মূর্তি ভাঙার রাজনীতি এবং কিছু প্রশ্ন

‘দড়ি ধরে মারো টান রাজা হবে খান খান।’ হীরকরাজার দেশে সাধারণ মানুষের জয় বার্তা সূচিত হয় এভাবেই মূর্তি ভাঙার ভেতর দিয়ে কিংবা হালের সিনেমা বাহুবলীতেও দেখি সোনার মূর্তি ভেঙে ফেলা হয় মাথা গড়িয়ে পড়ছে আর বাহুবলী নতুন রাজা হলেন।

কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গার পরেই সামাজিক মাধ্যমে ও গণমাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে। কিন্তু মূর্তিভাঙা-র সংস্কৃতি তো ভারতে নতুন কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গেও গত শতকের সত্তরের দশকে নকশালদের হাতে প্রথম এই মূর্তিভাঙা শুরু হয়। আমাদের দেশের স্মরণীয় মহাপুরুষ যাঁরা, যাঁরা আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রোল মডেল — যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ — তাঁদের মূর্তিভাঙা শুরু হয়। রাজনৈতিক অর্থে অত্যন্ত বালখিল্য ও ইংরেজিতে যাকে বলে ‘কাউন্টার প্রোডাক্টিভ’ ছিল এই কাজ। তবে এটা করার পেছনে যে মূল ভাবনাটা ছিল, সেটা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। নকশালরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই যে আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষেরা, এঁরা এতখানি ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন, কিন্তু এঁরা আমাদের সমাজের সংখ্যাগুরু উৎপাদক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কখনও যুক্ত হতে পেরেছিলেন কি? যুক্তিবাদী দর্শনের দিক থেকে বিদ্যাসাগরের মতো এমন নির্ভীক ও অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একজন মানুষ আমাদের দেশে — কোনও দেশেই — আর ক’টা জন্ম নিয়েছিলেন সন্দেহ আছে, কিন্তু তিনিও উনিশ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলির সঙ্গে কোনওভাবে সংযুক্ত হওয়ার কথা ভেবেছিলেন কি? সমাজের বৃহত্তম উৎপাদক শ্রেণির সঙ্গে তাঁদের এই ‘ডিসকানেক্ট’, এই সীমবদ্ধতা, তাঁদের মাহাত্ম্যকে কিছুটা মলিন করে দেয় না কি? নকশালরা সেদিন শ্রেণিগত দিক থেকে এই যে মৌলিক প্রশ্নটা তুলে দিয়েছিলেন, সেটা পরবর্তীকালে জ্ঞানচর্চার নিরিখে মান্যতা পেয়েছে, অনেক ইতিহাসবিদ এখন তাঁদের কাজে এই দৃষ্টিকোণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। অর্থাৎ সেদিন নকশালদের তোলা সামাজিক প্রশ্নটি স্থায়ী মূল্য পেয়েছে, যদিও ওই তর্ক তোলার জন্য শারীরিকভাবে মহাপুরুষদের মূর্তি ভাঙাভাঙির কোনও প্রয়োজন ছিল না। বরং ওরই মধ্য দিয়ে বিপ্লবীরা মধ্যশ্রেণীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সহানূভূতি হারিয়েছিল।

কিন্তু সেদিনের মূর্তিভাঙা আর আজ দেশজুড়ে যা চলছে — দু’টো ঘটনা রাডিক্যালি আলাদা।

কিছুটা সময় পিছিয়ে গিয়ে যদি তাকান ত্রিপুরার দিকে দেখবেন বামেদের সরিয়ে রাজ্যের সিংহাসনে বিজেপির আসীন হবার আগেই রুশ বিপ্লবের নায়ক ভলাদিমির লেনিনের মূর্তি ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গেছিলো  ত্রিপুরায়। পিছিয়ে রইলনা তামিলনাড়ু। সেখানেও ভেঙে ফেলা হল অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করা দ্রাবিড়ীয় নেতা তথা সমাজসেবী ই ভি রামস্বামীর মূর্তি, লোকে যাকে পেরিয়ার নামেই জানে। মূর্তি ভাঙার সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ল দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। রেনেসাঁর জন্মদাত্রী বাংলার মত রাজ্যেও কালি মাখানো হল ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মত বরেণ্য মানুষের মূর্তিতে। উত্তরপ্রদেশের মীরাটে এরপর আক্রান্ত হলেন স্বয়ং ভারতীয় সংবিধান প্রণেতা। ভাঙা হল ডঃ বি আর আম্বেদকরের মূর্তি। বাদ গেলেন না জাতীয় বীর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। রং মাখানো হল তাঁর মূর্তিতে। এরপর বঙ্গবাসীকে আশ্চর্য করে দিয়ে বাংলার বুকে মূর্তি ভাঙার তালিকায় চলে এলেন মাইকেল মধুসূদনের মত বিশ্বখ্যাত একজন কবিও। আসানসোলে রং মাখানো হল ‘মেঘনাদ বধ’ রচয়িতার মুখে।

এসব ঘটনাবলী দেখা ও শোনার পর যে সব প্রশ্ন সামনে আসে,তা হল কারা করছে এসব? তারা কি আদৌ রাজনীতির লোক? যারা এসব করছে তারা কি আদৌ জানে কেন তারা এই কাজ করছে? তারা কি জানে এটা উচিত কি অনুচিত? তারা কি আদৌ জানে কাদের মূর্তি কেন ভাঙছে তারা? তারা কি জানে যাদের মূর্তি ভেঙে কালি মাখানো হচ্ছে তারা কে , কি তাদের পরিচয়? সব থেকে বড় প্রশ্ন যারা মূর্তি ভাঙছে তারা কি ঐসব মানুষদের পরিচয় বোঝার যোগ্য?

আসলে ভারতের বুকে বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলিতে দুষ্কৃতিদের যে একটা বড় জায়গা রয়েছে একথা এখন আর গোপন নয়। প্রায় প্রত্যেক রাজনৌতিক দলই এখন মাসলম্যানের পূজারী। বলা বাহুল্য এদের দিয়েই বর্তমানে ‘রাজ-নীতি’ পরিচালিত হয়। অর্থাত্‍ ‘রাজনীতি’ বিষয়টাই এখন আর রাজ্যের নীতি নির্ধারণের জায়গায় নেই , পৌঁছে গেছে ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গায়। সেই কারণেই আজ সরকারে এসে কেউ রাজ্যের বা দেশের দায়িত্ব পালন নিয়ে সেভাবে ভাবেন না, যতটা ভাবেন বিরোধীদের নিয়ে। এই বিরোধীদের জব্দ করার সাথে সাথে দেশ বা সমাজের বুকে সাধারণ মানুষের মনে নিজেদের সম্পর্কে একটা ভয় জিইয়ে রাখার জন্যেই প্রয়োজন হয় এইসব মাসলম্যানের , যাদের দিয়ে অশান্তি লাগিয়ে প্রচার করা হয় – ‘এটা মানুষের ক্ষোভ’। মজার কথা হল, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওসব ক্ষোভ-টোভ নিয়ে মাথা ঘামানোর মত সময়ই নেই। থাকলে এদেশের চিত্রটাই বদলে যেত। কারণ উগরে দেবার মত বহু ক্ষোভ তাদের ভেতরে রয়েছে , অথচ তারা তা নীরবে হজম করে। এর জন্যেই তো মাসলম্যানরা রয়েছেন।

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, অন্যান্য খারাপ কাজের ন্যায় মূর্তি ভাঙার মত খারাপ কাজও সেই সব দুষ্কৃতিদের দিয়েই করানো হয়েছে যারা মূর্তির ইতিহাসের ধার ধারেনা। তবে দেশের শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা যখন অশিক্ষিতের মত আচরণ করে নিজেরাই দুষ্কৃতিদের দায়িত্ব পালন করে, তখন বুঝতে হবে সমাজে অবক্ষয়ের কালো মেঘ দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে।

মূর্তি ভাঙার ইতিহাস সারা পৃথিবীর বুকেই রয়েছে। জনগনের মন থেকে স্বাধীন চিন্তা ভাবনা তুলে ফেলে নিজেদের মতামত জোর করে প্রবেশ করিয়ে দেওয়াকেই আধুনিক বিশ্বে বলা হয়েছে ‘রাজনীতি’।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে আফগানিস্তানের বমিয়ানের বুদ্ধমূর্তিগুলি তালিবানরা ধ্বংস করেছিল । মূর্তিগুলি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় পৃথিবীর বহু দেশ নিষেধ করে। কিন্তু কারও কথা তারা শোনেনি। এমনকি ওরগেনাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স এর চুয়ান্ন দেশের প্রতিনিধিরা একটি সভায় মূর্তি ধ্বংসের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। সৌদি আরবের মতো কট্টর ধর্মপন্থী দেশও এই কাজকে বর্বোরচিত বলে আখ্যা দেয়। তালিবানদের দ্বারা ধ্বংসের জন্যে চিহ্নিত সমস্ত ভাস্কর্য ভারতে স্থানান্তরের আবেদন জানায় তৎকালীন ভারত সরকার। কিন্তু সে অনুরোধ তালিবান সরকার ফিরিয়ে দেয়। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ২ মার্চ থেকে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে ডিনামাইট ও অন্যান্য বিস্ফোরক দিয়ে মূর্তিগুলি ধ্বংস করা হয়। তালিবানদের যুক্তি ছিল মূর্তি-সংস্কৃতি ইসলাম বিরোধী। মূর্তি – ভাস্কর্য এবং মূর্তি পূজার মধ্যে তফাত সারা বিশ্ব তাদের বোঝাতে পারেনি। ভাস্কর্য ও স্থাপত্য যে মানবেতিহাসের অমূল্য সাক্ষী সে শিক্ষা গ্রহণ না করে কেবল ধ্বংস করার ইতিহাস তৈরি করে গেল তালিবানরা। যদিও তালিবান অর্থ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ থেকে প্রায়ই মূর্তি ভাঙ্গার খবর গণমাধ্যমে উঠে আসে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দেব দেবীর মূর্তি ভেঙ্গে ভয় জিইয়ে রাখে কিংবা অজান্তেই বার্তা দেয় দেশ সংখ্যালঘুদের জন্য নয়। এমন আরো দেশের গল্প অন্য একদিনের জন্য তোলা থাক। বরং পৃথিবীর সব মূর্তি ভাঙার ঘটনায় একটা জিনিস স্পষ্ট যারা তা করেছেন বা করছেন তারা রাজনৈতিক নেতা বা প্রবক্তাও বটে।

কিন্তু যে দেশ যুগে যুগে সারা পৃথিবীর মানুষ ও তাদের মতামতকে আপন করে নিয়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নিদর্শন স্থাপন করেছে , সেই নানা ভাষা-নানা মত-নানা পরিধানের দেশ ভারতের কাছ থেকে এটা কি আশা করা যায় ? আজকাল তো মঞ্চে বিবেকানন্দের মত সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী কিংবা রবীন্দ্রনাথের মত বিশ্বকবিকে রেখেও রাজনীতি করা হয়। তবে যারা শ্রীরামকৃষ্ণ-পরমহংসকে মানেন, তারা অদ্ভুতভাবেই তার “যত মত তত পথ”-এর আদর্শকে মানেন না। যারা নিজেদের ভারতের ঐতিহ্যের ধারক বাহক বলে প্রচার করেন, তাদের কাছে এটা দ্বিচারিতা নয় ?

মূর্তি ভাঙার খেলায় সেইরকম রাজনৈতিক প্রবক্তাদের প্রবচনই শোনা গেল – একটা নির্বাচিত শাসকদল আগের নির্বাচিত শাসকদলের গড়ে তোলা জিনিস ভেঙে দিতেই পারে। এখন তবে একটাই প্রশ্ন, কোনো শাসকের পক্ষে একাজ যদি বৈধ হয় ,তাহলে মন্দির ভেঙে মসজিদ গড়ার বেলায় সেটা বৈধ বলে তারা মেনে নিচ্ছেন না কেন ?

মনে পড়ে, আমাদের দেশেরই রাজা পুরু বিদেশির কাছে যুদ্ধে হেরেও চেয়েছিলেন-রাজার প্রতি রাজার মত আচরণ। ২৩০০বছর আগে বিদেশি আলেকজান্ডার তা দিতে পারলেও সংস্কৃতি ও প্রগতির বড়াই করা ভারত আজ নিজেরই দেশের মানুষের প্রতি সেই সৌজন্যটুকু দেখাতে পারছে না।

আজ সময় এসেছে মূর্তি না ভেঙে এসব নিয়ে গণপরিসরে আলোচনা-বিতর্ক চালানো হোক, তাতে জনগণ জানতে পারবে ইতিহাসে কার অবস্থান কোথায়। রাজনীতি তো জণগণের জন্যই…

One thought on “মূর্তি ভাঙার রাজনীতি এবং কিছু প্রশ্ন

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত