মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন: উত্তম দাশ

প্রচণ্ড অবিশ্বাস, ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান এই ত্রিবিধ নৈরাজ্যে ষাট দশকের শুরুতে আত্মার একটা ছটফটানি মলয় রায়চৌধুরী যখন সবে টের পাচ্ছেন তখন তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র । জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াবার বয়েস । নিজেকে চিনে নেবার, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সময় । ততদিনে চিনে নেবার অবকাশ হয়েছে স্বদেশকে, সমাজ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো খুলে ধরেছে সামনে । স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে চোদ্দ বছর আগে । দেশবিভাগ, শেকড়হীন মানুষের বিলিব্যবস্হা, দেশপপেম ততদিনে মুনাফা তুলছে । পরিবারের গঠন পালটাচ্ছে ; শহর গ্রাম ব্যবধান বাড়ছে, নীতিবোধ ভাঙছে, বিশ্বাসের তলানি এ পপজন্ম চেখে দেখার ফুরসৎ পায়নি । বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধ রাজনৈতিক মুনাফার জন্য মাত্র প্রয়োজন, ত্রিশ-চল্লিশের কবিতা গতানুগতিক হচ্ছে নির্জীব কবিদের হাতে । পঞ্চাশ সবে জাগছে । নিজস্ব ভূমি আবিষ্কার হয়নি ।
        বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে মলয়ের পরিচয় তখনও নিবিড় নয় । এই সময়ে হঠাৎ ইংরেজ কবি চসারের In the sowre hungry tyme পঙক্তিটি গিরে ধরল তাঁকে । একান থেকে তুলে নিলেন হাংরি শব্দটি । অসওয়াল্ড স্পেংলারের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বিষয়ক কনসেপ্টে খুঁজে পেলেন হাংরি শব্দের দার্শনিক ভিত্তি । এই সময়ের প্রতিক্রিয়া দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জানালেন তিনি । শক্তিও তখন পাটনায় । উৎসাহ দিলেন । [ মলয় ইংরেজিতে কবিতার একটি ইশতাহার প্রকাশ করলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বরে Hungry Generation নামে ; সেই ইশতাহার ১৯৬২ সালে আরও দুবার পরিমার্জিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল । বাংলা ইশতাহার প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ইশতাহারের পরে । ] ১৯৬২ সালের এপ্রিলে বাংলা ইশতাহারটি প্রকাশ করলেন মলয় ‘হাংগরি জেনারেশন’ । স্রষ্টা : মলয় রায়চৌধুরী, ; নেতৃত্ব : শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; সম্পাদনা : দেবী রায় । ততদিনে অবশ্য দলবল বেড়েছে । কিন্তু হাংরি জেনারেশনের প্রথম বাংলা বুলেটিনটি গুরুত্বপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে যাঁরা হাংরি আন্দোলনের সরিক হয়েছিলেন, ধরে নিতে হবে এই বুলেটিনের বয়ানে তাঁদের সায় ছিল । অন্তত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন এই আন্দোলনকে । মলয়ের লেখা বুলেটিনের সঙ্গে মৌল কোনো বিরোধ তাঁদের আদর্শগত কারণে ছিল না ; থাকলে একদল তরুণ নিশ্চয় এভাবে সংগঠিত হতে পারতেন না । আমি ভুলি না যে একটা আন্দোলন যৌথ চিন্তার ফসল । পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনে এই যৌথ চিন্তার রূপ দেখবো । কিন্তু প্রাথমিক স্তরে একজন তাত্বিকের আনুগত্ব মেনে নেওয়াই সঙ্গত । তাত্বিক মলয় প্রথম বুলেটিনে লিখেছেন :-
         “কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয়, অতিপ্রজ অন্ধ বল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্তৃস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের করার প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরু বিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রাগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবীবিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক । এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত আর কী আছে জীবনে ! মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।
         কবিতা থাকা সত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্ত প্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তরজগতের নিষ্কুন্ঠ বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা — উঃ, তবু মানবজীবন কেন এমন নিষ্প্রভ ! হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যারা অভ্যস্ত, তাদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সংকটের নিয়ন্ত্রক ।
         কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মোহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খাঁচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমন কি, প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর । ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতার বর্বরতার মধ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মধ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তর্জগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় ।
         ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অর্গাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । যেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে ‘সচতনভাবে বিহ্বল’ হলেই এখন কবিতা লেখা সম্ভব । শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত । শখ করে, ভেবে ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থবঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীত মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিনী হয়ে যেতে পারে ।”
         হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধে প্রচলিত যে অভিযোগ যৌনতা এবং জান্তব ক্ষুধা ও জৈবতার, তার ইঙ্গিতমাত্র নেই মলয়ের ইশতাহারে । যদিও জীবনের সামগ্রিক ক্ষুধাকে তিনি বলেছেন — ‘মানসিক, দৈহিক এবং শারীরিক।’ তবু তাঁর বিশ্লেষণ যেখানে এসে থেমেছে সেখানে এ ক্ষুধা আত্মিক । অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে কবিতা আসলে বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের মেলবন্ধন । কবিতা যেখানে জীবনের একমাত্র আশ্রয় সেখানে কবিতা ও জীবন একার্থক অথচ জীবনের সংকট কবিতা ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা। কবিতা-বানিয়েদের মলয় দেখেছেন ক্ষমাহীন, কবিতা তাঁর কাছে অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, সুতরাং ‘সচেতনভাবে বিহ্বল’ হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । অরগ্যাজম বলতে যে জৈববৃত্তি বোঝায় তা কখনই উদ্দীপনাহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় । বৈজ্ঞানিক সত্যে উপমাটি ব্যর্থ । এখানে আমাদের মেনে নিতে হবে কবিতার স্বতঃস্ফূর্তি মলয়ের ধারণামতো । অনেকটা রোমান্টিক কবিদের স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ পাওয়ারফুল ফিলিংস, অবশ্যই রোমান্টিকদের মতো আবেগে আত্মসমর্পণ নয়, কল্পজগৎ তৈরি নয়, সচেতন বিহ্বল অবস্হাই মলয়ের ধারণায় কবিতা সৃষ্টির শর্ত, ‘অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি’ না থাকলে তাকে মলয় কবিতা বলতে রাজি হননি । নিঃসন্দেহে অভিনব । বশেষত বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তি । কিন্তু এই অভিনব মতবাদ থেকেই হাংরি আন্দোলন শুরু ।
         এতদিনে হাংরি-সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করেছে, একে-একে জড়ো হয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, সুবো আচার্য, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক,বাসুদেব দাশগুপ্ত, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ফালগুনী রায়, অরণি বসু, শম্ভু রক্ষিত, ত্রিদিব মিত্র, তপন দাস, মিহির পাল প্রমুখ । তালিকায় প্রথম তিনজন পঞ্চাশের, বাকিরা সময়ের দিক থেকে ষাট দশকের অর্থাৎ শক্তিকে নিয়ে হাংরি গোষ্ঠীভূক্ত হয়েছেন পঞ্চাশের চারজন কবি । কিন্তু প্রশ্ন, পঞ্চাশের এই চার কবির ষাটের অনুজ কবিদের সঙ্গে নতুন আন্দোলনে শরিক হবার প্রয়োজন হল কেন ? এই সময়ে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘কৃত্তিবাস’ বেরিয়েছে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়র্কশপ প্রোগ্রামে আমেরিকায় । ‘কৃত্তিবাস’-এর পপকাশনা নিয়ে চিন্তিত অথচ শরৎ-এর ওপরে আস্হা রেকেই তাঁকে চলতে হচ্ছে । ‘স্বপ্ন সংকলন’-এর পরিকল্পনা তাঁর মাথায় । অথচ গুছিয়ে উঠছে না কিছুই । লেখক নির্বাচনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে বন্ধুদের সঙ্গে । শরৎ-এর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পেয়ে সুনীল আমেরিকা থেকে যে চিঠি সমীরকে লিখেছিলেন তাতে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে যে ভাঙন ধরেছে তারই ইঙ্গিত । এই সময়ে আরো একটি ঘটনা — তন্ময় দত্তের কবিতার খাতা চুরি । সুনীল বলেছেন, জীবনানন্দের পর সবচেয়ে সক্তিমান কবি তন্ময় । অভিমানে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দেন ।
         বন্ধুদের মধ্যে এমনি নানা অসন্তোষ এবং ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্ভাবনায় সন্দিহান হয়ে নতুন কিছু করার প্রবণতায় মলয়ের দাদা সমীরকে কেন্দ্র করে সন্দীপন উৎপল যোগ দিলেন হাংরি আন্দোলনে । শক্তি আগেই যুক্ত । তুলনায় প্রতিষ্ঠিত এই চার লেখকের সমর্থন পেয়ে হাংরি আন্দোলনে জোর এলো । আগেই বলেছি ইতিমধ্যে অনেক তরুণ সংঘবদ্ধ এই আন্দোলন ঘিরে । নানা চিন্তার ছাপ আসছে । আন্দোলন সম্পর্কে নানাজন নিজের মতো ফতোয়া দিচ্ছেন । মলয়ের চিন্তায় যে নির্দিষ্টতা ছিল,নানা চিন্তার চাপে ছড়িয়ে পড়ায় আন্দোলনকে স্পষ্ট রূপরেখায় বেঁধে দিতে হাংরি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নির্ণায়ক নিয়মবিধির একটি ইশতাহার রচিত হলো । লিখলেন মলয় :-
  1. The merciless exposure of the self in its entirety .
  2. To present in all nakedness all aspects of the self and thing before it.
  3. To  catch a glimpse of the exploded self at a particular moment.
  4. To challenge every value with a view to accepting or rejecting the same.
  5. To consider everything at the start to be nothing but a ‘thing’ with a view to testing whether it is living or lifeless.
  6. Not to take reality as it is but to examine it in all its aspects.
  7. To seek to find out a mode of communication, by abolishing the accepted modes of Prose and Poetry which would instantly establish a communication between the poet and his reader.
  8. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.
  9. To reveal the sound of the word, used in ordinary conversation, more sharply in the poem.
  10. To break loose the traditional association of words and to coin unconventional and here-to-fore unaccepted combination of words.
  11. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.
  12. To admit without qualification that poetry is the ultimate religion of man.
  13. To transmit dynamically the message of the restless existence and the sense of disgust in a razor sharp language.
  14. Personal ultimatum.
         এই চৌদ্দটি সূত্রের মূল লুকিয়ে আছে কি লিখব আর কি ভাবে লিখব এই তত্বের ওপর । সম্পূর্ণ অহং-এর ক্ষমাহীন প্রকাশ, বিশেষ মুহূর্তে বিস্ফারিত আত্মার আভাস সম্পূর্ণ নিজস্ব শব্দবন্ধে ও প্রকাশ রীতিতে । ঐতিহ্য অস্বীকার, পপচলিত রীতি প্রত্যাহার, এবং তার প্রকাশ প্রাত্যহিক ভাষায়, কিন্তু কামড় বসাবে তীক্ষ্ণ । অস্হির অস্তিত্বের যন্ত্রণা ও চরম বিতৃষ্ণা লোক-প্রচলিত মূল্যবোধকে ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত করবে কবিতাকে । ধর্মে কিছু পাওয়ার নেই । সমাজে প্রত্যাখ্যাত, রাজনীতি বন্ধ্যা — একমাত্র আশ্রয় কবিতা । সমস্ত ভাঙচুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থকে ফলবানের চিন্তা নিঃসন্দেহে শিল্পীর ।
         ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার, প্রচলিত ধারার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতার নতুন চেহারা আবিষ্কার প্রকৃতই সাহসী ও মৌলিক । নতুন কবিতার জন্য নতুন সূত্র অনুস্ধানও স্বাভাবিক । কিন্তু তত্ব নির্ভর করে কিংবা ইশতাহার মেনে কবিতা লেখা, দলবদ্ধভাবে সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন জাগতে পারে । ইশতেহারের সূত্রগুলো দলবদ্ধ সকলের ভেতর থেকে উঠে আসা কিনা সে প্রশ্নও উঠতে পারে । যদি ধরে নেওয়া যায় ইশতাহারের সূত্র ধরেই হাংরি আন্দোলনের সংঘবদ্ধতা তা হলে মেনে নিতে হয় এ আন্দোলনের জোর ছিল । জোর যে ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেল দ্রুত । তবে সে সংবাদ সমর্থনের নয়, বিরুদ্ধতার । লেখালিখির জন্য যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি এঁদের জীবনযাত্রা এবং শিল্প-অসম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ একটা টেনশনের আবহাওয়া তৈরি করল ।
         এ সবই হয়তো জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা থেকে উপজাত । চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান উভয়তই, ফলে এই বিকার । নাকি শুধু স্টান্ট ! শুধু স্টান্ট হলে মূল আন্দোলনই অর্থহীন । মনে হয় না শুধু স্টান্টের পেছনে এতগুলি তাজা ছেলে জুটেছিল । নিজেদের ধ্বংসের পথই কি নির্মাণ করেছিল হাংরি ছেলেরা ? এবং একই সঙ্গে এঁদের ধ্বংসের চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল এদেশে, বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিরুদ্ধবাদী সংবাদে এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়ায় । এই সময়ে মলয়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি খুবই জরুরি। চিঠিতে কোনো তারিখ নেই । পোস্টের স্হান আমেরিকার আইওয়া সিটি, তারিখ ১০ জুন ১৯৬৪ । উত্তরপাড়ায় ১৯৬৪ সালের জুনের ১৬ তারিখে । মলয়, সুনীলের বন্ধু সমীরের ভাই, তাঁর স্নেহভাজন ও প্রিয়জন । কিন্তু হাংরির অসামাজিক ও শিল্পসম্পর্কহীন ক্রিয়াকলাপে ক্ষুব্ধ সুনীল তাঁর মনোভাব স্পষ্ট বলেছেন । নিশ্চিতই সুনীলের কলকাতার বন্ধুরা তাঁর ক্ষোভের ইন্ধন যুগিয়েছিলেন । কিন্তু সুনীল এ-চিঠিতে মলয়ের কবিতাকেই সরাসরি অগ্রাহ্য করেছেন । যদিও কিছুদিন আগে সমীরকে লেখা চিঠিতে ‘কৃত্তিবাস’ থেকেই মলয়ের বই প্রকাশের অভীপ্সার কথা আমরা জানি । সুনীল লিখেছিলেন : ‘মলয়ের বই তো ওকে কৃত্তিবাস থেকেই বার করতে বলেছি, সাহিত্য প্রকাশক কোনো দরকার নেই ।
         ‘কৃত্তিবাস’ থেকে মলয়ের বই প্রকাশের ইচ্ছা কি শুধু বন্ধুকৃত্যের জন্য, বন্ধুর ভাইয়ের প্রতি স্নেহের টানই তার কারণ ? নাকি কবি হাসাবেই মলয়ের যোগ্যতা তখনও অবধি স্বীকৃত ছিল তাঁর । কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে এই ধরণের বদল তবে কি বন্ধুদের উসকানির ফল ? সুনীলের কাছে কবিতার আন্দোলনের চেয়ে ভালো কবিতা লেখা জরুরি । এতে আপত্তির কারণ নেই । এ তাঁর নিজস্ব ধারণা । কিন্তু হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার কথা বললেন কেন ? ঈর্ষা নয় । কারণ এঁদের লেখার জৌলস তিনি স্বীকার করেননি, লেখার জগতে এঁদের তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীও মনে করেননি । তবে কি হাংরির লেখকরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করেছিল বলেই এই উত্তেজনা ? কিন্তু এতখানি উত্তেজনা কি সম্ভব, একেবারে হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার মতো । নাকি শক্তি, সন্দীপন ও উৎপলের কৃত্তিবাসগোষ্ঠী ত্যাগ ও হাংরি আন্দোলনে যোগ কৃত্তিবাসী বন্ধুদের প্রতিশোধস্পৃহ করে তুলেছিল ? এঁদেরই কেউ কি সুনীলের উত্তেজনার কারণ সরবরাহকারী ?
         হাংরি আন্দোলন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে । সুনীলের চিঠিতে যা ছিল আভাস, এদেশে তা তখন নাড়া দেওয়া সংবাদ ।  ১৯৬৪-এর ১৭ জুলাই ‘যুগান্তর’ দৈনিকে সংবাদ বেরুচ্ছে ‘সাহিত্যে বিটলেমী’ এই শিরোনামে । এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের দিক থেকে নঙর্থক । কিন্তু অনেক সত্য এখানে লুকিয়ে আছে । প্রচলিত ধারণা, পুলিশী গ্রেফতার এবং মামলা হাংরি আন্দোলনকে রাতারাতি খ্যাতি দিয়েছে । কিন্তু এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্হা গ্রহণের দুমাস আগের । অথচ দেখছি সংবাদেই প্রকাশিত হয়েছে হাংরি আন্দোলন ও এর লেখকরা ইতিমধ্যে বিদেশে আলোচিত । সাংবাদিক জানাননি, এদেশে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এঁদের শেকড় ততদিনে অনেকদূর নেমে গেছে । হিন্দী তরুণ লেখকদের একটা অংশ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এই আন্দোলনে । পুলিশ এঁদের ওপর ন্জর রাখছে, রাখছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল দুমাসের মধ্যেই । পুলিশ নজর রেখেছিল কেন ? কিছু তরুণ লেখকের প্রথাবিরোধী লেখার জন্য ? শাসকগোষ্ঠী এবং সবরকম কতৃত্বকে অস্বীকার ও আক্রমণ করার জন্য ? বন্ধ্যা রাজনীতি , প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় তীব্র ছটফটানি পুলিশি আইনে অপরাধমূলক ছিল কি ? নাকি কেউ পুলিশকে এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন ? এসব কূট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের । ধীরে ধীরে তথ্য যাচাই করে ।
         এখন পর্যন্ত ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সংবাদ জানাচ্ছে এঁদের জীনযাত্রা ও লেখা বদ্ধ-বাঙালি জীবনে নাড়া দিতে শুরু করেছে । সংবাদের যোগ্য করে তুলেছেন এঁরা নিজেদের ।কী অন্তর্দৃষ্টিতে এঁরা দেখতে পেয়েছিলেন রাজনৈতিক পাণ্ডাদের । যাঁদের স্হান হবে ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও’ । শুধু রাজনীতি নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের অন্ধকার অনেক আগে থেকে আঁচ করার অপরাধ করে ফেলেছিলেন এঁরা। এবং সে শুধু সর্বস্ব পণ করে শিল্প করতে গিয়ে । দৈনিক যুগান্তরের সংবাদে  হাংরি আন্দোলনের ক্রিয়াকাণ্ডের উপরিতলের চেহারাটাই ফুটে উঠেছে, ভেতরের চেহারা কিছু পরিমাণে ধরার চেষ্টা দেখা যায় দুদিন পরের ‘আর মিছিলের শহর নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে । প্রয়োজনীয় অংশ এরকম : ‘’বাংলাদেশে দলাদলিতে দীর্ণ বিশ্বাসহীন রাজনীতি আজ নিজের মস্তক চর্বণ করিতে ব্যস্ত । এই আবহাওয়ার জন্যই কি সমাজে এক ধরণের নিরাশাবাদ জন্ম লাভ করিতেছে, যার চেহারা ড্রেন-পাইপ মস্তানি, যার আওয়াজ রাস্তার রোমিওদের শিস, এবং সাহিত্যের ‘ক্ষুৎকাতরতার’ মধ্যে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাইতেছে ? কাজেই ইহা আশ্চর্য নয়, এই সব বিকৃতির উপাসকরা, যারা ‘হাংরি জেনারেশন’ নাম ধারণ করিয়াছে, তারা পরম শ্রদ্ধাহীন অবজ্ঞায় ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের কোথাও’ রাজনীতিকদের স্‌আন নির্দেশ করিতে চাহিতেছে । কলিকাতার ক্ষুধার্ত ছেলেরা এই ধিক্কার দিতেছে এবং আত্মধিক্কারের মধ্যে বন্দী হইতেছে ; ইহা কি বন্ধ্যা রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত অথবা অসুস্হ সমাজের অভিশাপ?”
         সম্পাদকীয় স্তম্ভের লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তর দেননি । দিলে বলতে হতো ‘বন্ধ্যা-রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত ও অসুস্হ সমাজের অভিশাপ’ এই ক্ষুধার্ত ছেলেদের টেনে নিয়ে এসেছে শেষ আশ্রয়স্হল কবিতায় । তবে ভিন্নরূপের কবিতা নিশ্চয়ই, আমাদের সংস্কারের বাইরের কবিতা, ইরিটেটিভ কিন্তু নিজেকে চেনার জন্য অব্যর্থ । অন্তত হাংরি লেখকদের দৃষ্টিকোণ থেকে । হাংরি আন্দোলন সংবাদে ও সম্পাদকীয়তে এনেছে যে নঙর্থক প্রতিক্রিয়া, সে প্রতিক্রিয়ার টেনশন থেকে কলকাতার পুলিশ ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হাংরি লেখকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে নামলো । এ এস আই কালীকিঙ্কর দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতার জোড়াবাগান থানার এস আই এস এন পাল এই দিনেই এফ আই আর করলেন ।
         একই দিনের অভিযোগ ও এফ আই আর ( সেকশান ১২০ বি এবং ২৯২ আইপিসি ) — কলকাতা পুলিশের সুনাম খুব অর্থবহ । হাংরি জেনারেশনের অভিযুক্ত বুলেটিনে যাঁদের লেখা ছিল সবাইকে অভিযুক্ত করা হলো । অর্থাৎ ঢাকি ঢুলি সব । কালীকিঙ্কর দাস জানিয়েছিলেন ‘ক্রেডিবল ইনফরমেশান’ থেকে হাংরি জেনারেশনের প্রচারের কথা জানতে পারেন । পুলিশ শাখার ইনফরমাররা যেভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকে তাতে কলকাতা পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পক্ষে হাংরি ক্রিয়াকাণ্ডের খোঁজ পাওয়া খুবই সবাভাবিক ঘটনা । কিন্তু পুলিশ হঠাৎ হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে এত তৎপর হলো কেন ? কিন্তু কত ছিল হাংরি বুলেটিনের প্রচার সংখ্যা ? কজন পাঠক পয়সা খরচ করে ও পত্রিকা কিনত ? অর্থাৎ যে সময়ে কলকাতার বই-স্টল আলো করে পর্ণগ্রাফি বিক্রি হতো, সেসময়ে কতজন পাঠক রেস্ত খরচ করে  অশ্লীল লেখা জেনে হাংরি জেনারেশন বুলেটিন সংগ্রহ করত ? সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের বিপথগামী হবার কতখানি সম্ভাবনা ছিল ও পত্রিকা পড়ে ? মূলত কবিতার মগজ এবং যে পপকাশভঙ্গীতে লেখা সে যুগে কবিতা পাঠকদের ক্ষেত্রেও তা ছিল প্রায় অসহনীয় । তা হলে “টু করাপ্ট দি মাইন্ড অফ দি কমন রিডার’ একথা আসছে কি করে ? সাধারণ পাঠকের সংজ্ঞা কি ?
         তবু তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক পুলিশ তার দৃষ্টিকোন থেকে হাংরির লেখাকে নৈতিকভাবে অশ্লীল মনে করেছে । আমার সংশয়ী মন এখানে অন্য ইন্ধন খুঁজে ফিরছে হয়তো । অভোযোগ দায়ের ও মামলা চালানোর সময়ে পুলিশের মনোভাব পরিবর্তন হয়নি ধরা যেতে পারে । কারণ যে অভিযোগ পুলিশ তুলবে তাকে তথ্য প্রমাণে আদালতে পপতিষ্ঠা করবে, এটাই স্বাভাবিক । আমি এখানে একটা চিঠির উল্লেখ রাখতে চাই।  কিছু পরবর্তীকালের । কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক । ১৯৬৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ‘ইনডিয়ান কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর এগজিকিউটিভ সেক্রেটারি মিস্টার এ. বি. শাহ মলয়কে এই চিঠিতে লিখেছেন :
“I met the Deputy Commissioner of Police the other day after we met at the Office of the Radical Humanist in Calcutta. I was told that they would not have liked to bother themselves with the ‘hungry Generation’ but for the fact that a number of citizens to whom the writings of your group were made available, insisted on some action being taken.”
        তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের দক্ষতা বা সক্রিয়তা নয়, কিছু নাগরিকের চাপাচাপিতেই পুলিশ হাংরিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অগ্রসর হয় । প্রশ্ন, এই নীতিবাদী নাগরিকরা কারা ? কেন তারা হাংরিদের বিরুদ্ধে পুলিশকে সক্রিয় করলেন ? পুলিশ হাংরি জেনারেশনের এগারোজনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল ছয়জনকে । অথচ মামলা দায়ের করল একজনের বিরুদ্ধে । স্টেট বনাম মলয় রায়চৌধুরী । কিন্তু মলয় যে অভোযোগে অভিযুক্ত, অন্যদের তা থাকে নিষ্কৃতি পাবার কথা নয় । আসলে পেছনে আরও কিছু ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এর মধ্যে হাংরি লেখকরা অনেকেই জবানবন্দি দিয়ে বসে আছেন পুলিশের কাছে । মধ্যবিত্ত বাঙালির নিরাপত্তাবোধ উসকে দিয়েছিল তাঁদের অস্তিত্ব । শিল্পের জন্য কারাবরণের চেয়ে হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা অনেক জরুরি ছিল সেসময়ে । আসলে সে সময়ে হাংরির নেতৃত্ব ও সংগঠন মলয়ের হাতে । সম্পাদক প্রকাশক হিসাবে যাঁর নামই থাক, মলয়ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক । অবশ্যই বন্ধুরা জানতেন, কিন্তু থানা-পুলিশের ভয়ে ওঞ্চাশের লেখকদের মতই সুভাষ বা শৈলেশ্বর কেউ হাংরি জেনারেশনের কোনো দায়িত্ব নিতে চাননি । সবাই সম্পর্ক ত্যাগের কথাই বলেছেন । ব্যতিক্রম প্রদীপ চৌধুরী ।
         অ্যালেন গিন্সবার্গ আবু সয়ীদ আইয়ুবকে হাংরি লেখকদের সাহায্য করার আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন, সেই আবু সয়ীদ মলয় এবং তাঁর সঙ্গীদের লেখক বলে মেনে নিতে পারেননি । এবং লেখার জন্য কেউ এদেশে পুলিশীপীড়ন ভোগ করেছে বলেও তাঁর জানা নেই বলেছেন । অ্যালেন গিন্সবার্গকে ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ যখন আবু সয়ীদ চিঠিতে এসব লিখেছেন, তখন কিন্তু কলকাতা পুলিশ হাংরি লেককদের বিরুদ্ধে মামলা সাজাচ্ছে । আবু সয়ীদের চিঠিটি এইরকম :-
পার্ল রোড, কলকাতা,
৩১ অক্টোবর ১৯৬৪
প্রিয় শ্রীগিন্সবার্গ
         আপনার ১৩ তারিখের উদ্দেশ্যহীন অবমাননাকর চিঠি পেয়ে আমি বিস্মিত । আপনি যে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমকে কমিউনিস্টদের দ্বারা চিহ্ণিত একটি জোচ্চোর বুলশিট উদারনৈতিক আঁতেলদে কমিউনিস্টবিরোধী সিনডিকেট বলে মনে করেন, তাতে আমি অবাক হইনি ; কেননা আমি কখনও কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে আপনার লেবেল ‘বুর্জোয়া’ কিংবা ‘শ্রদ্ধেয়’ থেকে মুক্ত করার কথা ভাবিনি ।
         যদি কোনো পরিচিত ভারতীয় সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবি তাদের সাহিত্যিক বা বৌদ্ধিক কাজের জন্য পুলিশের অবদমনের শিকার হতো , আমি নিশ্চিত যে ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম আপনার অপমানজনক ওসকানি ছাড়াই হস্তক্ষেপ করতো ।  আমি আপনাকে জানিয়ে আনন্দিত যে তেমন কোনো কিছুই সাম্প্রতিককালে এদেশে ঘটেনি । মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি জেনারেশনের তরুণ বন্ধুরা, আমার জ্ঞানমতে তেমন কোনো রচনা লিখে উঠতে পারেনি, যদিও তারা আত্মপ্রচার করে লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছে  এবং গণ্যমান্য লোকেদের চিঠি নোংরা ও অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করেছে ( আমি আশা করি আপনি স্বীকার করবেন যে ‘ফাক’ শব্দটি অশ্লীল এবং ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি নোংরা, অন্তত এই বাক্যটিতে, “গাঙশালিক স্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো”, তারা এর চেয়েও খারাপ   ভাষায় কবিদের নাম উল্লেখ করে লিখতে ইতস্তত করেনি )। সম্প্রতি তারা একজন মহিলাকে ভাড়া করে তার উন্মুক্ত বুক দেখাবার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল এবং সেই আশ্চর্যজনক আভাঁগার্দ প্রদর্শনী দেখার জন্য অনেকের সঙ্গে আমাকেও আহ্বান করেছিল । আপনি পৃথিবীর ওই পারে বসে কলকাতায় এই ধরণের বয়ঃসন্ধিকালীন ইয়ার্কিকে প্রচার করায় আপনার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বলে চালাতে পারেন । আশা করি আমার যা দায়িত্ব তা পালন করার জন্য আপনি আমাকে আপনার মতের সঙ্গে পার্থক্য সমর্থন করবেন ।
         পুলিশের পক্ষে নিশ্চয়ই বোকামি হয়েছে এই যুবকদের গড়া ফাঁদে পড়ে তাদের কয়েকজনকে কয়েক দিনের জন্য হেফাজতে নেয়া ( তাদের সবাইকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়েছে ) আর তার দ্বারা তাদের প্রচারে সুবিধা করে দেয়া এবং জনসাধারণের সহানুভূতি সংগ্রহ করা — তারা তাদের ইয়ার্কির মাধ্যমে নিজেদের প্রচারই চাইছিল ।
         আপনার মতের সঙ্গে আমার এ-ব্যাপারে মিল নেই যে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের প্রধান কাজ হলো মার্কিন বিটনিক কবিদের কাঁচা অনুকরণকারীদের সাহায্য করা । ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমার ভাষার সাহিত্যকদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতাকে আপনার নির্দেশে খর্ব করতে পারি না — যে ভাষা সম্পর্কে আপনি নিজের অজ্ঞতা বেছে নিয়েছেন ।
         আপনার সঙ্গে গূঢ় পার্থক্য সত্ত্বেও এবং আপনার কয়েকটি অসাধারণ কবিতাকে ভালোলাগা সত্ত্বেও আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই ।
                                                                   ভবদীয়
                                                              আবু সয়ীদ আইয়ুব
         শৈলেশ্বর ও সুভাষের জবানবন্দিতে সাহসের অভাব ছিল । যে আত্মিক অসহায়বোধ তাঁদের হাংরি আন্দোলনে প্রাণিত করেছে, গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি তাই তাঁদের বৈষয়িক অসহায়বোধে দাঁড় করিয়েছে । সুযোগ খুঁজেছেন নিস্তারের । এমনকি হাংরির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের মুচলেকার বিনিময়েও কাঙ্খিত ছিল মুক্তি । এসব কার্যকলাপ ও মনোভাব দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে মলয়ের । সামাজিক সব মূল্যবোধকে যাঁরা অবিশ্বাস করে এগিয়েছিলেন, যা কিছু প্রচলিত তাকেই সন্দেহ করা, শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও  এ অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়েছিল । শৈলেশ্বরের জবানবন্দি পরবর্তী সময়ে মলয়ের ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ ।
         ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার দোষারোপে আলিপুর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের নয় নম্বর কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী এ কে মিত্র মলয়ের দোশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিলেন সঙ্গে অভিযুক্ত রচনাগুলোর বিনষ্টির আদেশ । কলকাতা হাইকোর্টে অবশ্য এ-মামলা টেকেনি । বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন মলয় । কিন্তু অনেক টেনশন ও অর্থ খরচের পর । শুধু কি তাই ? বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটে গেল হাংরি লেখকদের সঙ্গে ।
কৃতজ্ঞতা : মহাদিগন্ত

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত