| 20 জুলাই 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া গল্প: গান্ধী ফাগ্লা । নীলোৎপল বরুয়া

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

লেখক পরিচিতি—Nilutpal_Boruah

১৯৮২ সনে গল্পকার নীলোৎপল বরুয়ার জন্ম হয়।প্রথম বই ‘বন্ধ্যা প্রহরর কবিতা’ ১৯৯৯ সনে প্রকাশিত হয়। আলোচ্য গল্পটি ‘গান্ধী-ফাল্গা’গল্প গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।লেখকের রচিত ‘শুক্রাচার্য রাভাঃ যাত্রা আরু মাত্রা’ ২০১৮সনে অসম সাহিত্য সভার কলাগুরু বিষ্ণুরাভা পুরস্কার লাভ করে।

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ—বাসুদেব দাস


      জীউতের পাপ লেগেছিল।গভীর পাপ।আঠার মতো জড়িয়ে ধরা পাপ।পাপের মৃত রক্তবর্ণ একটা পুকুরে সে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিল।

      প্রায় এক কিলো ওজনের একটা গোটা লোহা দিয়ে তৈরি হাতল না থাকা বাঁকা দা-টা দিয়ে একটা ছাগলীকে বলি দেওয়ার পাপ।মাংসের খাঁচাটা ধপধপ করতে থাকা সত্ত্বেও ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে তাতে জল ঢুকিয়ে পরিষ্কার করার পাপ।

      প্রতিদিনই ছাগলী কাটার আগে ছাগলীর পা দুটি সে ধুয়ে নিত।কাজটা সে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে করত।ছাগলীটা যেন জানতে না পারে যে তার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে।টের পেয়ে যাওয়াটা খারাপ।খারাপ আর কী—মাংসটা খারাপ হয়ে যায়।মৃত্যু-ভীতি মাংসে এক অন্য রসের সৃষ্টি করে।মাংস তিতো হয়ে যায়।ছাগলীটার কাছে সে এরকম ভাব করে যেন একটা গতানুগতিক বিকেলবেলা।নিস্তরঙ্গ।চুকা-পথারের সহজাত বিকেল।

      কপালে হাত ঠেকিয়ে দুই তিনবার প্রণাম করে নেওয়া সত্ত্বেও পড়ে থাকা ছাগলীগুলির মাথাগুলি তাকে অভিশাপ দিত।স্থির হয়ে থাকা চোখগুলি তাকে নরকের নীরব আম্নত্রণ জানাচ্ছিল।সেই নরক সে যেন জানে না।পাতালের অতল তলের বহ্নিমান নরক।একটা শক্ত নাহর কাঠের গোড়ায় বসে জীউত মাংসগুলি টুকরো করছিল।

      চুকাপথার চৌ্রাস্তায় প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা সাইকেলে করে একটা বস্তায় বেঁধে একটা করে ছাগলী নিয়ে যেত।ছাগলীটা সাইকেলের ফ্রেমটা থেকে বস্তার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে নিত।পুঁটলির মধ্যে বসে যাওয়া ছাগলীগুলি চেঁচাত না।বরং সাইকেলে একটা সফর এবং ষষ্ঠেন্দ্রিয় (যদি ছাগলীৰ কোনো ষষ্ঠেন্দ্রিয় আছে বলে ধরে নেওয়া হয়।)বলে দেওয়া অবশ্যাম্ভবী কিছু একটার গভীর ভাবনায় মূক হয়ে বসে গিয়েছিল।

      সাইকেলটার কেরিয়ারে দুটুকরো কাঠ।

      একটুকরোয় বসে এবং অন্য টুকরোয় মাংসের বড়ো টুকরোগুলি রেখে সমান সমান মাপে কাটে।নীল জল কাপড়টার এককোণে একটা বাটির আকারে মাখনের নাড়ুর মতো ছাগলীটার জমাট বাঁধা রক্ত পড়ে থাকে।

      যদিও দুই টুকরো কাঠ দেখতে একই তথাপি জীউত সাহু কোনোদিন  ভুল করে না।

      একটুকরো তার চেয়ার ।

      বর্তুলাকৃতি হয়ে যাওয়া নাহর কাঠের শক্ত গোল টুকরোটাতে সে সিংহাসনে বসার মতোই আয়াস করে বসত।

      (কাঠের টুকরোটা তাকে যোগ বরা দিয়েছিল।নাহরের দীর্ঘ কুণ্ডা একটা।যোগ বরার সঙ্গে জিউতের ভাই ভাই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।অনেকটা যান এক সঙ্গে বড়ো হওয়া দুটো গুঁই সাপ।একে অপরের কথা বুঝতে পারে।)

      ভজপুর জেলার জীউত সাহু ইন্দিরাজির লাভার।

      এই দুনিয়ায় ইন্দিরা গান্ধীর যত প্রেমিক আছে তার সবচেয়ে টপে ছিল জীউত সাহু।

      দেশে থাকার সময় মহুয়া গাছের নিচের বিড়ির আড্ডাগুলিতে সে মুক্তভাবে সঙ্গীদের তার মোহব্বতের কথা বলেছিল।

      তখনও জীউত ইন্দিরাজীকে এতটাই ভালোবাসত যখন নাশাবন্দি করার জন্য ডক্তার নার্সের দলের সঙ্গে সি আর পির দল ঘুরে বেড়াত।

      মানুষ বলতে শুরু করেছিল ইন্দিরাজি ইণ্ডিয়া থেকে মর্দানগী উড়িয়ে দেবে।

      মহিলাদের রাজত্ব চলবে।

      মহিলাদের রাজত্ব।

      দলে দলে মরদদের ধরে ধরে চিকিৎসকের দলটি নাশাবন্দি করেছিল।

      গ্রাম পঞ্চায়েতে নাশাবন্দি ক্যাম্প বসেছিল।

      ভয় এবং বন্দিত্বের ত্রাস একটা জায়গাটাতে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

      নাসবন্দি করলে হাজারবার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক করলেও বাচ্চা হত না।নাসবন্দি করা মানুষগুলিকে চিনি অথবা মিঠাতেলের একটা টিন সরকারি উপহার হিসেবে দেওয়া হত।কখনও আর বাচ্চার জন্ম দিতে না পারার দুঃখে মুখ ফুলিয়ে মিঠাতেলের টিন নিয়ে মানুষগুলি বাড়ি ফিরে এসেছিল।মানুষগুলি নিজেদের পুরুষাঙ্গগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছিল।বারবার স্ত্রীদের খাটিয়ায় টেনে এনেছিল।পরীক্ষা করেছিল মর্দানগীর।

      অনেকের পুরুষাঙ্গগুলি শক্ত হত না,কারও কারও বীর্যপাত বন্ধ।অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে পড়া অনেকের ভেতরে ভেতরে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

      সিপাহি, জন্মেচ এবং বির্জুর পুরুষাঙ্গ এক একটি চামড়ার থলি হয়ে ঝুলে পড়েছিল।

সিপাহির স্ত্রী নিজের এক্মাত্র ছেলেকে কাউকে স্পর্শ করতে দিত না।

       ছয়টি মেয়ের পরে একমাত্র পুত্র।

      আর তো আশাই নেই।

      কী একটা অদ্ভুত হতাশায় সিপাহি সাহু ডুবে গিয়েছিল।

      বহু উপসর্গের ফিসফিসানি কাহিনিগুলি গ্রামটিতে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

      (কেউ বলেছিল ইন্দিরা গান্ধীর পাপ লাগবে।হাজার হাজার মরদের মর্দানগী খেয়ে দেবার পাপ।জীউত হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।

      ইন্দিরাজী আর পাপ।

      হতেই পারে না।যোগ বরাও নাসবন্দি করা কারবারটা ততটা ভালোভাবে নেয়নি।মহিলা,এতটা আক্রোশ ভালো নয়।এই কথাটাকে নিয়ে যোগ বরা এবং জীউতের মধ্যে একটা শীতল যুদ্ধও চলেছিল।)

      জীউতের বাবা অনেকদিন সি আর পির হাতে পড়ে নাশাবন্দি হওয়ার ভয়ে মুক্ত মাঠে শুয়েছিল।

      আর একটা সময়ে হাঁটতে হাঁটতে পালিয়ে আসামে চলে এসেছিল।

      (চুকাপথারে আসার আগে পর্যন্ত জীউত নিঃসঙ্গ ছিল।)

      হলেও জীউত ইন্দিরাজির ওপরে অসন্তুষ্ট ছিল না।

      তার প্রাক যৌবনের হাজার হস্তমৈ্থুন ইন্দিরাজির নামে হয়েছিল।চান্দোয়া আখড়ার নাঙ্গা বাবা হ্নুমান চালিশা আউরানোর মতো সে ইন্দিরাজির নাম বিড়বিড় করত।

       (হস্তমৈথুনের সময় সে হনুমান।পবনপুত্র।কখনও ইন্দিরাজির রাম হয় নি।এতটা পাপ করার ধৃষ্টতা তার নেই।)

      গাঢ় বীর্যের শুকনো খড়খড়ে দাগে বিবর্ণ হয়ে পড়েছিল মেরুণ রঙের সোনালি পাড় দেওয়া শাড়ি পরা লোহার মতো কঠিন মানুষটার ফোটো।চুমুর পরে চুমুতে মুখের লালায় গলে গিয়েছিল নেহেরুর নাতনি।

      ইস কি অনিন্দ্যসুন্দর সেই মুখশ্রী।

      হোয়াইট হাউসের সামনে পাশেই অপেক্ষা করে থাকা রিচার্ড নিক্সনের দেহটা ফোটোটা থেকে কাঁচি দিয়ে কেটে সরিয়ে দিয়েছিল জীউত।

      আর নিক্সনকে ছোটো ছোটো হাজার টুকরো করে ফেলেছিল।

      নিক্সনের গুমোট চেহারাটার প্রতি জীউতের ঘৃণা জন্মেছিল।নিক্সন এমনিতেও ইন্দিরাজীকে ভালোবাসত না।খোলাখুলিভাবে বলেও দিয়েছিলেন নাকি এইধরনের ভারতীয় নারীর সঙ্গে একই বিছানায় শুলেও উত্থিত হবে না আমার…।এই ধরনের নারীর চেয়ে আফ্রিকার নিতম্বিনী অনেক ওপরে।অন্ততঃ একটা জান্তব যৌনতা আছে…

      সন্ধ্যাবেলা জীউত সাহু ব্যাবসা সামলে চাপ্রা জেলার তাড়িওয়ালা যুগমোহনের ওখানে দুই ঘটি তাড়ি পান করে নিল।

      (জীউত সাহু কখনও লিমিট পার করে না,দুই ঘটি মানে দুই ঘটি তাড়ি।কেউ হাজার অনুরোধ করলেও তার এক আঙ্গুল ওপরেও যায় না।

      অবশ্য লালায় জীউতের হিসেবের গণ্ডগোল হয়।

      প্রায়ই কৌশলে সরিয়ে রাখা পাঠার চর্বি অথবা মাখনের মতো রক্তের লাড্ডুগুলি যুগমোহনের স্ত্রী শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভেজে দিয়েছিল।চর্বির ছোটো ছোটো বরফির মতো টুকরোগুলি থাকার দিন ওরা লাল খেয়েছিল।ছাগলীর মাথার অংশ,ঠেং যুগমোহনের স্ত্রী রাতের জন্য রেখে দিয়েছিল।)

      চুকাপথারের তখনকার সেণ্ড গ্রেভেল দেওয়া আঁকাবাঁকা পথে উচ্চস্বরে গাইছিল রামলীলার গান…

      শ্যাম তোহোর মুরলী বজেলি ধীরে ধীরে…

      বজেলী ধীরে ধীরে বজেলী ধীরে ধীরে…

      স্যাম তোহার …

      (সিনেমায় দেওয়া এই রামভজনটা জীউত প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা চিৎকার করে করে পাপ মোচনের জন্য গাইত।

      জীবন্ত পাঠাগুলিকে কোপ মেরে কেটে ফেলার পাপ।)

      এই সময় জীউত সাহু হয়ে পড়ত হনুমান দেবতা…

      সীতা মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসা বজরঙ্গী ভগবান…

      আর সীতা মা ইন্দিরাজী…

      (অবশ্য এত ভালোবাসলেও জীউত সাহু কখনও রাম হতে চায় নি।ব্যস হনুমানের মতো ইন্দিরাজীর সেবা করতে পারলেই হল।

      পবনপুত্র সচ্চা প্রেমী।নিস্বার্থ।)

      আর তারপরে…

      একের পরে এক মেঘনাদ বধ করে চলছিল।

      পহেলা মেঘনাদ ছিল ডিব্রুগড়ের দেউকান্ত বরুয়া।

      তার দেশের গভর্ণর ছিল।

      কবিতা লিখে লিখে ইন্দিরাজীর কাছ থেকে চেয়ার ছিনিয়ে নিয়েছিল।

      জীউত দেউকান্তকে সত্যিই দেখতে পারত না।

      (বলেছিল একদিন এই কবি ইন্দিরাজীকে দুঃখ দেবে।এ সচ্চা প্রেমী নয়।এর ধান্দা চেয়ার।

      একদিন দেউকান্ত ইন্দিরাকে ছেড়ে দিয়ে দেব্রাজের সঙ্গে কংগ্রেস(ইউ)তে যোগ দিয়েছিল।জীউত বলেছিল…দেখা দেখা…হমনে পহেলে হী বতায়া থা …)

      বাবু জগজীবন রাম।

      চামার ছিলেন।

      নিচ জাতির।ছুঁলে স্নান করতে হয়।

      চান্দোয়ার,জেলা ভৌজপুর।

      এক জায়গার হলেও বুড়োকে একদম সহ্য করতে পারত না জীউত।

      পুরো পঞ্চাশ বছর গদিতে ছিলেন।

      ওয়ার্ল্ড রেকর্ড।এত দীর্ঘকাল আজ পর্যন্ত কোনো পার্লামেন্টের মেম্বার হয় নি।

      একদম খারাপ টাইমে ইন্দিরাজীর সঙ্গে গাদ্দারি করেছে।

      হলে কী হবে ভগবান আছে তো।পুনরায় ফিরে এসে ইন্দিরাজীর পায়ের কাছেই আশ্রয় নিতে হল।

      দুই নম্ব্র মেঘনাদ … বাবু জগজীবন…

      চান্দোয়ার চামার।

      রোদেপোড়া দুপুরগুলিতে জীউত পাঁঠার মাংসের ছালগুলি পরিষ্কার করত।কয়েকদিন নুনের মধ্যে রেখে দেওয়া ছালগুলিতে লেগে থাকা চর্বির স্তরগুলি গলে জল হয়ে বয়ে যাচ্ছিল।

      চারপাশে চারটি খুঁটি লাগিয়ে সে ছাল্টা ফটফটে করে নেয়।


আরো পড়ুন: গুরমুখ সিংয়ের ইচ্ছাপত্র ।  সাদাত হাসান মান্টো


      একটা খুর দিয়ে একপাশ থেকে লোমগুলি কামিয়ে যায়।কয়েকদিন রোদে শুকোতে দেওয়ার পরে খড়খড়ে হওয়া ছালগুলি স্তূপীকৃ্ত করে রাখে।এক বোঝা হয়ে যাবার পরে সেগুলি নিয়ে যাবার জন্য মকবুল আসে।চামড়ার একটা পচা গন্ধ পুরো চুকাপথারে ছড়িয়ে পড়ে।প্রতিদিন গাওয়া বিহুগানের একটা সুর এবং ঘোড়ার খটখট শব্দ…

      সুরীদৌ ঐ শেনর এজাত

      কাম চরাই পানী সালে থিয় গরাত…

      ঘোড়াগাড়িতে বোঝাই করে নিয়ে যায় চামড়াগুলি।

      চামড়া বিক্রি করে পাওয়া পয়সাগুলি জীউতের দুই নম্বর স্ত্রী গুড়িয়া রেখেছিল।চামড়ার পয়সা তার।

      (হাবা-গোবা একটি মেয়ের জন্ম দিয়ে তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল।মানুষ বলত জীবন্ত পাঠাঁগুলিকে বলি দেবার আগে তোকে অভিশাপ দিয়েছিল।তাই তোর মেয়ের জিভটা ছাগলীর মতো সবসময় বাইরে বেরিয়ে থাকে।)

      হ্যাঁ হ্যাঁ…

      জীউতের হাবাগোবা মেয়েটি জিভটা একটা মরা ছাগলীর মতোই বাইরে বের করে রাখে।

      মুখ দিয়া ক্রমাগত লালা পড়তে থাকে।বুক,পেট ভিজে যায়…।উঠোনের এককোণে খাটিয়াটাতে মেয়েটি সারাদিন পড়ে থাকে।ক্ষুধা পেলে গোঁ গোঁ করে।প্রস্রাব পেলে গোঁ গোঁ করে।পিঠে পিঁপড়া কামড়ালে গোঁ গোঁ করে …

      গুড়িয়া মেয়েটিকে অসম্ভব ভালোবাসত।

      তার নিজের দেহের টুকরো যেন।

      সতীনের মেয়ের প্রতি গুড়িয়ার ভালোবাসা দেখে চুকাপথার,২নং বরাচুবুরির শরৎ ভূঞা সেকেণ্ড ম্যারেজ করেছিল।

      সারাদিন গুড়িয়া মেয়ের লালা মুছত।সে গুড়িয়ার একমাত্র সন্তান।

      জীউতের পাপ হয়েছিল।

      বাচ্চা হল না।সে গুড়িয়ার পেটে বাচ্চা দিতে পারল না।

      কোপ দেওয়ার আগে জীবন্ত ছাগলীগুলি দেওয়া পাপ।

      উঠোনে থাকা শিবলিঙ্গের মতো পাথরটার কাছে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা গুড়িয়া রামধনু গাইত।ডাহের কামড়ে গোঁ গোঁ করতে থাকা হাবা-গোবা মেয়েটির ওপরে একটা কাপড় নাড়াতে নাড়াতে।মৃদু ছন্দের সঙ্গে।রামধনুর সঙ্গে মিলে যাওয়া।ডাহের কুনকুন ধ্বনিটা যেন একটা বৃন্দগান।রামধুনকে অনুসরণ করে চলতে থাকা একটা মিহি পিয়ানোর নোট।

      গুড়িয়া কোনোদিনই ছাগলীর মাংস মুখে দেয় নি।বাজার থেকে ফেরৎ আসা ছাগলীর মাংস জীউত উঠোনে থাকা চুলোটাতে নিজেই ভেজে নিত।

      নাশাবন্দী না করার পরেও ছেলে-মেয়ে না হওয়ায় জীউত ভয় পেয়েছিল।

      তার বোধহয় পাপ হয়েছিল।যে সমস্ত পাপে মানুষ মহা-রৌরব নরকে পতিত হয়।

      দিল্লিতে গেলে একবার তিনমূর্তিতে থাকা ইন্দিরাজীর ঘরটা দেখবে বলে ভেবে থাকার সময়েই কারা যেন জীউতের বাড়িটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

      ধোঁয়া বেরোতে থাকা ছাইগুলির মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামের বাসন-পত্র গুলি পড়েছিল।

      আগুনে পুড়ে রূপোর মতো চকচকে হয়ে পড়েছিল।

      আগুন লেগে গুড়িয়ার চুলগুলি ছোটো হয়ে পড়েছিল।

      ইন্দিরাজীর চুলের মতো।

      বাড়ি পুড়ে যাবার পরে জীউত একেবারে নিশ্চিত হয়েছিল।

      তার পাপ লেগেছে।

      জীবন্ত ছাগলীকে হত্যা করার পাপ।

      তানাহলে অসম আন্দোলন করা যোগবাবুর ছেলে তার বাড়িটা কেন জ্বালিয়ে দেবে।

      কোনো কারণে জ্বালায় না।যোগবাবুর সঙ্গে সে চুকাপথারে একসঙ্গে বড়ো হয়েছে।এক জোড়া গুঁই সাপের মতো।একে অপরকে জানে।

      যোগবাবুর সঙ্গে জীউত ঘন্টার পরে ঘন্টা ইন্দিরাজীর কথা বলত।

      যোগবাবুও ইন্দিরাজীর সত্যিকারের প্রেমিক ছিলেন।

      এক পোয়া ছাগলীর মাংস আনতে গিয়ে তার সঙ্গে ঘন্টার পরে ঘণ্টা কথা বলা যোগবাবু তাকে বলেছিল দিল্লির রাধারমণের কথা।

      দিল্লি কংগ্রেসের প্রধান রাধারমণ ইন্দিরাজীর সত্যিকারের প্রেমিক ছিলেন।

      হাজার হাজার মানুষের ভিড় থেকে ইন্দিরাজীকে বাঁচানোর জন্য ষাঠের উর্ধের রাধারমণ ইন্দিরাজীর পায়ের কাছে লম্বা হয়ে পড়েছিল।রাধারমণের বৃদ্ধ দেহটি মাড়িয়ে মানুষ ইন্দিরাজীর কাছে পৌছাতে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছিল।

      পরের দিনই রাধারমণকে দিল্লি কংগ্রেসের প্রধানের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন ইন্দিরাজী।

      সত্যিকারের প্রেমের প্রতিদান পেয়েছিল রাধারমণ।

      জাইল সিং জাইল সিং …

      যে ইন্দিরাজী আসা যাওয়া পথ পরিষ্কার করে দিতে প্রস্তুত ছিলেন…

      সত্যিকারের প্রেমিক ছিলেন।জীউত ও কখনও ভাবত –সেও পাবে।একদিন সেও পেয়ে যাবে তার সত্যিকারের মোহব্বতের প্রতিদান।

      জীউত সাহু নিশ্চিত ছিল।

      তার পাপ লেগেছে।

      নাহলে যোগবাবুর ছেলে তার বাড়ি জ্বালিয়ে দিত না।

      সঙ্গে আসা বাকি কয়েকটি দাড়ি থাকা ছেলেগুলিকেও জীউত সাহু জানে।ওরা ইন্দিরাজীকে পছন্দ করে না।

      (জ্বলে যাওয়া বাঁশের চটি পরে জীউতের হাবাগোবা মেয়েটি আধমরা একটা ছাগলীর মতো ছটফট করছিল।

      তিনদিন পরে তার মৃত্যু হয়েছিল।

      আশ্চর্য আশ্চর্য…

      সেদিনই বিয়ন্ত সিঙের স্টারলিং সাব মেশিনগান গেরুয়া রঙের শাড়ি পরে থাকা জীউতের প্রাণের পুতুলকে ফুটো ফুটো করে দিয়েছিল।

      আশ্চর্য আশ্চর্য।

      অনেকদিন পরে জীউতকে কেউ শহরের রেলস্টেশনে দেখেছিল।গলায় একটা রশি লাগিয়ে একটা ছাগলীর মতো ব্যা ব্যা করে আওয়াজ করে মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষা করছিল।

      লোকেরা তাকে গান্ধী-ফাল্গা বলছিল।

 

 

 

     

     

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত