আমার শিক্ষকগণ (পর্ব-৪)

রবীন্দ্রনাথ, বাল্মিকীরা, ও হালের চলচ্চিত্র

১) ছেলের কাছে জল চাইলাম ও পেলাম। তৃষানিবারণের কেউ কেউ এখনো আমাদের আছে এটাই হয়ত অলৌকিক। জল চাইবার কেউ আছে – চাইবার সময় ভয় হয় না যেখানে, এটাই অলৌকিক। বারণহীন পর্দার আড়ালে যেটুকু রোদ, যেটুকু আকাশ সেটুকু দেখার জন্য আমাদের পার্থিব কী আকাঙ্ক্ষা। জলের আকাঙ্ক্ষায় আমরা কখনো ভিক্ষুক আনন্দ কখনো তৃষ্ণা মেটানোর ধারিত্রিক ব্যাকুলতায় চণ্ডালকন্যা প্রকৃতি।

২) কাল ও তার আগের দিন আমি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আরেকবার একটু বেশি মিত্রতার সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাঁকে বললাম যে তাঁর বাল্মিকী প্রতিভা আমার ভালো লাগে, সব মিলিয়ে অন্য সব নাচনাটকের থেকে বেশি। বাজাতে থাকে ঘণ্টার মত।

এর সুর, কথা, ছন্দ বারবার পাল্টে যায়। সুরতালের এত বৈচিত্র্য পরের দিকে আর ব্যবহার করা হয়নি। কখনো রামপ্রসাদী, কখনো ইংলিশ সুরের ব্যবহার ইত্যাদি। এর নাটকীয়তা, এর পার্থিব লোভ থেকে পার্থিব করুণা পর্যন্ত দুলতে থাকা আরণ্যক জটিল পথ। এখানে এত হিউমার। এত রূপক।

বীণাপাণির শেষ আশীর্বাদটুকু আমার বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। রবীন্দ্রনাথ বিশ বছরে লিখেছেন। তরুণ সুর আর উচ্ছ্বাসে ভরা রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুর অনিবার্য আঘাত তখনো তাঁকে সেই ভাবে স্পর্শ করেনি। নাটকটা আপাদমস্তক আমার ভালো লাগে। এর উল্লাস, এর মোচড়ানো কান্না, এর রস। সব। একটা কোথাও টাল খেয়ে যায় না।

৩) অথচ এই ভালো লাগার পেছনে আছে আরো পার্থিব অভিজ্ঞতা। গত দশকের কোনো এক সময় শুনেছিলাম পশ্চিম বাংলার এক সংশোধনাগারে এই নাটক করছে ত্রিশাধিক কয়েদী। বাল্মিকীর পার্ট করছে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত। আঠেরোর মতো অপরাধে দণ্ডিত আসামী সে।

সংশোধনাগারের পুলিশ সুপার এটা তাদের কালচার-থেরাপি হিসেবে দেখছিলেন। শিল্পী অলকানন্দা রায় সব শিখিয়েছেন বন্দীদের। শুনলাম সেই বাল্মিকী ওরফে ডাকাত ছেলেটি পাল্টে গেছে যেমন গেছে বাকিরাও। শুনলাম সে জেলের মধ্যে এখন গীতবিতান পড়ে। সে কথা কাগজে এসেছিল। আমরা শুধু তাজ্জব হই, তাই না। কেন, কীভাবে হল, ভিতরের মানবিক গল্পটা জানতে ইচ্ছে করছিল।

৪) তখনকার মত আমরা শুধু সেই পুরো প্রোডাকশন দেখতে পাই সুশীল কাকা (সুশীল সাহা)-র দৌলতে।

অলকানন্দা করেছেন সরস্বতীর পার্ট। উচ্চারণ আর পাঠ আমি শ বার শুনতে পারি। তিনি শেষে বীণা তুলে দেন দস্যু রত্নাকর অর্থাৎ বাল্মিকীর হাতে। সেই বাল্মিকী হলেন কবি। দস্যু থেকে কবি। করুণা যাকে আলোড়িত করে।

এই গল্পের ভাবনা আমাদের আলোড়িত করে এমন, আর এই গল্পের মিল আমরা খুঁজেও পাই এক জায়গায় পূর্ববংগ গীতিকা পাঠের সময়।

এর শিল্পরূপ – অর্থাৎ পুরো প্রডাকশন আমাদের বুক কাঁপায়।

৫) পরে সাশা ঘোষালদের দলকে মঞ্চে বাল্মিকী-প্রতিভা হাজির করতে দেখেছি। সাশার অন স্টেজ ডেলিভারি আর অভিনয় আমাদের বুক কাঁপিয়ে দেয়।

৬) অনেক দিন পরে দেখলাম এই সব কিছু এক পাত্রে মিশ খেয়ে গেল।

সংশোধনাগারের বন্দীদের নিয়ে সেই গল্পটা কাজে লাগিয়ে হালের দুই বিখ্যাত ছবি-নির্মাতা ছবি করলেন – তাঁরা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নন্দিতা রায়। ছবির নাম ‘মুক্তধারা’। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে ২০১১ সালে নির্মাণ হল।

দশ ফুট বাই দশ ফুট কারাগারের বন্দীদের বুকের আয়তনে অনন্ত ধরে কী করে? সেই গল্প। মানে বাল্মিকীদের গল্প। এখনকার যুগে। গল্প নয়, সত্যি।

কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই দুর্ধর্ষ ডাকাত, যে বাস্তবে দস্যু থেকে শিল্পী আর গীতবিতানের পাঠক হয়ে গেছে। তার নাম নিগেল আক্কারা। দুর্ধর্ষ দুঁদে ডাকাত এককালের। তাকে তাঁর জীবনের রোলটাই অভিনয় করতে দেওয়া হল।

৭) অলকানন্দা রায় এই ছবিরা নৃত্য-নির্দেশনা দেবেন এতে অবাক হইনি। আর সাশা ঘোষাল বাল্মিকীর কণ্ঠ দেবেন, এতেও অবাক হইনি।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত নৃত্য-শিক্ষকের পার্ট করেছেন। কিন্তু কাহিনীর প্রয়োজনে বন্দীদের বন্দীত্ব আর ঘরবন্দী একজন নারীর জীবনের নানা স্তরিক বন্দীত্বকে মিলিয়ে দেওয়া হয় সযত্নে।

চিত্রনাট্য কোথাও সাবেকী হয় না, ক্লিশে হয় না, টাল খায় না।

আমি এই ছবি এখনো পর্যন্ত তিনবার দেখেছি। আরো অনেক বার দেখতে পারি।

৮) মায়া এঞ্জেলুর একটা বই আছে – I know why the caged bird sings। এই বন্দীদের গান গাওয়াবার জন্য যে ব্যাকুলতা তা শুধু আরেক জন বন্দী জানতে পারেন।

নাচের দিদির নাম ছবিতে, নীহারিকা দত্ত। গল্পের প্রয়োজনে তাঁর পরিবারের নিটোল ছবি আঁকা হয়েছে। একজন কট্টর আইনজীবি আর নীহারিকার স্বামীর ভূমিকা করেছেন ব্রাত্য বসু। যে নারসিসিস্টিক আদলের আঁচড়ে, আর মাপা অভিনয়ে এই চরিত্র দাঁড় করানোর দরকার ছিল — নীহারিকার বন্দীত্ব বাস্তব করার জন্য, সেটা যেন খাপ খেয়ে যায়। এছাড়া, নীহারিকার কন্যা মূক ও বধির স্কুলে যায়। সেই কন্যাই বাল্মিকী-প্রতিভার বালিকার পার্ট করে। আর চলচ্চিত্রে দেখি, সেই বালিকার মতোই, সেও গলিয়ে দেয় বাল্মিকীদের মন।

৯) ছবির প্রয়োজনে অনেক সংকট আর সংঘর্ষের মুহূর্ত তৈরি হয়েছে যা বাস্তবসম্মত। বাস্তব বাধা এসেছে, যা বানানো মনে হয় না। রূপকথার মত নয়, বাস্তব জীবনের প্রতিঘাতেই জীবনের মোচড় আর দোলাচল নিয়ে ছবি এগোয়।

১০) রবীন্দ্রগান অসাধারণভাবে ব্যবহার হয়েছে – মোহন সিংহর অতিথি এপিয়ারেন্স আমাদের বুকে রোল তোলে।

বাল্মিকী প্রতিভা যাদের দেখা নেই, তাদের আশু দেখে নেওয়া ভালো। মুক্তধারা ছবিতে সেই নাচ আর গানের সিকুয়েন্স অনবদ্য।

শিবপ্রসাদের একটুখানি পার্ট অনবদ্য। হাহাকার আর হাহাকার-জয় অনবদ্য।

১১) আমার মনে হয়েছে সব মিলিয়ে এরকম আরেকটা কাজ হয়ত পাওয়া যাবে না। যেখানে একজন মানুষ তার নিজের রোলে অভিনয় করছে, তাও আবার এমন একটা রোল।

১২) নিগেল একটা কথা বলেছেন – সিস্টেমের সঙ্গে যে লড়াই, তার চেয়ে ঢের বেশি শক্ত নিজের ভেতরের লড়াই। আর সেই লড়াইতে আমাদের কে সঙ্গে থাকেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। অথবা কে এত অনায়াসে থাকেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া? একবিংশ শতাব্দীতে বাল্মিকী প্রতিভা কারো জীবনে নাটকটা করার মধ্যে দিয়েই সত্যি হয় এটা জানলে কেমন লাগে? আমাদের মজ্জার ভিতর বিদ্যুৎ বয়ে যায়।

১৩) এছাড়া আরেকটা কথা আমার কানে বাজছে নিগেলের – তিনি বলেছেন, মঞ্চে এসে তিনি প্রথমবার কাঁদলেন। শিখলেন কীভাবে কাঁদতে হয়।

আমরা শুধুমাত্র নিজের দুঃখে কোনো দিন কেঁদেছি কিনা মনে পড়ে না (যদিও ক্ষোভ চোখে জল আনে), কিন্তু এই রকম ছায়াছবি আমাদের ভাসায়।

এক অতিমানবিক কান্না দস্যু রত্নাকরের সমস্ত জীবনের যত হাহাকার — সব ধুইয়ে দেয়, জলোচ্ছ্বাসের মত। আর দেয় আমাদেরও।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত