Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,monika

ইরাবতী এইদিনে গল্প: ছায়ান্ধকার । মণিকা চক্রবর্তী

Reading Time: 11 minutes 

আজ কবি, কথাসাহিত্যিক ও সঙ্গীতশিল্পী মণিকা চক্রবর্তীর শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

আজকের বিষণ্নতার অনুভবটি পুরো স্নায়ুতে ছাপ ফেলেছে। রোজই গভীর মনখারাপ নিয়ে ঘুম ভাঙে। আজকের বিষণ্নতার রঙটি অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। আকাশটায় মেঘ করেছে।  ছাদের বাগানে পায়চারী করতে করতে রোখসানা ভোরের নির্মল বাতাসের আবেশটুকু টেনে নেয় নিজের শরীরে। মাত্র পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি বয়স। তবু এই টান-টান শরীর জুড়ে একরাশ ক্লান্তি টের পায়। কেন যে এই বয়সেই! এই অদ্ভুত ক্লান্তিতে রাত্রিতেও তার ভালো ঘুম হয় না। ডাক্তার দেখিয়েছে বেশ কয়েকবার। শুধু একই পরামর্শ ‘হাঁটুন, কমপক্ষে তিরিশ মিনিট’। কিন্তু মালিবাগের এই ঘুপচি গলির বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে যাওয়া তার পক্ষে একটা গোলমেলে ব্যাপার ছাড়া আর কিছু না। তাছাড়া গলির ভিতর থেকে বের হতে গেলে হাজারটা বাধা। শুক্র শনিবার ছাড়া প্রতিদিনই সকাল সাতটার আগেই ছুটতে হয় স্কুলে, মেয়েকে নিয়ে। বাইরের খোলা জায়গায় হাঁটার সময় কোথায়! একমাত্র সন্তান সাবিহা। এবার ও লেভেল পরীক্ষায় বসবে। স্কুলের পরে আছে মেয়ের কোচিং নিয়ে দৌড়ানো। এ অল্প সময়ের মধ্যেই ডিপার্টমেন্টাল থেকে বাজার সেরে কেবল ছুটতে থাকা। রাস্তার চারপাশে গিজগিজ করে লোকজন, ঠেলাগাড়ি, রিকশা, হিংসা-প্রতিহিংসা। হিংসার কবলে বেশ কয়েকবারই পড়েছে তাদের নতুন কেনা গাড়িটা। যেন ইচ্ছে করেই রিকশাচালকেরা টার্গেট করে নতুন গাড়িটাকে। আর ঠিক-ঠাক ছাল-চামড়া তুলে দিয়ে দারুণ নির্বিকার। ড্রাইভারদের বকাঝকা করে কোনো লাভ হয় না। বরং কিছুটা স্বস্তিকর পরিবেশ আরও বেশী অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। নতুন গাড়ির দৈন্যদশা দেখে সাবিহার আব্বু আরমান উত্তেজিত হয়ে হই-হল্লা করে বাড়ির সবার ওপর। রোখসানা তখন আরমানের মুখের এসব হল্লা আর  ঢাকাইয়া গালি-গালাজ শুনতে শুনতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অথবা সে বিস্মৃত হতে চায় তার চারদিকের সময় থেকে। নোনা ধরা একঘেয়ে, আর ক্লান্তিকর জীবনের মধ্যে থেকে পালানোর জন্য সে উঁকি দিতে থাকে, তার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে। এক বিরামহীন হতাশায় পেয়ে বসে। সে জানে এই হতাশাই তার সকল রোগের কারণ, যার কারণ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই কী রাতে ঘুম হয় না! মন জেগে থাকে অন্য কোনো এক আকাঙ্ক্ষায়! নীল আকাশ…সাদা সাদা মেঘ…বেলী ফুলের গন্ধ আরও কত কী আছে! আছে কী! ভালো লাগার! ভালো থাকার!

২.

মেয়ের স্কুলের পাশেই একটা ছোটখাট নার্সারি। যেদিন মেয়ের ছুটি হতে দেরি হয়, অথবা  স্কুলে অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে আড্ডা জমে না, সেদিন রোখসানা ঢুকে পরে নার্সারিতে। নানা রূপের ফুলের গন্ধ আর রঙ দেখতে দেখতে সময়টা বেশ কেটে যায়। ছোট্ট একটু জায়গায় চারা গাছগুলি দারুণ সজীব আর সুন্দর। এত ছোট্ট জায়গাতেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে টিকে আছে। অথচ এই জায়গা থেকেই গাছ কিনে তার নিজের ফ্ল্যাটের ছয়তলার ছাদে ওদের যত্ন করে লাগিয়েছিল। দু বছর হতে চলল, একটা গাছেও ফুল আসেনি। ছাদের উপর কত বেশি জায়গা নিয়ে ওদের রেখেছে! কত আলো! হাওয়া! ধূর! নিজের ওপর দারুণ অভিমান হয় ওর! কেন যে ফুলগুলি ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়! টগর গাছে দুটি কলি এসেও ঝরে গিয়েছিল। চৌকোনা প্লাস্টিকের টবের উপর ডালপালা মেলে দেয়া এত বড় একটা টগর গাছ! কোনো ফুল নেই। তবু ভালো লাগে যে, ভোর বেলা দু-চারটি চড়ুই আর ফড়িং আসে। ছাদে হাঁটতে হাঁটতে ওই সৌন্দর্যটুকু দুচোখে মেখে নেয়া যায়। পাওয়া যায় বাড়তি একটু অক্সিজেন।

আজ ভোরে হাঁটতে গিয়ে একটা রহস্যময় ব্যাপার খেয়াল করল রোখসানা। তার কাঠগোলাপ গাছের নিচে টবের কোণার মাটিতে দুটি সিগারেটের অনেকটা পোড়া অংশ। গতকালও টগর গাছের নিচে এই বস্তুটি দেখেছে, কিন্তু আজকের মতো বিশেষভাবে খেয়াল করেনি। এখন তার স্পষ্ট মনে পড়ছে যে তারও দুয়েকদিন আগে এই জিনিসটি সে দেখেছে। একটু অবাক হবার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তিত আর সতর্ক হয়ে ওঠে সে। কে ওঠে এই ছাদে! খুব আয়েশ করে ছাদে উঠে সিগারেট খাওয়ার মতো কোনো মানুষ এই বিল্ডিংয়ে নেই। এ বাড়ির সব পুরুষেরাই ব্যবসায়ী। অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেই ঘুমিয়ে পরে। তাছাড়া এরা সর্ম্পকে রোখসানার আত্মীয় সর্ম্পকের। সিগারেটের বাতিক তেমন কারোরেই নেই। ছয়তলা বাড়ির প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটেই রোখসানার মামাতো—চাচাতো ভাইবোনেরা রয়েছে। কেউ ভাড়া থাকে, কেউ কিনে নিয়েছে। শুধু দোতলার একটি ফ্ল্যাটে এক নিঃসন্তান মাঝবয়সী দম্পতি ভাড়া থাকে। কিন্তু গত দুমাস ধরে ওই বাসায় তালা দেয়া। সেই দম্পতি চিকিৎসার জন্য দিল্লি গেছে। ঠিকা বুয়ার কাছে এই খবরটি সে পেয়েছে দশ-বারো দিন আগে। তাহলে ছাদে এসে সিগারেট টানছে কে? বুঝতে পারছে না রোখসানা। চিন্তার একটা ঘূর্ণি মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

সন্ধ্যার পরে সাবিহাকে নিয়ে নাস্তা খাবার সময় রোখসানা তার এই গভীর চিন্তার মৃদু উত্তেজনাটা আর চেপে রাখতে পারে না। মেয়েকে অনায়াসেই বলে ফেলে, তার চিন্তার কারণ। মেয়ের সঙ্গে সে তার অনেক অভিজ্ঞতা ও চিন্তা ভাগ করে নেয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে মেয়েটি তার বন্ধুর মতোই। কারণ আরমানকে সে বন্ধু হিসেবে কখনো কোনো কাজে বিশ্বস্ত মনে করেনি। দৈনন্দিন জীবনে আরমান এতটাই অভ্যস্ত যে, রোখসানার গভীর ও শীতল অনুভবগুলো সে কোনোদিনও বুঝবার চেষ্টা করেনি। তার নিজের বিষণ্নতা, চোখের জল, নিঃসঙ্গতা সবকিছুই তার একার।

অবসরে সাবিহা বই পড়ে সময় কাটায়। বইয়ের গল্পগুলো সে মাকেই বলতে পছন্দ করে। যাই হোক সন্ধ্যার নাস্তার টেবিলে মায়ের চিন্তার উৎসটিকে সে খুব চমৎকারভাবে শান্ত করে দেয়।

‘আম্মু তুমি জান না! দোতলার ওই আন্টির ক্যান্সার ধরা পড়েছে দিল্লিতে। কেমো দিতে হবে। ওই বাসায় এখন আঙ্কেলের ভাইয়ের ছেলে থাকছে। ওই লোকটির বয়স হয়েছে, বিয়ে করেনি। বোহেমিয়ান। লম্বা চুল রেখেছে। তার গলায় বেল্টের সাথে বাঁধা একটা ছোট্ট কিউট বিড়াল আছে। লোকটি  নাকি লেখাপড়া শেষ করেছে দেশের বাইরে। ওখানেই থাকে। এখন বেড়াতে এসে এ বাড়িতেই থাকছে।’

সাবিহা! কী আর্শ্চয! তুই এত খবর কোথা থেকে জানলি!

পরী বুয়া বলেছে। ওদের বাসায় কাজ করে। সিঁড়িতে লোকটির সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হয়। সে প্রচুর বই পড়ে। আমি ওর কাছ থেকে বইও ধার এনেছি। আমি হুমায়ূন আহমেদের ‘মিসির আলি’ সিরিজটির অনুবাদ নিয়ে ওর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি।

কী বললি! রোখসানা চমকে ওঠে! তুই ওই লোকের কাছ খেকে বই আনলি! আমাকে না জানিয়ে! তুই চাইলে আমি কিনে দিতাম না!

আম্মু এত সিরিয়াস হচ্ছ কেন! এটা কোনো ব্যাপার! একটা সিলি ম্যাটার নিয়ে তুমি হইচই শুরু করলা!

তোর আব্বু জানলে ওই ব্যাটারে কী করবে তুই জানস! বলবে ব্যাচেলর লোক এ বাসায় থাকে কোন সাহসে!

আব্বু জানবে কেন! তুমি বলবা! তাছাড়া লোকটি ব্যাচেলর না। বিয়ে করেছিল। গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

বোকার মতো, নিজেকে গুটিয়ে স্তম্ভিত হয়ে থাকে রোখসানা। এই ছোট্ট মেয়েটিই না সেদিন তার কোলে ছিল! অথচ এখন কত বড় হয়ে গেছে! রোখসানা যেন চিনতে পারছে না মেয়েকে। মেয়ের এই হঠাৎ বড় হয়ে যাবার অপ্রত্যাশিত বিষয়টা চুপ করিয়ে দেয় রোখসানাকে। সত্যিই! সাবিহা এখন অনেক কিছু বোঝে। তার চিন্তাও অনেকটাই পরিণত।  তার মনে পড়ে এই বয়সে রোখসানা কখনো পরিণত চিন্তা করতে শিখেনি। পরিণত চিন্তা করতে না পারার অন্যতম কারণ ছিল অভিভাবকদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত। আর মেয়ে সন্তানের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এমন কি আরমানকে বিয়ে করার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও তার সময়ে সে নিশ্চুপভাবে মেনে নিয়েছে। এখন সময়টা কত বদলে গেছে! এরা ইংরেজিতে পড়ে, ইন্টারনেটে থাকে। তাই এই বয়সেই এদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা আর বাকশক্তি অন্যরকম।

যাই হোক এসব কথাবার্তার পর রোখসানার ভিতরের চাপটি অনেকাংশেই কমে যায়। কিন্তু অন্য একটি উল্টোমুখী চাপ ভিতরে ভিতরে তাকে আনমনা করে রাখে। এখন ভোরে উঠে বাগানে গেলে সে খুব আন্তরিকভাবে খেয়াল করে, সিগারেটের কোনো টুকরো তার টবের কিনারে পাওয়া যায় কিনা! যদি পাওয়া যায়, তবে ধরে নিতে হয়, কাল কেউ এখানে এসেছিল। সে কি সত্যিই এসেছিল! অর্থাৎ বাগানটি এখন রোখসানার মতো অন্য একজনেরও ভালো লাগে! সে কী অনেকক্ষণ ছিল এখানে! কতক্ষণ! সে ও কী আমারই মতো ছুঁয়ে দেখেছিল আমার টগর আর কাঠগোলাপ গাছটিকে! রোখসানা ঘুরে ঘুরে বেড়ায় মনের ভিতরের এক অদ্ভুত চিত্রকল্পের মধ্যে। আর এই ভালোলাগার বোধটাই কেমন করে যেন সকালের রুপটিকে আরও বেশি সুন্দর করে তোলে। বাতাসে ছড়িয়ে থাকে উড়ে আসা ভালোবাসার ঘ্রাণ।

কোনো একদিন ভোরবেলায় লোকটির গমগমে গলার স্বরে চমকে ওঠে রোখসানা।

গতকাল মাঝরাত থেকেই বাগানে বসে আছি! স্যরি, আপনার অসুবিধা করলাম না তো!

রোখসানা বিব্রত মুখে বলে, না আমার কোনো অসুবিধা নেই। তবে আপনি মাঝরাত থেকে এখানে কেন!

মাঝে মাঝে ঘুম হয় না। ঘরের ভিতর মনে হয় অক্সিজেনের অভাব। খুব সাফোকেটিভ লাগে।

তাহলে একটু পার্কে যেয়ে হাঁটতে পারেন!

পারি! তবে বিড়াল ছানাটিকে নিয়ে খুব অসুবিধা হয়। আপনার মেয়ে সাবিহার সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়। এই ছাদের ঠিকানা ওই আমাকে দিয়েছে। বলেছে, বিড়াল নিয়ে আমি এখানে স্বাচ্ছন্দে আসতে পারি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি খুবই কনফিউসড। আপনার অসুবিধা করছি নাতো!

রোখসানা মৃদু হেসে বলে, না। কিন্তু মনে মনে সতর্ক হয়। (কেউ দেখলে আবার কী ভাবে! তবে এই সময়ে কেউ ছাদে আসবে না। নিশ্চিত।) আচ্ছা, আপনার ছোট্ট বিড়ালটি কোথায়! এখন দেখছি না যে!

একটু আগে এখানে ছিল। ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওকে ওর বিছানায় রেখে এসেছি।

রোখসানা ওড়নার আড়ালে মাথা ঢেকে রেখে লোকটিক দেখে। তাকে যুবকই মনে হয়। একটু বয়স্ক, যুবক। লম্বা, ফর্সা, সুঠাম শরীর। চুলগুলো বেশ কোঁকড়ানো। পিছনে ঝুঁটি করে বাঁধা। ওকে বাঙালি মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে ওর গায়ের রং, খাড়া নাক, কোকড়ানো চুল সবটাই যেন কিরকম!

রোখসানা আবার আলাপ জমায়। বাবা-মা কী করেন! কোথায় আছেন! নাম কী!

লোকটি খুব নির্লিপ্ত ভাবেই বলে, আমি যুদ্ধশিশু। আমি বড় হয়েছি মেলবোর্নে। আমার মায়ের ছবি দেখেছি। তাঁকে আমি দেখিনি। আমার রিয়েল ফাদার যুদ্ধে মারা যায়। মাকে আর পাওয়া যায়নি। আমার পালক বাবা মিশ্যেল মেলবোর্নে আছে। তার বয়স সিক্সটি আপ। তার একটা অ্যানিমেল ফার্ম আছে। আমার বিড়ালটি ওখান থেকেই নেয়া। আমি মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসি। ছোট চাচা দিল্লি যাবার আগে এই বাড়িতেই আমাকে ছুটি কাটাতে বলল। 

রোখসানার কেমন যেন অস্থির লাগে! তার ভিতর থেকে একটা কান্নার রোল উথলে উঠে এই মাতৃহীন মানুষটির প্রতি। মৃদু স্তব্ধতা নিয়ে সে একটু দূরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। কী বলবে ভেবে পায় না।

লোকটি আবার নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকে। যেন পৃথিবীর কোনো রিক্ততার বোধই তার নেই। সে যেন জন্মের আগেই হারিয়েছে যাবতীয় শোকের অভিব্যক্তি।

এভাবে আরও কয়েকদিন রোখসানার সঙ্গে লোকটির ছাদে দেখা হয়। কোনো এক অজানা হাহাকার রোখসানার ভিতরে জন্ম নেয়। আজকাল ওর ডোরাকাটা বাঘের মতো দেখতে ছোট্ট বিড়ালটিকেও রোখসানার খুব প্রিয় মনে হয়। লোকটি যেন তার জীবনে এক অন্যরকম আবিষ্কারের সন্ধান দেয়, যার সঙ্গে তার কখনো পরিচয় ঘটেনি। প্রায়ই লোকটির উপস্থিতি না থাকলেও রোখসানার মনে হয় বাগানের একান্তে লোকটি দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে কথা বলছে।

আচ্ছা আপনি এত ভালো বাংলা কী করে শিখলেন? রোখসানা, একদিন কথা প্রসঙ্গে লোকটিকে জিগ্যেস করে।

আমার পালক বাবা মিশ্যেল এদেশে অনেকদিন কাজ করেছে, যুদ্ধের আগে। বাংলা সে ভালোই শিখেছিল। তবু সে আমার নাম রেখেছে এলেক্স। কখনো কখনো ভালোবেসে ডাকত আলী। আমার আপন চাচার সঙ্গে দেখা হওয়াটাও ছিল আমার ভাগ্যের ব্যাপার। চাচা ব্যবসার কাজে সিডনি গিয়েছিল। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় ছুটির দিনে আমি আমার পালক বাবার সসেঙ্গ সি-বিচে ঘুরছিলাম। আমাদের সঙ্গে চাচার পরিচয় হবার পর আমরা বাংলাতেই কথা বলি। চাচা দারুণ আর্শ্চয হয়। আমাদের বাসায় আসে। তারপর অনেক কথার পরে আমার মায়ের ছবি দেখে আমায় চিনতে পারে। সে এক দারুণ ব্যাপার। সেই ছুটিতেই আমি আর মিশ্যেল প্রথমবার চাচার সঙ্গে বাংলাদেশে আসি। সেবার আমরা হোটেল শেরাটনে ছিলাম। কথাগুলি এলেক্স বলতে থাকে একদমে, অতি উৎসাহে। যেন সে নিজেকে থামাতে পারছিল না।

আর রোখসানা খুব মুগ্ধ হয়ে দেখছিল, এই অতি উৎসাহী মানুষটিকে। সে তার জীবনে কোনো মানুষকে এতটা মুগ্ধভাবে কখনো দেখেছে কি না মনে করতে পারছিল না। সে যেন লোকটির কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কেড়ে নিচ্ছিল তার কথার গতি। যা তার স্থবির জীবনেও নিয়ে আসতে চাইল এক নতুনত্ব।

গত দুমাসে রোখসানা বেশ কিছু নতুন সালোয়ার-কামিজ কিনেছে। এখনো সে বিষণ্নতায় ভোগে তবে এখনকার বিষাদের রঙটি তার ভালো লাগে। এই বিষাদের কোথাও যেন ভালোবাসার আর্তি আছে। তাই এই টান সে নিজের ভিতর বার-বার অনুভব করতে চায়।  বুয়ার হাতের রান্না এখন তার মোটেই ভালো লাগে না। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও সে নিজেই রান্না করে মাটন-বিরিয়ানি। এই খাবারটি এলেক্সের খুব প্রিয়। ভালো কিছু রান্না করলে এলেক্সকে পাঠায়। একদিন সে ছাদে উঠার সময় লুকিয়ে কপালে টিপ পরেছিল। যদিও সেই বিশেষ ক্ষণটি চোখে পড়ে গিয়েছিল সাবিহার। সাবিহা খুব অবাক হয়ে মায়ের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিল। কিন্তু কারণটি সে বিশেষভাবে খুটিয়ে দেখতে চায়নি। কারণ সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এলেক্সের সঙ্গে মায়ের দেখা ও কথা  হতে পারে।


আরো পড়ুন: মণিকা চক্রবর্তীর গল্প রক্তগাছ


৩.

সাবিহা তার স্কুলের রাইটিং ক্লাবে নিয়মিত লিখত। তার বেশিরভাগ টপিকসই ছিল প্রেমহীনতার বোধ নিয়ে। সে প্রায়ই বলত ‘আনকন্ডিশনাল লাভ’  বলতে কিছুই নেই। একদিন সে রোখসানাকে বলছিল, ‘জান আম্মু রোমিও জুলিয়েট যদি বিয়ে করত তবে তার পরদিনই ছাড়াছাড়ি হয়ে যেত।’

কেন!

কারণ, পৃথিবীতে লাভ বা সো কলড ভালোবাসা ব্যাপারটা এক্সিস্ট করে না।

কী বলিস এইসব! তাহলে আমরা যে সংসার করছি এটা কী হাওয়ার ওপর!

হ্যাঁ। তাই। আমি তোমাদের মধ্যে কোনোদিন ভালোবাসার ব্যাপারটাই দেখি নাই। যেমনটা বইয়ে পড়ি! শুধু তোমার কেন! আমি আমার বন্ধুদের মা-বাবার মধ্যেও কোনো ভালোবাসার আচরণ দেখি নাই। বিয়ে জাস্ট একটা বোরিং ব্যাপার। সবাইকে টায়ার্ড হতে দেখি কেবল।

সাবিহা তার এসব কথা স্কুল ম্যাগাজিনে লিখে। রোখসানার ভারী আনন্দ হয় মেয়ের ভাবনাগুলো ছাপার অক্ষরে দেখে। কিন্তু মেয়ের মনের মধ্যে এতসব চিন্তার ভাঙচুর কখনো কখনো তাকে অবাকও করে। সে যেন আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে চায় জীবনের স্থবির রেখাগুলোকে।

এভাবে অনেকগুলো দিন কেটে যায়। মায়ের সঙ্গে এলেক্সের ঘনিষ্ঠতার কথা সাবিহা জানতে পারে না। অন্যদিকে সাবিহার ভিতরে যে একটা রঙের ঢেউ এলেক্সকে ঘিরে পাকদণ্ডী পথে ঘুরে ঘুরে উড়ে যেতে চাচ্ছে—সেটিও জানতে পারে না রোখসানা। তবে সাবিহার আচরণগুলো বদলে গেলে ভারী আর্শ্চয হয়। আবার ভাবে, বয়সন্ধির সময় একটু বেপরোয়া ভাব থাকতেই পারে। তবু একদিন সাবিহার কথায় চমকে উঠে রোখসানা।

আম্মু আমি বাইরে পড়তে গেলে অস্ট্রেলিয়াতেই যাব।

কেন! ইউ এস এ তে কত সুবিধা। ওখানে কেন? আমি শুনেছি অস্ট্রেলিয়াতে পড়ার খরচ  বেশি।

তোমাকে পড়ার খরচ দিতে হবে না। সেটা আমি ম্যানেজ করব। তাছাড়া তখনতো আমি একজন অস্ট্রেলিয়ানকে বিয়ে করে ফেলব!

সাবিহা কথাটা এমনভাবে বলল, এতটাই সাহসের সঙ্গে ও বেপরোয়াভাবে যে রোখসানার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হলো। সে দেখতে পেল একটা অস্বস্তিকর লম্বা ছায়ার ভিতর তাঁর মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।

সাবিহা ও রোখসানার সঙ্গে এলেক্সের ঘনিষ্ঠতার কথা পরী বুয়ার মাধ্যমে ছয়তলাবাড়ির সবখানেই অল্প বিস্তর ছড়িয়ে পড়ল। বিশেষ করে এলেক্সের জন্য রোখসানার স্পেশাল খাবার পাঠানোর বিষয়টা। আরমানের কানেও কথাটি কেমন করে যেন পৌঁছে গেল। বাতাসে ছড়ানো এই খবরাটাকে নিয়ে সরাসরিই জানতে চাইল আরমান। রোখসানা ভবলেশহীন চেহারায় উত্তর দিল, সে কিছু জানে না। এমন নিরেট মিথ্যে কথাটি রোখসানা এমন অকপটে বলল যে সাবিহা চমকে গেল। আরমান সাবিহাকেও এই ব্যাপারে জিগ্যেস করল। সাবিহাও মায়ের মতোই তবে একটু অসাড়ভাবে মিথ্যেটি বলল।

সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে মা-মেয়েতে একটা নীরব দূরত্ব ঘটে গেল। রোখসানা ভাবল , আরমানের সঙ্গে বিবাহিত জীবনে কখনো এমন মিথ্যে বলার প্রয়োজন হয়নি। আজ সে দৃঢ়তার সঙ্গে এই মিথ্যেটি কী করে বলল! নিজের মনের মধ্যে এই ক্ষমতার উৎস কোথায়! তবে কী সে এলেক্সকে ভালোবাসে! রোখসানার যেন নিজের মনেই এক অন্যমানুষ। এই প্রথমবারের মতো আরমানকে তাঁর মনে হলো অনেক দূরের কোনো মানুষ, যার তাকে প্রশ্ন করার কোনো অধিকারই নেই। তাই সেখানে মিথ্যে বা সত্যি বলা কোনোটাই কোনো ভূমিকা রাখে না। পাশাপাশি মনে পড়ল কলেজ জীবনে পড়া একটি কবিতার লাইন। তার মনের ভিতর কবিতার লাইনগুলি এলোমেলো উঠানামা করল।

‘ভালোবাসতে গেলে এমন কোনো নিয়ম আছে যে বয়স হবে কুড়ি পঁচিশ

ভালোবাসায় বয়স কি গো?

ষোলয় যেমন, তেমন করে ষাটে এসেও ফল্গুধারা বইতে পারে ।’

কার কবিতা সে মনে করতে পারল না, কিন্তু কবিতাটির এই তিন লাইন তার ভিতরে দারুণ এক ভালোলাগার প্রতিক্রিয়া তৈরি করল। সে যেন কবেই দৈনন্দিনতার চৌকাঠ পেরিয়ে কখন ছুটে পড়েছে দিগ্বিদিগে।

সাবিহাও নিজের ভিতরে এক অন্য জগৎ আবিষ্কার করল। এতদিন মায়ের সঙ্গে তার কথোপকথনের জায়গাটি যেন আর আগের মতো নেই। এখন তার এলেক্সের সঙ্গেই বেশি বেশি কথা বলতে ভালো লাগে। সে যে মোবাইল ফোনে এলেক্সের সঙ্গে কথা বলে, রোখসানা সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। এলেক্সকে জড়িয়ে মা-মেয়ের জীবনে এক বিপরীতমুখী ঘূর্ণি তৈরি হয়। সময়টা একইসঙ্গে গতিশীল ও স্থির হয়ে থাকে। দুজনের মধ্যেখানে এসে যোগ হয় একখণ্ড স্তব্ধ সময়। ওরা দুজনেই এই সময়টিকে এড়াতে ব্যর্থ হয়। গাড়িতে পাশাপাশি বসে রোখসানা ভাবে ভোরবেলায় এলেক্সের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল! এলেক্স ওর গাছগুলির পাতা ছুঁয়ে দেখার সময় রোখসানার আঙুল স্পর্শ করেছিল, চোখের ওপর চোখ রেখে কথা বলার সময় রোখসানার ভিতর জেগে উঠেছিল অন্য এক মানবী। যাকে সে এভাবে জেগে উঠতে কখনো দেখেনি। সাবিহাও ভাবে গত রাতে সে এলেক্সের সঙ্গে পাউলো কোহেলোর ‘আলকেমিস্ট’ বইটি নিয়ে দারুণ তর্ক করেছিল। এলেক্স খুবই প্রেমে বিশ্বাসী। পাউলো কোহেলোর মতোই। কিন্তু সাবিহা এ আইডিয়াগুলোতে বিশ্বাস করে না। তবু তার এলেক্সকে ভালো লাগে। তার সঙ্গে তর্ক করা যায়, গল্প করা যায়, দুষ্টুমি করা যায়, হাত ধরে নাচ করা যায় কে পপ গানের সঙ্গে। সে যেন জগতের সকল সীমাবদ্ধতা পেরোনো এক মানুষ। তার সান্নিধ্য সবসময়ই ভালোলাগায় ভরে থাকে। আর কারো সঙ্গেই সাবিহার এমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। সাবিহা তার ভাবনার স্তরকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। সে ভাবে এলেক্সের গার্লফ্রেন্ড কেমন ছিল! তার সঙ্গে কেন শেষপর্যন্ত অ্যাডজাস্ট হলো না! সেই গার্লফ্রেন্ডটির জায়গায় নিজেকেই কল্পনা করে। মা-মেয়ে পাশাপাশি বসে একই ব্যক্তিকে নিয়ে ভাবে, কখনো নিজের মনে হেসেও ওঠে, দুজনেই আশ্রয় নেয় এলেক্সকে কেন্দ্র করা কোনো বৃত্তের গভীর বুননে।

৪.

তিন মাস পর। আজ সাবিহার জন্মদিন। প্রতিবারের মতো এবারও এবাড়ির কিছু আত্মীয়-পরিজন আর সাবিহার বন্ধুদের বলা হয়েছে। শরতের শেষের দিকের এই সময়টায় হাল্কা কুয়াশা ঝরে। বৃষ্টি হয় না বলে এই সময়টায় ছাদের ওপর ছাউনি টানিয়ে জমজমাট পার্টির আয়োজন করা যায়। প্রতিবারের মতো এবারও ডেকোরেটারদের খবর দেয়া হয়েছে। সবকিছুই গতবারের মতো। তবে একটি ব্যতিক্রম হলো, এবারে এলেক্সের উপস্থিতি। আগামীদিনই এলেক্সের ফ্লাইট, সকাল সাতটায়। সে দিল্লি হয়ে তবে অস্ট্রেলিয়ায় যাবে। চাচির কেমোথেরাপি এখনো চলছে। তাই এলেক্স দিল্লিতে চাচির সঙ্গে দেখা করে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরবে।  সাবিহা তার জন্মদিনের দাওয়াত অনেক আগেই এলেক্সকে দিয়েছে। এলেক্সের জন্য কেনা হয়েছে খুব সুন্দর নকশা করা পাঞ্জাবি। এলেক্সের ছোট্ট বিড়াল কিটির জন্যও দুতিনটি নরম কাপড়ের লেস দেয়া জামা তৈরি করেছে সাবিহা। আজ সন্ধ্যায় সেই জামার একটি নিজ হাতে কিটিকে পরাবে সে। এমন ভাবনাগুলো মাথায় নিয়েই সকালে স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছিল । কিন্তু আম্মুকে যথাসময়ে রেডি হতে না দেখে, সে ভাবে একটু ছাদ থেকে বেড়িয়ে আসি। আম্মু ততক্ষণে কিচেন থেকে বের হয়ে রেডি হয়ে যাবে। মনের মধ্যে নানা ভাবনার গুনগুন শুনতে শুনতে কখন যেন ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে থাকে সাবিহা। আর স্তম্ভিত হয়ে দেখতে থাকে আম্মুকে আর এলেক্সকে। দুজনে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গল্প করছে। এলেক্সে আর আম্মুর মাঝখানে একটা প্লাস্টিকের বড় টব। তারা দুজনে মিলে বসাচ্ছে মাঝারি আকারের একটা শিউলি গাছ। আম্মু বলছে,  ‘দেখবে, এটাতেও ফুল ধরবে না।’ এলেক্স আম্মুর হাতদুটো মুঠিতে নিয়ে বলছে, ‘অবশ্যই ধরবে। এখানকার সবগুলো গাছেই ফুল ধরবে। তুমি এতটা দূরে দূরে রেখেছ কেন গাছগুলোকে! ওদেরকে কাছাকাছি রাখ। এরাও মানুষের মতোই। ভালোবাসতে হয়, কাছে রাখতে হয়, স্পর্শ করতে হয়। আর জানতো, ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না, তা শুধু একটা ফর্ম থেকে অন্য ফর্মে ট্রান্সফার হয়।’

বাকি কথাগুলো বিস্ময় চিহ্নের মতো সাবিহা দেখতে থাকে। কথাগুলো যেন কথা নয়, কিছু অব্যক্ত গুঞ্জনের মতো, বা সুইঁ ফোটানোর মতো তার সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে। তার ইচ্ছে করে বিকট এক চিৎকারে প্রতিবাদ করে উঠতে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারে না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ, আর সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে তার গোপন কান্নাগুলো চোখের জল হয়ে স্কুল ড্রেসের অনেকটা ভিজিয়ে দেয়।

যথাসময়ে গাড়িতে উঠে রোখসানা বলে, ‘সাবিহা, আজ তোর জন্মদিন। আয় তোকে একটু আদর করি। এ কী জামা ভিজে গেল কেমন করে!’

সাবিহা চুপ করে বসেই থাকে। সে যেন আশেপাশের সমস্ত অস্তিত্বকেই উপেক্ষা করবে বলে স্থির করেছে। রাস্তায় কিছু ক্রুদ্ধ কুকুর খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। সাবিহা ওই দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। এক নিরুপায় হিংস্রতায় সে রোখসানার দিকে একপলক কটমট চোখে তাকায়। রোখসানা সবুজ টিপ পড়েছে, সবুজ কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে। সাবিহা সেই দিকে তাকিয়ে মনে মনে আরও ক্ষ্যাপা হয়ে ওঠে। জন্মদিনের পার্টিতে আরও একটি পর্ব যোগ করার পরিকল্পনা করে সে গাড়িতে বসে বসেই। স্কুলে যেতে যেতে তার মনে হতে থাকে গাড়ির চাকা তাকে থেৎলে দিয়ে যাচ্ছে।

পার্টিতে সাজানো বেলুনের দিকে তাকিয়ে সাবিহার মনে হয় এখনি সুঁই দিয়ে সব ফুটো করে দেয়! তাহলে সে একটু স্বস্তি পেত। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। বন্ধুরা এসে সাজিয়েছে এসব সেই বিকেল থেকে। আম্মু-আব্বু দুজনেই ব্যস্ত আজকের পার্টি নিয়ে। তার ইচ্ছে করে পাথরের মুগুর দিয়ে আজকের সব আয়োজন থেৎলে দেয়। আবার ইচ্ছে করে এই আয়োজন থেকে নিঃশব্দে পালিয়ে যেতে। কিন্তু কিছুই করা হয় না। সে নতুন ঝকঝকে ফ্যাশানেবেল জামাটি পড়ে। চুলগুলোকে ইচ্ছেমতো ফাঁপিয়ে তোলে। চোখে ঘন কাজল আর আইশ্যাডো দেয়ার পর দামি ব্র্যান্ডের টকটকে লাল লিপস্টিক ঠোঁটে মাখে। ঝলমলিয়ে ওঠা অনেক আপন লোকের ভীড়ের এই সন্ধ্যাটায় তার খুব একা লাগে। সবাই এসে গ্যাছে যথাসময়ে। এলেক্সকে দারুণ লাগছে আড়ং-এর পাঞ্জাবিতে। রোখসানাকেও মনে হচ্ছে নীল শাড়িতে ডানা কাটা পরী। ওদেরকে দেখতে দেখতে সাবিহা একবার হোঁচট খায়। এখনই মনে হয় পা পিছলে পড়ে যাবে সে। আর কখনো যেন তাকে উঠে দাঁড়াতে না হয় ।

এক প্রবল হতাশার ঘোরে ঘটে যাওযা সবকিছুই মনে হয় এক বিরাট তামাশা। এই সময় কিটিকে নতুন জামা পড়াবার ডাক পড়ে। সাবিহা যেন হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।  নতুন জামাটি হাতে নিয়ে টগবগিয়ে হেঁটে যায় কিটির দিকে। ছাদের রেলিং ঘেষে দাঁড়ানো এলেক্সরে বুকের মাঝখান থেকে কিটিকে যেন অনেকটা ছিনিয়েই নেয়। কিটি তার বিহ্বল চোখে তাকিয়ে একবার মিঁউ ডেকে ওঠে। তারপর সাবিহার হাতের তৈরি নতুন জামার অর্ধেক পরে উঠার পর এক গভীর আতঙ্কে ও ভয়ে কিটি বারবার মিঁউ ডাকতে থাকে। তবু সবার চোখের সামনে একটি সফল হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়। কিটির থেৎলে যাওয়া ছোট্ট শরীর ছয়তলার ওপর থেকে দেখা যায় না। তবে এক প্রবল জিঘাংসায় সাবিহার শরীরটাকে অনেকক্ষণ কাঁপতে দেখা যায়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>