| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

আমার শিশুবেলার প্রিয় পাঠ

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

শিশুদের জন্য বাংলা সাহিত্য আর ছায়াছবির কথা ভাবছিলাম। বাংলা চলচ্চিত্রের বয়েস একশো বছর। তবে বাংলা শিশু সাহিত্যের ইতিহাস তো আরো পুরনো।

            

শিশুতোষ সাহিত্য না বলে শিশু সাহিত্য বলতে ভালো লাগে। শিশুতোষ লেখা এমন যা একটু বড়ো হলে আর পড়া যায় না। যেসব লেখার কথা এখানে উল্লেখ করব সেগুলি আমরা বড়ো হতে হতে বারবার পড়েছি, আবার পড়তে পারি।

খুব বেশি পছন্দের বাংলা শিশু সাহিত্য আর লেখকদের স্মরণ করছি যাঁদের কারো কারো সঙ্গে আমাদের পাঠক হিসেবে পরিচয় পাঁচ-ছয় বছর বয়েস থেকে। এখানে ব্যক্তিগত টান থাকাই স্বাভাবিক। বলাই বাহুল্য, এর বাইরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক-সাহিত্যিক রয়েছেন। এখানে অনুবাদ সাহিত্যকে আলোচনার বাইরে রেখেছি। আর তা ছাড়া আমার পড়া বেশ কিছু বইও বাদ যাবে। এই মুহূর্তে যেগুলি আমার পড়ার রুচি তৈরি করার জন্য অপরিহার্য মনে হয়েছে শুধু সেগুলি এখানে একটু লিখে রাখার চেষ্টা করলাম।

বাংলা শিশুসাহিত্যর বয়েস দুইশো বছর তো হবেই, আরো বেশি হতে পারে। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘নীতিকথা’ নামে আঠারোটি ছোটদের গল্পসমেত কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত একটি বই। তবে এই উদ্যোগে সাহিত্যচর্চার ইতিবাচক প্রচেষ্টা থাকলেও তা কতখানি সফল ঠিক বলা যায় না।

আমার ধারণা বাংলা শিশুসাহিত্য পত্রিকার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল শিশুদের প্রতি নিবেদিত সংগঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম।

ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের উদ্যোগে উনিশ শতকে রবীন্দ্রনাথের বৌদি সম্পাদিত ছোটদের পত্রিকা ‘বালক’ বাংলার প্রথম সাহিত্য পত্রিকা। স্থায়িত্ব কম হলেও প্রভাব কম নয়। এই পত্রিকার সম্পাদক জ্ঞানদানন্দিনী দেবী অর্থাৎ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ছোটদের পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। শুধু পেছন থেকে না, সামনে থেকেও ঠাকুরবাড়ির মহিলারা ছোটদের পাঠরুচি তৈরিতে অবদান রাখলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই পত্রিকার লেখা সংগ্রহ, বিপণন, মুদ্রণ আর কোষাধ্যক্ষের কাজ করতেন। রবীন্দ্রনাথের বয়েস তখন চব্বিশ। এর আগের বছরে ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ তাঁদের ‘ভারতী’ পত্রিকায় বের হয়।

এরপরে আরো কিছু শিশুসাহিত্য পত্রিকা পর পর প্রকাশিত হয় –

১৮৮৫ – ‘বালক’ (মাসিক) – জ্ঞানদানন্দিনী দেবী

১৮৯৩ – ‘সাথী’ (মাসিক) – ভুবনমোহন রায়

১৮৯৫ – ‘মুকুল’ (মাসিক) – শিবনাথ শাস্ত্রী

১৯১৩ – ‘সন্দেশ’ (মাসিক) – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

এর মধ্যে ‘সন্দেশ’ পত্রিকাটি এখনো টিকে আছে, হয়তো এটিই বাংলার সবচেয়ে দীর্ঘজীবী শিশু পত্রিকা। শুরুয়াতটিও অনবদ্য।  আমার সঙ্গে এই পত্রিকার পরিচয়ের কথায় পরে আসি।

এসবের কিছু পরে ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’ বেরোল। ‘সহজপাঠ’ যদিও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শিশু শিক্ষাক্রমে প্রথম ভাষা শেখার বই, কিন্তু এই বই কখনো আমাদের শিশু পাঠকদের কাছে নিছক শিক্ষামূলক বলে মনে হয়নি। এখনো বাংলায় শিশুদের প্রথম বই বলতে আমরা হয়তো অনেকেই ‘সহজ পাঠ’-এর প্রথম দুই খণ্ডকে বুঝি। এই বইয়ের কোনো বিকল্প খুঁজে পাই না বলে এখনো আমাদের আগের প্রজন্ম আর আমরা শিশুদের হাতেখড়ির সময় এই বই উপহার দিয়ে আসছি। ‘সহজপাঠ’-এ প্রশ্ন, অনুশীলনী এসবের ঝামেলা না থাকায়, শুধু পাঠ আর নন্দলাল বসুর আঁকা ছবির মধ্য দিয়ে কল্পনা ও ভাষার প্রসার যেভাবে হতে পেরেছে তা আর কিছুতে সেভাবে সম্ভব হত না।

রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-এর আগেই আমরা বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণ পরিচয়’-এর সঙ্গে পরিচিত হই, কেউ কেউ শৈশবে রামেন্দু সুন্দর বসাকের ‘বাল্য পরিচয়’ আর সীতানাথ বসাকের ‘আদর্শ লিপি’ও পড়েছেন। অন্যগুলির সঙ্গে পার্থক্য হল, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’ নিখাদ সাহিত্য, কোথাও শেখানোর নামগন্ধ নেই।

রবীন্দ্রনাথ স্কুল-পালানো শিশু, তাই হয়তো গুরুমশাই হতে পছন্দ করতেন না, শেখানোর ছলে নীতিবাগীশ  হতেও চাইতেন না। ‘সহজপাঠ’-এর আবেদন চিরকালের। এখানে আমি বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণ পরিচয়’কে তুলনা করছি না। শুধু এইটাই বলতে চাইছি যে, ভাষাশিক্ষার সময় শিশুদের জন্য শিশুতোষ লেখার দরকার নেই, রবীন্দ্রনাথ সেটা দেখিয়ে গেছেন।

আর সেটা বুঝছিলেন উপেন্দ্রকিশোররাও।

রবীন্দ্রনাথের বই ছাড়াও যা শিশুদের পাঠ তৈরি করে সে হল তাঁর গান। সবাই জানে সব বয়েসী শিশুদের জন্যই রবীন্দ্রনাথের গান প্রচুর আছে। ‘গীতবিতান’ পড়া বা গাওয়ার মাধ্যমে শিশুদেরও ভাষার ওপর দখল বাড়ে, এই অভিজ্ঞতা নিজেদের দিয়ে বোঝার সুযোগ হয়েছিল। সেই কারণে শিশুরা বুঝুক না-বুঝুক আমরা গান শেখানোর দলে। একসময় শব্দ, তাল, লয়, ভাব রক্তে ঢুকে যাবে এই আশায়। এটা তেমন দুরাশা না যদি অভ্যেস থাকে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে স্বামী বীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একযোগে রচিত বইয়ে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় শিশুদের উপযোগী গানের একটা তালিকা তৈরি করেছিলেন। তালিকাটা বেশ লম্বা ছিল।

এছাড়া রবীন্দ্রনাথের শিশুদের জন্য লেখা ছড়াও আমরা ছোটবেলায় পড়তাম, আসলে যত না পড়তাম তার চেয়ে বেশি শুনতাম। ‘শিশু’ আর ‘শিশু ভোলানাথ’-এর কবিতা নিয়ে একসময় ক্যাসেট বের হয়েছিল। অথচ তারপর আমরা সেভাবে এই কবিতাগুলিকে আর ফিরে পাইনি!

কেন যেন মনে হয় ছোটবেলায় কবিতার ঝংকার রক্তে আনার জন্য শ্রুতির কোনো বিকল্প নেই। তাই আবৃত্তিতে যখন আমরা ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটি শুনি আমাদের গায়ে কাঁটা দেয়। ছোটবেলায় আমরা অনেকগুলি শিশুকণ্ঠে তবলার ঠেকার সঙ্গে তালে তালে এই ছড়া শুনেছি, মনে পড়ে –

যত ঘণ্টা, যত মিনিট, সময় আছে যত

          শেষ যদি হয় চিরকালের মতো,

তখন স্কুলে নেই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ,

          আমি বলব, ‘দশটা বাজাই বন্ধ।’

                      তাধিন তাধিন তাধিন।

প্রত্যেকবার ওই ‘তাধিন তাধিন তাধিন’ তবলার সঙ্গে বেজে উঠে আমাদের বাজাত। কবি কী যে বলছেন সেই রহস্য উন্মোচন হল না, তবু কিছু একটা তো হল। এই রকম করে ‘শিশু ভোলানাথ’-এর থিম আমাদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়েস থেকে একটু একটু করে বুনে দেওয়া হলো। এভাবে শ্রুতির বা আবৃত্তির আর শিশুর জন্য শিশুকণ্ঠের একটা ভূমিকা থেকে গিয়েছিল।

এছাড়া রবীন্দ্রনাথের নাটক ডাকঘর, ফাল্গুনী আর শারোদোৎসব আমাদের খুব ভালো লাগতে শুরু করে কিশোর বয়েসের দিকে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এই নাটকগুলি ছোটরা বিশেষ করে ভালো উপভোগ করতে পারে সামনাসামনি।

আমরা অনেকেই নিউরোসায়েন্স থেকে জানি, ভাষাপাঠের সময় আমাদের মগজ সবচেয়ে জটিল কাজটা করে। অর্থাৎ কল্পনাকে শব্দ থেকে পেড়ে নিয়ে ওড়ায়। কল্পনার স্বাধীনতা আছে পাঠের ভিতর। সুতরাং পাঠের কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু এই পাঠের সম্যক অভিজ্ঞতার যে উপাদান-উপকরণ, সেগুলি না থাকলে, এই কল্পনার স্তর ঠেকে যাবে। যে শিশু কাঠবেড়ালি দেখেনি, তাকে নজরুলের ‘কাঠবেড়ালি’ কবিতাটা শোনাতে পারা যায়, কিন্তু সে কী বুঝবে? সুতরাং সাহিত্যের পক্ষে খুব জরুরি যে বিমূর্ত ধারণা, তাকে শক্তিশালী হতে গেলে মূর্ত চেতনাকে শক্তিশালী হতে হবে। কেউ হয়তো হেলেন কেলারের কথা মনে করিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর মতো মানুষ সব যুগেই বিরল।

এই প্রসঙ্গে মনে হয়, শিশুরা যেহেতু জেন মতে ‘এম্পটি মাইন্ড’ বা ‘শূন্য মন’, সুতরাং তাদের গ্রহণ-ক্ষমতা বিপুল। সেইটে ব্যবহার করে সাহিত্য রস নানা পারফরমিং আর্টস-এর সঙ্গে মিলেমিশে থাকলে পুরো অভিজ্ঞতাটা তারা নানাভাবে পেতে পারে, এমন আমার মনে হয়।

তার একটি দিক হল শ্রুতি। যেখানে আবৃত্তি ও পাঠের আসর, নাটক, এমনকি শ্রুতি নাটকের একটা স্থান আছে। হাজার হাজার বছরের সাহিত্যের ইতিহাসে পাঠের আগে ছিল শ্রুতি। আর সেই কারণে ধ্বনি ছন্দ ইত্যাদির এমন একটা আবেদন ছিল।

এই সামগ্রিক রসের কথা ভেবে হয়তো সুকুমার রায় নাটক, আবৃত্তি, বাজনা, গান, সংলাপ, অর্থাৎ সাহিত্যের কাছাকাছি সব কিছুকে তাঁর শিশুসাহিত্যের মধ্যে স্থান দিয়েছিলেন, আর সত্যজিৎ সেখান থেকে আরেক ধাপ এগিয়ে বানিয়েছেন চলচ্চিত্র। এই শাখাগুলির মধ্যে যাতায়াত হয়তো আরো সুগম করে বোধ আর কল্পনাকে।

আধুনিক শিক্ষায় আর মন্টেসরিতে এমন নানা তল মিলিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয়ে আসছে, তাই শিশুসাহিত্য নিয়ে বলতে গেলে একরৈখিক চিন্তার বদলে সৃষ্টিশীল অনুসন্ধান হয়তো কাজে লাগতে পারে।

এছাড়া পাঠের আরেকটা দিক হল অংশগ্রহণ। আধুনিক আর্ট ফর্ম অনেকটাই দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা নিয়ে চিন্তিত। আধুনিক নাটকে অনেক সময় দর্শকের আসনে যাঁরা আছেন, তাঁরা দর্শক থাকতে পারেন না। আধুনিক নগর বাউলরা দেখেছি গান গাইতে গাইতে দর্শকদের শুদ্ধু গাইয়ে নেন।

যাঁরা সফল শিক্ষক তাঁরা সর্বদা ক্লাসে ছাত্রদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দেন। যাঁরা সফল মা-বাবা তাঁরা শিশুদের কাছ থেকে পেরেন্টিং-এর দিকনির্দেশ নেন। যাঁরা সফল সম্পাদক তাঁরা শুধু পাতে খাবার না দিয়ে পাঠককে দিয়ে লিখিয়ে নেন, এভাবে একটা পাঠের পরিবেশ তৈরি হয়।

মারিনা আব্রামোভিচ নামের একজন শিল্পী আছেন যিনি পারফরমেন্স আর্ট করেন। এক-একটি পারফরমেন্সে মানুষ মন আর হৃদয়ের সঙ্গে এক এক প্রকারে এঙ্গেজ করে। একটি পারফরমেন্সে দেখেছিলাম তিনি কয়েক দিন একটানা একটা টেবিলে বসে থাকেন। তাঁর সামনে এসে বসতে পারেন যে-কেউ। শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। অনেকেই এই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা বেশিক্ষণ নিতে পারেন না। ভেঙে পড়েন, আলোড়িত হন। মনোবিজ্ঞানে বলে আমাদের নানা প্রলেপ সরে গেলে যে-নগ্ন আত্মা পড়ে থাকে সেই আত্মার মুখোমুখি নিয়ে আসতে পারে সরল অনাড়ম্বর দৃষ্টি। সেটা একটা আয়নার মতো। এখানে মনের যত প্রতিরোধ সেসব ভেঙে পড়ে। মানুষের মধ্যকার শিশু অনাবৃত হয়। কাজেই এরকমভাবে প্রজ্ঞাময় পারফরমেন্স আর্টের অভিঘাত যে কোথায় কীভাবে চলে যেতে পারে তার সম্ভাবনার শেষ নেই।

সাহিত্য আর শিশুসাহিত্য নিয়ে যাঁরা কাজ করবেন তাঁরা এরকম নানা আর্ট ফর্মকে হয়তো বুঝে দেখতে চাইবেন।

বিভেদরেখার ইতির ফলে পাঠকের ঘর হয়ে ওঠে ডেভিড হোয়াইটের বইয়ের মতো ‘হাউজ অফ বিলঙ্গিং’। বিলঙ্গিং বা আপন-বোধ হল যে-কোনো চেতনা বিপ্লবের শুরু। এ কথা সমাজবিজ্ঞানী ব্রেনে ব্রাউন বলেন।

অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, শিশুসাহিত্যের অনুবাদ শিশুরা অনেক সময় ভালোই করতে পারে। শিশুরা পাঠের বাইরেও জার্নাল লিখতে পারে। গল্প বলার আসরও তাদের ভাষা আর কল্পনার প্রসার ঘটায়, পেশি তৈরি করে। এই কারণেই হয়তো ‘বালক’ বা ‘সন্দেশ’-এর মতো শিশুপত্রিকায় হাত পাকানোর আসর রাখা হয়েছিল।

আগের কথায় ফিরে এসে বলি, আমাদের শৈশবের দ্বিতীয় দফায় মানে আট বছর বয়েসের দিকে ঘোর নিয়ে পড়ছি দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ আর ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’। তা বাদ দিলে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প। আমাদের প্রথম রামায়ণ ও মহাভারতের গল্প তো উপেন্দ্রকিশোরের কাছে শোনা। তাঁর ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের অমর ক্লাসিক চলচ্চিত্র সকলেই দেখেছে। ‘টুনটুনির গল্প’ও উপেন্দ্রকিশোরের লেখার মধুর চামচ চিনিয়ে দেয়।

‘ঠাকুরমার ঝুলি’ এখনো কেউ পড়ে কিনা জানি না। হয়তো সাধু ভাষা বলে আজকাল শিশুরা আর পড়তে চায় না। এই বইগুলোর চলিত অ্যাডাপ্টেশন হতে পারে, দু-একটা হয়েছেও।

দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত পূর্ববঙ্গের গীতিকার গল্প আর লোকগাথাগুলো এখনো সেভাবে আমাদের শিশুদের কাছে আসেনি। সেরকম কিছু গল্প শিশু-কিশোরদের কাছে নিয়ে আসার জন্য রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমাদের প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল ছোটদের মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সন্দেশ’। সেসব স্মৃতি এত আনন্দের যে পুরনো ‘সন্দেশ’-এর সংখ্যা পেলে এখন বাঁধাই করে রেখে দিতাম।

১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতে জন্ম নিয়েছিল ‘সন্দেশ’। সুকুমার রায়ের সময়ে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা জমে ওঠে নানা রসে। সুকুমারের মৃত্যুর পরে কিছু দিন তাঁর ভাই সুবিনয় এই পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন। মাঝখানে ত্রিশ বছর তা বন্ধও ছিল। পরে লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় ও নলিনী দাশ  পারিবারিক এই পত্রিকার গৌরবময় ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন নতুন মহিমায়।

মূলত শিশুমন বুঝতে পারতেন এমন কয়জন অর্থাৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় আর নলিনী দাশ নিবেদিত-প্রাণ শিশু-সাহিত্যিক ছিলেন, এই কারণে তাঁদের হাতে পত্রিকাটি হেসেখেলে উঠেছিল। আর কয়েক প্রজন্ম শিশুমন তৈরি করতে পেরেছিল বা হাত ধরে থাকতে পেরেছিল।

‘সন্দেশ’-এর লেখাগুলো শিশুদের জন্য হলেও লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, নলিনী দাশ, আশাপূর্ণা দেবী, সুখলতা রাও, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরী ধর্মপাল, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, নারায়ণ সান্যাল, বিমল কর, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, স্বপন বুড়ো, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ প্রমুখ যা লিখতেন তাকে ওইভাবে শিশুতোষ বলা যায় না। কারণ বড়ো হয়েও আমরা অনেকে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা পড়েছি, বয়স্করাও এই পত্রিকা কাড়াকাড়ি করে পড়তেন।

১৯৬০-৮০ সালের মধ্যে এই পত্রিকার কিছু সেরা লেখা নিয়ে সত্যজিতের সম্পাদনায় ও ইলাস্ট্রেশনে ‘সেরা সন্দেশ’ চিরস্থায়ী ক্লাসিক হয়ে আছে।

এই পত্রিকা যাদের জন্য সেই শিশুরা মূলত ‘সহজপাঠ’ থেকে সদ্য-বেরোনো শিশু থেকে শুরু করে শাদা চুলের শিশু।

গ্ল্যামার ছিল না পত্রিকাতে, বিদেশী কার্টুন ছিল না, কিন্তু খেলাধুলো, জ্ঞান বিজ্ঞান, গল্প, বড়ো গল্প, উপন্যাস, ছড়া আর কবিতার সঙ্গে সঙ্গে অফুরান কল্পনাকে হাওয়া দিয়েছিল অসাধারণ সব ইলাস্ট্রেশন। যতদিন সত্যজিৎ ছিলেন ‘সন্দেশ’কে তাঁর ইলাস্ট্রেশনে আলো করে রেখেছিলেন।

এছাড়া আরও কিছু ছোটদের পত্রিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যা এখনো চলছে। আমাদের শৈশব-কৈশোর মাতিয়ে রেখেছিল ‘আনন্দমেলা’, ‘শুকতারা’, ‘কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান’ ইত্যাদি।

পশ্চিম বাংলার শিশুপত্রিকা যখন শুরু হয়েছে তখন বাংলা নামের দেশ তৈরি হয়নি। আর বাংলাদেশের শিশু পত্রপত্রিকার কলেবরে জন্ম যখন হয়েছে তখন আমি আমার শৈশব পার করে এসেছি। এই কারণে আমার ছোটবেলার স্মৃতি ধরে এখানে কিছু কথা বললাম। বাংলাদেশে বর্তমানে কয় কুড়ি শিশু আর কিশোর পত্রিকা আছে। তার মধ্যে অধুনালুপ্ত ‘টাপুর টুপুর’ পত্রিকাটার কথা বিশেষভাবে বলার মতো বলে বিদগ্ধমহলের অনেকে মনে করেন।

ছোটদের মন বোঝার জন্য একজন শিশু-সাহিত্যিককে শিশুই হতে পারতে হবে – এ কথা সবাই জানে। এখনকার শিশুপত্রিকাকে অবশ্য নগরের শিশুদের কথা মাথায় রেখে চলতে হয়। তারা অনেকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে, অনেক স্মার্ট তারা। এই সব কারণে শিশুসাহিত্য আর আগের মতো নেই বলে আমার মনে হয়।

সুকুমার রায়ের কথা এখানে আলাদা করে বলছি না। সুকুমার রায় ভাত-ডালের মতো খেয়ে-পরে আমরা বড়ো হয়েছি। তাঁর সমগ্রের মধ্যে সাহিত্যের প্রায় সব দিকের স্ফূরণ আছে। তবে আমাদের যা বেশি আকর্ষণ করেছিল তা হল তাঁর ছড়া, গল্প, নাটক। তাঁর ননসেন্স লেখার শিশু-উপযোগিতা এখনো এতটুকু কমেনি।

স্মার্ট লেখা বলতে মনে পড়ে গেল, আমাদের কৈশোরে দেখা স্মার্ট লেখকের একজন তো সত্যজিৎ রায়, যাঁর ফেলুদা আর শঙ্কু আর তারিণী খুড়োর কীর্তিকলাপ অথবা এক ডজন গল্প সিরিজ আমাদের পড়তেই হত। এর আবেদন এমনই যে আলাদা করে কিছু বলার দরকার নেই। সত্যজিৎ লিখেছেন মূলত কিশোর-তরুণদের জন্য। সত্যজিৎ-কে পাশ কাটিয়ে বাংলা কিশোর-সাহিত্য চিন্তা করতে পারি না। কিন্তু উনি তো শুধু সেইটুকু করেই ক্ষান্ত না। উনি একই সঙ্গে শিশু পত্রিকা চালিয়েছেন কয়েক যুগ, নিজের বই আর সন্দেশ পত্রিকা ইলাস্ট্রেট করেছেন, একই সঙ্গে শিশু চলচ্চিত্রকে বিশ্বখ্যাতি দিয়েছেন। সুকুমার রায় আর উপেন্দ্রকিশোর, লীলা আর সত্যজিৎ শুধু এই চার জন মিলে তাঁদের পারিবারিক আবহ থেকে যা দিয়ে গেছেন শিশু কিশোরদের তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয় এখনো।

আমাদের পাঠকে পরিণত করেছেন বলতে গেলে অনেকটাই লীলা মজুমদার। লীলাকে সবাই জাত শিশু-সাহিত্যিক বলেই চেনেন। তিনি ছোটবেলায় শিশুদের মাতিয়ে রাখার জন্য মুখে মুখে গল্প বানাতেন। সেই গল্পের প্রথম দিকের একটা লিখে ফেলার পর যা দাঁড়ায়, তার নাম ‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’। ১৯৭২ সালে ছায়া দেবীকে পদি পিসি চরিত্রে রেখে এই ছবিটা পরিচালনা করেন অরুন্ধতী দেবী, কিন্তু এর প্রিন্ট আমরা খুঁজে পাইনি। ছবিটা নতুন করে বানানো যায় বলে আমার মনে হয়। কিন্তু যে-কেউ লীলার গল্পে ছবি বানাতে পারবেন না। বড়োদের মস্তিষ্ক আর মেজাজ নিয়ে লীলার গল্পে হাত দেবার দুঃসাহস করা যাবে না।

লীলার সব ক’টা বই-ই পড়া যায়, যেমন পড়া যায় সুকুমার আর সত্যজিতের প্রায় সব লেখা। তবে অদ্ভুত ব্যাপার যে, এরা একই পরিবারের হলেও এঁদের প্রত্যেকের লেখার বিষয়, আঙ্গিক, সিনট্যাক্স, দেখার চোখ আলাদা।

লীলার লেখা আধুনিক, অথচ তাঁর লেখায় আমাদের যা ছোট থেকে আকর্ষণ করত তা হল সাধারণ জীবনের মধ্যে অসাধারণ চমক আর রহস্য খুঁজে পাবার সাবলীলতা। কিন্তু এটা বানিয়ে তোলা ছিল না, লীলার শিশু-শিশু ঘ্রাণ ছিল এতে, বুড়োদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শিশুকে সেটা কান ধরে টেনে পড়িয়ে নিত।

এছাড়া লীলার গল্পে কোনো শাদা-কালো নেই। খলনায়ক বলে যাকে মনে হয় সেও ঠিক খলনায়ক নয়, একজন সাধারণ কষ্ট-পাওয়া মানুষ, ভুলচুক করে, হাজতে গেলেও হাজতে বসে রান্নার রেসিপি বই লেখে ইত্যাদি। মোটমাট জীবন নিয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র লীলা নন।

আরেকটা কথা হল লীলার গল্পে একটা ফোঁটা বানানো ওষুধ নেই, রদ্দি মাল নেই, চোখ ঘষে কাঁদানোর বাতিক নেই, ভূত আছে কিন্তু ভূতের ডর নেই। ভূতগুলি কথা বলে, কাছে আসে, সাহায্যও করে। লীলার গল্পের বাচ্চারা ভয়ে থাকলেও, তারা আমাদের দেখা শিশুদের মতোই, চোখা, বাস্তব আর ডানপিটে। বড়োরাও সাধারণত বাচ্চাদের মতো, চোখ আকাশে গিয়ে ঠেকেছে।

টং লিং গল্পটার কথাই ধরুন না। ওটার সমতুল্য বাংলা শিশু-গল্প খুব কম আছে, ওটার একটা আধুনিক চলচ্চিত্র হতে পারত। অথবা ‘হলদে পাখির পালক’। অথবা ‘বাতাস বাড়ি’। অথবা ‘সব ভুতুড়ে’। গুপী পানুর গল্পগুলো রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের। গুপী পানু ও ছোটমামা সিরিজ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা লীলার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের প্রেমেও পড়েছেন। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার অ্যাডভেঞ্চারের মতোই, লীলাও আমাদের নানা স্থানে নিয়ে যেতেন তাঁর গল্পে। ছোটবেলায় তাঁর শিলংয়ে কাটানোর অভিজ্ঞতা অনেক গল্পেই ছায়া ফেলে। আর ফিরে আসে সেখানকার কিছু স্থানিক পটভূমি আর মানুষ।

সেন্টিমেন্টালিজম বাদ দিয়ে জীবনকে ঝরঝরে, টানটান, অবাক, সুন্দর আর সাহসী, আর বাস্তব শিশু-উপযোগী করে লীলা আমাদের জয় করে নিয়েছেন। যতদিন শিশু সাহিত্য থাকবে ততদিন লীলাও আছেন। নিরান্নবই বছরের মধ্যে প্রায় সত্তর বছর তিনি শিশুদের জন্য, শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন।

ক্লাসিকদের মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে একটা বড়ো জায়গা করে নিয়েছিলেন। ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘নালক’, ‘আলোর ফুলকি’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘ভূত পত্রীর দেশ’, ‘শকুন্তলা’, ‘রাজকাহিনী’ পড়ে পড়ে বড়ো হয়নি এমন পাঠক বিরল। আলাদা করে কিছু বলার নেই।

অবনীন্দ্রনাথকে আমরা যতটা পারি পড়ি এখনো। ছবি তৈরি করার জন্য পড়ি। প্লট বোঝার জন্য পড়ি। ডিটেল বোঝার জন্য পড়ি। ভাষার মাধুর্য নেবার জন্য পড়ি। তাঁকে ছাপিয়ে শিশু সাহিত্য লেখা সম্ভব না বলে আমার মনে হয়।

‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ নামে তাঁর আত্মজৈবনিক লেখা কিশোরপাঠ্য। আর তাঁকে আরেকটু বোঝার জন্য ‘দক্ষিণের বারান্দা’ পড়ে নিয়েছিলাম, জেনেছিলাম তিনি যে এত ভূপ্রকৃতির বর্ণনা দিতেন বিশেষ করে ‘বুড়ো আংলা’ গল্পে, বাস্তবে কিন্তু ঘরকুনো মানুষ ছিলেন। তাঁর সব অদ্ভুত খেয়ালের স্থান অবশ্য তাঁদের পৈতৃক আবাসেই ছিল।

অবনীন্দ্রনাথের মধ্যে একজন উদ্দাম শিশু বাস করতেন বলে আমার মনে হয়।

‘বুড়ো আংলা’ যতদূর জানা যায় সুইডিশ লেখক Selma Lagerlöf-এর বইয়ের ছায়া নিয়ে লেখা। আর ‘আলোর ফুলকি’তেও অন্য ভাষার কাহিনীর ছায়া আছে। তবে তিনি বিদেশী গল্পগুলি ভেঙে দেশী ছাঁচে গড়ন আঙ্গিক পাল্টে ফেলে যেভাবে বিনির্মাণ করতেন তাতে সেসব তাঁরই হয়ে যেত।

১০

এছাড়া হাস্যরস আর কৌতুককে শিশু-উপযোগী করার জন্য কাজ করেছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে থেকে যাবেন শিব্রাম চক্রবর্তী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

শিব্রাম তো কয়েকশো গল্প উপন্যাস লিখেছেন নানা রঙের। হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন নামে দুই ভাই নিয়ে মজার সিরিজ লিখেছেন। কিন্তু মায়াময় উপন্যাসও তো আছে। যেমন, তাঁর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ উপন্যাসটি ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় ১৯৫৮ সালে চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায়। শিব্রামকে বাদ দিয়ে বাংলা শিশু সাহিত্য কল্পনা করা যায় না, কারণ এমন অবিরল নির্মল স্যাটায়ার সুকুমারের পরে আর কেউ বোধ হয় শিশুদের জোগান দিতে পারেননি।

শীর্ষেন্দু শক্তিশালী লেখক – সবাই জানেন। তবে বড়োরা হয়তো অনেকেই তাঁর ছোটদের গল্প পড়েননি। তাঁর সব বড়োদের গল্প আমার পড়া না-ও থাকতে পারে, কিন্তু শারদীয়া সংখ্যা ‘আনন্দমেলা’ আর ‘সন্দেশ’-এর কারণে তাঁর সব শিশুদের জন্য লেখা উপন্যাস আমি পড়েছি। এখনো পড়ি। তিনি বেঁচে থাকা শিশু সাহিত্যিকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী, আমার কাছে। তাঁর হিউমার, প্লট, ডিটেলিং, নামকরণের সঙ্গে চরিত্রায়ণের একটা যোগ, আর তাঁর জাদুবাস্তবতা সবাইকে আকর্ষণ করে। সাধারণ মানুষের ভুলভ্রান্তিকে মমতাময় কৌতুকের মধ্য দিয়ে আপন করে ফেলার শক্তি তাঁর অসীম। 

লীলা মজুমদারের মতোই তাঁর ঢংটাও হল রসিয়ে রসিয়ে গল্প বলার, প্লটটা আসল কথা না। যদিও প্লট সব সময় থাকে। তিনি কখনো শহরের স্মার্ট লেখক না, তিনি মফস্বল গাঁয়ের লেখক। যেখানে ভূত, চোর, ডাকাত ইত্যাদি থাকে, চাকরবাকর থাকে, ভগ্নপ্রায় পুরনো বসতবাড়ি থাকে, গুপ্তধন থাকে, পশুপাখি থাকে, নির্মল বাতাস থাকে। হয়তো বলতে পারি শীর্ষেন্দুর গল্পগুলি খুব ‘হেলদি’, এগুলি পড়ে সকলেই হোহো করে হাসবেন নয়তো হাসতে হাসতে চোখের জল ফেলবেন। এগুলো পড়ে একটা ঘোরের সৃষ্টি হয়।

১১

বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরের মন বোঝেন এমন লেখক অনেক আছেন। কাজী আনোয়ার হোসেনের সেবা প্রকাশনী থেকে অনেক বিদেশী বই আর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের রূপান্তর ও অনুবাদ বেরিয়েছে। এই পর্যায়ে আমরা অনুবাদ নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। তবে একটু বলতেই হবে যে, শিশু-কিশোর উপযোগী বলতে তিন গোয়েন্দা সিরিজ, সেসব আমরা এগারো-বারো বছর বয়েস থেকে পড়েছি। ‘দ্য থ্রি ইনভেস্টিগেটর্স’ নামে ষাটের দশকে ইংরেজিতে একটা গোয়েন্দা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ বেরোত, রবার্ট আর্থারের লেখা। সম্ভবত সেগুলোর ছায়া নিয়ে এসব বই বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছিল। স্বাদ-গন্ধ পাল্টে দিয়েই করা হয়েছিল। বিনোদন এর লক্ষ্য ছিল, সাহিত্য হিসেবে এগুলো তেমন দাঁড়াতে পারেনি। তবে বাংলাদেশের মোটামুটি উঠতি বয়েসের স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের বই পড়ত। পরের দুটো সিরিজ ঠিক শিশু-উপযোগী ছিল না। কাজেই এই আলোচনায় সেগুলো আনতে পারছি না।

এই জায়গা থেকে আমার বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রিয় শিশু সাহিত্যিকদের মধ্যে কয়েক জন হলেন হাসান আজিজুল হক, শাহরিয়ার কবির, হুমায়ুন আজাদ, মুনতাসীর মামুন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আলী ইমাম, সৈয়দ ইকবাল, আহসানুল হাবীব প্রমুখ।

এখনকার অনেক ভালো লেখকের কথা এখানে বাদ পড়বে, কারণ তাঁরা আমাদের শৈশবের লেখক নন। তবে শিশুদের ছড়ার জন্য সুকুমার বড়ুয়ার কথা না বললেই নয়। এঁদের মতো ছড়াকার শিশুদের নাড়ি চেনেন। শিশুদের পক্ষে এঁদের এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।

যেহেতু এ সবই আমার নিজস্ব পাঠের খবর, তাই এখানে আমার ব্যক্তিগত ভালো লাগার কথাই রেখেছি। এই প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কবিরের ‘নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়’ আর ‘হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা’ বয়ঃসন্ধির পাঠকদের কাছে খুব প্রিয় হবার কথা। এই দুটো বই নিয়ে ভালো চলচ্চিত্র বানানো সম্ভব বলে মনে হয়েছিল। এছাড়া হুমায়ুন আজাদের ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ পড়ে এই দেশের ফুল ফল পাখির জন্য দরদ আমাদের দ্রবীভূত করেছিল।

এই লেখাগুলো আমার পরিণত কৈশোরে পড়া, মানে যখন সেন্টিমেন্টের দাম একটু বুঝতে পারি। এখানে বয়ঃসন্ধির কিছু ভালো লাগা আছে, তা খুব স্ফুট না হলেও ধরা পড়ে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই বইগুলি সেই সময় পড়ে ভালো লাগা কঠিন হয়েছিল আমার জন্য। আমি এই বইগুলি পনেরো বছরের দিকে পড়ে ভালোবেসেছি।

১২

আমার খুব প্রিয় একজন লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। যিনি বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে নির্মল পাঠের অভ্যেস গড়ে দেওয়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখছেন আড়াই যুগ বা তার বেশি সময় ধরে।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল কল্পবিজ্ঞানের জন্য বিশেষ বিখ্যাত হলেও ছোটদের অন্য রসের গল্পও তাঁর অনেক। ছোটদের চোখে দেখার ক্ষমতা তাঁকে বিশেষভাবে আলাদা করে আমার কাছে। কারণ বড়োরা সাধারণত বড়োদের চোখ নিয়ে শিশুদের মাথার মধ্যে ঢোকেন। যাঁর নিজের শিশুটা খুব উজ্জ্বল না তিনি শিশুদের জন্য লিখতে পারেন বলে কেন যেন আমার মনে হয় না। যাঁদের কৌতূহল, বিশ্বাস, ভালোবাসা, রোমাঞ্চবোধ, উজ্জ্বলতা, প্রশ্ন এই সব হারিয়ে গেছে, যাঁরা নিতান্ত ছাপোষা হয়ে গেছেন, তাঁরা কীভাবে ছোটদের জন্য লিখবেন?

শিব্রাম চক্রবর্তীর টাকাকড়ি বেশি ছিল না, একটা মেসে তাঁর জীবন কেটেছে। কিন্তু তিনি বেশির ভাগ সময় ছোটদের জন্য হাস্যকৌতুক লিখেই কাটিয়ে গেলেন। তাই ছাপোষা বলতে এখানে আমরা নিশ্চয়ই তাঁর মতো জীবন বোঝাতে চাইছি না।

যা বলছিলাম। মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্পে আমরা মানুষের জন্য দরদ খুঁজে পেতাম। তাঁর গল্পের বই পড়লে মানুষকে যে ভালোবাসা যায়, দুনিয়াকে, দেশটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে, নিজেকে একজন মানুষ বলে মনে হয়, এই সবই তাঁর অবদান। তিনি পাঠককে দূরে রাখেন না।

তাঁর ‘দীপু নাম্বার টু’ নিয়ে একটা ছবি হয়েছিল। কিন্তু এই ছবি তাঁর গল্পকে যথেষ্ট মেলে ধরতে পারেনি, নাম-করা অভিনেতা থাকা সত্ত্বেও কিছুটা অতিনাটকীয়তা ছিল। তাঁর গল্পে শিশুরা ঋজু, সাহসী আর সাধারণত বিচ্ছু টাইপের। তাদের কান্না থাকলেও সেটা সিরিয়াস আর নিভৃত।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের অনেক গল্প নিয়ে সুন্দর ছবি বা টেলিফিল্ম হতে পারে বলে আমার মনে হয়।

১২

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বাংলাদেশের সব ছেলেমেয়ের একটা ঘোরলাগা ভাব আছে, যা হয়তো আমাদের ছোটবেলায় ছিল না। যদিও তাঁর লেখা বই বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল এক সময়, হয়তো এখনো আছে, আমরা তাঁকে সাবালকদের লেখক হিসেবেই ধরে নিয়েছি। তবে তাঁর পারিবারিক কমেডি-ড্রামা আর ড্রামা সিরিয়ালগুলি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’ বা ‘বহুব্রীহি’ টিভি সিরিয়ালগুলি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শিশু কিশোর তরুণদের কল্পনা জগৎকে অনেকখানি তৈরি করে দিয়েছে।

১৩

ছোটদের জন্য লিখতে পারতেন কিন্তু কম লিখেছেন এমন একজন লেখকের নাম জাহানারা ইমাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা যুদ্ধে তাঁর সন্তান রুমী শহিদ হয়েছিলেন। জাহানারা ইমাম পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে তুলে বাংলাদেশের মানুষকে নেতৃত্ব দেন এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে। ১৯৯২ সালের সেই আন্দোলন বা এর জের নিয়ে কি কোনো গল্প হয়েছে? জানি না। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এখন ইতিহাস। তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটির ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়। শিশুদের জন্য এই বই তিনি নিজেই ‘বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ নামে রূপান্তর করে গেছেন।

শেষে বলি, এখানে আমার নিজের একান্ত ভালো লাগা কিছু বইয়ের কথা লিখলাম। অনেক লেখার কথাই বাদ পড়ল যা আমার প্রিয়, কিন্তু অল্প পরিসরে এত কথা লেখার সুযোগ নেই। মূলত আমাদের পাঠের সামান্য অভ্যেস ও স্ফূর্তিকে যা বেশ হাওয়া দিয়েছে, আমাদের রুচিকে যা তৈরি করেছে, সেগুলির কিছু কিছু এই লেখায় তুলে ধরা হল। এসব আমার ব্যক্তিগত পছন্দের কথা, এর কোনো সর্বজনীনতা আমি দাবি করতে পারি না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত