মরিবার হলো সাধ

ওয়াসি আহমেদ 

ট্রাম দুর্ঘটনায়(?) জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু এবং তাঁর ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতাটির কোনো গূঢ় যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকে কৌতূহলী এমনকি ‘উৎসাহী’ হলেও ঘটনাটা দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা—এই সুরাহা হয়নি। দিনটা ছিল ১৪ অক্টোবর, ১৯৫৪। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ট্রামলাইনে উঠে জীবনানন্দ কি এতটাই অন্যমনস্ক, বিক্ষিপ্তচিত্ত ছিলেন যে ঘণ্টি বাজিয়ে ট্রাম আসছে বুঝতে পেরেও (কারও মতে দেখতে পেয়ে, এমনকি ড্রাইভারের চিৎকার বা ধমক সত্ত্বেও) আত্মরক্ষার কোনো তাড়া বোধ করেননি? কিংবা আজীবন আত্মভোলা, নিঃসঙ্গ কবির মনে কি তাঁরই স্বরচিত অদ্ভুত আঁধার জেঁকে বসেছিল, তিনি কোনো চিত্তচাঞ্চল্য বোধ করেননি? বাস্তব যা-ই হোক, মৃত্যুটা আজও তাঁর ক্রমস্ফীতমান পাঠকদের মনে বিপন্ন বিস্ময় হয়েই টিকে আছে।

বলা হয়ে থাকে, সৃজনশীলতার একটি অন্যতম অন্ধকার দিক হলো আত্মহনন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক শিল্পী, কবি, লেখকের মনোজগতের একটা অন্যতম প্রবণতা হলো বিষণ্নতা এবং অরাজক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় আক্রান্ত হওয়া, যাকে তাঁরা বলেন ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার’। এই বিষণ্নতা ও মনোবৈকল্যের চেহারা যেমন বহুমাত্রিক, তেমনি এর চাপ অনেককেই আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলে। আর শেষাবধি কারও কারও ক্ষেত্রে এতে নিজেদের সঁপে দেওয়া ছাড়া পথ খোলা থাকে না—অন্তত তাঁদের নিজেদের বিচার-বিবেচনায়।

শিল্পী-লেখক ছাড়া যাঁরা এ পথ বেছে নেন (ধরে নেওয়া যাক, বাধ্য হন), তাঁদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা যে অন্য রকম, তা বলা যাবে না। তবে সাধারণ মানুষের তুলনায় শিল্পী-লেখকদের বিষয়টা সামনে চলে আসে এ জন্য যে এর মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতায় লালিত মনোজগতের একধরনের বিস্ফোরক উন্মোচন ঘটে।

আমাদের একজন শক্তিমান কথাকার কায়েস আহমেদ যে আত্মহননকে বেছে নিয়েছিলেন, তার পেছনে পারিবারিক অশান্তির কথা (স্ত্রীর মানসিক অসুস্থতা) জানা গেলেও নিভৃতচারী এই লেখকের মনমানসিকতায় বা লেখাজোকায় আত্মবিনাশী বিষণ্নতার তেমন স্পষ্ট হদিস মেলে না। হতে পারে পারিবারিক অশান্তিও কারণ নয়, হয়তো কোনো ঘটনার দৈবদুর্বিপাকে মৃত্যুকেই মুক্তিদাতা ভেবে কাজটা করে ফেলেছিলেন।

বিশ্ববরেণ্য লেখক-শিল্পীদের অনেকেই যাঁরা এ পথে হেঁটেছেন, তাঁদের আত্মহননের ঘটনাগুলো নিয়ে যেমন বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি হয়েছে, তেমনি তাঁদের লেখালেখির সমালোচনাধারায়ও ঘটনাগুলো প্রভাব ফেলেছে। বলা অসংগত নয়, যদি আত্মহত্যার ঘটনাগুলো তাঁরা না ঘটাতেন, তাঁদের লেখালেখির ভিন্নতর মূল্যায়ন হলেও হতে পারত।

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুরহস্য অনুদ্‌ঘাটিত রয়ে গেলেও এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে বাংলা ভাষার এই বিরলতম কবির কবিতায় সমালোচকেরা তো বটেই, অগ্রসর পাঠকেরাও তাঁর মৃত্যুকে তাঁর অনেক বিষাদক্লিষ্ট কবিতার মতো স্বরচিত ভাবার পক্ষপাতী। বিশিষ্ট জীবনানন্দ-বিশেষজ্ঞ ভূমেন্দ্র গুহের জবানিতে জানা যায় জীবনানন্দ বাইপোলার সিনড্রোমে ভুগতেন।

কথা হলো, সৃজনশীলতার সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার কি কোনো সংগোপন সম্পর্ক রয়েছে? কারও কারও ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, ব্যাপারটা এমন একধরনের মানসিক বিকার (কখনো কখনো অসুস্থতার কাছাকাছি), যা সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করতেও সাহায্য করে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয়তো একপর্যায়ে বিনাশী রূপ ধরেই আসে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, লেখালেখি বা শিল্পচর্চা ছাড়াও সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাঁরা লিপ্ত, তাঁরা সমাজের অন্যদের থেকে কমপক্ষে ৮ শতিংশ বেশি বিষণ্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তবে কবি-লেখকদের বেলায় এই ঝুঁকি আতঙ্কিত হওয়ার মতো বেশি। ভুক্তভোগীদের শতকরা ৫০ জনই আত্মহত্যায় জীবনের ছেদ টেনেছেন এমন তথ্য রয়েছে। মার্কিন ঔপন্যাসিক ই এল ডকটোরো এ বিষয়ে খোলাখুলি মতামত দিয়েছেন এই বলে যে লেখালেখি সামাজিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত একধরনের সিজোফ্রেনিয়া।

বিশ্বসাহিত্যে শতাধিক খ্যাতনামা কবি-লেখকের খোঁজ মিলবে, যাঁরা আত্মহত্যায় নিজেদের জীবনের ছেদ টেনেছেন। খোঁজ নিলে আরও দেখা যাবে, তাঁদের লেখালেখিতে নিজেদের মনোজগতের ছাপ পড়ুক বা না-ই পড়ুক, তাঁরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিজীবনে প্রবল মানসিক চাপ বয়ে বেড়িয়েছেন, যা প্রায়ই তাঁদের এক দুঃসহ বিষণ্নতা ও মনোবৈকল্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ভার্জিনিয়া উলফ্, সিলভিয়া প্লাথ—অতি বিখ্যাত আত্মহননকারী হিসেবে যাঁদের নাম প্রথমেই মনে আসে—প্রত্যেকেই মনোরোগের নানা লক্ষণে আক্রান্ত ছিলেন। হেমিংওয়েকে যত প্রাণপ্রাচুর্যময়ই মনে হোক বা জীবনকে ভোগ করার যত অনুষঙ্গেই নিজেকে তিনি জড়ান না কেন, বাস্তবে জীবনের শেষ দিকে বিষণ্নতা ও মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্তির সঙ্গে তাঁর যোগ হয়েছিল; যাকে বলা যেতে পারে বংশগত বা জেনেটিক আত্মহত্যাপ্রবণতা। নিজে দোনলা বন্দুক মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপেছিলেন, সেই সঙ্গে এ-ও মনে রাখতে হবে, কাজটা তাঁর পরিবারে তিনি একাই করেননি, তাঁর বাবাও মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে নিজের জীবনের ইতি টেনেছিলেন। আরও যা বিস্ময়কর, তাঁর এক ভাই ও এক বোনও একই কায়দায় না হলেও নিজেদের জীবনের গতি থামিয়ে দিয়েছিলেন।

ভার্জিনিয়া উলফের বিষয়ে ধারণা করা হয়, তাঁর শেষ উপন্যাস বিটুইন দ্য এক্টস-এর (মৃত্যুর পর প্রকাশিত) পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার পরপরই তাঁকে প্রচণ্ড বিষণ্নতা পেয়ে বসেছিল। ইতিপূর্বেও একাধিকবার এমন হয়েছিল—পরিবারের আপনজনের মৃত্যুতে এবং বই প্রকাশের পর অসন্তুষ্টিতে। তবে সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকবলিত পৃথিবীর নানা দুর্যোগও তাঁর বিষণ্নতাকে মনোবৈকল্যের এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। ফলে বিশ শতকের এই মেধাবী লেখক, যাঁর কলমে চেতনাপ্রবাহ রীতি এক অপরূপ দ্যুতিময়তায় মূর্ত হতো, প্যান্টের পকেটভর্তি পাথর নিয়ে সাসেক্সের উস্ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন। স্বামী লিওনার্ড উলফ্‌কে লেখা সুইসাইড নোটে তিনি তার বিষণ্নতা ও মনোবৈকল্যের নানা লক্ষণের কথা লিখে জানিয়েছেন, তিনি যা করতে যাচ্ছেন তা তাঁর একমাত্র করণীয়। নিজের বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থার কারণে দাম্পত্য জীবনকে নিরুপদ্রপ করতে না পারার অপরাধবোধও অকপটে জানিয়েছেন।

সিলভিয়া প্লাথের আত্মহননের ঘটনা বহুল আলোচিত রোমহর্ষক মৃত্যু-পরিকল্পনার কারণে যেমন, তেমনি ঠান্ডা মাথায় আটঘাট বেঁধে গোটা ঘটনাকে, যাকে বলা যেতে পারে খুঁতহীনভাবে সাজানোর কারণেও। জানা যায়, সিলভিয়া প্লাথ প্রায় সারা জীবনই বিষণ্নতা নিরোধক (অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট) ওষুধ খেতেন। ১৯৬৩ সালে গ্যাস বার্নারে মাথা পেতে নিজেকে অঙ্গারে পরিণত করার অনেক বছর আগে উনিশ-কুড়ি বছর বয়সে স্মিথ কলেজে পড়াকালীন তিনি একবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

কবি-সাহিত্যিকদের আত্মহত্যার বিশদ তালিকায় সিলভিয়া প্লাথের মৃত্যু সবচেয়ে সাড়া জাগানো ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য যে তাঁর মৃত্যু কারও কারও জন্য প্রেরণা হয়েও কাজ করেছে। যেমন প্রখ্যাত মার্কিন কবি এ্যানি সেক্সটনের বেলায়। সিলভিয়া প্লাথের আত্মহত্যার খবর পাওয়ামাত্র তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল—এ তো আমার মৃত্যু। নিজের আত্মহত্যার ঘটনাটি তিনি ঘটিয়েছিলেন কয়েক বছর পর।

বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে জীবন দুর্বহ হয়ে পড়ার ঘটনা খ্যাত-অখ্যাত বিস্তর কবি-সাহিত্যিকের বেলায় ঘটেছে। কেবল খ্যাতনামাদের তালিকাই কম দীর্ঘ নয়; তবে এই বিষণ্নতা সবার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তা বলা যাবে না। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিষণ্নতাসহ নানা বিতর্ক দাঁড় করালেও এর পেছনে বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ায় বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর বৈরিতাজনিত হতাশাকে মূলত দায়ী করা হয়ে থাকে।

সৃজনশীলতা, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যা—এই তিনের অন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। বইপত্রও লেখা হয়েছে। সুরাহা হওয়ার বিষয় নয়, তবু কোথাও যেন একই সুতার টান টের পান কেউ কেউ, বিশেষত মনোবিশ্লেষকেরা। এ কি কখনো কখনো এক কুহকী মোহ?

কৃতজ্ঞতা: প্রথম আলো

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত