মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা

 


আজ ০৩ এপ্রিল কবি মৃদুল দাশগুপ্তের জন্মতিথি। এই পুণ্য লগ্নে বিনম্র শ্রদ্ধায় ইরাবতীর পাঠকদের জন্য বিশেষ আয়োজন কবির কিছু কবিতা।


 

বিবাহ প্রস্তাব

বাড়িটি থাকবে নদীর কিনারে, চৌকো,
থাকবে শ্যাওলা রাঙানো একটি নৌকো,
ফিরে এসে খুব আলতো ডাকবো, বউ কই….
রাজি ?

তবে এসো এসো জানাও তুমিও প্রস্তুত,
আত্মগোপন পর্বে তুমি এ দস্যুর
ক্ষতে দেবে মধু , দুব্বো চিবিয়ে , আস্তে

তোমাকে চেনাবো তারাগুলি, আর নৈঋত
দিক থেকে নেমে হঠাৎ আসবে দেবদূত
পুকুরে ভাসবে দুটি রাজহাঁস , চই চই ….

লুঠে নেব হ্রদ , টিলাগুলি , আমি জঙ্গি
দূর বনপথে ঝরে ঝরে যাবে রঙ্গন….
ছোটাবো তুফান ঘোড়াটি , যাবে না সঙ্গে ?
তোলো মুখ , এসো ধরো হাত, চলো সঙ্গে

 

 

 

নিজেকে নিদ্রিত দেখে

নিজেকে নিদ্রিত দেখে আকস্মিক মনোবেদনায়
শিয়রে বসেছি ঝুঁকে, কোনও কোনও রাত্রিকালে একাকী নিশ্চুপে…
হয়তো দু-এক ফোঁটা অশ্রুপতনের ফলে আধো চোখ মেলে
আবার নিদ্রায় ডুবে যেতে যেতে সে ভেবেছে, স্বপ্নে দেখা যায়

 

 

লিখছি আমি

নাম বলেছি , ধাম বলেছি- এবং বয়স কত
সেই সঙ্গে এও বলেছি মা হয়েছেন গত।
দশখানা আঁক কষতে দিলে একটা হবে ভুল
আমাকে তাও নিতে নারাজ এই তোমাদের স্কুল !

কারণ আমার প্যান্টে ফুটো জামার কলার ফাঁসা
উড়াল সেতুর নীচে আমার পাখ-পাখালির বাসা।
বাবা উধাও পুলিশভ্যানে তখন আমি ছোটো ,
মরার আগে মা বলেছেন মানুষ হয়ে ওঠো।

সেই কারণেই বই পড়েছি , পথ কুড়োনো বই
তোমার সঙ্গে আজকে না হোক , কালকে তো খেলবোই।

 

 

 

আঁকা, লেখা

রং ছড়িয়ে খুশ-খেয়ালে আমি যখন চিত্র আঁকি
তিনটি শালিক ঝগড়া থামায়, অবাক তাকায় চড়ুই পাখি,
মৎস্য ভুলে মাছরাঙা তার নীল রঙটি ধার দিতে চায়
প্রজাপতির ঝাঁক চাইছে তাদের রাখি আমার আঁকা,
গর্ত থেকে ইঁদুর, সেটাও পিটপিটে চোখ দেখছে চেয়ে
রং-তুলিরা বেজায় খুশি আজ দুপুরে আমায় পেয়ে।

ওই যে মাঠে চাঁদের দুধের সর জমে যায় যখন পুরু
বাতাস ঈষৎ কাঁপন দিতেই আমার ছড়া লেখার শুরু,
এবার যেন তারার মালা খুব গোপনে নামছে কাছে
‘অ’ লিখছে ‘আ’ লিখছে দশ জোনাকি বকুল গাছে,
এই ছড়াতেই আজ আমাকে তোমার কাছে আনলো হাওয়া
সেই তো আমার পরম পুলক, সেই তো আমার পদক পাওয়া।


 

ছবিঃ সংগৃহীত


গুপ্ত পুঁথি জ্ঞানে আমি দিয়ে যাবো পাণ্ডুলিপিখানি
বিরাট কাঠের ওই পেটিকায় রেখে দিও গৃহে, এক কোণে
সযত্নে কিছুটা কাল, ক্রমে তুমি ভুলে যাবে, জানি।
কী আছে ভিতরে শুধু ভাবনাই ঢেউ দেবে মনে

সহজ সরল বাক্সে মনে হবে দাপাদাপি চৈত্রের বিকেলে
কলরব, হট্টগোল, ঘোররাতে ক্ষুধাতুর, ক্রন্দনের ধ্বনি
আবার প্রভাতে হাসি খিল খিল- আমাদের একশত ছেলে
তখন মুদ্রণে দিও, ওরা যেই চেঁচাবে- জননী

 


কর্তব্য, তোমার কথা লিপিবদ্ধ করা
জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, পর্বতের গা-য়
টঙে, শীর্ষে, সূর্যের ললাটে, চন্দ্রে, হাসে যেন তুষ্ট হয়ে ধরা
নিশীথে তারকাপুঞ্জ কৌতুকে তাকায়
কুচি কুচি চিরকুটে ভেসে ভেসে নিনিভির নীলগ্রন্থাগারে
যদি যায় আগুনের হরফেও, আর অশ্রুপাতে
ক্ষতে, রক্তে, গ্রন্থে, পটে, এ বিশাল জগৎ সংসারে
পুনরায় কতো কথা হতে পারে তোমাতে-আমাতে।

 


অতি অল্পে চলে যাবে আমাদের বাকি দিনগুলি
শুনে চক্ষু ছলছল, তবে বুঝি- সম্মত সম্মত
নাসা মৃদু স্ফীত হয়ে পুনরায় শ্বাসকার্যরত
নীরবে দু-কান শুনে কর্তব্যে উন্মুখ, চারিদিকে শব্দ শত শত
দক্ষিণ হস্তটি স্থির, ঈষৎ বিদ্রোহ করে বাম হস্তে কনিষ্ঠ অঙ্গুলি
এর পর দশ দিকে ওলে ওলে বয়ে যায় নানাবিধ বায়ু
নখ, ত্বক, হাঁটু, কব্জি, হৃদি, লিঙ্গ, পায়ু
সমবেত পরামর্শে শরীরে জটলা করে, ভাবে
যত বলি বাকি দিন হেসে খেলে অল্পে চলে যাবে
সকাতরে মেনে নেয়, যেন-বা আমার শত সহস্র বছর পরমায়ু

 


কাকচক্ষু জলে আমি ইষ্টক বর্ষণ করে গড়েছি বলয়
সেই অপরাধে
সহস্র বায়স পাখি কা কা কা কা রবে
দিয়েছে ঠোক্কর এসে মাথা বুকে কাঁধে
তদুপরি ঘটেছে প্রলয়।

ছোট এক পুষ্করিনী, তার জল উপচিয়ে পড়ে
ধরণী ভিজিয়ে দিয়ে মহাকালে
টুপ টুপ টুপ
পড়েছে সেখানে গিয়ে, যেথা অন্ধকূপ
ভিতরে ভিতরে
গ্রহাণু খাওয়ার তালে ওৎ পেতে আছে
ওই নীল নভে।
ডানা ঝেড়ে এর পর গাছে গাছে গাছে
কাক ও কাকিনী দল একেবারে চুপ।
এমন দুর্ঘট আমি চেয়েছি কি? উঁহু
চেয়েছি জীবনব্যাপী কেকা আর কুহু

 


চিন্তার বিক্ষোভ শুরু হয় বলে সরে থাকি
তবে কিনা হাত বাঁধা, পা-য়েও শিকল
তথাপি আমাকে ঠেলো
যেখানে সেখানে ফেলো
কাতর কবিতাখানি দেখো দেখো করে ছল ছল
যদি বা কর্দমে পাড়ি
থেমে যাক হাতঘড়ি
মোবাইল ফোনখানি করে দাও ব্যাপক বিকল
আঁচড়াও, কামড়াও, ব্যথা ও বেদনাভরা
এই প্রাণ করে ধড় ফড়
তাহলে ল্যাংটো করো, ছিঁড়ে খুঁড়ে বের করো খড়
তবু তো দুপুরবেলা
তোমার-আমার খেলা
আমার চানের জল রোজ রোজ হয় নীল
এ তোমার কারসাজি বঙ্গোপসাগর।

 


ছবিঃ সংগৃহীত

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত