সূর্যম্পশ্যা

 

‘ভিতরে কিছু নাই মনে হয়’

কলমিটুলি বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে দশ মিনিটের পাথরকুচি পথ ধরে হেঁটে যেতে প্রায়ই কেউ না কেউ বিলুকে এই কথা শোনায়। এইমাত্র যেমন শোনালো । বিলু আড়চোখে দেখতে পাচ্ছে ছেলে দুটো হেসে গড়িয়ে পড়ছে, যেন খুব মজার একটা কথা ছিল ওটা! 

মাঝেমাঝে বিলুর চলার গতি শ্লথ হয়ে আসে। ইচ্ছে করে দুয়েকটা পাথর তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে ওই অশ্লীল হাসি হাসতে থাকা ছেলেগুলোর দিকে। শেষমেশ পারে না, রাস্তায় ছেলেদের সাথে ঝগড়া করে পরের দিন নির্ভয়ে বেরুতে পারার নিশ্চয়তা নেই। বিলকিস তাই চাইলেও আরো অনেক কিছু করতে পারে না। 

সেদিন কলেজে হাবিবা আর শিউলি যার যার প্রেমিকের বদনাম করছিল। কে কত বড় অলস, কে কতটা প্রেমে অন্ধ এইসব গল্প করতে করতে বিরক্তি মাখা গর্ব ফুটে উঠছিল ওদের চোখে মুখে। বিলকিস হাসি চেপে শুনছিল ওদের কথা। হাবিবার হঠাৎ কী হলো কে জানে, বিলকিসের মুখটা দেখে বোধ হয় মায়া লাগলো ওর। 

হাঞ্জেলা কবিরাজের ধারে চল একদিন, বিলু! তর একখান ব্যবস্থা কইরা দিই…

শিউলিও মাথা নেড়ে সায় দেয় খুব। হঠাৎ হাঞ্জেলা কবিরাজের কথা শুনে শুধু বিলকিসই কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। 

তার ধারে যামু কেন! 

ভাব ধরিস না! এই চেহারা সুরত নিয়া আর কয়দিন?

ধুরো..আমার এইসব লাগতো না! 

ঢংয়ের শেষ নাই! তর সমস্যাডা আসলে কই তাইলে? 

বাদ দে..

শিউলি আর হাবিবা অপরিসীম বিরক্তি নিয়ে নিজেদের গল্পে মত্ত হয়ে যায় আবার। বিলু মনে মনে ভাবে তার তো সত্যিই কোনো সমস্যা নেই! তবে কি এরা বন্ধু বলেই ওর ভালোর জন্য মাঝেমাঝে এমন মরিয়া হয়ে ওঠে? জানা নেই ওর। 

ফাইনাল পরীক্ষার পর অনেকেই চাকরির পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছে। কারো আবার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে৷ হয়তো সে কারণেই শিউলির চোখেমুখে অন্যরকম আভা! ব্রণের দাগগুলি মিলিয়ে যাচ্ছে ওর, চুলগুলো আরো নরম রেশমি হয়ে উঠেছে আজকাল। বিলু শুনেছে ওর প্রেমিকের নাকি নিউমার্কেটে নিজের দোকান আছে, বিয়েটা বোধ হয় সেই ছেলের সাথে হয়ে যাবে। তা হয়ে যাক, ভালো থাকুক ওরা। 

আড্ডা থেকে উঠে আসার সময় বিলু ওকে আরেকবার মুগ্ধ চোখে দেখে নেয়। হয়তো একটু ঈর্ষাও আর লোভ মাখা থাকে সেই দৃষ্টিতে। তারপর নিজের উপর বিরক্তি আসে। সব মাথা থেকে ঝেরে ফেলতে চায় সে, তবু কেন যে পারে না! 

ইদানিং শিউলিরা রবিনের নাম করে ওকে খ্যাপাতে চেষ্টা করে। বিলু হেসে উড়িয়ে দেয় প্রতিবারই। এত মেধাবী ছাত্র রবিন, কত মেয়ে ওর জন্য পাগল আর সে কিনা বিলুর মতো সাধারণ মেয়ের ব্যাপারে কৌতূহল দেখাবে! কিন্তু সত্যিই তো সেদিন রবিনের চোখে অন্যরকম ঝিলিক ছিল। 

ওদের রেজাল্টের দিন সবাই যখন সবচেয়ে ভালো ছাত্র রবিনকে ঘিরে ধরেছিল, বিলু শুধু দূর থেকে দেখছিল রবিনকে। তারপর চুপচাপ হেঁটে চলে যেতে দেখে ওকে রবিনই কাছে ডেকেছিল। সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলো, এতদিনের অনুমান তবে সত্যি? 

কে কী ভেবেছে জানা নেই বিলুর। সে শুধু দেখেছে রবিনের চোখে মুগ্ধতার রেশ। মাঝেমাঝে এই একটা মুগ্ধ দৃষ্টি ওর ভেতরটাকে তোলপাড় করে দেয়। খুব গহীনে একটা রঙমশাল জ্বলে উঠে বড় বিভ্রান্ত করে তোলে বিলুকে। পরক্ষণেই সেটাকে চাপা দিয়ে দেয় সে। বিলুর সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। মিথ্যে মোহের জালে জড়ানো মানে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। ওকে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবতায় এনে দেয় কলমিটুলির বখাটে ছেলেগুলো। 

‘ভিত্রে কিচ্ছু নাই… কী মাল এইডা!’ 

পুরোটা পথ এই একটা কথা ভেবে আর ছেলেগুলোর বিচ্ছিরি হাসির শব্দে কান দু’টো ঝাঁ ঝাঁ করে বিলুর। চোখ উপচে জল আসে বারবার। এই কান্নাটা ভীষণ বোকা বোকা লাগলেও কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারে না সে। হতাশা আর ঘেন্নায় মাখামাখি হয়ে একটা ভেজা বিষণ্ণ পাখির মত পুরোটা পথ হেঁটে যায় সে। একবার শূন্যে তাকিয়ে দোষারোপ করে অদৃশ্য কাউকে। কেন এই রঙ রুপ বর্ণের পৃথিবীতে বড় অযত্ন অবহেলায় গড়ে পাঠালেন ওকে? কার অন্যমনস্কতার বোঝা তাকে বয়ে যেতে হবে সারা জীবন? 

কলমিটুলি পোস্ট অফিসে পৌঁছে নিজেকে সামলে নেয় বিলু। বড় বিব্রত লাগে নিজেকে নিয়ে। এতসব ভাবার আর সুযোগ থাকে না। ভিড় ঠেলে ভেতরে যেতেই ঘেমে নেয়ে উঠে বিলু। 

এত দেরি করলে চলে? লম্বা লাইন পইরা গ্যাছে এতক্ষণে! শিগগির চল।

আখতার ভাই তো এমনই, মাথা গরম করে কথায় কথায়। সাড়ে দশটা বেজে গেছে, সত্যিই দেরি হয়ে গেছে অনেক। বিলু চুপ করে থাকে, কথা বললে আরো বকা খেতে হবে এখন।

আজ ফরম জমা দেবার শেষ তারিখ, তার উপর বৃহস্পতিবার। বড্ড ভিড় হবে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, পানি খেয়ে একটু ফ্যানের নিচে বসা যেতো যদি! আখতার ভাই একহাতে সব কাগজ সরিয়ে রেখে নিজের টেবিল ছেড়ে উঠে এলো। না, আর সময় নেই। তেষ্টা নিয়েই তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো বিলকিস। 

ফরমটা আমি নিলে কী হইতো? এইসব জিদ কইরা নিজেও মরোস, আমারেও জ্বালাইয়া খাস…

বিলকিস জানে শুধু তো ফরম তোলা নয়, টাকার ব্যাপারও আছে। আখতার ভাই কখনো খরচ করলে সে টাকা ফিরিয়ে নেয় না। বিলুর একটু সংকোচ থেকেই যায় মনে মনে। এত সাহায্য কেন নেবে? ভাবি টের পেলে অশান্তি বাড়ে। এত হাঙ্গামায় যেতে চায় না সে। 

এই যে পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য যাবতীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নেয়া, সেগুলো শহরে পৌঁছে দিয়ে আসা সবই তো আখতার ভাই করে দিল।এত ছুটোছুটি করছে মানুষটা! এস আই নিয়োগের শারীরিক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে বিলু বুঝি আরো ফেঁসেই গেছে। শুরুতে খুব আগ্রহ থাকলেও যতই দিন গড়ালো ততই বিলুর মনে সংশয় এলো। পারবে সে এই কঠিন পথ চলতে?

দু’দিন ধরে দোনামোনা করতে থাকা বিলুকে মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে দেখেছে আখতার। নিজের মায়ের পেটের ভাই না হলেও আখতার মিয়া মানুষটা দায়িত্ববান। পাশাপাশি বাড়িতে থাকে বলে দূর সম্পর্কের এই বোনটার প্রতি তার কিছু দায় আছে বলে সে মনে করে। তার নিজের মেয়েটাই বয়সে বিলুর মাত্র কয়েক বছরের ছোট। সে কারণেই হয়তো বিলুকে বোন নয়, মেয়ের চোখে দেখে লোকটা। 

শুরুতে ভালো কথায় কান না দেয়ায় আখতার মিয়া অনেক বকাবাদ্য করেছে, তারপর বিলু রাজি হয়েছে। এই রুক্ষ পৃথিবীতে ওর মতো মেয়েকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। নইলে শুধু কথার ঘায়েই তিলে তিলে মরতে হবে ওকে।

বিলু জানে ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই বড়দের। কিন্তু দৌড় তো শুধু ওই চিন্তা পর্যন্তই, কারো সময় নেই একটু সুপরামর্শ দেয়ার। শুধু আখতার ভাই উপযাচক হয়ে এগিয়ে আসে। বিলু দেখতে সুশ্রী নয়, এমন কোনো মেধাবী ছাত্রীও নয় সে। এতদূর পড়াশুনা করতে পেরেছে সেও শুধু বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল বলে। বিলুর নিজের ভাই বোন যার যার জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। সবার ছোট বিলু কেবল জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খেয়ে যায়। তাই আখতার ভাইয়ের কথা মাথা পেতে মেনে নেয়। 

জেলা শহরের রেঞ্জ অফিসে পৌঁছে দমে গেলো বিলু। বেশ ভিড়। তবে মেয়েদের লাইনের দৈর্ঘ্যটা ছোট। একটু অপেক্ষা করতে হলো কেবল। কিন্তু লিখিত পরীক্ষার সময়সূচি দেখে দুশ্চিন্তাও হতে লাগলো। হাতে সময় আছে মাত্র সপ্তাখানেক। লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে তারপর আবার মৌখিক পরীক্ষা। 

ডিআইজি রেঞ্জ অফিস থেকে বেরিয়ে বিলুকে নিয়ে একটা হোটেলে খেতে বসলো আখতার। বিলু খুব গম্ভীর হয়ে আছে। মাথার ভেতর চিন্তার ঝড় বইছে ওর। আখতার ভাই খোঁজ নিয়েছে, সব পরীক্ষায় পাস হয়ে গেলে রাজশাহীতে ট্রেনিং এ পাঠানো হবে ওদের। সেখানে টানা এক বছর থাকতে হবে। বাড়ি থেকে এত দূরে যায় নি কখনো বিলু। অবশ্য বাড়িতে আপনজন বলতে মিনারা বুবু ছাড়া আর তো কেউ নেই। তা সেই বুবুকে রেখে যেতেও কি কষ্ট হবে না? এত বছরের অভ্যস্থতা ছেড়ে থাকা বড় কঠিন। 

বিলু যখন এইসব আকাশপাতাল ভেবে মরছে আখতার তখন অবাক চোখে ওকে দেখছিলো। এতটাই আনমনা হয়ে গিয়েছে বিলু যে খেতেও পারেনি ঠিক করে। 

অই বিলু, তুই কি ডরাইতেছোস?  

বিষম খেয়ে সম্বিত ফিরলো ওর। সত্যিই বড় বেশি ভেবে ফেলেছে সে। পরীক্ষা দিলেই কি পাস করে ফেলবে? আর যদি পাস করেই ফেলে ভাবার কি সময় পাবে না? এখনই বোকার মতো তালগোল পাকিয়ে ফেলছে সব। 

কথা কস না ক্যান? কী ভাবতেছস এত? 

ভাবি না ভাই, আর ভাবুম না এত কথা..

হ, বেশি ভাবিস না.. আগে পরীক্ষায় পাস দে! 

দ্রুত খাবার শেষ করে উঠে পড়ে বিলু। আখতার ভাই পাওনা মিটিয়ে দিলে ছুটতে ছুটতে কলমিটুলির ফিরতি বাসে চেপে বসে ওরা। 

প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে গাদাগাদি করে আছে সবাই। বাস ছাড়ার পর একটু স্বস্তি পেলো বিলু। আখতার ভাই প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছে! বিলু টের পায় বয়স বাড়ছে লোকটার, আগের মতো ছুটোছুটি করতে পারে না। বড় মায়া লাগে ক্লান্ত মুখটা দেখে।

 

পাশের সিটে বসেছে এক নতুন দম্পতি। এই গাদাগাদির ভেতরেও খুনসুঁটি করছে ওরা। বিলু আড়চোখে ওদের দেখতে থাকে। মেয়েটার বড় অল্প বয়স, লাজুক মুখে হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। হাওয়াই মিঠাই রঙের কাতান শাড়িতে রূপ উপচে পড়ছে যেন। ছেলেটা মুগ্ধচোখে তাকিয়ে দেখছে! বিলুর তাতে কী! দেখুক না, নিজের বৌকেই তো দেখছে! বিলুই বরং হ্যাংলার মতো হাঁ করে ছিল এতক্ষণ। দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে। খর রোদের আঁচে ভেতরে বাহির সবই যেন তেঁতে ওঠে! 

 

দুই

 

পাপিয়া পরিবহনে আজ মহিলা যাত্রী খুব একটা নেই। ফেরার তাড়া আছে বলে এই ভিড়ের মধ্যে উঠে পড়েছে বিলু। মিনারা বুবুর ওষুধটা খুঁজে পেতেই দেরি হয়ে গেছে ওর। এখন বাড়ি ফিরে তবেই শান্তি। 

বাসি খাবার খেয়ে পেটের অসুখ বাঁধিয়েছে বুবু। বাড়িতে তারা দুটো মাত্র প্রাণী। বিলু আজকাল চাকরির জন্য হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে। এসবের মধ্যে রোগীর সেবা করার মতো সময় থাকে না। বুবুকে আজ খুব বকবে সে। অবশ্য তার কথা গায়েও মাখে না মানুষটা।উল্টো ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। 

এত ক্যাটর ক্যাটর করিছ না কইলাম..

করুম না যাও, মরলে তুমি মরবা আমার কী! 

কী কইলি তুই! তর নিজের বইন হইলে পারতি এত খারাপ কথা কইতে? 

কী খারাপ কথা কইলাম!

কইলি না আমি মরলে তর শান্তি! 

বিলুকে ওরই কথার জালে আটকাতে পেরে ফিক করে হেসে দেয় মিনারা বুবু। বুবুর চল্লিশ পেরিয়েছে বছর খানেক হলো। আজকাল বড্ড খিটখিটে মেজাজ হয়ে যাচ্ছে। বিলু আজকাল একটু বুঝেশুনে চলে ওকে, অযথা কথা বাড়ায় না, চুপ করে থাকে। 

তবে আজ এত ভাল একটা খবর সাথে নিয়ে ফিরছে, বুবু খুব খুশি হবে। সুন্দর মুখটা হাসিতে ঝলমল করে উঠবে। আবার দু’কথা শোনাতেও ছাড়বে না বুবু, বিলু ঠিক অনুমান করতে পারে। 

তুই বলে পরীক্ষায় ফেইল করবি, এখন কী হইলো! 

পাস কইরা কী আর হইবো! কেউ বিয়া তো করবো না…

ওই মুখপুড়ি..বজ্জাতের গুষ্টিগুলারে ধইরা প্যাদাইতে তো পারবি ! বিয়ার কথা কস! আমারে দেইখাও শিখলি না কিছু… মাইয়া মাইনষের জীবন হইলো এরমই, তুই সুন্দর হস আর কালা তরে যন্ত্রণা না দিলে তাগো প্যাটের ভাত হজম হয় না..

বুবুর মুখে প্রায়ই এমন কথাগুলো শুনে চমকে ওঠে বিলু। সত্যি বলতে কখনো বিয়ে, সংসার এসবের স্বপ্ন দেখেই নি সে। কী করে দেখবে! বিয়ের বাজারে ওর যে কোনো মূল্য নেই সে কথাটা চারপাশের সবাই মিলে আকারে ইঙ্গিতে কিংবা চোখে আঙ্গুল দিয়ে লক্ষ কোটিবার বলে দিয়েছে। 

এত সুন্দর বাপমায়ের ঘরে এমুন মাইয়া পয়দা হয় ক্যামনে! 

এমুন ঢ্যাঙ্গা মাইয়া, জামাই কইত্থে পাইবো! 

চ্যালাকাঠের মতো গতর! কপালে বিয়া শাদি নাই! 

 

এইসব কথার বিষ থেকে বাঁচতে সেই কিশোরী বেলা থেকেই মেয়েটা পালিয়ে বেড়িয়েছে । বন্ধ ঘরে বসে কাটিয়ে দিয়েছে কত শত পড়ন্ত দুপুর, বাদামী বিকেল। বিয়ে বা ঘরকন্নার মিষ্টি ভাবনা আসে নি কখনো তাই। 

বুবুর নিজের জীবনের গল্পটা জানা আছে ওর। এত রুপ নিয়েও তার ঘর টিকলো না। স্বামী অন্য নারীর প্রতি আসক্ত ছিল শুরু থেকেই। তারপর অল্প বয়সে হুট করে মরে গেলো লোকটা। বুবু বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলো। কাজ নিলো এই বাড়িতে। বিলুর বাবা-মা গত হবার পরেও থেকে গেলো, এখন এই বুবুই বিলু আর বাড়ির দেখাশোনা করে । 

এই মিনারা বুবুর শরীরটা ভালো ছিল না সকাল থেকে। বিলু তৈরি হচ্ছিল ওষুধ আনতে যাবে বলে। তখনই আখতার মিয়া ফোন করে এমনভাবে ডেকে পাঠালো যে বিলু তাড়াহুড়ো করে কলমিটুলির বাস ধরে পোস্ট অফিসে গিয়ে পৌঁছেছে। আখতার ভাই হাতে চাকরির চিঠিটা তুলে দেবার পরেও কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না ওর। 

এই চিঠি ভুল কইরা আসছে! 

ওর হতবাক চোখমুখ দেখে আখতার মিয়া হেসে ফেলছে। 

বারবার পড়ে শুনিয়ে ওকে আশ্বস্ত করেছে লোকটা। বিলু যেন নিজের অজান্তেই এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল এতগুলো বছর। সমাজের চোখে তার মতো সব দিক দিয়ে অযোগ্য একটা মেয়ে এস আই পদের নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করে ফেললো! পাড়াপ্রতিবেশীরা বিশ্বাস করবে কী, তার নিজেরই যেন বিশ্বাস হয় না। বিলু ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। 

আখতার ভাই দুই প্যাকেট মিষ্টি এনে হাতে ধরিয়ে দেয় ওকে। মাথায় হাত রেখে দোয়া করে অস্ফুটে। বিলু তখনো কাঁদছেই। 

আমি কি পারমু ভাই? সারাজীবন শুনলাম আমি একটা অপদার্থ..না আছে রূপ, না আছে গুণ! 

একশোবার পারবি…তোর ভিতরে কিছু না থাকলে পরীক্ষায় পাস দিলি কেমনে? 

বিলু উত্তর দিতে পারে না কিছুই। সত্যিই সে এতটাও অযোগ্য নয় তাহলে। একটু একটু করে মনের ভেতর জোর খুঁজে পায় বিলু৷ সেই আলোমাখা দুপুর আর বিকেলগুলো এতকাল ধরে অন্ধকার করে রেখেছে যারা, তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয় খুব। এস আই বিলকিস আরাকে দেখে ওদের মুখের সেই বাঁকা হাসিটা কেমন মুছে যায় এবার সেটা দেখার পালা। চিরকাল নতমুখে হেঁটে চলা জড়োসড়ো মেয়েটা আজ সূর্যের রশ্মিতে মাখামাখি হয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায়। 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত