নার্গিস

 

নার্গিস জানের যে কত বয়স তা তিনি নিজেও জানেন না।ভোটার কার্ডকে সত্যি বলে মানলে চুরানব্বই পেরিয়ে পঁচানব্বইএ পরেছেন।যারা চেনে তারা বলে একশোর এক দিনও কম নয়।বুড়ির বয়সের গাছ পাথর নেই।নার্গিস জান বয়সের পরোয়া কবেই বা করেছেন।

পুরনো লক্ষনৌর এক প্রান্তে নার্গিস জানের মহল,এখন কালের আঘাতে জরাজীর্ণ। নীচের মহলে সামনের দিকে কয়েকটি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে।পেছন দিকে দুঘর ভাড়াটে।উপরতলায় নার্গিস জান থাকেন,সাথে দিনরাতের কাজের লোক সুরাতিয়া।সুরাতিয়ারও বয়স নাই নাই করে ষাটের কম হবে না।সেই কোন ছোট বেলায় এই বাড়িতে এসেছিলো সে।তখন নার্গিস জানের কত রমরমা,তেমনি রোয়াব।কত মান, কত আদর,সুরাতিয়ার নিজ চোখে দেখা।আজ সেই রামও নেই,সেই অযোধ্যাও নেই।সারাজীবন নার্গিস জান তো কম উপার্জন করেননি।কিন্তু কিছুই রাখেননি।দু’হাতে উড়িয়েছেন।খয়রাতেরও তো কমতি ছিল না।এখন নার্গিস জান এক বিস্মৃত অধ্যায়।পুরোন মানুষ যে দু চারজন বেঁচে বর্তে আছে,এখনও এক বাক্যে স্বীকার করে,গানের গলা ছিল বটে নার্গিস জানের।আর রূপ?সে যে কি চোখ ধাঁধানো রূপ ছিলো,সুরাতিয়ার নিজের চোখে দেখা।সারা লক্ষনৌ শহর নার্গিস জানের পায়ের কাছে হত্যে দিত।সেই সময়গুলো ছিলো বটে।

আজ সেই রমরমা,চাকচিক্য কিছুই নেই।কিন্তু নার্গিস জানের রাজকিয় মেজাজটা আছে ষোলোআনা।এখনও এক নম্বর তামাক ছাড়া তার রোচে না।সেই তামাক নিজে হাতে সাজেন।আর কারও সাজা গড়গড়া মুখে তোলেন না এখনো।রোজ স্নানের আগে সারা গায়ে মালিশ করে দেয় সুরাতিয়া।গায়ের রঙ এখনও যেন ফেটে পরছে বাইজানের।গায়ের চামড়া থেকে যেন আলো ঠিকরোয়।এই বয়সেও মেঘের মত ঘন শুভ্রকেশরাজি।বেসভূষার পারিপাট্য এখনও দেখার মত।স্নানের পর বেশ কিছুটা সময় তিনি ঘরের দেওয়ালজোড়া আয়নাটার সামনে কাটান।নিজের ছায়াবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকেন অপলক।এই সময়টায় নানা রকম অভিব্যক্তি খেলা করে তার চেহারায়।এটা সুরাতিয়া সেই ছোট থেকে দেখে আসছে।আগে তো ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন এই আয়নার সামনে।এখন আর অতক্ষন পারেন না।সুরাতিয়া ধরে শুইয়ে দেয় জাজিমে।

সুরাতিয়ার আজকাল খুব চিন্তা হয়।আল্লার রহমতে নার্গিস জান যেন আরও একশ বছর বাঁচেন।নইলে সুরাতিয়ার কি হবে?কোথায় যাবে সে।ঘর তো হয়নি তার।সেই শিশুকাল থেকে এই মহলই তার আশ্রয়।আর তো কোন ঠিকানা,কোন আপনজন নেই তার।প্রভু বললে প্রভু,মা বললে মা,সবই নার্গিস জান।দুজন একা মানুষ একে অন্যের পরিপূরক।সন্ধ্যের পর নার্গিস জান একটু আফিম খান দুধের সাথে।সেই সময় তার মনের আগল খুলে যায়।অনেক কথা বলেন সুরাতিয়ার সাথে।সেই যৌবনকালে কত পুরুষ,নবাব,জমিদার নার্গিসজানের পায়ে জান কবুল করতো।সুরাতিয়ার খুব জানতে ইচ্ছে হয়,কাউকে কোনদিন মনে ধরেনি নার্গিস জানের?

নার্গিস জান হাসেন।হাসির দমকে দুলে দুলে ওঠে তাঁর সমস্ত দেহ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দেন,ভালোবাসতাম কি রে বুরবাক আওরত?এখনও তো বাসি।যতদিন সে আছে,আমিও আছি।সে না থাকলে আমিও নেই।
সুরাতিয়া একটু সাহস করে ফেলে।জিজ্ঞাসা করে,কে সে?কোন নবাব,জমিদার?নার্গিস জান আবার হাসতে শুরু করেন।হাসতে হাসতে গান ধরেন,’দিল-এ-নাদান তুঝে হুয়া কেয়া হ্যায়’।সুরাতিয়া উঠে যায় ধীরে ধীরে,নিঃশব্দে।যাওয়ার আগে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যায়।

সেদিনও এমনিই উঠে গিয়েছিল সুরাতিয়া। ঘন্টাখানেক পরে নার্গিস জানের ঘর থেকে ঘন্টা বাজানোর শব্দ শুনে ছুটে যায়।এখনো জেগে আছেন তিনি?এর অনেক আগেই তো অন্যদিন ঘুমিয়ে পরেন।সুরাতিয়া অবাক হয়।ঘরে ঢুকে দেখে,নার্গিস জান তাকিয়ায় ভর দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় বসে।সুরাতিয়াকে কাছে ডাকেন।মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,’উকিল সাহাবকে সব বলা আছে।এই বাড়ি তোর নামে করে দিয়েছি।তোর কোন চিন্তা নেই।’

সুরাতিয়া কেঁদে ফেলে।’এসব কেন বলছ?তোমার পায়ের কাছে সারা জীবন কাটিয়ে দেব আমি।’
নার্গিস জান হাসেন,’পাগল অওরাত’।তারপর বলেন,’ আমাকে ধরে একটু আয়নার সামনে নিয়ে চল।’সুরাতিয়া তাঁকে ধরে আয়নার সামনে কুরসিতে বসিয়ে দেয়।নার্গিস জান হাত নাড়িয়ে ইশারা করেন তাকে ঘর ছেড়ে যাবার জন্য।সুরাতিয়া বেরিয়ে যায়।কিন্তু ধরে আবার বিছানায় শুয়ে না দিলে তো তিনি শুতেও পারবেন না।সুরাতিয়া ঠায় বসে থাকে দরজার বাইরে,নার্গিস জানের ডাকের অপেক্ষায়।এক সময় তার চোখ লেগে আসে।

মাঝ রাতে ধরমরিয়ে উঠে বসে সুরাতিয়া।বাই জানকে তো বিছানায় শোয়ানো হয় নি।ছুটে ঘরে ঢোকে সে।নার্গিস জান তাঁর কুরসিতে বসে আছেন রাজেন্দ্রানীর মত।মুখে অনাবিল প্রশান্তির হাসি।নিজের ছায়ার দিকে চেয়ে আছেন একভাবে।সুরাতিয়া তাঁর কাঁধে হাত রাখতেই এক দিকে এলিয়ে যায় নার্গিস জানের প্রাণহীন দেহ।সুরাতিয়া তাঁকিয়ে থাকে।সে আজ এইমূহুর্তে কাঁদতেও ভুলে যায়।আয়নায় তাকিয়ে দেখে বাইজানের প্রানহীন দেহের প্রতিবিম্ব।এই তবে বাইজানের মনের মানুষ?অট্টহাসিতে ফেটে পরে সুরাতিয়া, ঠিক পরের মূহুর্তেই নার্গিস জানের প্রাণহীন দেহকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।এই কান্না তার ফুরোবার নয়।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত