গুম ও ঘুমের গল্প

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মাইক্রোবাসটাকে রাস্তার একধারে দাঁড় করিয়ে তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই নামিয়ে দিল ওরা। হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সে কোনোমতে টাল সামলে নিল আর তখনই বুঝতে পারল দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার নেই। উবু হয়ে বসতে গিয়ে কাত হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। ইঞ্জিন বোধহয় স্টার্ট দেওয়াই ছিল। গাড়িটা কিছুদূর গিয়ে একবার থামল, তারপর বাঁক ঘুরে দূরে মিলিয়ে গেল। গাড়িতেই ওরা তার চোখের বাঁধন খুলে দিয়েছিল। কিন্তু হাত শক্ত করে বাঁধা। শুয়ে শুয়েই সে কয়েকবার দাঁত দিয়ে বাঁধনটা খুলতে চেষ্টা করলো। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো সে নিজেই জানে না। বেশিক্ষণ হয়তো ঘুমায়নি, হয়তো কয়েক মিনিটই হবে। নাকি আসলে একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে ছিল সে। এ কয়দিন যেমনটা কেটেছে। কখন যে ঘুম আর কখন যে আচ্ছন্নতা, ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, তার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো! ঘটনাগুলো কি তার ওপর ঘটেছে নাকি তার বাবার ওপর? পর মুহূর্তেই গায়ের ব্যথা আর হাতের বাঁধন তাকে সচেতন করেছে।

বাবাকে সে কখনো দেখেনি। জানে যে একাত্তরে তার বাবাকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে। তার কাছে বাবার স্মৃতি মানে ছোটবেলা থেকে দেখা বাসার দেয়ালে টানানো একটা সাদাকালো ছবি। মা আর মেজ মামার মুখে শোনা বাবার গল্প। তার জন্ম যুদ্ধের পরে। প্রথমবার যখন বাবাকে আর্মিরা ধরে নিয়ে যায় তখনই তার মা তিন মাসের অন্তঃসত্তা। সেবার অবশ্য দুদিন পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বাবার অফিসের অবাঙালি বড় সাহেব আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তখন অবশ্য তিনিও জানতেন না তাঁর অফিসের এই বিশ্বস্ত ও সৎ কর্মচারীটি ভেতরে ভেতরে জয় বাংলার সমর্থক। মুক্তিবাহিনীর জন্য তাঁদের কোম্পানির গোডাউন থেকেই নাকি ওষুধ চুরি করেও দিয়েছে। যুদ্ধের সময়কার গল্প মা তাকে কখনোই তেমন বলেননি। হয়তো নিজেও মনে করতে চান না। তখনকার বাবার গল্প সে যেটুকু শুনেছে, আত্মীয়স্বজন বিশেষ করে মেজ মামার কাছ থেকে। দ্বিতীয়বার আর্মি যেদিন বাবাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়, সেদিন সঙ্গে মেজ মামাকেও নিয়ে গিয়েছিল। বাবা ও মামাকে ওরা কয়েকদিন একই জায়গায় রেখে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের ওপর সে অত্যাচারের গল্প মামা তাকে কখনো বলতে চাননি। বড় হওয়ার পর সে-ই বারবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মামার কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছে। তাও মাকে আড়াল করে। তারপরও সবটা কি জানতে পেরেছে? মামাকে ওরা শেষদিকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ফলে বাবার শেষ দিনগুলোর কথা মামাও ঠিক জানেন না। কারো কারো কাছ থেকে কিছু কিছু হয়তো শুনেছেন।

দূরে একটা গাড়ির শব্দ শুনে আর হেডলাইটের আলো দেখে সতর্ক হয় সে। ওরা কি আবার তাকে তুলে নিতে আসছে? যেমন তার বাবাকে একবার ছেড়ে দিয়েও আবার নিয়ে গিয়েছিল? হাতবাঁধা অবস্থায়ই নিজেকে সে ঢালের দিকে গড়িয়ে দেয়। কয়েকবার পাল্টি খেয়ে একটা ইটের পাঁজার কাছে এসে আটকে যায় তার শরীরটা। ওপর থেকে একটা বা দুটো ইট বুঝি খসে পড়ে। ভাগ্যিস, তার মাথায় বা গায়ে পড়েনি। একটা ট্রাক ঝমঝম আওয়াজ তুলে চলে গেল। তবে যা ভয় করছিল তা নয়? ওরা তাকে ছেড়েই দিয়েছে। কিন্তু এখানে ফেলে গেল কেন? এ জায়গাটার নাম কী? এটা কি ঢাকা নাকি অন্য কোথাও? ওরা তাকে যেখানে আটকে রেখেছিল সে জায়গা দুটোরই বা কী নাম? তবে ঘড়ি না দেখেও আন্দাজ করেছিল, বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর প্রথমদিন ঘণ্টা দুই গাড়ি চলেছিল। একে তো রাতের বেলা, তার ওপর গাড়িতে তোলার আগেই তার চোখ আর হাত কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছিল ওরা। কাজেই বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না গাড়িটা কোনদিক দিয়ে বা কোথায় যাচ্ছে। সপ্তাহ বা দিন দশেক পর আবারও একই ভাবে চোখহাত বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়েছিল তাকে। সেদিন মনে হয় অনেকটা পথ গাড়ি চলেছিল। সময়টাও ছিল ভোরের দিকে। কারণ একবার-দুবার এদিক ওদিক থেকে ফজরের আজান কানে এসেছিল তার। তবে শরীরের যন্ত্রণায় তার তখন বেহঁশ অবস্থা। শব্দ করে কাতরাতেও পারছিল না। একবার ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?’ বলতে যেতেই ঘাড়ের কাছে শক্ত হাতের চাপ টের পায়, সেই সঙ্গে কানের কাছে একটা ঠান্ডা ফিসফিসে স্বর, ‘চুপ! এক্কেরে চুপ! কথা কইবি তো জানে মাইরা ফেলামু।’ তারপর কিছুক্ষণ নাকি অনেকক্ষণের জন্য সে বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। কখন কোথায় এসে গাড়ি থেমেছে, কীভাবে সে গাড়ি থেকে নেমেছে বা তাকে নামানো হয়েছে, কিছুই মনে করতে পারে না।

 

প্রথম প্রথম ওরা তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায়ই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কেবল খাওয়ার আর বাথরুমে যাওয়ার সময় একটা লোক কিছুক্ষণের জন্য তার চোখের বাঁধন খুলে দিত। ঘরের লাগোয়া একটা ছোট্ট, প্রায় অন্ধকার আর নোংরা বাথরুম, দুর্গন্ধে বমি আসে। বাথরুমের দরজায় কোনো পাল্লা নেই। ওকে ঢুকিয়ে দিয়ে লোকটা দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকত। আর একটু পর পরই তাড়া দিত কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে। লোকটা মনে হয় ওদের নিয়োগ করা, ওকে পাহারা দেওয়াই ছিল তার কাজ। লোকটার সঙ্গে দু-একবার কথা বলার চেষ্টা করে দেখেছে, দরকারের বাইরে কোনো কথাই বলতে চায় না। হয়তো সে রকমই আদেশ আছে তার ওপর। রাতের বেলায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে লোকটা মনে হয় দরজার কাছেই শুয়ে থাকে। বাইরে থেকে নাক ডাকার শব্দ শুনে তাই মনে হতো। শেষ দিকে রাতের বেলা লোকটা তার চোখের বাঁধন খুলে দিত, তবে তার আগে ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো।

 

দিনের আলোয় যেটুকু দেখেছিল, তাতে মনে হয় ঘরটা কোনো আন্ডার-কনস্ট্রাকশান এপার্টমেন্ট বাড়ির নিচ তলায় দারোয়ান বা অন্য কোনো কর্মচারীর থাকার ঘর। বোধহয় অন্য সময় ওই লোকটাই থাকে এখানে। ঘরের একধারে দেয়াল ঘেঁষে একটা চৌকি, তাতে একটা ছেঁড়া কাঁথা বিছানো। আসার পর থেকে ওই চৌকিটাতে শুয়ে বসেই তার রাতদিন কাটছে। ঘরের এক কোনে একটা কেরোসিনের চুলা আর কয়েকটা এলুমিনিয়ামের হাড়ি-পাতিল। দু-একটা থালা-গ্লাস। অন্য কোনে টাইগার ড্রিঙ্কের কয়েকটা খালি বোতল, আর কয়েকটা পরিত্যক্ত বিরানির প্যাকেট। রাতের বেলা ইঁদুর নাকি তেলাপোকা ঢুকে খসর খসর আওয়াজ তোলে। প্রথম দু-রাত তো সে ভয়ে সারারাত জেগেই কাটিয়েছে। ঘরের একদিকে দড়িতে ঝোলানো গামছা-লুঙ্গি। ওই লোকটারই হবে হয়তো। চৌকি ছাড়া ঘরে আর কোনো আসবাব নেই। তবে লোকগুলো যখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসতো, তখন ওই দারোয়ান গোছের লোকটা কোথা থেকে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে দিত। ওরা চলে গেলে সরিয়ে ফেলত।

দু-জায়গায়ই তিন থেকে চারজন লোক রোজ সন্ধ্যার পর এসে অনেক রাত অবধি তাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করেছে। তার মধ্যে একজন লোককে সে চিনতে পেরেছে। তাকে সেদিন যারা তুলে এনেছিল, তাদের মধ্যে সে ছিল। বেশ লম্বা আর চোয়াড়ে ধরনের লোকটা। মুখে কেমন যেন একটা একটা হিংস্র ভাব, চোখের দৃষ্টি ঠান্ডা, ধারালো, একবার যে দেখবে মনে হয় জীবনেও ভুলতে পারবে না। অন্য লোকগুলোরও কাউকে কি সে দেখেছে আগে? ওই বেটে-খাটো লোকটাও কি সেদিন ওই দলে ছিল? রুবিনা যখন ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে? কেন নিয়ে যাচ্ছেন?’ বলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন ওই লোকটাই কি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল? বাজে খিস্তি করেছিল? আর্মিরা যখন তার বাবা ও মামাকে ধরে নিয়ে যায় তখন তার মাও নাকি একইভাবে দরজার কাছে ছুটে গিয়েছিল, স্বামী ও ভাইকে আগলে দাঁড়িয়েছিল। একজন সিপাহি সেদিন তাকে রাইফেল দিয়ে ধাক্কিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। বাবা তখন চিৎকার করে উর্দুতে অফিসারকে বলেছিলেন, তার স্ত্রী অন্তঃসত্তা, আল্লাহর ওয়াস্তে ওর যেন কোনো ক্ষতি না করা হয়। জবাবে অফিসার যা বলেছিল, ওর মামা কোনোদিনই তাকে তা বলতে পারেননি।

তুলে নিয়ে আসার পরদিন থেকেই ওরা তাকে জেরা করতে শুরু করে। কয়েকটা নাম বলে বারবার জানতে চেয়েছে, ওদের সাথে তার কতদিনের সম্পর্ক, কীভাবে পরিচয়, প্রথম কোথায় দেখা হয়েছিল, এসব। প্রথম প্রথম একটা-দুটো নাম তার চেনা মনে হলেও, ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বুঝতে পারে, ওরা যার কথা বলছে তার চেনা লোকটা সে নয়। মানে ওরা যে আলতাফ সম্পর্কে জানতে চাইছে ঠিক সেই আলতাফকে সে চেনে না। ওরা হয়তো মনে করেছে সে সত্য গোপন করছে। আর তখনই শুরু হয়ে যায় তার ওপর মারধর। যতক্ষণ সে একেবারে নেতিয়ে না পড়ে। প্রতিবারই ওরা তাকে বলে যায়, পরের দিন ওরা যখন আসবে সে যেন সব সত্যি কথা বলে, কোনো কিছুই গোপন না করে। যদি সব সত্যি বলে দেয়, ওরা তাকে ছেড়ে দেবে। নয়তো তাকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলা হবে, কেউ কোনেদিন জানতে পারবে না। আর্মিরাও নাকি এ রকমই ওর বাবাকে বলেছিল, তিনি যদি তাঁর চেনা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম-ঠিকানা বলে দেন, গুদাম থেকে ওষুধ সরাবার কাজে অফিসের আর কে-কে তাঁর সঙ্গে ছিল, জানিয়ে দেন, কোরেশী সাহেবের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বাবা কারো নাম বলেননি। বললেও কোরেশী সাহেব নিশ্চয় পরেরবার আর তার জামিনদার হতেন না। মামার এক পা জন্ম থেকেই খোঁড়া, তাছাড়া বাবা বলেছিলেন, তাঁর এই শালাটি দীনদার মানুষ, দিনের বেশিরভাগ সময় তার মসজিদেই কাটে। সে কারণেই কিনা কে জানে মামাকে ওরা জেলে পাঠিয়ে দেয়। তার দুদিন আগে জখমি শরীর বাবাকে ওরা টেনে-হিচড়ে কোথায় যেন নিয়ে যায়। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে। নিয়ে যাবার আগেরদিন তাই এক ফাঁকে পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে মামাকে ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘আমার আর ফেরা হবে না। যদি বেঁচে থাকিস, তোর বোনটাকে দেখিস। আর ভাগ্নে বা ভাগ্নি যাই হোক, তার গার্ডিয়ান হবি তুই। তুই ছাড়া ওদের নিকটাত্মীয় আর তো কেউ নাই।’ বছর দুই হলো বাস এক্সিডেন্টে মারা যাবার আগ পর্যন্ত মামা দায়িত্বটা পালন করে গেছেন। মা মারা যাওয়ার পরও অভিভাবক হিসেবে তার আর রুবিনার মাথার ওপর ছিলেন। এখন সে যদি চলে যায়, রুবিনাকে কে দেখবে? ওদের প্রথম বাচ্চাটা ছয় বছর বয়সে ডেঙ্গু জ্বরে ভুগে মারা গেছে। চারমাস পর রুবিনার আবার বাচ্চা হওয়ার কথা। ঢাকায় থাকার মধ্যে ওর এক বিধবা চাচী আর তার ছেলেরা থাকে বাড্ডায়। ওরা কি খবরটা পেয়েছে, রুবিনাকে এসে নিয়ে গেছে ওদের বাড়িতে? নাকি চাচীই এসে থাকছেন ওর সঙ্গে? কিছুই জানে না সে, একেবারে কিছুই না। গায়ের ব্যথা, মৃত্যুভয়, সব ছাপিয়ে এখন এই দুশ্চিন্তাটাই তাকে ঘুমাতে দেয় না।

যা তাকে ওদের কাছে আরও বেশি অবিশ্বাসের পাত্র করে তুলেছে তা হলো নিজের মোবাইল নম্বরটা ঠিকঠাক বলতে না পারা। আসলে মাস দুইও হয়নি সে তার আগের ফোনটা হারিয়ে ফেলেছে। আগের ফোনের সিমটা ছিল গ্রামীণ। নতুন সেট কেনার পর আগের সিমটা না তুলে সে বাংলা লিংকের একটা সিম নিয়েছে। অফিসের কেউ কেউ বলেছিল এতে নাকি ফোনের খরচ কমবে। নতুন নম্বরটা তার এখনও মুখস্ত হয়নি। ওদেরকে বলেছেও সে পুরো ব্যাপারটা। কিন্তু ওরা বিশ্বাস করতে নারাজ। ভাবছে এটা তার চালাকি। বলেছে, ওদের পক্ষে ফোন নম্বরটা পাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু তার কাছই থেকে ওরা শুনতে চায়। ফোন নম্বর দিয়ে ওরা কী করবে? ওকে জিম্মি করে বাড়িতে টাকা চাইবে? মুক্তিপণ? যেমন প্রায়ই শোনা যায়? এখন ফোন করলে সে ফোন তো রুবিনাই ধরবে। ফোনটা পেয়ে কী হবে তার অবস্থা? কত টাকা ওরা চাইতে পারে? নিশ্চয় হাজার নয়, কয়েক লাখ? কোথায় পাবে রুবিনা অত টাকা? কার কাছেই বা হাত পাতবে? কে দেবে তাকে অত টাকা? ভেবে দিশাহারা বোধ করে সে। টাকা পেলেই যে ওরা তাকে ছেড়ে দেবে তারই বা গ্যারান্টি কী? রুবিনার সঙ্গে তার যদি যোগাযোগ করার কোনো উপায় থাকতো, সে ওকে বলে দিত টাকা যোগাড়ের জন্য ব্যস্ত না হতে। তার কপালে যা লেখা আছে, তাই হবে। হায়াত-মওত আল্লাহর হাতে।

নির্যাতনের ধরনগুলো বোধহয় সবকালে সবখানে একই। কেবল মাত্রা বা ডিগ্রির তফাত। অর্থাৎ কার বেলায় কোনটা কীভাবে বা কতটা প্রয়োগ করা হবে। নির্যাতিতের অনুভূতিও কি একইরকম হয়? প্রথমদিকে দু-একদিন ওরা কিল-চাপড় আর ঘুষির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল। যখন ঘাড়ের কাছে ঘুষি চালাতো কিংবা মাথার চুল মুঠো করে ধরে ঝাঁকুনি দেওয়ার সাথে সাথে দু গালে একের পর এক চড় মারতো, দু চোখে অন্ধকার দেখতো সে। এভাবে কথা বের করতে না পেরে তারা এরপর নতুন উপায় নিল। হাতের আঙুলগুলো ধরে উল্টোদিকে মোচড় দিত। যন্ত্রণায় জান বেরিয়ে আসত তার। মেঝেয় হাত পেতে বসতে বলতো। তারপর জুতোপরা পা দিয়ে তা মাড়াতো। আর্মি ক্যাম্পে থাকার সময় ওরাও তার বাবার ওপর নাকি এমনই অত্যাচার করেছিল। আঙুলগুলো মুচড়ে ভেঙে দিয়েছিল। থাপ্পড়ের চোটে শেষদিকে কান দিয়ে রক্ত গড়াতো তাঁর।

যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে কখনো চিৎকার করে আবার কখনো ওদের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সে বলেছে, ‘প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দেন। আমি এসবের কিছুই জানি না। আপনারা বোধহয় ভুল করছেন। কদিন পর আমার বউয়ের বাচ্চা হবে। বাচ্চাটা ওর বাবাকে দেখতে পাবে না।’ কুৎসিত হাসি হেসে লোকগুলোর একজন বলেছে, ‘চিন্তা করিস না, তোর বউ আর বাচ্চার জন্য আমরা আছি। অনেকগুলা স্বামী, অনেকগুলা বাপ! হা-হা!’

তার বাবা যে একাত্তরে শহীদ হয়েছেন, সে কথাটা গোপন করে সে ওদের বলেছে, ‘বিশ্বাস করেন, আমাদের পরিবারের কেউ কখনো রাজনীতি করেনি। আমার বিধবা মা অনেক কষ্টে আমাকে মানুষ করেছে। টিউশানি করে আমি পড়ালেখার খরচ চালিয়েছি। অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় ছিল না। দলটল করার তো প্রশ্নই আসে না।’ লোকগুলো হাসতে হাসতে বলেছে, ‘করিস নাই, তাতে কি? এইবার করবি। আমরা যে দল করতে কমু, সেটাই করবি। যদি প্রাণে বাঁচতে চাস, আমরা যা জানতে চাইতাছি কয়া ফেল! তারপর আমরা যেমনি যেমনি কমু, তেমনি তেমনি চলবি। না হইলে কি হইব, জানস? সন্ত্রাসী নাইলে জঙ্গি বইলা পুলিশ-র‌্যাবের হাতে দিয়া দিমু। বউ-বাচ্চারে আর দেখন লাগবো না তোর।’

 

শেষের কথাটা শুনে তার মনে হয়, এরা তবে সরকারি লোক না? বাহিনীর কেউ না? কথাটা কি তার মনে সামান্য ভরসা জাগায়? নাকি উল্টো? ওই ‘জঙ্গি বইলা ধরাইয়া দিমু’ কথাটায় তার ভেতর অবধি কেঁপে ওঠে। তার মানে কি ক্রসফায়ার? তার বাবাকেও পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরেছিল, কিন্তু বাবা তো একরকম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তানিদের চোখে তিনি ছিলেন দোষী, অপরাধী। কিন্তু কোনো অপরাধ না করেও তাকে কি সন্ত্রাসী বা জঙ্গির অপবাদ নিয়ে মরতে হবে? সবাই তাই জানবে? তার সন্তান এই পরিচয় নিয়ে বড় হবে?

 

কী কারণে কে জানে লোকগুলো পরের দিকে তাকে জেরা করতে আসা বন্ধ করে দেয়। যদিও বাইরের পাহারাটা হয়তো ঠিকই ছিল। ওরা কি বুঝতে পেরেছিল, ওদের কোথাও ভুল হয়েছে? ওরা ভুল লোককে তুলে এনেছে? যে-লোকটা তার দেখাশোনা করত বা আসলে তাকে নজরে রাখতো, সেও যেন তার সাথে কিছুটা অন্যরকম মানে ভালো ব্যবহার করতে থাকে। হয়তো ওরা সে রকমই বলে দিয়েছিল ওকে। আগে তাকে দিনে দু-বার মাত্র খেতে দিত, রুটির সঙ্গে ডাল বা ভাজি যে-কোনো একটা। সে কখনো কিছুটা খেত, বাকিটা সরিয়ে রেখে দিত। খেতে ইচ্ছে করতো না বলেও, তাছাড়া টয়লেটে যাওয়ার ভয়ে। লোকটা এ নিয়ে কিছু বলতো না কখনো। এক সময় নীরবে থালাটা সরিয়ে নিয়ে যেত। কিন্তু সেও দেখা গেল জানতে চায়, ‘রোজ রোজ রুটি খাইতে খারাপ লাগে? ভাত খাইবার মন চায়?’ একদিন দুপুরে তাকে বিরানির প্যাকেটও এনে দেয়। খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে। রাতের বেলা তাকে ট্যাবলেট আর পানি এনে দিয়ে বলে, ‘খাইয়া লন, শরিলের ব্যাদনা সারবো। ঘুমও আসবো।’

ট্যাবলেটের প্রভাবেই হোক কিংবা মাঝরাতের দিকে হঠাৎ প্রবল ঝড়বৃষ্টি হওয়ার ফলে একটু ঠান্ডা নামাতে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। ভোররাতের দিকে লোকটা এসে তাকে ডেকে তোলে। বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা যায়। দুটো লোক এসে তাকে ধরে নিয়ে গাড়িতে ওঠালো। চোখ ছাড়া ওদের সারামুখ কাপড়ে ঢাকা। তবে এমনিতে দেখে মনে হলো এরা নতুন, আগে এদের দেখেনি। গাড়ি চলতে শুরু করতেই ওরা দ্রুত একটা দড়ি দিয়ে তাকে সিটের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। লাফিয়ে পালাবার চেষ্টা করতে পারে ভেবেই কি? একটু পরে তার চোখটাও বেঁধে দিল ওরা।

নতুন যে-ঘরটায় তাকে তোলা হলো সেটা একটা বেড়ার ঘর। মুলি বাঁশের বেড়া, উপরে টিনের ছাউনি। দিনের বেলায় দেখে মনে হয়েছে, এটা ঠিকাদারদের জিনিসপত্র রাখার জন্য তৈরি। ঘরের একদিকে অনেকগুলো সিমেন্টের বস্তা ডাঁই করে রাখা। এছাড়া আছে কোদাল, খুরপি, গাঁইতি, বেলচা, এসব। এখানেও একটা চৌকি, চৌকির ওপর চাটাই বিছানো। তেল চিটচিটে একটা বালিশ। ঘরটার চারদিকে অনেক গাছপালা। সকাল-সন্ধ্যায় অনেক পাখির ডাক শোনা যায়। ভোররাতের দিকে যখন তাকে বড় বাথরুম করতে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ঘরের পেছনের ঝোপঝাড়ে বসে, মশার কামড় খেতে খেতে সে দেখেছে, জায়গাটা একটা জঙ্গলের মতো। বড় বড় সব গাছ চারপাশে। গাড়ি থেকে নামিয়ে ঘরে ঢোকানোর পর, তার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে ওরা বলে গেছে, সে যেন এখান থেকে কখনোই পালাবার চেষ্টা না করে। বাইরে সব সময় ওদের লোক বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারা। যেদিক দিয়েই সে পালাবার চেষ্টা করুক না কেন, ওদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করে মারবে। এখানেও একটা লোক আছে তাকে দেখাশোনা বা পাহারা দেওয়ার জন্য। সে-ই কোথা থেকে জানে না তাকে খাবার এনে দেয়। তাকে বড় বাথরুম করতে বাইরে নিয়ে যায়, ছোট বাথরুম অবশ্য ঘরের ভেতরেই এক কোনে সারতে হয়। তবে এই লোকটা মিশুক ধরনের। গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে চায়। তার কাছে তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চায়, নিজের পরিবার-পরিজনের কথাও বলে। তবে একটা ব্যাপারে খুব হুঁশিয়ার, যারা ওকে এই কাজে লাগিয়েছে, তাদের সম্পর্কে কিছুই বলে না সে। ওরা কেন তাকে ধরে এনেছে সে সম্পর্কে জানারও কোনো আগ্রহ নেই তার। সবই যেন তার জানা। এই লোকটাও সন্ধ্যায় তাকে দুটো করে বড়ি খেতে দেয়। বলে, ‘ঘুমের ওষুধ, খাইতে অইব। বসেগো অর্ডার। খাইয়া আপনেও আরামে ঘুমাইবেন, আমিও নিশ্চিন্তে একটু গড়াইতে পারুম। নাইলে বুঝেন না, মানুষের মন, কখন কি খেয়াল হয়! আপনে হয়তো না ভাইবা চিন্তাই একটা কিছু কইরা ফেললেন, আপনেও মরবেন, আমিও মরুম!’ ট্যাবলেটগুলো ঘুমের নাকি আসলে নেশার, সে ঠিক বুঝতে পারে না। তবে খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিমুনি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ঘুমটা তার একটানা হয় না। কদিন হলো রোজ রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। একটা স্বপ্নই সে বারবার দেখে। একটা মাঠের ভেতর দিয়ে সে ছুটে পালাচ্ছে। তার পেছনে বন্দুক হাতে কতগুলো লোক তাড়া করে আসছে। সে ছুটছে আর লোকগুলো তার কাছাকাছি চলে আসছে। এ-পর্যন্ত দেখেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে বিছানায় উঠে বসে থাকে। জানে আবার ঘুমালেও সেই একই স্বপ্ন দেখতে পাবে।

গতকালই তো নাকি পরশু, ঠিক মনে পড়ছে না, সন্ধার পরপর একটা লোক এসেছিল তার সঙ্গে দেখা করতে। লোকটার পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি, গলায় সোনার চেইন। রাতের বেলায়ও তার চোখে কালো সানগ্লাস। সানগ্লাস না খুলেই সে পুরোটা সময় তার সাথে কথা বলে গেল। এসেই বললো, বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সে তার জন্য একটা খুশির খবর নিয়ে এসেছে। তার রিলিজ অর্ডার হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে শর্ত আছে। ‘কী শর্ত?’ কোনোমতে ঢোক গিলে সে জানতে চাইল। লোকটা বললো, এখান থেকে যাওয়ার পর এ-কদিনের ব্যাপার নিয়ে সে কাউকে কিছু বলতে পারবে না। এমনকি পরিবারের লোকজনকেও না। কারা তাকে ধরে এনেছিল, কেন এনেছিল, কোথায় রেখেছিল, কাদের সম্পর্কে বা কী জানতে চাওয়া হয়েছে, একেবারে কিচ্ছু না। কিছুই জানে না সে। জানলেও বলতে পারবে না। আসলে এ কদিনে কিছুই ঘটেনি তার জীবনে। হ্যাঁ, একটা কথা বলতে পারে, বাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিল, তারপর আর কিছুই তার মনে নাই। ‘বাইডি, দেমাকে ডুকছে নি কথাডা? খেয়াল রাইখো কইলাম। একডুও ইধার উধার য্যান না অয়। অইলে কিন্তু খবর আছে। তুমি তো বাঁচতে পারবাই না, তোমার বউ-বাচ্চারেও তুইলা আনা অইব। বুজছ? কথাডা মনে রাইখ।’

সে কি কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল? চোখ মেলতে দেখল অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। পুব আকাশে একটু যেন আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। উপরের রাস্তা দিয়ে বাস বা ট্রাক চলে যাবার আওয়াজের সঙ্গে মাঝে মাঝে রিক্সা বা সাইকেলের টুংটাং শোনা যাচ্ছে। সে অবশ্য এখান থেকে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। বাঁ পাশে ঘাড় ফেরাতে দূরে ছায়ার মতো দু-একজনের চলাফেরা নজরে এলো। ওরা কি মসজিদে যাচ্ছে? নাকি ঝোপঝাড়ের আড়ালে আর কিছু করতে? ওরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছে? পাবে? তার আবার ঘুম-ঘুম লাগছে। কদিন ধরেই কেমন যেন একটা ঘোর বা আচ্ছন্নতার মধ্যে আছে সে। গায়ের ব্যথা কমবে বলে ওরা হয়তো তাকে ঘুমের ওষুধই খাইয়ে দিয়েছে। আচ্ছন্নতার মধ্যেই সে যেন তার বাবাকে দেখতে পেল। এই প্রথম। বাবাকে নিয়ে তো তার কোনো স্মৃতি নেই, এর আগে স্বপ্নেও কোনোদিন বাবার মতো কাউকে দেখেনি। মা প্রায়ই বাবাকে স্বপ্নে দেখেন বলতেন। সে দেখলো খাকি পোশাক পরা কজন লোক বাবাকে ঠেলে-ধাক্কিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের দুজন আবার পেছন থেকে বাবার দিকে রাইফেল তাক করে রেখেছে। বাবা হাঁটতে পারছেন না, লেংচাচ্ছেন। তাঁর দুই হাত বাঁধা। মুখ নিচু করে এগোতে এগোতে বাবা যেন একবার মুখ তুলে তার দিকে তাকালেন। সে যেন শুনতে পেল তিনি শব্দ করে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন। সেও বাবার সঙ্গে পড়তে শুরু করলো, ‘আল্লাহু লা-ইলাহা ইল্লাহু আল-হাইয়ুল …’। কিন্তু শেষ করার আগেই আবার ঘুম তাকে দখল করে নিল।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত