মুমের বাহারী আহার

শিক্ষকতা, বিজ্ঞাপন কর্মকর্তা, সাংবাদিকতা ছেড়ে বর্তমানে পূর্ণকালীন লেখক। তথ্যচিত্র নির্মাতা, কবি, গল্পকার, চলচ্চিত্র সমালোচক, গদ্যকার ও অনুবাদক বলেই সকলে তাঁকে জানেন কিন্তু তাঁরা কী জানেন তিনি একজন রন্ধন শিল্পীও! ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ তিনি লিখেছেন বাহারী আহার নিয়ে।


 

প্রিয় কুসুম,
তুমি হরিয়ালি রান্নার রেসিপি চেয়েছো? রেসিপি কথাটা শুনলেই সুমনের সেই গানটার কথা মনে পড়ে, খাতা দেখে গান গেয়ো না, উল্টে খাতা যেতেও পারে। স্বরলিপি দেখে গান গাওয়া আর রেসিপি দেখে রান্না করা একই রকম লাগে।

আমার রান্নায় কোন রেসিপি থাকে না। আমি মায়েদের মতো। মায়েদের রান্নায় রেসিপি থাকে না। তারা যুগযুগ ধরে আসা নিয়ম কানুনের সাথে নিজের সুবিধা অসুবিধা মিলিয়ে নেন। মায়েরা থিয়েটারের ইম্প্রোভাইজ এক্টর। এই রেসিপি নামের জিনিসটা কি? একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা। বইপত্র, টিভির রান্নার অনুষ্ঠানে আহামরি ঢঙে একটা পেঁয়াজ, দুইটা কাচামরিচ, এক চামুচ চিনি এইসব বয়ান।

আজকাল দেখি ইউটিউব ভিডিওতে ভাত রান্না শেখায়। ৩০০ গ্রাম চালে ৫০০ গ্রাম পানি, সাত মিনিট ফুটিয়ে…। আমার মনে হয় আবার অঙ্কের ক্লাসে এসেছি। এই ওই উপাদান লাগবে, এতোক্ষণ ধরে রাঁধতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি লিখে দেয়া সহজ। কিন্তু আমার সমস্যা হলো সব খাবারকেই আমি নিজের সুবিধা মতো এবং স্বাধীন মতো বানাই। আজকে যেভাবে রাঁধি কালকে সেভাবে রাঁধি না। এক্সপেরিমেন্ট, বুঝলে জানু! রান্নাও রসায়ন। ল্যাবে ফেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করো।
কলকাতা গিয়ে হরিয়ালি কাবাবের প্রেমে পড়ি। শুধু কলকাতায় নয়, হরিয়ালি কাবাব ভারতের প্রায় সব রেঁস্তোরাতেই পাওয়া যায়। এর সঙ্গে হরিয়ানার কোন সম্পর্ক নেই জানু। আদতে হিন্দি হারা মানে সবুজ। হরিয়ালি মানে সবুজ রঙের কাবাব। এই সবুজ কাবাবটা আমার বিবেচনায় তিনটা কারণে মানুষকে আকর্ষণ করে। প্রথমত অন্য রকম রঙ। সবুজ মাংস দেখতে মজা লাগে। দ্বিতীয়ত ঘ্রাণ। পর্যাপ্ত পুদিনা বা ধনেপাতা দেয়ার কারণে একটা নাক ভাসানো ঘ্রাণ থাকে। তৃতীয়ত এটা খুব মোলায়েম আর রসালো হয়। ফলে খুকি বুড়ি সবাই পছন্দ করে।
এবার কিভাবে বানাবে তার একটা সংক্ষিপ্ত বয়ান বলি। খুবই সহজ। বুকের মাংস নাও। মুরগির বুকের মাংস। হাড় থাকবে না। একটা ব্লেন্ডারে ধনেপাতা (পর্যাপ্ত), কাচা মরিচ, লবণ, লেবুর রস দিয়ে দাও ঘুটা। ব্লেন্ডার বা ইলেকট্রিসিটি না থাকলে শিলপাটা, হামান দিস্তাই সই। এইবার এই পেস্টটা দিয়ে বুকের মাংস (মুরগির) আচ্ছা করে মাখো, ভালো করে মাখো। মাখা মাংসটা ফ্রিজে বা ঢাকনা দিয়ে বাইরে রাখো আধাঘন্টা। এটাকে বলে মেরিনেশন। মেরিনেশনকে বাংলায় বলা যায় রস ঢুকানো। বেশ খানিক রসে চুবিয়ে রাখলে মাংস নরম হয়, পরতে পরতে রস, মশলা ঢুকে যায়। তো রস ঢুকে গেলে শিকের মধ্যে মাংস গাঁথো, যেভাবে আমাকে গেঁথে ছিলে একদা।
পরের কাজটা তো তুমি জানোই, কাজটা সোজা, তবে সাবধানে করতে হবে। কাবাবগুলো চুলায় পুড়তে হবে। শিকটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুড়তে হবে। সাবধানে পুড়বে। মনে রেখো মুরগির বুকের মাংস আমার মতোই নরম। বেশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুড়বে। বেশি পুড়ে কয়লা করলে খেয়ে স্বাদ পাবে না। পুড়তে যদি না চাও তবে তাওয়াতে ভাজো বা শেকো। ভাজা, পোড়া বা শেকার সময় সরিষার তেল মেখে দিও। চাইলে অন্য তেলও দিতে পারো, আমি সরিষার তেলের ঝাঁজ পছন্দ করি। সরিষার তেল ব্রাশ বা কাপড় দিয়ে ধনেপাতা মাখা চিকেনে দিয়ে ভেজে বা পুড়ে ফেললেই কাবাব তৈরি হয়ে যাবে গো।
একটা কথা, ওই যে পেস্টটা বানিয়েছিলে সেখান থেকে খানিকটা উঠিয়ে রেখো। কাবাবের সঙ্গে ওটা সস হিসাবে পরিবেশন করবে।

ফুটনোটঃ হরিয়ালি কাবাবের মোদ্দা কথা সবুজ রঙ। অনেকে এ রঙ আনতে পালং শাক ব্যবহার করে। কেউ কেউ পুদিনাপাতাও দেয়। আমার পুদিনা প্রিয় হলেও এখানে দেই না। কারণ পোড়া শেকার সাথে ধনেপাতাটা মানায়। পুদিনার ঝাঁজ বেশি। বাচ্চারা পছন্দ নাও করতে পারে। কেউ কেউ দই বা টক দই মেশায় সবুজ পেস্টে। আমি মেশাই না। স্রেফ ধনেপাতা, লবণ, লেবুর রস, কাচামরিচের একটা সরলতা আছে।
আমি সরলতা পছন্দ করি। তুমি?


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com 

রেসিপি-২

ঝাঁঝেঁর ঢেঁড়স

আমি এট্টু ইচ্ছা করেই ঝাঁঝঁ-এ দুইটা চন্দ্রবিন্দু দিলাম। সব বানান যে বাংলা একাডেমির কথাতেই হবে তা তো না। ঝাঁঝঁ জিনিসটার উপর আমার এট্টু অধিকারও বেশি। লোকে জানে, মুম মানেই ঝাঁঝঁ। যাহোক লোকের আলাপ করে সময় নষ্ট না করি। বরং একটা ঝাঁঝাঁলো রেসিপির কথা বলি।
ঢেঁড়শ আমার খুব প্রিয়। অনেকে বলে ভিন্ডি, ভেন্ডি। ইংরেজিতে বলে লেডিস ফিঙ্গার। জীবনে অনেক লেডিসের ফিঙ্গার ধরেছি, কিন্তু ঢেঁড়শের মতো মনে হয়নি। তবে অরিজিনাল লেডিস ফিঙ্গারের চেয়ে ঢেঁড়শ কিন্তু কম লোভনীয় নয়। আমার তো কাঁচা খাওয়ার অভ্যাসও আছে। এইরে! কাঁচাতে কি চন্দ্রবিন্দু আছে! মশলার জগতে সরিষা চন্দ্রবিন্দুর মতোই। বাড়তি কৌমার্য বাড়ায়। চিতই পিঠার সাথে সরিষা ভর্তা এক মনোরম আবিষ্কার। আমি এই রেসিপিটাতে পর্যাপ্ত সরিষা বাটা, রসুন, কাঁচা মরিচ আর এট্টু (মামের বোতলের একছিপি) সরিষার তেল ব্যবহার করেছি। সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ, রসুনের ঝাঁঝেঁর সাথে সরিষার বাটার ঝাঁঝঁ এই রেসিপিকে জ্যাজ মিউজকের বিশুদ্ধতা দিয়েছে।
একটা কথা বলে নেই, এই রেসিপিটা খুব স্বাস্থ্যকর। আমার অধিকাংশ রেসিপিই স্বাস্থ্যকর। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো রেসিপিটা খুব সরল। আমি সরলতায় বিশ্বাসী। যে কোন জিনিস রাঁধতে গেলে উপাদানগুলোর মৌলিকত্বটা রাখতে হয়। গানে, কবিতায় যেমন একটা নিজস্বতা থাকা উচিত, রান্নাতেও থাকা উচিত। আমি তাই রাঁধতে গিয়ে পর্যাপ্ত তাৎক্ষণিক বুদ্ধি খাটাই। কী কী লাগবের চেয়ে কী কী ভাঁড়ারে (আবার চন্দ্রবিন্দু সংশয়!) আছে তা গুরুত্বপূর্ণ। মানে ওই যে ইংরেজিতে যাকে বলে কাট ইউর প্যান্ট, থুক্কু কাট ইউর কোট একর্ডিং… ইত্যাদি ইত্যাদি।
যাক পেঁচাল অনেক হলো, মূল রেসিপিতে চলে যাই। রাঁধতে আগ্রহীগণ ছবি অনুযায়ী ধাপে ধাপে মিলিয়ে নিন।

১. ঝাঁঝাঁলো ঢেঁড়শের মোদ্দাকথা হলো রসুনের মাতব্বরি। উত্তপ্ত কড়াইয়ে (সঙ্গীর মাথায় নয়) রসুনের কোয়া ছেঁড়ে দিন। কোন তেল দেবেন না। বেজায়গায় তেল দেয়া ভালো নয়। রসুনটাকে কড়াইতে নেড়েচেড়ে পোড়া পোড়া করে ফেলুন। এবার কয়েকটা কাঁচা মরিচ ছাড়ুন। আপনি কেমন ঝাল খান তা আমি জানি না। কাজেই ক’টা নেবেন সে সিদ্ধান্ত আপনার। কাঁচা মরিচের লেজ-মাথা কেটে দিন। নইলে ঠাসঠাস ফুঁটবে। এ ফোঁটা কিন্তু সে ফোটা নয়। এখানেও চন্দ্রবিন্দুর কনফিউশন!

২. প্রিয় বাঙালি এইবার সুখবর। আপনাদের প্রিয় জিনিস তেল। নিন কড়াইতে তেল দিন। বেশি না, একছিপি। সরিষার তেল। সাথে সাথেই ঢেঁড়শ ছাড়ুন তেলে। নাড়ুন, তবে বেশি ঘুটবেন না। বেশি ঘাটাঘাটি ভালো নয় মোটেও।

৩. হাল্কা নাড়াচাড়ার পর এইবার দিন আসল জিনিস, সরিষা বাটা। সরিষা বাটা আপনি চাইলে শিল-পাটায় কিংবা মিক্সিতে কিংবা গ্রাইন্ডারে করে রাখতে পারেন।

৪. সরিষা বাটা দিয়ে আবার একটু নাড়াচাড়া করুন। এবার লবণ দিন। নাড়ুন। একটু পানি দিন। কষাতে দিন।

৫. পানি শুকিয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন। আমি সাধারণত সাদা সিরামিকের পাত্রে খাবার ঢালি। এতে রঙ খোলে। মেলামাইন বা স্টিল আমার সেই রকম অপছন্দ।

এই ঝাঁঝের ঢেঁড়শ ভাতের সাথেও খাওয়া যায়, রুটির সাথেও খাওয়া যায়। দুটোই মজা।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


 

রেসেপি- ৩

খানাপিনার জগতে আপেল সিডার ভিনেগার যেন সাক্ষাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার বহুমুখি গুণের কোন শেষ নাই। গুগলে এক খোঁচা দিলে আপেল সিডার ভিনেগারের শত গুণ প্রকাশিত হবে শত শত সাইটে। দামেও বেশ খানদানি এই টক বাহাদুর। এক লিটারের আপেল সিডার ভিনেগারের দাম কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা। আমি লক ডাউনের দিনে একশ টাকায় এক কেজি আপেল কিনলাম। কেজিতে ছয়টা আপেল পেলাম। দুইটা খেলাম সালাদ বানিয়ে, দুইটা এমনি এমনি আর দুইটা দিয়ে বানালাম আপেল সিডার ভিনেগার। সিডার না সাইডার, ঠিক উচ্চারণটা কেউ একজন ধরিয়ে দেবেন আশা করি। মহার্ঘ্য আপেল সিডার ভিনেগার বানানো খুব কঠিন। স্যরি আই ওয়াজ জোকিং। আপেল সিডার ভিনেগার বানানো খুবই সোজা। যদিও রবীন্দ্রনাথ সোজা নয়, হওয়াই যায় না। তবে রবীন্দ্রনাথ, ভ্যান গগ, ব্রাডম্যান কি আপেল সিডার ভিনেগার যাই বানানোর চেষ্টা করুন না কেন, ধৈর্য লাগবে, একাগ্রতা লাগবে। আমি মহাশয় টানা ২২ দিনের চেষ্টায় বানালাম ইনাকে।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


 

তো প্রথমে আপেল ভালো করে ধুঁয়ে মুছে নিতে হবে। জ্বি, ভালো করে ধুবেন, ফরমালিনের ভয় থাকলে আপেলকে কয়েক ঘন্টা চুবিয়ে রাখতে হবে। তারপর ভেজান আপেলকে কাপড়, গামছা, তোয়ালে (যার যার রুচিমতো) মুছে নিতে হবে। শুকনো আপেলকে এবার টুকরো টুকরো করে বয়ামে রাখুন। বয়াম ভরে দিন আপেলের টুকরোয়। আমি নিয়েছিলাম ডাবর মধুর এক লিটারের বয়াম। আপনি যা খুশি নিতে পারেন। তবে অবশ্যই কাঁচের বয়াম হতে হবে আর কাপড় খানি হতে হবে সুতির। আর লাগবে একটা কাঠের চামচ। সুতি কাপড়, কাঠের চামচ, কাঁচের বয়ামের কোন বিকল্প নেই। তো বয়ামে আপেল ভরা হলে এবার চিনি দিন, লাল চিনি হলে ভালো। চিনি আর আপেলের উপর এবার পানি দিন। আচার যেমন তেল বা ভিনেগারে চুবিয়ে দিতে হয় তেমনি আপেল আর চিনিকে চুবিয়ে দিতে হবে পানিতে। পানিটি ফোটানো তবে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। চিনি মেশাবেন কাঠের চামচ দিয়ে। হাল্কা করে নেড়ে দিয়ে বয়ামের মুখটি কাপড় (সুতি) দিয়ে ঢেকে দিন। এবার এক কাপ কফি খান। বয়ামটি অন্ধকার কোথায় রাখবেন। ঘরে খাটের নিচে, রান্নাঘরের কোণায় রাখতে পারেন। ভুলেও ফ্রিজে বা রোদের আলোতে রাখবেন না।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

বয়ামের গায়ে তারিখ দিয়ে রাখুন। এক সপ্তাহ পরে মুখটা খুলে আবার কিছুটা চিনি দিয়ে নাড়ুন চাড়ুন, কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন, অন্ধকারে কোণায় রাখুন। আবার এক সপ্তাহ পর একই কাজ। তৃতীয় সপ্তাহে আপনার আপেল সিডার ভিনেগার তৈরি। ছেঁকে নিন। আপেলের রসগুলো চিপে চিপে বের করে নিন। এখানেও সুতি কাপড় ব্যবহার করুন। ছাঁকা আপেল সিডার ভিনেগার ফ্রিজে রেখে এক বছর নাগাদ খেতে পারবেন। নিন লেগে পড়ুন। এক বছর পর যোগাযোগ করবেন প্লিজ।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত