| 15 এপ্রিল 2024
Categories
এই দিনে ফিচার্ড পোস্ট সময়ের ডায়েরি

নেতাজী: ভারতীয় অসমাপ্ত অধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

 

সৌমিত জয়দ্বীপ

অহিংসা বনাম সম্মুখ সমর! মোহনদাস গান্ধী দলবল নিয়ে রইলেন অহিংসার পথে। সুভাষ বসু ‘তবে একলা চলো রে’ বলে চললেন যুদ্ধ করতে। কখনও কখনও ইতিহাসের পাতায় এই চলাচলগুলো ‘আপোসকামী’ বনাম ‘ক্ষাত্রেয়’ হিসেবে লেখা হতে পারে। কোন এক বেদব্যাস এভাবে হয়তো লিখতেই পারেন ‘কুরুক্ষেত্রে’র কাহিনী!

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদার ডাকসাইটে উপাচার্য অধ্যাপক রমেশ চন্দ্র মজুমদার অধ্যাপক সমর গুহের ‘নেতাজীর স্বপ্ন ও সাধনা’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘গান্ধীজীর সত্যাগ্রহই যে আমাদের স্বাধীনতা লাভের একমাত্র কারণ—এটাকে জ্যামিতিক স্বতঃসিদ্ধ বলে এখন আর অনেকেই গ্রহণ করেত চান না। অপপ্রচারের ফলে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সম্বন্ধে যে সত্যটা চাপা পড়ে ছিল তা ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছে।… নেতাজীর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য চিরদিন ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক প্রধান স্থান লাভ করবে। গান্ধীজীর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে একে একে কংগ্রেসের সকল নেতাই নিজেদের বিচারবুদ্ধি গান্ধীজীর পাদপদ্মে বিসর্জন দিয়ে অন্ধ বিশ্বাসে তার নির্দেশমত চলেছিলেন। … এই যুগে কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে কেবল সুভাষচন্দ্র বসুই গান্ধীজীর প্রভাব অতিক্রম করে নিজের স্বাধীন মত ব্যক্ত করতে এবং গান্ধীজীর প্রদর্শিত পথে না চলে ভারতের মুক্তিলাভের অন্য উপায় নির্ধারণ করার সাহস ও শক্তি দেখিয়েছেন। কেবল উপায় নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত হননি, তার নির্ধারিত পথে অগ্রসর হয়েছেন। তার ডাক শুনে সেদিন আর কেউ আসেনি, — তবু তিনি একলাই চলেছেন।’

এই একলা চলা সুভাষ বসু সফল হতে পারেননি। চলে গেলেন। ফিরতে পারলেন না। ইতিহাস ব্যর্থদের মনে রাখে না। সত্যই কি তা-ই?

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর একটি ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়া যাক। সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। যশোরের জিকারগাছার বন্দিশিবিরে তখন অসংখ্য যুদ্ধবন্দিকে গোপনে আনা হয়েছে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে। যুদ্ধ শেষে এই বন্দিরাই স্লোগান তুললেন ‘নেতাজী জিন্দাবাদ’ ও আরও বেশ কিছু স্লোগান। এর আগে, সংবাদপত্রের ওপর যুদ্ধকালীন বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু, বিধিনিষেধ উঠে যেতেই সংবাদকর্মীরা খবর পেয়ে ছুটলেন জিকারগাছায়। কথা বললেন যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে। জানতে পারলেন, কে এই নেতাজী! তিনি যে সাক্ষাত সুভাষ চন্দ্র বসু! এর আগেই, ১৮ অগাস্ট ‘বিমান দুর্ঘটনায় নিহত সুভাষ বসু’ বলে সংবাদ ছড়িয়ে পড়িয়ে সর্বত্র। কারও কারও মধ্যে তীব্র অবিশ্বাস। এটা হতেই পারে না! নানা রকম তথ্যের আস্বাদন পেয়ে সাংবাদিকরা গেলেন মিয়ানমারে, সিঙ্গাপুরে। এক এক করে মণিমুক্তোর মতো বিবৃত হতে লাগল সুভাষ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্বগাঁথা। মাসের পর মাস পত্রিকার পাতায় স্থান করে নিলেন সুভাষ বসু। না, সুভাষ বসু নয়; তিনি তখন ‘নেতাজী’ — ভারতীয় জাতীয় মুক্তির সর্বাধিনায়ক! এ এমন এক মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে গেলেন তিনি, যা পরে তীব্র করল স্বাধীকারের আন্দোলনকে। মানুষ আরও জঙ্গি হয়ে উঠল। তিনি ফেরেননি বটে, কিন্তু একটা চিরস্থায়ী স্থান করে নিলেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও নেতাজীর একদম সমসাময়িক রাজনীতিক মোরারজী দেশাই যেমনটা বলেছিলেন লেখক অধ্যাপক সমর গুহকে, ‘যদি সুভাষ বসু যুদ্ধের পর ভারতে ফিরতে পারতেন, তাহলে তিনিই হতেন সর্বেসর্বা।… সুভাষ বাবুই হতেন ভারতের গন্তব্যপুরুষ।’ এমন পুরুষকে ব্যর্থ বলা যায়!

গান্ধী ও গান্ধীপন্থিরাও কি সফল ছিলেন? আপাতভাবে তো তা-ই। কিন্তু, যে ‘অহিংসবাদ’ খোদ দেশ ভাগ করে ফেলে, সে নীতিকে সফল বলা যায় কী করে? গান্ধীর অবস্থানটা একদম স্পষ্ট ছিল। কংগ্রেস কমিটির প্রস্তাবিত ভারতের ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসে’র বিপরীতে সুভাষ বসু পূর্ণ স্বরাজের আওয়াজ তুলেছিলেন। এই বিপরীত মতামতের কারণে, সুভাষ বসুকে প্রয়োজনে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হবে, তার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতিত্বের পদ ছিনিয়ে নেওয়া হবে বা পদত্যাগে বাধ্য করা হবে এবং গান্ধী এতে সমর্থন দিবেন; কিন্তু কোনোভাবেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবেন না। অথচ, মানুষ মরছে। জালিওয়ানালাবাগ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মরতেই আছে। আরও পরেও মরেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেরা নিজেরা মারামারি করেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছে। বাংলায়, বিহারে, পাঞ্জাবে। পরিণতি হিসেবে দেশটাই ভাগ হয়ে গেছে!

এ গান্ধীকে সফল বলা যায় কি না অন্য বিবেচনা। কিন্তু, গান্ধীকে সফলদের কাতারে তো বসাতে হবে ‘কাল্ট’ হিসেবে! বসাতে হবে নেহেরুকে, জিন্নাহকে, প্যাটেলকে। তাই, আদতে দেশ ভাগাভাগি হলেও, এই প্রকল্পটা ভুলিয়ে দিতে চয়ন করা হলো ‘স্বাধীনতা’ ধারণাটিকে। ভাগের ভারাক্রান্ত দশাকে লুকিয়ে মহিমান্বিত (গ্লোরিফাই) করা হলো স্বাধীনতার স্বাদকে। এই প্রকল্পটিকেই হয়তো ‘দেশভাগ’ নামে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ না করে দু’টি রাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতা দিবস’ শিরোনামে স্মরণ করা হয়!

একই দিনে যদি একজনের জন্ম হয়, আরেকজনের হয় মৃত্যু, তাহলে, মৃত্যুদিবসের গুরুত্ব কবে জন্মদিবসের চেয়ে বেশি ছিল বলুন! যে মরে তাকে আমরা ভুলে যাই, নবজাতককে নিয়েই যত ব্যস্ততা! ১৯৪৭ সালের মধ্য অগাস্টের প্রকল্পটিও ঠিক তাই। এভাবেই ব্যর্থদের নাম সফলদের খাতায় উঠে যায়!

২.

একটু ‘ফাস্ট ফরোয়ার্ড’ করে রিলটা টেনে নিয়ে যাই ১৯৭১ সালে। পাকিস্তানের ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দুই পূর্বসূরি, আবুল কাশেম ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে ঠিক এ জায়গাটাতেই এগিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পূর্বসূরিরা মসনদে বসেও তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিনা প্রতিবাদে সরেও গেছেন! আর শেখ মুজিব? ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ‘ভূমিধ্বস’ বিজয়ের পরও মসনদে বসতে পারেননি। ফলে, জনযুদ্ধে (সিভিল ওয়ার) যাবারই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন!

কখনও কখনও, ইতিহাস নিজের প্রয়োজনেই জনযুদ্ধের ডাক দিবে। সেই ডাককে প্রত্যাখ্যান করলে বড় বিপদ! বঙ্গবন্ধু, বাংলার (পাকিস্তানেরও) ‘মেজরিটি পার্টি’র নেতা হিসেবে তা প্রত্যাখ্যান করেননি। এটাই নেতা হিসেবে তার সবচেয়ে বড় দূরদর্শিতা। একটা কথা আছে, ‘নাউ অর নেভার’। এই সত্যটা মানতে হয় ইতিহাসের গল্প বদলাতে হলে। বঙ্গবন্ধু সেটাই করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু একটা সময় তার আদর্শ মানতেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে। নিজের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি তার রাজনৈতিক ভ্রমণের প্রথম আদর্শ হিসেবে নেতাজীর নামই উল্লেখ করেছেন। একটা নিরস্ত্র জাতিকে নিয়ে যুদ্ধে যাবার এই প্রেরণা কি তিনি নেতাজীর কাছে পেয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু, যে উত্তরটা সবাই জানি সেটা হলো, যুদ্ধে জড়াবার পথ ভিন্ন ছিল দু’জনের। ‘নজরবন্দি’ অবস্থায় ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টায় টহলদারদের চোখে ধূলো দিয়ে নেতাজী বেছে নিয়েছিলেন নিষ্ক্রমণ। ছেড়েছিলেন ঘর, দেশ ছাড়বেন তাই। ১৭ জানুয়ারি তাই ইতিহাসে তার মহত্বের গুণে স্বীকৃত হয়েছে ‘মহানিষ্ক্রমণ দিবস’ (দ্য গ্রেট স্কেপ) নামে। ঠিক ৩০ বছর পরে প্রায় একই পরিস্থিতির মুখে পড়লেন বঙ্গবন্ধু। তিনি নিষ্ক্রমণের পথে যাননি। আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সেটাই তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছিল। শেখ মুজিব ফাঁসির মুখ থেকে নিস্তার পেয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে ফিরেছিলেন তার মাটি ও মানুষের কাছে।

সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেওয়া সুভাষ বসু ‘দৃশ্যত’ ফিরতে পারেননি তার প্রিয় স্বদেশে। কিন্তু, না ফিরেও, স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রাধিনায়ক তো তিনিই। কেননা, তার নেতৃত্বেই তো ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ভারতকে। এ দিনেই গড়ে উঠেছিল ভারতের প্রথম অস্থায়ী সরকার, যা আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ বা সংক্ষেপে আজাদ হিন্দ সরকার নামে পরিচিত। এটি ছিল একটি প্রবাসী সরকার, কিন্তু তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টত স্বদেশমুখী — দিল্লি দখল কর। এই সরকারের এমনকি নিজস্ব মুদ্রা, বিচারব্যবস্থা, দণ্ডবিধি, জাতীয় সঙ্গীতও ছিল। ফলত, এটা বলা অসঙ্গত নয় যে, সুভাষ চন্দ্র বসু সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লবেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন। যে কারণে, তিনি শুধু আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি, সিঙ্গাপুর হয়ে জাপান গিয়েই ক্ষান্ত হননি, ব্যাপক পরিকল্পনাও করে গিয়েছিলেন। জার্মানরা যখন জানতে চাইল, লড়বেন কী করে? তখন তিনি সেখানকার ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনী গড়ে তোলার পূর্ব পরিকল্পনার কথা বললেন। এর পর ডাক পেলেন জাপানিজ শাসকদের, পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়ার। সাবমেরিন যোগে গোপেন জার্মানির সহযোগিতায় প্রায় তিনমাস জলপথ ভ্রমণ শেষে তিনি জাপানে পৌঁছুলেন ১৯৪৩ সালের ১১ মে। জাপান প্রবাসী বিপ্লবী রাসবিহারী বসু যুদ্ধবন্দি ও সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে ইতোমধ্যেই (১৯৪১ সালে) গড়ে তোলা ভারতীয় জাতীয় সেনা বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (আইএনএ) প্রায় ৪৩ হাজার সেনা সমৃদ্ধ দলের নেতৃত্ব তুলে দিলেন সুভাষ বসুর হাতে।

অক্ষশক্তির জাপানের সহযোগিতায় আজাদ হিন্দ সরকারের অধীনস্ত আইএনএ শুরু করে দিল সমর লড়াই। আন্দামান-নিকোবার পর্যন্ত দখল করে নিল। এগুলোর নামও দিয়েছিলেন নেতাজী যথাক্রমে ‘শহীদ’ ও ‘স্বরাজ’। কিন্তু, শেষ বাধাটা এলো বাংলা-বার্মা তথা ইন্দো-বার্মিজ ফ্রন্টিয়ারে। আর পারল না সেই বাধাটা ভেদ করতে! রেঙ্গুন হয়ে, আরাকান হয়ে বাংলায় ঢুকতে চেয়েছিল তার ভারতীয় জাতীয় সেনা। কিন্তু, যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে তিনি ভারতে জাতীয় বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, সে যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতিই তার উদ্দেশ্যটাকে বুমেরাং করে দিল। জাপান ইন্দো-বার্মিজ ফ্রন্টিয়ার থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিল। ১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্ট তারা পরাজয়ও মেনে নিল। সাহস করে লড়তে গিয়েও একা আর কুলিয়ে উঠতে পারল না আইএনএ। মাথার ওপরে বোমারু বিমান, ট্যাঙ্ক, গোলা বারুদ, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ বাহিনীর এতো আনবানশানের সঙ্গে পারা যায় কী করে!

ওদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল, স্বপ্নবাজ নেতাজীর অন্তর্ধানের দুঃসংবাদ! জাতীয় বিপ্লবের সাধ ওখানেই মরে গেল! আজাদ হিন্দেরও অসমাপ্ত যাত্রা শেষ ওখানেই। তার ফেরা না-ফেরা নিয়ে যে বিতর্ক, তা আরও বহুকাল চলবে, এতে সন্দেহ নেই। এই বিতর্ক তার লিগ্যাসির কারণেই মহীরুহ হবে। কিন্তু, এ কথাটিও স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি থেকে যাবেন উপমহাদেশীয় রাজনীতির এক রহস্যময় ‘অসমাপ্ত অধ্যায়’ হিসেবে। তিনি যে ব্রত নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন, দেশ ছেড়েছিলেন, সেটা তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। এই সুভাষ কি সত্যই সফল নাকি ব্যর্থ? তিনি যদি ব্যর্থই হবেন, তাহলে তাকে নিয়ে এতো চর্চা আজও জারি আছে কেন? আজও কেন তাকে মনে করা হয় উপনিবেশের শৃঙ্খল থেকে মুক্তিদানের সবচেয়ে দূরদর্শী ও শক্তিমান নেতা?

যে নেতা বলতেন, ‘স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়, দিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়’, যিনি বলতেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিব’, তার উদ্দেশ্য ও উদ্যোগকে এতো সহজে নাকচ করে দেওয়া যাবে না। যুদ্ধ করতে গেলে রক্ত ঝরবেই। তিনি এ সত্য মেনে নিয়েই ভারতবাসীকে যুদ্ধে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কোন শঠতার আশ্রয় নেননি, কোন কিছু গোপন করেননি। এমনকি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে ১৯৩৯ সালের ২২ জুন তিনি যে ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ নামক বামপন্থি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই পার্টিকেও তিনি এ লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ করেননি। পার্টির উপরেও দেশ, এই নীতিতে বলিয়ান হয়েই দলকানা রাজনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি চলে গেছেন প্রবাসের পথে, সম্ভাব্য জাতীয় বিপ্লবের সশস্ত্র প্রস্তুতি নিতে।

৩.

হ্যাঁ, যদি আইএনএ প্রবেশ করতে পারত বাংলায়, আর যদি চলে যেতে পারত দিল্লি পর্যন্ত, তাহলে ‘স্বাধীন ভারত’ আরও একধাপ এগিয়ে জাতীয় বিপ্লবের মুখ দেখে ফেলত। সে বিপ্লব টিকত কি টিকত না, কতদিন টিকত সেটা অন্য আলোচনা, কিন্তু, সুভাষ বসুর ধাক্কাটা শুধু সাগরের স্রোতের মতো নয়, একদম মহাসমুদ্রের মতো আছড়ে পড়ত ভারতভূমিতে, এটা নিশ্চিত। তার এই উদ্যোগের সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। কিন্তু, তিনি খুব সচেতনভাবেই জার্মানি-ইতালি-জাপানের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। স্বদেশের ভাবনাই তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছিল। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে যেহেতু কিছু নেই, সেহেতু তার পদক্ষেপকে একজন জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী নেতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, রাজনীতিটা বুঝতে সহজ হবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ভারতীয়দের সঙ্গে যা করেছে, সেই পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে শুধু ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে হাত মেলানোটাকে কটূ চোখে দেখার ভ্রম আমাদের ছাড়তে হবে। ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ এই নীতিকে উপজীব্য করে তিনি ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন, ‘দিল্লি দখল’ করতে চেয়েছিলেন, এই সাহস ভারতবর্ষের আর কোনো নেতার মস্তিষ্কে কুলিয়ে ওঠেনি। শৈলেশ দে’র বিখ্যাত ‘আমি সুভাষ বলছি’ গ্রন্থে নেতাজী বলছেন, ‘অক্ষশক্তির আক্রমণ থেকে নিজেদের সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য যদি ব্রিটেন আজ আমেরিকার দ্বারস্থ হতে লজ্জা না পায় তাহলে ভারতবর্ষর স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অপর কোনো জাতির সাহায্যপ্রার্থী হওয়া আমার পক্ষে অন্যায়ও নয়, অপরাধও হতে পারে না।… আপনারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে প্রস্তুত থাকুন। আমি যেভাবে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টকে বিভ্রান্ত করে ভারতবর্ষ থেকে চলে এসেছি, ঠিক তেমনি যথাসময়ে আপনাদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হব।… যে সুযোগ আসছে সেটা সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য নিজেরা জাতি ও ধর্মনির্বিশেষ অবিলম্বে সঙ্ঘবদ্ধ হোন। চাই ঐক্য ও একাগ্রতা।’

এই ঐক্যের অভাবেই তো ভারত ভাগ হয়ে গেল। তিনি থাকলে ভারত-ভাগ ঠেকাতে পারতেন কি না সেটা অনেক যদি-কিন্তুর ওপর নির্ভর করত। কিন্তু, তিনি জানতেন জিন্নাহ কী চাইছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদলের সঙ্গে মিটিংয়ে তিনি সেসব কথা বলেছেনও। তবে, তার যে তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল বাংলায়, সেটার সদ্ব্যবহার করতে পারলে তিনি অন্তত বাংলাভাগ ঠেকাতে পারতেন। সে সময় তার মতো শক্তিশালী সর্বভারতীয় জাতীয় নেতা বাংলাতে আর দ্বিতীয়জন ছিলেন না। বাংলা যে একটি স্বতন্ত্র্য রাষ্ট্র হতে পারত, এই ওকালতিটা করার মতো শক্তিশালী কোনো সর্বভারতীয় চরিত্র তার অন্তর্ধানের পর আর অবশিষ্টই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত হয়েছেন, আর সুভাষ বসু নিখোঁজ। কে লড়ে নিয়ে আসবেন অখণ্ড বাংলাকে, গান্ধী-নেহেরু-জিন্নাহ-প্যাটেলের কাছ থেকে? কেউই নেই! তিনি থাকলে অবশ্যই হতো, নইলে, ভারতীয় জাতীয় সেনা অফিসার কেন তাঁকে বলবেন, ‘আরাকানের রাস্তা দিয়ে আমরা বাংলায় ঢুকতে পারি নেতাজী। যেদিন আপনি চট্টগ্রামে প্রবেশ করবেন, সেদিন পুরো বাংলাও দাঁড়িয়ে যাবে।’

৪.

পরিতাপের বিষয়, যে বাংলা দিয়ে প্রবেশ করে নেতাজী তার জাতীয় সেনা নিয়ে তাড়াতে চেয়েছিলেন উপনিবেশিক শক্তিকে, সেই তৎকালীন পূর্ব বাংলা, এখনকার বাংলাদেশে, তার স্মরণে কিছুই করা হয়নি। আজকের বাংলাদেশ যেহেতু তখন অখণ্ড ভারতেরই অংশ ছিল, ফলে তিনি তো আসলে আমাদেরও প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার সম্মানে অন্তত রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছু করার উদ্যোগ অবশ্যই নেওয়া প্রয়োজন বাংলাদেশে। তুলনার প্রয়োজন নেই; তবে, বাংলাদেশে শুধু পাকিস্তান আমলে যারা রাজনীতি করেছেন, তাদেরও গুরুত্ব আছে, কিন্তু, অখণ্ড ভারতে যারা বাংলায় এবং নেতাজী সুভাষ বসুর মতো সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তাদের স্মরণও করা হয় না। আর সবার কথা বাদ থাকুক। নেতাজী তো কোনো খণ্ডের নন। অন্তর্ধানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি যে ভারতীয় অখণ্ডতা দেখে গেছেন, সেটার সূত্রেই বলা যায়, তাকে শুধু ভারতের ‘পেটেন্ট’ হিসেবে কেন ছেড়ে দেবে বাংলাদেশ? কেন তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত নেই, কেন তাকে স্মরণ করা হয় না বাংলাদেশে, এটা কোটি টাকার প্রশ্ন। সে প্রশ্নের উত্তর কর্তারা দিতে পারবেন। আমাদের তো শুধু লেখে যাওয়ার দায়! রবীন্দ্র-নজরুল উভয় ভূখণ্ডের হতে পারলে, সুভাষ কেন হতে পারেন না? রাজনীতির খেলাটা কোথায় এখানে?

ভুলে গেলে তো চলবে না, যতবার পুরো উপমহাদেশ রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, ততবার অবিভক্ত ভারতের প্রথম রাষ্ট্রনায়ক ও সবচেয় প্রভাবশালী উপনিবেশ-বিরোধী নেতা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘সুভাষচন্দ্র, বাঙালী কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশ-নায়কের পদে বরণ করি।’ এই দেশনায়ক আমাদের ঘরে ফিরে না আসা মহান প্রমিথিউস। তিনিই ছিলেন বিশ্ব বাঙালির প্রথম প্রকৃত ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’। আফসোস একটাই, তিনি হতে পারতেন ‘উপমহাদেশের লেনিন’; প্রবাসে রণকৌশল সাজিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যেভাবে বলশেভিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন লেনিন, নেতাজীও ভারতে ঘটিয়ে দিতে পারতেন জাতীয় বিপ্লব। কিন্তু, আজ অবধি তিনি হয়ে রইলেন আমাদের এক রহস্যময় মহাকাব্যিক চরিত্র, আমাদের চর্চাজগতের অসমাপ্ত অধ্যায়!

 

 

সৌমিত জয়দ্বীপ, লেখক ও গবেষক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত