| 17 এপ্রিল 2024
Categories
রাজনীতি সময়ের ডায়েরি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর অবদান

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

নরেন্দ্র মোদী “মুসলিম” বাংলাদেশে গিয়ে বলে এসেছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সত্যাগ্রহ করেছিলেন, এবং জেলে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। মিডিয়া এই নিয়ে স্তবস্তুতি শুরু করে দিয়েছে যথারীতি। নরেন্দ্র মোদী এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক।

ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা যাক। অবশ্য ভোটের বাজারে এসব ইতিহাসের কথা আর কে পড়ে! মহান মোদী এবং মধু মিডিয়া যাহা বলিবেন, সত্য বলিবেন। সত্য বই মিথ্যা বলিবেন না। ভগবান সহায়।

আর এক সংঘী নেতা — শেষাদ্রি চারী — তিনিও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আরএসএসের অবদানের কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি আংশিক সত্য বলেছেন। পুরোটা বলেন নি। আমি বলছি।

শেষাদ্রি চারী আরএসএসের পুরোনো নীতিনিষ্ঠ নেতাদের মধ্যে একজন। সে যুগ আর নেই। সেই ভাউরাও দেওরাস, নানাজী দেশমুখ, রাজেন্দ্র সিং বা দত্তপন্থ ঠেঙ্গাড়ির যুগ। যখন আরএসএস মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসী অর্থনীতির সমালোচনা করতো, আর স্বদেশী অর্থনীতির কথা বলতো। যে আরএসএসে ফুটবল ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ ছিল। গুজরাট ক্রিকেট এসোসিয়েশন আইপিএল’এ নাম লেখায়নি। নাগপুরে স্টেডিয়াম তৈরী হয়নি।

সে ছিল এক যুগ, যখন কালো টাকায় ঘোড়া কেনাবেচা হতোনা, আর রক্তাক্ত দাঙ্গাকে রথযাত্রা নাম দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা হতোনা। যখন গুণ্ডাবাহিনী মোটরবাইক চড়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়াতো না। রামনবমীতে কলকাতার বুকে তলোয়ার নিয়ে মিছিল হতোনা। যখন মেয়েদের ধর্ষণ ও হত্যাকে আরএসএস বাহিনী জাস্টিফাই করার চেষ্টা করতোনা। যখন নাথুরাম গডসের নাম বললে আরএসএস জনসঙ্ঘ হিন্দু মহাসভার লোকেরা লজ্জায় চোখ ঢাকতো, আড়ালে।

সেই সময়ে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, অকল্পনীয় রক্তক্ষয়, বাঙালি মেয়েদের গণধর্ষণ, এবং তারপর ভারতের ইন্দিরা গান্ধী সরকার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজবাদী সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ। যে লড়াই পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে শুরু করেছিল, তার শেষ হলো ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মধ্যে দিয়ে।

সেই সময়ে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নিয়ে কখনো ভাবেনি। তীব্র বাঙালিত্বই ছিল রক্তের শিরায় শিরায়।

আরএসএস যেটা কখনো বলবেনা, তা হলো তারা কোনোদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে দেখেনি। দেখেছে কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদের পাকিস্তান-বিরোধী ধর্মযুদ্ধ হিসেবে। সেই যুদ্ধে পাকিস্তানকে হারানো এবং হিউমিলিয়েট করাই তাদের একমাত্র আদর্শগত লক্ষ্য ছিল। তারই স্ট্র্যাটেজি হিসেবে তারা ইন্দিরা গান্ধীকে সে যুদ্ধে সমর্থন করেছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর মাধ্যমে। বাজপেয়ী সে সময়ে ইন্দিরাকে সমস্ত ভারতবাসীর দেশনেত্রী বলেছিলেন। এতে জনসঙ্ঘ একটু মাইলেজ পেয়েছিলো।

আরএসেএসে দীর্ঘকাল কাটিয়েছি। কখনো কোনো মিটিঙে, কোনো অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের কথা শুনিনি। একুশে ফেব্রুয়ারীর কথা শুনিনি। রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতের কথা শুনিনি। কখনো শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনের কথা শুনিনি। শুধু মাঝে মাঝে শুনেছি হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের কথা। এটাই আরএসএস ও তার নানা সংগঠনের একমাত্র ফোকাস — চিরকাল ছিল। আর কিচ্ছু নয়। পূর্ব পাকিস্তান মানেই হিন্দু নিধন। পূর্ব পাকিস্তান মানেই মুসলমান।

আরএসএস কখনো পাকিস্তানকে মদত দেওয়া মার্কিন সরকারের সমালোচনা করেনি, তাদের ঘাতক মিলিটারির সমালোচনা করেনি। সেই একই সময়ে নিকসন ও কিসিঞ্জারের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বর্বরতার বিরুদ্ধে, চিলিতে, ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যার বিরুদ্ধে আরএসএস কখনো কোনো অবস্থান নেয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সিআইএর গোপন খেলাকে আরএসএস ও জনসঙ্ঘ কখনো উল্লেখ করেনি। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশকে যখন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম স্বীকৃতি দেয়, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে, তখন জনসঙ্ঘ একটাও মার্কিন-বিরোধী কথা বলেনি। বলে থাকলেও তা একেবারেই মৃদু, প্রায় অনুচ্চারিত।

সে সময়ে সারা ভারতে যখন বাংলাদেশের যুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে বিরাট হাওয়া উঠেছে, তখন সেই হাওয়াতে পাল তুলে নৌকো ভাসানোর জন্যে সঙ্ঘ পরিবার এখানে ওখানে কিছু প্রতীকী অনশন, মিটিং করেছিল — যাকে তারা বলে “সত্যাগ্রহ।” সে শব্দটাও গান্ধী, জয়প্রকাশের থেকে ধার করা। সত্যের প্রতি হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রহ, আর অমিত শাহের আম্বানি-বিদ্বেষ সমার্থক। দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইত্যাদি যেসব জায়গায় আরএসএস ও জনসঙ্ঘ সে সময়ে একটু শক্তিশালী ছিল, সেসব জায়গায় কিছু মিছিল করেছিল। আমাদের জন্যে পশ্চিমবঙ্গেও ডাক এসেছিলো একটু একটু মনে পড়ছে। কিন্তু ওই যে বললাম, একেবারেই প্রতীকী।

হতে পারে, তার কোনোটাতে নরেন্দ্র মোদী অংশগ্রহণ করেছিলেন। যদিও হঠাৎ সেই আন্দোলনের জন্যে তাঁদের গ্রেফতার করা হবে কেন, এবং জেল হবে কেন, তা একেবারেই দুর্বোধ্য। জেলের রেকর্ড দেখা যেতে পারে।

এমনকি যদি শেষাদ্রি চারীর কথা অনুযায়ী ধরে নেওয়া যায় তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন, কিন্তু জেলে কতক্ষণ কাটিয়েছিলেন এই “অপরাধের” জন্যে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মানুষ জানতে চাইতেই পারে। প্রতীকী প্রতিবাদের, প্রতীকী “সত্যাগ্রহের” জন্যে প্রতীকী জেল’ই হয়। অন্য কিছু হয়না। আমরা রাজনীতি করেছি বহুকাল ভারতে ও বাংলায়। আমরা জানি।

কিন্তু আরএসএস ও জনসঙ্ঘ কখনোই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে দেখেনি। দেখেছে পাকিস্তান-বিরোধী হিন্দুত্ব হাওয়া তোলার রাজনীতি হিসেবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তারা কোনোদিন হিন্দু মুসলমানের মিলিত শক্তির মহান, ধর্মনিরপেক্ষ, ঐতিহাসিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেনি। দেখেছে হিন্দুনিধন হিসেবে। একাত্তরের বাংলাদেশে মার্কিন সরকার-সমর্থিত পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার আলবদরদের গণহত্যা ও গণধর্ষণ আরএসএস, জনসঙ্ঘ ও আজকের বিজেপির কাছে কেবলমাত্র “হিন্দু গণহত্যা।” আর কিচ্ছু নয়।

সেই মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিব কোনোদিনও তাদের স্বীকৃত নেতা ছিলেন না। আমি আমার প্রায় কুড়ি বছরের আরএসএস জীবনে কোনোদিন মুজিবের নাম শুনিনি।

শেষাদ্রি চারী তাই অনেক কথাই বলেননি। ঠিক যেমন নরেন্দ্র মোদী এখন বলছেন না। মিডিয়াও চ্যালেঞ্জ করছে না।

যেমন চ্যালেঞ্জ করছে না ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে। করলে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়তো।

কিন্তু ভোটের সময়ে ঝুলির বেড়ালকে কেউ পছন্দ করেনা। মহান মোদীও না। মধু মিডিয়াও নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত