ন হন্যতে (পর্ব-১১)

যাবার কথা আমি ভাবি, দিনের বেলা আমি নানা চেষ্টা করি, সোজা তো নয় আজকাল বিদেশে যাওয়া। কিন্তু রাত্রে আমার ভয় করে। মনে হয় কোথায় যাব একলা? রাস্তার মাঝখানে যদি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই, যদি স্ট্রোক হয়। পার্বতীর স্বামীও তাই বলেছেন, “সে ভদ্রলোকের যেরকম বর্ণনা শুনছি, তিনি যে কি রকম ব্যবহার করবেন তাও তো জানা নেই, তোমরা যে অমৃতাকে একলা ছেড়ে দিচ্ছ, অসুস্থ হলে কি হবে?” সবাই ভাবছে, আমিও। কেবল আমার স্বামী আমাকে আশ্বাস দিচ্ছেন, “কিছু হবে না, কোনো ভয় নেই, কেউ তোমাকে কষ্ট দেবে না অসুস্থ হবে না। সব ব্যবস্থা হবে তুমি নির্বিঘ্নে ঘুরে আসবে। আমার অসুখ সম্বন্ধে আমার স্বামী সর্বদা চিন্তিত কিন্তু এখন ওঁর চিন্তা নেই। আমি অবাক হয়ে গেছি, আমি যদি ‘দশ পা পিছাই উনি ‘বিশ পা এগিয়ে দেন। আর এটা এত অবলীলাক্রমে করছেন যে আমরা সকলেই বিস্মিত। “যাবে, তুমি যাবে, সেখানে গিয়ে তোমার এই fairy tale-টা শেষ করে আসবে।”

সেদিন Air India-র আপিসে বসে আছি, আমাদের সাহায্য করছেন যে ব্যক্তি তার নাম পুরোহিত। এয়ার ইণ্ডিয়ার আপিসে বসে আমার ভয় করছে। এত অজ্ঞাত দেশে কি করে যাব? এর আগে যখন বিদেশে গিয়েছি হয় কোনো দলের সঙ্গে, নয় নিমন্ত্রিত হয়ে। বিদেশে তারাই আমার সব ভার নিয়েছে, তা না হলে একলা কি যেতে পারি? নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করছি, যদি নিমন্ত্রণ আসে তবেই যাওয়া হবে—নৈলে একা একা শুধু ওকে দেখতে যাওয়া অসম্ভব। আমি বললাম, “আজকে টিকিট করা থাক।

আমার স্বামী বললেন, “কেন? টিকিট করা হোক না, নিমন্ত্রণ আসবে, ঠিক আসবে দেখো।”

“না, না, আজ থাক, আমার ভয় করছে।”

“তোমার ভয় করছে কেন, আমারই তো ভয় করবার কথা!”

“তোমার আবার ভয় করবে কেন?”

“করবে না?” উনি খুব হাসছেন, “তুমি পুরোহিতের সাহায্য নিচ্ছ।”

অনেক দিন পরে খুব হাসছি, মন হাল্কা হয়ে গেছে, স্বচ্ছ, উদার, শুভ্র হাস্যধারা এই নিরভিমান ব্যক্তিটি উৎসারিত করতে পারেন।

নিমন্ত্রণ আসবে কি আসবে না, এই নিয়ে সংশয়ে আছি। আমি যাদের সঙ্গে নানা রকম কাজে এদেশে যুক্ত আছি তারাই আমার নিমন্ত্রণ করবে। তবে যদি সম্মেলন হয় তবেই করবে, তা না হলে সামনের বছর আমায় নিয়ে যাবে ঠিকই। তারা তো জানে না আমার তাড়াটা কি। সম্মেলন কবে হবে কে জানে। সেরগেই আসার পর ছ’মাসের উপর হয়ে গেল, কম দিন নয়। এই ছয় মাস আমি কোনো রাত্রে এক ঘণ্টার বেশি ঘুমোই নি, কিন্তু তাতে আমার শরীর খারাপ হচ্ছে না, বা দিনেও ঘুম পাচ্ছে না।

সেদিন একজন অধ্যাপক দেখা করতে এসেছেন, তিনি একটা বড় কাজের ভার নিয়েছেন। নানা কথার মধ্যে হঠাৎ বললেন, “আমার এক জ্যোতিষী আছেন তার কথাতেই আমি এই কাজের ভার নিয়েছি।”

আমি বিস্মিত, অনেক জ্যোতিষী দেখেছি আমি, ঠিকমত কাউকে কিছু বলতে শুনি নি, সবাই আন্দাজে ঢিল ছোড়ে। আর তারপরই, স্বস্ত্যয়ন কর—যেন এখানে দুটো ফুল ফেলে বিশ্বের অমোঘ নিয়মকে বদলে দেবে।

আমি বললাম, “আপনি এসব বুজরুকিতে বিশ্বাস করেন?”

“বুজরুক অনেক আছে, সবাই নয়।”

“আমাকে একবার নিয়ে যাবেন?” হাসি পাচ্ছে আমার, মানুষ যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন তার মেরুদণ্ডও বেঁকে যায়। আমার তাই হয়েছে। এখন অলৌকিকে নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব ভাবছি, আরো ভাবছি দেখাই যাক না। ক্ষতি তো কিছু নেই। অধ্যাপকের সঙ্গে জ্যোতিষীর বাড়ি গেলাম। তিনি আমায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেলেন। জ্যোতিষী নিবিষ্ট মনে আমার রাশিচক্র দেখছেন। আমি ভাবছি কার সাধ্য আছে, আমার কি হচ্ছে তা বলতে পারে? আমার বয়সই আমার বর্ম।

জ্যোতিষী বললেন, “আপনি কি জানতে চান?”

“আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু বলুন—অতীত শুনতে চাই না—অবশ্য জীবনের আর বেশি বাকি নেই, তাই ভবিষ্যৎও নেই।”

“তা নয়, আপনি অনেক দিন বাচবেন। আর খুব শীঘ্র, আমি তারিখ বলছি, লিখে দিচ্ছি, ১১ই এপ্রিলের মধ্যে আপনি সমুদ্র পার হবেন—বিদেশ যাবেন।”

“কি করে যাব, আমার কাছে তো টাকা নেই?”

“চেষ্টা করুন, নিমন্ত্রণ আসবে, টাকা আসবে।”

“আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি, একে আমার পরিচয়টাও দিই নি, এত কথা বলে কি করে? “তারপর? বিদেশে গিয়ে আমার লাভ কি হবে?”

“সেখানে গিয়ে একজনের সঙ্গে আপনার দেখা হবে, সারাজীবন আপনি যার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।”

আমি যথাশক্তি নির্বিকার থাকতে চেষ্টা করছি—গম্ভীরভাবে বললাম-“সে লোকটি কি রকম?”

“ম্লেচ্ছ।” চমকে উঠেছি আমি, সাবধানে কথা বলছি।

“ম্লেচ্ছর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিশেষত্বটা কি?”

ভদ্রলোক এবারে একটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলেন, “রোমান্টিক”।

“হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ” —আমি হাসছি—“জ্যোতিষীমশায়, আপনি কাকে কি বলছেন? আমার চুলের দিকে দেখুন, বরফ পড়েছে সেখানে।”

আমার হাস্যোচ্ছাসে তিনি বিরক্ত, “আমি কারু চুল, দাঁত বা নখ দেখি না, আমি তার গ্রহনক্ষত্রের দিকে দেখি।”

এবার আর সন্দেহ নেই—‘অনাদিকালের এই আছিল মন্ত্রণা’ তেতাল্লিশ বছর পরে মির্চা ইউক্লিডের সঙ্গে অমৃতার দেখা হবে। এ গভীর রহস্যের অর্থ বোঝার সাধ্য কি আমার, সামান্য আমার?

“জ্যোতিষীমশায়, আপনি তো এক ভয়ানক কথা বলছেন”, হালকা সুরে কথা বলছি আমি, “যদি এমন ঘটনা ঘটেই তাহলে অপমান হবে না আমার। নিন্দা হবে না?”

“না, না, নিন্দা হতে যাবে কেন?”

“কেন নয়? এ বয়সে রোমান্টিক দেখা হওয়া ভালো?”

“কেন নয়? কেন নয়?” ভদ্রলোক বিরক্ত, “অপমান হবে কেন? মানহানি যোগই যে নেই।”

আমার নিমন্ত্রণ এল, টাকাও। একে একে সব জটিল গ্রন্থি খুলে যাচ্ছে, যাবার পথ সহজ হয়ে আসছে। কি আশ্চর্য—কে আমাকে হাত ধরে এই অজ্ঞাত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ একটি বাঙালী ঘরের মধ্যবিত্ত সংসারের মধ্যে বসে জীবন এত বদলে যেতে পারে? আমার বন্ধুরা বলছে এই জীবনোপন্যাসটা লিখতে। মির্চা যা লিখেছে সেই অসমাপ্ত কাহিনী সমাপ্ত করা উচিত। জীবনে যখন সমাপ্ত করতে চলেছি সেই উনিশ শ’ ত্রিশ সালের আরম্ভকে, সাহিত্যেই বা হবে না কেন? এই তো এসেছে সেই ‘last of life for which the first was made

জীবনী লেখার কথা হলেই আমি রবীন্দ্রনাথের কথাই ভাবি।

বার্ধক্যে বাল্যকালের কথা স্পষ্ট করে মনে পড়ে। তাকেও দেখতাম সর্বদা অল্পবয়সের গল্প করতেন। সেই থেকেই তো ছেলেবেলা লেখার সূত্রপাত। আমি তখন অনেকবার তাঁকে বলেছি, আপনার জীবনটা লিখুন—এখন না হোক পরে প্রকাশিত হবে। বার বার বলছি অন্তৰ্জীবনটা লিখুন। তিনি বলতেন “অন্তৰ্জীবনই তো লিখছি—আর কি শুনতে চাও, আমার রোমান্টিক লাইফ? “আমি শুধু নয়। অনেকেই শুনতে চাইবে। আপনার এই দীর্ঘজীবনে কত মানুষ আপনাকে ভালোবেসেছে, বাসবে না কেন? ভালোবাসার যোগ্য আপনি, আপনি সামনে থাকলে তো আর ও বাড়ির পঞ্চাননকে ভালোবাসা যায় না। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে আপনি যে ভাবে মর্যাদা দিয়ে, তাকে যথাস্থানে রেখে তার মাধুর্য বিকাশ করে, তার থেকে যতটুকু গ্রহণীয় তা নিয়ে তাকে সার্থক করেন এও একটা কবিতা এবং এ কবিতা আপনার রচনার চেয়ে কম সুন্দর নয়। কম আশ্চর্য নয়। এ যদি আপনি না লেখেন—এ তো হারিয়ে যাবে।” আমি তাকে আরো বলতুম—“এর পরে আপনার জীবনের বহু অর্থবহ ঘটনা যেমন তেমন লোক তাদের নিজের মনের মাপে বুঝবে–ইতরজনের জন্য ইতরভাবে লিখবে যার নাম রিসার্চ-আপনি মানুষটি কি তা যারা কিছুই জানে না, তারাই আপনার জীবন লিখবে— এবং লিখবে তাদের খাট কলমে, ছোট মনের ছোট ছোট ছায়া ফেলে। আপনার সবচেয়ে বড় কাব্যটি হারিয়ে যাবে।”

তিনি বলতেন, “যা যাবার তা যাবেই, আমার কতটুকু রাখতে পারবে তুমি? রাখতে পারবে এই শরীর? আমার এই হাতখানা কি রাখা সম্ভব হবে? যা যাবার তা চলে গিয়ে যা থাকবার তা রইল আমার গানে কবিতায়।”

তিনি আরো বলতেন,-যে পথ দিয়ে চলে এসেছি সে পথে আর ফেরা যায় না, সে বড় বেদনা।আজ বুঝতে পারছি সে কথার অর্থ, যখন পিছনের দিকে তাকিয়ে আমার বর্তমান বেদনার ভারে দিশাহারা।

তবে একথাও ঠিক অতীতকে আমি ডাক দিয়ে আনি নি—সে দরজা ভেঙে আমার বর্তমানে প্রবেশ করে বর্তমানের সঙ্গে মিশে গেছে। যার কথা চল্লিশ বছর শুনি নি, এই কমাস ধরে ক্রমাগত শুনছি। আমি শুনেছি ওর স্ত্রী আছেন কিন্তু কোনো সন্তান নেই। ওরা দুটি প্রাণী এক বাড়িতে থাকে, ও দিনরাত্রি নিজের লাইব্রেরীতে বইয়ে মুখ খুঁজে পড়ে থাকে। তার জীবনে বই পড়া ও লেখা ছাড়া আর কিছু নেই। কথাটা আমায় ভয় দেখাচ্ছে, তাহলে যে মানুষকে আমি দেখতে যাচ্ছি সে একটা পুরো মানুষই নয়। যার বুকের উপর, পায়ে নূপুর, চোখে কাজল, হাতে নাড়, বালগোপাল নৃত্য করে নি সে কি করে সম্পূর্ণতা পাবে? শুনছি তার স্ত্রী খুব পাহারাদার, কেউ কেউ বলছে, আমার কোনো চিঠি সে পায় নি। কিন্তু একথা আমার বিশ্বাস হয় না। আমার চিঠিতে এমন কিছু ছিল না যে সেজন্য সেটা দেওয়া হবে না। আমাকে সে ঈর্ষা করবেই বা কেন, আমি তো অতীতের একটা স্বপ্নমাত্র। সেই যে আঠারই সেপ্টেম্বর উনিশ শ’ ত্রিশ সালের দুপুরবেলা মির্চা আমাদের বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল তারপর তার একটি চিঠি বা অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন আমি পাই নি। সেই দুঃখেই তো আমার বুকের একটা পাশ জ্বলে গিয়েছে, ধিকি ধিকি জ্বলছে—অবিশ্বাসের বিষাক্ত ধোয়ায় আমার ভালোবাসার শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে। আর আজ এতদিন পরে শুনলাম সে কারু কাছে বলেছে-“আমি তাকে একটা ছবি পাঠিয়েছিলাম স্বর্গদ্বার থেকে, আমি তো তাকে লিখতে পারতাম না, তাই খোকার মাধ্যমে পাঠাতাম—ঐ ছবিতে আমার মুখে দাড়ি দেখে সে খোকাকে বলেছিল, ‘পাশ থেকে হেঁটে ফেলে যেন।”

আমি ভাবছি, তাই কি? এরকম ছবি কি আমি দেখেছি? কখন দেখলাম, কোথায় দাঁড়িয়েছিলাম? আজকাল আমার কাছে উনিশ শ’ ত্রিশ সালের ঘটনাগুলো ছবির মত ভেসে উঠছে, আমি দেখতে পাই বাবা যখন বলছেন, “একমুখ দাড়ি রেখেছে”, তখন বাবা কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন, আমি কোথায় ছিলাম। কিন্তু খোকা যখন আমায় এ ছবি দেখাল, তখন আমিই বা কোথায় ছিলাম, সে-ই বা কোথায়! এ দৃশ্য তো মনে পড়ছে না। তাছাড়া আমি ওর ওরকম ছবি দেখলে শুধু বলব—দাড়িটা পাশ থেকে হেঁটে ফেলে যেন, আর কিছু না, তাই কি হতে পারে? পারে না, পারে না, আমি নিশ্চয় কেঁদে কেঁদে বলব, “ও খোকা আমাকে একটু দেখা করিয়ে দাও ভাই।” এ সব তো কিছু মনে পড়ছে না। আমি ভাবছিই, ভাবছিই, ভাবতে ভাবতে মনে হচ্ছে ছবিটাই শুধু পাঠাল আমাকে, তাহলে চিঠিও কি পাঠিয়েছে? নিশ্চয় চিঠি লিখেছে, কারণ আমাকে ছবিটা দেখাতে লিখেছে—তাহলে সে চিঠি তো আমি দেখি নি।

আমি এখন জানি খোকা ওর কাছে মাঝে মাঝে টাকা চাইত এবং সেই টাকা আদায়ের জন্যই সে ওর কাছে আমার উপর নির্যাতনের অদ্ভুত অদ্ভুত কাহিনী বলে ওকে বিপর্যস্ত করে ওর কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। আমি স্থির করলাম খোকার কাছে যাব। এখন আর আমার লজ্জাই বা কি, সে তো কত যুগ আগের কথা।

একদিন সন্ধ্যাবেলা খোকার বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হলাম। ওর দুরবস্থা কোনো দিন ঘুচল, ঘুচবে কি করে, ওর বারটি সন্তান। সবাই বড় হয়েছে অবশ্য, তবু ওদের তিন পুরুষের অক্ষয় দারিদ্র্য। বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি বাড়িটা অন্ধকার। কলকাতার একটা বিশিষ্ট পাড়াতেই ওরা থাকে, অনেক দিন আছে, চারদিক আলো ঝলমল, শুধু এই বাড়িটাই অন্ধকার। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর খোকা বেরিয়ে এল। বহু বছর পর ওকে দেখলাম। একেবারে বৃদ্ধ হয়ে গেছে, ওর কুৎসিত চেহারা আরো কুৎসিত হয়েছে। বিরাট থ্যাবড়া নাক ও মুখের পাশে লোলচর্ম ঝুলে এসেছে, ও বললে, “কে? কে?”

“আমি, আমাকে চিনতে পারছ না?”

অন্ধকারে কিছুক্ষণ ঠাহর করে বললে, “ও রু! অনেক দিন পরে তোমায় দেখলাম, কি ব্যাপার?”

“আলো নেই কেন?”

“সে তো বোঝা শক্ত নয়, বিল দিতে পারি নি বলে কেটে দিয়েছে।” তারপর, “ভিতরে আসবে? একটা মোমবাতি নিয়ে আসি”।

মোমবাতি এনে খোকা আমায় দেখছে, “তুমি এখনও খুবই সুন্দর আছ রু। তোমার বয়সে এরকম ক’জন আছে? আজকালকার মেয়েদের যা ছিরি”

“তাই নাকি? খুব আনন্দ পেলাম শুনে, খোকা তোমার কাছে মির্চার যে চিঠিগুলো ছিল দাও তো!”

“মির্চার চিঠি! এতকাল পরে তাকে মনে পড়ল?”

“আমার জীবনী লিখব, তাতে ওর কথা তো লিখতেই হয় একটু, নয় কি?”

“যদি তোমার সাহস থাকে তাহলে নিশ্চয় লিখবে। আর জীবনীটা যদি শুধু সাধুতার বড়াই করবার জন্য লেখ তাহলে লিখবে না।”

“আমি ভেবেছি মির্চার কথা খুব ভালো করে লিখব।”

“খুব খুশি হলাম শুনে, সত্যি আনন্দ হচ্ছে, সবাই বলে তোমার খুব সাহস আছে। আমাদের ছেলেবেলাটা কি সুন্দর ছিল রু, কি মধুর সে দিনগুলো। আর কি চমৎকার ছেলেই ছিল মির্চা, খোকা স্মৃতি রোমন্থন করছে “অমন করে এক ঘণ্টার মধ্যে ওকে তাড়িয়ে দেওয়া, মামার কোনো বিচার ছিল না, একটা ক্ষ্যাপাটে ছোট্ট মেয়ের কথা শুনে এমন কেউ করে…” ও বকেই চলেছে।

“খোকা চিঠিগুলো দাও তো। আমার তো কিছু মনেই পড়ছে না। চিঠিগুলো পড়লে হয়ত অনেক কথা মনে পড়বে। কটা চিঠি বল তো?” আমি মনে মনে আন্দাজ করছি দশ মাসে ক’টা লিখতে পারে, মাসে দুটো লিখেছে হয়ত।

“তা অনেক, কিন্তু সে সব চিঠি তো আমি ছিঁড়ে ফেলেছি!”

“ছিঁড়ে ফেললে কেন?”

“সাবধান হবার জন্য, কে কখন দেখে ফেলে।”

“খোকা ওর দাড়িওলা ছবিটা কই, সেটা তো হেঁড়বার দরকার ছিল না।”

“সেটা তো তোমায় দিয়েছি।”

“কখনো নয়। সে ছবি আমি দেখি নি! দেখলে ভুলতাম না।”

“ইঃ রে! একটা মানুষকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দিব্যি সংসারধর্ম করে, এখন আবার বলা হচ্ছে ভুলতাম না।”

“খোকা দাও, ছবিটা দাও, চিঠি কিছু না কিছু আছে, দাও তো।”

“আচ্ছা, চল্লিশ বছর আগেকার চিঠি কি আমি পকেটে করে ঘুরছি? খুঁজি, তুমি সাতদিন পরে এস।”

সাতদিন পরে গেলাম, রাগে আমার অন্তরটা জ্বলে যাচ্ছে—এত চিঠি লিখেছিল আর আমি কিছু জানি না—সে চিঠি তো আমাকেই লেখা নিশ্চয়, এই মূখ লোকটাকে এত চিঠি লিখবে কি কারণে!

বেশ কয়েকদিন ঘুরিয়ে তারপর খবর পাঠাল সে চিঠি পেয়েছে। সন্ধ্যাবেলা আবার গেলাম-খোকা উপর থেকে নেমে এল, স্থূল ললামশ শরীর, খালি গা, লুঙ্গি পরা.। লুঙ্গির পাশে চিঠি ক’টা গোজা। ওর ঐ উলঙ্গ ঘর্মসিক্ত শরীরের সঙ্গে চিঠিগুলো লেগে আছে দেখে আমার গা শির শির করতে লাগল।

হাত বাড়িয়ে দিলাম—“দাও।”

“অনেক খুঁজে এই তিনটে চিঠি পেয়েছি। আরো খুঁজবো।”

চিঠিগুলো নিয়ে মোমবাতির আলোয় পড়তে শুরু করেছি, খোকা বলছে, “বাড়ি গিয়ে পড়ো রু—একটু গল্প করা যাক, ছোটবেলার গল্প; জানো আমি তোমাদের দুজনের ছায়া কাচের কপাটে দেখেছিলাম। তারপর মির্চাকে বললাম, এস এই চেয়ারটায় বোসো, তারপর আমি গিয়ে পঁড়ালাম, দেখেছ? ঐখানে তোমাদের ছায়া দেখেছি আমি। ও তো চমকে উঠল। খোকা বকেই চলেছে, আমি চিঠি পড়তে শুরু করেছি—অপূর্ব চিঠি—একটি ইউরোপীয় মন প্রাচীন ভারতের জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় বিকশিত হচ্ছে আর প্রেমের দহনে দাহ্যমান, সেই সুন্দর মনের ছবি দেখতে পাচ্ছি। চিঠিগুলি জীর্ণ হয়ে এসেছে। বোঝা গেল এ চিঠির আগেও সে লিখেছে।

স্বর্গাশ্রম, ঋষিকেশ
১০ই নভেম্বর ১৯৩০
প্রিয় খোকা,

ব্ৰহ্মপুরী অরণ্যে অনেক দিন নির্জনে কাটিয়ে কাল রাত্রে আশ্রমে ফিরে তোমার চিঠি পেলাম। তোমার ও আমার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে না। কিছু কিছু ঘটনা তুমি জানতে না তাই আমি খুলে লিখেছি। লোকে আমায় শ্রীচৈতন্য বলে বলুক, এই সস্তা রসিকতা আমায় স্পর্শ করে না। আমি সুখী হয়েছি যে আমার বন্ধু দু’জন তা বিশ্বাস করে না। আমার বৈরাগ্যের কথা যখন ভাববে তখন ইয়োরোপীয়দের মত ভেব না। ভারতীয় হও। তুমি আমার চেয়ে ভালো বুঝবে কেন যীশুকে মরুভূমিতে বিশ বৎসর সাধনা করতে হয়েছিল, তার বাণী পৃথিবীতে প্রচার করবার আগে। ভেবে দেখ, যিশু মাত্র আঠার মাস প্রচার করেছিলেন এবং এ পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিলেন। আর আমি আমাদের সময়ের অনেক বুদ্ধিযুক্ত মস্তিষ্ক ও মনের কথা জানি যারা সারা জীবন প্রচার করলেও তাদের নিজের মনেরও পরিবর্তন করতে পারে না। আমি তাড়াতাড়ি সংসারে ফিরতে চাই না। রামকৃষ্ণের দরজার কাছে সারা বিশ্ব এসে গেল যখন তিনি সিদ্ধ হলেন। আর স্বামী বিবেকানন্দ সারা পৃথিবী ঘুরলেন তবু কাউকেই দীক্ষিত করতে পারলেন না। অনেক বাগবিস্তারে লাভ নেই–‘সাধনা অর্থ দেশবিদেশে বক্তৃতা দিয়ে ঘোরা আর বই লেখা নয়। অথবা এ কালের অসংখ্য গাধার কানে মন্ত্র দেওয়াও নয়। অন্তত আমার কাছে সাধনার অর্থ অন্য কিছু ও অনেক বেশি কিছু।

আমার বাবা মা ও বোন আশা করে আছেন আমি বাড়ি ফিরব তাই আমি অনেক দিন তাদের কাছ থেকে কোনো চিঠি পাই নি। কারণ আমার অল্পদিনের জন্য দেশে যাওয়া সবই ঠিক হয়েছিল। আমার বই ‘যে আলো নিবে গেছে’ ১৮ই সেপ্টেম্বর আমার বন্ধুর কাছে পৌঁছেছে, অদ্ভুত ব্যাপার না?

এই চিঠি অমৃতাকে দেখিও—ইতি মির্চা।

চিঠিটা পড়ছি আর বুঝতে পারছি বাবার উপর রাগে ওর মন জ্বলে যাচ্ছে। তার লেকচার দেওয়া দেশ বিদেশে, বিদ্যা অর্জন ও বিদ্যাদান কিছু ওর ভালো লাগছে না, কিন্তু মনে মনে তাকে অনেক বড় ভেবেছিল বলেই ঐ সব মহাপুরুষদের সঙ্গে তুলনা করেছে। বাবার এটাই দুর্ভাগ্য যে তাঁর প্রিয়জনদের কাছে তিনি দেবতা হতে চেয়েছিলেন—যদি তা না হয়ে একজন দোষগুণযুক্ত মানুষ হতেন তাঁরও দুর্ভোগ হত না—আমাদেরও না।

স্বর্গাশ্রম
২৫শে নভেম্বর ১৯৩০
প্রিয় খোকা,

আমি তোমার চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম ও তাড়াতাড়ি পড়ছি। আমি বাড়িতে ঐ বিষয়ে কেন লিখছি না? আমার বোনকে লিখেছি খানিকটা। ওরা কেউই আমার বিষয়ে, আমার চিন্তাধারা সম্বন্ধে এত বেশি জানে না যে আমার চিঠি পেয়ে সবটা বুঝতে পারবে। ওরা জানে আমি একটি হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করব ঠিক করেছি এবং ভারতে আরও পাঁচ বছর থাকব। ওরা আমায় দোষ দেবে কারণ ওরা এইটুকুই জানে। কিন্তু আমার অন্তরের কথা আমি কাউকে বলি না…কখনই বলি না…যা হোক ওদের বলব, তবে এখনই নয়। আমি প্রত্যুষের অপেক্ষায় আছি, তোমার কি মনে হয় প্রভাত হতে অনেক দেরী হবে? দেখছ তো আমার সাহিত্যিক খ্যাতি কি কাজে লাগল? কাজেই আমি এখন সাহিত্য বা যশ ইত্যাদি গ্রাহ্যই করি না। আমি রাত্রি দিন উপনিষদ পড়ছি, আর বেদের অংশবিশেষ। আমি গুরুকুলে গিয়েছিলাম—আর্য সমাজের দ্বারা চালিত এই কলেজটি বিখ্যাত—এখানে বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক বিষয়ে বক্তৃতা করতে নিমন্ত্রিত হয়েছি, আমি রাজি হয়েছি কারণ গুরুকুলে সংস্কৃতে কথা বলার সুযোগ পাব। এখানে ছাত্ররা পুরাতন ভারতের মহাভাবে উদ্বুদ্ধ—গাছের নীচে পবিত্রভাবে খোলা বাতাসে এরা বাস করে। এখন কেবল এই জীবনটাই আমি সহ্য করতে পারছি। তুমি জিজ্ঞাসা করেছ অল্পদিনের জন্যও দেশে যাচ্ছি নাকেন? কারণ তাহলে ওরা আর আমায় আসতে দেবে না! ওরা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝবে ভারত আমায় কি শিখিয়েছে। ওরা ভয় পেয়ে যাবে আর আমায় ইয়োরোপে আটকে রাখবে। ইয়োরোপ এখন আমার স্বপ্নের মহাদেশ-ওখানে আমি মুক্ত ছিলাম, আমার বয়স কম ছিল, ওখানে থাকতে জীবন সম্বন্ধে উদাসীন ছিলাম এবং শান্তিতে সুখে ছিলাম। এখন এসব আমার কাছে স্বপ্ন। সিসিলির তীর আর রোমের ধ্বংসাবশেষ, ফ্লোরেন্সের ঘন নীল আকাশ আর সুইটজারল্যাণ্ডের নির্জনতা, হয়ত এসব আমি আর কখনো দেখব না। আমাকে এখানে থেকে যুদ্ধ করতে হবে। এই ভারতে থেকে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করব আমি। ভারতই আমায় বন্ধন দিয়েছে, ভারতই মুক্তির পথ দেখাবে। আমি কাউকে ঠকাচ্ছি না, আমাকেও না, আমার দেশকেও না, কাজেই দেশে ফিরে গিয়ে আমার আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে বাজে কথা বলে কিংবা আমার যোগ বিষয়ে বিদ্যা সম্বন্ধে বড়াই করে লাভ কি—যখন সত্য হচ্ছে যন্ত্রণা, শুধু যন্ত্রণা। আমি চাই তুমি আর একটু সহানুভূতির সঙ্গে বোেঝ। তুমি এখনও জান না আমার কি ভয়ানক সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে, তার গভীরতা কতদূর। আমি এখানেই থাকব। আমি পাগলের মত সংস্কৃত ও ভারতীয় দর্শন পড়ছি। একটা বাতি পেয়েছি, অনেক রাত অবধি পড়ি। এখানটা খুব ঠাণ্ডা, খুব নির্জন, কয়েকজন পণ্ডিত আছেন। অমৃতাকে আমার ওই ছবিটা দয়া করে দেখিও—সে জানে আমার কত কষ্ট যে তাকে আমার একটা ছবি পাঠাবারও অধিকার নেই। ভালোবাসা জেন—ইতি মির্চা।

স্বর্গাশ্রম
৫ই ডিসেম্বর, ১৯৩০
প্রিয় খোকা,

তোমার চিঠি পড়লাম। তোমাকে ক্ষমা করবার কথাই ওঠে না। তুমি ঠিকই করেছ, তোমার বন্ধুকে তোমার বিপদের কথা লিখেছ, আমারই ত্রুটি যে তোমাকে সাহায্য করতে পারছি না।…আমি পাগলের মত কাজ করছি। উপনিষদের তত্ত্ব নিয়ে আমার প্রবন্ধ শেষ করছি। উপনিষদের কথা এইটুকু বলতে পারি যে এই বই আমার এ জীবনের সান্ত্বনা, আমার মরণেও সান্ত্বনাস্থল হবে। আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি তখনই সাহিত্য লিখি—অবসর বিনোদনের জন্যও নয় বা নাম-খ্যাতির জন্যও নয়—আমার সম্পাদকের প্রতি কর্তব্যের খাতিরে। লেখাই আমার বৈকালিক বিশ্রাম—অই আমি অনেক কাজ করছি।…এখন তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি অমৃতাকে আমার ছবিটা দেখিয়েছ? সে এখন কি করছে? তুমি প্রতি চিঠিতেই লিখছ এর সংকট এখনো কাটে নি। কিন্তু এ কথায় তো কিছু বোঝা যায় না, এ তো একটা কথা মাত্র। তুমি আশা করি বুঝছ ওর খবরের জন্য আমি কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। আমি জানি, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস যে ঠিক যা করা উচিত সে তাই করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে, কিন্তু আমি ওর কথা আরও জানতে চাই। তুমি কেন ওকে আমার চিঠিগুলি দেখাচ্ছ না? যখন সে একলা থাকে তখন তাকে আমার চিঠিগুলো দেখাও ও তার মনের কথা আমায় যে করেই হোক জানাও। তার মনের ঠিক কি অবস্থা আমি জানতে চাই। এ কথা লিখে লাভ নেই যে সে অতীতের কথা ভুলবে না কারণ ‘অতীত কথাটাও একটা কথা মাত্র। আমার কথা বুঝতে পারছ তো?…

আমার যে উন্মত্ত অভিজ্ঞতা হল (তুমি তাকে প্রেম বলতে পার) যা গত তিন মাস ধরে আমাকে অসীম যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছে—এখন তার শুভ দিকটা দেখাতে শুরু করেছে। ঐ মেয়েটি আমার জীবনটাকে বদলে দিয়েছে, বদলে একে সহস্রগুণে ভালো করেছে। আমার এই জাগরণ সূর্যোদয়ের মতই মহিমাময়। আমি সত্যকে দেখেছি এবং সামাজিক জগতের ও বিদ্যার জগতের নোংরামিও দেখেছি। চতুর্দিকের ভীরুতা ও নোংরামির মধ্যে আমি নিজেকে পবিত্র মনে করছি। যত মিথ্যার বেসাতি দেখছি, আমার শান্তি হচ্ছে যে আমি দুঃখ পাচ্ছি, আমি এ জীবন উপভোগ করতে চাই না ও করব না, আমি সুখ চাই না, চাই না—ইতি তোমার বন্ধু মির্চা।

…চিঠিগুলি পড়ছি আর ভাবছি মির্চা বেনা বনে মুক্তা ছড়িয়েছে। বাবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল আমায় লিখবে না তাই খোকাকে লিখেছে—ও নিশ্চিত ছিল খোকা আমাকে চিঠিগুলো দেখাবে এবং আমি যথাকৰ্তব্য করব। ওর বিশ্বাস ছিল আমি ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করব। এত বিশ্বাস ছিল আমার উপর আর আমি কি করলাম? সারা জীবন ধরে ভাবলাম যে ও আমাকে ঠকিয়েছে। করতে তো আমিই পারতাম, এ আমার দেশ, আমার কত বন্ধু ছিলেন, তারা সবাই শ্রেষ্ঠ পুরুষ। আমার কি সহায় কেউ ছিল না? তবে কেন করলাম না? কারণ আমার ধারণা ছিল এ বিষয়ে যা কিছু করণীয় পুরুষকেই করতে হবে, মেয়েরা কেন এগিয়ে যাবে, উপচিকা হবে! এও একটা কুসংস্কার এবং দম্ভ। আমি একটা বোকা অপদার্থ মেয়ে ছিলাম। অবশ্য আমি জানতাম না যে বাবা পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে আমাকে চিঠি লেখবার চেষ্টা করলে ওকে দেশ থেকে বের করে দেবেন। তিনি ওকে লিখেছিলেন, “তুমি আমার গৃহ অপবিত্র করেছ তুমি ছিলে তৃণাচ্ছাদিত সর্প, আর সাপ যখন মাথা তোলে তখনই তাকে মারতে হয়। তাই আমি করেছি…’ কাজেই ওর কোনো উপায় ছিল না, অথচ সারা জীবন আমি ওকে সন্দেহ করে কষ্ট পেয়েছি। আর এদিকে খোকা ওকে মিথ্যা কথা বলেছে, অন্তত ছবিটার কথা যখন বলেছে যে আমায় দেখিয়েছে তখন চিঠির কথাও বলেছে, কাজেই এটা কি অসম্ভব যে ওরও মনে হয়েছে আমি ইচ্ছে করেই কিছু করলাম না, আমারও সত্য ছিল না।…আমার বাড়ির দু মাইলের মধ্যে এই চিঠিগুলো ছিল আর আমি তেতাল্লিশ বছর, পর পেলাম। এই হচ্ছে কর্মফল, ভবিতব্য। খোকা বড় বড় করে কথা বলে যাচ্ছে, “পরে পোড়ো। এখন একটু গল্প করা যাক—

আমি বললাম “উল্লুক”, রাগে কাপছি আমি। ও চমকে উঠেছে। আমার মতো পরিশীলিত মহিলার মুখে এমন একটি ইতর দুর্বাক্য উচ্চারিত হতে পারে তা ও ভাবতেই পারে নি।

“কি বলছ, কি বলছ?”

“কিছু না, একটা জন্তুর নাম।”

“কাকে বলছ?”

“ঐ জন্তুকে। খোকা এসব চিঠি আমায় কেন দেখাও নি?”

“দেখিয়েছিলাম তো।”

“দেখিয়েছিলে? মিথ্যেবাদী! কেন দেখাও নি বল।”

“দেখালে তুমি কি করতে? তোমার করার কি ছিল?”

আমি তাকিয়ে দেখছি ঐ লোকটার দিকে-মুখে ঘাম চক চক করছে—মোমবাতির আলোকে ওকে এক আদিমগুহাস্থিত জন্তুর মত মনে হচ্ছে। কেন এই লোকটা এমন শত্রুতা করল? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর নেই এবং উত্তর পেয়েই বা কি হবে?

“চলি থোকা। এই চিঠি তিনখানা যে এতদিন রেখেছ সেজন্য ধন্যবাদ।” মনে মনে ভাবছি ওর উপর মিথ্যা রাগ করছি, এ চিঠি পড়ে কি ও বুঝতে পারে, হয়ত বা ভালো করে পড়েই নি। ব্যাগটা খুলে চিঠিগুলো ভরছি, খোকা বললে, “জানো তো কি দিনকাল পড়েছে, কত দিন রোজগার নেই, যদি পঞ্চাশটা টাকা দাও কাল র্যাশন তুলতে পারি।” আমি টাকা ক’টা ফেলে দিয়ে চলে এলাম—আমার গা ঘিনঘিন করছে। খোকা পিছন থেকে ডেকে বলছে—“ও কোথায় আছে জান?”

“নিশ্চয়ই—“

“কোথায় বলতো?”

“ঠিক যেখানে ছিল সেইখানে।”

খোকা বিস্মিত, “এ আবার একটা ঠিকানা হল?”

“আর কোনো ঠিকানা আমি জানি না ভাই।”

আমি অবাক হয়ে ভাবছি উনিশ শ ত্রিশ সাল যেন মন্ত্রণা করছিল আমাদের মিলন হতে দেবে না আর এই উনিশ শ তিয়াত্তর মন্ত্রণা করেছে আমাদের দেখা হবে। আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, আমি হয়ত গিয়ে পৌঁছতে পারব। আমি অবাক হয়ে গেছি ১৯৩০ সালে যে এরকম চিঠি লিখেছে, এত সত্যে স্থির—১৯৩৩ সালে সে ওরকম বই লিখল কি করে? আমার ভয় হচ্ছে ওর এই যে সুন্দর নরম মনটা এই চিঠির ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাচ্ছে সেই মনট বেঁচে আছেনা পাণ্ডিত্যের চাপে শুকিয়ে গেছে। ওর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি শুনছি আর ভয় পাচ্ছি আমি। আমি জানি বিদ্যার গুরুভারে মানুষ পিষ্ট হয়ে যায়। আমার বাবাও বলতেন, “বিদ্যা আমাদের অনেকেরই পিঠের বোঝা, ভাবাহী জন্তুর মতো আমরা চলেছি, একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই দেখেছি বিদ্যা তার রক্তে চলে গিয়ে দুদিকে পাখা গজিয়ে দিয়েছে, ঐ বিদ্যাই তাকে লঘুভার করে আকাশে ওড়াচ্ছে।”

যাবার সময় যত এগিয়ে আসছে—আমি বুঝতে পারছি না হঠাৎ কোথা থেকে এ আবর্ত এসে এই জীবননদীর মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে, কি এর উদ্দেশ্য, কি-ই বা পরিণাম!

আমার স্বামী আমাকে আশ্বাস দিচ্ছেন, “তুমি নিশ্চিত জেনো তোমার জীবনে এতে কোনো সুফল ফলবে। এর কোনো উদ্দেশ্য আছে, আমাদের দুজনেরই লাভ হবে।”

“তোমার আবার কি লাভ হবে!”

লাভ হবে না? লাভ তো হচ্ছে। আমি শুধু নয় আমরা সকলে তাকে আরো চিনছি, আমরা তাকে ভক্তি করছি। উনিও নিজেকে চিনছেন। কতটা ভালোবাসা, কতটা ধৈর্য, কতটা নিরভিমান হতে পারেন তার পরীক্ষা দিচ্ছেন, এবং অবলীলাক্রমে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছেন। আমি মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের একটা সাধারণ সংসারের মধ্যে বসে আমার স্বামী যা হয়েছেন ঋষিকেশের ঐ গুহায় বসে সেই জজসাহেব মৌনী সাধু তা হতে পারলেন কিনা!

আমি স্বপ্নাচ্ছন্নের মত কাজগুলো করে যাচ্ছি। যে সমস্ত নিমন্ত্রণ পেয়েছি তার জন্য লেখা লিখছি, বৈষয়িক কাজগুলো সবই করে যাচ্ছি কিন্তু এ সমস্তে স্পৃহাশূন্য আমার মন, ভাবাবিষ্ট। এই কথাটা লেখবার জন্যই এই কলম ধরেছি, বাল্যকালে কি হয়েছিল তা লেখবার জন্য নয়। কারণ বাল্যপ্রণয় ও মধ্যপথে তার অকস্মাৎ অপঘাতমৃত্যু কোনো বিশেষ ঘটনা নয়, এরকম সর্বদাই হয়েছে, হচ্ছে, হবে। বহু লোক লিখে গিয়েছে অনেক জোরালো কলমে। আমি লিখছি বেয়াল্লিশ বছর পরে যা ঘটল সেই বিশেষ ঘটনাটার জন্য, কারণ এ এক বিস্ময়কর ঘটনা, হয়ত বা অভূতপূর্ব। মুশকিলও হয়েছে অভূতপূর্ব বলেই—এ ভাব প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই—যা বলতে চাইছি বলা হচ্ছে না। বাক্যগুলি যেন নিপ্রাণ ছায়ামাত্র—আমার অনুভূতিকে ধারণ করবার অযোগ্য।

মির্চার বিষয়ে নূতন করে মনে পড়বার প্রায় বছর খানেক আগে থেকেই অর্থাৎ সেরগেই আসার আগে থেকেই আমি আমার ভিতরে একটা অদ্ভুত ব্যাকুলতা অনুভব করেছিলাম সেকথা আগেই বলেছি—সেই ব্যাকুলতার তীব্রতা আমি বোঝাতে পারছি না। মনের ভিতর সেই গানটার সুর ভেসে আসত-“আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী”—আমার এই ভাব কেবল সুরেই প্রকাশ্য। আবার চঞ্চলতা এতদূর হয়েছিল যে আমি একে ওকে তাকে বলতাম, “আমি দেশের বাইরে যাব, কোথাও যাব, একটু ব্যবস্থা করা যায় না?” আমাদের একজন সহকর্মী আছেন পাদ্রী, তাঁর অনেক জানাশোনা, তাকে ধরে পড়তাম বার বার—“আমায় একটু বাইরে কোথাও যাবার ব্যবস্থা করে দিন।”

“কোথায় যেতে চান?”

“যে কোনো জায়গায় দেশের বাইরে—”

“কেন, এদেশ দোষটা করল কি?”

আমি মুখ ভার করতাম। এ ব্যক্তি করে দেবে না।

“আচ্ছা আচ্ছা ব্যবস্থা করা যাবে, তা কোথায় যেতে চান তা তো বলবেন?”

“জাপানে, আমেরিকায়, ইংল্যাণ্ডে—যে কোন জায়গায়।”

ভদ্রলোক আমায় লক্ষ্য করছেন, “you are an amazing woman.”

এই ব্যাকুলতা যেন চন্দ্রোদয়ে চঞ্চল সমুদ্রের মতো, যেন কোন অজ্ঞাত শক্তি বহুদূর থেকে আমাকে আহ্বান করছে। আমার বন্ধন খুলে দিচ্ছে—

‘দিগন্ত হতে শুনি তব সুর, মাটি ভেদ করি ওঠে অঙ্কুর।
কারাগারে লাগে নাড়া।’

আমার কারাগার ভাঙবে, মির্চা তার নিমিত্ত মাত্র। কিসের কারাগার? এই জগক্টাকে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যে রকম চিনেছি, জেনেছি এবং যে জানাটাকে ধ্রুব বলে মেনেছি, সেই মূঢ় বিশ্বাসের কারাগার। আমি জানি অল্প কয়েক দিনই আমার এ ভাবটা থাকবে, চিরদিন থাকতে পারে না, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য হলেও সেই কারাগারটা আমার পক্ষে ভাঙলো, আমি মহাকালের এক আশ্চর্য রূপ দেখতে পেলাম। আমি অন্য কোনো অবস্থানে উন্নীত হয়ে দেখলাম যাকে আমরা অতীত বলে ভাবছি, প্রকৃতপক্ষে তা অতীত নয়, তা কোথাও চলে যায় নি। তার আদিও নেই, মধ্যও নেই, অন্তও নেই। ‘নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং, পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ এ দেখে লাভ কি হল? আমি আকূল হয়ে জিজ্ঞাসা করি যদি কোনো ঈশ্বর থাকো তো বল, লাভ কি হল আমার? কিন্তু উত্তর তো আমিই জানি, লাভ লোকসানের কথার তো খতিয়ান এখানে হবার নয়। এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার কোন সার্থকতা নেই বাস্তব জীবনে, অথচ সেই অবান্তর অনর্থক ঘটনাগুলি দিয়েই মানুষের জগন্টা তৈরী, পশুর নয়। এই আট মাস ধরে আমি অন্তত এটুকু বুঝতে পারলাম—আমি পশু নয়, আমি মানুষ, বিশ্বরূপ দেখবার অধিকার আমার আছে।

মহাকাল আমাকে কোলে তুলে নিয়ে নৃত্য করছেন, তার জটার বাধন খুলে আমার চোখমুখ সর্বশরীর আবৃত করছে। আমার অগ্রপশ্চাত, পূর্ব পশ্চিম, দূর ও নিকটে এক হয়ে গেছে, আমার কারাগার চুরমার হয়ে গেছে, লজ্জা, ভয় আত্মীয়-স্বজনের বন্ধন সব ঝরে পড়ে গেছে। শুধু প্রেম, কালজয়ী প্রেম ঐ উজ্জ্বল নীলাকাশে ধ্রুবতারার মত আমায় পথের নির্দেশ দিচ্ছে। আমাকে মহাসমুদ্র পার করে নিয়ে যাবে।

এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমার ইচ্ছা হল আমার স্বামীকে প্রণাম করব। তার ভালোবাসার স্নিগ্ধ বাতাস আমাকে ঘিরে আছে, আমার শরীর মন জুড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এখানে প্রণাম করা যাবে না। উনি অপ্রস্তুত হবেন। তাই আস্তে আস্তে বললাম “সারা জীবন তুমি আমায় এত স্বাধীনতা দিয়েছ।” উনি একটু একটু হাসছেন “তোমার স্বাধীনতা কি আমার পকেটে থাকে যে মাঝে মাঝে বের করে দেব? তোমার স্বাধীনতা তোমারই বস্তু।”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত