আমার শিক্ষকগণ

আমার এক স্বজন ছিলেন। তিনি বলতেন, প্রয়োজনে একজন ভিখিরির কাছেও শিক্ষা নিতে পারা যায়। অর্থাৎ শিক্ষা নেবার জন্য স্থানকালপাত্র মেনে চলার দরকার নেই। আমার কাছে সহজ করে বলতে গেলে, শিক্ষা কিছু না, দরজাটুকু খোলা রাখা আর একটা বীক্ষণযন্ত্র চালু রাখা। মনোযোগী বীক্ষক এক চোখা হরিণের ন্যায় নন, যিনি কিছু দেখবেন, আর নিজের সুবিধা মত বাকিটা বাদ দেবেন। খণ্ডিত সত্য নিয়ে আমাদের থাকতেই হয়, কিন্তু শিক্ষা শব্দটা একটা নিটোলতা দাবী করে।

 আমার শিক্ষকগণ কেমন ছিলেন

ছয় বছর বয়েসে আমাকে ভর্তি করা হয় ক্লাস ২তে, উগান্ডায়, সেশন শুরু হয়ে যাবার তিন মাস পর। এ ছাড়া উপায় ছিল না। আমার উগান্ডার শিক্ষকদের রঙ কালো তো অবশ্যি, কারণ তাঁরা আফ্রিকান, কিন্তু আমাদের হেডমাস্টার মিস্টার আলমেইডা, হাতে পাইপ (পেটানোর কায়দাটা অনবদ্য), চোখ পলাশের মত লাল আর বড়ো বড়ো, মুখে খিস্তি দেবার মত ভঙ্গী, তাঁর রঙ টকটকে হলুদ, কারণ তিনি গোয়ার মানুষ। তাঁকে কখনো হাসতে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। তখন ভয় হলেও, এখন করুণা হয়, কারণ শিক্ষক যেহেতু অভিভাবক এক প্রকার, তাই তাঁর আনন্দ পাবার অনেক উপকরণ থাকার কথা।

 ৮০’র দশকে এই দেশের মানুষমাত্র গরীব ছিলেন, একটা দুটো সামরিক অভ্যুত্থান হয়ে গেছে, ব্যাঙ্ক ফাঁকা, আমরা একটু দেরিতে এবং না বুঝে এসেছি। শিক্ষকরা চিরকেলে গরীব, অথচ পঙ্গপালের মত শিশুদের দায়িত্ব দেওয়া হত তাঁদের সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। আমাকে তারা ডাকত এক অদ্ভুত নামে; এই কারণে সেই সময় আমি আমার প্রথম নামের প্রতি বেশ বিরূপ ছিলাম। ‘আনান্ডামাইয়ে’। ওদের নামের সঙ্গে সঙ্গতি রাখা টান আর সুর।

 উগান্ডার ইস্কুলের প্রতি আমার কিছু ঋণ আছে। আমি এখানে গিয়ে শিখেছি, আমি ওয়ান এমং দ্য মেনি। লাই দেবার মত কেউ নেই, কিছু নেই, ভালো হলেও বেত খাবা, নাহলেও খাবা, একটু বেশি কম এই যা। এখানে ভালো রেজাল্ট করার মত অনেকে আছে কিন্তু সাবাশ দেবার মত কেউ নেই, সকলে লাইন ধরে কাঁচকলা সেদ্ধ, বাদামবাটা আর লাল বিন্স খায়। সকলের গায়ে একটা ইউনিফর্ম – সেখানে লেখা ‘টু ফ্লাই অন ইয়োর ওউন’।

 এখানে মেয়েরা হাওয়ার বেগে দৌড়ায়, আর লোহার রজ্জুর মত শক্ত হয়। আমাকেও তেমন হতে হয়েছে, অগত্যা। এছাড়া, ইস্কুলের ময়লা দেয়াল ধরে ধরে জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, হিয়েরোগ্লিফিক্স হরফ ইত্যাদি নানাবিধ জ্ঞানের ছবি আঁকা থাকত বলে সেগুলো আজও ভুলতে পারিনি।

 একজন অংকের শিক্ষক প্রত্যেককে বেত দিতে মারতেন, তাঁর নাম মিস্টার মুসাজ্জাকাহুয়া। এর মানে টক। তিনি যে খুব টক চোখমুখ দেখে সেটা কাউকে বলে দিতে হত না। আমাকে আর ডামালিন বলে আমার গাট্টাগোট্টা বান্ধবীকে তিনি অংক করতে বোর্ডে ডাকতেন।

এছাড়া ছিলেন স্মার্ট আর এলেগ্যান্ট দেখতে মিস্টার সেনফুমা। যিনি প্রহাররহিত ছিলেন না। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে ইস্কুলে ক্যারল গাইবার পরে একদিন আলাদা করে ডেকে ওই গানগুলো আবার আমাকে শোনানোর অনুরোধ করেছিলেন। আমি পায়ের দিকে তাকিয়ে ঘামতে লাগলাম।

মিস্টার টিন্ডিকাহুয়া আমাদের ইংলিশের শিক্ষক। ‘ল্যুজ’ (Lose) আর ‘ল্যুউস’ (Loose) এর পার্থক্য যেভাবে শিখিয়েছিলেন ভুলতে পারব না। ইংলিশে কাঁচা থেকে যাবার পরও তাঁর ক্লাসগুলো প্রহাররহিত হওয়ায় মন দিতে পেরেছিলাম। অবহেলিত শিশুদের ইস্কুলে পড়া যে ভালো হত তার প্রমাণ এখান থেকে সব মেধাবীরা শিখে পরে দেশে বিদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।

 এর পরে বাংলাদেশের ইস্কুল। তাঁরা এখনো বেঁচে বিধায় বেশি কিছু লিখতে চাই না। যদিও রুনু আপার ক্লাসে বাংলায় ‘কাবুলিওয়ালা’ অথবা ‘দারুচিনি দ্বীপের দেশে’ নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে লিখতে গিয়ে যে বেশ টেনে টেনে শব্দর পর শব্দ সাজাতে ভালো লাগে সেটা প্রথম ভালো করে টের পেলাম।

আর হালিম স্যারের ক্লাসে ব্যাকরণ আমাকে টানটান করল। বেতের ভয়ও ছিল। সমাস বাগধারা আর প্রবাদপ্রবচন আমার উগান্ডা থেকে আগত নবলব্ধ পরিষ্কার স্লেট উত্তেজিত করে তুলল। আর কলেজের মনীন্দ্র স্যারের ক্লাসের অংক পেলব আর মসৃণ হয়ে উঠল তার ব্যক্তিত্বের গুণে। এখানে সুশান্ত স্যারের কাছে ভাত টিপে স্যামপ্লিং শেখানোর যে উদাহরন দিয়েছিলেন, পরে অনেকবার স্যামপ্লিং নিয়ে কথা বলার সময় আমি সেই উদাহরণ ব্যবহার করেছি।

 ইস্কুলে দুষ্টু ছেলেপুলেদের গুণে শিক্ষকদের নিয়ে কিছু প্রাত্যহিক হিউমার গড়ে উঠবে এটা এমন কিছু নতুন না, কিন্তু সেসব আরেকদিন বলা যায়। যতবার ইস্কুলে দেখা করতে গিয়েছি, শিক্ষকদের চোখে যে সাড়া আর খুশি দেখেছি তাই আমাদের মনে থাকবে বেশি করে।

 তেতেপুড়ে যাওয়া গরম টিনছাদের তলায় জ্যৈষ্ঠবেলা ক্লাস করেছি, তাতে কিছু এসে যায় না। দুনিয়াতে শারীরিক কিছু কষ্ট আছে, যা সুখের। এই কলেজ থেকে অতঃপর অনেকে বেরিয়ে খুব ভালো কাজ করেছেন, তাই বিদেশী দামী ও নামী কলেজে পড়ার দরকারটা সেভাবে বুঝতে পারিনি। কলেজের পাশাপাশি বইপত্র আর পরিবেশের দিক থেকে অবশ্য আমরা একটু বেশি কিছু পাচ্ছিলাম, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক জায়গায়।

 এর মধ্যে অল্প অল্প যাতায়াত শুরু হল হাসান চাচার বাড়িতে। ওঁর কথা থেকে লেখা ও সাহিত্য নিয়ে ওঁর চিন্তার ব্যাপারে আমি এক আধুলি জ্ঞান পাবার আশায় ঘুরঘুর করেছি অনেক। কিছু বই হাতে দিতেন এবং সেগুলো পড়তাম। নিজে থেকে না দিলে মাঝেমাঝে চেয়ে নিতাম। দেবেশ রায় এভাবে পড়েছি। উনি ইংলিশ অনুবাদ বই বেশি দিতেন। নেরুদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ষোলো বছর বয়েসে ওর মাধ্যমে। অনুবাদ আর হাসান চাচার সঙ্গে আমার ছাত্রী এবং আত্মজাপ্রতিম সাক্ষাৎ আমি আর আলাদা করতে পারব না।

 আই এস আইতে পড়ার মধ্যে এক আধ জন সেই স্পার্ক এনে দিলেন হাতে। চোখে মুখে ফুলকি নিয়ে ঢুকতেন সম্ভাবনা তত্ত্বের শিক্ষক বি ভি রাও। এই প্রতিষ্ঠানে একদিকে বাঙালি, অন্যদিকে রাও (অন্ধ্র প্রদেশ) – এমন একটা ঠাট্টা সুপ্রচলিত ছিল।

শিক্ষক অনেকে কিন্তু বি ভি রাওকে কেউ কোনো দিন ভুলতে পারেন না। আমি তাঁকে কখনো সুট কোটে দেখিনি, মনে হয় না কোনোদিন সেজেছেন।

প্রথম দিন একটা হাওয়াই চপ্পল পায়ে ক্লাসের বাইরে ছিলেন। শার্টটা পুরোনো। জামাকাপড়ে কোনো জেল্লা নেই। এত নাম করা প্রতিষ্ঠানে এমন হবে বুঝতে পারিনি, তাই বোকাহদ্দ হিসেবে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বিস্ট্যাটের ক্লাসটা কোথায় হবে। সত্যি তাঁকে একজন খাটিয়ে লোক ঠাওরেছিলাম। তিনি খুব স্বাভাবিক হাসি দিয়ে জানিয়ে দিলেন, ওই দিকে। আমি বাংলাতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিও বাংলায় উত্তর দেন। হাসলে চোখে জোনাক জ্বলা কম দেখেছি। বি ভি রাও ছিলেন সেরকম একজন মানুষ। ঐ হাসি দেখার জন্য ওঁর ক্লাস করা যায়। এছাড়া আমরা যে বোকাহদ্দ থেকে দিগগজ হয়ে উঠেছিলাম একেবারে সক্কলেই, সেটা ওঁর জন্যই। একটা হোমওয়ার্ক দিতেন না। কিন্তু প্রতি ক্লাসে বাড়িতে নিজে নিজে করার জন্য নিজের হাতে লেখা একটা ওয়ার্কশীট। সব করতে হত। নাহলে পরীক্ষায় কলকে মিলত না। তবে একটু রাগ হত না, সেটাই আশ্চর্য। বি ভি রাও, পি এস এস এন ভি পি রাও, টি কৃষ্ণন আর সুষমা বেন্দ্রের ক্লাসে আমরা যে রেজাল্ট ভালো করতে এমন কি ভেসে থাকতে এসেছি তা মনে হত না, রীতিমত উত্তেজিত থাকতাম শেখার জন্য। যতটুকু উত্তেজনা, ততটুকুই লাভ।

 একই সঙ্গে অশোক রায়ের রিয়াল এনালিসিস ক্লাসে নিজেকে খড়কুটো নৌকা মনে হওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। যুক্তরাষ্ট্রে পিএচডি করতে এসে কিছু ক্লাস নিতে হয়েছিল আবার, কারণ কোর্সওয়ার্ক ছাড়া কিছু হয় না সেখানে। তখন রিয়েল এনালিসিস আর মেজার থিওরি আমার শত্রুভাবাপন্ন মনে হয়নি, দোস্ত মনে হয়েছিল। সব গুরুমশাইয়ের গুণ।

 আমার সেরা শিক্ষকের মধ্যে আরো আমার পিএচডি সুপারভাইজার এল্যান গেলফ্যান্ড আছেন, আছেন দীপক দে এবং নলিনী রবিশংকর। আজকাল আধুনিক শিক্ষা যে উত্তেজনাকর, নিজেকে আজীবন ছাত্র করে রাখতে ইচ্ছে করে, এটা আমি আরেকটু জানলাম এঁদের সঙ্গে এসে। আমি আসলে চিরকাল ছাত্র হয়ে থাকতে চেয়েছি। খুব নিশ্চিন্ত আর ঝরঝরে জীবন।

 ছাত্রজীবনের কথা বলতে হলে অবশ্য বলতে হবে আরো অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক আর গুরুমশাই আর দিদিমনির কথা, যারা কেউ বয়েসে আমার চেয়ে বড়ো কেউ বা ছোটো। কেউ জেনে কেউ না জেনে শিখিয়েছেন।

শিশু আসার আগে প্লেনো হাসপাতালে একটা বিনা বৈতনিক ক্লাস হত সম্ভাব্য অভিভাবকদের জন্য। ক্লাস করাতেন একজন নার্স। এই নার্স মানুষগুলো জিব্রাইল, ফেরেস্তা, পরী, মা সরস্বতী, মাদার টেরেসার কম কিছু না। এঁরা যেন প্রেমস্বরূপিনী। আমি এই ক্লাস করে মাতৃত্ব নামের অনন্ত রোমাঞ্চকর এডভেঞ্চারের জন্য উদগ্রীব হলাম। আমার শরীরে তখন নানা রকম সমস্যা আর সংকট, ঘুমাতে পারি না। তারপর সন্ধেবেলা সব কাজ সেরে, খাতা কলম পেন্সিল আর অধীর আগ্রহ নিয়ে ছুটতাম। শিশু তখন অভ্যন্তরে একটা বীজপত্র পুটুলি। আল্ট্রাসোনোতে এক দিন তার এতটুকু বুকের ওঠাপড়া দেখলাম আর ঠোঁট নাড়ানো। সকল প্রেমই অচেনা যে, তাই তো হৃদয় দোলে। এই জন্য ভাবলাম, সব জানা চাই, শুরু থেকে শেষ, শিশুর বেড়ে ওঠার প্রত্যেকটা সিঁড়ি, প্রত্যেকটা উন্মোচন, প্রত্যেকটা ক্ষরণ, প্রত্যেকটা শিহরণ। তার সেবা, নিজের যত্ন। যখন এক আশ্বিনের পূর্ণিমা রাতে ছেলে জলের চৌবাচ্চা ছেড়ে আসবে বলে জানিয়ে দিল, আমরা শ্বাসের দিকে নজর দিতে দিতে, নিজেদের প্রস্তুত করতে করতে আর গভীর আত্মস্থ বোধ করতে করতে হাসপাতালে এলাম তাকে স্বাগত জানাতে। পুরো প্রক্রিয়াটা যেমন ভাবা তেমনি কাজের মত হয়ে গেল। শিশু সাত ঘণ্টা পর ভোরে যখন এলো ততক্ষণে আমার কৃষ্ণাঙ্গ ডাক্তার আর দুই জন শ্বেতাঙ্গ নার্সের কাছে আমরা চিরদিনের জন্য বাঁধা পড়ে গেছি। আমার বাবা-মা সারা রাত জেগে ছিলেন শিশুর আগমনের জন্য।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত