মৌলবাদের উৎস সন্ধানে (পর্ব-৩)

মৌলবাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
 
Fundamentalis ও মৌলবাদের অন্যতম দুটি আভিধানিক অর্থের উল্লেখ আগেই করা হয়েছে, এগুলি হল যথাক্রমে, ‘বাইবেল বা অন্য ধর্মশাস্ত্রের বিজ্ঞানবিরুদ্ধ উক্তিতেও অন্ধবিশ্বাস’ এবং ‘ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলে জাত সংকীর্ণ মতবাদ’। এ ধরনের সংজ্ঞা থেকে মৌলবাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি দিক স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যেমন তা ধর্মের সঙ্গে (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের সঙ্গে) সংশ্লিষ্ট, ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি তার সম্পৃক্ত দিক, এটি একটি বিজ্ঞানবিরুদ্ধ ও সংকীর্ণ চিন্তা। স্পষ্টতঃই মানুষের চেতনা ও সমাজের উত্তরণের বিরোধী এটি এবং যাদের মধ্যে এই অন্ধবিশ্বাস, গোঁড়ামি, বিজ্ঞানবিরুদ্ধতা ও সংকীর্ণতা দেখা যায়, তাদেরই সাধারণভাবে মৌলবাদী বলা যায়।
 
Fundamental কথাটিরও অর্থ ‘আদিম’ বা ‘মূল’। মৌলবাদ কথার ভাবগত অর্থ তাই মূল বা শিকড়ে ফিরে যাওয়ার তত্ত্ব। কথাটি এখন সাধারণভাবে ব্যাপক ব্যবহৃত হতে হতে একটি নিন্দাসূচক কথায় পরিণত হলেও, এই শিকড়ে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা মানুষের কমবেশি থাকেই। অ্যালেক্স হেলির বিখ্যাত বই ‘The Root’ (বাংলা অনুবাদ-‘শেকড়ের সন্ধানে’) এই প্রবণতারই ফসল। কিন্তু তা মৌলবাদ নয়। নিজের অতীতকে জানা, নিজ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রথমদিকের ইতিহাস জানা তথা নিজের উৎস সম্পর্কে আগ্রহ বরং একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও মানবিক ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু যখন তা তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ঐ আদিম প্রাচীন মূল দিকেই ফিরে যাওয়ার কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ও করানো হয় অর্থাৎ পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতি জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঐ মৌলিক আদিমতার পরিমার্জনা ও রূপান্তরকে অস্বীকার করা হয় তখন তা মৌলবাদ বা মৌলবাদী তত্ত্বে পরিণত হয়। এর সঙ্গে পরমত-অসহিষ্ণুতা, নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবা, এই তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সংকীর্ণস্বার্থ সিদ্ধি করা এবং তার জন্য অনৈতিহাসিক মিথ্যাচারের সঙ্গে হিংস্ৰ উগ্ৰ অন্ধ আচরণ করা-ইত্যাদিও মিশে থাকে। এটি অবশ্যই মানুষ ও তার সভ্যতার বিরোধী। এটি প্রগতি ও বিকাশের পথ রোধ করে। বাইবেল ও যিশুকে অভ্রান্ত ধরা, কোরাণকে হুবহু অনুসরণ করার কথা ভাবা, হিন্দুধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভেবে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা—ইত্যাদি এরই ফসল। এইভাবে বিশেষ কোন প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মকে কেন্দ্র করে সাধারণতঃ মৌলবাদ তথা ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টি হলেও, কোন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তত্ত্ব কিংবা বিশেষ কোন মতাদর্শে অন্ধ গোঁড়া উগ্ৰ বিশ্বাসও মৌলবাদী মানসিকতারই বিশেষ রূপ।
 
 
আমেরিকায় প্রতিষ্ঠানিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া Fundamentalism-এর পূর্ববর্তী সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে এর কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকৰ্ষিত হয়। যেমন
 
(১) এটি অবশ্যই ধর্মের সঙ্গে সম্পূক্তভাবে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানিক একটি ধর্মে (এখানে খৃস্টধর্মে) বিশ্বাস তার প্রাথমিক ভিত্তি। তাকে আরো গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করাই তার লক্ষ্য।
 
(২) এটি আসল প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থকে (তথা মৌলিক প্রাথমিক দিকগুলিকে) অপরিবর্তনীয়, সমালোচনার উদ্ধেৰ্ব, সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী হিসেবে মনে করে এবং এই মনে করার মধ্যে কোন আপোষ করতে সে প্রস্তুত নয়। এ কারণে তার কাজের মধ্যেও ধর্মান্ধিতার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং Fundamentalism বা মৌলবাদ নামটি এ কারণেই হয়েছে।
 
(৩) কোন নতুন ধরনের বৈজ্ঞানিক চিন্তা, —তা সে বির্বতনবাদ থেকে সাম্যবাদ বা কম্যুনিজম যাই-ই হোক না কেন, যা ঐ ধর্ম তথা ধর্মগ্রন্থের ভিত্তিমূলে নাড়া দিতে চায়, তার প্রতিক্রিয়ায় তার জন্ম ও তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে সে কঁাপিয়ে পড়ে। এক কথায় যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেই তার সৃষ্টি ও টিকে থাকা। এটি চূড়ান্তভাবে অবৈজ্ঞানিক ও প্রতিক্রিয়াশীল।
 
 
(৪) ধর্মীয় ক্ষেত্রেও উদারনীতি, আধুনিকতা ও ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি সহিষ্ণুতা-এ সবেরও সেটি বিরোধী। তাই ধর্মীয় সংকীর্ণতা তার কাজকর্মের মধ্যে প্রকাশ পায়।
 
(৫) কিছু প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের সৃষ্টি তথা ধর্মীয় আন্দোলন মানুষের সমাজইতিহাসের বিশেষ পর্যায়ে তার অগ্রগমন ও সংস্কারের পথ সুগম করলেও ফান্ডামেন্টালিজম-এর ক্রিয়াকান্ডের মধ্যে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার, এমনকি পশ্চাদগমনের আকাঙক্ষারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
 
এখন থেকে আড়াই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ বা জৈনধর্মের, দু’হাজার বছর আগে খৃস্টধর্মের, দেড়হাজার বছর আগে ইসলাম ধর্মের বা পাঁচশ’ বছর আগে শিখধর্মের সৃষ্টি, এমনকি হিন্দুধর্মের মধ্যে ব্রাহ্মধর্ম, ভক্তি আন্দোলন বা বৈষ্ণবধর্ম ইত্যাদির সৃষ্টি এবং খৃস্টধর্মে প্রোটেস্টান্টিজমের জন্ম ইত্যাদির মধ্যে তখনকার ধর্মীয় আবিলতা, সামাজিক অবক্ষয় ও অনাচার, সামাজিক পীড়ন ও শোষণ, ইত্যাদির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই রূপ পেয়েছিল। ঈশ্বর বিশ্বাস বা বিশেষ ধর্মীয় আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে অবলম্বন করে বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার নেতৃত্ব দিলেও, ধর্ম ও সমাজের প্রসঙ্গে সেগুলির ইতিবাচক কিছু সংস্কারমূলক দিকও ছিল। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে এই যে ফান্ডামেন্টালিজম নামে সংগঠিত ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যার অবশেষ এখনো আছে এবং ভারতসহ নানা দেশে ভিন্ন পরিবেশে যা মূলত একই চরিত্র নিয়ে আরো উগ্রভাবে মাথা চাড়া দিয়েছে, তার মধ্যে ঐ ধরনের কোন ইতিবাচক দিক আবিষ্কার করা দুরূহ। বরং তা প্রগতিশীল সংস্কারইচ্ছার বা বৈপ্লবিক প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে তার প্রতিক্রিয়াতেই জন্মলাভ করছে।
 
 
(৬) দ্বিধাহীন বিশ্বাস ও প্রশ্নহীন আনুগত্য তথা চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদ তার অন্যতম সম্পূক্ত দিক। প্রাচীন ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মগ্রন্থগুলিকে নিজেরা তো প্রশ্ন করেই না, অন্য কেউ তার চেষ্টা করলেও তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করতে থাকে। কেন পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতি ও উন্নততর জ্ঞানের আলোয় তাদের বিচার করা যাবে না, ‘পাপ’ করলে ‘প্ৰায়শ্চিত্ত’ নামক কিছু মনগড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান করলে সব অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। কিনা, কোন মেয়ে ‘কুমারী’ থাকলেও বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। কিনা, অলৌকিক ক্ষমতা বলে কিছু আছে কিনা, শিগগিরই যিশুর আবার আসা সম্ভব কিনা এবং যুগাস্তে যিশুর পুনরভ্যুত্থান হওয়াও আদৌ সম্ভব কিনা—এ জাতীয় প্রশ্ন করার মানসিকতাই Fundamentalist-দের ছিল না! আর এদের মধ্যে একটি তো, অর্থাৎ যিশুর শিগগিরই মর্তে আবির্ভূত হয়ে মানবজাতিকে উদ্ধার করার বিশ্বাসটিতে, ইতিমধ্যে ভুলই প্রমাণিত হয়েছে; প্রায় দেড়শ’ বছর কেটে গেল, ‘তিনি’ আর এলেন না।
 
(৭) এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণীবিভাজন ও বৈষম্য, নারী-পুরুষ দ্বন্দ্ব তথা পুরুষ আধিপত্য ইত্যাদিকে অস্বীকার করে। কৃত্রিম ধর্মই তার প্রধান বিবেচ্য। এ ক্ষেত্রে একই ধর্ম মতাবলম্বী বিভিন্ন ব্যক্তিদের সে পারস্পরিক সুহৃদ বলে ভাবতে শেখায়, যদিও তাদের মধ্যে বৈষম্য ও শাসক-শাসিতের বিভাজন রয়েছে। এই বৈষম্য ও বিভাজনকে দূর করা দূরে থাক, তাকে কমিয়ে তোলার আন্দোলনেরও সে বিরোধী। এরই একটি বহিঃপ্রকাশ ঘটে কট্টর কম্যুনিজমবিরোধিতার মধ্যে। সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর মত নানা পদক্ষেপ নিয়ে সে শাসকশ্রেণীর হাতকে শক্তও করতে চায়। সব মিলিয়ে ফান্ডামেন্টালিজম হচ্ছে শাসক শ্রেণীর স্বার্থবাহী, জনস্বার্থবিরোধী, পুরুষ আধিপত্যকামী একটি মতবাদ।
 
(৮) আমেরিকার Fundamentalist-দের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা তাদের কাজকর্ম বা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষে বসার চেষ্টা করে নি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ও রাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা তারা অবশ্যই করেছে (প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো বা কঠোর কম্যুনিষ্ট-বিরোধী বৈদেশিক নীতির জন্য আন্দোলন করার মত কাজকর্মের মধ্যে), কিন্তু তাদের নীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী নিজেরা নেতৃত্ব দখল করে সমগ্র রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা, কিংবা খৃস্টান বা ফান্ডামেন্টলিস্ট রাষ্ট্র গড়ে তোলা—এমন আশা বা দাবী তারা করে নি, অন্তত তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নি।
 
 
আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের এই সব বৈশিষ্ট্য–বিশেষত প্রথম সাতটি চারিত্রিক দিক যাদের মধ্যে দেখা যায়, তাদেরই সাধারণভাবে মৌলবাদী হিসেবে এবং এ ধরনের মানসিক ও তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে মৌলবাদ হিসেবে অভিহিত করা যায়। সাংগঠনিকভাবে ব্যাপারটি মূলত ধর্মীয় পরিমণ্ডলে সীমিত থাকলেও, ব্যাপকতর অর্থে এই ধরনের মানসিকতাকেই মৌলবাদী মানসিকতা বলা যায়। সব সময় তা যে ধর্ম ও ঈশ্বর-বিশ্বাসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে বা থাকছে, তার কোন মানে নেই। রাজনৈতিক মতাদর্শগত ক্ষেত্রেও এই মানসিকতার প্রসার ঘটতে পারে এবং তা ঘটেছেও। এমন কি মার্কসবাদ নামক যে দার্শনিক চিন্তা চূড়ান্ত অর্থে ধর্ম ও ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তাকে ও বাস্তব অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সব কিছু বিচার করার কথা বলে, ঐ মার্কসবাদকে সামনে খাড়া করে রেখেও এমন মৌলবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। সহজভাবে বললে ব্যাপকতর অর্থে এইভাবে মৌলবাদকে দুটি মোটা দাগে ভাগ করা যায়-ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাজনৈতিক মৌলবাদ।
 
এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদ সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলার আগে অন্যান্য কয়েকটি প্রাসঙ্গিক দিকেরও উল্লেখ করা দরকার। সম্প্রতি যাদের মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে (যেমন আন্তর্জাতিক খৃস্টীয় বা ইসলামী মৌলবাদীরা কিংবা ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা) তাদের ক্ষেত্রে আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্যও সৃষ্টি হয়েছে, যেমন–
 
(১) বর্তমানে এটি আরো জঙ্গী ও হিংস্র। আমেরিকার ঐ ফান্ডামেন্টালিস্টরা নিজেরা প্রত্যক্ষভাবে দাঙ্গার জন্ম দিয়েছে, মানুষ খুন করেছে বা শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে—এমনটি নয়। অবশ্য তাদের একেবারে নিরীহ ভাবারও কারণ। নেই, কারণ আমেরিকায় ম্যাকার্থিবাদের সৃষ্টিতে এবং বিপুল সংখ্যক কমিউনিষ্ট নিধনে তাদের পরোক্ষ ভূমিকা ও উৎসাহ ছিলই। তবু তা ঘটেছে তাদের সৃষ্টির পরবর্তী পর্যায়ে। শুরুর দিকে ধৰ্মরক্ষা ও ধর্মবিরোধী বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াই ছিল প্রধান দিক। কিন্তু এখনকার হিন্দু-মুসলিম ইত্যাদি ধর্মীয় মৌলবাদীরা এই ধরনের মানসিকতার সঙ্গে গুণগতভাবে উচ্চতর ও লক্ষ্যণীয় মাত্রায় প্রত্যক্ষভাবে হিংস্রতাকেও সংযুক্ত করেছে। ১৯৭৮-এ ইরানে ইসলামী মৌলবাদীদের হাতে ৫৮ জন আমেরিকানের বন্দী থাকার উদাহরণ কিংবা আফগানিস্থানে রুশ সামরিক উপদেষ্টাদের হত্যার ঘটনা জানা আছে। এ-ও জানা আছে যে হিরোসিমা-নাগাসাকিতে যত মানুষ বোমার আঘাতে মারা গেছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ এই ভারতেই ধর্মকেন্দ্ৰিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছেন; তারই ধারাবাহিকতায় ‘রামরথ’ বের করে দাঙ্গার উস্কানি দিতে এই মৌলবাদীরা এখনো কোন ইতস্তত করে না। পরিণতি জানা সত্ত্বেও অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙ্গ আর উসকানি দিতে তাদের হৃদয়ে এতটুকু ভালবাসা ও মনুষ্যত্ব জাগে না। (অযোধ্যার পরে আসছে মথুরা, বারাণসী ও আরো কয়েকশত ‘উসকানি’-অর্থাৎ হিন্দু মৌলবাদের অন্তহীন অমনুষ্যত্ব।) কোরাণকে অপমানের ছুতো তুলে মুক্তমনা ব্যক্তিদের হত্যা করতে বা হত্যার ফতোয়া দিতে, কিংবা তথাকথিত নৈতিকতার সামান্য বিচ্যুতিতে নৃশংস শাস্তি দিতে, এদের হাত এতটুকু কাঁপে না।
 
 
Fundamentalism-এর ঐতিহ্যে এই ভয়াবহ মাত্রায় হিংস্রতার সংযোজন সাম্প্রতিক মৌলবাদীদের একটি বিশেষ কৃতিত্ব।
 
এবং এক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার যথেষ্ট মিল রয়েছে। (ফ্যাসিবাদ প্রথম দেখা দেয়। ১৯১১তে ইটালিতে এবং ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব বর্তমান শতাব্দীর চতুর্থ দশকে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্যাসিবাদকে ফাইন্যান্স পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল একনায়কতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। এদিক থেকে ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে তার কিছু তফাৎ হয়তো রয়েছে। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী হিংস্ৰতা সহ নানা দিকে তাদের মিলও প্রচুর।)
 
(২) এখনকার মৌলবাদীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল তথা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা ধর্মের মূল ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। এই ব্যক্তিগত বা শ্রেণীগত স্বার্থসিদ্ধির সংকীর্ণ মানসিকতা মৌলবাদী সংকীর্ণতাকে আরো মরিয়া, জঙ্গী ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছে। সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের মৌলবাদী উত্তরাধিকারী জামাতে ইসলামী (যেমন তার বাংলাদেশী সংস্করণ) কিংবা আর এস এস-ভি এইচ বি-বিজেপি চক্র রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। এবং বিশেষ দেশে বা রাজ্যে তারা ক্ষমতা দখল করতে ইচ্ছক। ধৰ্মরক্ষার চেয়ে গদিতে বসার আকাঙ্খীই স্পষ্ট হচ্ছে, যদিও আগেও ধর্মরক্ষার নামে সিংহাসনে বসার উদাহরণ ছিলই। এখন সব ধর্মের মৌলবাদী সংস্থার মধ্যে এমন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারটা সর্বজনীন না হলেও, Fundamentalism-এর র তকীকরণ সাম্প্রতিক মৌলবাদের অন্যতম একটি পার্শ্ববৈশিষ্ট্য।
 
তবে মৌলবাদের রাজনৈতিকীকরণ ও রাজনৈতিক মৌলবাদ—এ দু’টি ভিন্ন জিনিষ। মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তথা মানসিকতার দিক থেকে তারা অভিন্ন কিন্তু মৌলবাদের রাজনৈতিকীকরণ আসলে ধর্মীয় মৌলবাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সাম্প্রতিক আকাঙ্খারই বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার Fundamentalist-দের প্রধানতম কাজের ক্ষেত্র ছিল ধর্ম (এখানে খৃস্ট ধর্ম)। তার কিছু রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ হয়তো ছিল, কিন্তু তা ছিল গৌণ একটি দিক। কিন্তু ভারতীয় জনতা পাটি বা জামাতে ইসলামীদের কাজের ক্ষেত্র ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরো অনেক স্পষ্টভাবে ও সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত; ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে পাল্লা বিচারে ধর্মের দিকে পাল্লা ভারী তো নয়ই, বরং উল্টোটাই,–অন্তত সমান তো বটেই। অন্যদিকে রাজনৈতিক মৌলবাদের ক্ষেত্রে ধর্মের ব্যাপারটি নগন্য এমনকি শূণ্যও হতে পারে, যেমন মার্কসীয় মৌলবাদীদের’ ক্ষেত্রে। ‘মৌলবাদের রাজনৈতিকীকরণ’ কথার মধ্যে আসলে ধর্মীয় মৌলবাদের রাজনৈতিকীকরণকেই বোঝানো হচ্ছে—ধর্মীয় মৌলবাদের ক্ষেত্রে যা আগে এমনভাবে ছিল না। অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক মৌলবাদ’ বলতে রাজনৈতিক দলের মধ্যে মৌলবাদী কিছুমানসিকতার প্রতিফলনকে বোঝানো হচ্ছে মাত্র যা কাম্য নয়। বিশেষত যারা মার্কসবাদের মত দর্শনের কথা বলেন তাদের ক্ষেত্রে এবং সাধারণভাবে সমস্ত ধরনের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের পরিপ্রেক্ষিতে।
 
তবে ‘মৌলবাদ’ কথাটি স্বাধীনভাবে এখনো শুধুমাত্র ধর্মীয় মৌলবাদকেই বোঝায়। যদি তার আগে অন্য কোন বিশেষণ বসানো হয় তবে তা কিছু ভিন্নতর তাৎপর্য বহন করতে পারে, যেমন সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ, রাজনৈতিক মৌলবাদ। এমনকি মৌলবাদের আরো সাধারণীকরণ করে অর্থনৈতিক মৌলবাদ, যুক্তিবাদী মৌলবাদ ইত্যাদি কথাগুলিকেও ব্যবহার করা যায়, —যদি অর্থনীতি ও যুক্তিবাদের নাম করে একই রকম গোঁড়ামি, অসহিষ্ণুতা, সামাজিক ক্ষতিকর প্রভাব ইত্যাদি একই রকম ভাবে দেখা যায়।
 
 
আবার মৌলবাদ-মৌলবাদী কথাগুলি ব্যবহৃত হতে হতে অনেক সময় অনেকের দ্বারা শুধুমাত্র ‘গোঁড়ামি’ বোঝাতেই সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। (যেমন, ‘শঙ্করাচার্যের ফতোয়ায় রবিবার কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে মহিলার বেদপাঠ নিষিদ্ধ হওয়ায় স্তম্ভিত বহু সংগঠন। তাদের সম্মিলিত মঞ্চ মানব সংহতি-র তরফে আজ ক্ষোভ জানিয়ে বলা হয়েছে, এই ফতোয় হিন্দু মৌলবাদেরই দম্ভ। বাংলার মানুষ তা মেনে নেবে না। …’ আজকাল, ১৮ই জানুয়ারী,১৯৯৪)
 
হিন্দু, ইসলাম, খৃষ্ট, শিখ ইত্যাদি নানা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমতকে কেন্দ্র করে যখন মৌলবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তখন তা ধর্মীয় মৌলবাদ। এই ধরনের প্রায় সব ধর্মই ঈশ্বর নামক এক অলীক ও মানুষেরই মনগড়া শক্তিতে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদীরা সবাই সাধারণভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাসী এটি বলাটা বাহুল্য মাত্র। তবে তাদের সবার ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস আন্তরিক না-ও হতে পারে। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদীদের সবাই পরম ঈশ্বরভক্তি কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এদের অনেকের ক্ষেত্রেই ঈশ্বর ও ধর্মকে সামনে দাঁড় করিয়ে অর্থাৎ সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের ভুলিয়ে, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ধান্দাটিই বড়। এ ধরনের তথাকথিত মৌলবাদীরা আসলে প্রকৃত মৌলবাদীর মর্যাদা পাওয়ারও যোগ্য নয়, তাদের আরো নিকৃষ্টতর কোন বিশেষণে ভূষিত করা যায় এবং উচিতও। একজন বিশুদ্ধ মৌলবাদী, তার সমস্ত সংকীর্ণতা ও প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র নিয়েও, ঐশ্বরিক শক্তিতে বিশ্বাসের ব্যাপারে অন্তত অটল। তার এই অনড় অটল বিশ্বাস বা ভক্তিই তাকে মৌলবাদী করেছে,–ঐশ্বরিক গ্রন্থের সামান্য অমর্যাদা সে সহ্য করে না। বা তার ভিত্তিটাকে নাড়াতে উপক্রম যে-ই করে (কোন মানুষ বা তত্ত্ব) তাকে সে নিজের কাছের বলে গ্রহণ করতে পারে না। তারই জন্য তার মধ্য থেকে উদারতা ও অন্যের প্রতি সহিষ্ণুতা বিনষ্ট হয়, এ কারণেই সে প্রয়োজনে নিজেকে ও নিজের সমাজকে দু’এক হাজার বছর পিছিয়ে নিয়ে যেতেও রাজী। হিন্দু মৌলবাদীরা বেদকে, মুসলিম মৌলবাদীরা কোরানকে, খৃষ্টান মৌলবাদীরা বাইবেলকে সনাতন অপৌরুষেয়, সমালোচনা ও পরিমার্জনার উর্ধে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব-দায়ী একটি ভিন্ন সত্তা হিসেবে মনে করে। কিন্তু বেদ বা কোরানকে শ্রদ্ধার সঙ্গেও হুবহু না মেনে চলা এবং তাদের সম্পর্কে সামান্য কিছুও না জানা (স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় ‘চার পুরুষ ধরে এক খণ্ড বেদও না দেখা’) ধর্মীয় মৌলবাদীর অভাব নেই। ওরা আসলে মৌলবাদের পচা ডোবায় ভেসে থাকা পচা পাতার মত।
 
ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে রাজনৈতিক মৌলবাদীদের একটি বড় তফাৎ এখানে যে, রাজনৈতিক মৌলবাদীরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী নাও হতে পারে, এমনকি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বা তথাকথিত নাস্তিক (অন্তত বাহ্যিকভাবে) হতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা মার্কসবাদের নাম করে, কিছু কিছু রাজনৈতিক দল বা তথাকথিত কম্যুনিষ্ট পার্টির মধ্যে এই লক্ষণ যখন দেখা যায়, তখন ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে তাদের এই পার্থক্যের দিকটি পরিষ্কার হয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তারাও ঈশ্বরের পরিবর্তে তাদের পিতৃসুলভ তত্ত্বটিকে একই ভঙ্গিমায় একই আসনে বসায়।
 
‘মাকর্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য’–এই ধরনের পোস্টার ও প্রচার বাংলায় এখন বেশ দেখা যাচ্ছে। তথাকথিত মার্কসবাদী বা কম্যুনিষ্টদের মধ্যে অন্যত্রও এই মানসিকতার রকমফের দুর্লভ নয়। (যথাসম্ভব বিশ্বের নানা স্থানে মার্কসবাদ বা কম্যুনিজম ও সমাজতন্ত্রের তথাকথিত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আপন তত্ত্বের মাহাত্ম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাড়নায় তা করা হয়েছে।) মাকর্সবাদকে এইভাবে বিচ্ছিন্নভাবে ‘সর্বশক্তিমান’ হিসেবে ব্যাপক প্রচার করার বালখিল্যসুলভ (কিংবা অমার্কসীয়) প্রচেষ্টার মধ্যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে ভক্তির দিকটিই ভিন্নভাবে পরিস্ফুট হয়। মার্কস নিজেও কখনো তাঁর নিজের ‘তত্ত্বকে’ সর্বশক্তিমান হিসাবে দাবী বা প্রচার করেছেন বলে জানা নেই। বরং যে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন তার ভিত্তি, ঐ অনুযায়ী মার্কসের তত্ত্বেরও যুগোপযোগী পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক পরিমার্জনা ও গোঁড়ামিযুক্ত সমালোচনা সুস্থ ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এই রাজনৈতিক মৌলবাদীরা (এক্ষেত্রে আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে মার্কসীয় মৌলবাদীরা) ধর্মীয় মৌলবাদীদের মত অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতেও বাধ্য। তাদের ঐ মৌলবাদী চরিত্রেরই একটি বহিঃপ্রকাশ মার্কসবাদকে সর্বশক্তিমান হিসেবে প্রচার করার মধ্যে। অথবা কোন ধরনের সমালোচনা পর্যালোচনা ও পরিমার্জনার মানসিকতা ও যোগ্যতা অর্জন না করে এবং সেগুলিকে মুক্ত মনে গ্ৰহণ না করার মানসিকতা নিয়ে, অন্ধভাবে নিজেদের আঁকড়ে রাখা তত্ত্বকে সর্বশক্তিমান হিসেবে গণ্য করার সঙ্গে সঙ্গে মৌলবাদী চরিত্রও তারা অর্জন করে ফেলে (একই ধরনের অন্ধবিশ্বাস, হিংস্রতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, সংকীর্ণতা তথা অনুদার দৃষ্টিভঙ্গী, মূল রাজনৈতিক গ্রন্থটিকে সর্বোচ্চ ভাবা ইত্যাদি)। কিংবা উভয়ই। প্রকৃত বিচারে এই গোঁড়ামি মার্কসবাদ অনুসরণে নিজেদের অক্ষমতা ও ভন্ডামি এবং হয়তো বা তজনিত হতাশারই বহিঃপ্রকাশ।
 
 
বিজ্ঞানে চরম সত্য বলে কোন কিছু নেই। একটি বিশেষ সময়ে তখনকার জ্ঞান অনুযায়ী এবং তথ্য, যুক্তি, প্রমাণের সাহায্যে কোন তত্ত্বকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক মন সর্বদাই তার বিকাশের জন্য আগ্রহী এবং পরবর্তীকালে নতুনতর তথ্য-প্রমাণের সাহায্যে পুরনো সত্য পাল্টে নতুন একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্টা। (এমন কি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ইত্যাদির আরো বিকাশে বিশুদ্ধ বস্তুবাদী দর্শনের বর্তমান রূপটিও পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।) উপযুক্ত তথ্য-যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে নতুনতর সত্য প্রতিষ্ঠিত করা গেলে বিজ্ঞানীরা নিদ্বিধায় তাকে গ্ৰহণ করেন এবং পুরনো সত্য।’-কে মোহমুক্ত ভাবে বিসর্জন দেন। অন্ধবিশ্বাসী, গোঁড়া বা মৌলবাদীদের থেকে তাদের এখানেই বড় তফাৎ। তাই বেদ বাইবেল বা কোরানের শিক্ষাকে অপরিবর্তনীয় ও সমালোচনার উর্ধে বলে গণ্য করা যেমন ধর্মীয় মৌলবাদের বড় একটি লক্ষণ, তেমনই গান্ধীবাদ বা মার্কসবাদকে অপরিবর্তনীয় ও সমালোচনার উর্ধে বলে গণ্য করাটাও রাজনৈতিক মৌলবাদের লক্ষণ।
 
একইভাবে ‘সর্বশক্তিমান’ কথাটিও অবৈজ্ঞানিক ধারণার বহিঃপ্রকাশ। যে ধারণা ও কল্পনা থেকে ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান হিসেবে কিছু মানুষ শ্ৰদ্ধা ও ভয় করেছে, ঐ ধরনের ধারণা ও কল্পনা থেকেই কোন তত্ত্বকে একই ভাবে সর্বশক্তিমান বলার প্রবণতা জন্মায়। প্রকৃতি, পৃথিবী ও সমাজের সমস্ত সমস্যার সমাধান মার্কসবাদ বা এই জাতীয় একটি তত্ত্ব করে ফেলতে সক্ষম, এটি ভাবতে ভাল লাগলেও লগতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা থেকে তা বহু দূরে। বড়জোর বলা যেতে পারে এই সব সমস্যার সমাধানে এ ধরনের একটি তত্ত্ব বর্তমান জ্ঞানে ও পরিবেশে সব চেয়ে বেশি কার্যকরী হিসেবে প্রচেষ্টা চালাতে সক্ষম। ভবিষ্যতে আরও কার্যকরী, আরো বিজ্ঞানসম্মত কোন তত্ত্ব মানুষ জানতেই পারে। কিন্তু এখনই একটিকে সর্বশক্তিমান হিসেবে ঘোষণা করার মধ্যে ভবিষ্যতের ঐ সত্যকে আন্তরিকভাবে গ্ৰহণ করার মানসিকতাটিকে নষ্ট করা হয়, মনকে ঐ ভাবে সত্যিকারে প্রস্তুত করাও যায় না।
 
‘মার্কসীয় মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য’-এ কথাটি লেনিনের। (‘The Marxian doctrine is omnipotent because it is true’-Three sources and three component parts of Marxism, V.I. Lenin) যেহেতু লেনিন বলেছেন, অতএব কথাটি প্রচারযোগ্য, এই বিচারের চেয়ে লেনিন কেন বলেছেন এবং তার পেছনে যুক্তি কতটা রয়েছে,–এ ধরনের বিচার করাই যুক্তিযুক্ত। আর সত্যি কথা বলতে কি, বিচ্ছিন্নভাবে শুধু এই কথাগুলিকে বড় বড় করে তুলে ধরলে ভুল বোঝার সম্ভাবনাই বেশি। কোন বিশেষ তত্ত্ব বা মতবাদ সম্পর্কে এমন সাটিফিকেট প্রচার করার চেয়ে, বাস্তব কাজ ও আচার আচরণের মধ্যে ঐ তত্ত্ব বা মতবাদের যাথার্থ্য ও যৌক্তিকতা প্ৰমাণ করাটাই কাম্য ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। কাজে তা না করে, নিজেদের গোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তিদের ঐ তত্ত্বে প্রকৃত শিক্ষিত করার চেয়ে অন্য সংকীর্ণ ধান্দায় নিয়োজিত করাকে বেশি গুরুত্ব দিযে, এমন কি যারা এ কথাগুলি প্রচার করছেন তারা আদৌ ঐ তত্ত্বকে আত্মস্থ করে সৎভাবে কাজ করেন কিনা—এই বিতর্কের সৃষ্টি যেখানে হয়েছে—সেখানে তাদের এই আচমকা প্রচার একটি ভান ও প্রতারণা বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
 
লেনিন ঐ একই লেখায় আরো মন্তব্য করেছেন, ‘মার্কসবাদে ‘গোঁড়ামি’ জাতীয় কোন কিছু নেই…’ (‘There is nothing resembling ‘sectarianism’ is Marxism, in the sense of its being hide bound, petrified doctrine, a doctrine which arose away from the highroad of development of world civilisation.’) ভাববাদী দর্শনের বিপরীতে এবং অবশ্যই মৌলবাদী চিন্তাভাবনার বিপরীতে স্পষ্টভাবে যে তত্ত্ব গোঁড়ামি বর্জন করার কথা বলে, সেই তত্ত্বের প্রতিই গোঁড়ামি থাকাটা সেই তত্ত্বেরই বিরোধী। মাকর্সবাদের–বা যথার্থভাবে বল্পে বলা উচিত মার্কসীয় দর্শনের, যথার্থ্য এখানেই যে, সে নিজের প্রতি সহ সর্বত্র এই গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে এবং এও বলে যে, প্রকৃতিতে সব কিছুই পরিবর্তনশীল, কোন কিছুই স্থির নয় ইত্যাদি। এখনো অব্দি জানা বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসীয় দর্শনকে তার বিপুল বিস্তারী দিক নিয়ে, এ কারণেই যথার্থ ও বিজ্ঞানসম্মত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
 
কিছু সত্য আছে যা চরম সত্য (absolute truth)। যেমন ত্রিভুজের তিনকোণের সমষ্টি ১৮০ ডিগ্রি ইত্যাদি জাতীয় জ্যামিতিক সত্য কিংবা কাউকে দেখিয়ে যদি বলা যায় তার ঠাকুর্দা-ঠাকুমা বা বাবার মা ছিলেন। তবে তা চরম সত্যই। লেনিনও তার Materialism and Empirico-Criticism গ্রন্থে চরম সত্যের উদাহরণে বলেছেন, ‘না খেয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না’ এবং ‘শুধুমাত্র প্লেটোনিক প্রেমের সাহায্যে বাচ্চার জন্ম হবে না’, এগুলি চরম সত্য। কোন প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কেও তা একইভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু এই ধরনের উদাহরণই চরম সত্য কিনা তা নিয়েও বিতর্ক উঠতে উঠতে পারে। যেমন কেউ যদি না খায়, তবে তাকে ইনজেকশন করে পুষ্টির যোগান দিয়ে বঁচিয়ে রাখা যায়। তাই—’পুষ্টি ছাড়া মানুষ বেশিদিন ধাঁচে না’। এটি হয়তো চরম সত্য। (কিন্তু এতেও ফাঁকি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।) আবার বর্তমানে যখন কৃত্রিম প্ৰজনন ও টেস্ট টিউব বেবি ইত্যাদির বিপুল অগ্ৰগতি ঘটছে, যেখানে দু একশ’ বছর পরে নারী পুরুষ প্লেটেনিক প্রেম করে গেলেও মানব সমাজে শিশুর জন্ম হবে না তা নিশ্চিত করে বলা মুস্কিল। তা অসম্ভব নয় বলেই মনে হয়। সেক্ষেত্রে লেনিনের কথাটি ভুল বলে প্রতিষ্ঠিত হবে। যেহেতু লেনিন বলেছিলেন ‘প্লেটোনিক প্ৰেম করে গেলে বাচ্চার জন্ম হবে না-এ মন্তব্যটি একটি চরম সত্য’, তাই ভবিষ্যতের ঐ রকম সম্ভাবনাকেও নস্যাৎ করাটা মৌলবাদী চিন্তার একটি প্রকাশ হিসেবেই বলা যায়। লেনিনের সময় কৃত্রিম প্রজনন সম্পর্কিত মানুষের জ্ঞান বর্তমান অবস্থার মত আদৌ ছিল না। তাই লেনিন উদাহরণ দিয়ে গিয়ে এমন কথা বলেছিলেন। তখনকার পরিবেশ ও জ্ঞানের স্তরে সেটাই সত্য ছিল। কিন্তু তাঁর মন্তব্যই চরম সত্য তা নয়। একইভাবে ভবিষ্যতে এমন কৃত্রিম প্রজননে জাত কোন প্রাণী বা মানুষের প্রচলিত অর্থে সুনির্দিষ্ট বাবা-মা, ঠাকুমাঠাকুর্দা না-ও থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রেও পূর্বোক্ত মন্তব্যটি পরম সত্য নয় বলে প্রমাণিত হয়। পরবর্তীকালে নতুন জ্ঞান পুরনো সত্যকে এইভাবেই বাতিল করে বা পরিমার্জিত করে। মৌলবাদী মানসিকতা এই পরিবর্তন ও পরিমার্জনাকে গ্ৰহণ করতে চায় না, যেমন চায়নি আমেরিকার ‘Fundamentalist’-র বাইবেলের ক্ষেত্রে বা মুসলিম মৌলবাদীরা চায় না কোরানের প্রসঙ্গে কিংবা হিন্দুরা বেদ উপনিষদ জাতীয় ধর্মগ্রন্থ প্রসঙ্গে।
 
‘সত্য’ (Truth) সম্পর্কে পূর্বোক্ত কিছু চরম সত্য (যাও হয়তো আপাত) ছাড়া, সাধারণভাবে কোন কিছুকে এইভাবে চিহ্নিত করা অবৈজ্ঞানিক। মরিস কনফোর্থ মন্তব্য করেছেন, ‘সাধারণভাবে, বিজ্ঞান চরম সত্যে আদৌ আগ্রহী নয়। প্রকৃতপক্ষে একবার যদি কোন সিদ্ধান্তকে চরম সত্য হিসেবে বলে দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী অনুসন্ধানের সমস্ত দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয় : চরম সত্যই যদি জানা হয়ে যায়, তবে তো আরো গবেষনার কোন প্রয়োজনই থাকে না, চরম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার বা জেনে নেওয়ার দাবী তাই প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান-বিরোধী, কারণ এমন দাবী আমাদের আরো গবেষণা চালাতে, আমাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে, সত্যের কম কাছাকাছি অবস্থা থেকে বেশি কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছতে, অন্য কথায় বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের বাধা দেয়’।
 
বিচ্ছিন্নভাবে মার্কসবাদকে ‘ইহা সত্য’ বলার মধ্যে ঐ চরম সত্য জেনে ফেলার দাবীই যেন বোঝায়। মার্কসবাদের সত্যতা ও চমৎকারিত্ব এইখানেই যে, কোন কিছুই যে ঐভাবে সত্য নয়, এটি উপলব্ধি করতে তা আমাদের শেখায় এবং এই কোন কিছুর মধ্যে সে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতেও দ্বিধা করে না। অ্যান্টি ডুরিং-এ এঙ্গেলস যেমন বলেছেন, ‘প্রকৃত পক্ষে ‘ভুল’ ও ‘ঠিক এই কথাগুলির মত গোঁড়া ও নীতিগত ভাবপ্রকাশকে বৈজ্ঞানিক কাজ নিয়ম করেই এড়িয়ে চলে, যদিও এই ধরনের কথার সঙ্গে কাজেকর্মে আমরা সর্বত্রই পরিচিত হই.এদের মাধ্যমে একটি সর্বোচ্চ চিন্তার সর্বোচ্চ ফলাফলকে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে; যে চেষ্টায় এক একটি উক্তির ব্যবসা করার শূন্যগর্ভ প্রবণতা থাকে।’ (‘Really scientific works therefore as a rule avoid such dogmatic and moral expressions as error and truth, while these expressions meet us everywhere in works…in which empty phrase mongering attempts to impose on us as the sovereign result of sovereign thought.’) সুবিধাজনক ভাবে এইভাবে এক একটি উক্তি বা ফ্রেজ (phase) তুলে নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে তার ‘প্রচার করার প্রবণতা না থাকলেই ভাল।
 
সত্য সম্পর্কে এ ধরনের বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গীর পাশাপাশি এটিও বারংবার মনে রাখা দরকার এবং আবারো বলা দরকার যে, মার্কসবাদের মত কোন তত্ত্বই হোক বা পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে জাতীয় কোন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণই হোক বা বিবর্তনবাদের মত কোন যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই হোক, যেটি সাম্প্রতিক জ্ঞান ও তথ্যের পরিপূর্ণ প্রয়োগ ঘটিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সেগুলিকে তখনকার মত সত্য বলে গ্রহণ না করাটাও গোঁড়ামি, যা মৌলবাদী মানসিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং যা মৌলবাদী ক্রিয়াকান্ডের জনক। সেগুলিকে ‘আরো সংশোধন করতে হবে, তাদের উন্নতি ঘটাতে হবে, নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন জ্ঞানের আলোয় তাদের নতুন করে ব্যাখ্যা করতে হবে। কিন্তু এই কারণেই সেগুলি অসত্য নয় : সেগুলি আংশিক ও তুলনামূলকভাবে সত্যের কাছাকাছি।’ (‘They require to be corrected, improved upon, restated in the light of new experience and new knowledge. But they are not for that reason untrue : they are partial, relative, approximate truth.’–Dialectical Materialism, Maurice Cornforth) ব্যাপারটি মার্কসবাদ সম্পর্কেও সত্যি। রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাস ও অসূয়া থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাপারটি উপলব্ধি করলে, লেনিনের একটি বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে।
 
মার্কসীয় দর্শন প্রসঙ্গে একটু বেশি আলোচনা করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে আরও একটু স্থূলভাবে তুলনা করলে, এই ধরনের সমস্ত দলীয় রাজনৈতিক মৌলবাদীদের মানসিকতা-আচার-আচরণের মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদের সাধারণ লক্ষণগুলিও দেখা যায়—(১) তারা ধর্ম-এর স্থানে নিজের দলীয় রাজনীতিকে বসায়, (২) ধর্মগ্রন্থের জায়গায় বসায় রাজনৈতিক দলিলপত্ৰকে, (৩) নিজের দলীয় রাজনীতিকে যা বিরোধিতা করে বা সমালোচনা করে, তাকে খোলামনে রাজনৈতিক বিতর্কে না। নিয়ে গিয়ে উগ্র ও হিংস্রভাবে বিরোধিতা করে, (৪) রাজনৈতিক উদারতা ও বিরোধী বা ভিন্ন রাজনৈতিক কর্মর প্রতি নৃত্যুনতম সন্ত্ৰমবোধ হারিয়ে ফেলে, (৫) দলীয় রাজনীতির প্রতি শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রিকতার নামে একসময় দল ও নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন বিশ্বাস ও দ্বিধাহীন আনুগত্য প্রকাশ করতে থাকে; দলে বা গোষ্ঠীতে যেই কেউ কিছু প্রশ্ন তোলে বা সমালোচনা করে তাকেই শত্রু বা শ্রেণীশত্ৰু, প্রতিক্রিয়াশীল, চক্রান্তকারী, পার্টিবিরোধী ইত্যাদি নানাভাবে চিহ্নিত করা হয়; অন্তত তার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক আর থাকে না। মৌলবাদী সংগঠনের মত এই রাজনৈতিক নেতৃত্বও কর্মীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত আনুগত্য প্রত্যাশা করে (৬) দলীয় রাজনীতির স্বার্থে হিংস্র আচরণ, খুন-জখম, দৈহিক-মানসিক-সামাজিক অত্যাচার চালানো ইত্যাদি তত্ত্ব লিপ্ত হয়। (৭) রাজনৈতিক ক্ষমতা তো লাভ করতেই চায়। তবে অবশ্যই সামাজিক সংস্কারমূলক কিছু ভূমিকা তার থাকে, ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে কিংবা নাও থাকতে পারে।
 
এ ব্যাপারে অবশ্যই কোন সন্দেহ নেই যে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন বা বিশেষ কোন রাজনৈতিক মতবাদ অনুযায়ী কাজ করেন, তাদের একটি অংশ যে অন্তত একটি স্তর অব্দি উদার ও মানবিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। পরমত সহিষ্ণুতা, সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথ কাজকর্ম করা, মত ও পথের পার্থক্য থাকলেও সুস্থ বিতর্কের মধ্য দিয়ে সামাজিক উন্নয়নের জন্য চেষ্টা চালানো ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা-এগুলি বিরল কোন ঘটনা নয়।
 
ধর্মের প্রসঙ্গে ধর্মনিষ্ঠ বা ধামিক ব্যক্তির সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদীদেরও এইভাবে একটি বড় তফাৎ রয়েছে। ধর্মনিষ্ঠ বা ধামিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে, নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে, সেটি ঠিক ভুল যাই হোক না কেন, সৎভাবে অনুসরণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তা করেন। তার মধ্যে প্রশ্নহীন দ্বিধাহীন আনুগত্য ও বিশ্বাসের ব্যাপারগুলিও থাকে, কিন্তু মৌলবাদের অন্যান্য যে কয়েকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছিল সেগুলি অনুপস্থিত। তাঁর মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা ইত্যাদি অপ্রত্যাশিত নয়। অন্য ধর্মের বা গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি ঘূণা বর্ষণ করা ও বিষোদগার করার ব্যাপারটি তাঁর মনেও আসে না। সবচেয়ে বড় কথা তার মধ্যে সংকীর্ণভাবে শুধু নিজ ধর্মের মানুষের নয়, সবার মঙ্গলের সামগ্রিক ইচ্ছাটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, যিশু খৃস্ট থেকে গুরু নানক, শ্ৰীচৈতন্য, রামকৃষ্ণ-ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক ধর্মনিষ্ঠ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। এদের মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক বলার মত অবস্থা নেই, যদিও ধর্ম তাঁদের জীবন ও কাজের সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে থাকে।
 
একইভাবে রাজনৈতিক মৌলবাদীদের সঙ্গে সৎ রাজনৈতিক কামীদের পার্থক্য রয়েছে। একদা একনিষ্ঠ গান্ধীবাদী বা কম্যুনিষ্ট কর্মীদের কথা আমরা জানি। মানুষ ধ ও তার সমাজকে ভালবেসে, নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে রেখে, তার ত্রুটি বা সীমাবদ্ধত হয়তো থাকলেও, নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের কথা মাথায় না। রেখে তারা কাজ করে গেছেন। এই ব্যক্তিগত স্বার্থবোধ ছিল না বলেই, তাদের মধ্যে উদারতা ও মুক্তমনের পরিচয় পাওয়া যেত। প্রয়োজনে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথ কাজ করা, তাদেরও বন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণ করার মহত্ত্ব বিরল কোন ঘটনা ছিল না। ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমী মানেই সে শত্রুস্থানীয়, তাকে প্রয়োজনে হত্যাও করা দরকার এবং কোনভাবেই তাকে ভালবাসা যায় না–এমন সংকীর্ণ মৌলবাদী মানসিকতা ছিল অনুপস্থিত। ধাৰ্মিক বা ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির মত এমন রাজনৈতিক কামী এখনো নিশ্চয়ই আছেন, কিন্তু পুরষ্কার রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্র, তীব্র মেরুকরণ ও অনুদার মৌলবাদী মানসিকতার এর অর্থ এ অবশ্যই নয় যে, মৌলবাদী বলে প্রমাণিত কোন গোষ্ঠীর সঙ্গেও ঐক্য স্থাপন করা অমৌলবাদী মানসিকতার লক্ষণ। বরং উল্টোটাই। মৌলবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলে নিজেকেও কিছুটা মৌলবাদী হতে হয়। না হলে ঐভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানসিকতটাই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক গাঁটছড়ার সঙ্গে প্রকৃত পক্ষে আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, সংকীর্ণ গোষ্ঠী স্বাৰ্থ ব্যক্তিগত নোংরামির ব্যাপারটিই বেশি।
 
তাই দেখা যায় রাজনৈতিক মৌলবাদীরা মার্কসবাদ বা গান্ধীবাদকে সামনে রেখেও মুসলিম লীগ বা বিজেপি-র মত সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকার গড়া থেকে পঞ্চায়েত বানানো পর্যন্ত নানা স্তরে ক্ষমতা লাভ করার চেষ্টা করে। ভারতের তথাকথিত মার্ক্সবাদীরা মুসলিম লীগের সঙ্গে কেরলে একদা সরকার গঠন করেছে। হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েও কংগ্রেসকে সরিয়ে জাতীয় ফ্রন্টের বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং-কে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে; তখন যুক্তি দেখিয়েছিল কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা ছিল সব চেয়ে বড় কাজ। কিন্তু এসবে প্রকৃত লাভ হয়েছে হিন্দুমৌলবাদী রাজনৈতিক দলটির। লোকসভায় প্রতিনিধি সৎখ্যা তারা এক অঙ্কের থেকে তিন অঙ্কে নিয়ে যেতে পেরেছে। ধর্মীয় মৌলবাদীদের এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল তথাকথিত কম্যুনিষ্টরা।
 
বাংলাদেশেও কমিউনিষ্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সি পি বি) জামাতে ইসলামীর মত মুসলিম মৌলবাদীদের সঙ্গে আটের দশকের শেষদিকে ‘ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে লিপ্ত হয়েছিল। তখনো তারা কৌশল হিসেবে সামরিক শাসনকে উচ্ছেদ করাকে প্রধান কাজ হিসেবে মনে করেছে। তখন (১৯৮৭) বদরুদিন উমর মন্তব্য করেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বি এন পি, বাকশাল, সিপি বি এবং বামপন্থী নামধারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জামাতে ইসলামী এখন আওয়ামী লীগ ও সিপিবি মার্ক লোকেদের কাছেও রাজনৈতিক, মিত্র হিসাবে বেশ ভালভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। জামাতে ইসলামের পক্ষে এই কীর্তি অর্জন করা উপরে উল্লিখিত তথাকথিত গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট নামধারী সংগঠনগুলির নিদারুণ অবক্ষয় ও চরিত্রহীনতার ফলেই যে অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে একথা বলাই বাহুল্য।’ ভারতের ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামীর পরিবর্তে ভারতীয় জনতাপাটিকে (ও তার ধর্মভাইদের) বসালে, ঐ একই মন্তব্য এদেশের ‘তথাকথিত গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট নামধারী সংগঠনগুলির’ জন্য ব্যবহার না করার কোন কারণ নেই। শ্রদ্ধেয় বিমলকৃষ্ণ মতিলাল এই কারণেই মন্তব্য করেছেন, ‘উদারনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার লোভে মিথ্যার ব্যবসা আরম্ভ করেন-মৌলবাদের অভ্যুত্থানকে তখন আর রোধ করা যায় না।’ (মৌলবাদ কি ও কেন?)
 
পারিবারিক শাসন ও সামরিক শাসনকে উচ্ছেদ করার কর্মসূচীকে খারাপ কিছু ভাবার কারণ নেই। কিন্তু তার জন্য সুস্থতর কোন উপায় না গ্ৰহণ করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত শক্ত করা ও তাদের উত্থানে সাহায্য করার ভয়াবহ ঢেঁকীশালের মধ্যে শুধু অবক্ষয়, চরিত্রহীনতা, দেউলিয়াপনা ও সৃজনশীলতার অভাব নয়, মৌলবাদের প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির ব্যাপারেও সন্দেহ জাগে। আর বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সহ অনেক নেতারাই তো নিজেদের নির্বাচনী ইস্তাহারে (১৯৯১) আল্লা হো আকবর’ যুক্ত করেছিলেন; এও জানা আছে যে পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ ফরহাদ-এর মত কম্যুনিষ্ট নেতার মৃত্যুতে পার্টি অফিসে মিলাদ-এর মত ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। এদেশের একম্যুনিষ্টরাও জনসংযোগের নাম করে পাড়ার দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে যমপূজার মত নানা ধৰ্মীয় অনুষ্ঠানে মদত দেন, ভোটের স্বার্থে জাত পাতের রাজনীতি করতে পিছপা হন না, সংরক্ষণের নাম করে জাত-পাতের বিভাজনকে শক্তিশালী করেন। আর ‘কম্যুনিষ্ট’ সদস্যরাও পূজা-শ্ৰাদ্ধ-বৈদিক মন্ত্র পড়ে বিয়ে করা জাতীয় নানা ধরনের ধর্মীয় অনাচার করেন হাজারো গালভরা যুক্তি দেখিয়ে। এদেশের একদা কত কম্যুনিষ্ট কর্মর মার্কসবাদের প্রতি নিষ্ঠ, ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তক্ষরণের স্মৃতিকে পায়ে মাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অধুনা এই সব মার্কসীয় দর্শনে অশিক্ষিত ও এই ধরনের ক্ষমতালোভী, স্বার্থপর কমীবৃন্দ ও নেতৃবৃন্দের বেশিরভাগই। তাঁদের চরিত্র বদলের সঙ্গেই যুক্ত ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা। এঁরা ধর্মীয় মৌলবাদের প্রচ্ছন্ন সুহৃদ, রাজনৈতিক মৌলবাদী। আপাত ধৰ্মবিরোধী ব্যক্তিদের মধ্যেও নিজের বন্ধু খুঁজে নেওয়ার ও এইভাবে নিজেকে সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা ধর্মীয় মৌলবাদের একটি বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্য যার আছে সে যে অন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে তার আরো বেশি সংখ্যায় কাছের লোক পাবে তাতে তো কোন সন্দেহ নেই। জন্মসূত্রে হিন্দু কিন্তু কোনভাবে কম্যুনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত, এমন মানুষদের মধ্যেও বেশ কিছু জন আছে যারা হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনগুলির মতই মনে মনে, মনে করে যে, মুসলিমদের একটু কড়কে দেওয়া দরকার, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে বেশ আচ্ছা শিক্ষাই দেওয়া গেছে ইত্যাদি। আর কংগ্রেসের মত অন্যান্য দলগুলিতে তো কথাই নেই। ভোটের সময় বিজেপি যাদের ভোট পায় তাদের একটা অংশই একসময় কংগ্রেসকে ভোট দিত বা কংগ্রেসের সমর্থক ছিল। তাই ত্রিপাক্ষিক ভোটযুদ্ধে কংগ্রেস-বিজেপি বাদে তৃতীয়পক্ষের লাভ হয়ে যায় বেশি।
 
ব্যাপারটি খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, যখন এটি অজানা নয় যে কংগ্রেসের তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলন, মুখে যাই হোক না কেন, কার্যত দাঁড়িয়েছিল হিন্দুদের (বর্ণহিন্দুদের!!) স্বাৰ্থবাহী আন্দোলন। স্বদেশী যখন জন্মসূত্রে হিন্দু তখন তার কাছে এই হিন্দুত্বই বড় এবং মুসলমানকে, এমনকি সহযোদ্ধা মুসলিমকেও, অস্পৃশ্য বলে। ঘূণা করেছে। এরই একটি বাস্তব চিত্র বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-’হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন স্বদেশী প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই।’ (লোকহিত)
 
স্পষ্টতঃ এইসব কর্মীদের অন্য যা শেখানো হোক না কেন, ধর্মমোহমুক্ত হবার শিক্ষাটিকে অন্যতম প্রাথমিক প্রয়োজন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলত যা হওয়ার হয়েছে, —তথাকথিত স্বাধীনতার আগেও যেমন, পরেও তেমনি, ধর্ম সুযোগ পেলেই মৌলবাদে পরিণত হওয়ার নিজস্ব প্রবণতা নিয়ে ভারতের এই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির মধ্যে নিজেকে পরিপুষ্ট করেছে।
 
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে কর্মীদের ধর্মমোহমুক্ত করা সম্ভবও ছিল না,–বড়জোর কিছু ধর্মীয় সংস্কারের কথা বলা ছাড়া। এর জন্য বেশি গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। জাতির জনক হিসেবে প্রচারিত যে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ছাড়া এই কংগ্রেসকে ভাবা যায় না, তিনি তার অন্যান্য ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক বহু দিক সত্ত্বেও প্রথমেই ছিলেন ঈশ্বরভক্তি ধর্মপ্ৰাণ ব্যক্তি এবং হিন্দু। ভারতের স্বাধীনতা বা ‘স্বরাজ’ আনার ব্যাপারে তার মূল বক্তব্যই ছিল, ‘সংগ্রামের মাধ্যমে নয়, ভগবানের আশীৰ্বাদরূপেই এই স্বরাজ স্বৰ্গ থেকে ভারতের উপর নেমে আসবে।’(ইন্ডিয়ান হোমরুল, ১৯২১) এমনকি নোয়াখালির দাঙ্গাবিধ্বস্ত পরিবেশে দাঁড়িয়েও তিনি হিন্দুদের ঈশ্বরবিশ্বাস ও রামনামে আস্থা রাখতে উপদেশ দিয়েছেন।–
 
‘ঈশ্বরে যদি আপনাদের অকপট বিশ্বাস থাকে তাহা হইলে আপনাদের স্ত্রীকন্যার উপর, কেহই অমর্যাদাজনক আচরণ করিতে সাহসী হইবে না। আপনারা আপনাদের মুসলমান ভীতি ত্যাগ করুন; রামনামে যদি আপনাদের আস্থা থাকে তাহা হইলে আপনারা কখনোই পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করিয়া যাইবেন না।’ (নোয়াখালি ডাইরি) এই ‘রাম’ হিন্দুমৌলবাদীদেরও আদর্শ চরিত্র।
 
কুসংস্কারমুক্ত হয়ে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর কথা বল্লেও যেন আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের মত, হিন্দুধর্মের আদি গ্রন্থগুলির প্রতি ছিল ভগবদভক্ত গান্ধীর গভীর শ্রদ্ধা।–
 
‘হিন্দুধর্মের দুইটি দিক আছে, একদিকে ঐতিহাসিক হিন্দুধর্ম—তাহার অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কার, প্রস্তুরাদির পূজা ও পশুবলি প্রভৃতি; আর অপরদিকে গীতা, উপনিষদ এবং পতঞ্জলি যোগসূত্রের হিন্দুধর্ম-সেখানে অহিংসার চরম স্মৃর্তি, সর্বভূতের ঐক্য এবং সর্বব্যাপী, নিরাকার, অবিনশ্বর, অদ্বিতীয় ভগবানের পূজা। আমার কাছে অহিংসাই হইল হিন্দুধর্মের সর্বোত্তম মহিমা।’ (ঐ) আবার এই উদারনৈতিকতা ও সর্বধর্মের মানুষের (সর্বভূতের) ঐক্যের মানসিকতার মত নানা দিকের কারণে তাঁকে মৌলবাদী কখনই বলা চলে না, যদিও আবার তাদেরই মত তিনিও ছিলেন। কম্যুনিজম বিরোধী এবং কম্যুনিস্টদের সাহায্য করার জন্য ভগবানের কাছে আবেদনও জানিয়েছেন—
 
“পুজিপতিদের বিরুদ্ধে আমার কোন অনিষ্ট করার মনোভাব নেই। তাঁদের কোন ক্ষতি করার কথা ভাবতে পারি না। …ভগবান আপনাদের (কম্যুনিষ্টদের) বুদ্ধি ও যোগ্যতা দিয়েছেন। সেগুলিকে উপযুক্ত কাজে আপনার প্রয়োগ করুন। আপনাদের কাছে আমার নিবেদন এই যে, আপনারা আপনাদের বুদ্ধির দ্বার রুদ্ধ করবেন না। ভগবান আপনাদের সাহায্য করুন।’ (ইয়ং ইন্ডিয়া; ২৬শে মার্চ, ১৯৩১)
 
হিটলার থেকে হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা নারীদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে হুবহু প্রায়ই একই দৃষ্টিভঙ্গী ছিল গান্ধীরও —
 
‘জীবিকা অর্জনের জন্য নারী চাকরি বা ব্যবসা করুক—এ নীতিতে আমার বিশ্বাস নেই। …মেয়েদের বিদ্যালয়েও ইংরাজী শিক্ষা প্রবর্তন করার একমাত্র অর্থ হচ্ছে আমাদের অসহায় অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধি করা।’ (বোম্বাই ভগ্নী সমাজের সভাপতির অভিভাষণ; ১৯১৮)
 
‘…গৃহস্থলীর ব্যাপারে ও শিশুপালন এবং তাদের শিক্ষা সম্বন্ধে নারীর অধিকতর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’ (ঐ) এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সময় মেয়েদের ‘ইংরেজি শেখানোর অর্থ তাদের মেরে ফেলা।’ ‘আমার মতে মেয়েদের সংস্কৃত শেখানো উচিত।’ ‘হিন্দুধর্মের মূলনীতি এত প্রচ্ছন্ন যে কিভাবে এ ধর্ম শেখানো যেতে পারে হঠাৎ তা বলা যায় না। তবে মোটামুটি এই কথা বলা যায় যে, গীতা রামায়ণ মহাভারত ও ভাগবতকে হিন্দুরা সবাই শ্রদ্ধা-দৃষ্টিতে দেখেন এবং এই সব ধর্মগ্রন্থের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের হয় তাহলে যথেষ্ট কাজ হবে মনে হয়।’ (আত্ম্যোদ্ধার)
 
(তুলনীয়–হিন্দুমৌলবাদীদের অনুমোদিত ও ক্ষমতাশীল থাকার সময় উত্তর প্রদেশে কিছুদিন আগেও সরকারীভাবে উৎসাহিত পাঠ্যপুস্তকের কিছু অংশ–’নারীমুক্তি শুরু হয়েছে। এই কিছুদিন আগেও মেয়েরা চার দেওয়ালের মধ্যে থাকত ও সংসারকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখত। এখন তারা কাজে বেরুচ্ছে-পেছনে ফেলে যাচ্ছে তার সংসারকে। নারী-স্বাধীনতা পরিবারে এক ধরনের চাপ-এর সৃষ্টি করে এবং অনেক পরিবার এই স্বাধীনচেতা, মুক্ত মনোভাবের জন্য ভেঙ্গে যায়।.’
 
‘যে সব আইন নারীদের অধিকার দিয়েছে সেগুলিও পারিবারিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন, ১৯৫৬; হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত আইন, ১৯৩৭; বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪; হিন্দু বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৫৫-এ সবগুলিই মেয়েদের অবস্থানকে উন্নত করেছে। মেয়েরা তাদের বাবা-মোর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও হচ্ছে। মেয়েদের অনুকূলে সরকারের শুরু গ্রগতিশীল আইনগুলির সমধিক ফল হচ্ছে পরিবারে উত্তল ও বিবাদের সৃষ্টি।’
 
নাৎসীদের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের এ ব্যাপারে মত ছিল, ‘মেয়েদের দায়িত্ব হচ্ছে নিজেরা সুন্দরী থাকা ও সন্তান ভূমিষ্ট করা…’
 
হিটলার-এর বক্তব্য ছিল, ‘মেয়েদেরও তাদের নিজস্ব যুদ্ধক্ষেত্ৰ আছে। দেশের জন্য প্রত্যেকটি শিশুর জন্ম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, দেশের স্বার্থে সে তার নিজস্ব লড়াই চালিয়ে যায়।’–ফ্রন্টলাইন, ৯.৪.৯৩ থেকে সংগৃহীত)
 
কিন্তু হিটলার বা হিন্দুমৌলবাদীর হুবহু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গান্ধীর মধ্যে নেই। তাই দেখি তিনি এও বলেন যে,–
 
‘পুরুষদের মত নারীদের ভিতর নিরক্ষরতার কারণ আলস্য ও জাড্য নয়। যে হীন অবস্থার বোঝা নারীকে স্মরণাতীত কাল থেকে অন্যায়ভাবে নিচিপষ্ট করে মারছে, নারীর বর্তমান অবস্থার প্রত্যক্ষ কারণ তাই। পুরুষ নারীকে তার কর্মসহচরী ও অর্ধাঙ্গীর মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে গৃহস্থলীর নীরস কৃত্য সম্পাদনাযন্ত্র ও সম্ভোগপত্রে পরিণত করেছে। ফলে সমাজ প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে। নারীকে অতি সঙ্গত কারণেই জাতির মাতা আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতি আমরা যে মহা অবিচার করেছি, তাঁদের ও আমাদের উভয়ের খাতিরে তার নিরাকরণ করতে হবে।’ (হরিজন; ১৮.২৯৩৯)
 
এবং এও তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ যে, ‘আমি যে বিশেষ কোন বর্ণের অন্তর্গত একথা তো আমি বহুদিনই ভুলিয়া গিয়াছি। কাজেই আমি নিজেকে ভাঙ্গী বলিয়া অভিহিত করিতে এবং সেইমত কাজ করিতে আনন্দ পাই। সমাজকে তো উচ্চনীচ স্তরে ভাগ করা চলে না। তাহা ছাড়া বৰ্ণহিন্দু সমাজ যদি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের লইয়াই হয় তাহা হইলে তাহারা তো শোচনীয়ভাবে সংখ্যালঘু। বৃটিশ শাসনের অবসানে ভারতে যখন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইবে তখন উচ্চবর্ণ হিসাবে এই তিনশ্রেণীর বিলোপ সাধন ঘটিবে। সকল অসামাই তখন অতীতের কাহিনী বলিয়া গণ্য হইবে এবং তখনই তথাকথিত দলিত শ্রেণী তাহাদের স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হইবে।’ (নোয়াখালি ডাইরি, ১৯৪৭)।
 
‘বৃটিশ শাসনের অবসানে ভারতে’ কি হয়েছিল তা অজানা নয়। গান্ধীর ভবিষ্যদবাণী সত্য হয়নি। উচ্চ তিনবর্ণ এখনো রয়েছে। এবং সত্যি কথা বলতে কি এমন সোনার পাথর বাটি সম্ভবও নয়। তিনি নিজে সারাজীবন ধরে নিজেকে, উচ্চবর্ণের না হোক, হিন্দু বলে মনে করবেন এবং হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলি পড়ানোর সুপারিশ করবেন (-রামায়ণ, মহাভারত বা ভাগবতের মত যেসব গ্ৰন্থ বৰ্ণাশ্রমের ব্যাপক প্রচারে ভরা,)—আর শেষ সময়ে আশা করবেন বৰ্ণভেদ লুপ্ত হবে, এটি যে হওয়ার নয় তা সহজবুদ্ধিতেও বোঝা যায় এবং এইভাবেই সম্ভব হয় নি হিন্দুমুসলমান বিভাজনকে আটকাতে, এদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থানকে রুখতে। এই উত্থানের পেছনে গান্ধী তথা কংগ্রেসের ভূমিকা,-’তাদের সাম্প্রদায়িক না বলা গেলেও এবং তারা ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার কথা বল্লেও, ছিল।
 
তাই দেখি তাঁর উত্তরসূরী শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী হিন্দু মৌলবাদীদের উৎসাহিত করছেন। (‘বিশেষত ১৯৮০ সালের পর থেকে শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী হিন্দু ভোটের উপর নির্ভর করতে শুরু করলেন, কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সংখ্যালঘু ভোটের উপর তিনি আর ভরসা করতে পারবেন না। ১৯৮১ সালে মীনাক্ষীপুরমে কয়েকটি হরিজন পরিবার ধর্মান্তরিত হয়। এই ঘটনার পর তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ গঠন ও তার প্রসারকে প্রচ্ছন্নভাবে উৎসাহ দিতে লাগলেন। হিন্দুদের ভিতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রভাব বাড়তে লাগল, বাড়তে লাগল তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা। এই ব্যাপারটিও শ্ৰীমতি গান্ধীকে আরো বেশি ঠেলে দিল হিন্দু ভোট জয়ের লক্ষ্যে এগনোর পথে।’-আসগর আলি ইঞ্জিনীয়ার-এর প্রবন্ধ ‘বন্ধ হোক এই পাগলামি’) এমনকি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃষ্ঠপোষক (যান্ত্রিক!) হিসেবে প্রচারিত রাজীব গান্ধীও অপরিণামদর্শীর মত, নিতান্তই সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিমও হিন্দুমৌলবাদীদের উৎসাহিত করেছেন ও তোষণ করেছেন। শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় মুসলমান মৌলবাদীদের ক্ষুব্ধ করলে তাদের আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে সেই রায়কে নাকচ করিয়ে ১৯৮৬-এর মে মাসে মধ্যযুগীয় মুসলিম মহিলা বিল সংসদে পাশ করানো হল। সংসদে বিলটি ২৫শে ফেব্রুয়ারী পেশ করার আগে হিন্দুমৌলবাদীদের খুশি করতে ফৈজাবাদ জেলা আদালতের মাধ্যমে বাবরি মসজিদের দরজা হিন্দুদের জন্য খুলে দেওয়া হল। তার আগের ও পরের ইতিহাস অনেকের জানা, এখানে বিস্তারিত জানানোরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু অমৌলবাদীর মুখোশ পরা ব্যক্তিদের হাতেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও মৌলবাদের তোষণ কেমন জঘন্যভাবে হতে পারে—এসব তারই ইতিবৃত্ত। এগুলিকে ‘পাগলামি’ বলা অনেকটা ক্ষমা করে দেওয়ার সামিল। মৌলবাদকে সস্তুষ্ট ও উৎসাহিত করতে এ ধরনের কাজ ও কথাবার্তা মৌলবাদী ক্রিয়াকাণ্ডেরই একটি দিক। ঈশ্বরও ধর্ম-বিশ্বাসের দ্বারা নিষিক্ত হয়ে গান্ধীবাদী কংগ্রেসী রাজনীতির মধ্যে হিন্দু মৌলবাদ একদা এভাবেই পরিপুষ্ট হয়েছে।
 
অন্যদিকে একসময় বামপন্থীদের মত জয়প্রকাশ নারায়ণও হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে ইন্দিরা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও ভারতীয় জনসঙ্ঘ তার সহযোগী হয়ে যায়। ১৯৭৪-এর ডিসেম্বরে আর এস এস-এর সরীসংঘচালক বালাসাহেব দেওরস। জয়প্ৰকাশকে ‘সন্ত’ বলে অভিনন্দিত করেছেন। আর ১৯৭৫-এর মার্চে জয়প্রকাশও প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির অভিযোগ থেকে জনসঙ্ঘকে মুক্তি দেন।(১) ১৯৭৫-এর ২৫শে জুন (জরুরী অবস্থা ঘোষণার ঠিক আগে) লোক সংঘর্ষ সমিতি গড়া হলে প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক ও শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা নানাজি দেশমুখকে তার সম্পাদক করে দেওয়া হয়। ঐ সময় ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে এ ধরনের আঁতাত কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল তার বিচার করার সুযোগ ও সামৰ্থ্য এখানে নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, দেশের মানুষের কাছে তাদের ক্রমশ গ্রহণযোগ্য করে তোলার এবং তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এধরনের পদক্ষেপের কিছু ভূমিকা আছেই। স্বৈরতন্ত্র, দক্ষিণপন্থা ইত্যাদির চেয়ে ধর্মীয় মৌলবাদীরা যে তবু গ্রহণযোগ্য—এই ধরনের একটি সর্বনাশা ধারণাও তা তৈরী করতে পেরেছে। এখন তার ফল ফলতে শুরু করেছে।
 
আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে আরো সুস্পষ্টভাবে ইসলামী মৌলবাদীরা তথাকথিত অ-মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তিদের দ্বারা উৎসাহিত ও পরিপুষ্ট হয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-এর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। পাকিস্থানী শাসন মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম সারা পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের মধ্যে যেমন, তেমনি ভারতে, বিশেষত ভারতীয় বাঙালীদের মধ্যে একটি আবেগ ও আশার সঞ্চার করেছিল। এও হয়তো আশা করা গেছিল যে, সাম্প্রদায়িক মুসলীম লীগ-এর উত্তরাধিকারী মৌলবাদী জামাতে ইসলামীর কারাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশের জনগণ মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু এ ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।
 
আওয়ামী লীগ আসলে ছিল মুসলিম লীগ থেকে ভেঙ্গে আসা একটি অংশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে নাম পাল্টে হয় ‘আওয়ামী লীগ’। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এভাবে নাম পাল্টালেও নেতৃত্বের অধিকাংশই তাঁদের সাম্প্রদায়িক ইসলামী চরিত্র এবং নিজেদের গোঁড়া মুসলিম পরিচয়কে অক্ষুন্ন রাখেন। এই অবস্থায় স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিলেও অবশেষে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের দোসরে পরিণত হওয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তার ভালভাবেই ছিল।
 
এরই প্রতিফলন ঘটে ঐ আওয়ামী লীগের আমলে অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বাড়বাড়ন্তের মধ্যে; তাদের সংখ্যা বাড়ানো হয়, মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিও করা হয়। এবং আরো ভয়াবহ হল, আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭১এর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও ঘাতক দালালদের প্রতি নমনীয় নীতিও গ্ৰহণ করে; পাশাপাশি বামপন্থী কর্মীদের উপর নিপীড়ন নামায়, তাদের হত্যাও করতে থাকে লালবাহিনী, রক্ষী বাহিনী ইত্যাদির মাধ্যমে। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শুরুর দিকে বলা হলেও, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নতুন করে টেলিভিশন রেডিওতে ‘খোদা হাফেজ’ বলা চালু হয়, সরকারীভাবে গণভবনে ধর্মীয় মিলাদ অনুষ্ঠানও করা হয়। তবু আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ধর্মীয় দলসহ জামাতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করেছিল।
 
কিন্তু পরবর্তীকালে সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৭৮) জামাতে ইসলামীর উপর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের প্রকাশ্যে ও আইনসঙ্গতভাবে একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হল। ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক লড়াই নয়, তাদের রাজনৈতিকভাবে মর্যাদা দেওয়া ও প্রতিষ্ঠিত করার কাজই করা হল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি এন পি) এই জিয়াউর রহমানেরই রাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগ সদ্যপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে ধর্মীয়া (ইসলামী) প্রভাব যেমন ঢোকানো শুরু করেছিল, এই জিয়াউর রহমানের আমলে তারই ধারাবাহিকতায় সংবিধানেই ‘বিসমিল্লাহ রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করা হল। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে ধর্মকে এইভাবে রাষ্ট্ৰীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত করার পরোক্ষ ফলাফলই হোল ধর্মীয় মৌলবাদীদের নৈতিক জয় ঘোষণা করা এবং তাদের উৎসাহিত করা।
 
আর এর পরে এরশাদের আমলে তো বামপন্থীরাও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে পরোক্ষভাবে উঠে পড়ে লেগে যায় মৌলবাদী জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্ৰতিষ্ঠাকে শক্তিশালী করতে। একইভাবে পশ্চিমবাংলাতেও বামপন্থীরা ১৯৮৫ সালে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের পর ত্রিশঙ্কু ফলাফলের সময় বিজেপি-র সমর্থন নিয়ে (অর্থাৎ তাদের সহযোগী বা বন্ধু হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে) পুরসভা গঠন করে। তবে বাংলাদেশের বামপন্থীদের সঙ্গে পশ্চিমবাংলার বামপন্থীদের একটি বড় তফাৎ হচ্ছে–এখানকার তথাকথিত বামপন্থীদের বিপুল অংশ আদৌ ধর্মমোহমুক্ত না হলেও,-প্রকাশ্যে বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকদের মত নির্বাচনী পোস্টারে (১৯৯১) ‘আল্লাহো আকবর’-এর সমগোত্রীয় (‘জয়শ্ৰীরাম’ কিংবা ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, কারণ তিনি সত্য’?) শ্লোগান কখনোই দেন নি। তাঁদের নেতার মৃত্যুতে পার্টি অফিসে ধর্মীয় শ্ৰাদ্ধানুষ্ঠান করার কথাও তারা ভাবতে পারেন না, যেমন বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টি অফিসে মিলাদ অনুষ্ঠানের কথা জানা আছে। এছাড়া অস্তুত বর্তমানে পশ্চিমবাংলার বামপন্থীরা বিজেপি-র মত হিন্দু মৌলবাদীদের থেকে শত হাত দূরে থাকার চেষ্টা করেন। যেমন ১৯৯৫-এ কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের পর, ১০ বছর আগেকার ঐ ত্রিশঙ্কু ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও তারা (এবং কংগ্রেসীরাও) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, আর যাই হোক নির্বাচিত দুই বিজেপি সদস্যার সমর্থন র্তারা পুরসভা গঠন করতে আদৌ গ্ৰহণ করবেন না। স্বস্তিকর ও সুস্থ এই ব্যাপারটির মধ্যে আন্তরিকতা কতটা, আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদ কতটা তার বিচার করা মুস্কিল,-বিশেষত যখন মুসলিম লীগ ও বিজেপিদের সঙ্গে তাদের রাতনৈতিক আঁততের পূর্ব ইতিহাস অজানা নয়।
 
ধর্মের সঙ্গে, ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে এই ধরনের সুবিধাবাদী আঁতীতের পেছনে নিছক সুবিধাবাদ ছাড়াও ধর্মের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ, ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা, নিজেদের সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণীভিত্তি ইত্যাদিও কাজ করে।
 
ধর্মীয় মৌলবাদীদের এখানে এই একটি বড় সুবিধা। বামপন্থীদের স্রোতের বিরুদ্ধে হাঁটতে হয়, বহু শত বছরের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের জনবিরোধী চরিত্রটি উন্মোচিত করে বস্তুবাদী দর্শনকে তুলে ধরতে হয় এবং কোন অতিপ্রাকৃতিক ঐশ্বরিক শক্তির উপর নির্ভর করে নয়, মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভরতায় বলিষ্ঠ করতে হয়। একাজে এখনো সঙ্গী যেমন কম, তেমনি নিজেদের সহযোগী হিসেবে মনে করা ব্যক্তিদের মধ্যে দোদুল্যমানতাও বেশি। অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদীরা হাঁটে স্রোতের দিকেই। যে অলীক ঐশ্বরিক কল্পনা ও মায়াময় ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে রেখে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিত্তিহীন সাহসের সন্ধান করে, সেই কল্পনা ও বিশ্বাসকে আরো তীব্র হিংস্রভাবে সুসংহত করে মৌলবাদীরা। আর প্রচলিত এই স্রোতের গাড ধরে এগোেনর পথে তারা কখনো কখনো সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যায় বামপন্থী বা কম্যুনিষ্ট, গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত ও প্রচারিত এবং মৌলবাদের ছাপ্লামুক্ত মানুষদেরও,-মূলত তাদের অন্তর্নিহিত ধর্মবিশ্বাসের কারণে।
 
বামপন্থী বা কম্যুনিষ্টসহ এ ধরনের মানুষেরা নানা জটিল সময়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সাহায্য করলেও, কম্যুনিজমকে সামান্য সাহায্য করা দূরের কথা ধর্মীয় মৌলবাদীরা কিন্তু তীব্রভাবে এই কম্যুনিজমের বিরোধী। কি আমেরিকায় ফান্ডামেন্টালিস্টরা, কি হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীরা সবার ক্ষেত্রেই এটি অন্যতম সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও ধর্মের অন্তঃসলিলা চোরাস্রোতের কারণে তারা অমৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত আবামপন্থীদের থেকে তো বটেই, এমনকি? বামপন্থীদের থেকেও বা তার আপাত শত্রুদের কাছ থেকেও সহযোগিতা আদায় করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
 
মানসিকতা ও কিছু কাজকর্মে একনায়কতন্ত্র বা ম্বৈরতান্ত্রিক আচরণ মৌলবাদের আরেকটি বিশেষ চারিত্রিক দিক হিসেবে প্রতিফলিত হয়। এটির উৎস আসলে বিশেষ একটি ধারণার প্রতি দ্বিধাহীন বিশ্বাস থাকার কারণে। বাইবেল, কোরান বা বেদ ঐগুলি ঐশ্বরিক ও সর্বোত্তম, এদের সামান্য পরিবর্তন করা বা অবমাননা, সমালোচনা করাও ধর্মবিরোধী–এ ধরনের বিশ্বাস থাকলে নিজের কাজের ক্ষেত্রেও এমন গোঁড়ামির বহিঃপ্রকাশ ঘটতে বাধ্য এবং তার ফলশ্রুতিতে নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের পরিবেশও সৃষ্টি হয়। মূলগত ঐ গোঁড়ামির কারণে নেতৃত্বেরও সামান্য সমালোচনা করার মানসিকতাই ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। নেতা তখন ঈশ্বরের এবং তার কথা (বাণী!) ধর্মগ্রন্থের সমগোত্রীয় হয়ে দাঁড়ায়।
 
হিটলার-গোয়েবলসরাও নিজেদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশুদ্ধ আর্যরক্তের তত্ত্বে গভীরভাবে বিশ্বাস করত। তাদের নীতিই ছিল—একটি মিথ্যাকে বারবার বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলা। এই বিশ্বাস ও এই মিথ্যার স্বার্থে তারা কি পাশবিক ক্রিয়াকাণ্ড করেছে তা আজ কারোর অজানা নয়।
 
ধর্মীয় মৌলবাদীরাও ফ্যাসীবাদীদের মত প্রায় একই ঢঙে কাজ করে। আর কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও একই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিকতা ও অগণতান্ত্রিকতা কাজ করতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে রাজনৈতিক দলের মধ্যে বা অন্য কোন গণতান্ত্রিক সংগঠনের মধ্যে এই প্রবণতা সংগঠনের অসুস্থতা ও ক্ষয়ের লক্ষণ। কিন্তু রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক মৌলবাদী সংগঠনের ক্ষেত্রে এটি তার অবধারিত বৈশিষ্ট্য। এবং এ কারণে হিটলারীয় দর্শন থেকে শিক্ষালাভ করার কথা দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারণ করে তারা। যেমন করেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এস এম গোলওয়ালকর তার ‘উই আর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ (১৯৩৮) গ্রন্থে – ‘জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমেটিক জাতি-ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেছে। জাতিত্বের গর্ব এখানে তার সর্বোচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। জার্মানি এটাও প্রমাণ করেছে যে, নিজস্ব ভিন্ন শিকড় আছে এমন জাতি বা সংস্কৃতির একসঙ্গে মিশে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা তৈরী করা অসম্ভব। এই শিক্ষা হিন্দুস্তানে আমাদের গ্রহণ করা এবং তার থেকে আমাদের উপকৃত হওয়া প্রয়োজন।’
 
মুসলিম মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িকতাবাদীরাও একই কথা বলে; যেমন, ১৯৪১এর মার্চ মাসে সিন্ধু-র মুসলিম লীগ নেতা এম. এইচ. গজদর করাচীর সভায় বলেছিলেন, ‘হিন্দুরা যদি ঠিকমত ব্যবহার না করে তবে জার্মানী থেকে ইহুদিদের যেমন দূর করে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও তাই করতে হবে।’ ফ্যাসিবাদ মৌলবাদের গুরুদেব!
 
গোলওয়ালকর অন্যত্র আরো বলেছিলেন,–‘আমাদের দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এই কথাই বলে যে সমস্ত কিছু করেছে একমাত্র হিন্দুরা। এর অর্থ এই যে কেবল হিন্দুরাই এই মাটির সন্তান হিসেবে বসবাস করেছে।’
 
এবং তাই— ‘…হিন্দুস্থানের সমস্ত অহিন্দু মানুষ হয়। হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি গ্ৰহণ করবে, হিন্দু ধর্মকে শ্ৰদ্ধা করবে ও পবিত্র বলে জ্ঞান করবে, হিন্দু জাতির গৌরব গাথা ভিন্ন অন্য কোন ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না, অর্থাৎ তারা শুধু তাদের অসহিষ্ণুতার মনোভাব এবং এই সুপ্রাচীন দেশ ও তার ঐতিহ্যের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাবই ত্যাগ করবে না, এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তির মনোভাব তৈরী করবে। এক কথায় তারা হয়। আর বিদেশী হয়ে থাকবে না, না হলে সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জাতির এই দেশে তারা থাকবে অধীনস্থ হয়ে, কোনও দাবি ছাড়া, কোনও সুবিধা ছাড়া এবং কোনও রকমের পক্ষপাতমূলক ব্যবহার ছাড়া। এমনকি নাগরিক অধিকারও তাদের থাকবে না।’’
 
নামাজ না পড়া, মদ্যপানে অভ্যস্ত মহম্মদ আলি জিন্না-ও আসলে কতটা ইসলামে আস্থা রাখতেন, ঐ বিতর্ক থাকলেও, রাজনৈতিক শ্রেণী স্বার্থে তিনিও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করতে গিয়ে ১৯৪১ সালে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মুসলিমদের ব্যাপক অংশ এখন সহস্ৰাধিক বছর ধরে একটি ভিন্ন জগত, একটি ভিন্ন সমাজ, একটি ভিন্ন দর্শন ও একটি ভিন্ন অবস্থায় জীবন নির্বাহ করছে।’ সব শেয়ালের একই রা!
 
বর্তমানের হিন্দু মৌলবাদী সমস্ত সংগঠনেরও মূলকথা এইই।** এই সংকীর্ণতম, অগণতান্ত্রিক, অনৈতিহাসিক মিথ্যাচারকে বারংবার বলে বলেই তারা দেশের বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও ইসলাম ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করেছে। এবং করছেও, যেমন করেছিল হিটলার ও তার সঙ্গীসাথীরা।
 
এবং তাদেরই মত এরাও কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় কর্মীদের শিক্ষিত ও অভ্যস্ত করে। যেমন আর এস এস-এর নতুন সদস্য এলে তাদের নিয়মিত এই প্রশ্ন করা হয়,-’যদি তোমার অধিকারী’ তোমাকে কুঁয়োয় ঝাপ দিতে বলে, তুমি কি করবো?’ প্রত্যাশিত উত্তর হল, ‘আমি তক্ষুণি ঝাপ দেব।’ কোন প্রশ্ন নয়, কোন অজুহাত নয়। কেউ উত্তর দিতে দ্বিধা করলে তাকে বিদ্রুপে জর্জরিত করা হয়। অন্যদিকে আর এস এস-এর নিয়মিত অনুষ্ঠানের একটি হচ্ছে সেপ্টেম্বরের ব্যাসপূজা। এই সময় গেরুয়া পতাকার পূজা করা হয় এবং সদস্যরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অর্থ দান করেন। এই দান থেকেই সংগঠনের ভাণ্ডার পরিপুষ্ট হয়, কিন্তু তার কোন রসিদ দেওয়া হয় না, কোনও নথিও রাখা হয় না। সব মিলিয়ে কি সাংগঠনিক, কি আর্থিক সমস্ত দিক থেকেই নেতৃত্বের চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়। নেতৃত্বকে কোনভাবে প্রশ্ন করা, বিচার করা, সন্দেহ করার মানসিকতাটিকেই ধ্বংস করা হয়। এই মানসিকতা না থাকাটাই মূল ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে অন্ধভাবে মেনে চলার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। হিটলারের নাৎসিবাহিনীও একইভাবে পরিচালিত হত। পাকিস্তানে জামাতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীও একই হিটলারীয় কায়দার কথা বলেছেন। তাঁর মতে ইসলামী রাষ্ট্রে থাকবে শুধু একটিমাত্র দল, হিজাব-ই-আল্লা (অর্থাৎ the party of God)। কোরান শরীফেও বলা হয়েছে, ‘তারা কি জানে না যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করে তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন, সেথায় সে স্থায়ী হবে, উহা ভীষণ লাঞ্ছনা।’ (সূরা ৯ আয়াত ৬৩) কিংবা ‘এবং যারা অবিশ্বাস করে ও আমার নিদর্শন সমূহে মিথ্যারোপ করে, তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে সর্বদা অবস্থান করবে।’ (সূরা ২, আয়াত ৩৯) অর্থাৎ অবিশ্বাস করার কোন উপায় নেই। সব মিলিয়ে প্রতিটি ধর্মীয় মৌলবাদী ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে একনায়কতন্ত্রী প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছেই।
 
ব্যাপারটিকে ফ্যাসিস্ট কায়দার সঙ্গে তুলনা করা যায়। কঠোরভাবে কম্যুনিজম বিরোধী, হিংস্র জাতীয়তাবাদী এই ফ্যাসিস্টদের মতই ধর্মীয় মৌলবাদীরাও বিশেষ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, কাজেকর্মে হিংস্র এবং মূলগতভাবে কম্যুনিজম বিরোধী। কিন্তু স্পষ্টতই আগেকার ঐ ফ্যাসিস্টদের থেকে এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রধান ও বীভৎস পার্থক্য হল, দ্বিতীয়রা ফ্যাসিস্ট কায়দার সঙ্গে ধর্মের ও ধর্মীয় বিভাজনের মত একটি কৃত্রিম ও নিছক বিশ্বাসগত দিকের সম্পূক্ত সংমিশ্রণ ঘটায়। এই চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ইরানের মুসলিম মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে,
 
‘এই ব্যবস্থার ও মুসলমানদের ন্যায়পরায়ণ ইমাম (খোমেনি)-র বিরোধিতা যে করে, তার উপযুক্ত শাস্তি মৃত্যু। তেমন কোন লোক গ্রেপ্তার হলে তাকে হত্যা করতে হবে। সে আহত হলে তাকে আরো আহত করতে হবে, যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। যে বর্তমান ব্যবস্থা ও ন্যায়বান ইমামের বিরুদ্ধে, তার একমাত্র দণ্ড মৃত্যু।’ (১৯৮১ তে জুম্মাবারে ইরানের পাবলিক প্রসিকিউটার আয়াতোল্লা মুসাভি তাবরিজির নামাজ-কালীন বক্তৃতার অংশ।) ১৯৯০-এর অক্টোবরে অযোধ্যা ও ফৈজাবাদের বাড়ী ও মন্দিরগুলির দেওয়াল লিপিতে ‘হিন্দুদের বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কাজ যারা গোহিত্যা করে তাদের হত্যা করা’ ধরনের নির্দেশও ওই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
 
ফ্যাসিস্টদের মত এদের দ্বিধাহীন নিরলস কম্যুনিজমবিরোধিতার কথা সর্বজনবিদিত। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর ৪ঠা ফেব্রুয়ারী, আর এস এস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তাদের উপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে গোলওয়ালকার নেহেরু ও প্যাটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কাছে লেখা ২৪শে সেপ্টেম্বর এর চিঠিতে তিনি এ ব্যাপারে সব চেয়ে জোর দেন যে,–দেশে কম্যুনিজম-এর প্রসার আটকাতে গেলে আর.এস.এস.কে খোলাখুলি কাজ করতে দেওয়া উচিত। বাম, জাভা, ইন্দোচীন ইত্যাদি। পার্শ্ববতী দেশের বিপজ্জনক ঘটনাবলীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনার সরকারি ক্ষমতা এবং আমাদের সংগঠিত সাংস্কৃতিক শক্তি এক হলে আমরা এই বিপদের (কমিউনিজমের প্রসারের) অবসান করতে পারব।’ নেহরুরা অবশ্য এই যুক্তিতে টলেননি, কিন্তু কম্যুনিজম বিরোধিতায় আর এস এস চক্রের চরম আগ্রহ ও নীতিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে কোন সন্দেহ থাকে না। বাংলাদেশেও মুসলিম মৌলবাদী জামাতে ইসলামীরা হিন্দুদের থেকে কম্যুনিষ্টদের ও বামপন্থা তথা মার্কসীয় দর্শনকে অনেক বেশি আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। আমেরিকার ফান্ডামেন্ডালিস্টদের থেকেই এই ধারা চলছে। আসলে আদর্শ হিসেবে কমিউনিজমের তথা বস্তুবাদী দর্শনের তীব্র কঠোর ও নিরলস বিরোধিতা না করলে এই মৌলবাদী মানসিকতাকে টিকিয়ে রাখা ও তার প্রসার করা যাবে না। ফ্যাসিস্টদের হিংস্র কম্যুনিজম বিরোধিতার সঙ্গে মৌলবাদীদের কিছু সাযুজ্যও তাই চোখে পড়ে।
 
মৌলবাদ-মৌলবাদী প্রসঙ্গে আরেকটি কথাও বলা দরকার। মৌলবাদ একটি সাধারণ দৃষ্টিঙ্গিী হলেও এবং খৃস্ট বা হিন্দু বা ইসলামী মৌলবাদী বলে উচ্চারণ করলেও, একই ধর্মের মৌলবাদীরা যে গভীরভাবে ঐক্যবদ্ধ তা নয়। ধর্মের প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য থাকলেও এবং একই ধর্মের মৌলবাদীদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র থাকলেও, নানা স্বার্থের সংঘাতের কারণে এবং ধর্মের মূল কোনটি তা নিয়ে বিতর্কের কারণে তাদের মধ্যে অনৈক্যও থাকে। আমেরিকার খৃস্টীয় ফান্ডামেন্ডালিস্টরা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা কিভাবে গড়ে তুলেছিল তা আমরা আগেই দেখেছি। ইরান ও পাকিস্থানে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হলেও দু’দেশের মৌলবাদীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে কিছু তফাৎ আছে। ইরানে মৌলবাদের একটি বড় ভূমিকা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায়। পাকিস্থানে আবার মৌলবাদীরা সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। আরবে ইসলামী মৌলবাদের মধ্যে রাজার মৌলবাদ’ ও ‘র্যাডিক্যাল মৌলবাদী হিসেবে দুটি পৃথক ধারা লক্ষ্য করা যায় এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষও ঘটে অর্থাৎ ইসলামী মৌলবাদের সঙ্গে ইসলামী মৌলবাদের সংঘর্ষ। র্যাডিক্যাল ইসলামী মৌলবাদীরা কয়েক বছর আগে এই ধরনের একটি সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষণের জন্য কাবা দখলও করে নিয়েছিল। হিন্দু মৌলবাদীদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসঙ্ঘ (আর.এস এস) সাংগঠনিক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভি এইচ পি) সামাজিক ও এককালের ভারতীয় জনসংঘ (বি জে এস)-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী ভারতীয় জনতাপার্টি (বি জে পি) ‘রাজনৈতিক দিকগুলি প্ৰধানত দেখাশুনা করে এবং বিজেপি-র প্রাক্তন সহ সভাপতি সুন্দরসিং ভাণ্ডারির মতে তিনটিই স্বক্ষেত্রে স্বাধীন, তিনটিই জাতীয় সংগঠন, কিন্তু একই হিন্দুত্বের সংস্কৃতি দ্বারা পরিচালিত। এদের সঙ্গে শিবসেনা সহ আরো বহু সংগঠন (যেমন অখিল ভারত বিদ্যাখী পরিষদ, রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি, দুর্গ বাহিনী, ভারতীয় মজদুর সংঘ বা বি এম এস, নানা সাইজের সাধুদের হরেক রকম সংস্থা ইত্যাদি) এদের সহযোগী। কিন্তু এদের মধ্যে নানা বিরোধও মাঝেমাঝেই মাথা চাড়া দেয়। মহারাষ্ট্রে আমেরিকান সংস্থা এনরন প্রসঙ্গে শিবসেনা ও বিজেপির মতবিরোধ। আপাত ও সাময়িক হলেও গোপন নেই। গুজরাতে বিজেপি নেতৃত্বের ক্ষমতার লড়াই নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মেয়েরাও গোলওয়ালকরের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীকে অস্বীকার করতে চাইছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের দাবী ‘নারীর সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য নারীর আর্থিক স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক। সুতরাং এই আর্থিক স্বাধীনতার প্রয়াসে চাকুরিরত মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ প্রয়োজন এবং এ সম্পর্কিত মামলার নিম্পত্তির জন্য মহিলা বিচারক আবশ্যক।’ (রাষ্ট্র সেবিকা। সমিতির পত্রিকা ‘জাগৃতি-তে প্রকাশিত; এখানে ‘খাকি প্যান্ট গেরুয়া ঝাণ্ডা’ থেকে সংগৃহীত) ভারতের চার পীঠের শঙ্করাচার্যদের সঙ্গে বজরঙ্গ দল বা বিশ্ব হিন্দুপরিষদ ইত্যাদির মতানৈক্য অজানা নয়। মুসলিম মৌলবাদীদের অসংখ্য সংগঠন রয়েছে। এবং ধর্মরক্ষার প্রশ্নে কে সাচ্চা তা নিয়ে বিরোধও আছে। সব মিলিয়ে অন্তত একই ধর্মের মৌলবাদীরা এক কাট্টা হয়ে, অতি সুসংহত ভাবে ভিন্ন ধর্মকে আক্রমণ করছে বা সমগ্ৰ দেশকে গ্ৰাস করতে চাইছে-এমন ভাবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পশ্চাদপদ মানসিকতাই শুধু তাদের প্রধান দুর্বলতা নয়, তাদের নিজেদের মধ্যে অনৈক্যও যে আছে সেটিও জেনে রাখা ভাল।
 
কিন্তু বহুশত বছরের অভ্যস্ত ব্যাপক ধর্মবিশ্বাসের কারণে তাদের যে সার্বিক ঐক্য রয়েছে তাকে উপেক্ষা করার কোন কারণ নেই, বিশেষত নবীন ও তুলনায় অনভিজ্ঞ বামপন্থার সাম্প্রতিক অনৈক্য ও দিশেহারা অবস্থার কথা মাথায় রাখলে। তাই বিশেষ ধর্মের প্রসঙ্গে একই ধর্মের কিন্তু বিচ্ছিন্ন সব মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিই বিশেষ অবস্থায় অনৈক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে যেমন হয়েছিল ইসলামী মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পরে।
 
এখনকার বিশেষ বিশেষ ধর্মের মৌলবাদীরা নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতা দখলের লড়াই চালাচ্ছে। ভিন্ন ধর্মের মৌলবাদীরা এই এলাকায় যতক্ষণ না অনুপ্রবেশ করে, ততক্ষণ ভিন্ন ধর্মের হলেও, এইসব মৌলবাদীদের মধ্যেও ঐক্য রয়েছে—এই ঐক্যের ভিত্তি ধৰ্মরক্ষার তাড়না; হিন্দু হোক, ইসলাম হোক বা খৃস্ট হোক, সাধারণভাবে ধর্মের উপর আঘাত রুখতে তারা এক কাট্টা!! তাই বির্বতনবাদ বা মার্কসীয় দর্শনের উপর এরা সবাই খাপ্পা। পাকিস্থানে বা বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেও কিংবা ভারতের বুকে বসে হিন্দু মৌলবাদীরা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বল্লেও মূলগতভাবে হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা পরস্পরের শুভাকাঙ্খী ও সুহৃদ।
 
তাই দেখা যায় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের কিছু আগে জামাতে ইসলামী প্রকাশিত পুস্তিকায় (জামাতে ইসলাম কি দাওয়াৎ’) মওদুদীর বন্ধুত্বপূর্ণ আবেদন, ‘ভারতের একটি অংশ দেওয়া হবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠদের এবং অন্য একটি অংশ নিয়ন্ত্রিত হবে অমুসলমানদের দ্বারা। প্রথম অংশে (পাকিস্থানে)। আমরা জনমত সংগঠিত করবো যাতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ইসলামী আইনের উপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। অন্য অংশে আমরা হব সংখ্যালঘু এবং আপনারা (হিন্দুরা) হবেন সংখ্যাগুরু। আমরা আপনাদের অনুরোধ করব রামচন্দ্ৰ, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, গুরু নানক ও অন্যান্য সাধুসন্তদের জীবন ও শিক্ষা অধ্যয়ন করতে। দয়া করে বেদ, পুরাণ, শাস্ত্র ও অন্যান্য বই পাঠ করুন। এইসব থেকে যদি আপনারা কোন ঐশ্বরিক দিগনির্দেশ পান তাহলে তার ভিত্তিতেই আপনারা নিজেদের শাসনতন্ত্র তৈরী করুন। আপনাদের ধর্মের নীতি অনুযায়ী আপনারা আমাদের সঙ্গে আচরণ করুন। এ অনুরোধ আপনাদের করবো এবং এ নিয়ে আমরা কোন আপত্তি করব না।’ ১৯৫৩-তে দাঙ্গা শুরু করে এবং বহু কাদিয়ানীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দাঙ্গার পর পাকিস্থান সরকার যে তদন্ত কমিশন করে তাতে সাক্ষ্য দিতে গিয়েও মওদুদী জানিয়েছিলেন, ‘ভারতের মুসলমানরা ঐ ধরনের সরকারে যদি ম্লেচ্ছ ও শূদ্র হিসেবেও বিবেচিত হয় ও সেখানে মনুর আইন জারি হয় এবং তারা সরকারে অংশগ্রহণের ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলেও আমি তাতে আপত্তি করব না।’
 
এটি অন্তত কিছুটা সুখের ব্যাপার ছিল যে, ১৯৪৭-এর পরে ভারত ধর্মীয় (হিন্দু) রাষ্ট্র হয় নি। কিন্তু এখনকার হিন্দু মৌলবাদীরা হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে খোয়াব দেখছে, তাতে মুসলমানদের প্রতি এদের বৈরি আচরণকেও যে মুসলিম মৌলবাদীরা সমর্থন করবে তাতে মনে হয় কোন সন্দেহ নেই। অর্থাৎ ধর্মবিশ্বাসী জনগণের সঙ্গে নয়, মৌলবাদীরা একাত্ম মৌলবাদীদের সঙ্গেই। তাই দেখা যায়, ১৯৯২-এর ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার অব্যবহিত আগে বাংলাদেশের জামাতেইসলামীর প্রতিনিধিরা অর্থাৎ মুসলিম মৌলবাদীরা, দিল্লিতে হিন্দু মৌলবাদীদের রাজনৈতিক মুখপাত্র ভারতীয় জনতাপার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করে গেছে এবং ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক দৃঢ়তর করে এসেছে। আসলে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার কাজটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় মৌলবাদীরই আকাঙ্খিত ছিল। হিন্দু মৌলবাদীরা এর ফলে হিন্দুদের সংগঠিত করতে পেরেছে; মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দুত্বের বা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের খেপিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে। ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বা তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইকে শক্তিশালী করার জন্য নয়, ধর্মের মত একটি কৃত্রিম পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে এবং ধর্মবিশ্বাসকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে নামিয়ে রাষ্ট্ৰীয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে সব ধরনের মৌলবাদীরাই কাজ করে। এইভাবে সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের চরিত্রই হচ্ছে জনবিরোধী,–এমন কি তারা নিজ ধর্মের জনসাধারণেরও স্বাৰ্থ দেখায় ততটা উৎসুক নয়, যতটা উৎসুক ধর্মকে রক্ষা করার অজুহাত সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্ষমতা অর্জন করার জন্য তথা শাসক ও শোষক হিসেবে আপন শ্রেণীস্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মুসলিম মৌলবাদীরা হিন্দু রাষ্ট্রে সাধারণ মুসলিমদের নাগরিক অধিকার না থাকলেও তেমন দুঃখিত হবে না। তেমনি হিন্দু মৌলবাদীরাও জন্মসূত্রে হিন্দু, এমনকি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু পরমতসহিষ্ণু, উদারনৈতিক ব্যক্তিদেরও ‘মেকি ধর্ম-নিরপেক্ষ বা ‘মুসলিম তোষণকারী’ হিসেবে ছাপ মেরে অনায়াসে শত্রুর পর্যায়ে ফেলে দিচ্ছে। তাই প্রকৃত অর্থে ধর্ম ও জনসাধারণের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ধান্দাবাজি ও শ্রেণী:স্বার্থটিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরাও অন্যান্য খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। মৌলবাদীরা একসময় এমন সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হলেও ধর্ম তাদের কাজের একটি প্রাথমিক ভিত্তি। ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির সমগ্ৰতা জুড়ে ধর্মবিশ্বাস ছড়িয়ে থাকে। তার কাছে ধর্মের স্থান এবং মানুষের স্থান নিজের স্বার্থের উপরে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্মের ছাঁই গায়ে মাখে, তার আড়ালে লুকিয়ে রাখে। নিজের শ্রেণীস্বার্থ ও প্রকৃত ধান্দাগুলিকে। মানুষকে প্রতারণা করার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এখনকার ধর্মীয় মৌলবাদীদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
 
শ্ৰেণীবিভাজিত সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, ঐ ব্যবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের উর্বর বিচরণক্ষেত্র খুঁজে পায়। এই ধরনের রাষ্ট্র নিজ স্বার্থে ধর্ম ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সহ সমস্ত ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাদপদ। চিস্তাকে সযত্নে লালিত করে। এমন কি কোন রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর’ হলেও তার অনুরূপ মানসিকতার গরিষ্ঠ সংখ্যক জনগোষ্ঠীর দ্বারা নির্বাচিত প্ৰতিনিধির মাধ্যমে সে এমনকি মৌলবাদকেও উৎসাহিত করে যায়।
 
তাই দেখা যায় আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রধানদের গভীর বন্ধুত্ব একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পূর্বোক্ত বিলি গ্রাহাম (Billy Graham; জন্ম ১৯১৮)-এর কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০এর মধ্যে ইনি ফান্ডামেন্টালিস্টদের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৪৯এ-আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যাঁরি এস. ট্রম্যান একে হোয়াইট হাউসে প্রথম আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন। এবং সেই শুরু। হোয়াইট হাউসে। তঁর যাতায়াত এর পর অতি নিয়মিতই ঘটতে থাকে। বিলি গ্রাহাম পরবর্তী প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার, জনসন ও নিক্সনের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গলফ খেলার সঙ্গী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। রেগনের স্ত্রীর মত আমেরিকার ফাস্ট লেডিসহ বহু উচ্চশ্রেণীর বিশিষ্ট ব্যক্তিই জ্যোতিষীরও শরণাপন্ন হতেন বা হন। ফ্রান্সে রেজিস্টর্ড জ্যোতিষীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইংল্যান্ডে রাজা বা রানী গীজাঁর অধিকর্তা এবং রাষ্ট্র থেকেই গীর্জার খরচ মেটানো হয়। আমেরিকার ধর্মীয় দক্ষিণপন্থীরা (religious rights) প্ৰবল ক্ষমতার অধিকারী এবং আগের নির্বাচনে রিপাবলিকান সাফল্যের পেছনে ‘বাইবেল বেল্ট (ফান্ডামেন্টালিস্ট)-দের ভূমিকা কম ছিল না। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এদের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।
 
আর ভারতের মত দেশে তো কথাই নেই। বামপন্থী-দক্ষিণপন্থী সবাই জাতপাত ধর্মের রাজনীতি করে। তারা জনগণের মধ্যেকার এমন অমানবিক ও কৃত্রিম বিভাজনকে ব্যবহার করে নির্বাচনী কৌশল স্থির করে এবং এইভাবে এমন বিভাজনকে শক্তিশালী করে। আর্থিক প্রয়োজন নয়, জাত-পাতিভিত্তিক এই বিভাজন অনুযায়ী তারা শিক্ষা ও চাকরী সংরক্ষণ থেকে ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়া-নানাবিধ সুবিধা দিয়ে মানুষকে ভোলানোর চেষ্টা করে। বাম-ডান উভয় রাজনৈতিক নেতাই এটা ভুলে যান যে বা ভুলে থাকার ভান করেন যে, তথাকথিত মুচি, তাঁতী, চামার কিংবা সাঁওতাল-মুন্ড ইত্যাদি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-এর মধ্যেও শ্রেণীবিভাজন রয়েছে এবং ঐ সব অনুন্নত গোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষই নিজেদেরই গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী মানুষের দ্বারাও শোষিত হন। এদের সবাইকে একই চোখে দেখে ঢালাও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্যেকার শ্রেণীবিভাজনকে যেমন অস্বীকার করা হয়, তেমনি ঐ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের হাতই বেশি শক্ত করা হয়; আর মূল সমাজ থেকে তাদের চিহ্নিত করা ও বিচ্ছিন্ন করা তো হয়ই। পাশাপাশি তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের দরিদ্রতম অংশকেও বঞ্চিত করা হয়। এই ধরনের জাত-পাতি-ধর্ম ভিত্তিক, তথাকথিত জনদরদী সংরক্ষণ-নীতির পাশাপাশি ভারতের মত দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীরা চন্দ্ৰস্বামী বা সাইবাবার মত গুরুদের তথা ধান্দাবাজ ধৰ্মজীবীদের পেছনে ঘুরঘুর করেন, মসজিদ-গীর্জামন্দিরে ভক্তির প্রদর্শন করেন, জ্যোতিষীদের অবাধ পরামর্শ গ্রহণ করেন। এঁদের এই সব কান্ড করার পেছনে একটি বড় যে মানসিকতা কাজ করে, তা হয়তো ভোলতেয়ার-এরও ছিল এবং তাই তিনি বলেছিলেন–
 
‘আমি চাই যে আমার চাকর-বাকরেরা ধর্মে বিশ্বাস করুক, তাহলে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব।’
 
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক তোকভিল মন্তব্য করেছিলেন, ‘ফরাসী বিপ্লবের আগে দেশের অভিজাতশ্রেণী খুবই ধর্মবিরোধী ছিল। বিপ্লবের পর বিপদ বুঝে তারা আবার ধর্মের দিকে মুখ ফেরায়। তারপর এল। বুর্জেয়াদের পালা। তারাও বিপদ দেখে ধর্মের শরণ নিল।’
 
এই সব অভিজাত বা বুর্জোয়ারা যে সবসময় ধর্মীয় মৌলবাদী হবে তা অবশ্যই নয়। কিন্তু টুম্যান-আইনেহাওয়ার-জনসন-নিক্সনই হন বা ইন্দিরা-মুজিব-রাজীবনরসিমহা রাওরাই হন, —এঁরা প্রকাশ্যে ধর্মকে উৎসাহিত করতে, ধর্মের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যবহার করতে এবং এমন কি নানা সময়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গী হতে পিছপা হন না। এই অবস্থায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা উৎসাহ বোধ করে, শক্তি অর্জন করে এবং শত্রু হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারটি এর ফলে অনেক দুরূহ হয়ে ওঠে। অমৌলবাদী, গণতান্ত্রিক ও উদারপন্থী হিসেবে চিহিন্ত ঐ সব ব্যক্তিদেরই এক ধরনের সঙ্গী হিসেবে মৌলবাদীরা প্রতিষ্ঠিত হয়, হয়তো বা তাদের কাজটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
 
এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় লালিত ধর্মীয় মৌলবাদের যথাসম্ভব সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হল শ্রেণী-সমন্বয়ের মানসিকতা। বাস্তব অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে, অলীক ও কৃত্রিম ধর্মীয় বিভাজন তথা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি করেই তার সৃষ্টি ও টিকে থাকা। মার্কসীয় দর্শনকে সামনে রেখে যে সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে মৌলবাদী সংকীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতা থাকে, তাদের সঙ্গে এটি একটি গুণগত বড় তফাৎ—এঁরা অন্তত মুখে শ্রেণীসংগ্রামের কথা বলেন। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছে এই শ্রেণীবিভাজনই মূল্যহীন। হিন্দু, ইসলাম বা খৃস্ট-যে ধর্মেরই হোক না কেন ঐ ধর্মাবলম্বী সবার স্বার্থ যে এক নয় তা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ অস্বীকার করে। একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শাসকশাসিত বিভাজন আছে। হিন্দু শাসক ও শোষক হিন্দুদের মৃদুভাবে শাসন করে ও কম শোষণ করে তা নয়। হিন্দু জমিদার হিন্দুপ্রজাদের উপর অত্যাচার করে না তা-ও নয়। হিন্দু পুঁজিবাদীরা হিন্দু জনসাধারণের কাছে থেকে কম মুনাফার চেষ্টা করে সেটিও নয়। এবং ব্যাপারটি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সত্য। পাকিস্থান বা বাংলাদেশের মত যে সব দেশে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম, নেপালের মত যে দেশ সরকারী ভাবে হিন্দু রাষ্ট্র, বলিভিয়া-আর্জেন্টিনা-অ্যান্ডোরার যে সব দেশ সরকারীভাবে খৃস্টধর্মাবলম্বী—সেই সব দেশে অন্তত একই ধর্মের সব মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে সমানাধিকার ভোগ করে, ধনী-দরিদ্র বিভাজন নেই, বিপুল সংখ্যক মানুষ নিকৃষ্ট জীবন যাপন করে না-তা আদৌ নয়। বিশেষ ধর্মকে বিশেষ দেশের রাষ্ট্ৰীয় ধর্ম করলেই আর যাই হোক বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান আদৌ হয়নি, হবেও না। বরং তার জন্য মানুষের বেঁচে থাকার যে আন্দোলন তা বিপথগামী ও বিলম্বিত হবে। কারণ ধর্ম ও ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদকেই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিভেদ বলে গ্রহণ করতে শেখায়। এর ফলে এক হতদরিদ্র হিন্দু বা মুসলিম কৃষক কিংবা বেকার ও হতাশ এক তরুণ ভিন্ন ধর্মের মানুষকে, যে হয়তো তারই মত দরিদ্র ও হতাশাগ্ৰস্ত, তাকে শত্রু বলে ভাবতে থাকে-আর আড়ালে থেকে নিশ্চিন্ত উল্লাসে ঠাকরে-আদবানি-ঋতম্ভরামওদুদী-গোলাম আজমরা পরস্পরের পিঠে সুড়সুড়ি দেয়।
 
ধর্মীয় মৌলবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা এইভাবে শোষিত শ্রেণীর মধ্যকারী সংগ্ৰামী ঐক্যকে ও ঐক্যের সম্ভাবনাকে ভেঙ্গে চুরমার করতে থাকে। ধৰ্মীয় রাষ্ট্রের শাসককুল এই উদ্দেশ্যেই বহু লড়াই’ (অর্থাৎ ধান্দাবাজি) করে দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে তোলে। এবং সবচেয়ে করুণ, নির্মম দিক হল তাদের এই লড়াইতে তারা গাধার সামনে গাজর ঝোলানোর মত শোষিত মানুষের সামনের ধর্মের গাজর ঝুলিয়ে রেখে ধর্মবিশ্বাসী বা ধর্মের প্রতি মোহগ্ৰস্ত অজস্ৰ সাধারণ মানুষকেও সহযোদ্ধা’ হিসেবে জোগাড় করে নেয়। এই ‘যোদ্ধারা’ধর্মকে রক্ষণ করার মহান ব্রত পালন করছে ভেবে শহিদ হতেও পিছপা হয় না। (এই ভাবেই তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়)। আসলে তারা শহিদ হয়, তাদেরই সিংহাসনে বসানোর জন্য যারা ভবিষ্যতে তাদেরই শাসন ও শোষণ করবে।
 
এই সিংহাসনে বসতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা যে আলাদা একটি শ্রেণী আর যাদের ঘাড়ে পা দিয়ে তারা এই লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে তারা যে ভিন্ন আরেকটি শ্রেণী, ধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলন এই সত্যটিকে ভুলিয়ে দেয়। নিছক একই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্যই শোষিত মানুষেরা শাসকশ্রেণীকে নিজেদের মিত্র বলে ভাবতে শেখে। এটি ঠিকই যে আদর্শ শ্রেণীবিভাজন। এখন আর নেই এবং শাসকশোষিত বিভাজন এখন অনেক জটিল। এই বিভাজন অনেক ক্ষেত্রেই আপেক্ষিক এবং শাসক শ্রেণীর নিম্নস্তরের সদস্যরা উচ্চ অবস্থানের শাসকদের দ্বারা শাসিত ও শোষিত হয়। তাই শাসক-শাসিত বা শোষক-শোষিতের বিভিন্ন স্তরবিন্যাস রয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ এ ধরনের স্তরবিভাজনকেও অস্বীকার করে এবং তাদের লক্ষ্য থাকে। এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন না হতে দেওয়া। তাই দেখা যায়,–
 
‘আর এস এস-কর্মীদের ছোটোবেলা থেকেই শিক্ষা দেওয়া হয় যুক্তিতর্কের ধার না ধারতে এবং হিন্দুসমন্বিত সমাজ সম্পর্কে তাদের যে ধারণা গড়ে তোলা হয় তাতে স্পষ্টতই সমাজে শ্রেণী, জাতপাত এবং পুরুষ-নারী বিরোধ–এসব এড়িয়ে যায় এবং পুরোপুরি পুরুষ শাসিত, উচ্চবর্ণের এবং মধ্য এবং নিম্নমধ্য শ্রেণীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত সমাজের ধারণার সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়।’ (খাকি প্যান্ট, গেরুয়া ঝান্ডা)
 
এবং ব্যাপারটি অন্যান্যদের ক্ষেত্ৰেও সত্য। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিস্টরা প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বিবর্তনবাদ, কম্যুনিজম, বাইবেলের সমালোচনা, ইত্যাদিকে, কিন্তু কোন বিশেষ শ্রেণীকে নয়। বরং তারা উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে (কম্যুনিজমবিরোধী বৈদেশিক নীতি, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি) শাসকশ্রেণীর হাত শক্ত করতেই চেয়েছিল এবং এখনো চায়। পাকিস্থান-এ বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীদের প্রতিনিধি ঐ জামাতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীও পাকিস্থানে ও ভারতে যথাক্রমে ইসলাম ও হিন্দুধর্মের উপর ভিত্তি করে শাসনতন্ত্র গড়ে তোলার প্রেসক্রিপশান করেছেন, কোন জনস্বার্থবাহী জনগণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করে নয়। এবং তিনি আরো স্পষ্টভাবে শ্রেণীবৈষম্যকে অস্বীকার করে পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের, জমিদার ও কৃষকদের, শাসক ও শাসিতকে একাকার করে দিয়েছেন (‘…in an Islamic country there is no conflict between capitalist and workers, landlords and peasants, rulers and the ruled.’) মওদুদীর বদলে ঠাকরে-আদবানিদের বসালে এবং ইসলামিক দেশের বদলে হিন্দু রাষ্ট্রের কথা বল্লেও ভাষা ও ভাব হুবহু একই।
 
ধর্মীয় মৌলবাদের এই শ্রেণী সমন্বয় বা শ্রেণী বিভাজনকে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তাদের নারীবিদ্বেষী চরিত্র। ধর্মীয় মৌলবাদ মূলগতভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারী-পুরুষের সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও সে অস্বীকার করে। নারী তার কাছে অনুগত একটি বিশেষ গোষ্ঠী মাত্র। ধর্ম এবং ধর্মীয় মৌলবাদের মায়ায় আচ্ছন্ন নারীরাও এই নারীবিদ্বেষী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের শিকার। যেভাবে আজীবন অবহেলিত এক শাশুড়ি সুযোগ পেয়ে পুত্রবধুর উপর অত্যাচার চালায়, তেমনি ধর্মমোহে আচ্ছন্ন এই সব নারীরাও তাদের-অপমানিত-অবদমিত সামাজিক অবস্থানের মধ্যে, আপাত তৎপরতার বা কর্তৃত্বের আস্বাদ পেয়ে নারীসমাজকে নিষ্পেষিত করতে পুরুষ শাসিত মৌলবাদকে সাহায্য করে যায়। হিন্দু মৌলবাদের উস্কানিতে তারা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গতে দলে দলে এগিয়ে যায়, মুসলিম মৌলবাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারা বোরখার স্বপক্ষে ও শরীয়তী আইনের স্বার্থে মিছিল বের করে। এমন নারীর সংখ্যা তুলনায় সীমিত হলেও, তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। যে কৌশলে ধর্মীয় মৌলবাদ সরল ধর্মবিশ্বাসী জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের প্রতারণা করে এবং নেতৃত্বের শ্রেণীস্বর্ধকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ঐ একই নির্মম কৌশলে তারা ধর্মবিশ্বাসী নারীদেরও ব্যবহার করে। বেদ বাইবেল কোরান মনুসংহিতা হাদিস বা অর্থশাস্ত্রের ছত্ৰে ছত্ৰে নারী অবদমনের কথাবার্তা ছড়িয়ে রয়েছে। কোরানে নারীর সম্পত্তির অধিকার জাতীয় কিছু কিছু মানবিক নির্দেশ থাকলেও নারীর স্থান যে পুরুষের নীচে, অবাধ্য নারীকে যে গৃহে আবদ্ধ করে রাখা যায় ইত্যাদি ধরনের কথাও দ্বিধাহীনভাবে বলা হয়েছে। ইসলামী আইনে ব্যভিচারে অভিযুক্ত নারীকেই নিজের নির্দোষিতার প্রমাণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নারীর সাক্ষ্যের মূল্য যে পুরুষের সাক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম তাও বলা হয়েছে দ্বিধাহীনভাবে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থে (শীতপথ ব্রাহ্মাণে) ‘কুকুর ও শূদ্রের’ মত নারীরাও যে ‘অসত্য, পাপ ও অন্ধকার’ তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং এ ধরনের উদাহরণ অসংখ্য। আর এসব বক্তব্যের মর্মবস্তু যে পুরুষশাসিত সমাজ, তাকে গ্ৰহণ করেই ধর্মীয় মৌলবাদের চরিত্র পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।
 
কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব মাত্রেই এমন নারীবিদ্বেষী তা নন। তাই দেখা যায় সম্রাট আকবর মুসলমানদের যথেচ্ছ তালাক করার প্রথা রদ করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী মুতাজিলাহ-রা বা ঈশ্বরবিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মহাত্মা গান্ধী নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং এমন ধর্মনিষ্ঠ কিন্তু নারীদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি প্রদর্শন করার মানুষ অসংখ্যই আছেন। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীরা এঁদের থেকে পৃথক। মৌলবাদীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে ধর্মের মূল দৃষ্টিভঙ্গীগুলিকে ঈশ্বরদত্ত বলে প্রচার করা ও অন্ধভাবে আঁকড়ে রাখা। এরই একটি অংশ এই নারীস্বার্থবিরোধী পুরুষতান্ত্রিকতা তথা পুরুষ আধিপত্য। নারীপুরুষের সার্বিক সমানাধিকার ও সহযোগিতা তাদের ভাব ও ভাবনা থেকে বহু দূরে। এক্ষত্রে হিটলার তথা ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীগত মিলের কথা আগেই বলা হয়েছে।
 
ইরান-পাকিস্তান-আলজিরিয়া সর্বত্র এই মৌলবাদীরা মেয়েদের উপর বোেরখা চাপিয়ে চাকরি থেকে দূর করে দিতে চাইছে। এরা মুসলিম ধর্মের জোব্বা গায়ে চাপায়। হিন্দুত্বের নামাবলী গায়ে জড়িয়ে ভারতেও হিন্দু মৌলবাদীরা একই কথা বলে। তাদের নারীবিভাগ রাষ্ট্র সেবিকা সমিতিও এই ফাঁদে পা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই,—পারিবারিক সিদ্ধান্তই বিবাহ, পেশা ও কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত এবং এমনকি সংগঠনে কাজ করার ব্যাপারটিও। সানন্দে উদাহরণ দেওয়া হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কমী-সমর্থক এক মহিলার, যিনি সস্তানের দেখাশুনা করার জন্য ব্যাংকের বড়ো চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পারিবারিক স্বাৰ্থ, সন্তানের যত্ন, যৌথ সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অবশ্যই গুরুত্বহীন নয়, কিন্তু যখন তা নারীর আপন ব্যক্তিত্ব যোগ্যতা ও স্বাধীন ইচ্ছাকে আদৌ মূল্য দেয় না। তখন সেটি আর যাই হোক নারীস্বার্থবাহী থাকে না। এবং তা নারীর স্বাৰ্থ যদি না দেখে, তবে সেটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপর পক্ষের অর্থাৎ পুরুষের স্বাের্থই দেখে। হিন্দু মৌলবাদীরা সম্প্রতি অবশ্য দরিদ্র-বেকার যুবক কিশোর, শ্রমিক কৃষকদের মত মেয়েদেরও দাবার বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী সুন্দরভাবে বৈষম্যমুক্ত।
 
রাজনৈতিক জ্ঞান-ও ব্যক্তিত্ব-হীন কিন্তু সুন্দরী চিত্ৰতারকা বা দূরদর্শন তারকাকে (হায় সীতা!) তারা নিছক তার গ্ল্যামার ও শারীরিক সৌন্দর্যের কারণে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে নামিয়ে দিয়েছে। এখানেও নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য ও অভিনেত্রী হিসেবে আনন্দদায়িনী ভূমিকাই বড় করে ধরা হয়। (তবে ব্যাপারটি শুধু মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে নয়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে তেলেগু দেশম,–নানা রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রেও সত্য। মৌলবাদীদের মত এক্ষেত্রে এদেরও উদ্দেশ্য থাকে, চটক ও সস্তা জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে কোনভাবে গর্দিটা লাভ করা। আদর্শবোধ বা রাজনৈতিক চেতনা ইত্যাদি। এদের সবার কাছেই গৌণ একটি ব্যাপার।)
 
অন্যদিকে হাজার হাজার কিশোরী-যুবতী-প্রৌঢ়ারা করসেবিকা নাম দিয়ে গডডলিকা স্রোতে এগিয়ে যায় অযোধ্যার সত্যগ্রহে বা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার উন্মাদনায়। ঝামেলার মুখে বা মিছিলের সামনে মেয়েদের লেলিয়ে দেওয়ার এ আরেকটি চিরাচরিত পৌরুষী ও নোংরা কৌশল। যদিও ঋতম্ভরা তাঁর বক্তৃতায় বোনেদের নয়, ভাইদের জাগার কথা বলেছিলেন (‘বীর ভাইয়ো জাগো’), তবু তিনি সহ আরো বহু মহিলারাই জগতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই নারী জাগরণ নিজেদের সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা নয়, বরং তা ভুলিয়ে দেওয়ারই একটি উপায় মাত্র। তাই হিন্দুধর্মের তথা ধর্মের পিতৃতান্ত্রিকতার কোন সমালোচনামূলক কথাবার্তা তাদের মাথাতেও আসে না। গোলওয়ালকারের নারীস্বার্থবিরোধী সংকীর্ণতাকে অস্বীকার করে, হিন্দু মৌলবাদের খপ্পরে থাকা নারীদেরও কেউ কেউ সম্প্রতি নারীর আর্থিক স্বাধীনতা’-র কথা বলছেন। কিন্তু এমন কথাবার্তা এত নীচ সুরে বাঁধা যে, ধৰ্মরক্ষার (অর্থাৎ নারীবিদ্বেষী পুরুষশাসিত সমাজের স্বৰ্থবাহী বিশেষ প্রতিষ্ঠানিক ধর্মকে রক্ষার) তীব্রতার কাছে তা মূল্যহীন হয়ে ওঠে।
 
 
মৌলবাদের এ জাতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হলেও, এটিও সত্য যে অমৌলবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলি যে এ ধরনের সমস্ত বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত তা নয়। মৌলবাদী না হওয়া মানেই শ্রেণী সচেতন, জনস্বার্থবাহী, শাসক শ্রেণীবিরোধী ও শ্রেণী সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা হয়ে ওঠা তাও নয়। ধর্মীয় মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক না হওয়ার অর্থ কম্যুনিস্ট হয়ে যাওয়া বা বস্তুবাদী দর্শনের ছাত্র হয়ে যাওয়া-সেটিও আদৌ নয়। এটি অতি সুস্পষ্ট একটি সত্য। মহাত্মা গান্ধীও কম্যুনিজমবিরোধী ছিলেন, পুঁজিবাদের তথা পুঁজিপতিদের কোন ধরনের ক্ষতি হোক তা তারও কাম্য ছিল না, ঈশ্বর ও ধর্মে ছিল তার অচলা আনুগত্য ইত্যাদি। কিন্তু তাকে ধর্মীয় মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক বলা যায় না। বড়জোর এটি বলা যায় যে, তার মানসিকতা ও কাজকর্ম ধর্মীয় মৌলবাদের সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এবং এ ধরনের ব্যক্তিত্বের উদাহরণ। অসংখ্য রয়েছে। সাধারণভাবে ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেও তা সত্য।
 
প্ৰতিষ্ঠানিক ধর্মের অস্তিত্ব ও এইসব ধর্মে বিশ্বাস না থাকলে ধর্মীয় মৌলবাদ (ও সাম্প্রদায়িকতার) সৃষ্টি হওয়ার ও টিকে থাকার সম্ভাবনাই থাকে না। তাই ধর্মবিশ্বাসীরা আসলে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে ফক্ষুধারার মত লালন করেন। বিশেষ সময়ে ও পরিস্থিতিতে এই ধারা কারোকারোর ক্ষেত্রে প্রকাশ্য হয়ে বন্যার আকার ধারণ করে। তবু তাদের বৃহদংশই প্রকাশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতাই করেন। এঁরা ধর্মের গ্রহণীয়, নমনীয়, সহনীয়, উদার রূপকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্মের অবৈজ্ঞানিক, প্রতিক্রিয়াশীল, শাসকশ্রেণীর স্বার্থবাহী, পুরুষ আধিপত্যকামী এবং ধর্মের নামে মানুষকে কৃত্রিমভাবে বিভক্ত করার জনস্বার্থবিরোধী দিকগুলিকে হিংস্র ও চরমভাবে তাদের কথায় ও কাজে প্রকাশ করতে চায়। জনসমর্থন আদায়ের জন্য তারা ধর্মবাদী জাতীয়তাবাদের প্রচার করে। তাদের সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থ এসবের পেছনে ইন্ধন জুগিয়ে চলে।
 
————–
* ভারতীয় জনসঙ্ঘের লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা না করে শুধু তার সভাপতি বলরাজ মাধোককে উদ্ধৃত করা যায়।-’ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হলে ইন্ডিয়া নাম মুছে ফেলা হবে। নাম হবে। হিন্দুস্তান। জাতীয় পশু হবে গরু। রাষ্ট্রভাষা হবে সংস্কৃত। যোগাযোগের ভাষা হবে হিন্দি-বলেছেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের সভাপতি বলরাজ মাধোক। বুধবার। কলকাতায়।’ (আজিকাল; ২৫.৫.৮৯.)
 
** ভারতীয় জনতা পার্টির মত হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি (যাদের সাধারণ ভাবে হিন্দু মৌলবাদী বলা যায় ও বলা হচ্ছে), তারা এই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শিক্ষা ও নীতিতেই প্রশিক্ষিত। বিজেপি (rIS 267 (5 Stifts (Tiri 4GIC2, ‘I am proud that my virtues have been imbibed from RSS,” (The Statesman; 17.995)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত