মৌলবাদের উৎস সন্ধানে (পর্ব-৫)

মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ
 
ধর্ম তার বিপন্ন অস্তিত্বের সময় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে মৌলবাদের আশ্রয় নেয়। পুঁজিবাদ তার মুমূর্ষ অবস্থায় বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টায় সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। উভয়ের সৃষ্টির পেছনেই বিশেষ একটি শ্রেণীর বা তার একাংশের ভূমিকা প্রধান।
 
ধর্ম ও পুঁজিবাদ দুটিই এক সময় মানব সভ্যতার ইতিহাসের বিশেষ সময়ে জনস্বার্থবাহী, প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু মানুষের সমাজ ও জ্ঞানের বিকশিত পর্যায়ে তাদের প্রয়োজন ক্রমশ ফুরিয়ে আসে বা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রাসঙ্গিকতা আর থাকে না। প্রয়োজন হয়ে পড়ে নতুনতর মতাদর্শের, যা ধর্ম ও পুঁজিবাদের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়ে তাদের সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু ধর্ম ও পুঁজিবাদকে সম্বল করে যে কায়েমী স্বাৰ্থ তৈরী হয়ে যায়। তারা নিজেদের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করতে এগুলিকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধ পরিকর থাকে। এদের ঘিরে বিশ্বাস, নির্ভরতা ও অভ্যাসও বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে তৈরী হয়ে যায়। এরাও নতুনতর চিন্তা ও নতুনতর ব্যবস্থাকে স্বাগত জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। এই দ্বিধার ও বদ্ধপরিকর ইচ্ছার চরম সাংগঠনিক বহিপ্রকাশ ঘটে ধর্ম ও পুঁজিবাদের বিকৃত ব্যবহার তথা মৌলবাদী সংগঠন ও সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এবং উভয়েই উভয়ের সাহায্য নিতে পারে বা না-ও নিতে পারে। কিন্তু উভয়েই মানুষের সভ্যতাকে পিছিয়ে নিয়ে যেতে চায়,-ধর্মীয় মৌলবাদ মূলত তার মননকে, সাম্রাজ্যবাদ মূলত তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে, যদিও উভয় ক্ষেত্রেই উভয়ের প্রভাব থাকেই।
 
 
ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। বর্তমানে মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় দুটি বিপদ। প্রথমটি মানুষের মনকে আদিম প্রচীন মূল ধর্মীয় বাতাবরণে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বিকাশ ও উত্তরণকে ব্যাহত করে সমস্ত প্ৰগতিশীল বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে সক্রিয়ভাবে প্রতিহত করে এবং আরো বিপজ্জনক হল তা মানুষে মানুষে কৃত্রিমভাবে তীব্র বিভেদ সৃষ্টি করে। এই বিভেদ প্রতিহত না হলে তা হিংস্র৷ পারস্পরিক হানাহানিতে মানুষের ও তার সভ্যতার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে সক্ষম। ধর্মপরিচয়ের মত সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও আরোপিত একটি পরিচয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নিজেরই মত আরেকটি মানুষকে ঘূণা করতে, শক্রতে পরিণত করতে, এমনকি হত্যা করতে উৎসাহিত করে ধর্মীয় মৌলবাদ। পাশাপাশি সে আপন ধর্মের শত্রুদেরও সুহৃদের মুখোশ পরায়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ তার নেতৃত্ব দিলেও সরল ধর্মবিশ্বাসী বহু মানুষকে সে এই বিশ্বাসের কারণে তার চারপাশে জড়ো করে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
 
অথচ এক সময় এই ধর্ম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছে, সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। (Religion কথাটিই এসেছে re-digare থেকে যার অর্থ পুনঃসংযুক্ত করা।) তখনকার সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রাসঙ্গিকতা ও উপযোগিতাও ছিল। কিন্তু সমাজে যতই শ্রেণীদ্বন্দ্ব বেড়েছে, ততই ধর্মের বিকৃত ব্যবহার তীব্রতর হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী তাকে নিজের শাসন, শোষন ও অস্তিত্বের স্বার্থে মানুষকে ভুলিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। এই শ্রেণীবিভক্ত ব্যবস্থার অনুসঙ্গ হিসেবে সৃষ্টি হওয়া ও টিকে থাকা নানা প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মকে তারা নিজেরাও অনুসরণ করেছে, কখনো নিছক নিজস্ব বিশ্বাসের কারণে, কখনো বা সচেতন ভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। এ কারণেই অ্যারিস্টটল (জন্মঃ খৃ:পূ: ৩৮৪) তাঁর ‘Politics’-এ মন্তব্য করেছিলেন, ‘স্বেচ্ছাচারী শাসককে (অটোক্র্যাট) ধর্মের প্রতি অতিশয় আনুগত্য দেখাতেই হবে। কারণ জনগণ যদি তাকে ধাৰ্মিক বলে মনে করে তবে তার বেআইনি অত্যাচার, নিপীড়নকেও সহ্য করবে এবং তার বিরুদ্ধে সহজে বিদ্রোহও করবে না, কারণ তারা মনে করবে। তার পক্ষেই দেবতারা রয়েছে।’
 
 
তাঁর জন্মের প্রায় ১৮০০ বছর পরেও ছবিটা যে পাল্টায়নি, তা বোঝা যায় ম্যাকিয়াভেলি (জন্মঃ ১৪৬৯ খৃস্টাব্দী)-র মন্তব্যে (The Prince)-’রাজপুত্রের পক্ষে সমস্ত ভাল মানবিক গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, অন্তত তাকে দেখে সে রকম গুণসম্পন্ন মনে হওয়া চাই, এবং সর্বোপরি, তাকে দেখে যেন পুণ্যবান, ধাৰ্মিক মনে হয়। তাতে যদি কেউ কেউ তাকে অন্যরকম দেখতে পায় তাহলেও তারা কিছু বলবে না.। জনগণের অধিকাংশই মনে করবে। যে সে একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যদিও কোনো বিশ্বাসই সে করে না বা ধর্মের প্রতিও তার কোনো আস্থা নেই। তবুও সে শুধু সাধু ব্যক্তির ভান করেই চালিয়ে যাবে, কারণ তার জন্য তো কোনো মূল্যই দিতে হয় না। তদুপরি ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্মযাজকদের প্রতি তার বিশেষ আগ্ৰহ দেখাতে হবে।’ (এইভাবে ধর্মের ভান করে মানুষকে প্রতারিত করা ও শাসন করার কৌশলের নির্দেশ সব ধর্মগ্রন্থেই আছে, হিন্দুদের মহাভারত, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰ, মনুসংহিতা ইত্যাদিতে বটেই। বর্তমানের হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে এইসব গ্ৰন্থ খুবই মূল্যবান’)
 
ধর্ম ও শাসকশ্রেণী এইভাবে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে গোলাম আজম-এর মত মুসলিম মৌলবাদী বা ডঃ মুরলীমনোহর যোশীর মত হিন্দু মৌলবাদীরা আদৌ ইসলাম বা হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী। কিনা বা কতটা বিশ্বাসী এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আসলে তারা এমন ভান করে যাতে তাদের ‘দেখে যেন পুণ্যবান, ধাৰ্মিক মনে হয়।’ নিক্সন থেকে রাজীব গান্ধী, বিল ক্লিন্টন থেকে নরসিমহা রাও—সবার ক্ষেত্রেই কথাটা হয়তো কমবেশি সত্যি। শাসন ও ধর্মের এই সম্পর্কের কারণেই হয়তো যুধিষ্ঠিরের মত খালি ‘ধর্ম ধৰ্ম’ করা অজঙ্গী শাসকের চেয়ে কৃষ্ণ বা রামের মত যাঁরা ধর্ম আর শাসনের মধ্যে ব্যালেন্স করেছিলেন, তাঁরাই হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে বেশি প্রিয় ও কাছের লোক (যদি সত্যিই এরা কোন দিন থেকে থাকেন)।(১) ইসলামী মৌলবাদীদের কাছে একা হযরত মহম্মদই এ ব্যাপারে, একশ’ জনের কাজ করে দিয়েছেন।
 
 
বর্তমান পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে অর্থনৈতিক শাসনের (এবং পরোক্ষ রাজনৈতিক শাসনেরও) সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সে অনায়াসে একটি দেশের অননুগত সরকারকে ফেলে দিতে পারে, পুরো অর্থনীতিকে কাজ করতে পারে, লক্ষ লক্ষ যুবক যুবতীর সাংস্কৃতিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে বিকৃত করে দিতে পারে, গাধার সামনে গাজর ঝোলানোর পদ্ধতিতে দরিদ্র দেশের হাজার হাজার মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে ক্রীতদাসে পরিণত করতে পারে। এমনকি বাজার দখলের স্বার্থে বোমা মেরে কয়েক লক্ষ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে মেরেও ফেলতে পারে। স্পষ্টতঃই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অ্যারিষ্টটল-ম্যাকিয়াভেলি-ভীষ্ম-মনু বা মহম্মদের শিক্ষাকে সে-ও তার স্বার্থে ব্যবহার করে। এ করতে গিয়ে সে যে সব সময় ধর্মীয় মৌলবাদী হয়ে ওঠে তা নয়, কিন্তু প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করতে বা ধর্মীয় মৌলবাদীদের সাহায্য করতে সে পিছপা হয় না। তাই দেখা যায় ইরানে যখন ইসলামী মৌলবাদীরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা নেয় (যদিও সাময়িকভাবে ও নিজের স্বার্থেই), তখন পাকিস্থানের ইসলামী মৌলবাদীরা ঐ সুগ্ন্যুই মত নেয় বা আমেরিকার মৌলবাদীরা শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে।
 
নব্যপ্রস্তর যুগের শেষ ১০০০ বছরে (অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর আগে) ঐতিহাসিকভাবে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সৃষ্টির সময় থেকে ঈশ্বর বিশ্বাস তথা ধর্মের এই শ্রেণী:স্বার্থে ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু ঐ সময়, এবং তারো আগেকার সময়ে, ধর্ম ও ঈশ্বরবিশ্বাস বিভিন্ন মনুষ্যগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ ছিল। জাগরণ থেকে নিদ্রা ও তার মধ্যবর্তী সমস্ত দৈনন্দিন কাজে এই ধর্মীয় চেতনার ঐতিহ্য অনুসারী নির্দেশগুলি সম্পূক্তভাবে মিশে থাকত। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বিভেদ থাকলেও এবং একই গোষ্ঠীর মধ্যে দায়িত্বের পার্থক্য থাকলেও, অর্থনৈতিক শ্রেণীর অনুপস্থিতির কারণে এই বিশ্বাসের শ্রেণীগত ব্যবহারও আদিম মানব সমাজে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু গোষ্ঠীপতির সৃষ্টি, তাকে সাহায্যকারী পুরোহিত শ্রেণীর উদ্ভব এবং কিছু মানুষের হাতে উদ্ধৃত্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে যে বৈষম্য ধীরে ধীরে, যেন অতি স্বাভাবিকভাবে সৃষ্টি হল, ঐ বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে ঐসব ব্যক্তিরা ধর্মীয়-ঐশ্বরিক বিশ্বাসকেও কাজে লাগাতে থাকে। নিজেদের প্রতি আনুগত্যকে ঐশ্বরিক নির্দেশ ও ইচ্ছা বলে প্রচার করেছে। যতদিন গেছে, ততই তা তীব্র হয়েছে। কিন্তু তারও পরোকার দীর্ঘ সময় ধরে এই ধর্মবিশ্বাসও কিছু মানুষের সামাজিক আন্দোলনে হাতিয়ারের ভূমিকা পালন করেছে। নতুন দার্শনিক উপলব্ধি, ধর্মের নামে পুরোহিততন্ত্র বা রাজতন্ত্রের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা, মানবিক ঐক্য ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা, সামাজিক উৎপাদনে ও শিল্প-সাহিত্যে মানুষকে উৎসাহিত করার মত নানা ইতিবাচক কাজ ধর্মকে কেন্দ্র করে বা ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষ করেছে। কিন্তু কখনোই ধর্মের শ্রেণী:বহির্ভুত ব্যবহার হয় নি, তা হওয়া সম্ভবও নয়। শাসকশ্রেণী ধর্মকেও তার হাতিয়ার করেছে। আর শোষিত মানুষ তাকে ব্যবহার করেছে একটি অলীক অসহায় আশ্রয়স্থল হিসেবেও,-একটি মানসিক নেশার মত। আফিম যেমন কৃত্রিমভাবে রোগযন্ত্রণা বা ব্যথার অনুভূতি কমায়, কিন্তু মূল রোগটি সারায় না, তেমনি তারাও তাদের দৈনন্দিন জীবনের হতাশা, বঞ্চনা, ব্যর্থতা ও দুরবস্থার যন্ত্রণাকে ভুলে থাকতে ঈশ্বর ও ‘তাঁর’ ধর্মকে আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু এর ফলে এসব সমস্যার সমাধান তো ঘটেইনি, বরং বেড়েছে।
 
 
এই শ্রেণীর সৃষ্টি তথা ধর্মের শ্রেণীগত ব্যবহার অর্থনীতির সঙ্গেই যুক্ত। কৃষি পদ্ধতির আবিষ্কার, ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি, শৃঙ্খলার স্বার্থে গোষ্ঠী ও গোষ্ঠীপতির উদ্ভব ইত্যাদি নানা কিছু এর পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আদিম উৎপাদন ব্যবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে দাস ব্যবস্থা, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মত সাধারণভাবে বিভক্ত করা অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে ধর্ম ও তার ব্যবহারের রূপান্তর ঘটেছে। রূপান্তর ঘটেছে ধর্মীয় অনুশাসন, মূল্যবোধ ও নীতি বাক্যেরও। আদিমকালে মানুষ যখন শুধুমাত্ৰ ঐশ্বরিক শক্তির কাছে প্রার্থনাদি করেই নিজেদের উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে, দাসব্যবস্থা ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর রূপান্তর ঘটল দ্বিধাহীন আনুগত্যের মানসিকতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। এই চরম আনুগত্য ঈশ্বর ও ধর্মের প্রতি যেমন তেমনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি ও ধর্মের রক্ষক হিসেবে প্রচারিত পুরোহিত ও রাজার প্রতিও তথা শাসকগোষ্ঠীর প্রতিও। এই মানসিকতা না থাকলে মুখ বুজে উৎপাদন বাড়ানো যায় না, এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের অধীনে তথাকথিত সামাজিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখা যায় না। ভারতে যেমন দাসপ্রথা প্রচলিত না হয়েও চতুর্বর্ণ বিভাগের মধ্য দিয়ে শূদ্রদের সৃষ্টি করা হয়েছে, যারা সামাজিক ভাবেই দাস-গোষ্ঠী ও একান্ত অনুগত একটি শ্রেণী। প্রকৃতির উপর তথা এক অজ্ঞাত শক্তির উপর নির্ভরতা এই আনুগত্যের শক্তি জুগিয়েছে। (কিন্তু অবশ্যই প্রতিটি স্তরে নানা ভাঙ্গাগড়া ও টানাপোড়েনের সঙ্গে মানুষের নিজস্ব শ্রম, মেধা ও উদ্যমও মিশেছিল, সৃষ্টি হয়েছে নিত্য নতুন দ্বন্দ্ব।)
 
পাশাপাশি অস্তুত হাজার আড়াই বছর আগে কিছু মানুষের বস্তুবাদী দার্শনিক উপলব্ধিও ঘটেছে। উপলব্ধি করা গেছে ঈশ্বর বিশ্বাস আর এই বিশ্বাসকে কেন্দ্ৰ করে গড়ে ওঠা ধর্ম ও তার অনুশাসনের অসারতা ও ফকির দিকগুলিও। কিন্তু তখন এগুলি মূলত ছিল উপলব্ধিই, যদিও তার সামাজিক ইতিবাচক কিছু দিকও অনুভব করা বা প্রমাণ করা সম্ভব ছিল। (যেমন পুরোহিতদের উচ্ছেদ ঘটিয়ে মানুষের উপর শোষণ ও অত্যাচার কমানো সম্ভব।) তা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যবস্থাকে পাল্টানো এবং ধর্মের ভিত্তিকে নাড়ানোর মত অবস্থা তার ছিল না, কারণ ঐ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানই তখনো মানুষের করায়ত্ত হয়নি। এই অজ্ঞানতার পরিবেশে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় তাণ্ডব ও চূড়ান্ত শোষণভিত্তিক সমাজ হাতে হাত ধরে টিকে থেকেছে৷
 
কিন্তু মূলত ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দী থেকে দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্বি কাটিয়ে মানুষ আবার যুগান্তকারী নানা আবিষ্কার ও জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে। ব্যপারটি এখন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে শেষ হওয়া নব্য প্রস্তর যুগের শেষ দু’হাজার বছরে মানুষের একের পর এক যুগান্তকারী নানা আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনীয়, —যখন মানুষ মাটির জিনিষ তৈরী করা, লোহা ছাড়া অন্যান্য কিছু ধাতুর আবিষ্কার ও ব্যবহার, কৃত্রিম সেচ-ব্যবস্থা, নদীকে পোষ মানানো, চাকার আবিষ্কার, পাল তোলা নৌকার ব্যবহার, লাঙলের ব্যবহার, চাষের কাজে গবাদি পশুর ব্যবহার, আদিম পঞ্জিকার উদভাবন, সংখ্যার ব্যবহার, ইট আবিষ্কার করে তা দিয়ে ঘরবাড়ি বানানো, লেখার পদ্ধতি তথা আদিম লিপি-ইত্যাদির মত বৈপ্লবিক নানা আবিষ্কার করেছে। স্পষ্টতঃ এগুলি মানুষের জীবন, মনন, অর্থনীতি ও সমাজ সবকিছুকে প্রভাবিত করেছে। উৎপাদন বেড়েছে ও উদ্ধৃত্তি সম্পত্তির সৃষ্টি হয়েছে। তাকে রক্ষা করার জন্য শাসকের প্রয়োজন হয়েছে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ সৃষ্টি হয়েছে।
 
 
কিন্তু একসময় এই শ্রেণীবিভাজন তীব্র হওয়ার কারণে মানুষের চেতনাও দাস ব্যবস্থার মত দাসত্বে অভ্যস্ত হয়েছে। ফলে নব্যপ্রস্তর যুগের পরবর্তী ২০০০ বছরে (অর্থাৎ তথাকথিত সভ্যতা শুরুর তথা ঐতিহাসিক যুগ শুরু হওয়ার প্রথম ২০০০ বছরে) মানুষের চিস্তাচেতনায় এই দাসত্বের অনিবাৰ্য প্রতিক্রিয়ায় তার বিজ্ঞানচর্চাও অবরুদ্ধ হয়েছে। দেখা গেছে এই সময়ে মাত্র চারটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ঘটেছে, যেমন দশমিক পদ্ধতি (২০০০ খৃস্টপূর্বাব্দ), লোহার আবিষ্কার (১৪০০ খৃস্টপূর্বাব্দ), বর্ণমালার আবিষ্কার (১৩০০ খৃস্টপূর্বাব্দ) এবং পয়ঃপ্ৰণালীর আবিষ্কার (৭০০ খৃ খৃস্টপূর্বাব্দ)।
 
এবং প্রকৃতপক্ষে তারও পরবর্তী প্রায় ২০০০ বছর ধরে অর্থাৎ সমগ্ৰ মধ্যযুগ অব্দি এই অবৈজ্ঞানিক আচ্ছন্নতা ছিল। সামাজিকভাবে বিজ্ঞানচেতনার শূন্যতা পূরণ করতে এই আচ্ছন্নতন্ত্রর একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ধর্ম। ভারত থেকে ইয়োরোপ পর্যন্ত ছিল একই চিত্র, যদিও সর্বত্রই কমবেশি কিছু বৈজ্ঞানিক কাজ ও গবেষণাও চলেছিল কিছু মানুষের স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসার প্রেরণায়। মধ্যযুগে খৃস্টান ইয়োরোপে ধর্মচৰ্চা ও ধর্মসাধনাই ছিল মানুষের জীবনের প্রধান কাজ। ভারতসহ অন্যান্য নানা দেশও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে এছবি আস্তে আস্তে পাল্টাতে থাকে। দীর্ঘদিনের জড়তা ও অন্ধত্বের প্রতিক্রিয়ায় হয়তো এক সময় কর্মচাঞ্চল্য ও আলোকের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধর্মের তথাকথিত রক্ষকেরা এই আলো-কেমোটেই যে সহজভাবে নেয়নি তা অজানা নয়। গ্যালিলিও গালিলি (১৫৬৪— ১৬৪২) বা জিওরদানো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০)-এর মত বৈজ্ঞানিক মানসিকতার লোকেদের উপর ধর্মীয় অত্যাচারের কথা সুবিদিত। এমনি ভাবেই ধর্মসংস্থার কর্তৃপক্ষীরা যান্ত্রিক ঘড়ির প্রচলনেরও বিরোধিতা করেছিল, কারণ তা হলে তাদের ঘোষণা করা খৃস্টান ধর্ম-মুহূর্তগুলি(২) ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞান চর্চার প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এমন প্রতিরোধের ঘটনা ঘটেছে। (এখনো যেমন বলা হয় যে, ‘দু পাতা বিজ্ঞান পড়ে ধর্ম-ভগবান মানছে না’)
 
কিন্তু মধ্যযুগের শেষদিক থেকে একের পর এক অসংখ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার মানুষের সমাজ, উৎপাদন ব্যবস্থা ও মননকে পাল্টাতে থাকে, কিংবা ধর্মান্ধতার প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে ওঠা যুক্তিবোধ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার ফলেই এমন সব আবিষ্কার করা সম্ভব হয়। ১৪০০-১৬০০ সময়কাল-এটি এই আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাবের সময় তথা ইয়োরোপীয় রেনেশার (বা পুনর্জন্মের) কাল, যখন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও ধর্মব্যবস্থা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য চর্চা, শিল্পকলা ও ভাস্কর্য ইত্যাদি নানা মানবিক ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন ঘটে। (এবং তারই ধারাবাহিকতায় মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা তথা সত্যের প্রতি অনুসন্ধিৎসা এই বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ তীব্ৰতা লাভ করেছে।)
 
এই রেনেশাঁর ফলে মধ্যযুগীয় পোপতন্ত্রের অবসানে জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হতে থাকে। সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পর্ক ক্রমশ ভেঙ্গে পড়তে থাকে, জন্ম হয় পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি। জন্ম হয় গোঁড়ামিমুক্ত বুর্জেয়া শ্রেণীরও এবং এটিও সুবিদিত, যে এই শ্রেণী প্ৰথমের দিকে ধর্মের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিল। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও রিফর্মেশান আন্দোলন শুরু হয়,-প্রোটেস্টান্টবাদ-উইজম-এর মত খৃস্ট ধর্মের বুর্জেয়া রূপের আবির্ভাব ঘটে। ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার বিরোধিতা করে তথা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করে, তাকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এই রোনেশী-র ফলেই গণতন্ত্র ও মানবতার পুনর্জন্ম ঘটে।
 
 
চিন্তার স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও রূপান্তর ঘটতে থাকে। দাসব্যবস্থার পরিপূর্ণদাসত্ব ও সমস্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রায় দাসত্বের অবস্থান থেকে নতুন উদ্ভূত শ্রমিক শ্রেণীকে নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুক্ত করে দেয়, যদিও তার হাতে উৎপাদন ব্যবস্থার উপাদানগুলির মালিকানা দেয় না, উৎপাদিত পণ্যাদির মালিকানাও নয়। এই নতুন ব্যবস্থা শ্রমিকের শ্রম স্বল্পমূল্যে ক্রয় করে নিয়ে মুনাফা বাড়ানোর জন্য তথা সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকে। মুনাফা না বাড়লে পুঁজির বিকাশ ঘটবে না, পুঁজির বিকাশ না ঘটলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটাই ভেঙ্গে পড়বে।
 
গণতন্ত্র, মানবতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত স্তরে ধর্মের প্রয়োগ, যুক্তিবাদী চিন্তা, বুর্জোয়া নাস্তিকতা ইত্যাদির মত নানা মানবিক মানসিকতার বিকাশের পাশাপাশি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একদিকে প্রয়োজনীয় ও ভোগ্য পণ্যের উৎপাদন বিপুলভাবে বাড়িয়ে তোলে,-অন্যদিকে অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ, পণ্যনির্ভরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য ইত্যাদিরও জন্ম দিতে থাকে। এই ধরনের প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই মুষ্টিমেয় দু’চারজনই সফল হতে পারে। বিপুল সংখ্যক মানুষের সাফল্য পুঁজির অতিবিভাজন ঘটায় তথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই বিরোধী। যত দিন যায়, ততই এই ব্যবস্থা নিজের সৃষ্টি করা সমস্যার জলে আটকে যেতে থাকে। তার থেকে মুক্ত হতে সে নতুনতর কৌশলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পুঁজি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একসময় অবধারিতভাবে মুনাফার হার কমে যায়। এটি পুঁজিবাদের অস্তিত্বের ক্ষেত্রেই সংকটের সৃষ্টি করে। এই সংকট আরো বাড়িয়ে দেয় পুঁজিপ্রয়োগের অসামঞ্জস্যতা। পুঁজিবাদের মূল কথা হল ব্যক্তিগত মালিকানায় ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য উৎপাদন। ফলত যে যার সুবিধা ও পরিকাঠামো মত পণ্যের উৎপাদন করে। আর এর থেকে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। তৃতীয়ত, অতি উৎপাদনের সংকট পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে। তারা মুনাফা (অর্থাৎ পরোক্ষ শোষণ) করতে করতে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাই কমিয়ে দিতে থাকে। ফলে পণ্য আর আশানুরূপ বিক্রি হয় না, তাকে নষ্ট করে দিতে হয়। কিন্তু জনগণের মধ্যে বিনামূল্যে তা বিতরণ করে না, করলে পরবর্তী মুনাফার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, পণ্যের দামও পড়ে যায়। এই অতি উৎপাদনের আরেকটি পরিণাম একের পর এক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া। এর ফলে শ্রমিকরা চরম সংকটের মধ্যে পড়ে, বেকারত্ব বাড়ে, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা আরো কমে। সব মিলিয়ে একদিকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভ ও জঙ্গী আন্দোলন যেমন শুরু হয়, তেমনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটিই ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। এক সময় যে ব্যবস্থা মানুষের মনন ও অর্থনীতিকে বিকশিত করার প্রগতিশীল ভূমিকা নিয়েছিল, পরবর্তীকালে তা নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে চুড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী ভূমিকা নিতে বাধ্য হয়। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে এবং ধর্মকেও নতুন করে ব্যবহার করার তথা ধর্মে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে।
 
সংকট থেকে বাঁচতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বহু গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন পথ হাতড়ে বেড়ায়। অন্যের পুঁজিকে যথেচ্ছ বাড়তে দেয় না, নিজের পুঁজির বিভাজন ঘটায় না, বড়জোর নিজ পরিবারের মধ্যে তাকে ভাগ করে। পুঁজিপতিরা পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ করে ও বাজার-গবেষণা করে কারখানা খোলে। জনগণের মধ্যে নিত্যনতুন অনাবশ্যক পণ্যের প্রতি কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে (হরলিক্স-কমপ্লান না হলে বাচ্চার শরীর ভাল হবে না, লিপস্টিক-নেলপালিশ না ব্যবহার করলে সুন্দরী হওয়া যাবে না বা ব্যক্তিত্বের বিকাশ হবে না ইত্যাদি অজস্রভাবে)। এর জন্য তাকে হাজারো গবেষণা ও মিথ্যাচার, অর্ধসত্য কথা বলা, চতুর বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিত্ব ও মানবতার নতুনতর সংজ্ঞা দেওয়া ইত্যাদির মত অজস্র কাজ করতে হয়।
 
 
পুঁজিবাদের প্রথম অবস্থা হচ্ছে অবাধ প্রতিযোগিতার কাল। কিন্তু এর ধারাবাহিকতায় এক সময় অবধারিতভাবে, দ্বিতীয় অবস্থায়, পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটে তথা কিছু একচেটিয়া পুঁজির জন্ম হয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টি হওয়া এই একচেটিয়া পুঁজি ক্রমশঃ নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে বিশ্বের বাজার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। দরিদ্র, পিছিয়ে থাকা দেশের স্বাধীন শিল্প বিকাশ ও অর্থনৈতিক প্রগতিকে প্রতিহত করে নিজেদের সুবিধাজনক শিল্প, পণ্য ও প্রক্রিয়া চাপিয়ে দিতে থাকে। তা করতে গিয়ে যুদ্ধ বাধাতে আর নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করতেও তারা পিছপা হয় না।
 
এরই প্রতিফলন ঘটেছে, ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারীতে তৈরী পি পি এস-২৩ নামে আমেরিকার চরম গোপনীয় ঐ দলিলে, যেটিতে পররাষ্ট্র দপ্তরের জর্জ কেনান জানিয়েছিলেন, ‘পৃথিবীর ঐশ্বর্যের শতকরা ৫০ ভাগের মালিক আমরা, কিন্তু আমরা পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র ৬.৩ ভাগ। এই অবস্থায় আমরা ঈর্ষা ও বিদ্বেষের লক্ষ্য না হয়ে পারি না। আমাদের সামনে মূল কাজ হল এমন একটা সম্পর্কের ছক খুঁজে বের করা, যার সাহায্যে আমাদের এই অসাম্যের অবস্থা জিইয়ে রাখা সম্ভব হবে। আমরা, বিশ্বের হিতসাধন কিংবা পরার্থপরতার ব্যয়ভার বহন করতে পারি এরকম চিন্তাধারা দিয়ে নিজেদের প্রতারণার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। মানবিক অধিকার, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিকরণ–এই সমস্ত অস্পষ্ট এবং অবাস্তব লক্ষ্য সম্পর্কে কথা বলা আমাদের বন্ধ করা উচিত। সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন আমাদের প্রত্যক্ষ শক্তি প্রয়োগের ধারণার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তখন আদর্শবাদী বুলিতে আমরা যত কম বাধাপ্রাপ্ত হই ততই ভাল।’
 
প্রাকৃতিক ও স্বকীয় কিছু কারণ আমেরিকার এই সম্পদের পেছনে হয়তো, ভূমিকা পালন করেছে, দরিদ্র দেশের মানুষের অযোগ্যতাও হয়তো তাদের দুরবস্থার পেছনে কিছু ভূমিকা পালন করে,-কিন্তু যখন এক ‘ধনী’ ‘দরিদ্রের’ উপর এই ‘প্রত্যক্ষ শক্তি প্রয়োগের’ নীতি গ্ৰহণ করে, তখন আর তা মানবিক থাকে না। অবশ্য এই মানবিকতা ও গণতন্ত্রের কথাবার্তা যে আসলে ভানমাত্র তা-ও স্বীকার করা হয়। যেমন প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এবং লাতিন আমেরিকায় কেন্যান-বৰ্ণিত আমেরিকান নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ‘আমাদের কঁচামাল রক্ষা করা।’ কাদের হাত থেকে? এইসব দেশের জনসাধারণের হাত থেকে, যারাই আসলে ঐ কঁচামালের মালিক এবং গায়ের জোরে সাম্রাজ্যবাদ তাকে তাদের নিজেদের ‘কাচামাল’ হিসেবে গণ্য করে। আর এই রক্ষা করার কাজ কিভাবে হবে তার উত্তরও স্পষ্ট,–
 
‘চুড়ান্ত উত্তরটা অগ্ৰীতিকর হতে পারে, কিন্তু স্থানীয় সরকার দিয়ে পুলিশী নিপীড়নে আমাদের দ্বিধা করলে চলবে না।’ এই দ্বিধাহীন নিপীড়ন এখন দেশে দেশে। ঐ সময় (১৯৪৯-এর গোয়েন্দা রিপোর্টে) এও বলা হয়েছিল, কমিউনিষ্টদের কোনোভাবে বাধা না দিতে পারলে আমাদের এই কঁচামাল’ বিপন্ন হতে পারে। এও মনে রাখা দরকার, চল্লিশের দশকের ঐ সময়ে আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্টরাও চূড়ান্ত কমিউনিস্ট-বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল, এবং এই সময়ের পর কমিউনিজমএর প্রসার রেখা ও বিভিন্ন দেশে কঁচামাল রক্ষণ করা (একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে)–র মহান’ উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চরম আকার ধারণ করে। —১৯৫০৫।৩-তে কোরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসন, ১৯৫৪-তে গুয়াতেমালায় মার্কিন সামরিক অভিযান, ১৯৫৬-তে মিশরে ব্রিটেন-ফ্রান্স-ইজরায়েলের, ১৯৫০-তে জর্ডান ও লেবাননে মার্কিন ও ব্রিটেনের, ১৯৬০-৬২-তে কঙ্গোয়, ১৯৬১-তে কিউবায়, ১৯৬২তে সেনেগালে প্রেসিডেন্ট সেংঘর-কে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা, ১৯৬৪-৭৫-এ ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন, ১৯৬৫-তে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে মার্কিন হস্তক্ষেপ, ১৯৬৯-৭৫-এ কম্বোডিয়া-লাওসে মার্কিন আগ্রাসন, ১৯৭৩-এ চিলিতে মার্কিন সমর্থনে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন, ১৯৭৫-৭৬ ও ১৯৮১-তে অ্যাঙ্গোলায় আগ্রাসন, ১৯৮১-তে মোজাম্বিকে, ১৯৮৩-তে গ্রেনাডায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তালিকা এখনো শেষ হয় নি।
 
এইভাবেই ১৯৬৫-তে ইন্দোনেশিয়ার একটি অভ্যুত্থানে আমেরিকা মদত দিয়েছিল। তাতে মারা যায় সাত লক্ষ মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই ভূমিহীন কৃষক। কয়েক মাসের মধ্যেই দেশটি আমেরিকার ‘বিনিয়োগকারীদের স্বৰ্গে’ পরিণত হল। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রবন্ধে একে বলা হল ‘এশিয়ার আলো’। আমেরিকার বহু ‘বুদ্ধিজীবী’-ই এ কাজকে খুব বাহবা দিলেন। তাঁরা বললেন, ‘এই চমৎকার ঘটনাগুলি ভিয়েতনামে আমাদের নীতির প্রাজ্ঞতা প্রমাণ করে।’ নতুনতর কৌশলে, নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির মধ্য দিয়ে এমন আগ্রাসন এখনো অপ্রতিহত গতিতে চলছেই।
 
বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এসবের নেতৃত্ব দেয়। আসলে তারা নিজেদের সংগঠন যে রাষ্ট্র তার মাধ্যমেই এই কাজ করে। তারা নিজেদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা চালায়। সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে বিশাল ক্ষমতাধর এই একচেটিয়া পুঁজি, যা নিজ দেশের বাজার শেষ করে ফেলে বাঁচার জন্য বাইরে থাবা বাড়ায়, যেন প্রাচীন রাজাবাদশার সাম্রাজ্য বাড়ানোর মত। তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপদগ্ৰস্ত ক্ষয়িষ্ণু বা মুমূর্ষ রূপ, বিপদে পড়ে ক্ষুদ্র পুঁজির উপর আর নির্ভরশীল হয়ে সে বাঁচতে পারছে। না। একদা প্রগতিশীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই রূপান্তর ঘটে বিশেষ শ্রেণীর হাত দিয়েই। এরা সংখ্যায় কম। কিন্তু তাদের ছত্ৰছায়ায় লালিত ও সুবিধাভোগী ব্যক্তির সংখ্যা বিপুল।
 
অর্থনৈতিক নয়াউপনিবেশবাদ আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নিজের দেশের বাজার ফুরিয়ে যাওয়ার পর পুজিবাদ এইভাবে, এই রূপে বহির্বিশ্বের জনগণের মধ্য থেকে মুনাফা তথা পুঁজি সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট হয়। এ করতে গিয়ে তাকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবেও আধিপত্য বা প্রভাব বিস্তুত করতে হয়। এর স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করতে বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদকে মদত দিতেও সে পিছপা হয় না। আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্টদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টদের গভীর সখ্য কিংবা পোল্যান্ডে খৃস্টীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে ‘গণতন্ত্রের’ প্রতিষ্ঠা এরই ফলশ্রুতি। এ ব্যাপারটিও পুঁজিবাদের করুণ সাংস্কৃতিক বা মননগত অসহায়তার পরিচয়। শুরুতে পুঁজিবাদের উদগত বুর্জোয়ারা ছিল উদার ও বৈজ্ঞানিক মানসিকতার অধিকারী। কিন্তু পরে তাদেরই নিজেদের বিপুল পণ্যবাহী জাহাজকে বাঁচাতে ধর্মের ঝালাই-ও লাগাতে হচ্ছে—যতদিন তা কাজ করে ততদিনই তাদের পক্ষে ব্যাপারটি মঙ্গলকর।
 
বাঁচার চেষ্টায় তাকে নয়াউপনিবেশে নিজেদের অনুগত এক গোষ্ঠীকেও তৈরী করতে হয়। নানা পুরস্কার, নানা ধরনের বৃত্তি ও অনুগ্রহ প্ৰদান, ভ্রমণ ও ভক্ষণ, সাংস্কৃতিক প্রভাব, আদিম প্রবৃত্তিকে সুড়সুড়ি দেওয়া আনন্দ ইত্যাদির মাধ্যমে তো বটেই,-শ্রেণীচেতনাহীন ও গণ বিচ্ছিন্ন বুর্জোয়া নাস্তিকতা, যান্ত্রিক যুক্তিবাদ, তথাকথিত গণতন্ত্র ও সমানাধিকার (যা প্রায়শঃ বাস্তবত নিজ শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যকার গণতন্ত্র ও সমানাধিকারে পর্যবসিত হয়), আপাত সেবাপরায়ণতা ও সেবামূলক কাজকর্ম, নানা সংস্কারবাদী ক্রিয়াকাণ্ড ইত্যাদি। আপাত মানবিক ও আপাত প্রগতিশীল (অন্তত সামন্ততান্ত্রিক বাতাবরণের পরিপ্রেক্ষিতে) নানা ভাবেও নিজেদের বন্ধুমনোভাবাপন্ন ও নিজেদের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীর সৃষ্টি করে। এমনকি নিজেদের ক্ষমতার অস্তিত্ব বজায় রাখতে ও পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতির নাম করে, বিপদগ্ৰস্ত অবস্থায় তথাকথিত বামপন্থীরাও সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি একচেটিয়া পুজিকে স্বদেশে আমন্ত্রণ করে আনে।
 
ধৰ্মীয় মৌলবাদের মত সাম্রাজ্যবাদও এইভাবে যাদের শাসন ও শোষণ করা হবে তাদেরই মধ্যে নিজের অনুগৃহীত অনুগত বাহিনী তৈরী করে। কারণ এটি স্পষ্ট যে, শোষিত মানুষের একাংশই যদি তাদের সাহায্য করে তবে এই শাসন, শোষণ ও আধিপত্য নিশ্চিত দীর্ঘস্থায়িত্ব অর্জন করবে। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা সাধারণ সরল ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের অসহায় ধর্মবিশ্বাসকে কাজে লাগায়—উৎসাহিত করে পিছিয়ে থাকা অবৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনাকে। আর সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজি কাজে লাগায় পিছিয়ে থাকা দেশের স্বচ্ছন্দ্যকামী মানুষদের উন্নততর চিস্তার আকাঙ্খা, শ্রম ও মেধাকে,—উৎসাহিত করে আত্মকেন্দ্রিকতা, যান্ত্রিকতা ও পরনির্ভরতাকে।
 
পুঁজিবাদের মুমূর্ষ অবস্থা যেমন সাম্রাজ্যবাদ, তেমনি ধর্মের বিপদগ্ৰস্ত, ক্ষয়িষ্ণু বা মুমূর্ষ অবস্থা ধর্মান্ধতাত, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ। বিবর্তনবাদ থেকে বস্তুবাদী দর্শনের মত নানা বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ এবং পরিবর্তিত উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের কারণে ঈশ্বরকেন্দ্ৰিক ধর্মের তথা ভাববাদী দর্শনের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। তার আদিম ও প্রাচীনকালের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসে (যখন ম্যাজিক ও ধর্মানুশাসন উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করত)। দলে দলে মানুষ ঈশ্বরবিশ্বাস ও ধর্মপরিচয় থেকে মুক্ত বলে নিজেদের ঘোষণা করতে থাকে। (বর্তমানে যেমন প্রায় ১১৫ কোটি পৃথিবীবাসী এই দলভুক্ত)। এ অবস্থায় ধর্ম নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তিদের ও ধর্মজীবী শ্রেণীর নিজস্ব সংকটের অসমাধান ব্যাপারটিতে ইন্ধন জোগায়। হিংস্র অন্ধভাবে ধর্মানুসরণের মধ্যে এই সংকটের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে। তারা নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এক কাট্টা করে ভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খোজে। তারা ধর্মের মূল অনুশাসন ও নিয়মনীতিকে ফিরিয়ে এনে আনন্দময় ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। ধর্মীয় মৌলবাদ শুধু ধর্মের এই মূলে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্খা নয়, তা ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার রসে জারিতও বটে। সাম্রাজ্যবাদ। এই ধর্মকেন্দ্রিক উন্মত্ততা ও বিপথগমনকে উৎসাহিত করে, কারণ সে অনুভব করে এর ফলে তার গায়ে অন্তত আচড়টি পড়বে না। পরিস্থিতি বিশেষে তাই ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ সাম্রাজ্যবাদের বড় প্রিয় বন্ধু, বড় আপন জন।
 
কিন্তু ধর্মের এই নাজেহাল অবস্থার পেছনে বুর্জেয়াদের তথা পুঁজিবাদের উদ্ভবই বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। শুরুর দিকে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও ঐ উপযোগী৷ উদার বুর্জেয়া মানসিকতাকে রুখতে সর্বশক্তি দিয়ে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, কারণ তার অস্তিত্বের সঙ্গে ধর্ম ও ভাববাদ গভীরভাবে সংযুক্ত (এবং এখনকার ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের মধ্যে তারই ধারাবাহিকতা বর্তমান)। পাশাপাশি পুঁজিবাদও তখন চেষ্টা করেছে ধর্মের ভাববাদী কুয়াশা সহ সামন্ততন্ত্রকে হটাতে। কারণ তার বিকাশের জন্য এই অবৈজ্ঞানিক ভাববাদী পরিমণ্ডল ছিল বাধাস্বরূপ। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে কম অনিশ্চয়তায় ভরা, কম প্রকৃতি নির্ভর এবং অনেক বেশি মনুষ্য-ও বিজ্ঞান-নির্ভর। তখন অলৌকিক শক্তির বা ধর্মীয় অনুশাসনের ভাবালুতার চেয়ে বাস্তববাদী, যুক্তিনির্ভর, বস্তুকেন্দ্ৰিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও মানসিকতার প্রয়োজন ছিল বেশি। তাই প্রয়োজন হয়েছিল নতুনতর আইনকানুন, রাষ্ট্ৰীয় ব্যবস্থা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতির। বেদ-বাইবেলের চেয়ে ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিই তখন প্রধান পাঠ্য হয়ে ওঠে। দরিদ্রকে অন্নদান করে পুণ্য অর্জনের চেয়ে, তাদের চাকরি দিয়ে ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানো বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে।
 
রেনেশাঁর ধারাবাহিকতায় যে আধুনিক জ্ঞান ও মানসিকতার বিকাশ ঘটে, তাতে প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মের চিরাচরিত অবস্থান ও ঐতিহ্যনির্ভর মূল্যবোধ-রীতিনীতির প্রতি এই আলোকিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ জাগে। সৃষ্টি হয় বুর্জেয়া নাস্তিকতা, অধাৰ্মিকতা ও যুক্তিবাদ। এসবের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানিক ধর্মকে বাঁচাতে খৃস্টীয় রিভাইভ্যালিজম বা ধর্মীয় পুনরভুত্থানবাদ ও ফান্ডামেন্টালিজম বা মৌলবাদের ও সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে ধমীর্য নানা রিফর্মেশান আন্দোলন,-পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ধর্মকে গ্রহণযোগ্য রূপে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু পরবর্তীকালে বুর্জেয়ারা যখন নিজেরাই সংকটে পড়ে তথা পুঁজিবাদের ক্রম ঘনায়মান বিপদ অনুভূত হয়, তখন তাদের একাংশের মধ্যে আবার ধর্মকে ব্যবহার করার বা ধর্মে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। সামন্ত প্ৰভুদের মত পুঁজিপতিরাও ক্রমশ অনুভব করল শ্রমিকদের মধ্যে ধর্ম ও ঈশ্বর বিশ্বাস গভীরভাবে টিকে থাকলে তাদের ক্ষোভ ও হতাশা অনেক কমে যায়, তাদের থেকে আনুগত্যও বেশি পাওয়া যায়। তাই জৈন ব্যবসায়ীরা বা বিড়লারা বিশাল মন্দির বানায় বা জিন্ডাল অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানির ফ্যাকটরির মধ্যে মন্দির গড়ে ওঠে। আমেরিকাইংল্যাণ্ডে চার্চের পুনরায় রমরমা শুরু হয়। ব্যাপারটি প্রধানতঃ, ক্রমশ পরিস্ফুট হতে থাকা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ও সংকটের প্রতিফলনও বটে। একজন পুঁজিপতির সর্বস্বাস্ত হওয়া, মুনাফা কমে যাওয়া, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া—এই ব্যবস্থায় এ সবের কোনটিই যে চূড়ান্তভাবে আটকানো সম্ভব নয় তা পরের দিকে ক্রমশ পরিষ্কার হয় (যেন প্রকৃতিনির্ভর কৃষি উৎপাদনের মত)। এই ব্যবস্থার এই যে অদেখা, অজানা, সামাজিক প্রতিকূল শক্তি, সেটিরও প্রতিফলন ঘটতে থাকে বুর্জেয়া, পুঁজিপতি এমনকি জনসাধারণের মধ্যেও—একদা যেমন ঘটেছিল অজ্ঞাত রহস্যময় প্রাকৃতিক প্রতিকূল শক্তির প্রতিফলনে অলৌকিক শক্তিকল্পনার সৃষ্টির সময়ে। এর ফলে বুর্জেয়া পুঁজিপতিরাও ধর্মে তার প্রাথমিক অনীহা ত্যাগ করে ধর্মশ্রিয়ী হতে থাকে। পাশাপাশি প্রকৃতিকে জয় করার ক্ষেত্রে এখনো মানুষের বিপুল অসম্পূর্ণতাও প্রতিফলিত হয় এই ধর্মাশ্রয়ের প্রক্রিয়াতে।
 
কিন্তু শুরুর দিকের ইতিবাচক বুর্জেয়া মূল্যবোধগুলিও টিকে থাকে,–সেই মানবতা, গণতন্ত্র, তথাকথিত সমানাধিকার (আসলে তা বুর্জোয়াদের নিজেদের মধ্যেকার সমানাধিকার), ধর্ম ও ঈশ্বরকে অস্বীকার করার প্রবণতা তথা নাস্তিকতা, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তরে নিবদ্ধ রাখা ইত্যাদি। তবে পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতেতে তাদের বিকৃতি ঘটে। এই বিকৃতি মূলত ঘটে। পুঁজিবাদের দ্বিতীয় স্তরে, তার সাম্রাজ্যবাদী রূপান্তরের কালে। টিকে থাকার মরীয়া চেষ্টায় সে সাংস্কৃতিক ও চেতনাগত বিকৃতি, হিংস্রতা ও বিকৃত যৌনতার মত নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় পণ্যের বন্যা, নিত্যনতুন কৌশাল, চুক্তি, আগ্রাসন, ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বঁধানো বা ধর্মীয় মৌলবাদকে মদত দেওয়ার মত নানা অমানবিক অগণতান্ত্রিক ক্রিয়াকাণ্ডে লিপ্ত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সামাজিক প্রয়োগের চেয়ে ক্রমাগত ব্যক্তিগত স্বার্থে তার প্রয়োগের অবশ্যম্ভাবী। পরিণামও তাই হতে বাধ্য।
 
বর্তমান সময়ে ধর্মও তার প্রাথমিক সারল্য, অসচেতন বিশ্বাস, ভালবাসা, উদারতা, মানবিকতা ইত্যাদি হারিয়ে ক্রমশঃ ক্রুর, অসহিষ্ণু, জনবিরোধী, অনৈক্য সৃষ্টিকারী ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থে ধর্মকে ক্ৰমাগত ব্যবহারের পরিণামও হয়তো তাই। এরই চূড়ান্ত একটি রূপ মৌলবাদ, যা ভিন্ন ধর্মের মানুষকে শত্রু বলে গণ্য করতে শেখায়, যা মানুষের মনকে’ প্ৰাচীন ও এখন অপ্রাসঙ্গিক পরিবেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, রুদ্ধ করতে চায় আলোর দিকের অভিসারকে। আসলে ধর্মের এই বিবর্তন ঘটে বিশেষ শ্রেণীর হাতে, যারা নিজেদের বাঁচাতে শ্রেণীবিভাজনের চেয়ে ধর্মীয় বিভাজনকে ও বৈজ্ঞানিক দর্শনের পরিবর্তে ভাববাদী দর্শনকে তীব্রভাবে উপস্থাপিত করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত সুফল আত্মসাৎ করেও মৌলবাদীরা বৈজ্ঞানিক দর্শনকে অস্বীকার করে। এমন কি তাকে ব্যবহার করে ধর্মীয় মৌলবাদ প্রচারের জন্যও। (হাই-টেক মৌলবাদী প্রচার ও ধর্মপ্রচার!!) ধর্মীয় মৌলবাদ যেমন যান্ত্রিকভাবে বিজ্ঞানের প্রয়োগ ঘটায়, সাম্রাজ্যবাদও তেমনি বিজ্ঞানচেতনার চেয়ে বিজ্ঞানের মুনাফাদায়ী প্ৰযুক্তিকেই প্রধান গুরুত্ব দেয়।
 
এ কারণে উভয়ের সাধারণ শত্রু হচ্ছে বস্তুবাদী দর্শন, সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজম। ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়েই সর্বশক্তি দিয়ে, ছলেবলে কৌশলে তাকে প্রতিরোধ করতে চায়। উভয়ের শত্রু যখন এক, তখন তাদের নিজেদের মধ্যকার মিত্ৰতাও অস্বাভাবিক নয়। কমিউনিজমকে আটকাতে তাই পোল্যান্ডে খৃষ্টীয় ধর্মীয় মৌলবাদ মাথাচাড়া দেয়। এগুলি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরই আরব্ধ কাজ। তাকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। ধর্মীয় মৌলবাদ। কিন্তু কখনো আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা পরস্পরের সাময়িক বিরোধী ভূমিকাও পালন করে, যেমন ঘটেছে। ইরানে কিংবা সম্প্রতি ভারতের মহারাষ্ট্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হলেও শিবসেনা-বিজেপির দ্বারা আমেরিকার এনরনের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করার মধ্য দিয়ে।
 
কমিউনিজম-এর তত্ত্ব যথার্থ কি যথার্থ নয়, কিংবা তার সম্পূর্ণতা ও বাস্তবতা কতখানি, এসব প্রশ্ন অবাস্তর। কিন্তু এটি সত্য যে, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ উভয়েরই কমিউনিজম বিরোধিতার প্রশ্নে কোন দোদুল্যমানতা নেই। সাময়িক ও সংকীর্ণ স্বার্থে কখনো মৌলবাদী শক্তিরা (যেমন মুসলিম লীগ বা বিজেপি) বামপন্থীদের সঙ্গে একদা আপোষ ও বাহ্যিক ঐক্য গড়লেও, তা কখনোই কমিউনিজমের সঙ্গে ঐক্য নয়, বরং তা কমিউনিজমের নামাবলী গায়ে চাপানো সুবিধাবাদীদের সঙ্গে অতি ভঙ্গুর এক জোট মাত্র। সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেও এই সংকটাপন্ন সুবিধাবাদী বামপন্থীদের সঙ্গে আপোষ অসম্ভব নয়। তবে প্রায়শ প্রাথমিক উদ্যোগটা আসে। দ্বিতীয়দের কাছ থেকেই। আর উদারপন্থী বুর্জোয়ারা বামপন্থীদের সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক ঐক্য গড়তেই পারেন এবং ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রুখতে ধর্মনিরপেক্ষ বুর্জেয়াগোষ্ঠীর সঙ্গে বামপন্থীদের এমন ঐক্য একটি সুস্থ ব্যাপারই।
 
ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়েই ভিত্তিমূলে কমিউনিজম বিরোধিতা করতে বাধ্য হয়, কারণ মতাদর্শগতভাবে এটি তাদের উভয়েরই অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক। (আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের কাছে বিবর্তনবাদ বা ইয়োরোপের খৃস্টীয় ‘মৌলবাদীদের কাছে গালিলেও প্রমুখের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও একইভাবে বিপজ্জনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।) এই বিরোধিতার ক্ষেত্রে তারা সর্বাধিক আন্তরিক এবং কোন আপোষ করতে রাজী নয়। কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে প্রয়োজনে আপোষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ের ব্যাপার ঘটতে পারে। এর একটি পরিচয় পাওয়া যায়। ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদী ও মৌলবাদীদের মধ্যে। এই মৌলবাদীরা ভিন্ন ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে (যারা তারই দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও বন্ধু ছিল) যতটা না সোচ্চার ছিল, তার অতি সামান্য অংশে সোচ্চার ছিল সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে। গান্ধীবাদী বা সন্ত্রাসবাদী যে পথেই হোক না কেন হিন্দু-মুসলিম-শিখ নির্বিশেষে বহু ধর্মবিশ্বাসী মানুষই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দল বা গোষ্ঠীগুলি সাধারণভাবে এর থেকে দূরে থেকেছে—তাদের প্রধান শত্রু ছিল সাম্রাজ্যবাদ নয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষ।
 
সাভারকর একসময় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে ও তার পর তিনি হিন্দুত্বের প্রধান তাত্ত্বিক প্রবক্তা ও হিন্দুমহাসভার নেতার ভূমিকাই মূলত পালন করেন। ১৯৪২-এর আন্দোলনের সময় বিভিন্ন পৌর ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, আইনসভা এবং বিভিন্ন চাকুরিতে মহাসভার সদস্যদের তিনি নিজ নিজ পদে অবিচলিত থেকে দৈনন্দিন কর্ম করে যেতে’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় তাঁর শ্লোগান ছিল ‘রাজনীতির হিন্দুকরণ ও হিন্দুধর্মের সামরিকীকরণ’। এর অর্থ দাঁড়ায় তীব্র মুসলিম বিরোধিতা ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতা। প্রকৃতপক্ষে ১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাসে সাভারকার গোপনে ভাইসরয়কে বলেন যে, হিন্দুদের ও বৃটিশদের বন্ধু হওয়া উচিত এবং প্রস্তাব করেন যে কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি পদত্যাগ করলে হিন্দুমহাসভার কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে থাকা উচিত। (জোটল্যান্ডের প্রতি লিনলিথগো, ৭ অক্টোবর, ১৯৩৯)।
 
১৯২৯ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর. এস. এস)-এর প্রধান কর্মধ্যক্ষ বা সংঘচালক হিসেবে মনোনীত হওয়া হেডগেওয়ার নিজে সত্যাগ্ৰহ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং কারাবরণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৩০-৩১-এর আইন অমান্য আন্দোলনসহ অন্যান্য নানা আন্দোলনে আর এস এস-এর ভূমিকা নগন্য। ১৯৪০এর নাগপুরে অফিসারদের’ প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দিয়ে হেডগোওয়ার বলেছিলেন, ‘আমি আমার সামনে হিন্দুরাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ দেখতে পাচ্ছি।’ স্বাধীনতার চেয়ে এই হিন্দুরাষ্ট্রই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তাই তার পরবর্তী সরসংঘচালক গোলওয়ালকর সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়কেই এক করে ‘বিদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং উই আর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ বইতে এই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নীরবই থেকেছেন। উল্টে তিনি বৃটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন, ‘আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং সর্বজনীন বিপদের তত্ত্ব থেকে আমাদের জাতিত্বের ধারণা তৈরী হয়েছে। এর ফলে আমাদের প্রকৃত হিন্দু জাতিত্বের ইতিবাচক অনুপ্রেরণা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু আন্দোলনই নিছক বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বৃটিশ বিরোধিতার সঙ্গে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদকে সমার্থক করে দেখা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতৃবর্গ এবং সাধারণ মানুষের উপর এই প্রক্রিয়াশীল মতের প্রভাব সর্বনাশা হয়েছে।’
 
স্পষ্টতঃই এই হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার চেয়ে হিন্দুজাতিত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তা সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে ও তার শোষণকে টিকিয়ে রেখে হলেও তাদের কিছু যায় আসে না।(৩) এবং এটিও আসলে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিক্ষারই ফল। অন্যান্য দেশের ইতিহাস বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত হলেও, বৃটিশরাই ভারতীয় ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিম যুগ, ও বৃটিশ যুগ (‘খৃষ্টান যুগ’ নয়) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মুসলিম লীগ-এর জন্মের অনেক আগেই বৃটিশ শাসক স্যার হেনরি এলিয়ট ভারতের হিন্দু ও মুসলিমদের দুটি পৃথক জাতিসত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মিল (Mill)-এর মত বৃটিশ ঐতিহাসিকেরা অবৈজ্ঞানিক ভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভারতীয় ইতিহাসকে পূর্বোক্ত তিনভাগে বিভক্ত করে ‘হিন্দুযুগ’ ও ‘মুসলিম যুগ’-কে সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে দিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে ও ঐ মানসিকতায় পরিশীলিত এইসব ঐতিহাসিকেরা হিন্দুদের সাধুসন্ন্যাসী ও মুসলিমদের অত্যাচারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থনৈতিক শ্রেণীগত বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করে স্যার হেনরি এলিয়টের মত বৃটিশ শাসকরা এমনও মন্তব্য করেছেন যে, ‘… মুসলিমদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে, হিন্দুদের ধর্মীয় মিছিল ও পূজা ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, মূর্তি ভাঙ্গা হয়েছে, মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে, জোর করে ধর্মান্তরকরণ ও বিয়ে করা হয়েছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থে সর্বদা চেষ্টা করে। এইভাবে একপেশে, বিকৃত, আংশিক ইতিহাসকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে শাসিতদের বিভাজিত করতে এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐক্যকে বিনষ্ট করতে। ভারতের হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীরা এই সাম্রাজ্যবাদী প্রচারকেই লুফে নিয়েছে। কারণ তারাও শাসিত ও শোষিত জনগণকে ধর্মের মত একটি কৃত্রিম পরিচয়ে বিভাজিত করতে চায়। মানসিকতার এই ঐক্য কখনোই সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদকে পরস্পরের চরম বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আর তাই দেখা যায় বৃটিশ বিরোধী সত্যাগ্ৰহ আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজ ও তার বিচার, বোম্বাই-এর নৌবিদ্রোহকে কন্দ্র করে ১৯৪৫-৪৬-এর উত্থান ইত্যাদি কোনটিতেই কি আর এস এস কি মুসলিম লীগ কেউই নিজেদের জড়ায় নি, এবং এই সময় তারা নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে। পরোক্ষ বৃটিশ সহযোগিতার দ্বারা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর বৃটিশরা যে অত্যাচারের বন্যা বইয়েছে, এইসব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক তথা মৌলবাদী ‘দলগুলির উপর তার প্রায় কোন ছিটেই লাগে নি। উপরন্তু এদের সাম্প্রদায়িক আন্দোলনে বৃটিশবিরোধী সংগ্রামই দুর্বল ও বিভ্রান্ত হয়েছে। পাকিস্তানের জন্য জঙ্গী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় হিন্দুরা আর এস এস-কে রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে, এমন কি কংগ্রেসের একটি অংশের মধ্যেও এই মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার মত মুসলিম অধূষিত এলাকায় বাম ও প্রগতিশীল শক্তিগুলি আর এস এস-এর উত্থান রোধ করতে পারলেও সারা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এসময় এটি তার শক্তিবৃদ্ধিই ঘটিয়েছে। যুদ্ধের ঠিকাদারি ও বাড়তি মুনাফার ফলে সৃষ্টি হওয়া বণিক গোষ্ঠীর বড় অংশ তাদের অর্থের জোগানও দিয়ে গিয়েছেন।
 
সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদের বন্ধুত্বের স্বাভাবিক প্রবণতাই রয়েছে এবং তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে গণবিরোধী শ্রেণীস্বার্থ। (কিন্তু এই স্বার্থে ঘা লাগলে তারা পরস্পরের বিরোধিতা করতেও পিছপা হয় না।) তাই আমেরিকা ফান্ডামেন্টালিস্টরা রাষ্ট্রকে আরো সশস্ত্র করার দাবী জানায়, হিরোসিমা-নাগাসাকির উপর বোমাবর্ষণ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বর্বরতায় অনুতপ্ত না হওয়া এই ধরনের মানসিকতারই একটি প্রকাশ। তাই বিলি গ্রাহামের মত ফান্ডামেন্টালিস্ট নেতৃত্ব টুমান-আইসেনহাওয়ার থেকে জনসন-নিক্সনের পরম সুহৃদ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সেই দেশেই শ্ৰীবৃদ্ধি ঘটে অন্যান্য মৌলবাদীদের নানা সংগঠনেরও। যেমন ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ‘ফেডারেশান অব হিন্দু অ্যাসোসিয়েশনস’। (এরা ১৯৯৫-এর ‘বর্ষসেরা হিন্দু বা ‘Hindu of the Year’ উপাধিতে সম্মানিত করেছে। পিতাম্বারা ও বাল থ্যাকারে-কে। পরের বছরের জন্য মনোনীতদের তালিকায় অন্যতম। নাম-উমা ভারতী ও টি এন শেষন।) আর মহেশযোগী থেকে প্রভুপাদ-অসংখ্য বদমায়েস ধর্মজীবীদের রমরমা বাজারের পরিবেশও ঐসব দেশই।
 
পোল্যান্ডের মত দেশ সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্ম তথা মৌলবাদের গাঁটছড়া বাঁধার আরেকটি উদাহরণ। একদা সে দেশ ছিল সমাজতন্ত্রের নামধারী কিন্তু অসমাজতান্ত্রিক। সমাজতন্ত্রের মুখোশপরা পোল্যান্ডে ধর্মের রমরমা শুরু হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে সে দেশে পাদ্রীর সংখ্যা ছিল ৯৫৩০, কিন্তু ১৯৭০-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৩৭৬৫তে। চার্চের সংখ্যা ৫১২০ থেকে বেড়ো হয় ১১৭০৯। লক্ষ লক্ষ কপি ধর্মীয় বই ও পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সবই খৃস্টীয় মৌলবাদের পথ পরিষ্কার করছিল। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবেও তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক পোল্যান্ডে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটছিল। এসব কারণে ‘শেষ পর্যন্ত সেখানে ‘গণতন্ত্রের’ নামে সোভিয়েত সমর্থিত প্রতিবিপ্লবী সরকারকে হটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অপর এক প্ৰতিবিপ্লবী সরকারী-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ক্যাথলিক চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন এক সরকার। কিন্তু এই সত্যটি গোপন করার জন্য সারা বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রচার মাধ্যমসমূহ তাদের একনায়কত্বমূলক প্রচারণার মাধ্যমে এই পরিবর্তনকে ‘সমাজতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের বিরাট বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং শ্রমিক সহ শ্রমজীবী জনগণের এক বিরাট অংশ এই প্রচারণার শিকার হয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষ অবলম্বন করছে এবং সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই এই ধারণার বশবতী হয়ে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থের বিরোধিতায়, সাময়িকভাবে হলেও, নিযুক্ত হচ্ছে।’ (বদরুদ্দীন উমর, অনীক, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৯০) ফ্যাসিবাদের সঙ্গেও ধর্মের তথা ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির এমন গাঁটছড়া বাধা অস্বাভাবিক নয়। ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ-সবাইয়ের জনবিরোধী চরিত্রের মিল তাদের অবস্থা বিশেষে পরস্পরের সুহৃদ করে তোলে। পোল্যান্ডকে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ধর্মের সহযোগী হওয়ার একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায়। একইভাবে ইটালি ও জার্মানিতেও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ধর্মের এই সহযোগী ভূমিকার কথা জানা আছে। এখানে ধর্ম (ক্যাথলিক চাৰ্চ) একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার ভূমিকা পালন করে। আসলে এসব ক্ষেত্রেই ধর্ম বৃহত্তর অর্থের নিছক একটি বিশ্বাস নয়, সেটি শাসকশ্রেণীর একটি গণবিরোধী প্ৰতিষ্ঠানিক হাতিয়ার, যে হাতিয়ার মৌলবাদেরই রকমফের মাত্র।
 
ইটালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানে ও শক্তিশালী হওয়ার পেছনে ভ্যাটিকানের বিরাট ভূমিকা ছিল। ১৯২১-এ ভবিষ্যতের পোপ পিউস-১১ (Pius XI) মুসোলিনি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মুসোলিনির মত একজনকে আমাদের খুব দরকার,–ঈশ্বরই (Providence) তাকে আমাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। উদার চিন্তার আচ্ছন্নতা থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে মুক্ত।’ ১৯২৩-এর জানুয়ারী মাসে রাষ্ট্রের ধর্মীয় (papal) সেক্রেটারী, কার্ডিন্যাল গ্যাসপেরি এই ফ্যাসিষ্ট নেতার সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন, যাতে তাঁর সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসা যায়। গ্যাসপেরি মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই মুসোলিনি। যদি কোনদিন পূর্ণ ক্ষমতায় আসে, তবে আমরা যা চাই সেটিই আমরা পেয়ে যাব।’ পোপ হওয়ার পরও পিউস-১১ মুসোলিনিকে সমর্থন করার জন্য ক্যাথলিক কেন্দ্রীয় দল (Catholic Centre Party)-র নেতাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তিনি ঈশ্বর প্রেরিত ব্যক্তি।’
 
১৯২৯ সালে ভ্যাটিকান ইটালির ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে একটি চুক্তি (concordatঅর্থাৎ পোপ তথা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রের চুক্তি) করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্ৰীয় ধর্ম হিসেবে রোমান ক্যাথলিক ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা এবং এসবের ফলে সরকার থেকে চার্চ ১ কোটি ৯০ লক্ষ পাউন্ড অনুদানও পায়। প্রোটেস্টান্টদের মধ্যে গড়ে ওঠা আমেরিকান ফান্ডামেন্টালিজম-এর মত রোমান ক্যাথলিক গোষ্ঠীও যে একই ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তাতে কোন সন্দেহ নেই, যদিও ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’-এর ছাপ তার নেই, কিন্তু মৌলবাদী চরিত্রের প্রায় সবটুকুই রয়েছে। নাৎসি-জার্মানির তিন মুখ্য ফ্যাসিস্ট নেতৃত্ব—হিটলার, গোয়েকেবলস ও হিমলার-সবাই ছিল একনিষ্ঠ রোমান ক্যাথলিক। কঠোর যান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও প্রশ্নহীন দ্বিধাহীন আনুগত্য ফ্যাসিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের টিকে থাকার প্রধান শর্ত। এ কারণেই রাষ্ট্ৰীয় স্বয়ং সংঘ বা জামাতে ইসলামী তাদের সংগঠনকে ‘ক্যাডার ভিত্তিক’ করে গড়ে তোলে এবং এদের কাজেকর্মে কথায় বার্তায় ফ্যাসিস্টদের ছায়া স্পষ্ট অনুভব করা যায়। এই একই বৈশিষ্ট্য ছিল নাৎসীদেরও। ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য, সত্যের তথা যুক্তির প্রতি সম্পূর্ণ অনীহা, আর অমানবিকতা-পোপের অধীন ক্যাথলিক ধর্মের এই ধরনের শিক্ষা হিটলাররাও পেয়েছে। ইট্ৰলির মত জার্মানিতেও প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের এই রূপ ফ্যাসিস্টদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে। এই কারণেই দেখা যায় জার্মানির পার্লামেন্টে (রাইখস্টাগ-এ) হিটলারকে যে একটি ভোটের গরিষ্ঠতায় একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা (dictatorial power) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল ঐ ভোটটি (decisive vote) দিয়েছিল ক্যাথলিক সেন্টার পাটি। হিটলার ক্ষমতা পাওয়ার ছ’ মাসের মধ্যেই ১৯৩৩-এর ২০শে জুলাই, পোপ হিটলারের সঙ্গে চুক্তি (concordat) করেন।
 
হিটলার কোনদিনই সরকারীভাবে চার্চ ত্যাগ করেননি। ক্যাথলিকরা অনেক বইকে নিষিদ্ধ করলেও (যেমন গ্যালিলেও-দের), কখনোই হিটলারের ‘মাইন কাম্পফ’ (Mein Kampf) এই নিষিদ্ধ তালিকায় ওঠেনি। অথচ গ্যালিলিওরা যখন একটি বৈজ্ঞানিক সত্যকে তুলে ধরেছিলেন, তখন মাইন ক্যাম্পফ’ ছিল জাতিভেদ ও হিংস্রতায় ভরা। হিটলার নিজেও স্বীকার করেছেন, তিনি ‘মার্কসীয় সন্ত্রাসবাদ’ ও ও ‘ধর্মীয় অনুশাসন’ থেকে শিক্ষাগ্ৰহণ করেছেন, তবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা পেয়েছেন ও উৎসাহিত হয়েছেন খৃস্টীয় গোষ্ঠীর থেকে (Jesuit Order থেকে)। নিজের উচ্চপদাধিকারী এস এস বাহিনীর সদস্যদের তিনি খুসন্ট সংঘ’ (Society of Jesus) নামে অভিহিত করতেন এবং অন্ধবিশ্বাস ও কঠোর শৃঙ্খলার ব্যাপারে শিক্ষা নিতে তাদের বিশেষ কিছু ধর্মগ্রন্থ (যেমন Spiritual Exercises of Ignatius of Loyola) পড়তে নির্দেশ দিতেন। এই শিক্ষায় শিক্ষিত নাৎসি প্রচার বিভাগীয় প্রধান গোয়েকেবলস একসময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘চার্চ যদি কালো-কে সাদা বলে। তবে আমি তাইই বিশ্বাস করব।’ আরেক শীর্ষস্থানীয় নাৎসি নেতা হিমলার তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘যাই-ই ঘটুক না কেন আমি সবসময় ঈশ্বরকে ভালবাসব, তার কাছে প্রার্থনা করব, ক্যাথলিক চার্চের প্রতি বিশ্বস্ত থাকব এবং আমাকে যদি তার থেকে বহিষ্কারও করা হয়, তবু তাকে সমর্থন করে যাব।’ (Heinrich Himmer; Roger Manvel 3 H. Frankeal) (এছাড়া ‘The Psychopathic God, Rober G. L. Waite 44° ‘History of the SS, Graber ইত্যাদি)
 
ধর্মের মূল শিক্ষা অন্যকিছু বলে যতই বলা হোক না কেন, ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে যে অবৈজ্ঞানিক যুক্তিহীন মানসিকতা ও অন্ধ আনুগত্য সম্পৃক্তভাবে মিশে থাকে তা। এইভাবে ফ্যাসিবাদের সৃষ্টিকে উৎসাহিত করে, ধর্মের মৌলবাদী রূপান্তরে ভূমিকা পালন করে এবং ধর্মের গণবিরোধী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশও ঘটায়। আসলে বিশ্ব মানবতা, প্রেম, অহিংসা, সবার প্রতি সমদৃষ্টি ইত্যাদি জাতীয় ধর্মের এইসব তথাকথিত মূল শিক্ষা’-গুলি ঈশ্বর ও ধর্মের নাম না করেও অনায়াসে বলা যায় এবং সেটিই সুস্থ ও কাম্য ব্যাপার, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। তা না করে এগুলি ধর্মের নামে প্রচার করতে গিয়ে এই শিক্ষাগুলিকে প্রতিষ্ঠা করা তো যায়-ই নি, উপরন্তু মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের মত অপশক্তিগুলির সৃষ্টিকেই উৎসাহিত করা হয়েছে।
 
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই যুক্তিহীনতা ও অন্ধ আনুগত্য একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে আমন্ত্রণ করে আনে। যেমন ভারতের বেশ কিছু লোক প্রয়াত রাজীব
 
উপাধিকারী এরা ব্যক্তিগতভাবে যাই-ই হোন না কেন, দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থে কোন সংগ্রামের ইতিহাস বা কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান যে তাদের নেই-তা স্পষ্ট। তবু ঈশ্বরের সামনে হামাগুড়ি দেওয়ার মত বা রাজার সামনে নতজানু হওয়ার মত এমন হাস্যকর উন্মাদের (যেন রাজনৈতিক জোকারের) দল এদেশে যথেষ্টই রয়েছে। অন্যদিকে শৃঙ্খলা রক্ষার নাম করে কিছু কিছু কমিউনিষ্ট নামধারী ‘ক্যাডারভিত্তিক’ রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের মধ্যেও এই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা ও যুক্তিবুদ্ধিহীন আনুগত্যকে উৎসাহ দেওয়া হয়। একনায়কতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি এদের ঘাড়ে চেপেই আবির্ভূত হয়, এরাই পরিস্থিতি বিশেষে নয়াফ্যাসিবাদ বা ধৰ্মীয় ও রাজনৈতিক মৌলবাদের ক্যাডারেও পরিণত হয়।
 
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় ১৯৪৫-এ অর্জিত হয়েছে বলে মনে করা গেলেও, তার সঙ্গী ও সস্তানেরা এখনো রয়েছে-ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে। এই সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ সর্বত্র ও সর্বদা চেষ্টা করে জনসাধারণের উপর অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। তার জন্য তারা বিশেষ ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে পরস্পরের হাতে হাত মেলাতেও প্রস্তুত। গণবিরোধী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য উভয়েই অনুভব করে যে অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে গেলে ধর্মমোহ একটি বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।(৪) এরজন্য তারা জনগণের সমস্ত বিপ্লবী প্রচেষ্টা এবং শোষণমুক্ত, শ্রেণীহীন বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে টুটি টিপে মেরে ফেলতে চায়। তার জন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা কৌশল তারা অবলম্বন করে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রসার ঘটিয়ে কিছু মানুষের আপাত স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করা যেমন এর একটি দিক, তেমনি নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করে ধর্মীয় গোষ্ঠীগত স্বাতন্ত্র্য, জাতীয়তাবাদ ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতিও অন্য একটি দিক।
 
কিন্তু এর ফলে আপামর জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য আন্দেী অজিত হয় না, মাঝখান থেকে কিছু দেশ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির মত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নয়া ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক দাসে পরিণত হয় এবং স্বদেশেরই ও স্বধর্মেরই কিছু শাসক-শোষকের অধীনে ক্ৰমশঃ বেড়ে চলা বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সংকটের দিকে এগিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি আমেরিকার মত অগ্রসর’ দেশের জনসাধারণের একটি বড় অংশই গৃহহীন, দরিদ্র, বেকার, অসহায় জীবনে ক্রমশ পতিত হয়। রমরমা ঘটে (অন্তত সাময়িকভাবে) শুধু সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থার (একচেটিয়া পুঁজির) ও কিছুটা তার প্রতিনিধি-কর্মচারীদেরও, কিন্তু উভয়ের চূড়ান্ত স্থায়িত্বও এই ব্যবস্থা দিতে অক্ষম। অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদীরা বিশেষ ধর্মের মূলভিত্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে যে ঐতিহ্যকে রক্ষা করার কথা বলে, তার ফলে মানুষে মানুষে সম্প্রীতিই বিনষ্ট হয় এবং কৃত্রিম বিভাজন বাড়ে মাত্র। কৃত্রিম ধর্মপরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে নিজের ও অন্যের পরিচয়ই যে একমাত্র ও বড় পরিচয় ঐ বোধ সে ভুলিয়ে দেয়। বিজ্ঞানমনস্কতার পরিবর্তে ভাববাদী দর্শনের অন্ধকারে মানুষের মনকে নিমজ্জিত করে। সাম্রাজ্যবাদ মুনাফার তথা পণ্যবিক্রির স্বার্থে জড়বাদী ও ভোগবাদী মানসিকতায় ভুলিয়ে এবং ধর্মীয় মৌলবাদ জঙ্গী ভাববাদে নেশাগ্ৰস্ত করে মানুষকে ও তার সভ্যতাকে ক্রমশঃই এক বৃহৎ সংকটের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। উভয়েই মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান, সমস্যা, সমস্যার স্বরূপ ও তার সমাধানের উপায় সম্পর্কে সচেতন হতে অতি সক্রিয়ভাবে বাধা দেয়।
 
পৃথিবীর নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে একসময় মানুষ মার্কসীয় দর্শন তথা সাম্যবাদী-সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের সন্ধান পেয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে এই দর্শনই চরম সত্য, সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত এবং শতাধিক বছর। পরেও সে অপরিবর্তনীয়। মার্কসীয় দৰ্শন নিজেই এই মৌলবাদী মানসিকতার বিরোধী। কিন্তু ক্ৰমশঃ পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে এই ধরনের নানাবিধ দার্শনিক মতাদর্শের থেকে শিক্ষা নিয়ে কিভাবে জড়বাদ-ভোগবাদ-বৈষম্যবাদ-শোষণবাদের মোকাবিলা করার উপায় ও তত্ত্ব আবিষ্কার করা যাবে, সেই পথ অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক চেতনাকেই দুর্বল ও বিকৃত করে দেয় সাম্রাজ্যবাদী প্রচার ও মৌলবাদী মানসিকতা। এখনো পর্যন্ত জানা তত্ত্বগুলির মধ্যে মার্কসীয় দর্শন জনগণের বৃহত্তম অংশের স্বাৰ্থবাহী বলে প্রতিষ্ঠিত এবং সাম্রাজ্যবাদ-মৌলবাদ মানুষের একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের স্বাের্থবাহী বলে প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও এখনকার পৃথিবীতে মানুষ ও তার সমাজ এই সাম্রাজ্যবাদী-মৌলবাদী মানসিকতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রস্তুত বলেই প্রতীয়মান হয়, যে কারণে এখনো এরা শক্তিশালী এবং একইসঙ্গে, প্রাসঙ্গিকভাবে, শক্তিশালী মানুষের হিংস্রতা, উগ্ৰপন্থা, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অনৈক্যের মানসিকতা, অসহিষ্ণুতা এবং (পুজিবাদ প্রচারিত) ভোগবাদী বা (ধর্মাচরণের নামে) ভাববাদী মনোবৃত্তি। অন্যদিকে মানুষ এখনো যথাসম্ভব মার্কসীয় দৰ্শন বা এই ধরনের আরো বিকশিত যে মতাদর্শ মানুষকে শ্রেণীহীন, শোষণমুক্ত, মানবিক ঐক্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তার জন্য প্রস্তুত নয়। পাশাপাশি বহু মানুষের মধ্যেই অসততা, শ্রমবিমুখতা, সুবিধাবাদী স্বার্থপরতা, ক্ষমতালিন্সা ইত্যাদি এখনো তীব্রভাবে রয়েছে, রয়েছে বহু বিচিত্র ধরনের স্বার্থগত, শ্রেণীগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব। এসবের প্রতিফলন ঘটে যারা এই মতাদর্শকে অনুসরণ করার কথা বলে তাদের বহুজনের আপাত বিচ্যুতি, ব্যর্থতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে। এবং এই মতাদর্শকে প্রয়োগ করার ব্যবহারিক দিকগুলি সাময়িকভাবে ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়েও। ঐতিহাসিক নিয়মে আপনা থেকেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে-এমন নিয়তিবাদী, স্বতস্ফুৰ্ততানির্ভর মানসিকতা অবশ্যই বিপজ্জনক এবং অবশ্যই সচেতন প্ৰয়াসে ও সক্রিয় উদ্যোগে ছবিটিকে পাল্টানো দরকার। এই পাল্টানোর ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ উভয়ের মূলোচ্ছেদ ঘটানো অন্যতম প্রাথমিক শর্ত।
 
এটি হয়তো ঠিক যে চরম অর্থে বৈষম্যহীন সমাজ কোনদিনই মানুষ অর্জন করতে পারে না। এর বড় একটি কারণ মানুষ যন্ত্র বা ছাঁচে গড়া কোন বস্তু নয়। মানুষ তার আবেগ ও আকাঙ্খা নিয়ে পরস্পরের থেকে পৃথক। এই পার্থক্যের পেছনে নার্ভকোষ থেকে শারীরিক নানা দিক তথা জীন-গত (genetic) কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে চতুষ্পপাশ্বের জাগতিক প্রতিফলন এবং বিগত বহু সহস্র বছরের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পুরুষানুক্ৰমিক ধারাবাহিকতাও। এই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন শুধু মানুষে মানুষে ঘটে না, তার ছোট বড় অজস্ৰ গোষ্ঠীর মধ্যেও ঘটেছে। এই বৈচিত্ৰ্য নিয়েই মানুষ ও তার সমাজ। এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে ও তার আবেগকে মূল্য না দিয়ে, মানুষকে যন্ত্রের মত একটি আরোপিত মত বা আদর্শকে অনুসরণ করায় বাধ্য করলে, এক সময় সে বিদ্রোহ করবেই। এইভাবেই যে দীর্ঘকালীন মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি তাকে তার নানাবিধ শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার উপযোগী, স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলবে, সেই ধৈর্যশীল প্রক্রিয়া এড়িয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্ম–এদের উৎখাত করার প্রচেষ্টা একসময় ব্যর্থ হতে বাধ্য।
 
একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় ও প্রয়োজনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্মের সৃষ্টি। মানব সভ্যতার একটি বিশেষ পর্যায়ে উভয়ের বিপদ ও অপ্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে অনুভব করা যাচ্ছে। এটিও অনুভব করা যাচ্ছে যে, এ দুটি বস্তুগত ও মনোগত পদ্ধতিই সাম্রাজ্যবাদের মত ভয়াবহ ও মৌলবাদের মত বিপজ্জনক সামাজিক অপশক্তির জন্ম দিতে পারে এবং দিয়েছেও। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্ম-এদের টিকিয়ে রেখে সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ উভয়ের চূড়ান্ত মূলোচ্ছেদ করা ও পুনরাবির্ভাবকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। মানুষের সভ্যতার যে পর্যায়ে এ দুটির অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের আবির্ভাব ঘটে নি, সেই সময় মানুষ পেরিয়ে এসেছে বিগত শতাব্দীতেই। এখন তাদের বিদায়ের পালা। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের বিগত নৃত্যুনতম ৬-৭ হাজার বছরের অভ্যাসকে দুই-এক শত বছরে পুরোপুরি উচ্ছেদ করার চিন্তা কতটা বাস্তব সম্মত তা বিচার করা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটিও বিচার করার প্রয়োজন যে, বর্তমান পর্যায়ে এ দুটির সামাজিক উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরো কতটা রয়েছে। তাদের এই উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্মের মূলোচ্ছেদ করার জঙ্গী আপোষহীন ও বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা চালানো হয়, তবে এই অকালবোধনের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মধ্যেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ধর্ম—উভয়কে আরো অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা সৃষ্টি হতে বাধ্য এবং তা হচ্ছেও।
 
কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু এই কারণে স্তিমিত করাটা বিপজ্জনক। পরস্পর সম্পর্কিত, পরস্পরের সুহৃদ এবং একই সমাজব্যবস্থার কাঠামো ও উপরিকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই দুই সভ্যতা-বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই স্তিমিত করার অর্থ, দুর্বলতার সুযোগে তাদের শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করা এবং বৈষম্যমুক্ত বৈজ্ঞানিক চেতনাসম্পন্ন নতুন মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার কাজকে বিলম্বিত করা। এর জন্য সরাসরি এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত প্রচার ও তার জনস্বার্থবিরোধী দিকগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামও করা প্রয়োজন। কিন্তু তার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই শ্রেণী যারা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মোহ ও প্রয়োজন এবং ধর্ম ও ঈশ্বর-বিশ্বাসে মোহ ও প্রয়োজনকে ব্যবহার ক’রে তাদের শাসন, শোষণ ও প্রতারণা করে। বিভিন্ন স্তরের শোষিত মানুষকে এ ব্যাপারে। সচেতন করা, সংগঠিত করা ও বৈজ্ঞানিক সত্য জানতে সাহায্য করা যায়, এবং এইভাবেই তাদের স্বাবলম্বী হয়ে মুক্তির পথ খোঁজার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার চেষ্টা চালানো যায়। কিন্তু তা করতে গিয়ে এখনো মানুষ তার যে অসহায়তা, অনিশ্চয়তা, অজ্ঞতা ও আবেগের কারণে ব্যক্তিগত সম্পদ ও ধর্মকে আকড়ে রাখতে চায়, সেগুলিকে অস্বীকার করে মানুষকে অপমান, হতমান ও আঘাত করা অপরাধ।
 
এবং অপরাধ মানুষের শারীরিক, মানসিক তথা আবেগগত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে তাকে যন্ত্রে পরিণত করা বা যন্ত্রের মত ব্যবহার করার মানসিকতাও। ‘আমি (নেতা) যা বলছি, সেটিই সত্য, আর তার অনুসরণ যে না করে সে ভ্রান্ত ও শত্ৰুস্থানীয়’-এমন মানসিকতা মূলত কর্তৃত্ববাদী, পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের হলেও এই মানসিকতা এখনকার, রাজনৈতিক দল, এমন কি তথাকথিত বামপন্থীদের মধ্যেও সংক্রমিত।
 
মানুষের সমাজে বাস করতে গেলে প্রতিটি মানুষকেই নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ, আচারবিধি ও শৃঙ্খলা মানতেই হয়; সমাজে বিশেষ একজনের চূড়ান্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও চরম গণতন্ত্র অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু তা যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা এবং কাদের স্বার্থে এই শৃঙ্খলা ও আচারবিধি—এগুলি বিচার করা অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। যান্ত্রিকতা-মুক্ত একটি বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ ও পথ মানুষকে তার সভ্যতার স্থায়িত্বের দিকে নিয়ে যাবে, যে স্থায়িত্বকে রক্ত লোলুপ সাম্রাজ্যবাদ ও চেতনাবিকৃতকারী মৌলবাদ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে মার্কসীয় দর্শনকে অনুসরণ করার কথা বলা কিছু ব্যক্তিদের মধ্যে মানুষকে যন্ত্র হিসাবে ও একই ছাঁচে ফেলা আদর্শ একটি সত্তা হিসেবে ভাবার এবং ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, প্রকৃতপক্ষে এই দর্শনই মানুষকে তার সামগ্রিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করার কথা বলে। মানুষের নিজের মধ্যে, পরস্পরের মধ্যে ও সমাজের সঙ্গে নিরস্তুর ঘটে চলা দ্বন্দ্ব ও মিলনের প্রক্রিয়া এই দর্শনের অন্যতম দিক। ‘যান্ত্রিক মার্কসবাদীরা’ বা ‘মার্ক্সিস্ট মৌলবাদীরা’ তাদের আচরণে এসব অস্বীকার করে। অধৈৰ্য, অসহিষ্ণু, সুবিধাবাদী এরাই মার্কসবাদের নামে সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি করে।
 
প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদই মানুষকে এক যন্ত্রে পরিণত করে। সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজি তার অস্তিত্বের স্বার্থে মানুষকে এক পণ্যক্রেতা, মুনাফাদাতা যন্ত্র হিসেবেই দেখে। মানুষ সম্পর্কে তার প্রধান বিচার্য কোন দেশের মানুষের মধ্যে বাজার ভাল, কারা বেশি মুনাফা দেবে। তার কাছে মানুষের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার স্বাধীন মূল্য ততটা নেই, যতটা আছে। এই স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তাকে কিভাবে পুঁজির স্বার্থে লাগানো যায় তার চিন্তাটি। ধর্মীয় মৌলবাদও যান্ত্রিকভাবে ধর্মানুসরণকে উৎসাহিত করে। একজন ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি যান্ত্রিকভাবে সারা দিন রাত নানা ধর্মীয় আচার ও সংস্কারগত খুঁটিনাটি মেনে চলেন। তার একটু ব্যতিক্রম হলেই খুঁতখুঁতানি শুরু হয়। মৌলবাদ এর ওপর আরো রঙ চড়ায়। সে মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে, একটি বিশেষ ধর্মপরিচয়ের অধীনস্থ হিসেবে বিচার করে। মানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব তার কাছে মূল্যহীন। জন্মসূত্রে একজন হিন্দু বা মুসলিম কিভাবে চলবে, কিভাবে চিন্তা করবে, কি চোখে ভিন্নধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের দেখবে তা ঠিক করে দেওয়ার ঠিকাদারি নেয় মৌলবাদ (ও সাম্প্রদায়িকতা)। একইভাবে সাম্রাজ্যবাদও ঠিকাদারি নেয়। তার অর্থনৈতিক উপনিবেশের মানুষরা কিভাবে চিন্তাভাবনা করবে, কিভাবে নাচ-গান করবে, তাদের ব্যক্তিত্ব কেমন হবে, তারা কি কেনাকাটা করবে, কি খেলে ভাল থাকবে, কি বানাবে ইত্যাদি সবকিছু ঠিক করে দেওয়ারও।
 
এগুলিকে পরিহার করে এবং প্রতি মানুষের স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্ৰ্যকে মর্যাদা দিয়ে চরম অর্থে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়তো বাস্তবত অসম্ভব। সম্প্রতি জানা আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা কোয়ান্টাম তত্ত্ব জাতীয় কিছু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রকল্পের সামাজিক প্রয়োগ এ ব্যাপারে নতুনভাবে ভাবতেও হয়তো বাধ্য করবে। তবু আপাতত এই সমাজের জন্য চেষ্টা করাটাই বৈজ্ঞানিক ও সুস্থ ব্যাপার। অন্তত এই প্রচেষ্টা বৈষম্য ও শোষণকে নূনতম করবে, প্রতি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি পালন করবে। আর তা না করার অর্থ এই বৈষম্য বাড়তে দেওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদ-মৌলবাদের হাতকে তথা শাসকশ্রেণীর হাতকে শক্ত হতে দেওয়া। পৃথিবীর কোন দুটি বট গাছের গড়ন, পাতার সংখ্যা ইত্যাদি হুবহু এক নয়। এই বৈচিত্র্য থাকলেও সবগুলিই বটগাছই বটে। একইভাবে দুটি মানুষের মধ্যেকার যে পার্থক্য তা বাহ্যিক, ও ততটা গুরুত্বপূর্ণও নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সমগ্র মানবজাতির অন্যতম সদস্য হিসেবে তার পরিচয়টি। তাই আপাত কিছু বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা সত্ত্বেও সমগ্র মানবজাতির ঐক্য অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তা অর্জন অদূরভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ। তবু তার প্রচেষ্টাই বৈজ্ঞানিক, সুস্থ ও কাম্য। তা না করার অর্থ মানুষের মধ্যকার অনৈক্য, অবিশ্বাসকে বাড়তে দেওয়া। এবং তা করার অর্থ সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের মত অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরলস লড়াই করাও। সদা সত্য কথা বলিবো’-র মত নির্দেশ চরম অর্থে আজীবন মেনে চলা দুরূহ ও প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তবু তাকেই অনুসরণীয় হিসেবে সামনে রাখাটাই কাম্য, তা না হলে মিথ্যারই বিপুল ব্যাপ্তি ঘটবে। একইভাবে চুড়াস্ত বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ সমাজের লক্ষ্যই সামনে থাকাটা কাম্য-অন্যথায় অনৈক্য, বৈষম্য ও শোষণকেই বাড়তে দেওয়া হবে মাত্র। সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ উভয়েই এই বৈষম্য, শোষণ ও অনৈক্যাকে উৎসাহিত করে। তাই অন্যান্য নানা সামাজিক অপশক্তি তথা গণশত্রুর মত তাদের উচ্ছেদের লক্ষ্যও সমস্ত সচেতন, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জীবনেরই একটি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
 
অনাবিল ধর্মবিশ্বাস আছে, মৌলবাদ নেই, কিংবা তারও পরোকার, সেই কৈশোরের পুঁজিবাদ আছে সাম্রাজ্যবাদ নেই। —এমন হলে হয়তো কত সুন্দরই হত এই পৃথিবীটা। ২ কিন্তু তা আর হবার নয়। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস সময়ের স্রোতে ঐ কাল পেরিয়ে এসেছে। তাকে আবার পশ্চাদগমনে ফেরানো যায় না। তার বড় কারণ এই এগিয়ে যাওয়ার পথে, মানুষ অনেক কিছু অর্জনও করেছে, যা তার অবস্থানকে গুণগতভাবে পাল্টে দিয়েছে। এমন বৈজ্ঞানিক সত্য ও জ্ঞান মানুষ লাভ করছে। যাতে ঐ ঈশ্বরের ও ধর্মের কোন স্থান নেই, প্রয়োজন হয়ে পড়েছে নতুনতর মূল্যবোধের, যার একমাত্র ভিত্তি মনুষ্যত্ব। এমন উৎপাদন পদ্ধতি মানুষ করায়ত্ত করছে, যাতে পুঁজিবাদের প্রাথমিক রূপ একেবারেই বেমানান ও বর্তমান স্তরও একসময়ে বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। তাই প্রয়োজন নতুনতর এক ব্যবস্থা, যার প্রধান লক্ষ্য স্বনির্ভরতার নামে সংকীর্ণ জাতীয়তা নয়, ব্যাপক আস্তর্জাতিক সহযোগিতায় এক বিপুল গণ উৎপাদন ব্যবস্থা, যাতে পৃথিবীর সব মানুষ প্রায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যে সুন্দর হয়ে উঠবে। কিন্তু এই প্রয়োজন কবে মিটবে তা জানা নেই,—হয়তো দু’ চার দশক বা দু’ চার শতাব্দী পরে। কিংবা হয়তো আদৌ মিটবে না, যদি মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদকে সক্রিয়ভাবে দ্রুততর না করা হয়; হয়তো তাহলে এই প্রয়োজন মেটার আগেই মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ, এই দুই দৈত্যের হাতে মানবসভ্যতার ধ্বংস ঘটবে (সেই সঙ্গে তাদেরও)। যাদের জন্য এই প্রয়োজন মেটার প্রয়োজন ছিল, সেই মানুষই আর থাকবে না।
 
এই ভয়ংকর পরিণতির কথা ভেবে আমরা শিহরিত হতে চাইনা। মানুষ বিপুল ক্ষমতাধর। তার মানবিকতা অক্ষয়, অমর। মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতিক্রিয়ায় চরমতম সর্বনাশের প্রাগমুহূর্তেও সে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম। এবং সে রুখে দাঁড়াবেও, দাঁড়াচ্ছেও।
 
—————————-
(১) অবশ্য এদের ‘অবতারত্ব সম্পর্কিত প্রচার ও বিশ্বাসও এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা পালন করে।
 
(২) হিন্দুদের মত বা মুসলিমদের নামাজের সময়ের মত মধ্যযুগে খৃস্টান ইয়োরোপেদিনে ৭টি বিশেষ ধর্মীয় সময় চিহ্নিত করা হত-(১) ম্যাটুটিনা-ব্রাহ্মা মুহূর্ত (বিছানা ছেড়ে ওঠার সময়), (২) প্রাইমা-সূর্যোদয় (৩) টার্সিয়া—সূর্যোদয় ও মধ্যাহ্নের মাঝামাঝি, (৪) সেক্‌ষ্ট্ৰী-মধ্যাহ্ব, (৫) নোনা-মধ্য অপরাহ্ন, (৬) ভেসপেরি—সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা আগে, (৭) কমপ্লিাটা-সূর্যস্ত। এই সময়গুলিতে গীর্জা থেকে ঘন্টাধ্বনি করে সবাইকে জানানো হত।
 
(৩) তবে বিশেষ সময়ে কৌশল হিসেবে তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কথাও বলে। যেমন, ‘সাম্রাজ্যবাদ রাখতে বিজেপি সঙ্গে চায় বাম দলগুলিকে—দলের সাধারণ সম্পাদক কে এন গোবিন্দাচাৰ্য আজ সরাসরি বামন্দালগুলিকে বলেছেন, বিজেপি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাও সংস্কার ঝেড়ে ফেলেনিয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমরা একত্রে রুখে দাঁড়াই আসুন…’ ইত্যাদি। ব্যাপারটি প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ও গণসমর্থন আদায় করা ইত্যাদির লক্ষ্যে একটি কৌশলীই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়। তার পরেই গোবিন্দাচাৰ্য বলেন, ‘আমাদের উচিত একজোট হয়ে ভারতীয় জীবনদর্শন ও মূল্যবোধকে রক্ষা করা।’ এই দর্শন ও মূল্যবোধ তাঁদের কাছে দ্বিধাহীনভাবে হিন্দুত্বেরই। (সংবাদ প্রতিদিন, ২৯.৯.৯৪)
 
(৪) কিন্তু শুরুতে পুঁজিবাদী বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসা। তখন এই ধর্মমোহ তার বিকাশে বিরোধী ভূমিকা পালন করছে বলে অনুভব করা গিয়েছিল। তাই শুরুর দিকে বুর্জেয়ারা ছিলেন ধর্মবিরোধী।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত