মৌলবাদের উৎস সন্ধানে (পর্ব-২)

২. ফান্ডামেন্টালিজম ও ফান্ডামেন্টালিস্টরা
Fundamentalism ও Fundamentalist
 
বাংলা ‘মৌলবাদ’ কথাটি যে ইংরেজী ‘Fundamentalism’ (ফান্ডামেন্টালিজম)–এর অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি (coin) করা হয়েছে তাতে প্রায় কোন সন্দেহ নেই। মৌলবাদ বা Fundamentalism বিগত শতাব্দীতে আমেরিকার প্রোটেস্টান্ট খৃস্টানগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্ভূত হয়েছিল এবং খৃস্ট ধর্মের একটি অন্যতম ক্ষুদ্র উপ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বাতন্ত্র লাভ করেছে। তবে মানসিকতাটি অতি ব্যাপক। মৌলবাদী বলতে সাধারণভাবে যা বোঝানো যায়। তার চরিত্র ও লক্ষণগুলি এই বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেও ছিল বা আছে। কিন্তু শুধু মৌলবাদী বা খৃস্টীয় মৌলবাদী বলে Fundamentalist (ফান্ডামেন্টালিস্ট)-দের বোঝানো মুস্কিল, ‘ধৰ্মীয় মৌলবাদী’ বলে তো নয়ই। এই বিশেষ গোষ্ঠীকে বোঝাতে Fundamentalist কথাটিই ব্যবহার করা দরকার। এখনো খৃস্টানদের মধ্যে এঁদের অস্তিত্ব রয়েছে।
 
এরা একেবারে সাধু-সন্ন্যাসী গোছের না হলেও, এঁদের কিছু নিজস্ব আচার আচরণ বিধিনিষেধ রয়েছে। অধিকাংশ Fundamentalist (ফান্ডামেন্টালিস্ট) ধূমপান করেন না, মদ্যজাতীয় কোন পানীয় গ্রহণ করেন না, নাচে অংশ গ্ৰহণ করেন। না বা নাচেন না এবং এমনকি সিনেমা, নাটক ইত্যাদি দেখেন না। এঁদের নিজস্ব, ফান্ডামেন্টালিস্ট কলেজ ও বাইবেল ইনস্টিটিউট রয়েছে। অন্তত এগুলিতে পূর্বোক্ত বিধিনিষেধগুলি কঠোরভাবে পালন করা হয়। এদের ঈশ্বর উপাসনার পদ্ধতিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু তফাৎ থাকতে পারে, তবে সাধারণতঃ গীর্জ বা যাজকের ভূমিকা তাতে থাকে না। কিন্তু বাইবেলকে অপরিবর্তনীয় বিতর্কাতীত সর্বোচ্চ নেতৃত্বের গ্রন্থ হিসেবে গ্ৰহণ করা এবং প্রাচীন আচারপদ্ধতিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটি তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আর একসঙ্গে জড়ো হয়ে গান ও প্রার্থনার সঙ্গে ধর্মোপদেশ দেওয়াটা ফান্ডামেন্টালিস্ট উপাসনা প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ দিক।
 
এধরনের বাহ্যিক কিছু দিকের মধ্যে ফান্ডামেন্টালিস্ট-দের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বাইবেলের কোন ধরনের সমালোচনাকে বা পরিবর্তনকে সহ্য না করার মানসিকতা। এর সঙ্গে আধুনিকতা (modernism), আধুনিক মতাদর্শগত বিতর্ক, যুক্তিবাদ ইত্যাদি এবং বিশেষত বিবর্তনবাদ ও এই ধরনের আধুনিক দৈত্য’ (demon)–দের ঘূণার সঙ্গে পরিহার করার মানসিকতাও এঁদের বিশেষ চারিত্রিক লক্ষণ। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তাদের এই বিরোধ (Fundamentalist-modernist controversy) আসলে বেশ পরেকার ব্যাপার-প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক নাগাদ এটি পরিষ্কার রূপ পায়।
 
কিন্তু ফান্ডামেন্টালিজম-এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক আগে এবং এক্ষেত্রেও পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি, বৈজ্ঞানিক চেতনার ক্রমবিকাশ, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ৰমপরিবর্তন ইত্যাদির ফলে যখন ধর্মের অস্তিত্ব ও চিরাচরিত। ঐতিহ্যের উপর আঘাত আসতে থাকে তখন তার প্রতিক্রিয়ায় এধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সব সময়ে সমাজে নতুন প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা যখন আসে, তখন তার বিরুদ্ধে পুরনো চিন্তাভাবনা কিছুকাল। লড়াই চালাতেই থাকে। ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি মৌলবাদের রূপ ধারণ করতে পারে এবং জেতার জন্য তার এই লড়াই জঙ্গী, মরিয়া ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। সমাজের কিছু মুক্ত চিন্তার মানুষ জ্ঞান ও সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পুরনো ধ্যানধারণার পরিমার্জনা-এমনকি বৈপ্লবিক রূপান্তরও ঘটান, কিন্তু অন্য কিছু মানুষ প্রাচীনকেই পরম সত্য বলে আঁকড়ে রাখেন-যা মৌলবাদেরই একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। নতুন চিন্তা যদি সত্য ও শক্তিশালী হয় তবে তার জয় এর ফলে বিলম্বিত হলেও, অবশ্যম্ভাবী। এবং পরবর্তী কালের নতুনতর আরো বিকশিত চিন্তার সঙ্গে তারও দ্বন্দ্ব শুরু হয়, তখন আগেকার একদা প্রগতিশীল চিন্তা প্রতিক্রিয়াশীলের ভূমিকা পালন করে বা করতে পারে। সমাজ বিকাশে এবং এই বিকাশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে এধরনের সর্বদা পরিবর্তনশীল দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া অবিচ্ছেদ্য একটি দিক এক সময় যে প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম সমাজে প্রগতিশীল ও প্রয়োজনীয় হিসাবে সৃষ্টি হয়েছিল, কিছু পরে তাইই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
 
খৃস্টধর্মের জড়বদ্ধতা, বিশেষত তার আচার সর্বস্বতা, কায়েমী স্বার্থের সংকীর্ণতা–এসবের প্রতিবাদে একদা প্রোটেস্টান্ট উপ-বিভাগের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীর্ণ কালে ঊনবিংশ শতাব্দী সময়কালে যে আমেরিকায় ইয়োরোপের শিল্পবিপ্লবের উত্তরসূরী হিসেবে দ্রুত উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টাচ্ছিল এবং নানা ধরনের উদার চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল, তখন ঐ আমেরিকাতেই ‘আমেরিকান প্রোটেস্টন্টিজম’-এর মধ্যে রক্ষণশীল ধর্মীয় আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ‘ফান্ডামেন্টালিজম’-এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল—(১) খৃস্টান ধৰ্মপুস্তকগুলির অপরিবর্তনীয়। আক্ষরিক ব্যাখ্যাকে ও সেগুলির চরম অবস্থানকে খৃস্টধর্মের মৌল (fundamental) ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা, (এখন হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদীরা বেদ-উপনিষদমনুসংহিতা-কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰ-কোরাণ-হাদিস সম্পর্কে যে মনোভাব পোষণ করেন), (২) যিশু খৃষ্ট শিগ্নিরই সশরীরে দ্বিতীয়বার আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন-এ সম্পর্কিত বিশ্বাস, (রামরাজ্য বা ইসলামী রাষ্ট্র?), (৩) কুমারী মায়ের গর্ভে তার জন্ম সম্পর্কিত বিশ্বাস (The Virgin Birth), (8) পুনরভ্যুত্থান (resurrection) সম্পর্কিত বিশ্বাস ও (৫) প্রায়শ্চিত্ত (Atonement)।
 
পরবর্তীকালে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক মানসের বিপরীতে আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিজম পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকায় তার প্রতিনিধি হিসেবে অসংখ্য ধর্মীয় সংগঠন (Church bodies), শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নানা সংগঠন ও সংস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখনো এগুলি যথেষ্ট সক্রিয়। (একইভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহ নানা দেশে হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদীরাও নানা ধর্মীয় সংগঠন, শিক্ষা প্ৰতিষ্ঠান এবং গণসংগঠন বা রাজনৈতিক সংগঠন, দল, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।)
 
কিন্তু পরের দিকে যাই-ই হোক না কেন, একটু পেছন দিকের ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে যিশু খৃস্টের দ্বিতীয় আবির্ভাব (Second Advent of Christ) হতে চলেছে এবং সামনের এক হাজার বছর ধরে অপার শাস্তির যুগ আসছে।–এমন একটি বিশ্বাস ১৮৩০-৪০ সাল নাগাদ আমেরিকায় প্রচণ্ড আলোড়ন ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই ‘একহাজার বছরের আসন্ন শান্তির যুগকে বলা হয় ‘the millennium, (মিল্লেন্নিয়াম) (তুলনীয়, ভারতের হাস্যকর রামরাজ্যের কথাবার্তা) এবং এ সম্পর্কিত ধর্মীয় আন্দোলনের নামই হয় ‘millenarian movement’। এই আন্দোলনের মধ্যেই পরবর্তীকালে সৃষ্টি হওয়া ফান্ডামেন্টালিজম’-এর শেকড় লুকিয়ে আছে। ঐ ধরনের বিশ্বাস, তার প্রচার, তাকে কেন্দ্র করে নানা স্বার্থের নানা ধরনের সাংগঠনিক ধর্মীয় প্রয়াস—এগুলি ‘নায়াগ্রা বাইবেল সম্মেলন’ (Niagara Bible Conference)-এর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনে সুসংহত হয়। নিউ ইয়র্ক শহরের ব্যাপটিস্ট যাজক জেমস ইংলিশ (James Inglis)। ১৮৭২ সালে তাঁর মৃত্যুর অল্পদিন আগে এই সম্মেলনের প্রারম্ভিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর পর ‘সেন্ট লুই প্রেসবিটেরিয়ান’ (Presbyterian) যাজক জেমস এইচ ব্রুকস (James H. Brooks) (১৮৩০-৯৭)-এর অধীনে এর কাজ চলতে থাকে। জেমস ব্রুকস ছিলেন প্রভাবশালী মিলেনারিয়ান পত্রিকা ‘দি টুথ’-এর সম্পাদক।
 
তবে এই ‘মিলেনারিয়ান’ আন্দোলনের আগে প্রটেস্টান্ট চার্চের মধ্যে পুনরভ্যুত্থানবাদ বা revivalism নামে আরেকটি ধারার সৃষ্টি হয়েছিল, যা আমেরিকায় এই ফান্ডামেন্টালিজম’-এর সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইংল্যাণ্ডে এর উদ্ভব হয় এবং পরে উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই তত্ত্বের নাম থেকেও খৃস্টধর্মের শক্তিকে আবার বাড়িয়ে তোলার আকাঙ্খার ব্যাপারটি বোঝা যায়। এর অনুগামীরা খৃস্টধর্মের প্রভাবকে সংহত করা এবং আরো বিস্তার করার প্রচেষ্টা চালায়। আমেরিকায় প্রসারিত এই ধারাই কয়েক দশক পরোকার মিলেনারিয়ান বিশ্বাস ও পরোকার ফান্ডামেন্টালিজম-এর পথ প্রশস্ত করে।
 
এই রিভাইভ্যালিজম’-এর উদ্ভবও ধর্ম ও বাইবেল বিরোধী বাতাবরণের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইয়োরোপে মূলত দরিদ্র ও সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষদের উদ্যোগে প্রথাবিরোধী বিশ্বাস ও কাজকর্মের একটি তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ডিগার, র্যান্টার, লেভেলার, কোয়েকার ইত্যাদি নামের নানা গোষ্ঠীর মধ্য দিয়ে প্রচলিত খৃস্টধর্ম তথা বাইবেলের বিরুদ্ধেবিদ্রোহী চেতনার এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা ঐতিহ্যগত প্রাচীন ধারণা ও বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রয়াস সংগঠিত হয়েছিল। র্যান্টাররা বাইবেলকে মনে করতেন যত দুঃখকষ্ট, বিভেদ ও বিশ্বব্যাপী রক্তপাত –এর কারণ। কারো মতে ওটা ধাপ্লাবাজিতে ভরা। কেউ (ওয়ার্ল্ডউইন) বলেছেন, ‘বাইবেল স্ববিরোধিতায় ভর্তি এবং তাকে ঐশী বাণী বলেও গ্রহণ করতে তারা রাজী নন। কেউ (বোথােমলি) বাইবেলকে রূপক হিসেবে গণ্য করেন এবং তাকে কোন সৎ লোকের লেখা যে কোন গ্রন্থের সমতুল্য’ বলে মনে করেন এবং এই ধরনের দু একটি উদাহরণ সপ্তদশ শতাব্দীর ধর্মবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের পরিচায়ক অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। আপাতত এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বলা যায় যে, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও চেতনার বিকাশের অনেক আগেই, ইয়োরোপের শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত কল্পতে ও তার প্রাসঙ্গিকতায় এ ধরনের প্রথাবিরোধী, ধর্মবিরোধী ও বাইবেলবিরোধী তীব্র মতাদর্শ জনগণের মধ্যে গড়ে উঠছিল। একে রুখতে একে একে সৃষ্টি হয়েছিল রিভাইভ্যালিজম, মিলেনারিয়ান আন্দোলন, ফান্ডামেন্টালিজম তথা মৌলবাদ। বিংশশতাব্দীর শেষ প্রান্তে ধর্ম যতই কোণঠাসা হচ্ছে ততই এই হতাশ মৌলবাদও আপ্ৰাণ শেষ লড়াই চালাচ্ছে। সে অন্য প্রসঙ্গ। আপাতত আমরা মিলেনারিয়ান আন্দোলনেই ফিরে যাই।
গোঁড়ার দিকে অন্যান্য মিলেনারিয়ান নেতৃত্বের মধ্যে আরো কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন–ব্যাপটিস্ট ইভাঞ্জেলিস্ট জর্জ সি. নীডহ্যাঁম (George C. Needham; ১৮৪০-১৯০২), প্রেসবিটেরিয়ান যাজক উইলিয়াম জে. আর্ডম্যান (William J Erdman; ১৮৩৪-১৯২৩) (বাইবেলের ব্যাখ্যাতা হিসেবে এর বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল), উইলিয়াম আর নিকলসন (William R. Nicholson; ১৮২২-১৯০১),–ইনি ১৮৭৩-এ এপিস্কোপাল চার্চ ছেড়ে ছোট্ট গোষ্ঠী রিফর্মড এপিস্কোপালএর বিশপ হয়েছিলেন।
 
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বেষ্টনের বিখ্যাত ব্যাপটিস্ট যাজক অ্যাডোনিরাম (šī ti (Adoniram J. Gordon; ১৮৩৬-১৮৯৫) ও চার্চ অব কানাডায় হুরোনের বিশপ মরিস বন্ডউইন (Maurice Baldwin; ১৮৩৬-১৯০৪)-এর মত ব্যক্তিরাও এই মিলেনারিয়ান আন্দোলনে আকৃষ্ট হন।
 
১৮৯৯ অব্দি সাধারণত নায়াগ্রা অন দি লোক (ওন্টারিও)-তে এই গোষ্ঠী প্রতি বছর গ্ৰীষ্মে সম্মেলনের আয়োজন করতেন। আর ১৮৭৮ থেকে ঐ নায়াগ্রা সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত মিলেনারিয়ানরা বড় বড় শহরেও বহু প্ৰকাশ্য সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করেছিলেন যেমন নিউইয়র্ক শহরের ‘বাইবেল অ্যাণ্ড প্রফেটিক কনফারেন্স’।
 
আমেরিকায় এ ধরনের মিলেনারিয়ান আন্দোলনের সূত্রপাতের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সংকট, ঘাত-প্ৰতিঘাত ও ঘটনাবলীর সম্পর্ক ছিল। আমেরিকায় ক্রমশঃ মাথা চাড়া দেওয়া শ্রমিক বিক্ষোভ, সামাজিক অসন্তোষ ও ক্রমবর্ধমান রোমান ক্যাথলিক অনুপ্রবেশের কারণে কিছু প্রোটেস্টান্ট নেতৃত্বের মধ্যে আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। (তুলনীয়, ভারতে মুসলিম অনুপ্রবেশ’-এর কারণে ভারতের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি বিপন্ন হচ্ছে বলে হিন্দু মৌলবাদীদের আশঙ্কা ও দেশের রুগ্ন অর্থনীতি ও কায়েমীস্বার্থের সামাজিক অবস্থানের অনিশ্চয়তা এই আশঙ্কা যথার্থ বলে বিশ্বাস করতে তাদের সাহায্য করে—যদিও এই রুগ্নতার কারণ তা নয়।) এছাড়া নতুনতর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঊনবিংশ শতাব্দীর অষ্টম দশকের শেষের দিকে ও নবম দশকে আমেরিকায় বাইবেলের মত তথাকথিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থের সমালোচনামূলক মুক্তচিন্তার প্রচার ও প্রসারও তখন ঘটছিল; এর প্রতিক্রিয়াতেও ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একাংশ এই গোঁড়া, ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারী মিলেনারিয়ান আন্দোলনে আকৃষ্ট হন। এবং তাকে ধৰ্মরক্ষার (তথা দেশকে রক্ষার) একটি উপায় বলে বিশ্বাস করেন। (ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইয়ংবেঙ্গল বা রামমোহন-বিদ্যাসাগরের সমাজ-সংস্কারমূলক আন্দোলনের স্তর পেরিয়ে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় এই বাংলাতেও গোঁড়া হিন্দুত্ববাদের আবির্ভাব ঘটে—বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শশধর তর্কচূড়ামণি জাতীয় বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে।)
 
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রোটেস্টান্ট ইভানজেলিস্ট ডুইট এল মুডি (Dwight L. Moody; ১৮৩৭-৯৯)। নর্থফিল্ডে তার সমাবেশগুলিতে মিলেনারিয়ান চিস্তাভাবনার প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী কর্মপন্থা উপস্থাপিত করেন। বিদেশে গিয়ে ধর্মপ্রচার তথা মিশনারী কাজকর্ম করাকে মিলেনারিয়ানরা সমর্থন ও উৎসাহিত করেন!! (হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদীরাও বিদেশের নানা স্থানে নিজেদের শাখা প্রতিষ্ঠা করছেন।) এর ফলশ্রুতিতে এ ধরনের মিশনারী উৎসাহ ও কাজকর্ম উত্তাল তরঙ্গের আকারে বিস্তার লাভ করে এবং একসময় তা ‘স্বেচ্ছাসেবী ছাত্র আন্দোলন’ (Student Volunteer Movement বা SVM) নামে বিশ্বষ সাংগঠনিক রূপ পায়। তাঁরা নিউ জার্সির প্রিন্সটনে প্রিন্সটন থিওলজিক্যাল সোসাইটি’ (প্রিন্সটনের ঈশ্বরতাত্ত্বিক সংস্থা)-র মধ্যে কিছু অধ্যাপক তথা বিদ্বান ব্যক্তিরও সন্ধান পান যাঁরা বাইবেলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও প্রেরণাকে কঠোরভাবে রক্ষা করতে আগ্রহী। প্রিন্সটনের এই অধ্যাপকদের মিলেনারিয়ানরা নিজেদের সভা-সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান এবং বাইবেলের সমর্থনে তাদের বক্তব্যগুলিকে নিজেদের মত করে গ্রহণ করেন। বাস্তবত প্রিন্সটনের এই সব ব্যক্তিদের প্রায় কেউই মিলেরিয়ানদের মতবাদকে গ্ৰহণ করেন নি, কিন্তু উভয়পক্ষই বাইবেলের কর্তৃত্বের প্রশ্নে উভয়ের সমর্থনকে সম্মান জানান ও স্বীকার করেন।
 
(প্ৰসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, আমেরিকায় ধর্ম-কেন্দ্ৰিক আলোড়নের ঐ পরিবেশে এই সময় অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে, ১৮৯৩ সালে, আমেরিকার চিকাগো শহরে বিখ্যাত বিশ্বধর্ম সম্মেলন বা ধর্ম মহা সভা অনুষ্ঠিত হয়,-স্বামী বিবেকানন্দের কারণে এবং প্রচারের গুণে যার সঙ্গে ভারতীয়, বিশেষত বাঙালীদের, একটি আবেগগত। সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মিলেনারিয়ান আন্দোলন বা পরবর্তীকালের ফান্ডামেন্টালিজম’-এর সংকীর্ণ ও গোঁড়া মানসিকতা থেকে না হলেও এই ধর্মমহাসভার উদ্দেশ্য ছিল,-’একই সভায় বিভিন্ন ধর্মমতাবলম্বীদের প্রতিনিধিদের একত্রিত করে মত বিনিময় করা, বিভিন্ন খৃস্টান গোষ্ঠীদের সমন্বিত করা এবং পারস্পরিক সহানুভূতির সঙ্গে সবার কথা শোনা, জড়বাদীদের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় ফ্রন্ট’ গড়ে তোলা, বিশ্বের জন জীবনের উপর ধর্মের সুগভীর প্রভাব ব্যক্ত করা এবং বিভিন্ন দেশের ও ধর্মের মানুষের মধ্যে গ্ৰীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। সম্মেলনের দু’বছর আগে থেকে জন ব্যারোজ-এর সভাপতিত্বে এই ধর্মমহাসভার জন্য কমিটি গড়া হয়েছিল; এর পক্ষ থেকে বিশ্বের নানা স্থানে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল তাতেই তার এই উদ্দেশ্যগুলি লেখা ছিল। স্পষ্টত এর মধ্যে মিলেনারিয়ানদের সংকীর্ণ বা মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গী ততটা ছিল না, যতটা ছিল। উদারনৈতিক কিন্তু নিছক ধর্মীয় অনুপ্রেরণা। এলাহাবাদের জ্ঞানেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কলকাতার হেবাবির্তনে ধর্মপাল, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ও স্বামী বিবেকানন্দ সহ মোট ১৩ জন ভারতীয় প্রতিনিধি সশরীরে ঐ ধর্ম মহাসভায় উপস্থিত ছিলেন। মিলেনারিয়ান বা ফান্ডামেণ্টালিস্টদের মত বাইবেলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য না থাকলেও, ঈশ্বরবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। গড়ে ওঠা ধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য তাঁদের অবশ্যই ছিল। এই উদ্দেশ্যের একটি সার্থক রূপায়ণ ঘটে স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে। এই ধর্মমহাসভায় ও তার পরেই তিনি হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় নিরলস চেষ্টা করেন। কিছু সংস্কারমূলক, আপাত প্রগতিশীল, উদার ও কুসংস্কারমুক্ত কথাবার্তা মাঝে মাঝে বল্লেও, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ১৮৯৩-এর শিকাগো বক্তৃতার পরই বিবেকানন্দ কার্যত ঐক্যবদ্ধ, পেশীবহুল তথা জঙ্গী হিন্দুত্বের ভ্ৰাম্যমান দূতে পরিণত হন। এ কারণে এখনকার হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে তিনি ও তাঁর কিছু সুবিধাজনক কথাবার্তা বেশ প্রিয়।)
 
ইভানজেলিক্যাল প্রোটেস্টান্টদের রক্ষণশীল গোঁড়া চিন্তার মধ্যে মিলেনারিয়ানদের প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯০২ সালে। এই সময় বাইবেলের প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য ঘোষণাকারী অন্যান্য গোষ্ঠীদের সহযোগিতায় মিলেনারিয়ানরা ‘আমেরিকান বাইবেল লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘দি ফান্ডামেন্টালস’ নাম দিয়ে পরপর ১২টি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এই প্রথম ফান্ডামেন্টাল’ কথাটি একটি বিশেষ। ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে সাংগঠনিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এই সব পুস্তিকার মধ্যেও তীব্র ঘূণা বা মনোরোগীসুলভ (hysterical) ধর্মীয় আবেগ ততটা ছিল না,-যা দেখা যায় এখনকার হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীদের মধ্যে। তবে এগুলিতে বাইবেলকে পুন্যমূল্যায়ণ বা সমালোচনা করার তৎকালীন তত্ত্ব ও চিন্তাভাবনাগুলিকে আক্রমণ করা হয় এবং প্রিন্সটন সেমিনারীতে পাওয়া যুক্তির সাহায্যে বাইবেলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। বাইবেলের সমালোচনা ও আধুনিকতাকে যুক্তিতর্ক দিয়ে পর্যুদস্ত করার জন্য পূর্বসূরীরা যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এই পুস্তিকাগুলি ছিল তারই সারসংক্ষেপ।
 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই অর্থাৎ ১৯১৪ সালের মধ্যে নায়াগ্রা সম্মেলনের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দের প্রায় সবাই মারা যান। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব পূর্বসূরীদের মত আপন আদর্শে ততটা স্থির ছিলেন না, যতটা ছিলেন মিলেনারিয়ান মতাদর্শকে রক্ষণ করার ক্ষেত্রে আরো জঙ্গী ও আপোষহীন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি সম্পর্কিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রসঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশ পাচ্ছিল। কিন্তু জেমস ব্রুকস বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীদের একত্রিত করে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েকবছরের মধ্যেই নায়াগ্রা সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়া হল এবং তার অল্প কিছু পরেই ‘ওয়াচওয়ার্ড অ্যাণ্ড টুথ’ ও ‘আওয়ার হোপ’ নামক দুটি মিলেনারিয়ান পত্রিকার মধ্যে কাগুজে লড়াই শুরু হয়ে গেল। এর ফলে মিলেনারিয়ান আন্দোলনে স্পষ্ট বিভেদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু তার কাজ চলতেই থাকে।
 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান উদারনীতিবাদ (Liberalism) ও ধর্মীয় সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যাপকতায় সন্ত্রস্ত হয়ে মিলেনারিয়ানরা নিউ ইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলন ও সমাবেশের আয়োজন করেন এবং এর ফলশ্রুতিতে, ১৯১৯ সালে ‘ওয়ার্লডুস। ক্রিশ্চিয়ান ফান্ডামেণ্টলস অ্যাসোসিয়েশন’ (World’s Christian Fundamentals Association) নামে একটি বৃহত্তর ও অধিকতর কার্যকরী সংগঠন সৃষ্টির পথ সুগম হয়। এর ফলে মিলেনারিয়ান আন্দোলন তার মূল চরিত্র না পাল্টে নামটি পাল্টায়। উপরন্তু ১৯১৯-এর এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যে সাংগঠনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তার উপর। পরবর্তী তিরিশ বছর ধরে মিলেনারিয়ানফান্ডামেন্টালিস্ট আন্দোলন দাঁড়িয়ে থাকে। আমেরিকার ফান্ডামেণ্টালিজম মতবাদের তথা ফান্ডামেন্টালিস্টদের সংগঠিত রূপ ছিল এই অ্যাসোসিয়েশন। এখনকার মৌলবাদ-মৌলবাদী কথাগুলির সৃষ্টি ও ব্যবহারের পেছনে এরই অবদান সর্বাধিক।
 
আধুনিকতা (Modernism)-এর সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ লড়াই এই সময় থেকেই বিশেষ মাত্রা পায়। নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের ধর্মীয় ভিত্তিকে বারংবার জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন, আধুনিকতা এবং তার সব ধরনের ‘অশুভদিক’কে (বিশেষত বিবর্তনবাদ-কে) বেঁটিয়ে বিদায় করার আহ্বান জানান। তারা বাস্তবত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে পরিহার করেন এবং সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত বাইবেল সংস্থায় (Bible Institutes-এ) তাঁদের আস্থা স্থাপন করেন। সব মিলিয়ে যেন মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইয়োরোপের ধর্মীয় কুসংস্কারকে বিংশশতাব্দীতে আমেরিকার বুকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চলতে থাকে। (হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীরা ভারত-বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে বিংশশতাব্দীর শেষ পাদে যা করতে চাইছে।)
 
তখন আমেরিকায় ‘ফেডারেল কাউন্সিল অব চার্চেস অব দি ক্রাইস্ট’ (The Federa Council of Churches of the Christ) নামক ধর্মীয় সংগঠন ধর্মীয় ক্ষেত্রে ঐক্য, মিলন ও সহযোগিতার কথা বলছিল। এই নব্য ফান্ডামেন্টালিস্টরা তীব্রভাবে তারও বিরোধিতা করে এবং এই ধরনের আধ্যাত্মিক অবক্ষয়।’ চলতে থাকলে আলাদা হয়ে যাওয়ার হুমকি দিতে থাকে। (ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা যেমন এই ধরনের মানসিকতা থেকে মুসলিম তোষণ’-এর অভিযোগ এনে প্রতিক্রিয়াশীল। লড়াই চালাতে চাইছে)। কিন্তু মিনিয়াপলিস-এর ‘ফাস্ট ব্যাপটিস্ট চার্চ’-এর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা (প্যাস্টর; pastor) ডব্লু. বি. রিলে (W. B. Riley), ব্যাপটিস্ট প্যাস্টর ও ইভানজেলিস্ট এ.সি. ডিক্সন (A. C. Dixon) এবং মুডি বাইবেল ইনস্টিটিউট’ (Moody Bible Institute)-এর অধ্যক্ষ, ইভানজেলিস্ট আর. এ. টোরি (R. A. Torrey)-র মত ব্যক্তিবর্গের জঙ্গী নেতৃত্ব সত্ত্বেও তাদের এই সংস্থার কখনোই এমন কিছু উন্নতি ঘটে নি।
 
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকায় গির্জা তথা ধর্মীয় পরিমণ্ডলে উদারপন্থী ব্যক্তির সংখ্যা ছিল নগণ্য,-তাদের অধিকাংশই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় বা রোমান ক্যাথলিক যাজকদের শিক্ষণকেন্দ্ৰ (সেমিনারি)-র অধ্যাপক। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে উন্নত সমালোচনাকে তাঁরা গ্রহণ করতেন। কিন্তু অধিকাংশ যাজক সম্প্রদায় ও ঐ ধরনের ব্যক্তিরা ব্যাপারটিকে আশঙ্কার চোখে দেখতেন। নব্য শিক্ষাকে খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে যেখানে আইনী ব্যবস্থা ছিল (যেমন প্রেসবিটরিয়ানদের মধ্যে), সেখানেই উদারপন্থীদের নতুন চিন্তাভাবনাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যেমন ঘটেছে বাইবেলীয় ঈশ্বরতাত্ত্বিক চার্লস এ. ব্রিগস (Charlis A. Briggs; Str8 S-SSSO) এর ক্ষেত্রে। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই এ ধরনের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কৌশলগুলি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়, কারণ বাইবেলকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার (তথা সমালোচনা করার) ব্যাপারটি মাথা চাড়া দিতে থাকে এবং নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা সেমিনারিগুলি উদারনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে থাকে। ১৯১৪ সালের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের এপিস্কোপাল, মেথডিস্ট, ব্যাপটিস্ট ও প্রেসবিটেরিয়ানদের মত কিছু খৃস্টীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উদারনীতি (Liberalism)-এর অনেক সমর্থক সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই নতুন চিন্তাভাবনাকে প্রতিহত করার ও তার বিস্তার আটকানোর জন্য লড়াই করার অবস্থা তখন আর প্রায় ছিল না। ১৯২০ সাল নাগাদ শুধু এটুকু দেখা আর বাকি ছিল যে, এই উদারনৈতিকদের (Liberalsদের) সম্প্রদায় থেকে বের করা যায কিনা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরোকার সময়ে আমেরিকানদের মধ্যে চরম অস্থিরতা, নৈরাশ্য, অসংযমী আচার-আচরণ ও সামাজিক নানা ধরনের ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের ফলে উদ্বেগ, হতাশা ও দুশ্চিস্তা আমেরিকাবাসীর বৃহদংশের মধ্যে ছড়িয়ে ‘ পড়ে। যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যাপারটি এ চিত্রকে পাল্টাতে পারে নি। ইতিমধ্যেই আমেরিকায়, বিশেষত শ্রমিকদের মধ্যে, সাম্যবাদী মতাদর্শের প্রসার ঘটেছে এবং কম্যুনিষ্ট সংগঠন তৈরী হয়েছে। বিগত শতাব্দীতে বির্বতনবাদ যেমন প্রধানত ধর্মের ভিত্তি মূলে নাড়া দিয়েছিল, এখন এই সাম্যবাদ ধর্মীয়-সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে উপস্থিত হয়। এসবের প্রতিক্রিয়ায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়গুলিতেও ধর্মোপদেশের মধ্যে কম্যুনিজমএর প্রতি ভয়, শ্রমিক অসন্তোষ ও খুনজখম মারামারির ব্যাপারগুলি স্থান পায় ও আলোচিত হতে থাকে। আমেরিকার দ্বারা লীগ অব নেশনস ত্যাগ করার ঘটনায় এটি বোঝা যায় যে, বহু আমেরিকানই নতুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পছন্দ করে নি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের ফান্ডামেন্টালিস্টদের মধ্যেও এই মানসিকতা ও কম্যুনিজম-এর প্রতি ভীতি ইত্যাদি অন্যান্য অনেকেরই মত ছিলই, কিন্তু ছিল আরো তীব্রভাবে, এবং ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিগত বিচ্ছিন্নতাবোধও।
 
তবে প্রোটেস্টাণ্ট সংগঠনের সর্বত্রই যে ১৯২০-এর সময় এ ধরনের বিতর্ক, বিরোধ বা দোদুল্যমানতা ছিল তা নয়। সাউদার্ন ব্যাপটিস্টদের মত কোন কোন সংস্থায় আধুনিকতা (Modernism) স্পষ্টভাবে দেখা দেয় নি; মেথডিস্ট ও এপিস্কোপাল চার্চে এর অনেক প্রভাব ছিল। কিন্তু পুরনোর সঙ্গে নতুনের দ্বন্দ্ব যথেষ্ট সংগঠিত হয় নি, সংস্থাগুলির সরকারী গঠনতন্ত্রও ব্যাপারটিকে সামনাসামনি আনার মত প্রচার চালানোর উপযোগী ছিল না।
 
কিন্তু নর্দার্ন ব্যাপটিস্ট সহ উত্তরাঞ্চলের রাজ্যগুলির প্রেসবিটেরিয়ানদের মধ্যে গুরুতর বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের মধ্যে যে রক্ষণশীল গোঁড়া অংশে প্রিন্সটন সেমিনারীর ঈশ্বরতাত্ত্বিক অবস্থান প্রতিফলিত হয়, তারা মিলেনারিয়ানদের সাহায্য নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ রচনা করে এবং ১৯১০-এ যে অবস্থান ছিল তার সঙ্গে যুক্ত করে, তারা বলে যে, খৃস্টান ধর্মে বিশ্বাসী হতে হলে কয়েকটি দিককে অবশ্যই গ্ৰহণ করতে ও বিশ্বাস করতে হবে, যেমন, (১) বাইবেলের অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব ও প্রেরণা, (২) কুমারী মায়ের থেকে খৃস্টের জন্ম (the virgin birth of Christ), (3) প্রায়শ্চিত্ত করা ও এর জন্য অনুষ্ঠানাদি, (8) পুনরভ্যুত্থান (resurrection) এবং (৫) যিশু খৃস্টের ঐশ্বরিক অলৌকিক ক্ষমতা। ১৯২২ সালে হ্যাঁরি এমারসন ফসডিক (Harry Emerson Fosdick) নামে নিউইয়র্কের এক যাজক মডানিস্ট-দের একজন প্রথম সারির মুখপাত্র হয়ে ওঠেন এবং বিদেশে মিশনারীদের কর্মক্ষেত্রে মিলেনারিয়ানদের কিছু কাজকর্মের (যেমন ফান্ডামেন্টালিস্টরা কি জিতবো?’ এমন শিরোনামে ধর্মোপদেশ দেওয়া) প্রতিবাদ করেন। কিন্তু এর ফলে ‘ফাস্ট প্রেসবিটেরিয়ান চর্চ’-এর প্যাস্টর-এর পদ থেকে, ব্যাপটিস্ট ফসডিক-কে রক্ষণশীলেরা ও মিলেনারিয়ানরা মিলে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
 
জেমস এইচ ব্রুকস (James H. Brookes)-এর মত মিলেনারিয়ানরা এবং প্রিন্সটন অধ্যাপক জে. গ্রেশাম মাচেন (J. Gresham Machen)-এর মত রক্ষণশীলেরা চাইছিলেন যাতে উদারনৈতিকেরা নিজে থেকেই সরে যায়। আমেরিকার প্রেসবিটরিয়ান চার্চের মধ্যে বিভাজন আটকাতে সমঝোতার একটি রাস্তা বের করানোর জন্য ১৫ জনের একটি কমিশন (Commission of Fifteen) নিয়োগ করা হয়। এঁরা রিপোর্ট দেন যে, প্রেসবিটেরিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে মতামতের বৈচিত্র্যাকে সহ্য করার ঐতিহ্য রয়েছে। খৃস্টান ধর্মে বিশ্বাসের অত্যাবশ্যক দিকগুলি কি তা ঠিক করার জন্য সাধারণ সভাকে ক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারটিকেও তারা বাতিল কদের দেন। এর ফলে প্রধানত রক্ষণশীলদের অবস্থান ধ্বসে যায়। নর্দার্ন ব্যাপটিস্টদের অভ্যস্তরীণ বিরোধ তাদের বাৎসরিক সভায় প্রকাশ্যে আসে, যেটি একটি দলীয় রাজনৈতিক সভার চেহারা নিয়েছিল। ১৯২০ সাল থেকে ব্যাপটিস্টদের একটি গোষ্ঠী নিজেদের ‘ন্যাশন্যাল ফেডারেশান অব ফান্ডামেন্টালিস্টস’ (National Federation of Fundamentalists; মৌলবাদীদের জাতীয় জোট) নামে অভিহিত করতে থাকে। মৌল ব্যাপটিস্ট নীতির উপর এরা বাৎসরিক সভার অব্যবহিত পূর্বে সম্মেলনের আয়োজন করতে শুরু করে, এইভাবে সংগঠিত হয়ে নিজেদের মতামতকে তারা মূল সভায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। ‘ন্যাশনাল ফেডারেশান অব ফান্ডামেন্টালিস্টস’-এর এ ধরনের কৌশল খুব একটা কাজ দেয় নি; এর ফলে আরো কিছু জঙ্গী ব্যাপটিস্ট ফান্ডামেন্টালিস্টরা ‘ব্যাপটিস্ট বাইবিল ইউনিয়ন।’ (Baptist Bible Union) গড়ে তোলে। কিন্তু প্রেসবিটেরিয়ানদের মত ব্যাপটিস্টদের মধ্যেও ফান্ডামেন্টালিস্টদের নিজেদের মধ্যেকার বিভাজন তাদের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
 
ক্রমবর্ধমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ তথা ধর্মের ক্রমশঃ প্রমাণিত অপ্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদির ফলে রক্ষণশীল গোঁড়ারা শামুকের মত মৌলবাদের আশ্রয় নেয় অর্থাৎ নতুনকে জোর করে অস্বীকার করে প্রাচীনকে আঁকড়ে রাখে। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা ছিল। এরই আধুনিক সাংগঠনিক রূপ। ইয়োরোপের মধ্যযুগে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে এমন বাইবেল-বিরোধী। কিন্তু সত্যি কথা বলার জন্য কত মনীষী ও বিজ্ঞানীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, এমনকি হত্যাও করা হয়েছে। একই মানসিকতা থেকে এই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ১৯২০ সাল নাগাদ, বিবর্তনবাদ (evolution)-এর শিক্ষায় রুষ্ট হয়ে, বাইবেলের সমালোচনায় উদ্বিগ্ন হয়ে, আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্টরা জঙ্গী আন্দোলন শুরু করে। তারা মনে করত যে, চার্লস ডারউইন যে বিবর্তনবাদের তত্ত্ব উপস্থিত করেছেন তার সঙ্গে বাইবেলের শিক্ষা খাপ খায় না, তাই তারা বিবর্তনবাদের বিরোধিতা করে। কিন্তু মজার ব্যাপার ও লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যাঁরাই বিবর্তনবাদের বিরোধিতা করতেন তারা সবাই যে ফান্ডামেন্টালিস্ট ছিলেন তা নয়। বিবর্তনবাদ-বিরোধী ‘যোদ্ধারা’ সরকারী স্কুলে বিবর্তনবাদ না পড়ানোর জন্য আইনপ্রণয়ন করতে প্রচার চালায়। টেনেসি (Tennesse)-তে এ ধরনের আইনও হয়ে যায়। অবশ্য পরে, ১৯২৫-এ, আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU)-এর উদ্যোগে আদালতে এটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। ছোট্ট শহর ডেটন’ (Dayton)-এর জন টি. স্কোপিস (John T. Scopes) নামে এক বিজ্ঞান-শিক্ষক বিবর্তনবাদ পড়ানোর অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হিসেবে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসেন। ঐ দশকের দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, প্রেসবিটেরিয়ান ফান্ডামেন্টালিস্ট উইলিয়াম জেনিংস (William Jennings) ও বিখ্যাত মামলাগুলিতে প্রতিবাদী পক্ষের নামকরা উকিল ক্ল্যারেন্স ড্যারো (Clarence Darrow) ঐ সময় এই মামলায় সংবাদের শিরোনামে আসেন; প্রথম জনের ভূমিকা ছিল মামলা রুজু করে বাদী পক্ষের সহকারী অ্যাটর্নির এবং দ্বিতীয় জন ছিলেন প্রতিবাদী পক্ষের অ্যাটর্নি।
 
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আমেরিকা থেকে বহুদূরে, ভারতীয় ভূখণ্ডেও মোটামুটি এই সময়কালেই হিন্দু মৌলবাদেরও তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কুড়ির দশকের মাঝামাঝি, একদা ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামী বীর সাভারকর হিন্দুত্বের প্রধান তাত্ত্বিক প্রবক্তা ও হিন্দু মহাসভার নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯২৩এ প্রকাশিত হয় তঁর ‘হিন্দুত্ব! হিন্দু কে?’ পুস্তিকাটি। আর ১৯২৫-এর বিজয়া দশমীর দিন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আর এস এস) প্রতিষ্ঠা করেন ডঃ হেডগেওয়ার ও তার অন্য পাঁচজন বন্ধু। উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বি জে পি), বজরং দল, ভারতীয় মজদুর সংঘ বা অখিল ভারতীয় বিদ্যাথী পরিষদ হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণার মূল চালিকাশক্তি নয়; এর মূল চালিকাশক্তি এই আর এস এস-ই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরোকার অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রতিক্রিয়া—এগুলি এক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করেছিল।
 
অন্যদিকে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা সংঘাতের জায়গা থেকে সরে আসে এবং জাতীয় ক্ষেত্রেও তারা আর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকে না। এই সময়কালে যান্ত্রিকভাবে ও কঠোরভাবে সংযত নৈতিক জীবনযাপনকে একটি দার্শনিক ভিত্তি দেওয়া হয়। ভোগসর্বস্বতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, বিলাসব্যসন থেকে দূরে থাকার, এমন কি নাচগান করা, সিনেমা নাটক দেখা বা মদ্যপানধূমপান করা ইত্যাদির বিরুদ্ধেও তাঁরা তীব্র প্রচার শুরু করেন। এই সময়েই আধুনিক ফান্ডামেন্টালিজম-এর প্রতিষ্ঠানিক রূপ বিকশিত হতে থাকে, (যা এখনো আমেরিকায় নানাভাবে এবং ভালভাবেই আছে)। কিছু ফান্ডামেন্টালিস্ট তাদের সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন যেমন জেমস জে মাচেন (James J. Machen)-এর নেতৃত্বে কিছু প্রেসবিটেরিয়ান ‘প্রেসবিটেরিয়ান চার্চ ইন আমেরিকা’ বা ‘নির্দান ব্যাপটিস্ট কনভেনশান’ ছেড়ে কিছু ব্যাপটিস্ট ‘জেনারেল অ্যাসোসিয়েশন অব রেগুলার ব্যাপটিস্টস’ গড়ে তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ ফান্ডামেন্টালিস্টরাই এক একটি ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠীতে জড়ো হন, যেগুলি সর্বতোভাবে বাইবেলের আক্ষরিক অনুসরণে এবং মিলেনারিয়ানের পূর্ববর্তী অবস্থানের প্রতি বিশ্বস্ত, যেমন ‘খুষ্টান অ্যান্ড মিশনারী অ্যালয়েন্স’, ‘প্লাইমাউথ বৃন্দ্রেন’, ‘ইভানজেলিক্যাল ফ্রি চার্চ কিংবা ঐ সময় গড়ে ওঠা অজস্র স্বাধীন ‘বাইবেল চার্চ’ ও উপাসনাকেন্দ্রের কোন কোনটিতে।
 
বর্তমানে আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিজম এইভাবে রূপান্তরের পর নানান ক্ষেত্রে টিকে আছে। এই আধুনিক ফান্ডামেন্টালিজম (modern Fundamentalism) তার সাংগঠনিক রূপের অনেকটাই ‘বাইবেল ইনস্টিটিউট’ ও ‘বাইবেল কলেজগুলি থেকে পেয়েছে। চিকাগোর ‘মুডি বাইবেল ইনস্টিটিউট’ (Moody Bible Institute) বা লস এঞ্জেলস-এর বাইবেল ইনস্টিটিউট’-এর মত এ ধরনের অনেক শিক্ষাকেন্দ্ৰে শুধু ছাত্রদের পড়ানোই হয় না, তারা তাদের নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশ করে, নিজেদের বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচার চালায়, সভা-সম্মেলনের আয়োজন করে এবং সংগঠন বাড়ানোর জন্য বক্তাদের মাইনে পাওয়া কৰ্মচারী হিসেবেও রাখে। মূল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ কেন্দ্রের মতই তারা সংগঠন চালায় এবং এইভাবে প্রায় সমমনোভাবাপন্ন কিন্তু পরস্পরবিচ্ছিন্ন সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যোগসূত্র বজায় রাখে। চিকাগোর শহরতলী এলাকায় এই ধরনের জ্ঞানচর্চার নামকরা কেন্দ্ৰ, হুইটন কলেজ, দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে কাজ করেছে।
 
আমেরিকার সমাজের ব্যবসায়িক ও পেশাগত বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি, ও প্রায় সমকক্ষ হিসেবে, ফান্ডামেন্টালিস্টদেরও বহু সংস্থা রয়েছে। ছাত্র, নার্স, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ, সমাজকর্মী, ঐতিহাসিক, ব্যবসায়ী ও অন্যান্যরা তাঁদের নিজস্ব স্বাৰ্থবাহী বা প্ৰশিক্ষণের জন্য গড়া এ ধরনের আপনি আপন সংস্থায় যোগ দিতে পারেন। বৃহৎ প্রোটেস্টান্ট সংগঠন ও রোমান ক্যাথলিকদের মত, শত শত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এঁদেরও নিজস্ব ‘ক্যাম্পাস ক্রুসেড ফর ক্রাইস্ট’ ও ‘ইন্টার-ভার্সিটি ক্রিস্টিয়ান ফেলোশিপ’,ইত্যাদি রয়েছে। এদেরই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘আমেরিকান সায়েন্টিস্ট অ্যাফিলিয়েশন’ নিয়মিত আলোচনাসভায় বসেন এবং একটি পত্রিকা প্ৰকাশ করেন; এই পত্রিকায় বিজ্ঞানের সঙ্গে বাইবেল ও খৃস্টান বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী কিভাবে একসঙ্গে পাশাপাশি মানিয়ে থাকতে পারে তার উপর জোর দেওয়া হয়।
 
প্রোটেস্টান্ট মতের বৃহৎ সংস্থাদির সমকক্ষ হিসেবে ফান্ডামেন্টালিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত ‘অ্যামেরিকান কাউন্সিল অব ক্রিস্টিয়ান চার্চেস’ (ACCC; প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৪১) ও ‘ন্যাশন্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইভানজেলিক্যিাল’ (NAE; প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৪২) রয়েছে। ১৯৬৯ অবিদ প্রথমোক্ত সংস্থাটি বাস্তবত ক্যাল ম্যাকআনটায়ার (Carl McIntire) নামে একজন ব্যক্তিরই মুখপাত্র ছিল। ন্যাশন্যাল কাউন্সিল অব চার্চেস-এর মত বৃহত্তর খৃস্টান সংগঠনের বিরুদ্ধে এবং আমেরিকাকে ধ্বংস করার জন্য কম্যুনিস্ট, ষড়যন্ত্রের বিপদের বিরুেদ্ধে ইনি প্রচার চালাতেন। দ্বিতীয়োক্ত সংস্থাটি তার সদস্যদের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে কিন্তু নিজস্ব কোন কর্মসূচীর রূপায়ণ করে না।
 
যুদ্ধের পরবর্তী দশকগুলিতে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, ১৯৫০-এর ধর্মীয় পুনরভ্যুত্থান এবং কম্যুনিস্টরা সব গণ্ডগোল করে দেবে এমন ভয় ও অভিযোগ–এই বিষয়গুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্ট ও ইভানজেলিক্যাল চার্চের উপর সবচেয়ে বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। এই সময়ে ফান্ডামেন্টালিস্টদের নতুন এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, বিখ্যাত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিটি যথাসম্ভব ছিলেন ইভানজেলিস্ট বিলি গ্রাহাম (Billy Graham) (জন্ম-৭.১১.১৮; ভিন্ন নাম-উইলিয়াম ফ্র্যাংলিন গ্রাহাম)।
 
১৯৫০ সাল নাগাদ ইনি ছিলেন ফান্ডামেন্টালিস্টদের প্রধান মুখপাত্র। ফান্ডামেন্টালিস্ট তথা ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে শাসকশ্রেণীর আঁতাতের জুলন্ত উদাহরণ ছিলেন ইনি। ১৯৪৯ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যাঁরি এস. ট্রম্যান। এঁকে প্রথম হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ করে আনেন। পরে সেখানে তার অবাধ যাতায়াত শুরু হয়। ডুইট ডি, আইসেনহাওয়ার, লিন্ডন জনসন ও রিচার্ড এস. নিক্সনের মত আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টদের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু এবং গলফ খেলার সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন এই বিলি গ্রাহাম। জোনস কলেজে (ক্লিভল্যান্ড, টেনেসি) ও ফ্লোরিডা বাইবেল ইনস্টিটিউট (ট্যাম্পার নিকটবতী) নামে ফান্ডামেন্টালিস্টদের দুটি প্রতিষ্ঠানে ইনি পড়াশুনা করেন এবং শেষেরটি থেকে ১৯৪০-এ স্নাতক হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইলিনয়েসের হুইটন কলেজ থেকে নৃতত্ত্বে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্রুসেড নাম দিয়ে বহু প্রচারমূলক ভ্ৰমণ করার পাশাপাশি, ‘বিলি গ্রাহাম ইভানজেলিস্টিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্ৰতিষ্ঠা করেন। নিজের ধর্মীয় প্রচারগুলিকে ‘ডিসিসান’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করে ও অন্যান্য লেখাপত্রের মধ্য দিয়ে প্রচার করেন।
 
কম্যুনিজমের ভয় এই ১৯৫০-এর সময়কালে আমেরিকায় একটি বিরাট গণ বিতর্ক ও বাদ প্রতিবাদের বিষয় ছিল। এর জন্য বহু সংস্থায় ভাঙ্গনও ঘটে গেছে। আমেরিকার শাসকশ্রেণী ও ফান্ডামেন্টালিস্ট-উভয়ের কাছেই এই কমিউনিজম ছিল প্রধান শত্রু ও প্রবল ভীতিপ্রদ, প্রতিরোধযোগ্য ব্যাপার। কম্যুনিজমের প্রতি এই ভয়ের ব্যাপারটার সঙ্গে ফান্ডামেন্টালিস্টদের চিরাচরিত শত্রুর (অর্থাৎ বাইবেলের সমালোচনা ও বিবর্তনবাদ) চরিত্রগত কিছু মিল রয়েছে, যেমন এটি (কমিউনিজম) বাইরে থেকে এসেছে, এমনভাবে তা ছড়িয়ে পড়ছে যে মনে হচ্ছে তাকে আটকানো যাবে না। আর সবকিছু ওলোট পালট করে দেবে এবং সেটি খৃস্টধর্মকে বেশ হতমোনই করছে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকালের এই কম্যুনিস্ট-বিরোধী ধৰ্মযুদ্ধ যেন ১৯২০এর বির্বতনবাদ-বিরোধী ধর্মযুদ্ধেরই হুবহু পুনরাবৃত্তি।
 
সত্তর-এর দশকের শেষের দিকে বিবর্তনবাদ নিয়ে বিতর্ক আবার মাথা চাড়া দেয়। এই সময়কালের মধ্যে বিবর্তনবাদ একটি বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গৃহীত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু তথাকথিত সৃষ্টিবাদীরা (Creationists) স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে বাইবেলের সৃষ্টি সৃষ্টি কাহিনী (Biblical Creation account)-কে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী জানাতে থাকে এবং তার জন্য প্রচার আন্দোলন চালায়। রক্ষণশীল ক্ষেত্রগুলিতে এর ফলে ফান্ডামেন্টালিস্ট সৃষ্টিবাদীরা কিছু জমি খুঁজে যায়। নিজের ছেলেমেয়েদের কি পড়ানো হবে বা হচ্ছে, তা ঠিক করার অধিকার বাবা-মায়েরও থাকা উচিত। কিনা,—এ ধরনের বৃহত্তর বিতর্কও এর ফলে সৃষ্টি হয়।
 
আর ৭০-এর দশকের শেষের দিকের এই সময়কালেই তথাকথিত মরাল মেজরিটি, (Moral Majority) নামে ফান্ডামেন্টালিস্ট নাগরিকদের একটি সংস্থা ধৰ্মযুদ্ধে নামে। এর নেতৃত্ব দেন ভার্জিনিয়ার ব্যাপটিস্ট যাজক জেরি ফ্যালওয়েল (Jerry Falwell)। বাইবেলের কর্তৃত্বের প্রতি আগেকার আপোষহীন মানসিকতার সঙ্গে গর্ভপাত, সমলিঙ্গী যৌন অধিকার, সমানাধিকার সম্পর্কিত আইনের সংশোধন—এ সবের বিরুদ্ধে এবং স্কুলে প্রার্থনাসভার আয়োজন করা, প্রতিরক্ষণ খাতে ব্যয় বাড়ানো, কম্যুনিস্ট বিরোধী বৈদেশিক নীতিকে শক্তিশালী করা, —এসবের স্বপক্ষে এই ফান্ডামেন্টালিস্টরা আন্দোলন গড়ে তোলে। মৌলবাদী বলতে এখন যাদের বোঝানো হচ্ছে, তাদের সঙ্গে এই মরাল মেজরিটি-র সাদৃশ্যই সবচেয়ে সাম্প্রতিক। ভারতের হিন্দুমৌলবাদীরা বা কিছু ইসলামী দেশের মুসলিম মৌলবাদীরা প্রায় হুবহু একই ধরনের দাবী এখন জানাচ্ছে-হিন্দু-মুসলিম সবার জন্য একই আইন থেকে কঠোর কম্যুনিষ্ট বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী আদি।
 
এখনো আমেরিকায় টিকে থাকা ফান্ডামেন্টালিস্টদের বিশ্বাস সেই নায়াগ্রা সম্মেলনের সময় থেকে এমন কিছু পাল্টীয় নি। এখনকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা ধূমপান বা মদ্যপান না করা, নাটকে অংশগ্ৰহণ না করা জাতীয় নানা ধরনের আচরণবিধি অনুসরণ করেন। এ সম্পর্কে গোঁড়ার দিকেই বলা হয়েছে। এটিও উল্লেখ্য যে, সম্প্রতিকালে আধুনিক ফান্ডামেন্টালিজমের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজনাকর আধ্যাত্মিক তথা ঈশ্বরতাত্ত্বিক (theological) আলোড়ন ঘটে কার্ল বার্থ (Karl Barth)-এর ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কিত ব্যাখ্যায়। তিনি বাইবেলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বকে কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এবং এটি ফান্ডামেন্টালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রতিফলন বলে অনেকে মনে করেন।
 
[কার্লবাৰ্থ (জন্ম সুইজারল্যান্ডের বাসেল-এ, ১০ই মে, ১৮৮৬; মৃত্যু-৯ বা ১০ই ডিসেম্বর, ১৯৬৮)-একদিকে নাৎসি-বিরোধী ও জাতীয় সমাজতন্ত্র’ (National Socialism)-বিরোধী কাজের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন, অন্যদিকে ছিলেন প্রোটেস্টান্ট চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর উদার ঈশ্বরতত্ত্ব (liberal theology) ঈশ্বরকে মানুষের মত, মানুষের কাছাকাছি এনে (anthropocentrism) হাজির করছিল। এর বিরুদ্ধে কার্ল বার্থ ঈশ্বরের পরিপূর্ণ অনন্যতা (Wholy Otherness of God)–র উপর জোর দেন। সুইজারল্যান্ড থেকে ইনি আমেরিকায় যান। ১৯৬২ সালে। চার্চ ডগম্যাটিকস’ নামে এর লেখা সুবৃহৎ গ্রন্থ আছে। বাইবেল সহ যিশুখৃস্ট সম্পর্কে কোন ধরনের দ্বিধা, অবিশ্বাস, সমালোচনা বা তর্কবিতর্ককে পরিপূর্ণভাবে পরিহার করে তাঁর দ্বিধাহীন ঘোষণা ছিল,–‘…Jesus Christ, as He is attested for us in Holy Scripture, is the one Word of God, which we have to hear and which we have to trust and obey in life and in death.’]
 
আমেরিকায় সৃষ্টি হওয়া ও টিকে থাকা এই ফান্ডামেন্টালিজম ও ফান্ডামেন্টালিস্টদের মানসিকতা ও ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকার কারণেই আমাদের দেশে সম্প্রতি মৌলবাদ ও মৌলবাদীর মত ‘আধুনিক পরিভাষা’-র সৃষ্টি হয়েছে। এবং সাম্প্রতিক মৌলবাদীরা ফান্ডামেন্টালিজমের আধুনিকীকরণ করেছে। হিংসা, জঙ্গীপনা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আকাঙক্ষা-এগুলিকে তার সঙ্গে সংযুক্ত করে। কথাগুলির তাৎপর্য শুধু আমেরিকা বা ভারত বলে নয়, আন্তর্জাতিক ভাবেই তার সাধারণীকরণ ঘটেছে, পেয়েছে কিছু নতুনতর মাত্রাও।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত