রক্ত থেরাপী

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comনিজের নিস্তেজ শিন্নের দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছেন জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর।

না, রক্ত থেরাপী গল্পের প্রধান চরিত্র জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর ভারতের মোগল সম্রাট নন। তিনি এই সময়ের বাসিন্দা। থাকেন ঢাকা শহরে সম্প্রতি কেনা একটি দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে। গত রাতেও তিনি ঘুমুতে যাবার আগে প্রশাব করেছেন। স্পষ্ট মনে আছে, চমৎকার ছিল তার প্রশাব। যা তিনি জন্মের পর থেকে করে আসছেন। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কি ঘটলো শরীরের মোহাফেজখানায়, যে তার প্রশাব আর প্রশাব নেই। শিন্নের নল বেয়ে প্রশাবের পরিবর্তে নামছে লাল তাজা টাটকা রক্ত।

রক্ত! কেনো রক্ত আসছে? কই শরীরে কোনো জ্বালাপোড়া নাই। রাতে ঘুমও হয়েছে ভালো। তাহলে? কেনো আসছে এই রক্ত প্রশাব? কোত্থেকে আসছে? জহিরউদ্দিন অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন শিন্নের দিকে। এখনও ফোটা ফোটা পড়ছে। কাকে বলবেন তিনি অগ্নি নয়, শিন্নের রক্ত উৎপাতের ঘটনা? কে বিশ্বাস করবে? হাতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি, আটটা পনেরো বেজে দশ সেকেন্ড। আর দশ মিনিট পর অফিসের গাড়ি আসবে। দ্রুত তিনি বাথরুম থেকে বের হলেন। কিন্তু বাথরুমে প্রবেশের আগের জহিরউদ্দিন আর এই মাত্র বের হওয়া জহিরউদ্দিন- দুই জহিরউদ্দিনের মধ্যে অনেক ব্যবধান।

জহিরউদ্দিনের স্ত্রী জোবেদা সুলতানা নাস্তা সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন। জোবেদা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এতো দেরী হলো যে বাথরুমে?
এমনিই, খেতে বসলেন জহিরউদ্দিন।
বলার মধ্যে এমন একটা হতাশার সুর অনুভব করলেন জোবেদা সুলতানা, আমূল চমকে উঠলেন। জানেন তার স্বামী জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর যদিও পরাক্রমশালী মোগল সম্রাট নন, কিন্তু সংসারে, অফিসে একটা ঠাট বজায় রেখে চলেন। সবাই তাকে সমীহ করে। চলায়, বলায় প্রবল ব্যক্তিত্বের প্রকাশ আছে। কণ্ঠে থাকে জৌলুশমাখা হুকুম। জোবেদা সুলতানা অনুভব করলেন, তার স্বামীর কণ্ঠে সেই হুকুম বা তেজ নেই। এই কণ্ঠ খুব বেমানান। তিনি স্বামীর কাছে এসে দাঁড়ালেন, তোমার কি শরীর খারাপ?

জহিরউদ্দিন কি উত্তর দেবেন? তিনি স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়ে রুটি দিয়ে সবজি খেতে শুরু করলেন। কিন্তু তিনি জানেন, যতক্ষণ উত্তর না পাবেন, ততক্ষণ জোবেদার কাছ থেকে নিস্তার নেই। একটা কিছু বলা দরকার। কি বলবেন? বলবেন আমার শিন্ন দিয়ে প্রশাব নয়, টাটকা রক্ত পড়ছে! অথচ কোনো ব্যথা পাচ্ছি না। কিন্তু এমন হলো? এই মুর্হতে তো প্রশাবও আসবে না। আসলে বাথরুমে ঢুকে আর একবার দেখতেন, মাত্র কয়েক মিনিট আগে যা ঘটেছে তার জীবনে, সেটা সত্যি নয়। সত্যি কি করে হয়? মানুষ হাজার হাজর বছর ধরে প্রসাব করে আসছে। কিন্তু সাদা প্রসাবের পরিবর্তে পেটের ভেতর থেকে নেমে আসছে লাল লাল আর লাল রক্ত। জহিরউদ্দিন একটা রুটির সামান্য অংশ ভাজি দিয়ে মুখে দিলেন। মুখে গহব্বরে খাবারের স্বাধ পাচ্ছেন না। এক গ্লাস পানি গলায় ঢেলে বের হয়ে অফিসের জন্য বের হয়ে গেলেন। জোবেদা সুলতানা তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ সংসার জীবনে এই প্রথম মানুষটা না বলে অফিসের জন্য নেমে গেলেন। ঘটনা কি? জোবেদা কোনো কিছু ভেবে পেলেন না।

অফিসে এসে জহিরউদ্দিন গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। সামনে বেশ কয়েকটা জরুরী ফাইল। দেখে সই করা দরকার। পিওন এক কাপ চা আর একটা টোস্ট দিলে তিনি বললেন, এক গ্লাস পানি দে সুকুমার।সুকুমারও অনেক দিন ধরে জহিরউদ্দিনের পিওন হিসেবে কাজ করে আসছে। স্যারের মতিগতি মোটামুটি জানা। নিশ্চয়ই বাসায় ঝামেলা ঘটেছে! দ্রুত এক গ্লাস পানি এনে দিলে জহিরুদ্দিন ঢক ঢক খেয়ে নিলেন। পানি খাওয়ার পর শুন্য গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে তিনি ঝিম মেরে বসে রইলেন। ভাবছেন, কেনো এমন হচ্ছে? আমি যা দেখলাম সেটা সত্যি? নাওতো হতে পারে। হয়তো প্রশাবের সময়ে ভূল দেখেছি। জহিরউদ্দিনের ভাবনার মধ্যে প্রশাবের বেগ অনুভব করেন। দ্রুত তিনি বাথরুমে ঢোকেন। এবং প্রসাবের সময়ে দেখতে পেলেন, সকালের প্রশাবের সেই সাপের ফনা গতিতে রক্তের মতোই লাল রক্ত বের হয়ে আসছে…। প্রসাব করতে করতে জহিরউদ্দিন বিভ্রান্ত বোধে আক্রান্ত হলেন। শরীর অবস হয়ে আসছে। চক্ষু বুঝে তিনি প্রসাব শেষ করেন। প্রসাব শেষ করে তিনি কমোডের ভেতরে তাকান। ভেতরে লাল লাল আর লাল…।

রাতে শোয়ার সময়ে জোবেদা সুলতানাকে সব ঘটনা খুলে বললেন। জোবেদা অবাক চোখে জহিরউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তুমি কি দেখতে কি দেখেছো, জোবেদার সংশয়ী কণ্ঠ। না, আমি নিশ্চিত। নিজের প্রশাব নিজে দেখেছি। বার বার দেখেছি, জহিরউদ্দিনের গলায় অসহায় হাহাকার। কাউকে কিচ্ছু বলতে পারছি না। কোথায় যাবো কি করবো বুঝতেও পারছি না।
মোট কয়বার দেখেছো?
তিন চার বার।
তিন চার বার?
হ্যাঁ।
প্রসাবের সময়ে ব্যথা পাও?
না। কোনো ব্যথা নেই। কেবল রক্তলাল প্রশাবটা বের হয়ে আসে। একেবারে টাটকা। আচানক ঘটনা! প্রসাবে রক্ত যায় অথচ ব্যথা পাও না! এইটাতো হতে পারে না। আচ্ছা, শরীরের ভেতরে কোনো যাতনা, ব্যথা…।
না, সব স্বাভাবিক।
ডাক্তারের কাছে চলো।
কিন্তু ডাক্তারকে কি বলবো?
যা ঘটেছে সেটাই বলবে। নিশ্চয়ই ডাক্তাররা জানে…

জহিরউদ্দিন বিকেলে পরিচিত ডাক্তারের খোঁজ করেন। বাসার কাছে কয়েকজন খুব পরিচিত ডাক্তার বসে। যাদের সঙ্গে বিকেলে বা অবসরে গল্প করেন। কিন্তু সেইসব পরিচিত ডাক্তারদের কাছে যেতে চান না জহিরউদ্দিন। এখনও নিজে আর স্ত্রী জোবেদা ছাড়া কেউ জানে না জহিরউদ্দিনের এই সর্বনাশষা রোগ বা রক্ত প্রশাবের ঘটনা। তিনি রাস্তায় বের হলেন বিকেলের দিকে। এলেন গ্রীনরোডে। গ্রীনরোডে ডাক্তারদের কারখানা। ঘুরে ঘুরে কয়েকজন ডাক্তারের সাইনবোর্ড পড়েন। বড় বড় ডাক্তার। বড় বড় উপাধি এফ আর সিপি এস, অমুক তমুক দেশ বিদেশের নানা ডিগ্রী দেখে একটা চেম্বারে ঢোকেন তিন। দশাসই রাশভারী ধরনের মানুষ তিনি। মুখে হালকা কিন্তু বেশ লম্বা দাড়ি। জহিরউদ্দিনকে দেখেই ওয়েটার দাঁড়িয়ে যায়, আপনার সিরিয়াল নাম্বার কতো?

আমিতো নাম লেখাই নি। তাহলে এখনই নাম বলুন। জহিরউদ্দিন নাম বলেন। ওয়েটার সিরিয়ালে নাম লেখে তাকায়, আপনার সিরিয়াল বাইশ নাম্বার। রাত দশটার পরে আসুন। রাত দশটার পরে আসবো?
হ্যাঁ। সিরিয়ালের আগেতো দেখানো যাবে না। আর ডাক্তার এখনও আসেনি। আপনি তো অনেক আগে এসেছেন। ঠিক আছে, রাত দশটার পরেই আসবো।

জহিরউদ্দিন স্ত্রী জোবেদাকে বলে আসেন নি। বললে, সঙ্গে আসতে চাইবে। স্ত্রীর সামনে ডাক্তার কি না কি বলে, ভয়ে ভাবনায় না বলেই চলে এসেছেন দুপুরের ভাত খেয়ে। কিন্তু এই কয়েকঘন্টা কোথায় কাটাবেন তিনি? অনেক ভেবে বাসায় গেলেন। একটা ঘুম দিয়ে ওঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মাত্র পাঁচটা বাজে। উসখুশ করতে করতে জোবেদাকে বললেন, চলো আমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে।

রাতে ডাক্তার আবু রায়হানের সামনে সব খুলে বললেন জহিরউদ্দিন, সব শুনে ইউরোজলির ডাক্তার রায়হান অবাক হয়েছেন। ডাক্তার বেশ কয়েকবার পাত্রে প্রশাব দেখলেন। না, কোনো গন্ধ নেই। এক ধরনের লাল টাটকা রক্ত তরল দেখছেন। গম্ভীর ডাক্তার। বললেন, আমি আমার স্যারদের সঙ্গে আপনার প্রশাব নিয়ে কথা বলবো। দেখি, তারা কি বলেন। আপনি আগামী বোরবারে আসুন।

পরের রোববারে ডাক্তার আবু রায়হান জানালেন, আপনার রক্ত প্রশাব নিয়ে আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করেছি কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে আপনার প্রশাবে ক্ষতিকর কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি। ল্যাবরেটরির ট্যাকনিশিয়ানরাও অবাক হয়েছেন। এই রক্ত প্রসাব থেকে আমার মুক্তি নেই? হাহাকার করে ওঠেন জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর। কেনো আমার এই অবস্থা? টেবিলের উপর মাথা রাখেন। পাশে বসা জোবেদা হাত ধরেন বিধস্থ স্বামীর।

ডা. আবু রায়হান গম্ভীর মুখে চেয়ারে হেলান দিলেন, দেখুন আজকাল পৃথিবীর নানা দেশে হঠাৎ হঠাৎ অজানা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। বিজ্ঞানিরা গবেষণা করছে। কিন্তু সব রোগের হদিশ খুঁজে পাচ্ছে না। গত সপ্তাহে আপনি চলে যাওয়ার পর নেটে অনেক সার্চ করেছি। আমার ডাক্তার স্যারদের সঙ্গেও আলাপ করেছি। একজন স্যারতো বললেন, এসব কোনো রোগই হতে পারে না। হয়তো আপনার মধ্যে কোনো মনোবিকৃতি দেখা দিয়েছে।

হাহাকার করে ওঠেন জহিরুদ্দিন, শুনলে জোবেদা? ডাক্তার কি বলছে? আমার নাকি মনোবিকৃতি ঘটছে? আমি বলিনি কিন্তু জহিরুদ্দিন সাহেব। বলেছেন একজন ডাক্তার।

এখন আমি কি করবো? এক কাজ করেন ডা. আবু রায়হান ঝুঁকে টেবিলের কাছে আসেন, আপনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলোজি ডিপার্টমেন্টে যান। ওখানে অনেক খ্যাতিমান ডাক্তার আছেন।
আপনার পরিচিত ডাক্তার আছেন?
হাসেন ডাক্তার, থাকবে না কেনো? ডাক্তার খস খস করে দুজন সিনিয়র ডাক্তারের নাম লিখে দিয়ে বললেন, ডাক্তার জায়েদ ইকবাল কেবল দেশের না, বিদেশেও ইউরোলজির বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আর ডা. জহির আলীমও ইউরোরজির বিখ্যাত ডাক্তার। এদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

জহিরুদ্দিন বের হয়ে এলেন স্ত্রী জোবদোর হাত ধরে। পরের দিন ডা জায়েদের সঙ্গে দেখা করলেন। সব শুনে ভ্রু কুঁচকালেন। পুরোরো রিপোর্ট বাতিল করে তিনি প্রসাবের আট প্রকারের, রক্তের পাচঁ প্রকারের পরীক্ষা দিলেন। প্রত্যেকটি পরীক্ষা খুবই ব্যয়বহুল। কিন্তু জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর বলে কথা! এই ঢাকা শহরে রয়েছে তার তিন তিনটি ফ্ল্যাট। একটায় থাকেন স্বপরিবারে। বাকি দুটো ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। আয় করেন ভালোই। বেতনের চেয়ে বিকল্প আয় তার বিশগুন। তো…।

জায়েদ ইকবালের আন্ডারে ছয় মাস চিকিৎসা নিলেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। বেচারা জহিরুদ্দিন একেবারে ভেঙ্গে পড়েছেন। জায়েদ ইকবালের পরামর্শে গেলেন থাইল্যান্ডে বামরুনগ্রান্ড হাসপাতালে। পৃথিবীর বিখ্যাত হাসপাতাল। সেখানে অবাক রোগ নিয়ে ডাক্তারেরা গবেষণায় বসে। বামরুনগ্রান্ড হাসপাতালের ডাক্তারেরা নতুন রোগের নতুন রোগী পেয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। ডাক্তারদের হাতে অনেক ধরনের পরীক্ষার মধ্যে ডুবে গেলেন জহিরুদ্দিন। সঙ্গে স্ত্রী জোবেদা সুলতানা। পানির গতিতে টাকা খরচ হচ্ছে। যাক টাকা, সুস্থ জীবন চান জহিরুদ্দিন। টাকার টান পড়লে বিক্রি করে দিলেন কলাবাগানের পনেরো’ শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। একমাস বামরুনগ্রান্ড হাসপাতালে থেকে এলেন দেশে। দামী ওষুধ খাচ্ছেন। কিন্ত প্রশাব আর সাদা হচ্ছে না। বিষাদগ্রস্থ জহিরুদ্দিন একবার রাগ করে বাসার সব ঔষুধ ফেলে দিলেন জানালা দিয়ে। জোবেদা ধমক দিলেন, জানো তুমি কতো টাকার ঔষুধ ফেলে দিলে? এগারো হাজার টাকার ঔষুধ ফেলে দিলে।

তুমি আমার সামনে দিয়ে সব ঔষুধ নিয়ে যাও কিন্তু আমাকে স্বাভাবিক প্রশাব এনে দাও। কি হবে ঔষধ খেয়ে, যখন কোনো কাজই হচ্ছে না। বামরুনগ্রান্ড হাসপাতালের ডাক্তার তোমাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছেন। তোমার রোগ নিয়ে সাড়া দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে। তোমার রক্ত প্রসাব নিয়ে দেশে দেশে গবেষণা হচ্ছে অপেক্ষা তো করেছো, আর একটু ধৈর্য্য ধর। রাগে গজ গজ করেন জহিরুদ্দিন, বলা খুব সহজ। যে অসুস্থ সেই জানে ধৈর্য কেমন!

মাস খানেক পর বামরুনগ্রান্ড হাসপাতাল থেকে ফোন। সুইজারল্যান্ড, বৃটেন আর যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোলজির বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে একটি প্যানেল তৈরী করা হয়েছে। তারা নতুন চিকিৎসা শুরু করবে। জহিরুদ্দিন আবার উড়লেন থাইল্যান্ডের পথে। সঙ্গে স্ত্রী জোবেদা সুলতানা। জহিরুদ্দিনের রক্ত প্রশাব নিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত গবেষণা করছেন কিন্তু কেনো প্রসাব রক্তের মতো লাল, তার কোনো ক্লু আবিষ্কার করতে পাচ্ছেন না। এমন কি জহিরুদ্দিনের প্যানিস নিয়েও নানা ধরনের নিরীক্ষা করলেন, উত্তর শূণ্য। দেশে বিদেশে প্রায় দু বছর চিকিৎসার পরও কোনো জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের মুত্র বিষয়ক জটিলতার সমাধান হলো না। তিনি বিষন্ন এবং বিপন্ন মনে দেশে ফিরে এলেন। সংসারের খরচ, চিকিৎসার খরচ মিলে অবস্থা খুবই করুণ। অন্যদিকে অফিসের ছুটি নেই। সরকারি চাকরির কারণে এতোদিন ছুটি কাটাতে পারলেন। সবদিক বিবেচনা করে, ধারের টাকা শোধ করার জন্য দ্বিতীয় ফ্ল্যাটটিও বিক্রি করে দিলেন। ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা দিয়ে ধারদেনা শোধ করে দিলেন জহিরুদ্দিন।

অনেক দিন পরে জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর অফিসে গেলেন। সহকর্মীরা ছুটে এসেছে। নানাভাবে শান্তনা দিচ্ছেন। জহিরুদ্দিন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নেয়ার চেষ্টা করলেন। লোকজন চলে গেলে নিজের রুমে, নিজের চেয়ারে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফ্যান ছেড়ে, এক গ্লাস পানি সামনে রাখে সুকুমার। প্রায় দু বছর ধরে সুকুমারের দিনকাল খারাপ যাচ্ছে। কারণ, বস নাই। ফাইলের আনাগোনা নাই। ফাইলের আনা গোনা না থাকলে নগদ নারায়নের আমদানীও থাকে না। দিনে কম পক্ষে সাত আট- নয়টা, কোনো কোনো দিন আরও বেশি ফাইল রুমে আসে। প্রতিটা ফাইল থেকে একশো টাকা কামালে দিরে এক হাজারের মতো, মাসে? বড় স্যার জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর আবার অফিসে আসায় সুকুমারের আয় রোজগারের দরজাও খুলে গেছে। দুপুরের পর পরই সুকুমার একটা ফাইল নিয়ে রুমে ঢোকে, স্যার!

কি সুকুমার?
ফাইল-
জহিরুদ্দিন জানেন, সুকুমারের এই চিকন গলার ব্যকরণ। জিজ্ঞেস করেন, কোন পার্টির কতো টাকার ফাইল?
স্যার ফাইল হলো আগা শাহীর। আর আঠারো লাখ টাকার ফাইল। এক পার্সেন্ট দিতে রাজি হয়েছে। সই করলে পাবেন আঠারো হাজার …।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন জহিরুদ্দিন, তুইতো জানিস তিন বছর আগে পবিত্র হজ্ব করে আসার পর আর ঘুষ খাইনি। কিন্তু কি হলো? আমি কঠিন দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলাম। যার চিকিৎসা দুনিয়ায় নাই। চিকিৎসা করাতে করাতে এখন আমি নিঃস্ব, পথের ফকির। একটু আয় রোজগার না করলে না খেয়ে মরতে হবে বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে। বন্ধুর কণ্ঠে উত্তর দেয় সুকুমার, “জানিতো স্যার।”

ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে যা, নগদ নিয়ে আয়। আর শোন, সুকুমার মুখের কাছে কান আনলে তিনি বলেন, খুব গোপনে কাজ করবি। কেউ যেনো জানতে বা বুঝতে না পারে। আকর্ণ হাসি ফোটে সুকুমার পোদ্দারের মুখে, আমার উপর ছেড়ে দিন স্যার। কাক পক্ষীও টের পাবে না।

পরের দিন সকাল থেকে জহিরুদ্দিস মুহম্মদ বাবরের প্রশাব স্বাভাবিক। একেবারে আগের মতো…।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত