উনিশের চেতনা ও বরাকের বাংলা কবিতা

।। তু ষা র কা ন্তি নাথ।।

একষট্টির মহাসংগ্রামের কথা এই অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকদের ও শক্তি যুগিয়েছে, এই অঞ্চলের সাহিত্যচর্চাকে বেগবান করেছে। গেল শতাব্দীর আশির দশক থেকে বরাকের বাংলা কবিতার সুর বদলের দিকটি তুলে ধরে লেখক দেখিয়েছেন শব্দের মালায় কবি-সাহিত্যেকরা উনিশের চেতনাকে বেঁধেছেন ।

উনিশে মে বলতেই বরাকবাসীর চেতনায় ভেসে ওঠে ১৯৬১ সালের রক্তঝরা একটি দিনের কথা । উনিশে মে নিজেই এক ইতিহাস । আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত স্তম্ভ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মহাসংগ্রাম আর ত্যাগের ইতিহাস । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় গোটা বরাক উপত্যকায় যে দৃপ্ত উত্থান লক্ষ করা গিয়েছিল টা আজও এখানে এক বিরল উদাহরণ । প্রবল প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও সংগ্রামের মাধ্যমে এখানকার জনগণ তাদের ভাষিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়টি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছেন । যে কোনও জাতির ইতিহাসে কোনও বড় ঘতনা কিংবা কোনও আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টিশীল মানুষদের নাড়া দিয়ে যায় । এর প্রভাব পড়ে সমসাময়িক শিল্প-সাহিত্যে । উনিশে মে-র এগারো শহিদের আত্মাহুতির ঘটনা বরাক উপত্যকা ও পশ্চিমবঙ্গের লেখক-কবি-শিল্পী-সাংবাদিক সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে প্রচণ্ডরকম নাড়া দিয়েছিল । মনীশ ঘটক, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল),দক্ষিণারঞ্জন বসু, রামেনড্র দেশমুখ্য, কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রমুখ কবিরাও কবিতায় হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদমুখর ।

   ১৯৬১-র এই মহাসংগ্রামের কথা, জনজোয়ারের কথা, শহিদের মহান আত্মাহুতির কথা ষাটের দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে বা এখানকার সাহিত্যে খুব বেশি প্রতিফলিত হয়নি । সত্তরের দশকেও হয়েছে আরেক দফা আন্দোলন । ষাট-সত্তর দশকের ভাষা সংগ্রাম বরাক উপত্যকার কবিদের মনে রেখাপাত করে গেলেও তা তেমন কোণও অবারিত স্রোতধারার মতো সাহিত্যের পাতায় ধরা পড়েনি । অথচ এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গভীর । বস্তুত ষাট-সত্তরের দশকে যা ছিল না, তা সম্ভব হয়েছে আশির দশকে কিছু তরুণের সাহিত্যচর্চা তথা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনার মধ্য দিয়ে । রক্তাক্ত ভাষা সংগ্রাম তাদের চেতনাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। আর গত শতাব্দীর আশির দশকেই বরাকের সাহিত্যে এক বড়ধরনের বাঁক পরিবর্তন লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠে । এই দশকেই বরাকের সাহিত্য হয়েছে গ্রামমুখী ।

এ প্রসঙ্গে  ডঃ অমলেন্দু ভট্টাচার্য লিখেছেন – ‘আমি বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাসের সমর্থনে প্রমাণ দিতে রাজি আছি যে, ৮০-র  দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বরাক উপত্যকার সাহিত্য গ্রামমুখী । প্রচার মাধ্যমে যারা প্রচার চালাচ্ছেন তাঁরা বাস্তব সত্য জানেন না আর নয়ত জানতে আগ্রহী নন’ (খেলাঘর :শারদ সংকলন ১৩৯৭ :সমীপেষু :পৃঃ ২ ) । ওই সময়ে সাহিত্য গ্রামমুখী হয়েছে গ্রাম থেকে উঠে আসা একদল তরুণের আন্তরিক কাজকর্মে । এঁরা গ্রামাঞ্চল থেকে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা শুরু করেন । এসব লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে আরেক নতুন মাত্রা যোগ হল, আর তা হল ভাষা সংগ্রামের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া, বহির্জগতের কাছেও উনিশে মে-র গৌরবময় আবেদন পৌঁছে দেওয়া। এঁদের লেখনীতে ভাষাসংগ্রাম ও উনিশের চেতনা ভিন্ন মাত্রা লাভ করে । এঁরা পরিচয় দিয়েছেন সংগ্রামী চেতনার ।

  ষাট-সত্তরের দশকের সাহিত্যে এক বিশাল শূন্যতা আশির দশকে নতুন প্রজন্মের কবি ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা অনুভব করেছিলেন । সাহিত্যপত্র ‘ইত্যাদি’ (নবমবর্ষ:পঞ্চদশ প্রকাশ :১৯৮৮) –র সম্পাদকীয় নিবন্ধে এভাবে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে – ‘একথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায় বরাক উপত্যকার এ দশকের কবিরা সমাজ-সময় ও সর্বোপরি এ অঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ , বিদ্রোহ ও মাটির গন্ধ নিয়ে কবিতা লিখে যাচ্ছেন। যা গত দুই দশকে বরাকের কবিতায় লক্ষ করা যায়নি। … গত দুই দশকে বরাকের কবিরা মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা, তৎকালীন সময় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে লিখে গিয়েছিলেন কবিতা । সময়ের কোনও পদছাপ আমরা দেখতে পাই না সে সময়ের কবিতায়, এ এক ধূসর শূন্যতা আমাদের কাছে।‘ সত্তর দশকের শেষদিকে শুরু হওয়া দুরারোগ্য ব্যাধির মত আসাম আন্দোলন, নৈরাজ্য, রিরংসা, ভাষা সার্কুলার, বরাকে আবার ভাষা-সংগ্রাম, অস্তিত্ব সঙ্কট, সমকালীন সময়ের নষ্ট রাজনীতি ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জন্য আশির দশকের কবি ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা ঝলসে উঠেছিলেন । উনিশের চেতনা তাঁদের শক্তি যুগিয়েছে । তাঁরা লিখেছেন প্রতিরোধ- কবিতা । এ পর্যায়ে যাদের নাম উঠে আসে তাঁরা হলেন – বিজয়কুমার ভট্টাচার্য , জালাল উদ্দিন লস্কর, সুজিৎ দাশ, স্নিগ্ধা নাথ, স্মৃতি পাল নাথ , দিদারুল ইসলাম, দিগ্বিজয় পাল, শেলী দাসচৌধুরী, আশিসরঞ্জন নাথ, তুষারকান্তি নাথ, পার্থপ্রতিম মৈত্র, পীযূষকান্তি নাথ, মাশুক আহমদ, সুশান্ত কর, পরম ভট্টাচার্য, আশুতোষ দাশ, শোভনলাল ভট্টাচার্য, জয়দেব ভট্টাচার্য, তপনকান্তি নাথ, স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ । আর আশির দশকে প্রকাশিত কলিযুগ, খেলাঘর, চম্পাকলি, অনির্বাণ শিখা, প্রহরী, প্রবাহ, ইত্যাদি, গণআরশি, দিগ্বলয়, ঘোড়সওয়ার, প্রতিস্রোত ইত্যাদি সাহিত্যপত্রের উনিশের সংকলনগুলো উনিশের উন্মোচিত-ফলক তৈরিতে বিরাট অবদান রেখেছে । বস্তুত বরাকের সাহিত্যচর্চার ধারায় আশির দশক ছিল এক অত্যুজ্জ্বল সময়। বিবর্ণ সময়ের বিপ্রতীপে আশির দশকের কবি ও সাহিত্যপত্রগুলোর ছিল উজ্জ্বল উচ্চারণ । অথচ বরাক উপত্যকার সাহিত্য-আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকে এই দশকের কথা সামান্য স্পর্শ করেই শেষ করেন ।

 একথা স্বীকার্য যে, বরাক উপত্যকার কবিতায় ষাট-সত্তর দশকও ছিল উল্লেখযোগ্য

সময় । ‘অতন্দ্র’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একদল কবি একটা প্রচণ্ড ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন । কবিতার সামুদ্রিক বিস্তার ঘটেছিল এখানে । কিন্তু ১৯৬১-র মহান ভাষা-সংগ্রামের চেতনা ও সমকালীন সময়ের নৈরাজ্য-বিপর্যয়-সঙ্কট-ক্ষোভ তাঁদের কবিতায় প্রতিফলিত হয়নি । এ প্রসঙ্গে কবি-প্রাবন্ধিক অনুরূপা বিশ্বাসের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য : ‘ষাটের দশক থেকে উদ্যত বিপদের বিরুদ্ধে সমুত্থিত এই আন্দোলন গোড়ার দিকে কবি-সাহিত্যিকদের মনোযোগ তেমন আকর্ষণ করতে পারেনি । বেশিরভাগ ব্যস্ত ছিলেন মগ্ন- চেতনার গভীর থেকে ডুবুরির মত মণিমুক্তো চয়নে । আর এ সবই ছিল ব্যক্তিগত অনুভব সঞ্জাত’ ( উনিশের স্মরণিকা :শিলচর শহর আঞ্চলিক কমিটি, ব.উ.সা.স.স.:১৯৮৭ :পৃঃ- নেই ) । অন্যত্রও তিনি সখেদে বলেছেন : ‘উনিশে মে যে বিরলতম ঘটনা ঘটেছিল, বরাক উপত্যকার ব্যাপক জনজীবনে যে বিস্ফোরণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বিশাল অভ্যুত্থান ও জনজাগরণ সমসাময়িক কবি, লেখকদের মায়াঘুম ভাঙাতে পারেনি । তাঁরা তাঁদের স্বেচ্ছাবৃত সৃষ্টির ভুবনে মগ্ন ছিলেন তখনও’ ( প্রসঙ্গ বরাকের সাহিত্য :২০০১ :পৃঃ ১১) । মননশীল সমালোচক তথা বরাক উপত্যকায় সমুচ্চ বুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত অধ্যাপক আবুল হোসেন মজুমদারও অনুরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেন : ‘দেশ বিভাগ- জনিত অস্থিরতা, বাস্তুহারা মানুষের জীবন সংগ্রাম, হিন্দু-মুসলিম অবিশ্বাস, আরও কত কী । ষাটের দশকের শুরুতেই ভাষা আন্দোলন। একাদশ শহিদের রক্তে শিলচরে রক্তস্নান । এসব ঘটনার কোনও ছায়াপাতই কি প্রত্যাশিত ছিল না ষাটের কবিদের কাছে ? দুঃখের বিষয় অতন্দ্র – গোষ্ঠীর কবিরা সে প্রত্যাশা পূরণ করেননি একেবারেই । … সুখকর চিত্র আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছে আশির দশক । … আশির দশকের বরাকের কবিতায়, বিশেষত নতুন কবিদের লেখায় ক্ষোভের সঙ্গে প্রতিরোধ, প্রতিবাদ, আশা-নিরাশার দোলাচল এবং পরিবর্তন কামনা একটা যুগলক্ষণ । এরা এমনকী প্রেমকেও অস্বীকার করেন, অথবা জৈবিক কামনাকে দূরে রেখে মৃদুপ্রণাম জানিয়ে কাজ শেষ করেন । ষাটের দশকের কাব্যচর্চার সঙ্গে আশির দশকের কাব্যচর্চার প্রভেদ ও পার্থক্য এখানেই’ (বরাক উপত্যকার কবিতায় সমাজমনস্কতা, আশির দশকে (নিবন্ধ) :প্রবাহ :আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯২ :পৃ:৩৫,৩৭-৩৮) । তিনি আরও বলেছেন : ’১৯ শে মে ১৯৬১ সালের পরে উঠে এসেছে একটা নতুন প্রজন্ম । এদের কেউ কেউ সে সময় ছিলেন নিছক শিশু, কারও জন্মই হয়নি । বড় হতে হতে এরা লখ্য করলেন আমাদের স্ববিরোধিতা , অবক্ষয় , বঞ্চনা, রাজনীতির জুয়াখেলা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাজনিত ফ্রাসটেশন থেকে এরা হয়ে উঠলেন সংগ্রামী, প্রতিবাদী, প্রতিরোধী। শিল্পীর সংবেদনশীলতা এদেরকে টেনে নিল ক্ষয়ে ক্ষয়ে বেঁচে থাকা মানুষের কাছে। তাদের যন্ত্রণা, তাদের সংগ্রামের শরিক হলেন এরা । আশির দশকে বরাকের কাব্যচর্চায় এই পালাবদল সহজেই চোখে পড়ে । আর নতুন চেতনার উন্মেষে ইন্ধন যুগিয়েছে ভাষা সংগ্রামের অভিজ্ঞতা’ ( কবিতা আমার শহিদ মিনার :১৯৮৯ :ভূমিকা )।

  নানা দৃককোণ থেকে এভাবে আলো ফেলে লক্ষ্য করা যায় যে, ষাট দশকের পরবর্তী সময়ে, বিশেষত আশির দশক থেকে যুগচেতনা বরাকের কবিদের সৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। উনিশ তাঁদের শক্তি যুগিয়েছে, বরাকের কাব্য-সাহিত্যচর্চাকে বেগবান করেছে। শব্দের মালায় তাঁরা উনিশের চেতনাকে বেঁধে দিয়েছিলেন । আশির দশক থেকেই এখানকার বাংলা কবিতা ভিন্ন খাতে বয়ে চলেছে । ঐতিহাসিক বাঁক পরিবর্তনের এই বিশেষ তাৎপর্যেই এই পর্বের সাহিত্য পৃথক মূল্যায়নের দাবি রাখে ।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত