| 23 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

সাপ্তাহিক গীতরঙ্গ: ভারতীয় সঙ্গীত । রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

আমি ব্যক্তিগত ভাবে প্রাচীন ভারত নিয়ে গর্ব বোধ করি! এই গর্ববোধের প্রচুর কারণ রয়েছে। জ্ঞান- বিজ্ঞান, গণিত, শিল্প সাহিত্য- সব ব্যাপারেই প্রাচীন ভারত এগিয়ে ছিল।নাটক এবং গানেও পেছিয়ে ছিল না, আমাদের এই সুজলাং সুফলাং মাতৃভূমি। কবিগুরু বলেছেন-

“প্রথম প্রভাত উদয় তব গগনে
প্রথম সাম রব তব তপোবনে”

বৈদিক যুগে ঋগ্বেদ আর সামবেদের স্তোত্রগুলো বিভিন্ন সুরে আবৃত্তি করা হত। সেই উদাত্তসুরে গাওয়া বেদ স্তোত্র গুলিই আদি ভারতীয় সংগীত বলে মনে করা হয়। এই স্তোত্র গুলির ছিল এক বিশেষ সুর বৈশিষ্ট্য। বিশেষ প্রয়োগ পদ্ধতি ছিল এর আরও একটা গুণ।

এই যুগে সেই সংগীত লোপ পেয়েছে। গবেষকরা স্থির নিশ্চিত, এই লোপ পাওয়ার পেছনে বৈদিক যুগের মানুষরাই দায়ী। গুরুমুখী বিদ্যার নাম করে এই সব আজ লোপ পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে তাঁরা যেটা বলেছেন-ইন্দ্রীয়ের প্রীতিসাধন সংগীতের একটি উদ্দেশ্য, এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই সত্যি এই সংগীতের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল- ভগবানের প্রীতিসাধন। অযোগ্য লোকের হাতে পড়লে সংগীতের মূল্য খর্ব হতে পারে। সেই ভয়ে, গুরুর নাম করে স্তোত্র-সংগীতের সুর ভঙ্গিমাকে গোপন করে রাখতেন। আর এই গোপনীয়তাই আদি সংগীতের লুপ্ত হওয়ার কারণ। প্রাচীন ভারতে সংগীত নিয়ে অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ বই লেখা হয়েছিল। কয়েকটা নাম নীচে দিলাম।

 ভরতের রচনা-“নাট্যশাস্ত্র”।
 মতঙ্গর রচনা-“বৃহদ্দেশী”।
নারদের রচনা-“সংগীত মকরন্দ”।
 শার্ঙ্গদেবের রচনা-“সংগীত রত্নাকর”।

এই সব বইয়ে ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন সুর ও লয়ের উল্লেখ আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য; প্রয়োগ পদ্ধতির তেমন উল্লেখ নেই।

ভারতীয় সংগীতের স্বর সাতটি! এদের সুরসপ্তকও বলা হয়। এরা হলো : –

• সা (ষড়জ)
• রে (ঋষভ)
• গা (গান্ধার)
• মা (মধ্যম)
• পা (পঞ্চম)
• ধা (ধৈবত)
• নি (নিষাদ)

আবার এদের কণ্ঠের স্বরক্ষেপণের তীক্ষ্ণতা অনুযায়ী তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে:-

• উদারা (মন্দ্র)
• মুদারা (মধ্যম)
• তারা (উচ্চ)

যতদূর জানি, এই তিনটি ভাগ এসেছে, এই নিয়মে: –
উদারা এসেছে সাতটি সমুদ্রের মন্দ্র স্বর থেকে। সেই সপ্তসমুদ্র হল:-

• লবণ
• ইক্ষু
• সুরা
• সর্পি
• দধি
• দুগ্ধ
• জল

মুদারা এসেছে সপ্তপাতাল থেকে:-

• অতল
• বিতল
• সুতল
• তলাতল
• মহাতল
• সাতল
• পাতল

আর তারা এসেছে সপ্তস্বর্গ থেকে:-

• ভূঃ
• ভূব
• স্ব
• জন
• মহঃ
• তপঃ
• সত্য

সবখানেই লক্ষণীয় যে, “৭” সংখ্যাটি বর্তমান। গাণিতিক ভাবে ৭= ৪+৩ বা ৫+২ হয়। আরও অনেক রকম ভাবে হতে পারে তবে এই ভাবে কেন? এর উত্তর কিছুটা হলেও দেবার চেষ্টা করব।

পা, ধা, নি; এদের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে!!!!!

• প্রথম মত:-
এই সুরসপ্তক উদ্ভব হয়েছে, চারটি বেদ থেকে।
Ø ঋগ্বেদ থেকে- “সা” এবং “রে”।
Ø সামবেদ থেকে-“গা” এবং “পা”।
Ø যজুঃবেদ থেকে-“”মা” এবং “ধা”।
Ø অথর্ববেদ থেকে- “নি”।

• দ্বিতীয় মত: –
Ø প্রথম পাঁচটি স্বর মহাদেবের আবিস্কার আর পরের দুটি স্বর পার্বতীর আবিস্কার। ( ৫+২=৭)

• তৃতীয় মত: –
Ø ময়ূরের কণ্ঠ থেকে- সা
Ø বৃষের কণ্ঠ থেকে-রে
Ø ছাগলের কণ্ঠ থেকে-গা
Ø বকের কণ্ঠ থেকে- মা
Ø কোকিলের কণ্ঠ থেকে-পা
Ø ঘোড়ার কণ্ঠ থেকে-ধা
Ø হাতির কণ্ঠ থেকে-নি

সপ্তস্বরের উদ্ভব সম্বন্ধে বা অন্যান্য জিনিস গুলো সম্বন্ধে, ঠিক কোন মতটি গ্রহনীয়; তা আমাদের বিবেচ্য নয়। শুধু এটুকুই বলা যায়, এই সপ্তস্বর অতি প্রাচীনকাল থেকেই জানা ছিল।প্রকৃতি এবং প্রয়োগ পদ্ধতিও অজানা ছিল না।
ভারতীয় সংগীতের এই সপ্তস্বর কে “সপ্তক”/“সুরসপ্তক” বলা হয়।
এই “সপ্তক”/“সুরসপ্তক” থেকেই ছয় রাগ এবং ছত্রিশ রাগিণীর সৃষ্টি।
ভারতীয় সংগীতশাস্ত্রের আর একটা বৈশিষ্ট্য হল- দিনের বিভিন্ন সময়ে এক একটা নির্দিষ্ট রাগ গাইবার নির্দ্দেশ আছে। অল্প উদাহরণ দেই: –

• সকালে বা ভোরে – ভৈরবী।
• দুপুরে- সারঙ্গ।
• বিকেলে- মূলতান।
• সন্ধ্যায়-পূরবী।
• রাতে- বেহাগ।

বিভিন্ন ঋতুতেও আবার বিভিন্ন রাগ গাইবার নির্দ্দেশ আছে।
• গ্রীষ্ম-ভৈরবরাগ
• বর্ষা-সেমরাগ
• শরৎ-পঞ্চমরাগ
• হেমন্ত- নট- নারায়ণরাগ
• শীত-শ্রীরাগরাগ
• বসন্ত- বসন্তরাগ
এবার এই সংগীতের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তাল, লয়,মান ও মাত্রা।

অখণ্ড কালকে ছন্দ দিয়ে ভাগ করাকেই “তাল” বলে। (প্রসঙ্গত বলে রাখি; নটরাজ মূর্ত্তি পৃথিবীর ছন্দ আর তালের রূপক।) “মাত্রা” হচ্ছে স্বরের স্থায়িত্বকাল নির্দেশক। তাল, কয়েকটি মাত্রার সমষ্টি। সংগীতের আর একটি বিশেষ অংশ হচ্ছে “লয়”। সংগীত শাস্ত্রে কালের গতিকেই লয় বলা হয়। নাচ, গান, বাজনা; এমনকি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই লয়ের গুরুত্ত্ব অপরিসীম।

লয় তিন রকম: –
• বিলম্বিত
• মধ্য
• দ্রুত

তালের বিরাম স্থানের নাম- “মান”।
মান আবার চার রকম:-
• সম
• বিষম
• অতীত
• অনাঘাত

প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানে এদের প্রয়োগ দেখা যায়। অদ্ভূত হলেও সত্যি।
আবহমানকাল থেকে ভারতীয় সংগীতের দুটি ধারা চলে আসছে।
• লোকসংগীত বা দেশীয় সংগীত।
• শাস্ত্রীয় সংগীত বা মার্গ সংগীত।

তবে বর্তমানের শাস্ত্রীয় সংগীত বা মার্গ সংগীত প্রাচীন ভারতের ধারা থেকে অনেক সরে এসেছে। বলা যায় একেবারেই ভিন্ন ধারা, যদিও বর্তমানের শাস্ত্রীয় সংগীত; প্রাচীন ভারতের সংগীতের রীতির ওপরই নির্ভর শীল।

শাস্ত্রীয় সংগীত বা মার্গ সংগীতের দুটি ধারা।

• উত্তর ভারতীয় সংগীত।
• দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীত।

Ø উত্তর ভারতীয় সংগীত, পারস্য প্রভাবিত এবং হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির মিলনের ফল। যে সব মার্গ সংগীত আমরা বর্তমানে শুনতে পাই; সবই অপেক্ষাকৃত নতুন সংযোজন।
যেমন:-
• ধ্রুপদ।
• খেয়াল।
• ঠুংরী।
• গজল।
• টপ্পা প্রভৃতি।

মার্গ সংগীত বলতে আজকাল প্রধানত উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতই বোঝায়।
Ø দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সংগীতে, হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির মিলনের কোনো চিহ্ন নেই। প্রাচীন ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতকেই এঁরা ধরে রেখেছেন। মূলত দ্রাবিড়ীয় এই সংগীত. লঙ্কেশ;রাবণের সৃষ্টি বলে মত প্রচলিত আছে। তাই কর্ণাটকী সংগীত আর্য এবং দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতির সংঘাতে (?) কোনো রকম মিশ্রণ হতে দেন নি।

এই স্বরলিপিটি পণ্ডিত ভাতখণ্ডের বই সংগীত পদ্ধতি থেকে নেওয়া হয়েছে।

এটি “সারেগামাপাধানিসা” র স্বরলিপি। কোমোল সুর সহ। ( পণ্ডিত ভাতখণ্ডে)

রাগ ললিত

পাশ্চাত্য স্বরলিপি অনুযায়ী

এবার সংক্ষেপে কিছু শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিচয় দেই:-

• ধ্রুপদ:-
এর প্রচলন অতি প্রাচীন কাল থেকে। বর্তমানে আমরা যে ধ্রুপদ শুনি, তার প্রচলন, খিলজি সুলতানদের আমল থেকে শুরু। প্রায় কতকগুলি অর্থহীন শব্দের সাহায্যে আলাপ করে এই গান শুরু হয়। এই গানে ৪ টি কলি থাকে।অন্যান্য কলিগুলি গাইবার পর অস্থায়ী কলিটি বারবার গাওয়া হয়। যে কোনো রাগেই এই গান গাওয়া যায়। সাধারণ ভাবে, দেবলীলা, প্রবল সংগ্রাম প্রভৃতি ধ্রুপদে গাওয়া হয়।

• খেয়াল:-
এই গানের স্রষ্টা খিলজি আমলের আমীর খসরু, এরকম একটা মত চালু আছে। খেয়াল গান, মাত্র দুটি কলিতে বিভক্ত।অস্থায়ী আর অন্তরা। সাধারণত অন্তরার সুরেতেই গানটি গাওয়া হয়। গায়ক, সুর ও ছন্দের বৈচিত্র স্বাধীন ভাবে প্রকাশ করতে পারেন।

• ঠুংরী:-
এটি একরকমের আবেগপ্রধান গান। এটি খেয়ালের থেকে হাল্কা ধরণের। হাল্কা রাগ-রাগিনী ঠুংরীতে ব্যাবহার করা হয়। এই গানে বেশ কিছু রাগ-রাগিনী মিশিয়ে সুর ও তালের বৈচিত্র সৃষ্টি করা যায়। সুর মাধুরিই ঠুংরীর জনপ্রিয়তার কারণ।

• ট্প্পা:-
এই গান তাল প্রধান। সংক্ষিপ্ত এবং হালকা ধরণের গান। এই গানের বিষয়বস্তু-মূলত প্রেম।

শোনা যায়, লক্ষ্ণৌয়ের নবাব আসফউদ্দৌলার সময়ে এর উৎপত্তি। বাংলায় নিধুবাবুর টপ্পা বিখ্যাত।

প্রাচীন ভারতের এই বিশাল ভাণ্ডার এতটুকু পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তাও জিজ্ঞাসু হিসেবে এই লেখাটি উৎসর্গ করলাম সংগীত রসপিপাসুদের কাছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত