| 19 জুলাই 2024
Categories
এই দিনে কবিতা সাহিত্য

নির্মলেন্দু গুণের নির্বাচিত কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট


কবি নির্মলেন্দু গুণের (Nirmalendu Goon) পুরো নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। ১৯৪৫ সালের ২১শে জুন (৭ই আষাঢ় ১৩৫২ বঙ্গাব্দ) তিনি নেত্রকোনার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক কবি হিসাবে খ্যাতিমান হলেও কবিতার পাশাপাশি চিত্রশিল্প, গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনীতেও তিনি স্বকীয় অবদান রেখেছেন। ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রেমাংশুর রক্ত চাই” প্রকাশিত হবার পর থেকেই তিনি তীব্র জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর কবিতায় প্রেম ও নারীর পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধিতা ও শ্রেণীসংগ্রামের বার্তা ওঠে এসেছে বার বার। তাঁর বহুল আবৃত্ত কবিতা সমূহের মধ্যে হুলিয়া, মানুষ, আফ্রিকার প্রেমের কবিতা, একটি অসমাপ্ত কবিতা, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আজ কবির শুভ জন্মতিথিতে ইরাবতী পত্রিকা কবিকে জানায় বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। ইরাবতী পত্রিকার পাঠকদের জন্য রইল কবির কয়েকটি নির্বাচিত কবিতা।


 

স্ববিরোধী

আমি জন্মেছিলাম এক বিষণ্ন বর্ষায়,
কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত ।
আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে,
কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল ।
আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে,
কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি ।
আমি জন্মেছিলাম ছায়াসুনিবিড় গ্রামে,
ভালোবাসি বৃক্ষহীন রৌদ্রদগ্ধ ঢাকা ।
জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম,
এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায় ।
আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম,
এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি ।



যাত্রা-ভঙ্গ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷

তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরনী নায়ে৷

নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷
তুই কেমন করে যাবি?



তোমার চোখ এতো লাল কেন?

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার
জন্য।
বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন
ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা
নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না।
আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায়
থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুকঃ
আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে
কিনা,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে
পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের
দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত
আমাকে
জিজ্ঞেস করুকঃ “তোমার চোখ এতো লাল
কেন?”



পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু

একদিন চাদঁ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো
মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে
একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয়বন্ধু হবে
একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।

একদিন চুল কাটতে যাবোনা সেলুনে
একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো
একদিন কালো চুলগুলো খসে যাবে, একদিন
কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।

একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে
ট্রেনের টিকিট কেটে
একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না
একদিন পরাজিত হবো।

একদিন কোথাও যাবো না, শূণ্যস্থানে তুমি
কিম্বা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স
একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে
পূর্ণিমার রাত্রে মরে যাবো।

একদিন সারাদিন কোথাও যাবো না।


 


শুধু তোমার জন্য

কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে
গিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও
কতবার যে আমি সে কথা বলিনি
সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে
জেগে উঠবার জন্য
দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে
রেখেছিলাম
আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে
বলবেঃ
‘এই ওঠো,
আমি, আ…মি…।‘
আর অমি এ-কী শুনলাম
এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো
তোমার উদ্দেশ্যে
কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি
মনে মনে
কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর
জানেন।
আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য,
আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য,
আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে
তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু
তোমার জন্য।


 


ওটা কিছু নয়

এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার
অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ?
একটু দাঁড়াও আমি তৈরী হয়ে নিই ।

এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার
অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ?
তেমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার ।
ওটা নয়, ওটা চুল ।

এই হলো আমার আঙ্গুল, এইবার স্পর্শ
করো,–না, না, না,
-ওটা নয়, ওটা কন্ঠনালী, গরলবিশ্বাসী এক
শিল্পীর
মাটির ভাস্কর্য, ওটা অগ্নি নয়, অই আমি–
আমার যৌবন ।

সুখের সামান্য নিচে কেটে ফেলা যন্ত্রণার
কবন্ধ–প্রেমিক,
ওখানে কী খোঁজ তুমি ? ওটা কিছু নয়, ওটা
দুঃখ ;
রমণীর ভালোবাসা না-পাওয়ার চিহ্ন বুকে
নিয়ে ওটা নদী,
নীল হয়ে জমে আছে ঘাসে,–এর ঠিক ডানপাশে
, অইখানে
হাত দাও, হ্যাঁ, ওটা বুক, অইখানে হাতা
রাখো, ওটাই হৃদয় ।

অইখানে থাকে প্রেম, থাকে স্মৃতি, থাকে সুখ,
প্রেমের সিম্পনি ;
অই বুকে প্রেম ছিল, স্মৃতি ছিল, সব ছিল
তুমিই থাকো নি ।



ঐক্যবদ্ধ জল

জলের সাথে আছে জলের গভীর পরিচয়,
সমুদ্র তাই ঐক্যবদ্ধ, পাহাড় ততো নয় ।
পাহাড় হলো একটা থেকে অন্যটা বেশ দূরে,
কিন্তু সাগর মহাসাগর বাঁধা একই সুরে ।

ধ্যানী পাহাড় আপন ধ্যানে থাকে পৃথক একা,
তখন তুচ্ছ নদীর সাথে সাগর করে দেখা ।
নদীর যতো জলের ধারা সাগর বুকে বয়
সমুদ্র তাই ঐক্যবদ্ধ, পাহাড় ততো নয় ।

পাহাড় হলো অহংকারী শিখর হিমাদ্রির,
সাগর সদা গতিচঞ্চল প্রতীক পৃথিবীর ।
সইতে জানে, বইতে জানে সারা জগৎময়,
সমুদ্র তাই ঐক্যবদ্ধ, পাহাড় ততো নয় ।



স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর

জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত
বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি
দীর্ঘজীবী হও।
তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার
অস্তিত্বে, স্বপ্নে,
প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে,
মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি
দীর্ঘজীবী হও।
তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয়
থেকে
সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন,
ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো।
তুমি বেঁচেছিলে মানুষের কলকোলাহলে,
জননীর নাভিমূলে ক্ষতচিহ্ন রেখে
যে তুমি উল্ঙ্গ শিশু রাজপথে বেরিয়ে
এসেছো,
সে-ই তুমি আর কতদিন ‘স্বাধীনতা,
স্বাধীনতা’ বলে
ঘুরবে উলঙ্গ হয়ে পথে পথে সম্রাটের মতো?
জননীর নাভিমূল থেকে ক্ষতচিহ্ন মুছে দিয়ে
উদ্ধত হাতের মুঠোয় নেচে ওঠা, বেঁচে থাকা
হে আমার দূঃখ, স্বাধীনতা, তুমিও পোশাক
পরো;
ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো
আমারো শরীরি থেকে
ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা।
বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়,
বলো দূঃখ কোনো স্বাধীনতা নয়,
বলো ক্ষুধা কোন স্বাধীনতা নয়,
বলো ঘৃণা কোন স্বাধীনতা নয়।
জননীর নাভিমূল ছিন্ন-করা রক্তজ কিশোর
তুমি
স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে
থাকো
আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল
পেন্সিলের
যথেচ্ছ অক্ষরে,
শব্দে,
যৌবনে,
কবিতায়।


 


তুলনামূলক হাত

তুমি যেখানেই স্পর্শ রাখো সেখানেই আমার
শরীর৷
তোমার চুলের ধোয়া জল তুমি যেখানেই
খোঁপা ভেঙ্গে বিলাও মাটিকে;
আমি এসে পাতি হাত, জলভারে নতদেহ আর
চোখের সামগ্রী নিয়ে ফিরি ঘরে, অথবা ফিরি
না ঘরে,
তোমার চতুর্দিকে শূন্যতাকে ভরে থেকে যাই৷
তুমি যেখানেই হাত রাখো, যেখানেই কান
থেকে
খুলে রাখো দুল, কন্ঠ থেকে খুলে রাখো হার,
সেখানেই শরীর আমার হয়ে ওঠে রক্তজবা
ফুল৷
তুমি যেখানেই ঠোঁট রাখো সেখানেই আমার
চুম্বন
তোমার শরীর থেকে প্রবল অযত্নে ঝরে
যায়৷
আমি পোকা হয়ে পিচুটির মতো
তোমার ঐ চোখের ছায়ায় প্রতিদিন খেলা
করে যাই,
ভালোবেসে নিজেকে কাঁদাই৷
তুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিলে
আমি রথ রেখে পথে এসে তোমারই দ্বৈরথে
বসে থাকি
তোমার আশায়৷ তুমি যেখানেই হাত রাখো
আমার উদগ্রীব চিত্র থাকে সেখানেই৷ আমি
যেখানেই
হাত পাতি সেখানেই অসীম শূন্যতা, তুমি
নেই৷


 


নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ

নেকাব্বর জানে তাঁর সম্পত্তির হিসাব চাইতে
আসবে না
কেউ কোনোদিন।
এই জন্মে শুধু একবার চেয়েছিল একজন, ‘কী
কইরা
পালবা আমারে,
তোমার কী আছে কিছু তেনা?’
সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে ফাতেমাকে জড়িয়ে
দু’হাতে বুকে পিষে
বলেছিল নেকাব্বর;
‘আছে, আছে, লোহার চাককার মতো দুটা
হাত,
গতরে আত্তীর বল – আর কীডা চাস্ মাগী।’
‘তুমি বুঝি খাবা কলাগাছ?’
আজ এই গোধুলিবেলায় প্রচন্ড ক্ষুধার
জ্বালা চোখে নিয়ে
নেকাব্বর সহসা তাকালো ফিরে সেই
কলাবাগানের গাঢ় অন্ধকারে।
তিরিশ বছর পরে আজ বুঝি সত্য হলো
ফাতেমার মিষ্টি উপহাস।
পাকস্থলি জ্বলে ওঠে ক্ষুধার আগুনে, মনে হয়
গিলে খায়
সাজানো কদলীবন,’
যদি ফের ফিরে পায় এতটুকু শক্তি দুটি হাতে,
যদি পায়
দাঁড়াবার মতো এতটুকু শক্তি দুটি পায়ে।

কিন্তু সে কি ফিরে পাবে ফের?
ফাতেমার মতো ফাঁকি দিয়া সময় গিয়েছে ঢের
চলে।
কারা যেন ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গেছে সব
শক্তি তার।
বিনিময়ে দিয়ে দেছে ব্যাধি, জরা, দুর্বলতা,
বক্ষে ক্ষয়কাশ-
অনাদরে, অনাহারে কবরে ডুবেছে সূর্য,
ফাতেমার তিরিশ বছর।

এখন কোথায় যাবে নেকাব্বর?
হয়তো গিলেছে নদী তার শেষ ভিটেখানি,
কবর ফাতেমা-
কিন্তু তার শ্রম. তার দেহবল, তার
অকৃত্রিম নিষ্ঠা কারা নিলো?
আজ এই গোধুলিবেলায় এই যে আমার
পৃথিবীকে মনে হলো পাপ,
মনে হলো হাবিয়া দোজখ – কেউ কি নেবে না
তার এতটুকু দায়?
মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চায় না সুদুরে চলে যেতে,
নেকাব্বর ভাবে,
অজানা অচেনা স্বর্গে বুঝি মেটে বাস্তবের
তৃষ্ণা কোনোদিন?
তবু যারা চায়, তারা কেন চায়? তারা কেন
চায়? কেন চায়?

নেকাব্বর শুয়ে আছে জীবনের শেষ ইস্টিশনে।
তার পচা বাসী শব
ঘিরে আছে সাংবাদিক দল। কেউ বলে
অনাহারে, কেউ বলে অপুষ্টিতে,
কেউ বলে বার্ধক্যজনিত ব্যাধি, – নেকাব্বর
কিছুই বলে না।


 


আমার জলেই টলমল করে আঁখি

নিজের জলেই টলমল করে আঁখি,
তাই নিয়ে খুব বিব্রত হয়ে থাকি।
চেষ্টা করেও রাখতে পারি না ধরে-
ভয় হয় আহা, এই বুঝি যায় পড়ে।
এমনিই আছি নদীমাতৃক দেশে,
অশ্রুনদীর সংখ্যা বাড়াবো শেষে?
আমার গঙ্গা আমার চোখেই থাক্
আসুক গ্রীষ্ম মাটি-ফাটা বৈশাখ।
দোষ নেই যদি তখন যায় সে ঝরে,
ততদিন তাকে রাখতেই হবে ধরে।
সেই লক্ষেই প্রস্তুতি করে সারা,
লুকিয়েছিলাম গোপন অশ্রুধারা।
কিন্তু কবির বিধি যদি হন বাম,
কিছুতে পূর্ণ হয় না মনস্কাম।
মানুষ তো নয় চির-সংযমে সাধা,
তাই তো চোখের অশ্রু মানে না বাঁধা।
আমার জলেই টলমল করে আঁখি,
তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি।

 


আমার বসন্ত 

এ না হলে বসন্ত কিসের? দোলা চাই
অভ্যন্তরে,
মনের ভিতর জুড়ে আরো এক মনের মর্মর,
পাতা ঝরা, স্বচক্ষে স্বকর্ণে দেখা চাঁদ,
জ্যোৎস্নাময়
রাতের উল্লাসে কালো বিষ । এ না হলে
বসন্ত কিসের ?
গাছের জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়েছে অপিচ্ছিল বোধ,
ওর মুখে কুমারীর খুন, প্রসূতির প্রসন্ন
প্রসূন ।
কন্ঠ ভরে করি পান পরিপূর্ণ সে-পাত্র
বিষের,
চাই পূর্ণ শিশিরে নির্ঘুম । এ না হলে বসন্ত
কিসের?

 


শিয়রে বাংলাদেশ

আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
তুই তখনও ছিলি আমার স্বপনে।
আমি পাঁজর খুলে বলেছিলাম তোকে,
আমার বুকে যা আছে তুই সব নে ॥
আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
তুই তখনও ছিলি মায়ের ভ্রণে।
আমি অস্ত্রজ্ঞানে আড়াল করে তোকে
তীর বানিয়ে রেখেছিলাম তূণে ॥
আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
তুই তখনও ছিলি জন্ম-আশায়।
তোকেই তখন বড় করে দেখেছিলাম বলে
সঁপিনি মন নারীর ভালোবাসায় ॥
আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম হাতে।
যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম দূরপাহাড়ী বনে
যদিও সায় ছিলো না হত্যাতে ॥
আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
টগবগে লাল রক্ত ছিলো বক্ষে।
তখন তোকে নরক থেকে মুক্ত করা ছাড়া
আর কী শ্রেয় ছিলো আমার পক্ষে ?
আমার যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো,
বিজয়-গর্ব ছিলো না তোর স্বরে।
আমি তোকে বিজয় দিয়ে বিজয়বতী করে
দিয়েছিলাম ষোলোই ডিসেম্বরে ॥
এখন যখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হলো তোর,
আমি তখন তোকে রেখে পঞ্চাশে দেই দৌড়।
রজতে নয়, সুবর্ণতে এ-দৌড় হবে শেষ,
তখনও তুই থাকবি আমার শিয়রে বাংলাদেশ।




হুলিয়া
(‘হুলিয়া’ কবিতার রফিজ আর নেই)

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে৷
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ
থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহকুমা
স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন
থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিত্কার করে উঠেছিল;- আমি
সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে
দিয়েছি৷
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন
রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর
থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন
না৷
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনলো না৷
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে
ফিরছি আমি৷
সেই একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল
ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি৷
আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ-শোঁ করছে হাওয়া৷
অনেক বদলে গেছে বাড়িটা,
টিনের চাল থেকে শুরু করে পুকুরের জল,
ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই
কোনখানে৷
পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের
গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লক্লকে
জিভ দেখালো৷
স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির
চতুর্দিকে ঘাস, জঙ্গল,
গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে
অনায়াসে; যেন সবখানেই
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে
গোঁয়ার প্রকৃতি৷
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল
প্রায়,
আমাকে দেখেই পালালো একজন, একজন গন্ধ
শুঁকে নিয়ে
আমাকে চিনতে চেষ্টা করলো- যেন পুলিশ-
সমেত চেকার
তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল৷
হাঁটতে- হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে
দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া
অশোক,
একসময়ে কী ভীষন ছায়া দিতো এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারতো
এর ছায়ায়৷
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়ে ছিলুম৷
সেই বাসন্তী, আহা, সেই বাসন্তী এখন
বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার- সন্তানের জননী
হয়েছে৷
পুকুরের জলে শব্দ উঠলো মাছের, আবার
জিভ দেখালো সাপ,
শান্ত-স্থির-বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে– -৷
আমি বাড়ির পেছন থেকে দরোজায় টোকা
দিয়ে
ডাকলুম,— “মা’৷
বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে দরোজায় কোন কন্ঠস্বর ছিল না,
মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ
শব্দ করে খুলে গেলো৷
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ
আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার
ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী
হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ
রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম৷
মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম
করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন; আমি ঘরের
ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে
সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা- খরচের পাশে
কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙ্গা- কাচের অভাব পূরণ
করছে
ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি৷
মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহকুমা শহর
থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ
ঝুলবে তেমনি৷
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন
আমাকে৷
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী
ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে
আসবে আদিত্য৷
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা
থেকে আসবে আব্বাস৷
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
– আমাদের ভবিষ্যত্ কী?
– আইয়ুব খান এখন কোথায়?
– শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?
– আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া
ঝুলবে?
আমি কিছুই বলবো না৷
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি
চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্য়্ত্কে চেয়ে চেয়ে
দেখবো৷
উত্কন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো
অন্ধকার, আমি চিত্কার করে
কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে
বলবো:
‘আমি এসবের কিছুই জানি না,
আমি এসবের কিছুই বুঝি না৷’

 

 

অক্সি-এসিটিলিনের শিখা


হাজার হাজার কোটি শব্দের ভিড়ে মিশে-যাওয়া তোমার নাম
টন টন অন্ধকারের ভিতর থেকে মুহূর্তের মধ‌্যে জ্বলে উঠলো
কম্পিউটারের রূপালি পর্দায়, যেন অক্সি-এসিটিলিনের শিখা।
আর তা দেখামাত্র আমি অপেক্ষমাণ প্রেমিক-পতঙ্গের মতো
মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তোমার ঐ অগ্নিজ্বলা নামের ভিতরে।

অমরত্ব অর্জনের পথে আমার আর কোনো বাধাই থাকল না।

 

 

একটা সারাদিন কিছুই করবনা আমরা


একটা সারাদিন কিছুই করবনা আমরা,
না কিছুই না।।
হয়তো সারাটাদিন আমরা পাশাপাশি
বসে থাকব,অনন্তকালের মতো ।।
হয়তো আবার একাও থাকবো,
কিন্তু সত্যি বলছি একটা সম্পূর্ণ দিন আমরা
কিছুই
করবনা।।এই হেমন্তে যে নদী মৃত্যুর প্রস্তুতি
নেবে
আগামী শীতের,তার মতো আমরাও প্রস্তুত
হবো
আমাদের একটা সারাদিনের জন্যে, এই
হেমন্তে।।
কে জানে বলো;
আগামী শীতে হয়তো আমরা থাকবনা।।




মুঠোফোনের কাব্য

‘‘পাগলী আমার ঘুমিয়ে পড়েছে
মুঠোফোন তাই শান্ত,
আমি রাত জেগে দিচ্ছি পাহারা
মুঠোফোনের এই প্রান্ত ।
এ কথা যদি সে জানতো ?
আমিও দিই না জানতে,
কবির প্রেম তো এরকমই হয়-
পান্তা ফুরায় নুন আনতে ।
হে চির-অধরা আমার,
তুমি তো সেকথা জানতে ।’’



বিষ্টি

আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা
বাতাস জুড়ে বিষ্টি,
গাছের পাতা কাঁপছে আহা
দেখতে কী যে মিষ্টি!
কলাপাতায় বিষ্টি বাজে
ঝুমুর নাচে নর্তকী,
বিষ্টি ছাড়া গাছের পাতা
এমন করে নড়তো কি?
চিলেকোঠায় ভেজা শালিখ
আপন মনে সাজ করে,
চঞ্চু দিয়ে গায়ের ভেজা
পালকগুলি ভাঁজ করে।
হাঁসেরা সব সদলবলে
উদাস করা দিষ্টিতে
উঠানটাকে পুকুর ভেবে
সাঁতার কাটে বিষ্টিতে।
আকাশ এতো কাঁদছে কেন
কেউ কি তাকে গাল দিলো?
ছিঁচকাঁদুনে মেঘের সাথে
গাছগুলি কি তাল দিলো?
সকাল গেল, দুপুর গেল-
বিকেল হ’য়ে এলো কী?
আচ্ছা মাগো তুমিই বলো
মেঘেরা আজ পেলো কী?

 


স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো


একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার
উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী
শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জন সমুদ্রের উদ্যান সৈকতে:
‘কখন আসবে কবি’?
এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল
না।
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল
বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে,
বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?
জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে
উদ্যত
কালো হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ
প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ…।
হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে
তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের
কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।
সেদিন এই উদ্যানের রুপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান, – এসবের কিছুই
ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম
দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে
সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে
মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে।
কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার
শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে
উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত
যুবক।
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে
এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ,
বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মতো শিশু পাতা- কুড়ানীরা
দল বেঁধে।
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: ‘কখন আসবে কবি?’
‘কখন আসবে কবি?’
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল
জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার
বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর
অমর-কবিতা খানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।



এবারই প্রথম তুমি

ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে
মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না
ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে
ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না৷
ফুলেও ছিলে না, ফলেও ছিলে না
নাকে মুখে চোখে চুলেও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি এখানে ছিলে না
এর আগে তুমি সেখানে ছিলে না
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
রাতের পুণ্য লগনে ছিলে না
নীল নবঘন গগনে ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷
এর আগে তুমি তুমিও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷




উপেক্ষা

অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য
শিখিনি৷
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে
পারি
সমস্ত বোধের উত্স গ্রাস করা প্রেম; যদি
চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা
দেখাও৷
আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারি
বিরহে?

 

মানুষ


আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো
অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে
যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে
পালায়।
আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে
থাকি,
গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান
গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে আছি আমার মতো।
অবাক লাগে।
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো
থাকতো।
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো,
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে স্বামী থাকতো,
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো।
আমি হয়ত মানুষ নই,
মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন?
মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে,
নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে,
নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে।
ভালবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে।
মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো,
চোখের মধ্যে অভিমানের রাগ থাকতো,
ভালবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো।
আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে তোমার লেখা কবিতা শোনা
আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত
বেঁচে-থাকাটা আর হতো না।
মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই,
অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি।

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত