গীতরঙ্গ: এ কোন সোনার গাঁয় । সংগ্রামী লাহিড়ী

Reading Time: 5 minutes

পুরোনো বালিগঞ্জের বাড়িতে দোতলায় ইজিচেয়ারে আধশোয়া স্বর্ণকুমারী দেবী। কাঠের সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ। মেয়ে সরলাসরলা দেবী ফিরলেন ঢাকা থেকে। উঠে বসলেন স্বর্ণকুমারী। ধবধবে সাদা লম্বা চুলের গোছা মাটি ছুঁল। আরো একটা পায়ের আওয়াজ। একজন তো নয়দুজন উঠে আসছে সিঁড়ি বেয়ে।

সরলা এসে ঢুকলেন ঘরে। সঙ্গে একটি ছিপছিপে কিশোরী মেয়ে।

এই দ্যাখোমিসেস দে বলেছিলেনঢাকা যাচ্ছকানাইবাঁশি কলা নিয়ে এস। তা কানাইবাঁশি কলার বদলে কানাইবাঁশি গলা নিয়ে এলুম।” বলে মেয়েটিকে দেখালেন।

ওর নাম রানুরানু সোম।” পরিচয় করালেন।

রানুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার মাপ্রণাম করো। স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম জানো?”

রানু তখন অপলকে তাকিয়ে আছে সেই আশ্চর্য রূপলাবণ্যবতী বৃদ্ধার দিকে। এই সেই বিখ্যাত লেখিকা স্বর্ণকুমারী দেবীরবীন্দ্রনাথের দিদি?

সরলা দেবী হীরে চিনতে ভুল করেননি। ঢাকায় যদিও কানাইবাঁশি গলার অভাব ছিল নাকিন্তু রানুর প্রতিভা সত্যিই বিস্ময়কর।

ঢাকা শহর বরাবরই দুটি কারণে উত্তালএক সংগীতআর দুই রাজনীতি। তখন ইংরেজ রাজস্বদেশী আন্দোলন তুঙ্গে। সরলা দেবী সেসময় ঢাকায়। নানা জায়গায় সভা করে বেড়াচ্ছেন। সেই সঙ্গে খুঁজছেন গানের গলা। বীরাষ্টমী ব্রত করবেন। তাতে অভিনয় হবে রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা। এমনই একটি স্বদেশীসভায় উদ্বোধনী সংগীত গেয়ে তাঁর নজরে পড়ল রানু।

ঢাকার বনগ্রাম অঞ্চলে তাদের বাসা‘, অর্থাৎ ভাড়াবাড়ি। তার মিষ্টিসুরেলা গলার গানে অনেকেই মুগ্ধ। ততদিনে রানুর দুয়েকখানা রেকর্ডও বেরিয়েছে। তার গলায় গাওয়া লখনৌনিবাসী অতুলপ্রসাদ সেনের নিদ নাহি আঁখি পাতে‘ গানটি কিঞ্চিৎ বিখ্যাতও হয়েছে।

সদ্য তখন চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ঘটনা ঘটেছে। সে ঘটনার অন্যতম নায়ক অনন্ত সিং ধরা পড়েছেন। ফাঁসির হুকুম হয়েছে। ঢাকা শহর উত্তেজনায় ফুটছে। ফাঁসি রদ করার জন্যে মামলা চলছেটাকা চাই। রানু গান গেয়ে গেয়ে টাকা তুলতে সাহায্য করছে। ঢাকার নবাববাড়িতে বেগম গান শুনে প্রশংসা করলেননজরানা দিলেন। নানা সভাসমিতিতে গান শুনিয়ে ভালোই টাকা উঠছে। শেষে অনন্ত সিংয়ের দিদির হাতে দশ হাজার টাকা তুলে দেওয়া গেল। রানুর গাওয়া সার্থক।

ঢাকা শহরে সেসময় নক্ষত্রসমাবেশ। রমনা পাড়ায় থাকেন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তাঁর বাড়িতে অতিথি এসেছেন। যে সে লোক ননখোদ ডি এল রায়ের পুত্র দিলীপকুমারদিলীপকুমার রায়। অপূর্ব দেবকান্তি চেহারাসাহিত্যসংগীতে অনায়াস বিচরণ। গলার মডুলেশন দিয়ে গানের ভাবটিকে কেমন করে প্রকাশ করতে হয়তিনিই তা দেখালেন। ভয়েস কন্ট্রোল শ্রোতারা তাঁর গানেই প্রথম শুনল।

রমনার বাড়িতে গানের আসর বসল। সংগীতের সুধা অকৃপণ বিলোলেন দিলীপকুমার। শ্রোতারা মুগ্ধ। সে আসরে রানুর গান শুনে দিলীপকুমারও মুগ্ধ। প্রতিদিন রমনা থেকে ঢাকার বনগ্রামে আসেন রানুকে শেখাতে। বাংলা গান রানু বেশি জানে না। ডি এল রায়অতুলপ্রসাদের গান শেখান তাকেনিজের তৈরী করা গানও শেখান। তবে রানুর সবচেয়ে ভালো লাগে কাজি নজরুল ইসলামের গান। একেবারে অন্য জাতের গানঅন্য ধরণের কথা। পারস্য দেশের গোলাপবাগানের সুরভি ভাসে তাঁর গানেগেয়ে ওঠে বুলবুল। ছোট ছোট মুড়কি আর অলংকারের সাজে সেজে ওঠে অপরূপ গীতিকবিতা। নিরজনে সখি বোলো বঁধুয়ারে। এ এক অনাস্বাদিত অনুভূতি। সুধাসাগরতীরে যেন রানুর হাতটি ধরে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিলেন দিলীপকুমার। রানুর জীবন ধন্য।

একদিন দিলীপকুমার ফিরে গেলেন কলকাতায়। বিরস দিনবিবশ কাজ‘, সময় যেন থমকে থেমে গেছে কিশোরী রানুর জীবনে। নতুন নতুন গান শেখা নেইগানের আসর নেই। মন খারাপ করে থাকে সে।

ততদিনে তারা বনগ্রাম ছেড়ে ওয়ারীতে বাসা‘ নিয়েছে। হঠাৎ এক বিকেলে বুক ধড়াস করে উঠল। রাস্তায় এসে থেমেছে একটি ফিটন গাড়ি। যে ভদ্রলোকটি নামে বাড়ি খুঁজছেনতিনি আর পাঁচটা গড়পড়তা লোকের থেকে একেবারেই আলাদা। স্বাস্থ্যবান দেহে উজ্জ্বল কমলা পোশাক। চাদর লুটোচ্ছে মাটিতে। একমাথা এলোমেলো চুলে গান্ধীটুপি। সর্বাঙ্গে প্রবল পৌরুষের দীপ্তি। বিশাল আয়ত নয়ন। সে এক আবির্ভাব বটে!

রানু দরজা খুলে দিল।

একমুখ হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমিই তো রানুমন্টুর ছাত্রী?”

মন্টু দিলীপকুমারের ডাকনাম।

রানুকে প্রায় ঠেলেই ঢুকে এলেন ঘরেযেন বন্ধনহীন ঝর্ণা। প্রাণশক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজের চারপাশে।

আমি নজরুল ইসলাম।

সেই কমলাগেরুয়াবেশধারী প্রবল পুরুষটির অট্টহাস্যে চারদিক কাঁপে। তাঁর বাঁশির সুরে আনন্দধারা বয়ে যায় ভুবনে। প্রবল উৎসাহের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যান চারপাশের মানুষকে। সময়ের সঙ্গে বাঁচেন নজরুল। যুদ্ধফেরত সৈনিকজেল খেটেছেনঅনশন করেছেন।

ঢাকায় এসে উঠেছেন বাল্যবন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িবর্ধমান হাউসে। ওয়ারীর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছেন রানুর খোঁজে। দিলীপকুমারের কাছে শুনেছেন তার গানের কথা। ব্যাসআর যায় কোথায়ঢাকায় এসেই আগে রানুর খোঁজ। গান শুনতে হবে। মন্টু তাঁকে বলেছেসে নাকি নজরুলের গান এত সুন্দর করে গায় যে তার জন্যেই নজরুল ঢাকায় বিখ্যাত হয়ে গেছেন!

রানু তো থ। তার বাবামা বাক্যহারাএই নজরুলের গানে তখন আমজনতা পাগল! “কে বিদেশী বন উদাসী” গান লোকের মুখে মুখে ফেরে! “দুর্গম গিরি কান্তার মরু” গাইতে গাইতে ছেলেরা ইংরেজ রাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে।

সে কথা বলতেই ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠলেন।

পরদিন তখনো ভালো করে সকাল হয়নি। অধৈর্য তিনি এসেই হারমোনিয়াম আর পানের বাটা নিয়ে বসে পড়লেন, “তাড়াতাড়ি সুরটা তুলে নাওনইলে ভুলে যাব।

নতুন এক গান বেঁধেছেন তিনিযা পরে তুমুল জনপ্রিয় হবে।

আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরীএ কোন সোনার গাঁয়।

আমার ভাটির তরী আবার কেন উজান যেতে চায়।“

গানের সঞ্চারীতে এসে গাইছেন,

তুমি কে এলে মোর সুরের সাথী গানের কিনারায়।

ওগো সোনার দেশের সোনার মেয়েতুমি হবে কি মোর তরীর নেয়ে,

এবার ভাঙ্গা তরী চল বেয়ে রাঙা অলকায়।“

রানু শিহরিতসোনার কাঠির ছোঁয়ায় প্রাণ জাগছে। গানের আলোয় নিজেকে চিনছে সে। জীবনে শুরু হল এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

রোজই সকাল সকাল হাঁটতে হাঁটতে নজরুল চলে আসেন রানুর বাড়ি। আসার পথেই গান বাঁধা হয়। সেই গান রানুর গলায় আগে তুলিয়ে তবে শান্তি। সুর ভুলে যান যদিএকের পর এক নতুন গানশিক্ষা। বাংলার মধ্যে সুকৌশলে উর্দু ভাষা মিশিয়ে দেন তিনি। নিয়ে আসেন গজল গানের সুর। রানুর কাছে এ এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের স্রোতগানের স্রোত বয়ে চলে। স্বপ্নের দিনগুলি পাখির মত হালকা ডানা মেলে ওড়ে।


রানু সোম ও তাঁর মা সরযূবালার সঙ্গে নজরুল; PC: Internet

রানু কানাঘুষোয় জানতে পারেনজরুল নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবিনী ছাত্রী ফজিলতুন্নেসার প্রতি অনুরক্ত। সে শুনেছে, ‘নিরজনে সখি বোলো বঁধুয়ারে‘ গানটি নাকি ফজিলতুন্নেসার প্রতি নজরুলের প্রেমনিবেদন।

ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র নজরুলকে বড়োই প্রীতি করেন। তাঁর বড় কন্যা নোটন মৈত্ররানুর প্রিয় নোটনদিও নাকি নজরুলের প্রণয়প্রত্যাশী। ঢাকার মত শহরে খবর হাওয়ায় ওড়েরানুর কানে আসে সবই।

সেবার অল্পদিনের জন্যে এসেও নজরুল অনেকদিন রইলেন ঢাকায়। রানুর বাড়িরই একজন হয়ে। তারপর কলকাতায় ফেরা। রানুকেও আসতে হল। গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছেবছরে ছখানা করে গান রেকর্ড করবে সে।

নজরুল বললেন, “আমার গান গাও।

সে তো বটেই। নজরুলের গানেই তার সিদ্ধি। রানুর ভালো নাম প্রতিভা। রেকর্ডে প্রতিভা সোমের গাওয়া নজরুলগীতিগুলি অসম্ভব জনপ্রিয়। কাগজে কাগজে গায়িকা আর গানের প্রশংসা।

আনন্দের দিন একসময় শেষরানুর ঢাকায় ফেরার সময় হল। মিলনমেলা ভাঙল। ভেঙে গেল আরও অনেক কিছুই। রানুর চোখের সামনেই চেনা পৃথিবীটাতার মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। এক ঝটকায় বড় হয়ে গেল রানু। গভীর বেদনা লুকিয়ে তরুণী গায়িকা প্রতিভা সোম ঢাকা মেলএ উঠলসঙ্গে বাবামা।

এর কিছুদিন পর নজরুল আবার ঢাকায় এলেন। প্রতিভা সোমের বাড়িতে যথারীতি তাঁর অনেকখানি সময় কাটে। কলকাতায় ফিরতে দুদিন বাকি। সেদিন একটু রাতই হয়েছে প্রতিভার বাড়ি থেকে বেরোতে। নির্জন রাস্তায় নজরুল আক্রান্ত হলেন। একদল ছেলে তাঁকে লাঠি নিয়ে ঘিরে ধরেছে।

মাথায় লাঠির ঘানজরুল ক্ষণিকের জন্যে থতিয়ে গিয়েছিলেন। পরক্ষণেই যুদ্ধফেরতফৌজি মানুষটি সম্বিৎ ফিরে পেয়েছেন। লাঠি কেড়ে নিয়ে এমন পাল্টা মার মারলেন যে কাপুরুষের দল পালতে পথ পায় না। নজরুলও আহতরক্তাক্ত। সে রাতের ঘটনা যেন পূর্ণচন্দ্রের অনাবিল জ্যোৎস্নায় কালি ছিটিয়ে দিল। সোম পরিবার মর্মাহতলজ্জিত। দুঃখ আর অসম্মানের অশ্রুতে ভেসে গেলেন সবাই।

নজরুল স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে উড়িয়ে দিলেন, “আরে দূরওই শূকরসন্তানদের সঙ্গে আমি যুঝতে পারিচিন্তা নেই আপনাদের।

এর দুদিন পরেই নজরুল কলকাতায় চলে আসেন। প্রতিভা সোমের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সংখ্যা কমতে কমতে একসময় তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

জীবন কখনো কখনো গল্পকথাকেও হার মানায়। কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানি নজরুলের সৃষ্টিশীল সময়ের সিংহভাগ বন্দী করে ফেলে। তাদের জন্যে একের পর এক গান লিখছেন তখনশেখাচ্ছেন আঙুরবালাইন্দুবালাদের মত বিখ্যাত গায়িকাদেররেকর্ড বেরোচ্ছে তাঁর গানেরজনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছচ্ছে তাঁর সৃষ্টি। এমনই সময়ে জীবনসঙ্গিনী প্রমীলা এলেন ঘরে।

রানুর মনোহরণ করেন ঢাকার উজ্জ্বল ছাত্র ও কবি বুদ্ধদেব বসু। রানু সোম হারিয়ে গেলজন্ম নিল বুদ্ধদেবঘরণী প্রতিভা বসু। আশ্চর্য এই যে কিন্নরকন্ঠী গায়িকাটি সেই যে নিজেকে স্তব্ধ করে দিলআর কোনোদিনই সে গান গেয়ে ওঠেনি। ভুলেও না। পরবর্তীকালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রতিভা বসুর ছেলেমেয়েরা মনে করতে পারেন না কখনো মায়ের গান শুনেছেন বলে। আজকের এই ডিজিটাল মিডিয়ার যুগেও রানু সোমের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। তাঁর কণ্ঠের মূৰ্চ্ছনার সঙ্গে একালের আমাদের কোনো পরিচয়ই নেই। এককালের অসামান্য প্রতিভাময়ী ও জনপ্রিয় গায়িকা কেন যে নিজের গানের সব চিহ্নটুকু সযত্নে মুছে দিলেনকোন অভিমানে জীবনপাত্রের উছলে ওঠা মাধুরীকে ফেরালেনআমাদের কাছে তা অজানা।

অজানাই থেকে যাবে গভীর গোপনে কোনোদিন সুর গুনগুনিয়ে উঠেছে কিনা, “ভুলি কেমনেআজও যে মনেবেদনা সনেরহিল আঁকা।“

সঙ্গে রইল সেই গানটি, যা নজরুল বেঁধেছিলেন রানুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, আর কাকভোরে এসে হাজির হয়েছিলেন রানুর বাড়িতে, সে গান শেখাতে।



     

তথ্যসূত্র:

১.জীবনের জলছবি– প্রতিভা বসু ২.নজরুলমানস– সনজীদা খাতুন ৩.সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি– যোবায়দা মির্যা
   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>