নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

আজ ২১ নভেম্বর কবি নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


চন্দ্রমা হয় 

দু’ধারে পথের ফুলের বাগানে গান

প্রিয়‚ তোমাকে দিচ্ছি প্রকৃতির সম্মান।

প্রকৃতির পাশে আমিও সফল এই

মাথা তুলে দেখি কোথাও কষ্ট নেই।

কষ্ট এখানে রুদ্ধের মাটি দেশে

চন্দ্রমা হয় মৃত্যু নিরুদ্দেশে।

সারথি

শোন্‌
একটা জরুরি দরকারে তোকে ফোন করলাম
জিগ্যেস করিস না যেন আবার
কেন এত রাতে বা দিনে বা অসময়ে
বা তুই এখন কার সঙ্গে কোন নাইট ক্লাবে বা সুইজারল্যান্ডে বা খালসিটোলার বাংলা ঠেকে
বা উইক এন্ডে লাস ভেগাসে ক্যাসিনো রয়্যালে , তা জেনে আমার কোন লাভ নেই

তুই যে চুলোয় থাক , এই কল লোকাল , এস টী ডি না আই এস ডি
এই সব ফালতু বকে
টাইম নষ্ট না করে , বাইরে আয়, ফাঁকায় , নিরিবিলি
একটু কাজের কথা বলি।

শোন , আবার আমাদের নামতে হবে , এই হল মোদ্দা কথা
এবার আমাদের কাজ আরও কঠিন এবং সোজা
এবার কোন অশ্বারোহী নেই, নেই কোন গজযূথপতি
না আছে ঢাল তরোয়াল , না আছে নিয়মের নীতি ।
সব কিছু রিমোটেই চলে , তাও লাগেনা , যদি ভালয় ভালয় কাজ যায় সারা

এবার সমস্যা হল , জোটগুলো বোঝা,
আজ কে কার সঙ্গে , কাল সে কোথায় থাকবে
ভাল করে খোঁজা । বাংলা ভাষায় বলি শোন , কারও কারও আছে কাঁচামাল
কারও হাতে প্রযুক্তির কামাল।
তবে তাই দিয়ে , তুই থাকতে , দুনিয়া জোড়া মাতব্বরি ?
করে খাবে? ধান্দাবাজেরা?

মনে আছে?
পাঁচ খানা গ্রাম মাত্র চেয়েছিলি তোরা।
কেউ কেউ চাইছে আজও , পিতৃভূমি , মাতৃভূমি,
তুলে নিতে কাঁটা তার বেড়া । কেউ কেউ চেয়েছিল
একটু আধটু ছাতের নিচে বসে , একটু আধটু প্রিয় নাম ডাকা।

কেউ কেউ চেয়েছিল , নিজের জমির ধান, তামাকের স্বাদ
থেকে যেন বঞ্চিত হয়ে , কিনতে না হয় , প্যাকেটের ফল ও দুধ
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কোথায় কোন তারিখে আছে আগ মার্কা ছাপ তার আঁকা

কেউ কেউ চেয়েছিল , বন ওর বনের ফলমূল, ঝরে যাওয়া শুকনো দুটো পাতা
জ্বাল দিয়ে নুন-চা আর সঙ্গে লেড় বিস্কুট। জল দেখে সেই জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে
সেই জল বুক ভরে , পেট ভরে টেনে , মাথার নিচে হাত রেখে
ঘুম দেশে ভেসে চলে যাওয়া ।

সেই সব বনভুমি , জমি সব আবাদি পতিত
গ্রাম কে গ্রাম গিলে নিচ্ছে, উগরে দিচ্ছে হ্যালোজেন শহর ,
শিল্প হবার আগেই নেমে পড়ছে ব্যবসা দেহের আর তুই?
গালে হাত দিয়ে ভাবছিস , কার সঙ্গে লড়বি এখন?

সত্যি, এটা ঠিক , ফারাক করা কঠিন হয়েছে খুব ,
কে যে কৌরব আর কে যে পান্ডব
আমারই গুলিয়ে যায় , যদি দেখি হাতে নেই গাণ্ডীব
বদলে রকেট লাঞ্চার , কালাশনিকভ আর স্যাটেলাইট ফোন

ধর্ম যুদ্ধ কাকে বলে, কাকে বলে আমরণ জিহাদ
কাকে বলে ফাসিস্ত আর সত্যি করে কোনটা সমাজবাদ
গুলিয়ে যাচ্ছে খুব আমারই, তুই ত’ কোন ছার।

শুধু জেনে রাখ্‌, অধর্মে তারাই রয়েছে যারা
কেড়ে নিচ্ছে একটা থেকে আধখানা রুটি
কেড়ে নিচ্ছে বুকের বউ রাতের স্বপ্ন মাখা ঘুম
অপরাধ ? মাটির নিচে আছে তেল ,
দামি দামি আকরিকে ভরা।

তাদের মনের মানুষ যে দেশের সিংহাসনে নেই
সে দেশে গণতন্ত্র , প্রজাতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা পালাবেই

তবু তোর গালে হাত ? তবু তোর ভুরুতে গভীর চিন্তার ছাপ?
কাল বাদে নাতি হবে তোর , অভিমন্যু উত্তরার ছেলে
নাত-বউ কি করে একা ফিরবে একটু বেশি রাত্তির হয়ে গেলে ?

চলে আয় , সঙ্গে নিয়ে যত কিছু অধীত আয়ুধ । সমুদ্রের নিচ থেকে
তুলে আন রিমোটে চলা আকাশ যান। তুলে আন মরে যারা আজও বেঁচে আছে
কুরুক্ষেত্রের অন্তহীন প্রাণ। যাদের মৃত্যু নেই , যাদের চিতা আজও বহ্নিমান ।

তুলে আন গণকবর থেকে তুলে আন মুক্তিযুদ্ধের লাশ
তুলে আন আউশভিত্স‌ , তুলে আন হিরোশিমা জাপান
তুলে আন তেভাগা চাষিকে তুলে আন নীলরক্তে স্নান
তুলে আন কাল মানুষগুলো যাদের পিঠ চাবুকে লালে লাল

আরেকবার, ওরে আরেকবার আমার মুখের দিকে তাকা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভার তোদের হাতেই দিলাম , আমার ভেতরটা আজ ফাঁকা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত