির একটা ছবি, এই ছবিতে স্থির নয় শুধু অনন্যা আফরিন…। কমল মিয়া, তুমি দেখি কবিতা লিইখা ফেলছ! এটা আমার ধারণা। ১১ ১২ ৬ হইতে পারে তোমার ধারণা। কিন্তু তোমার ধারণা ভুল। আর আপনার ধারণা ঠিক? আমারটা ঠিক। এই মেয়ে হইতেছে চঞ্চলা। তার মন নরম, কিন্তু সে চঞ্চলা, সে হাসে সুন্দর কইরা, গুনগুন কইরা গান গায়, বই পড়ে, আবার কখনও উদাস হইয়া যায়। আপনাকে বলেছে! মিয়া শুনো, আমার বয়স হইছে, আমার আন্দাজ আছে। বুঝলাম। কিন্তু আজম ভাই, ওই মেয়ের চিঠি এই আমিই ছাপি। আমি জানব না, বলেন? আবার পুরান কথা কও! ছাপো তুমি, ঠিক আছে না? কিন্তু এই চিঠি তোমারে ছাপতে বলছে কে? আমি না বললে তুমি ছাপতা? আপনি বলেছেন, এটা আমি অস্বীকার করি না কিন্তু আপনি ছাপেন না, আমি ছাপি। নির্বাহী সম্পাদক কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন কমলের দিকে, তার চোখেমুখে বিরক্তি মাতবর হইছ, না? মুখে মুখে তর্ক করো। বেশি বুঝো। এতই যখন বুঝো, দেখি, ধারণা না কইরা, অনন্যা আফরিন কই থাকে, এইটা সত্য সত্য বাহির করো দেখি। কমল বলল, সে যেখানে থাকে সেখানে থাকে। বের করার দরকারটা কী? তিন দিন পর অনন্যা আফরিনের একটা চিঠি ছাপা হলো। সে লিখেছে, ‘কে যেন বললেন, অনন্যা আফরিন, আপনি কি চিরদিন ঠিকানাবিহীন! কেন এই কথা! কেন মনে হলো আমি ঠিকানাবিহীন চিরদিন? আমার চিঠির নিচে লেখা নেই কোনো জায়গার নাম, তাই? এই এটুকুতেই আমি ঠিকানাবিহীন! আচ্ছা, বলুন দেখি, কার কার আছে ঠিকানা? আর কার কার জানা আছে তার নিজের ঠিকানা? আমি যদি বলি আমার ঠিকানা আছে দূরের মেঘের কাছে, সবুজ বনের কাছে, নির্জন ঝর্ণার কাছে, ফুলের সৌরভের কাছে, সাগরে ফিরে যাওয়া ঢেউয়ের কাছে, অসুবিধা আছে কোনো? কিংবা, যদি ইচ্ছা হয়, এমনও মনে করতে পারেন আমি থাকি বহেড়ায়। ধরে নিন, বসে আছি বহেড়াতলায়। বসে আছি আর অপেক্ষা করছি, কেউ একজন আসবে, কিংবা আসবে না, তবু আমি জানব, সে বলেছে, ‘তুমি যে আমার সোনাঝরা দিন/ দূর বহেড়ার অনন্যা আফরিন।’ নির্বাহী সম্পাদককে দেখে মনে হলো তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছেন। কমলকে ডেকে পাঠিয়ে তিনি কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। তু, তু, তুমি কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারো? এটা আবার আপনি কী বলেন আজম ভাই!পত্রিকা অফিসে বসিং নাই, কিন্তু আমি তোমার বস, এইটা তো ঠিক? জি, ঠিক। তাইলে আমারে টেক্কা মারার জন্য তুমি ওই চিঠি ক্যান ছাপলা? আজম ভাই, বোঝার চেষ্টা করেন, অনন্যা আফরিন যদি বহেড়া থাকে, আমার কী করার আছে? তুমার কী করার আছে মানে! তুমি আমার কথা শুনলা না ক্যান! আমার কী করার আছে, আমি বুঝতে পারছি না। পারবা ক্যামনে! পারো শুধু তর্ক করতে। আমি বললাম, তার বয়স ৩৫-এর বেশি, তুমি বললা, না ৩৫ না, ৩০। তার বয়স ৩০-৩৫-এর বেশি। আপনি বললেই হবে না। হইব। ১০০ বার। সে ৩৫-এর বেশি কিন্তু চঞ্চলা। সে শান্ত। সে শান্ত না। তবে সে মাঝে মাঝে উদাস হইয়া যায়। সে সব সময়ই উদাস। সে চঞ্চলা। তার শরীর বেতের মতন। এটা ঠিক। ছিপছিপে। তবে সে ধীরস্থির। তার চোখ হরিণের মতো। আজম ভাই, আপনি এমনভাবে বলছেন, যেন তাকে কতদিন হলো চেনেন! চিনিই তো। এ মিয়া, আমি চিনলে অসুবিধা কী? অসুবিধা নেই। সে যে কবিতা লেখে, এটা জানেন? ছাই লেখে! সে গান গায়। এই মেয়ে গান গাইলে মানায়। ভালো বলেছেন। কোনদিন দেখব, সে আপনাকে গান শোনানোর জন্য অফিসে চলে এসেছে। হুঁ, পারে। আসতেই পারে। অসম্ভব না। যদি আসে কোনো দিন, আমার কাছে আসবে। মিয়া শুনো, এই মেয়ে বুদ্ধিমান। এই মেয়ে ঠিকই জানে কে তার চিঠি ছাপতে বলছে। রাখেন! তুমি রাখো। এই মেয়ে ঠিকই জানে কার কাছে যেতে হবে। আচ্ছা! শোনেন তা হলে, যদি আসেও আপনার কাছে, আপনাকে মেয়েটার পছন্দ হবে না। আপনার যা ছিরি। ওই, তোমার মতো লালটুরে পছন্দ হইব! বললাম তো যে ছিরি আপনার! ১৩ ১৪ ৭ কিছুই জানো না। এই টাইপ মেয়েরা অগোছালো, কেয়ারলেস টাইপ মানুষ পছন্দ করে। আপনি, আপনি কেয়ারলেস টাইপ মানুষ! কমল হো হো করে হাসতে আরম্ভ করল। নির্বাহী সম্পাদক খেপে গেলেন, গলা উঁচিয়ে তিনিও চেঁচাতে লাগলেন খবরদার, খবরদার বলতেছি, হাসবা না। তুমি কী বুঝো? ভিড় জমে গেল নির্বাহী সম্পাদকের রুমের সামনে। কী হচ্ছে কেউ বুঝতে পারল না। তারা বিরক্ত হলো। বলল, এইটা কী, অফিসের মধ্যে এইটা কী? আপনারা থামেন। দুইদিন কথা বন্ধ না থাকলেও দিনকয়েক ঠাণ্ডা সম্পর্ক থাকল নির্বাহী সম্পাদক আর কমলের। একদিন কমলই গেল নির্বাহী সম্পাদকের রুমে, তার মুখে কুণ্ঠার হাসি আজম ভাই…। নির্বাহী সম্পাদক চোখ তুলে তাকালেন। মাফ চাইতে এসেছি। সেদিন আপনার সঙ্গে বেয়াদবি করেছি। হইছে। বসো। চা খাও। আপনার পাঞ্জাবিটা সুন্দর। নীল রঙে আপনাকে মানায়। পাম্প দিতেছ? আরে না, সত্যি। গতকাল যেটা পরেছিলেন সেটাও সুন্দর ছিল। কিনলাম আর কী। তুমি কি ভাবছ আমার রুচি খারাপ? কী যে বলেন না, তা কেন ভাবব! …ক্লিন শেভড থাকলে আপনাকে ভালো দেখায় আজম ভাই। হুম। চুলও তো কাটিয়েছেন। সময় পাই না, বুঝছ? দেখো না অফিসে কী অবস্থা! জি। এই সব বাদ দাও। তুমার খবর কও। ঝামেলা। লিপি দুই বেলা ফোন করে আর ঝামেলা করে। মাইয়া মানুষের কত যে বাহানা! তার বাহানা একটাই দুই বেলা প্রশ্ন করে সত্যি করে বলো, অনন্যা আফরিন কি তোমার কাছে আসে? মাঝেমাঝে মনে হয় অনন্যা আফরিনের চিঠি ছাপাই বন্ধ করে দিই। নির্বাহী সম্পাদক চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে গেলেন। এইটা কী বললা! কমল চুপ করে থাকল। নির্বাহী সম্পাদক বললেন, এইটা কী বললা! তার চিঠি ছাপা বন্ধ করবা মানে! অনন্যা আফরিনের চিঠি কি আমাদের দরকার নাই! আছে। কমল মৃদু গলায় বলল। দরকার আছে। তাইলে? লিপির ঘ্যানঘ্যান ভালো লাগে না। এত সন্দেহ করে। লিপিরে বুঝাও। তারে বলো অনন্যারে তুমি চিনো না। তার সঙ্গে তুমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ নাই। সে কুনোদিন এই অফিসে আসে নাই, আসবে না। …কমল। নির্বাহী সম্পাদক হঠাৎ থমকে গেলেন। …অনন্যা আফরিন কি সত্যিই কুনোদিন আসবে না? সত্যি কথা বলি আজম ভাই। কমল উত্তর দিতে একটুও দেরি করল না। আমার মাঝেমাঝে মনে হয় আসবে। আসবে? মনে হয়। আমারও এই রকম মনে হয় কমল। হয়তো আসবে। নীল রঙের শাড়ি, কপালে টিপ, চঞ্চল চোখ…। আজম ভাই, মেয়েটার চোখ ভেজা ভেজা…। চুপ। মেয়েটা আসবে। জিজ্ঞেস করবে নির্বাহী সম্পাদক কোথায় বসেন? জিজ্ঞেস করবে পাঠকের পাতা কে দেখেন? নির্বাহী সম্পাদক হতাশ চোখে কমলের দিকে তাকালেন তুমারে নিয়া পারলাম না। শুনো, বাদ দাও। দিলাম। তবে মেয়েটা আসতেও পারে, তাই না? পারে তো বটেই। আমরা বরং অপেক্ষা করি। কী কও? কমল সামান্য মাথা ঝাঁকাল হুঁ, অপেক্ষা করি। আসুক। আসুক একদিন। আসবে যে না, এটা তো আমরা বলতে পারি না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত