পাবলো নেরুদার কবিতা

নেফতালি রিকার্ডো রেয়েস বাসোয়ালতো চিলির একজন রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক। কিন্তু এই পোশাকি পরিচয়ের বাইরে এই মানুষটি একজন জনপ্রিয় কবি। আর তাঁর কাব্যিক নাম বা বলতে পারেন ছদ্মনাম পাবলো নেরুদা। চেক কবি জ্যান নেরুদার কাছ থেকেই ধার নিয়েছিলেন নামটি। সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য ১৯৭১ সালে নোবেল পুরস্কার পান পাবলো নেরুদা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই, চিলির প্যারাল অঞ্চলে। আর মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। শক্তিমান এই কবির জন্মদিনে ইরাবতী পরিবারের শ্রদ্ধাঞ্জলি। পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো দুটি কবিতা- Don’t go far off ও A Dog has died -এর ভাষান্তর।


দূরে সরে যেও না

দূরে সরে যেও না, এমনকি একদিনের জন্যও না, কারণ-
কারণ- আমি জানি না কীভাবে তোমাকে বোঝাব : একটা দিন অনেক লম্বা
আর আমাকে তোমার অপেক্ষায় থাকতে হবে, যেমনটা একটা খালি ইষ্টিশানে
ট্রেনগুলো পার্ক করা থাকে অন্য জায়গায়, ঘুমন্ত।
আমাকে ছেড়ে যেও না, এমনকি এক ঘণ্টার জন্যও, কারণ
তখন ওই ছোট ছোট যন্ত্রণাগুলো সব একসাথে ভিড় করবে,
যে ধোঁয়ারা আশ্রয়ের খোঁজে উড়ে বেড়ায় তারা প্রবাহিত হবে
আমার ভেতর, শ্বাসরোধ করবে আমার নষ্ট হৃদয়।

ওহ, তোমার গাঢ় ছায়া যেন তীর থেকে মিশে না যায়,
তোমার চোখের মণি যেন ঝাপটানি না দেয় দূরে শূন্যে কোথাও।
এক সেকেন্ডের জন্যও আমাকে ছেড়ে যেওনা, আমার প্রিয়।
কারণ সেই মুহূর্তে তুমি চলে যাবে অনেক দূরে
আমি ধন্দের মতো সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব, জিজ্ঞেস করে বেড়াব,
তুমি কি ফিরে আসবে? নাকি ফেলে রেখে যাবে, মরার জন্য?

 

একটি কুকুর মারা গেছে

আমার কুকুরটা মারা গেছে।
আমি তাকে কবর দিয়েছি বাগানে
একটা জং পড়া পুরোনো মেশিনের পাশে।
কোন একদিন আমি তার সাথে গিয়ে যোগ হব ওইখানে
কিন্তু এখন সে চলে গেছে তার লোমশ শরীর,
তার বাজে আচরণ আর উদাসী নাক নিয়ে
আর আমি, এই জড়বাদী, যে কিনা কোনোদিন বিশ্বাস করেনি
আকাশের কোনো প্রতিশ্রুত স্বর্গে
যেখানে কোনো মানুষ যাবে,
আমি বিশ্বাস করি সেই স্বর্গে যেখানে আমি যাব না ।
হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি সমস্ত কুকুর প্রজাতির জন্য একটা স্বর্গ আছে
যেখানে আমার কুকুরটা আমার জন্য অপেক্ষা করে
তার বন্ধুত্বের পাখার মতো লেজ নাড়িয়ে।

আহ, আমি পৃথিবীতে বসে দুঃখের কথা বলব না,
সেই সঙ্গীকে হারানোর জন্য যে কিনা
কখনোই খুব একটা প্রভুভক্ত ছিল না।
তার বন্ধুত্ব ছিল আমার জন্য এমন, যেন একটা সজারু
তার সহজাত কর্তিতকে রোধ করছে,
ঠিক যেন একটা তারার সাথে বন্ধুত্ব, একান্তে,
প্রয়োজনের বেশি একটুও খাতির নেই,
কোনো রং চড়ানো নেই;
সে কোনোদিনও আমার গায়ের কাপড় বেয়ে উঠে
তার গায়ের লোম আর কিচ্ছু মাখিয়ে দেয়নি আমাকে,
সে কখনোই আমার হাঁটুতে শরীর ঘষেনি
যেমন অন্য কুকুর ঘষে কাম উত্তেজনায়।
না, আমার কুকুর শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকত,
আমার দিকে যতটুকু মনোযোগ দেওয়া দরকার দিত,
যে মনোযোগটা দেওয়া দরকার ছিল
আমার মতো একটা নিষ্ফল মানুষকে এটা বোঝাতে
যে, কুকুর হয়ে জন্মে, সে সময় নষ্ট করছে,
কিন্তু, আমার চেয়েও শুদ্ধ ওই চোখ দুটো দিয়ে
সে আমার দিকে তাকিয়েই থাকত
এমন একটা দৃষ্টিতে যেটা শুধু আমার একার জন্যই
বরাদ্দ রেখেছিল তার অমায়িক লোমশ এই জীবনে,
সব সময় আমার কাছে কাছে, কিন্তু কখনোই বিরক্ত করেনি,
আর কখনোই কিছুই চায়নি।

আহ, কতবার আমি তার লেজটার ঈর্ষা করেছি
নিঃসঙ্গ শীতে একসাথে হাঁটতে হাঁটতে
আইলা নেগ্রার সাগরতীরে
যেখানে শীতের পাখি আকাশ ছেয়ে ফেলত
আর আমার লোমশ কুকুরটা সাগরের নড়াচড়ার
সাথে তাল দিয়ে পূর্ণ উদ্যমে লাফাত
আমার ঘুরে বেড়ানো কুকুরটা, তার সোনালি
লেজ উচ্চে তুলে শুঁকে শুঁকে বেড়াত
সাগরের সব জল ঝাঁপটার মুখোমুখি।

আনন্দিত, আনন্দিত, আনন্দিত,
যেন শুধু কুকুর জানে কীভাবে সুখী হতে হয়
তাদের স্বশাসিত নির্লজ্জ আত্মা নিয়ে।
আমার মরে যাওয়া কুকুরটার জন্য কোনো বিদায় সম্ভাষণ নেই,
এবং আমরা শুধু এখন না, কখনোই নিজেদের মধ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেই নাই।
তো এখন সে আর নেই, এবং আমি তাকে কবর দিয়ে ফেলেছি
এই মুহূর্তে এর থেকে বেশি কিছু আর করার নেই।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত