মতি নন্দীর গল্প: রাস্তা

দীপু, তাের বাবা এখনও আসছে না যে রে। একবার গেটের কাছে গিয়ে দ্যাখ-না।

মেটারনিটি ওয়ার্ডের গাড়িবারান্দার তলায় তখন একটাই মােটর দাঁড়িয়েছিল। দীপু তার বাম্পারে বসে দেখছিল, উত্তর-পূর্ব কোনার লালবাড়িটার সিঁড়িতে দুটো ছেলে-মেয়ে কথা বলছে। দুজনের হাতেই বুক দেখবার নল। মেয়েটা হেসেই কুটিকুটি। হাসি থামিয়ে সিঁড়িতে উঠছিল। আবার কী শুনে আবার কুটিকুটি। মেয়েটা আটকা পড়ে গেছে। দীপু ভাবল ছেলেটা কি খুব হাসির গল্প জানে, না কি এখনও খিদে পায়নি মেয়েটার!

অ দীপু।

বলেছি তাে, অফিস থেকে ছুটি করিয়ে তবে আসবে।

তােকে একলা পাঠাল কী বলে শুনি? ছেলে-মেয়েগুলাে বাড়িতে এতক্ষণ কী কান্ড করছে কে জানে।

শিকলি দিয়ে এসেছি।

তাতে কী হয়েছে, ঘরের জিনিস ভাঙবে। এত বেলা হল ওদের খিদেও তাে পেয়েছে।

মেয়েটা লালবাড়িতে ঢুকে গেল। সােজা পুবমুখাে রাস্তা ধরে ছেলেটা চলে যাচ্ছে। হাতের নলটা দোলাচ্ছে। দীপু পুব দিকে তাকিয়ে রইল।

কমলা দেখছে সবুজ শাড়িপরাটিকে। গাড়িবারান্দার নীচে আরও তিনটি বউ বসে। সবাই মাঝবয়সি। শুধু একে দেখেই মনে হচ্ছে প্রথম পােয়াতি। চোখে-মুখে ভয় এখনও কাটেনি। বাচ্চাটাকে পর্যন্ত ভরসা করে কোলে নেয়নি। নাতি কিংবা নাতনিকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে বুড়িটা।

খস করে ট্যাক্সিটা থামল। তর সইছে না ছেলেটার। নেমেই তাড়া দিল ওঠার জন্য। হাসপাতালের বুড়াে দারােয়ান ট্যাক্সির দরজা খুলে ধরেছে। বউকে দু-হাতে ধরে তুলল। দু

পাশে তাকিয়ে বউটা স্বামীর হাত দুটো সরিয়ে দিল।

বুড়ি ট্যাক্সিতে উঠতে পারছে না। হাতজোড়া বাচ্চা। মাথা নীচু করে বুকলে, খাড়া থাকার মতাে জোর আর কোমরে নেই।

আপনি ছেলেকে ধরুন-না। উনি উঠলে পর কোলে দেবেন।

কমলার পরামর্শ শুনল ছেলেটা। দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল দারােয়ান। একটা টাকা বকশিশ পেল।

জানলি দীপু, তােকে নিয়ে ওঠবার সময় টাসকির দরজায় মাথা ঠুকে গেছল। খিঁচিয়ে উঠেছিল তাের বাবা। এমন রাগ ধরেছিল তখন, মনে হয়েছিল দিই তােকে ফেলে, যেদিকে দু-চোখ যায় চলে যাই।

বাবার স্বভাবটা বড়াে বিচ্ছিরি।

তাের ঠাকমা খুব বকেছিল তার বাবাকে। হ্যাঁ রে, মনে আছে ঠাকমাকে? আমায় খুব ভালবাসত।

তুমি ট্যাক্সি করে গেছলে!

এর থেকে বড়াে ছিল টাসকিটা। তাের মেজোমামা, সােনাপিসি সব্বাইকে ধরে গেছল।

নিতু, অপু, বাচ্চু এরাও ট্যাক্সিতে গেছল?

শুধু নিতুটা গেছল, আর সব রিসকোয়।

কমলা তার বাচ্চাকে কোল থেকে হড়ানাে পায়ের উপর শুইয়ে দিল। নাপিত নখ কাটছে ফর্সা বউটার। ওর গায়ে জামা নেই, শরীরেও মাংস নেই। একলা বসে। স্বামী গাড়ি ডাকতে গেছে। নাপিতটা নতুন। মাথায় টিকি। টিকিওলা নাপিত কমলা কখনাে দেখেনি। বার সময়ে ছিল বেঁচে গাট্টাগােট্টা এক নাপিত। পােয়াতিরা খালাস হয়ে যাবার সময় এখানেই নখ কেটে যায়। সে-বার ঝগড়া হয়েছিল। দু-আনার জন্য দীপুর বাপ হাতাহাতি করতে গেছল।

হ্যাঁ রে দীপু দ্যাখ-না ক-পয়সা নেয়।

কী হবে দেখে।

তাহলে এখানেই কেটে নােব।

দীপু উঠে গেল। একটা রিকশা নিয়ে এল বউটার স্বামী। দারােয়ান গাড়িবারান্দার তলায় রিকশাকে দাঁড়াতে দিল না। বউকে ধরে নিয়ে গেল লােকটা। কোমর ভেঙে গেছে। ধুকতে ধুকতে হাঁটছে। হঠাৎ কাপড়টা আলগা হয়ে পড়ছিল, একহাতে বাচ্চাকে অন্যহাতে কাপড়টা ধরে সে অসহায় চোখে কমলার দিকে তাকাল।

অ দীপু, ভাইকে একটু ধর তো।

বাচ্চাকে দীপুর কোলে দিয়ে কমলা গিয়ে বউটাকে কাপড় পরিয়ে দিল। হ্যাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছে। কমলা ধরে নিয়ে গেল রিকশা পর্যন্ত। উঠতে পারছে না। রিকশাগুলাে এমন গড়ানে হয় যে কমজোরি লােক উঠতে গেলেই টলে পড়ে। বাচ্চাকে চেয়ে নিল কমলা। হামাগুড়ি দিয়ে বউটা রিকশায় উঠল। ওর স্বামীও উঠল। কমলা বাচ্চাকে কোলে তুলে দিল।

আসি দিদি।

নামবার সময় সাবধানে নেবাে।

রিকশাটা চলে গেল। আবার একটা ট্যাক্সি এল। হাতআয়নাটা বাস্কেটে রেখে বাচ্চা বউটা উঠে দাঁড়াল। বেশ শক্তসমর্থ গড়ন। কোন ফাঁকে বুকটাকে আঁটসাঁট করে নিয়েছে। বাচ্চাকে স্বামীর কোলে দিয়ে গটগটিয়ে ট্যাক্সিতে উঠল।

চলে গেল ট্যাক্সিটা। দরজা বন্ধ করে বকশিশ পেল দারােয়ান। এখন গাড়িবারান্দার তলায় বাড়ি যাবার জন্য রইল শুধু কমলা।

দীপুর কাছ থেকে ছেলেকে কোলে নিয়ে মােটরের ধার ঘেঁষে কমলা মেঝেয় বসল। দীপু বসল বাম্পারে। দারােয়ান বসেছে তার টুলে আর নাপিত সিঁড়িতে। হাসপাতালের ভিতর থেকে টুকটুক করে একটা বেড়াল নেমে এল। সঙ্গে সঙ্গে এক মাঝবয়সি দাই এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে গেল। খিলেনের কার্নিশে দু-তিনটে কাক উঠে এল। অনেক দূরে, গােলাপি বেল্টআটা সাদা কাপড়ের টুপিপরা পাঁচ-ছটি মেয়ে খাতা হাতে চলে গেল। উত্তরের ছাই রঙের বাড়িটার তিন তলার বারান্দায়, টেবিল ঘিরে তাস খেলছে ক-জানে।

নাপিতটা কত নিল রে?

আট আনা।

তাের বাবা ভােলাকে বলে রেখেছে তাে?

কী জানি। ভােলা তাে বারােটা পর্যন্ত পাড়ায় থাকে। এখন গেলে হয়তাে পাওয়া যাবে।

দ্যাখ-না একটু, তাের বাবা আসছে কি না।

দেখলেই কি বাবা তাড়াতাড়ি আসবে?

দীপু ঝেঁঝে উঠল। বাতাসে হলকা আসছে। বাচ্চাকে আঁচল দিয়ে কমলা ঢেকে দিল। উত্তর-পুবের লালবাড়িটা থেকে তরতরিয়ে দুটি মেয়ে নেমে গেল। দীপু ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে রইল। একটু গিয়েই ওরা বেঁকে গেল।

মা তােমার কাছে পয়সা আছে?

বারােটা পয়সা আছে। কেন?

কতক্ষণ বসে থাকব?

উনি কখন আসেন, কে জানে।

হেসে উঠল নাপিতটা। আর খদ্দের নেই তবু বসে গল্প করছে। দারােয়ানকে খুশি না রাখলে এখানকার পসার বন্ধ হয়ে যাবে। দীপু উঠে গিয়ে দরজার পাশে টাঙানাে রুগি দেখবার নিয়ম পড়তে শুরু করল। কমলা তাকাল বাগানের দিকে। হাওয়া আসছে, তবু গলগলিয়ে ঘাম নামছে। চমকে উঠে হাত ছড়ল বাচ্চাটা। স্বপ্ন দেখছে। বােধ হয় গতজন্মের কথা ভাবছে। ঠোঁট নড়ছে। হাসছে। না কি খিদে পেয়েছে। মােটরটার দিকে পিছন ফিরে মুখে মাই গুজে দিল কমলা। চনমন করে মুখ সরিয়ে নিল। চোখ বুজেই আছে। বড়ড় আলাে, কচি চোখে সইবে কেন। আঁচল দিয়ে বাচ্চাকে আবার ঢেকে দিল কমলা। আঁচলের নীচে নড়ছে। আঁচল ফাঁক করে দেখল। হাত-পা কুঁকড়ে গুটিয়ে রয়েছে। কালাে ঠোঁট দুটো নড়ছে। কী ছিল ও আগের জন্মে, রাজার ছেলে? গতজন্মের কথা মনে পড়ে হাসছে?

হ্যাঁ রে দীপু ট্যাসকির ভাড়া বুঝি কম? সবাই যে গেল।

দীপু সাড়া দিল না। ঘাড় তুলে সে নিয়ম পড়ছে।

এখান থেকে আমাদের বাড়ি যেতে কত নেবে রে?

দীপু এবারও সাড়া দিল না। কমলা দীপুর থেকে চোখ সরিয়ে ফড়িংটার ওপর রাখল, ওটা এইমাত্র মােটারের টায়ারে এসে বসেছে; তারপর রাখল বাচ্চার উপর। বাচ্চাকে দু-হাতে দোলাল। বড়ড হালকা। কালাে বেল্টপরা নার্সটি হেসে বলেছিল, কী সুন্দর বেবি। আহা, বড়াে ভালাে মেয়েটি। বলেছিল দেখা করবে।

কমলা দূরের বারান্দায় তাকাল। একটাও মানুষ নেই। কে থাকবে এই গরমে। তা ছাড়া ওর ডিউটি তাে ওধারে দক্ষিণের বারান্দায়। কালকে এমন সময় দেখা হয়েছিল। কাঁদো কাঁদো মুখ করে ছুটে আসছিল। কে একজন না কি বাড়ি যাবার সময় হাতে আট আনা পয়সা ওঁজে দিয়েছে।

দীপু একটু নজর করিস তাে, সেই কপালে কাটাদাগ আমাদের নার্সটির যদি দেখতে পাস। আমাকে খুব যত্ন করেছিল।

তাকে দেখব কী করে, সে তাে ওয়ার্ডে এখন।

তবু যদি এদিকে এসেটোসে পড়ে। এক জায়গায় বসে তাে আর কাজ করতে হয় না।

দীপু আগের মতো বাম্পারে বসে গাড়ির পিঠে মাথা রাখল।

আর গােটা কতুক পয়সা থাকলে বাসে চলে যেতুম।

কমলা মুখ ফিরিয়ে নিল। পা ছড়িয়ে দিল রােদুরে। সিমেন্ট তেতে উঠেছে। উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলে সেঁকের কাজ হয়ে যাবে। ঠেস দিয়ে সে চোখ বুজল।

এই ওঠো, ওঠো।

ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে দারােয়ান। যার মােটরগাড়ি সে এসে গেছে। উঠে দাঁড়াতে ভুলে গেল দীপু তার দিকে তাকিয়ে।

লেড়ি ডাক্তার দীপুকে নজর না করেই গাড়িতে উঠে বসল। সেলফ স্টার্টারের বােতাম টিপল। খরখর করে উঠল এঞ্জিন, স্টার্ট হল না।

গাড়ি ঘেঁষে কমলা বসেছিল। লেডি ডাক্তারের মুখটুকু শুধু দেখতে পাচ্ছিল সে। সুন্দর। কপাল, সুন্দর রং, সুন্দর চুল।

আবার শব্দ হল স্টার্টারের। বিচ্ছিরি শব্দ। এত সুন্দর গাড়িটা যেন ককাচ্ছে। বার কয়েক এমন হবার পর লেড়ি ডাক্তার গাড়ি থেকে নামল। নীচু হয়ে গাড়ির তলা দিয়ে কমলা শুধু গােড়ালি আর সায়ার লেস দেখতে পেল।

নাপিত আর দারােয়ান এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে যেন গাড়ি স্টার্ট না হবার দোষটুক তাদেরই। দীপু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। হঠাৎ মনে হল, তার পা দুটো খুব সরু আর লােম গুলাে বড়ড় ঘন। থুতনিতে বড়াে বড়াে চুল মুখটাকে কুচ্ছিত করে রেখেছে। মােটরের আড়ালে সরে এসে সে গালে হাত বােলাল। আঙুলে একটা ব্রণ ঠেকল।

গাড়িটা একটু ঠেলে দাওনা।

বলার ভঙ্গিটা আবদের। স্বরটা ঠিঠিনে। নাপিত আর দারােয়ান সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়িটা মস্ত। ওরা দুজনেই বুড়াে। জায়গাটা খাড়াই। ওদের পিঠ বেঁকে গেল, পায়ের ডিম শক্ত হল, তবু গাড়িটাকে নড়ানাে গেল না।

হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, গিয়ে ঠ্যাল-না?

আমি কেন ঠেলব?

আহা, মানুষ বিপদে পড়েছে সাহায্য করবি না। একটুখানি ঠেলে দিলেই বুঝি মান-ইজ্জত খােয়া যায়?

দীপু গিয়ে হাত লাগাল। নড়ে উঠল গাড়িটা। মুগ্ধ কমলা তাকিয়ে রইল দীপুর কনুইয়ের কাছের গুড়িগুড়ি পেশির দিকে। উঁচু দিকটা কাবার হয়, ঢালুতে পড়েই গাড়ির গতি বাড়ল। ঝকা করে ক্লাচ পড়ল। গড়গড়িয়ে উঠল এঞ্জিন। গাড়িটা কিছুটা ছুটে গিয়ে থামল। হাত নেড়ে লেডি ডাক্তার ডাকছে। দারােয়ান আর নাপিত ছুটে গেল। ওদের হাতে কী যেন দিল, বােধ হয় বকশিশশ।

দীপুর হাঁটুর কাছে নুনছাল উঠে গেছে। ক্লাচ দিতে থমকে যায় গাড়িটা, তখনই মাডগার্ডের ধারটা লেগেছিল।

সামনের বাগানটা চক্কর দিয়ে গাড়িটা পুব দিকে চলে গেল। কমলা তাকিয়ে রইল ওইদিকে। অল্প অল্প ধোঁয়ার গন্ধ আসছে। বেশ লাগে শুকাতে।

ওরা পয়সা নিল।

দিল বুঝি?

হুঁ।

ওরা তাে নেবেই।

আমায় দিলে ছুড়ে ফেলে দিতুম।

তােকে দিতই না। শিক্ষিত তাে, মানুষ চেনে। কাকে দিতে হয় না হয় বােঝে।

পয়সাটা দুজনে ভাগাভাগি করে নেবে।

তা তাে নেবেই।

আমায় যদি দিতে আসে?

আসবে না।

আমি না ঠেললে গাড়ি চলত না।

নাপিত আর দারােয়ান এতক্ষণ সেইখানে দাঁড়িয়েই কথা বলছিল। নাপিত চলে গেল। দারােয়ান ওদের কাছে এসে দাঁড়াল।

আপনারা যাবেন কখন?

এই তাে এক্ষুনি যাব।

দেরি করলে আরও গরম পড়বে, বাচ্চার কষ্ট হবে। কাল একশো পাঁচ ডিগ্রি হয়েছিল?

ওরা দুজনেই মুখ ঘুরিয়ে রইল। দারােয়ান টুলে গিয়ে বসল।

কী বলেছিল আসবে তাে?

হ্যাঁ, ছুটি করিয়ে চলে আসবে বলেছিল, বােধ হয় কাজের তাড়া পড়েছে।

জানি, তোকে আর বােঝাতে হবে না। যত কাজ এর আজকেই।

বােধ হয় ছুটি পায়নি। অফিসে খুব গােলমাল চলছে বলছিল। বারাে জনের চাকরি গেছে, সবাই ভয়ে ভয়ে রয়েছে।

একটা দিন ছুটি নিলে কি চাকরি যেত?

উবু হয়ে বসল দীপু। মুখ ফিরিয়ে রয়েছে কমলা। রসালাে লেবু চুষলে অমন হয় ঠোট দুটো। ছেলেমানুষের মতাে দেখতে হয়ে গেছে। দীপু বাচ্চাটার গালে আঙুল ছোঁয়াল। ওকে কনুই দিয়ে ঝটকা দিল কমলা।

মা, তােমাকে এখন তার মতাে লাগছে কিন্তু।

উঠে পড়ল কমলা। কাপড়ের পুঁটলিটা এক হাতে নিয়ে গেটের দিকে চলতে শুরু করল। দীপু পিছু নিল।

কোথায় যাচ্ছ?

কথা বলল না কমলা। গেটের বাইরে এসে দাঁড়াল সে। এপার-ওধার তাকিয়ে দিশা করতে পারল না কোন দিকে যেতে হবে।

বাড়ি যাবে না কি?

হ্যাঁ।

কী করে যাবে?

হেঁটে যাব। কোনদিকে যাব বল?

থুতনি তুলে দীপু উত্তর দিকে দেখাল। হাঁটতে শুরু করে দিল কমলা। পা ফেলছে আর আঙুলগুলাে কুঁকড়ে যাচ্ছে। দীপু চটি থেকে পা বার করে ফুটপাতে রেখেই চমকে তুলে

ওই বারান্দাটার তলায় দাঁড়াই।

মাথা নামিয়ে চলছিল কমলা। চলতেই লাগল। ওর হাত ধরে দীপু ছায়ায় টেনে আনল।

হেঁটে বাড়ি যাওয়া যাবে না।

এই তাে যাচ্ছি।

রেগে গেছ বলে কষ্ট লাগছে না। সারা রাস্তা তাে আর রাগতে রাগতে যাওয়া যায় না।

তবে কী করব?

ফিরে যাই। হয়তাে বাবা এসে পড়েছে; তাহলে ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে।

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কমলা। রাগ করে চলে আসাটা বােধ হয় ঠিক হয়নি। এমন করে বাড়ি পৌঁছােনাে যায়। যেতে যেতেই পায়ের তলা ঝলসে যাবে। শরীরের ব্যথাও মরেনি, চলতে কষ্ট হয়। এত গরম বাচ্চাটাই-বা সইবে কী করে।

ওদের দেখে দারােয়ান কাছে এল। দীপুকে লক্ষ করে জিজ্ঞেস করল, গেলে না যে? চুপ করে রইল দীপু! এবার কমলাকে সে জিজ্ঞেস করল, নিতে আসার কথা আছে বুঝি?

হ্যাঁ।

দারােয়ান চাবির তােড়া বাজাতে বাজাতে চলে গেল। কোথা থেকে কান্নার শব্দ আসছে। শব্দটা এগিয়ে আসছে। এসে পড়ল। দুই বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। রাস্তা থেকে লরির টায়ার ফাটার শব্দ এল। কাক ডাকছে।

ব্যাটা দরদ দেখিয়ে গেল।

কেন?

আমি না থাকলে ওর বকশিশ জুটত না।

লােক ডেকে গাড়ি ঠেলত।

তাদের তাে পয়সা দিতে হত।

হলকা আসছে। বাপ্পাটা আরও ছােটো হয়ে গেছে যেন। বুকের আরও কাছে কমলা জড়িয়ে ধরল। দীপুর কানের পিছন দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। আঁচল তুলে মুছিয়ে দিতে গেল, মাথা সরিয়ে নিল দীপু। জামার হাতায় মুছে নিল।

একটা রিকশা করে চলে যাই চলাে।

পয়সা?

তুমি তাে জমিয়ে রাখ।

কে বলল?

সেদিন দুপুরে যে বাসনওলাকে ডাকলে?

সে তাে অমনি ডেকেছিলুম, কিনেছি না কি?

তাহলে দোতলার বউদির কাছে ধার নিলেই হবে।

ধার করতে হবে না।

তা বলে সারাদিন এখানে বসে থাকব না কি?

তুই অত রেগে উঠছিস কেন? অধৈর্য হাস কেন? দ্যাখ-না উনি হয়তাে এসে পড়বেন।

আমার খিদে পেয়েছে।

দীপু প্ৰত এসে ফুটপাথে দাঁড়াল। কমলা আসতেই চটিটা খুলে এগিয়ে দিল।

কী হবে?

পরো, নইলে চলবে কী করে?

তুই?

ততক্ষণ দীপুর পায়ের চোটো জ্বলতে শুরু করেছে। ছুটে সে গাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তার গাছ। লিকলিকে তার ছায়া।

দাঁড়িয়ে কেন, হাঁটতে আরম্ভ করাে।

অবাক হয়ে কমলা ওর কান্ড দেখছিল। চটিপরা অভ্যাস নেই। আঙুল দিয়ে ফিতেটাকে আঁকড়ে থাপথপিয়ে একটু হেঁটেই থেমে গেল। দীপু পায়ে পা ঘষছে। হেসে ফেলল কমলা।

ধ্যাত, আমি কি এমনভাবে চলতে পারি?

নইলে দেরি হয়ে যাবে। অপু, নিতুদের এখনও খাওয়া হয়নি।

গাছের ছায়ায় কমলা এসে পৌঁছােতেই দীপু আবার ছুট লাগাল অনেক দূরে একটা হাইড্রেট লক্ষ করে। দুটো লােক স্নান করছে। জলে পা ভিজিয়ে দীপু দাঁড়াল। কমলা অনেক দূরে। ছেলে কোলে, পুটলি হাতে থপথপিয়ে আসছে। দু-হাতে জল নিয়ে দীপু মাথায় থাপড়ল।

অ দীপু, অমন করে তুই কত ছুটবি?

দাঁড়ালে কেন, হাঁটো।

নিতুটাকে বার্লি দিয়েছিস তাে?

হ্যাঁ।

ওরা চৌবাচ্চায় নামবে না তাে?

না না না, তুমি হাঁটো।

আবার ছুটল দীপু। এবার একটা রিকশার আড়ালে। রিকশাওয়ালা হুড ফেলে সিটের উপর বসেছিল। কমলাকে তার দিকে তাকিয়ে আসতে দেখে নেমে দাঁড়াল। দীপুও লক্ষ করেছে কমলা রিকশাটার দিকে কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে।

মা, রিকশায় ওঠো।

ধার করলে তার বাবা রাগ করবে।

জানবে কী করে?

তাহলে কার কাছ থেকে নিয়ে ধার শুধবি?

তবে বাবা এল না কেন? কেন আমায় পয়সা না দিয়ে পাঠাল?

চিৎকার করল দীপু। চোখে জল এসে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে।

অ দীপু, তুই চুপ কর।

কেন করব? তােমার জন্যই তাে এই কষ্ট। দারােয়ানটার কাছ থেকে ঠিক ভাগ আদায় করে নিতুম।

দীপু তুই রিসকায় ওঠ, আমি ধার শােধ করে দেব।

দীপু রিকশার ছায়া থেকে বেরিয়ে নর্দমায় পা রেখে দাঁড়াল।

লক্ষ্মীছেলে আমার।

না।

দীপু চোখ সরিয়ে নিল। কমলার চোখের থেকে দূরের রাস্তা অনেক ঠাণ্ডা। রিকশাওয়ালা সিটে উঠে বসল। ঘাম গড়াচ্ছে কমলার গাল বেয়ে। ভুরু ভিজে গেছে। চোখ জ্বলছে। ঘাড়ে চোখ ঘষল। চোখ দুটো গর্তে বসে গেছে। শুকনাে বাতাসে চুল উড়ে পড়ল কপালে। ঠোঁট চাটল কমলা। গলার নলিটা তুলতুল করে কাঁপছে।

এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে, চল ওখানটায় বসি।

মনােহারী দোকানটার সিঁড়িতে ছায়া। দীপু সিঁড়িতে বসল। কমলা এল না। উঠে এসে দীপু এর হাত ধরে টানল।

আমি যাব না।

মাকে দু-হাতে জড়িয়ে দীপু টেনে আনল। দোকানি খবরের কাগজ পড়ছিল। ওদের দেখে নিয়ে আবার পড়তে শুরু করল।

মা তােমার খিদে পেয়েছে?

না।

না কেন, এত বেলা হয়েছে।

বেলায় খাওয়া আমার অভ্যেস।

ঘাড় ফিরিয়ে কমলা দোকানের ভিতর তাকাল। সারি সারি বয়ামে বিস্কুট আর টফি।

তাের খিদে পেয়েছে?

না।

বললেই বিশ্বাস করব! সাড়ে নটাতেই ভাত ভাত করে চিৎকার করিস না?

তােমারও তাে পেয়েছে।

আমার গা গুলােচ্ছে। খেলে বমি হয়ে যাবে।

আঁচল থেকে বারােটা পয়সা খুলে নিল। বিস্কুট কিনল দীপু। খেতে খেতে আড়চোখে দেখল কমলা তার খাওয়া দেখছে। দুর্গা প্রতিমার মতাে হাসিটা, মানে বােঝা যায় না। শেষ বিস্কুটটা এগিয়ে দিল দীপু।

না, তুই খা।

বাচ্চার বুকের ওপর বিস্কুটটা রাখতেই গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিল, কমলা ধরে ফেলল। দীপু মুখ ঘুরিয়ে সরে বসল। জিভ দিয়ে মাড়ি পরিষ্কার করে, টাকরায় শব্দ করল।

কমলা তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে একদৃষ্টে। ফুটপাথে বসন্তের ঘায়ের মতাে দাগ। অনেক দিনের অনেক লােকের হাঁটাচলার জায়গায় জায়গায় দাগগুলাে মিলিয়ে গেছে। দীপুর বাবার মুখের দাগগুলো এখনও মেলায়নি। তখন অনেকেই বলেছিল কচি ডাবের জলে মুখ পুতে, ধােয়নি। এই ফুটপাথের মতাে হয়ে আছে ওর মুখটা। মানুষটাও খ্যাপাটে হয়ে গেছে। খেপলে মুখটা বাটনা বাটা শিলের মতাে হয়ে যায়। একঘেয়ে, রােজকার অভ্যাস। আয় বাড়ছে না, ঘর বাড়ছে না, খাটুনিরও কামাই নেই।

কেন যে এমন করে। এতে আমার কী দোষ, আমি কী করতে পারি, উঁ?

ফুটপাথের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে নিজের মনেই কমলা বলল। বাচ্চার গলায় সুতাের মতাে ময়ল্লা। সাবধানে তুলে ফেলে দিল। মাথায় হাত বােলাল। চুল নেই বললেই হয়। দীপুটারও ছিল না।

আস্তে আস্তে কমলার শুন্য চোখ ভরাট হয়ে উঠল। হাসল সে।

তাের বেলায় টাসকি করে এসেছিলুম।

সেকথা তাে বললে।

বলেছি না কি! তুই এর থেকেও বড়ােসড়াে হয়েছিলি, বলেছি? হয়েই কী কান্না। এটা কিন্তু একদম কাঁদেনি।

বাচ্চার ঠোঁট নড়ছে। বােধ হয় খিদে পেয়েছে। কমলা মাই গুঁজে দিল ওর মুখে। দীপু আড়চোখে দোকানির দিকে তাকাল। এইদিকেই তাকিয়েছিল, চোখে চোখ পড়তেই কাগজটা তুলে ধরল।

তাের ষষ্ঠী পুজোর দিন একটা ধনেখালি ডুরে পেয়েছিলুম। ঠাকুরঝির বিয়েতে খোঁচা লেগে ছিড়ে গেছল। পর্দা করেছিলুম।

আমাদের পর্দা ছিল!

জানলায়। ঘন্টুদের বাড়িতে একটা লােক তখন ভাড়া ছিল, খালি তাকাত।

কমলার খেয়াল হল চটিটা এখনও পড়ে আছে। খুলে ফেলল।

থাক-না।

না তুই পর। এটা পরলে কেমন কেমন লাগে। পায়ের পাতায় হাত বোলাল কমলা। আঙুলে হাজা, গােড়ালি ফাটা।

আমার জন্যই এই কষ্ট না রে?

তােমার জন্য কেন হবে।

দীপু মাথা নামিয়ে পায়ের আঙুলের ফাঁকে আঙুল ঘষতে শুরু করল। কমলা মুখ তুলে তাকাল আকাশে। গরমে চোখ পাতা যায় না। তাকাল ফুটপাথে। সেই বসন্তের ঘায়ের মতাে দাগ। বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, কষ্ট কি আমি ইচ্ছে করে দিই, সংসারে দুখু বাড়ুক তা কি আমি চাই। কিন্তু তার বাবার যে একটুও কান্ডজ্ঞান নেই। বারণ করলে রেগে ওঠে।

যার কান্ডজ্ঞান নেই তার রাগারও কোনাে মানে নেই। আপিসে বসে মজা দেখছে হয়তাে, আর আমরা এখানে…

মুখ তুলল কমলা। ছেলের চোখে রাগ, ধমকানি, দুঃখ। ও এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। ধক করে উঠল কমলার বুক। ছেলেকে আর এখন চেনা যাচ্ছে না। মস্তবড়াে হয়ে গেছে। বুঝতে শিখেছে, ধমকাতে শিখেছে। কিন্তু ও ধমকাচ্ছে কাকে! আমাকে? আমি কী দোষ করেছি! ইচ্ছে করে কি সংসারে অশান্তি এনেছি? ছেলেটা বাপের স্বভাব পেয়েছে, সবটাতেই রেগে ওঠে। এইটুকু ছেলে রাগে কেন? ওকি সংসারের হালচাল বুঝে ফেলেছে?

কমলা চুপ করে তাকিয়ে রইল। রাস্তার ওপারে ফুটপাথে ছায়া। খাটিয়ায় একটা লােক শুয়ে। কাঠ কাটছে একটা মেয়েমানুষ। হঠাৎ দমকলের ঘণ্টা বাজল। গাড়িগুলাে রাস্তার কিনার ঘেষে এল। ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল একটা দমকলগাড়ি।

আহারে! কাদের আবার কপাল পুড়ল।

যাদেরই পুড়ক-না, তােমার কী?

ক্ষতি তাে হবে!

হােক গে, তা ভেবে আমাদের কী হবে, বাড়ি পৌঁছােতে পারব কি?

ছেলের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে। পিচ গলে যাওয়ায় চড়বড় শব্দ হচ্ছে। গাড়ির চাকায়। এখন অনেকখানি পথ হাঁটলে তবে বাড়ি পৌঁছােনাে যাবে। ছেলে মেয়েগুলােকে শিকলি দিয়ে ঘরে আটকে রেখে এসেছে। তাদের খাওয়া হয়নি। গিয়ে উনুন ধরিয়ে বেঁধে খাওয়াতে হবে। ওরা এতক্ষণ কী করছে কে জানে। হুটোপাটি করে ঘরের জিনিস ভেঙেছে। বালিশ নিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলেছে। নিতুটার ভীষণ লােভ চিনিতে। দেয়ালে পা দিয়ে দিয়ে উঠে হয়তাে শিশিটা সাবড়ে দিয়েছে। বাছুর ঘরকন্নার কাজ খুব পছন্দ। কুজো থেকে জল ঢেলে, জামাটামা কিছু একটা দিয়ে ঘর মুছতে শুরু করেছে। কিন্তু কতক্ষণ ওরা খেলা করবে। খিদে পাবে, চিৎকার করবে, কাঁদবে। ওরা তাে সবসময়ই চ্যাঁচায়। পাশের বাড়ির লােকেরা শুনলে গ্রাহ্যই করবে না। হয়তো তারপর কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়বে। নিতুটা আগে ঘুমােবে। ওর স্বাস্থ্যটাই ভালাে। অপুকে হয়তাে বাছুই ঘুম পাড়িয়ে দেবে। জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাচ্চুটাও ঘুমিয়ে পড়বে একসময়।

আবার উঠছ কেন?

আর বসে থাকতে পারছি না রে। আমার কষ্ট হচ্ছে।

হচ্ছে তাে যাও, আমি উঠতে পারব না।

তুই অমন করে আর কথা বলিসনি।

কেন বলব না, কেন পয়সা পর্যন্ত চেয়ে রাখ না?

আমায় যদি না দেয় কী করতে পারি।

তুমি একটা বােকা। মান-ইজ্জতটাই তােমার কাছে বড়াে, নইলে দারােয়ানটা পর্যন্ত…

ফ্যালফ্যাল করে কমলা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। …ও বলছে আমি বােকা। তাহলে একটু আগে কেন আমায় চটি পরতে দিয়েছিল? ওর নিজের পা পুড়বে তা কি ও জানত না?…

মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে দীপু। কমলার চোখ টলটল করছে। দোকানি টেবিলে থুতনি রেখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। এতক্ষণে একটাও খদ্দের আসেনি।

রােগা জিরজিরে একটা গােরুকে দুটো লােক টানতে টানতে নিয়ে এল। ইলেকট্রিক পােস্টে বেঁধে লােক দুটো এপার-ওধার তাকাচ্ছে। মুচকি হেসে গেল এক পিয়ােন। খাটিয়ায় শােয়া লােকটা উঠে বসেছে। উরু থাবড়ে চা-ওয়ালাকে ডাকল। সামনের বারান্দায় ঘোমটা দিয়ে এক বউ এসে দাঁড়াল।

শালা যা গরম পড়ছে! না যায় ঘরে বসে থাকা, না যায় বাইরে বেরােনাে।

লুঙ্গির কষি আটতে আটতে দোকানি বেরিয়ে এল। গােটা চোখ বুজে জাবর কাটছে।

উধার দেখাে। গলিকা ভিতর এক ঠো হ্যায়।

দোকানি হাত তুলে কাছের গলিটা দেখিয়ে দিল। দুটো লােকের একজন সেইদিকে গেল। একটা মাছি বসেছে গােরুটার পিঠে। থরথরিয়ে চামড়া কাঁপাল। উঠে দাঁড়াল দীপু। হনহন কার খানিকটা গিয়ে পিছু ফিরে তাকাল। কমলা সঙ্গে আসেনি।

কী জন্য দাঁড়িয়ে আছ? চলে আসছ না কেন?

কাছে এসে কমলা বলল, তুই হঠাৎ এমনভাবে হাঁটতে শুরু করে দিলি যে?

কথা না বলে দীপু হাঁটতে লাগল। ঘাড়টা নামানাে। হাত দুটো আড়ষ্ট। মুখ দেখে কিছু বােঝা যায় না।

পা জ্বলছে। জ্বলুক। ওকথা বললেই বিপদ। ছেলে হয়তাে আবার বলবে ছায়ায় দাঁড়াই। তাহলে বাড়ি পৌঁছােনাে যাবে না। কিংবা হয়তাে চটিটা খুলে দেবে। তার চেয়ে এই ভালো। ওকে কষ্টের কথা জানতে না দিলেই হল। এখন অনেক রাস্তা হাঁটতে হবে। দীপু একটু আস্তে চ।

দীপু দাঁড়াল। কমলা পাশে আসতেই বলল, ওটাকে আমার কাছে দাও।

না রে বড় নরম, পারবি না।

খুব পারব।

বাচ্চাকে দীপুর হাতে তুলে দিল কমলা। আস্তে আস্তে পা ফেলে চলতে লাগল দীপু।

হ্যাঁ রে, তাের মনে আছে বাচ্চুকে একবার ফেলে দিয়েছিলি?

জবাব দিল না দীপু। কথা বলতে গেলে রাস্তা দেখে চলা যায় না ঠিকমতাে। ঠোক্কর খেয়ে পড়লে বাচ্চাটা বাঁচবে না।

ঘ্যানঘ্যান করতিস বােনকে কোলে নেব বলে। একদিন দিলুম কোলে তুলে। ওমমা! দেয়ামাত্তরই যেই দাঁড়াতে গেলি আর টলে পড়ে একশা কান্ড।

শালা খচরা কোথাকার।

ইটটাকে লাথি মেরে দীপু ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পাঠাল। হাতের পুঁটলিটা দুলিয়ে কমলা একটা খুকির মতাে হাসল। পায়ের তলার জ্বলুনিটা সয়ে এসেছে। রাস্তার সবটাই তাে আর তেতে নেই। মাঝে মাঝে ছায়া আছে, জল আছে, মার্টিও আছে।

আচ্ছা বল তাে, এখন যদি তাের বাবার সঙ্গে দেখা হয়, কিংবা দারােয়ানটা এসে যদি বকশিশের ভাগ দিয়ে যায়। তাহলে টাসকি করে বাড়ি যাওয়া যায় না রে?

দীপুর দিকে আড়ে তাকিয়ে কমলা কুট করে বিস্কুট কামড়াল। তারপর আবার খুকির মতাে হাসল।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত