মূকাভিনয় : ইতিহাস জুড়ে নীরবতার শিল্প

Reading Time: 8 minutes

জুবাইর মেহরান

যদি একদিন পৃথিবীর এতসব ভাষার ভিন্নতা আর বৈরিতা ভেঙে আমরা সবাই শুধুমাত্র একটি ভাষায় যোগাযোগ করতে চাই, তবে সেটি কোন ভাষা হবে? সেটি হবে শরীরের ভাষা, দেহের ভাষা। জগতের আদি ও অকৃত্রিম, শাশ্বত ও সর্বজনীন ভাষা হলো দেহের ভাষা। কালের পরম্পরায় দেহের আর শরীরের এই ভাষাকে শিল্পে সংজ্ঞায়িত করা হয় মূকাভিনয় বলে। প্রত্যেকটি শিল্পের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। আমরা যখন কোনো শিল্পের ভাষা অন্তঃকরণ করতে পারি, তখনই কেবল সেই শিল্পের পরিপূর্ণ আস্বাদ লাভ করতে পারি। মূকাভিনয়ের ভাষা হচ্ছে সর্বজনীন ও শাশ্বত। মূকাভিনয় শিল্প বোঝার জন্য দর্শকের মধ্যে কোনো শ্রেণীকরণ প্রয়োজন হয় না। মূকাভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে ভাষা, চিন্তাধারা এবং প্রদর্শিত শিল্পের মর্মার্থ উপলব্ধির ক্ষেত্রে কোনো বৈরিতার জায়গা থাকে না। কারণ, দেশ, কাল, পাত্রভেদে মূকাভিনয়ের সহজ সাবলীল ভাষা সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করতে সক্ষম।

দেহের আর শরীরের এই ভাষাকে শিল্পে সংজ্ঞায়িত করা হয় মূকাভিনয় বলে

অন্যান্য শিল্পকর্মে শিল্পী এবং দর্শকের মধ্যে সার্বিক যোগাযোগ সম্ভবপর হয়ে ওঠে না; যেমন- ভাষার ভিন্নতার কারণে ভিন্নদেশীয় নাটক বা চলচ্চিত্রের পরিপূর্ণতা বুঝতে আমরা সক্ষম হই না। সাধারণ মানুষেরা নৃত্য দেখলে নৃত্যের ব্যঞ্জনা অনুভব করে ঠিকই, তবে নৃত্যের স্বীকৃত মুদ্রাসমূহের সাথে পরিচিতি না থাকার ফলে দর্শক ও শিল্পীর মধ্যকার সার্বিক যোগাযোগ স্থাপনে বাধার সৃষ্টি হয়। চিত্রকার সৃজনশীলতার মাধ্যমে জীবন্ত রূপ দেন তার চিত্রপটে আঁকা ছবিতে। ছবির ভাষা আন্তর্জাতিক হওয়া সত্ত্বেও ছবির মর্মার্থ সবসময় সকল দর্শকের কাছে সমানভাবে একই আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না। তবে দর্শক মূকাভিনয়ের স্বীকৃত ব্যাকরণ না জানলেও অভিনয়ে মানুষের মৌলিক উপস্থাপনভঙ্গী, প্রাচীন আবেদন, হৃদয়ের আকুতি, আবেগ, উৎকণ্ঠা ইত্যাদিকে অন্তঃকরণ করতে পারে। ফলে বলা যায়, মূকাভিনয় হলো শিল্পের ‘বৈশ্বিক ভাষা’। মূকাভিনয়ের সংজ্ঞা ‘মূকাভিনয়’ শব্দটির উৎপত্তি ‘মূক’ এবং ‘অভিনয়’ শব্দ দুটি থেকে। মূক মানে যে কথা বলতে পারে না, বাকপ্রতিবন্ধী। আর অভিনয় মানে চরিত্র অনুকরণ করা। সুতরাং মূকাভিনয় হলো সংলাপবিহীন অভিনয়। কোনো প্রকার সংলাপ উচ্চারণ না করে নান্দনিক, শিল্পসম্মত এবং অর্থপূর্ণ অভিনয় কৌশলকে সাধারণ অর্থে মূকাভিনয় বলা যায়। ‘মূকাভিনয়’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হিসেবে দুটি শব্দ পাওয়া যায়। ১. মাইম (Mime) ২. প্যান্টোমাইম (Pantomime) মিম হচ্ছে ফরাসি শব্দ। ইংরেজিতে একে বলা হয় মাইম। এর অর্থ হলো প্রহসনের অভিনয়, কোনো চরিত্রকে হাস্যোদ্দীপকভাবে উপস্থাপন করা। ফেসবুকে ব্যাঙ্গার্থে ব্যবহৃত ছবিগুলোকে ‘মিম’ বলার প্রচলন এই ফরাসি শব্দটি থেকেই। প্যান্টোমাইম শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ Pantos (প্যান্টোস) এবং Mimeomai (মাইমিওমাই) থেকে। এর অর্থ সংলাপবিহীন অভিনয়, নির্বাক নাটক বা অভিনয়। এই শব্দটি গ্রিক থেকে এলেও এর নামকরণ করেছে রোমানরা। মাইম আর প্যান্টোমাইমের পার্থক্য মাইম এবং প্যান্টোমাইম একই ধারায় বয়ে আসছে সূচনালগ্ন থেকে। এই দুটির মাঝে তেমন ফারাক নেই। তবুও কেউ কেউ এর মধ্যে পার্থক্য করে বলেন, মাইম হচ্ছে সিরিয়াস বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা আর প্যান্টোমাইম হচ্ছে হাস্যরসাত্মক নাটকাদির উপস্থাপনা। মাইম সুক্ষ্ম আর প্যান্টোমাইম বৃহদাকার। মাইমের বিষয়বস্তুতে কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকবে না, প্যান্টোমাইমে কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকবে ইত্যাদি। যুগে যুগে মাইম আর প্যান্টোমাইমের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে যেন বিষয়টিকে আরো জটিলতর করে ফেলা হয়েছে। উভয়ের মাঝে পার্থক্য আছে বলে মেনে না নিলেও, মূকাভিনয়ের উন্নতিতে বাধা পড়ার কথা না। তাই বলা যায়, মাইম আর প্যান্টোমাইম যেন এক গন্তব্যেরই দুটি পথ। মূকাভিনয়ের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব শুরুর দিক থেকে মূকাভিনয়ের উপস্থাপন রীতির সাথে ব্যঙ্গাত্মক, হাস্যরসাত্মক এবং ভাঁড়ামিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ প্রাধান্য পেয়ে আসলেও শিল্পটি এখন সেখানেই আর সীমাবদ্ধ নেই। অধুনা মূকাভিনয় এখন শিল্পিত ও নন্দিত উপায়ে ফুটিয়ে তোলে সামাজের মানুষের না বলা কথা, অব্যক্ত জ্বালা-যন্ত্রণা, অন্যায়, অবিচার, শাসন-শোষণ, ভালোবাসা আর আকাঙ্ক্ষা তথা সার্বিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি।

মূকাভিনয়ে বাংলাদেশী শিল্পী মীর লোকমান

মূকাভিনয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব থাকলেও মূকাভিনয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে সচেতনতা বৃদ্ধি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণসচেতনতা এবং দেশজ সংস্কৃতিবোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে। রাজনীতির কলুষিত পরিস্থিতিতে মানুষের মুখ যখন বন্ধ হয়ে আসে, কথা বলার অধিকার যখন থাকে না, তখন মূকাভিনয় হয়ে ওঠে কথা বলার বিরাট এক মাধ্যম। এ যেন কিছু না বলেই সবকিছু বলে দেওয়ার এক প্রতিবাদী কণ্ঠ-অস্ত্র। ফরাসি বিপ্লবের সময় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের বৈপ্লবিক জাগরণে উদ্বুদ্ধ করেছিলো মূকাভিনয়। উৎস ও ক্রমবিকাশ মূকাভিনয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রকার বিতর্কের দিকে না গিয়ে এই কথা বলে দেওয়া যায় যে, মানুষ সৃষ্টির সূচনালগ্ন পর্যায়েই মূকাভিনয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মানবসভ্যতা যখন ‘আহরণ ও শিকার’ যুগকে অতিক্রম করছিলো, তখনই তাদের মাঝে অনুকৃতি শিল্পের জন্মলাভ করে। তখন শিল্পকলার বিষয়বস্তু ছিলো শিকার সংক্রান্ত বিষয়াদি। যেমন- কোন পশু কীভাবে শিকার করলে পশু ফের আক্রমণ করতে পারে না, শিকারকৃত আহত পশু কীভাবে গোঙ্গায়, ইত্যাদি অনুকৃতির অভিনয় করে অন্যদেরকে আনন্দ দিতো মূকাভিনেতারা। এভাবে পশুপালন যুগ, কৃষি যুগ এবং ধারাবাহিকভাবে শিল্প যুগে মূকাভিনেতারা নিজস্ব যুগের মৌলিক উপজীব্য সংক্রান্ত বিষয়াদির ভাঁড়ামিপূর্ণ অনুকৃতি করে মানুষকে আনন্দের খোরাক দিত। যদিও প্রাচীন যুগগুলোতে শিল্পটির কোনো শৈল্পিক রূপ ছিল না। এরিস্টটল তার ‘পয়োটিকস‘-এ এবং ভারতমুনি তার ‘নাট্যশাস্ত্র‘তে নাট্যকর্মের প্রধান অবলম্বনরূপে ‘অনুকরণ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অনুকরণ বা অনুকৃতি শিল্প তথা মূকাভিনয়ের শৈল্পিকরূপ আত্মপ্রকাশ ঘটে চীন, জাপান এবং ভারতবর্ষে।

মূকাভিনয় হলো শিল্পের ‘বৈশ্বিক ভাষা’

চীন ১০০ অব্দের একজন লেখকের রচনা থেকে উদ্ধার করা যায়, চীন দেশে মেং (Meng) নামক একজন প্রসিদ্ধ মূকাভিনেতার অস্তিত্ব ছিলো। মূলত চৌ রাজত্বকালে (১১২২-৩১৪ খ্রিস্টপূর্ব) নৃত্যাভিনয়ের বিকাশ ঘটেছিলো এবং হান রাজত্বকাল (২০৬ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ২২০ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত মুখোশ নৃত্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আর এই মুখোশ নৃত্যই বর্তমান মূকাভিনয়ের প্রাচীনতম শৈল্পিক গঠন। চীনা মূকাভিনেতারা অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বাস্তব কোনো উপকরণ ছাড়াই তারা বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। কাল্পনিক দরজা খোলা ও বন্ধ করা; সমতল ভূমিতে সিঁড়ি ভাঙার বাস্তব রূপ দেওয়া; সুঁই-সুতা ছাড়াই কাপড় সেলাই করা; কাপ, পিরিচ, প্লেট ছাড়াই আহারাদি সম্পন্ন করা; দুঃখের হাসি, তোষামোদি হাসি, পাগলের হাসি, ভয়ঙ্কর হাসি; খুঁড়িয়ে চলা প্রভৃতি যাবতীয় অঙ্গভঙ্গিমায় তারা পারঙ্গম ছিলেন। পৌরুষ, সাহসিকতা, ভয়ঙ্কর ভাব আনার জন্য তারা মুখে বাঁকা করে সাদা বা কালো রঙের দাগ কাটতেন। সাদা রং করা মুখ ভালো চরিত্র এবং কালো রং করা মুখ খারাপ চরিত্ররূপে গণ্য হতো। জাপান জাপানী থিয়েটারের প্রাথমিক বিষয়বস্তু ছিলো ধর্মীয়। মুর্তির সামনে তারা নৃত্যানুষ্ঠান উৎসর্গ করতো। জাপানের ক্লাসিক্যাল থিয়েটার স্বীকৃত ‘নো’ (Noh) এখনও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে আদিযুগের ঐতিহ্য বহন করে। ‘নো’ নাটকের উদ্ভব চতুর্দশ শতকে। এই নাটক জেন (Zen) দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলো। বৌদ্ধ পুরোহিত কোয়ানামি (Kwanami, ১৩৩৩-১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং তার পুত্র জেয়মির (Zeami, ১৩৬৩-১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দ) চেষ্টাতেই ‘নো’ নাট্যশিল্প পূর্ণতা লাভ করে। ‘নো’ নাটকের একটি হাস্যরসাত্মক অংশ ছিলো, যার নাম কিয়োগেন (Keogen)। এটিই মূলত মূকাভিনয়ের জাপানী প্রাচীনতম শৈল্পিক রূপ। বাঁশের পুলের উপর দিয়ে পার হওয়া, যাত্রীদের নৌকায় আরোহণ, নদী পার হওয়া, মাঝির নৌকা চালানো এবং নৌকা থেকে অবতরণ ইত্যাদি ক্রিয়াকলাপ তার মূকাভিনয়ের মধ্য দিয়ে প্রদর্শিত করতো।

আধুনিক যুগের নো নাটকের একটি থিয়েটার

ভারতবর্ষ পণ্ডিতদের মতে, ভারতবর্ষে পুতুল নাচ ও মূকাভিনয়ের প্রচলন বৈদিক যুগেরও (আনুমানিক ১,৫০০-৭০০ খ্রিস্টপূর্ব) আগে থেকে। পতঞ্জলি তার ‘মহাভাষ্য‘ গ্রন্থে শৌভিক ও গ্রন্থিকের কথা উল্লেখ করেছেন। সে আলোচনা থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় শৌভিকেরা মূকাভিনয় করতো আর গ্রন্থিকেরা শব্দ গ্রন্থনের মাধ্যমে বর্ণনা করতো। ভারতীয় নৃত্যের সাথে মূকাভিনয়ের অস্তিত্ব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিশেষ করে ‘কথাকলি’ ও ‘ভরতনাট্যম’- এ মূকাভিনয়ের উৎস পাওয়া যায়। কথাকলি হলো একধরনের নৃত্যবিশেষ। এই নৃত্য প্রাচীন ঐতিহ্য বহনকারী এমন শিল্প, যা ছিলো সম্পূর্ণ বিদেশি প্রভাবমুক্ত। কথাকলি নৃত্য মূলত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাবব্যঞ্জক মূকাভিনয় সম্বলিত দৃশ্যকাব্য। ভরতনাট্যম হলো এমন বিশেষ ধরনের নৃত্য, যা মার্গনৃত্যধারার পূর্ণাঙ্গ রূপের শ্রেষ্ঠতম অভিব্যক্তি। ভরতনাট্যমের মাঝেও মূকাভিনয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

কথাকলি নৃত্যশিল্পীর অঙ্গসজ্জা

গ্রিস গ্রীক সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গৌরবরূপে পরিগণিত যে শিল্প-আঙ্গিক, তার নাম হলো গ্রীক নাট্য বা গ্রীক থিয়েটার। হেরোডোটাসের মতে, গ্রীক দেবতা ডিয়োনাইসাস (Dionysus) ছিলেন লৌকিক দেবতা। সাধারণ মানুষের মতো তিনিও সুখ-দুঃখের অনুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। ৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অ্যাটিকা অঞ্চলে শীত ও বসন্ত উপলক্ষ্যে এই দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা অনুষ্ঠিত হতো। এসব পূজায় নৃত্য সহযোগে আচার-আচরণ পালন করা হতো। এর থেকেই প্রাচীন গ্রীক নৃত্যের উৎপত্তি ঘটে। গ্রিসে ডিয়োনাইসাসের উৎসবগুলো ছাড়াও আরেক প্রকার উৎসব পালিত হতো, যার নাম প্যানাথেনিয়া। এই উৎসব থেকে কোরাস অভিনয়ের উদ্ভব ঘটে। গ্রীক নাটকের উৎস, অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার, নীরব অভিনয়, মুখোশ সংযোজন, নৃত্যভঙ্গিমা, কোরাসের উদ্ভব ইত্যাদির মাঝে মূকাভিনয়ের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।

ডিয়োনাইসাস

রোম শস্য দেবতা ডিয়োনাইসাসের উৎসবকে অবলম্বন করে গ্রিস নাট্যকলার জন্ম দিয়েছিলো। তবে রোমানরা তাদের শস্যদেবতা সিলভানুস ও টেল্লুসকে অবলম্বন করে উন্নতমানের কোনো থিয়েটারের উদ্ভব করতে পারেনি। দেবতাদের সামনে সস্তা হাস্যকৌতুক, ভাঁড়ামি আর অশ্লীল নৃত্য ইত্যাদিই হতো। তবে মূকাভিনয় সে সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব ইতালি ও সিসিলিতে খুব বিস্তার লাভ করে। মাইম এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, কবিরাও এতে আত্মনিয়োগ শুরু করে। ষষ্ট-সপ্তম খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় সর্বত্রই মাইম প্রবল প্রতাপে বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। তবে রোমানরা মূকাভিনয়ে তেমন উন্নতি করতে পারেনি শিল্পগুণহীনতা ও অশ্লীলতার কারণে। তখন একদল রুচিশীল ব্যক্তির হাত ধরে উদ্ভব ঘটে প্যান্টোমাইমের। প্যান্টোমাইম অভিনেতারা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। তবে কিছুদিনের ব্যবধানে প্যান্টোমাইমও নীতিহীনতার দোষে কলুষিত হয়ে উঠে। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা প্যান্টোমাইম অভিনেত্রীদেরকে নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে শুরু করল এবং মঞ্চে সত্যিকার ব্যভিচার অভিনীত হওয়া শুরু হলো। এভাবেই রোমে প্যান্টোমাইমেরও পতন ঘটল। ফ্রান্স ১৪৫৩ সালে মুসলিমদের হাতে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) বিজিত হলে খ্রিস্টান পণ্ডিতবর্গ গ্রীকদের জ্ঞান ভাণ্ডার নিয়ে ইউরোপে চলে আসেন। শুরু হয় রেনেসাঁর যুগ। এই জ্ঞানের সাথে ইউরোপের পরিচয় ছিলো না। প্রাচীন গ্রীক ও ল্যাটিন জ্ঞান ভাণ্ডার পেয়ে ইউরোপ পায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য চর্চার এক ভিন্ন দিগন্ত। রেনেসাঁ আন্দোলনের সূত্র ধরে শিক্ষিতদের নাট্যকর্মের জন্য গড়ে ওঠে নাট্যশালা এবং বিভিন্ন মঞ্চ পদ্ধতি ও কারিগরি কৌশল যা ফর্মাল থিয়েটার হিসেবে অভিহিত হয়। ইতালিতেই রেনেসাঁর প্রথম প্রাণবীজ রোপিত হয়। ষোল শতকের মাঝামাঝি থেকে ইতালিতে গড়ে উঠতে থাকে জনগণের অর্থাৎ পপুলার থিয়েটার, যার নামকরণ করা হয়েছিলো ‘কমেডিয়া ডেল আর্টে’ (Commedia dell arte)। কিন্তু আশ্চর্যজনক কথা হলো, এই থিয়েটার ইতালির নাট্যকারদের উপর তেমন প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি। অথচ ইউরোপের অন্যান্য স্থানে অর্থাৎ ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও পরে জার্মানিতে এর প্রচুর প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাবেই ফ্রান্সের প্যারিসে ১৬৮০ সালে গঠিত হলো ‘কমেডিয়া ফঁসেজ’ (Comedia Francaise) নামের থিয়েটার এবং এর মাধ্যমে ফ্রান্স পৃথিবীর নাট্য ইতিহাসে প্রথম জাতীয় থিয়েটার নির্মাণ করল।

মার্সেল মার্সো

ইতালির ‘কমেডিয়া ডেল আর্টের’ প্রভাবে ফ্রান্সের ‘কমেডিয়া ফঁসেজ’ সৃষ্টি হলো এবং এভাবেই ইতালি থেকে প্রাপ্ত মূকাভিনয় ফরাসিরা নিজস্ব ঐতিহ্যের আলোকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলে, যা ফরাসিদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করে। উল্লেখ্য, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মূকাভিনেতা হিসেবে খ্যাত ফরাসি মূকাভিনেতা মার্সেল মার্সোকে বলা হয়ে থাকে ‘মাস্টার অব মাইম’। ২২শে মার্চ ১৯২৩ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। তার জন্মদিন অনুসারে বাইশে মার্চকে বিশ্ব মাইম দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ইংল্যান্ড ইংল্যান্ডে মধ্যযুগ থেকেই বিভিন্ন নাট্যদল গড়ে ওঠে। এসব দল মেলায় নাটক করে বেড়াত। ১৬৭২-১৭১৮ পর্যন্ত ফরাসি ও ইতালীয় বিভিন্ন নাট্যদল ইংল্যান্ডে সফর করে। তাদের সংস্পর্শে ইংল্যান্ডের যে কয়জন মূকাভিনেতা তৈরি হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেন জোসেফ গ্রিমাল্ডি। তবে তিনি এত বেশি হালকা ও ভাঁড়ামিপূর্ণ বিষয় নিয়ে মূকাভিনয় করতেন যে, মূকাভিনয়ের অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে শুধু ভাঁড়ামির অংশটুকুই টিকে ছিলো। ১৭৩৭ সালে এই জনপ্রিয় মূকাভিনেতা মৃত্যুবরণ করলে মাইমে ভাঁড়ামির উপাদান ধীরে ধীরে কমে আসে। ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন আরেকজন শক্তিমান মূকাভিনেতা ডন ল্যানো। ল্যানো ইংল্যান্ডের প্রথম মূকাভিনেতা, যিনি কৌতুক অভিনেতা না হয়ে শুধু অভিনেতা হিসেবেই মূকাভিনয় করেন। ১৯২০-৩০ সালের মিউজিক্যাল কমেডিগুলোও প্যান্টোমাইম দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিল।

জোসেফ গ্রিমাল্ডি

বাংলাদেশে মূকাভিনয় স্বাধীনতার পূর্বে মাইম, প্যান্টোমাইম বা মূকাভিনয় কোনো শব্দের সাথেই এ দেশের মানুষের পরিচিতি প্রায় ছিল না বললেই চলে। তখন গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন পালা-পার্বণ, ধর্মীয় উৎসব, লোকাচার, বাৎসরিক মেলা বা উৎসবগুলোতে অপরিশীলিত অবস্থায় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আনন্দদানের বিষয়টি প্রচলিত ছিল। এসব মূকাভিনয়ের পর্যায়ে না পড়লেও অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে অভিনয় করার রীতিকে এদেশে মূকাভিনয়ের অস্পষ্ট উৎস হিসেবে চিহ্নিত করাই যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে এ দেশে প্রথম আধুনিক মূকাভিনয় প্রদর্শনের কৃতিত্ব প্রথিতযশা মূকাভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদারের। তিনি  সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মূকাভিনেতা হিসেবে খ্যাত ফরাসি মূকাভিনেতা ‘মাস্টার অব মাইম’ মার্সেল মার্সোর কাছ থেকেও মূকাভিনয়ে দীক্ষা নিয়েছিলেন। মার্সো তার সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “পার্থ ইজ দ্য ব্রিজ অব কম্যুনিকেশন বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট।

পার্থপ্রতিম মজুমদার

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের মঞ্চে প্রথম বিদেশি যিনি অভিনয় করেন, তিনি হলেন আমেরিকার শিল্পী অ্যাডাম ডারিয়াস। তার অভিনয়ের মধ্য দিয়েই এ দেশের মূকাভিনয়-মঞ্চ আন্তর্জাতিক পদচারণায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়। এরপর বেশ ক’জন বিদেশি মূকাভিনেতা শিল্পকলা একাডেমি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউট মঞ্চে মূকাভিনয় প্রদর্শন করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্পে কাজ করার জন্য অল্প কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন। এদের মধ্যে পার্থপ্রতীম মজুমদার ছাড়াও কাজি মশহুরুল হুদা এবং জিল্লুর রহমান জন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের চর্চা থেমে নেই এখনও। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইম বা প্যান্টোমাইম চর্চার জন্য ছোট-বড় সংগঠন রয়েছে, যারা মাঝেমধ্যেই দেশের বাইরে গিয়েও মূকাভিনয় প্রদর্শন করছে।  

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত